আলুটিলা গুহা – Alutila Cave
প্রকৃতির রহস্যময়ী আঁচল আর পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা হিমশীতল রোমাঞ্চের নাম আলুটিলা গুহা । বাংলাদেশের পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলায় অবস্থিত এই প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গটি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটকদের কাছে এক পরম আরাধ্য স্থান । স্থানীয়দের ভাষায় এটি ‘মাতাই হাকড়‘ বা দেবতার গুহা নামে পরিচিত । প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ এই অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ আর তার ভেতর দিয়ে বয়ে চলা ঝরনার ঝিরিঝিরি জলধারা পর্যটককে নিয়ে যায় এক আদিম ও মায়াবী জগতে । হাতে জ্বলন্ত মশাল আর পায়ের নিচে পিচ্ছিল পাথুরে পথের এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিতে প্রতি বছর হাজারো ভ্রমণপিপাসু ছুটে আসেন পাহাড়ের এই লুকানো স্বর্গে ।
আরও দেখুন:
- রিসাং ঝর্ণা ভ্রমণ গাইড: যাতায়াত, খরচ ও থাকার পূর্ণাঙ্গ তথ্য
- জাফলং ভ্রমণ গাইড : কিভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন ও খরচ
- সাজেক ভ্যালি ভ্রমণ গাইড: কিভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন ও খরচ
- সুন্দরবন ভ্রমণ গাইড: কিভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন ও খরচ
- কাপ্তাই লেক ভ্রমণ গাইড: খরচ, যাতায়াত ও দর্শনীয় স্থান (পূর্ণাঙ্গ তালিকা)
আলুটিলা গুহা কোথায় অবস্থিত – Alutila Cave Location
আলুটিলা গুহা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলায় অবস্থিত ।
স্থানটি খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে মাটিরাঙ্গা উপজেলায় অবস্থিত । এটি খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের ঠিক পাশেই আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে অবস্থিত । স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মাতাই হাকড়‘ নামেও পরিচিত ।
আলুটিলা গুহা কিভাবে যাবেন
খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহায় যাওয়া বেশ সহজ । ঢাকা, চট্টগ্রাম বা দেশের অন্য যেকোনো প্রান্ত থেকে আপনি সড়কপথে এখানে পৌঁছাতে পারেন । নিচে বিস্তারিত যাতায়াত ব্যবস্থা দেওয়া হলো:
১. ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি
ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে করে খাগড়াছড়ি যাওয়া যায় ।
- বাসের ধরন: এসি এবং নন-এসি উভয় ধরনের বাসই পাওয়া যায় ।
- পরিবহনসমূহ: শান্তি পরিবহণ, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহণ, সৌদিয়া, এস আলম, ইকোনো এবং ঈগল পরিবহণ ।
- ভাড়া: নন-এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ৫২০ থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে এবং এসি বাসের ভাড়া ১,০০০ থেকে ১,৬০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে (সময়ভেদে ভাড়া পরিবর্তন হতে পারে) ।
- সময়: ঢাকা থেকে বাসে যেতে সাধারণত ৭-৮ ঘণ্টা সময় লাগে ।
২. চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ি
চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে নিয়মিত বাস ছাড়ে ।
- পরিবহনসমূহ: বিআরটিসি (BRTC) এবং শান্তি পরিবহণ সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়া অনেক লোকাল বাসও চলাচল করে ।
- ভাড়া: নন-এসি বাসের ভাড়া ১৮০ থেকে ২৭০ টাকার মধ্যে ।
- সময়: চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ি পৌঁছাতে ৩-৪ ঘণ্টা সময় লাগে ।
৩. খাগড়াছড়ি শহর থেকে আলুটিলা গুহা
খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে আলুটিলা গুহার দূরত্ব মাত্র ৭-৮ কিলোমিটার । শহরে পৌঁছানোর পর গুহায় যাওয়ার জন্য নিচের মাধ্যমগুলো ব্যবহার করতে পারেন:
- সিএনজি/অটোরিকশা: শহর থেকে সিএনজি নিয়ে সরাসরি আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়া যায় । একদিকের ভাড়া সাধারণত ১৫০-২০০ টাকা হতে পারে (দরদাম করে নেওয়া ভালো) ।
- চান্দের গাড়ি (জিপ): যদি আপনারা বড় গ্রুপে থাকেন, তবে পুরো দিনের জন্য চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করে আলুটিলা গুহা, রিচাং ঝরনা ও অন্যান্য স্পট ঘুরে দেখতে পারেন ।
- লোকাল বাস: খাগড়াছড়ি থেকে মাটিরাঙ্গার দিকে যাওয়া যেকোনো লোকাল বাসে উঠে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের সামনে নামা যায় ।
৪. পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশ এবং গুহায় যাওয়া
- টিকিট: আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ৪০-৫০ টাকার একটি টিকিট কাটতে হয় ।
- মশাল: গুহার ভেতরটা একদম অন্ধকার, তাই প্রবেশপথের কাছ থেকেই ১০-১৫ টাকা দিয়ে একটি বাঁশের মশাল সংগ্রহ করতে হবে । এটি ছাড়া গুহার ভেতর হাঁটা সম্ভব নয় । এছাড়া আপনি চাইলে নিজের সাথে থাকা শক্তিশালী টর্চলাইটও ব্যবহার করতে পারেন ।
টিপস: আলুটিলা গুহাটি খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঠিক পাশেই অবস্থিত । আপনি যদি চট্টগ্রাম থেকে বাসে আসেন, তবে সুপারভাইজারকে বললে তিনি আপনাকে সরাসরি আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের সামনেই নামিয়ে দিতে পারেন । এতে আপনার সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে ।
কোথায় থাকবেন
খাগড়াছড়ি শহরে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে । আলুটিলা গুহা শহর থেকে খুব কাছে (মাত্র ৮ কিমি) হওয়ায় পর্যটকরা সাধারণত খাগড়াছড়ি শহরেই অবস্থান করেন । আপনার বাজেট ও সুবিধা অনুযায়ী নিচের অপশনগুলো দেখতে পারেন:
১. পর্যটন মোটেল (সরকারি)
এটি খাগড়াছড়ি শহরের প্রবেশমুখেই অবস্থিত । সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই মোটেলে থাকা বেশ নিরাপদ এবং আরামদায়ক ।
- সুবিধা: এসি ও নন-এসি রুম, বড় পার্কিং এরিয়া এবং নিজস্ব রেস্টুরেন্ট ।
- ভাড়া: রুম ভেদে ২,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে ।
২. উন্নত মানের বেসরকারি হোটেল
শহরের কেন্দ্রস্থলে কিছু ভালো মানের বেসরকারি হোটেল আছে, যেগুলোতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়:
- হোটেল গায়িং (Hotel Gaiyoung): এটি খাগড়াছড়ির বেশ জনপ্রিয় ও মানসম্মত হোটেল ।
- হোটেল শৈল সুবর্ণ (Hotel Shailo Suborna): এটিও বেশ ভালো মানের এবং পরিবারের সাথে থাকার জন্য উপযোগী ।
- ভাড়া: এসি রুম ২,৫০০-৪,০০০ টাকা এবং নন-এসি ১,৫০০-২,০০০ টাকা ।
৩. মাঝারি ও বাজেট হোটেল
আপনি যদি কম খরচে থাকতে চান, তবে শাপলা চত্বর বা বাস স্ট্যান্ডের আশেপাশে অনেক বাজেট হোটেল পাবেন:
- হোটেল ইকো ছড়িয়া (Hotel Eco Chhariya)
- হোটেল নূর (Hotel Noor)
- হোটেল অরণ্য বিলাস (Hotel Aranya Bilash)
- ভাড়া: এই হোটেলগুলোতে ৫০০ থেকে ১,২০০ টাকার মধ্যে রুম পাওয়া সম্ভব ।
৪. আর্মি রিসোর্ট (বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে)
খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনীর পরিচালিত ‘আর্য্যগিরি রিসোর্ট’ বা ‘মাউন্টেন ইন’ রয়েছে । তবে এখানে থাকার জন্য আগে থেকে বুকিং বা বিশেষ সম্পর্কের প্রয়োজন হতে পারে ।
💡 কিছু প্রয়োজনীয় টিপস:
- আগে বুকিং: সরকারি ছুটির দিন বা শীতকালে পর্যটকদের অনেক ভিড় থাকে । তাই যাওয়ার অন্তত ১ সপ্তাহ আগে ফোন করে রুম বুক করে রাখা ভালো ।
- লোকেশন: চেষ্টা করবেন শাপলা চত্বর বা এর আশেপাশের এলাকায় থাকতে, কারণ এখান থেকে আলুটিলা বা অন্যান্য জায়গায় যাওয়ার জন্য সহজে সিএনজি বা গাড়ি পাওয়া যায় ।
- চেক-ইন/আউট: অধিকাংশ হোটেলের চেক-আউট সময় সকাল ১১টা বা ১২টা ।
একনজরে খাগড়াছড়ি হোটেল ও হোটেল ভাড়া
| হোটেলের নাম | ধরন ও মান | অবস্থান | আনুমানিক ভাড়া (প্রতি রাত) | যোগাযোগ (মোবাইল/ফোন) |
| পর্যটন মোটেল | সরকারি (সেরা মান) | পর্যটন মোড়, খাগড়াছড়ি প্রবেশমুখ | ২,০০০ – ৫,০০০ টাকা | ০২৩৩৩৩৪৩১১১, ০১৫৫৭-২১৫১৮৮ |
| হোটেল গায়িং | বেসরকারি (উন্নত) | ক্যন্টনমেন্ট এরিয়া, নারকেল বাগান | ২,৫০০ – ৪,৫০০ টাকা | ০১৫৫৬-৫১৭৫৮৮, ০৩৭১-৬১৩৩৭ |
| হোটেল শৈল সুবর্ণ | বেসরকারি (মানসম্মত) | শাপলা চত্বর (শহরের কেন্দ্র) | ১,৫০০ – ৩,৫০০ টাকা | ০১৮৮২-৫৩৫০৫০ |
| হোটেল ইকো ছড়িয়া | মাঝারি (ইকো ফ্রেন্ডলি) | নারকেল বাগান রোড | ১,২০০ – ৩,০০০ টাকা | ০১৮২৮-৮৭৪০১৪ |
| হোটেল অরণ্য বিলাস | মাঝারি/বাজেট | শাপলা চত্বরের কাছে | ১,০০০ – ২,৫০০ টাকা | ০১৮৭৫-৬৯৬৯৬৯ |
| হোটেল নূর | বাজেট ফ্রেন্ডলি | বাস স্ট্যান্ড এলাকা | ৮০০ – ১,৫০০ টাকা | ০১৮৩৬-৮৫৮০৫০ |
| হোটেল মাউন্টেন ইন | প্রিমিয়াম | জেল রোড, খাগড়াছড়ি | ২,৫০০ – ৫,০০০ টাকা | ০১৮১৯-৮৫৩০৩৫ |
কোথায় খাবেন
খাগড়াছড়িতে খাওয়ার অভিজ্ঞতা হবে একদম অন্যরকম । এখানে আপনি সমতলের সাধারণ খাবারের পাশাপাশি পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী ও মশলাদার খাবারের স্বাদ নিতে পারবেন । নিচে খাগড়াছড়ির সেরা কিছু রেস্টুরেন্টের তালিকা দেওয়া হলো:
১. সিস্টেম রেস্টুরেন্ট (System Restaurant)
খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম হলো সিস্টেম রেস্টুরেন্ট । এটি খাগড়াছড়ি জেলা সদরের পানখাইয়া পাড়ায় অবস্থিত।
- কেন যাবেন: পাহাড়ী ঘরানায় তৈরি এই রেস্টুরেন্টে আপনি সম্পূর্ণ আদিবাসী স্টাইলে খাবার পাবেন। এখানে বসে খাওয়ার জন্য নিচু টেবিল ও মাচার ব্যবস্থা আছে ।
- স্পেশাল মেনু: বাঁশের কোড়ল (Bamboo Shoot), কচি বাঁশের ভেতর রান্না করা মুরগি (Bamboo Chicken), পাহাড়ি ছোট মাছের চচ্চড়ি এবং হরেক রকমের ভর্তা ।
২. পাজন রেস্টুরেন্ট (Pajon Restaurant)
এটিও পানখাইয়া পাড়া এলাকায় অবস্থিত এবং সিস্টেম রেস্টুরেন্টের মতোই জনপ্রিয় ।
- কেন যাবেন: খাবারের গুণমান এবং পরিবেশের জন্য এটি পরিচিত । ঘরোয়া পরিবেশে পাহাড়ী খাবারের আসল স্বাদ নিতে চাইলে এখানে যেতে পারেন ।
- স্পেশাল মেনু: বিভিন্ন ধরনের পাহাড়ি শাক-সবজি এবং ঐতিহ্যবাহী ‘পাজন’ (অনেক প্রকার সবজি দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ রান্না) ।
৩. বনভোজন রেস্টুরেন্ট (Bonbhojan)
এটি খাগড়াছড়ি শহর এলাকায় অবস্থিত । যারা খুব বেশি মশলাদার বা একদম আদিবাসী খাবার খেতে অভ্যস্ত নন, তাদের জন্য এটি ভালো অপশন ।
- কেন যাবেন: এখানে পাহাড়ি খাবারের পাশাপাশি সাধারণ বাঙালি খাবার (ভাত, মাছ, মাংস, ডাল) খুব চমৎকারভাবে পরিবেশন করা হয় ।
৪. নিউজিল্যান্ড ক্যাফে (New Zealand Cafe)
খাগড়াছড়ি শহরের কাছেই নিউজিল্যান্ড’ নামক একটি সুন্দর এলাকা আছে । সেখানে ঘোরার পাশাপাশি এই ক্যাফেতে সময় কাটাতে পারেন ।
- কেন যাবেন: বিকেলের নাস্তা, কফি বা হালকা স্ন্যাকসের জন্য এটি সেরা জায়গা । এখান থেকে পাহাড়ের ভিউটাও দারুণ পাওয়া যায় ।
🥗 খাওয়ার জন্য কিছু স্পেশাল টিপস:
| খাবারের নাম | বর্ণনা | কেন ট্রাই করবেন? |
| ব্যাম্বু চিকেন | বাঁশের চোঙের ভেতরে বিশেষ কায়দায় রান্না করা মুরগি। | বাঁশের ঘ্রাণ আর মশলার এক অপূর্ব মিশেল পাওয়া যায়। |
| বাঁশের কোড়ল | কচি বাঁশের ডগা দিয়ে তৈরি সবজি। | এটি পাহাড়ের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার। |
| বিভিন্ন ভর্তা | থানকুনি পাতা, টক পাতা বা পোড়া মাছের ভর্তা। | পাহাড়ি মরিচের ঝাল আর ফ্রেশ সবজির স্বাদ মুখে লেগে থাকবে। |
⚠️ মনে রাখবেন:
- সিস্টেম বা পাজন রেস্টুরেন্টে দুপুরের দিকে প্রচণ্ড ভিড় থাকে, তাই একটু আগেভাগে যাওয়াই ভালো ।
- পাহাড়ি খাবারে ঝাল সাধারণত একটু বেশি থাকে, তাই ঝাল কম খেতে চাইলে অর্ডার দেওয়ার সময় আগেই বলে নিন ।
খাগড়াছড়ি দর্শনীয় স্থান
খাগড়াছড়ি জেলাটি পাহাড়, ঝরনা এবং সবুজের এক অনন্য সংমিশ্রণ । আপনি যদি খাগড়াছড়ি ভ্রমণে যান, তবে আলুটিলা গুহা ছাড়াও আরও বেশ কিছু চমৎকার জায়গা রয়েছে যা আপনার তালিকায় রাখা উচিত ।
- আলুটিলা গুহা
- রিসাং ঝর্ণা
- তারেং
- হর্টিকালচার পার্ক
- নিউজিল্যান্ড পাড়া
- বৌদ্ধ বিহার
- দেবতা পুকুর
- শতায়ু বর্ষী বটগাছ
- মায়াবিনী লেক
🗺️ ভ্রমণের একটি সংক্ষিপ্ত ম্যাপ (শহর থেকে দূরত্ব):
| স্থান | দূরত্ব (প্রায়) | যাতায়াত মাধ্যম |
| আলুটিলা গুহা | ৮ কিমি | সিএনজি / মাহিন্দ্রা |
| রিচাং ঝরনা | ১১ কিমি | সিএনজি / জিপ |
| হর্টিকালচার পার্ক | ২ কিমি | রিকশা / অটো |
| নিউজিল্যান্ড পাড়া | ৩ কিমি | অটো / পায়ে হাঁটা |
| দেবতা পুকুর | ১৮ কিমি | জিপ / সিএনজি + ট্রেকিং |
⛰️ খাগড়াছড়ি ২ দিন ১ রাত: পূর্ণাঙ্গ ট্যুর প্ল্যান
এই প্ল্যানটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে আপনি আলুটিলা গুহার পাশাপাশি খাগড়াছড়ির প্রধান আকর্ষণগুলো ঘুরে দেখতে পারেন ।
দিন ১: পৌঁছানো এবং খাগড়াছড়ি শহর ভ্রমণ
- সকাল (৭:০০ – ৮:০০): ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে বাসযোগে খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছানো । এরপর কোনো হোটেলে ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিন ।
- দুপুর (১২:০০ – ৩:০০): স্থানীয় জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট ‘সিস্টেম রেস্টুরেন্ট’-এ ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ী খাবারের স্বাদ নিন (বাঁশের কোড়ল বা ব্যাম্বু চিকেন ট্রাই করতে ভুলবেন না) ।
- বিকেল (৩:৩০ – ৫:৩০): সিএনজি বা মাহিন্দ্রা নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন আলুটিলা গুহা এবং তারেং-এর উদ্দেশ্যে।
- প্রথমে আলুটিলা গুহা ভ্রমণ করুন (মশাল নিতে ভুলবেন না) ।
- গুহা থেকে বের হয়ে কাছেই অবস্থিত রিচাং ঝরনা দেখে নিন ।
- সন্ধ্যা (৬:০০ – ৭:৩০): সূর্যাস্তের সময় আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের ভিউ পয়েন্ট থেকে পুরো শহরের আলোকসজ্জা উপভোগ করুন । এরপর খাগড়াছড়ি সদরে ফিরে এসে রাতের খাবার ও বিশ্রাম ।
দিন ২: সাজেক ভ্যালি অথবা জেলা সদরের বাকি অংশ
যদি আপনার হাতে সময় কম থাকে তবে সাজেক না গিয়ে খাগড়াছড়ি শহরের আশেপাশের বাকি জায়গাগুলো দেখতে পারেন:
- সকাল (৯:০০ – ১১:০০): খাগড়াছড়ি হর্টিকালচার পার্ক বা ঝুলন্ত ব্রিজ ভ্রমণ । পরিবার নিয়ে ঘোরার জন্য এটি দারুণ জায়গা।
- দুপুর (১২:০০ – ২:০০): দেবতা পুকুর ভ্রমণ । এটি পাহাড়ের অনেক উঁচুতে অবস্থিত একটি স্বচ্ছ পানির পুকুর, যা স্থানীয়দের কাছে পবিত্র । (এটি বেশ ট্রেকিংয়ের কাজ, তাই শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন) ।
- বিকেল (৩:০০ – ৫:০০): শতায়ু বর্ষী বটগাছ এবং অপরাজিতা বৌদ্ধ বিহার দেখে নিন। এটি আপনার মনে প্রশান্তি এনে দেবে ।
- রাত: খাগড়াছড়ি শহর থেকে রাতের বাসে করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ।
💰 সম্ভাব্য খরচ (জনপ্রতি)
| খাতের নাম | আনুমানিক খরচ (টাকা) |
| যাতায়াত (ঢাকা-খাগড়াছড়ি আপ-ডাউন) | ১,৪০০ – ১,৮০০ |
| অভ্যন্তরীণ যাতায়াত (চাঁদের গাড়ি/সিএনজি) | ৫০০ – ৮০০ |
| থাকা (সাধারণ হোটেল, শেয়ারিং) | ৫০০ – ৮০০ |
| খাবার (২ দিন) | ১,০০০ – ১,২০০ |
| প্রবেশ টিকেট ও মশাল | ১০০ |
| মোট | ৩,৫০০ – ৪,৭০০ টাকা |
পরিশেষে বলা যায়, আলুটিলা গুহা কেবল একটি প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ নয়, বরং এটি অ্যাডভেঞ্চার আর রহস্যের এক রোমাঞ্চকর মেলবন্ধন । পাহাড়ের নিস্তব্ধতা আর মশালের আলো-আঁধারিতে ঘেরা এই পথ পাড়ি দেওয়া প্রতিটি ভ্রমণপিপাসুর জন্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা । নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেতে এবং প্রকৃতির আদিম রূপকে খুব কাছ থেকে অনুভব করতে খাগড়াছড়ির এই ‘মাতাই হাকড়’ বা দেবতার গুহা হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের আদর্শ গন্তব্য । সুতরাং, পিঠে ব্যাগ আর হাতে মশাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন—প্রকৃতির এই রহস্যময় হাতছানি আপনাকে নিরাশ করবে না ।
আলুটিলা গুহা সম্পর্কে সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
১. আলুটিলা গুহায় প্রবেশের টিকেট মূল্য কত?
উত্তর: আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশের টিকেট মূল্য জনপ্রতি সাধারণত ৪০-৫০ টাকা । তবে সময়ের সাথে এটি সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে ।
২. গুহার ভেতরে কি মশাল নিয়ে যেতেই হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, গুহার ভেতরটা একেবারেই অন্ধকার এবং সেখানে কোনো কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা নেই । তাই প্রবেশপথ থেকে ১০-১৫ টাকা দিয়ে একটি বাঁশের মশাল কিনে নেওয়া জরুরি । আপনি চাইলে নিজের সাথে শক্তিশালী টর্চলাইট বা স্মার্টফোনের ফ্ল্যাশলাইটও ব্যবহার করতে পারেন, তবে মশালের অভিজ্ঞতাটি বেশি রোমাঞ্চকর ।
৩. গুহাটি পার হতে কত সময় লাগে?
উত্তর: গুহাটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ১০০ মিটার । স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে গেলে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে ।
৪. গুহার ভেতরটা কি বিপজ্জনক?
উত্তর: গুহাটি খুব বেশি বিপজ্জনক নয়, তবে এর মেঝে বেশ পিচ্ছিল এবং পাথুরে। নিচ দিয়ে সবসময় ঝরনার পানি প্রবাহিত হয় । তাই সাবধানে পা ফেলতে হবে । যাদের শ্বাসকষ্ট বা অন্ধকার নিয়ে ভীতি (Claustrophobia) আছে, তাদের জন্য ভেতরে প্রবেশ না করাই ভালো ।
৫. ছোট শিশু বা বয়স্করা কি এই গুহায় ঢুকতে পারবেন?
উত্তর: সুস্থ ও সবল বয়স্করা অনায়াসেই ঢুকতে পারবেন । শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্যই বড়দের হাত ধরে থাকতে হবে । তবে খুব ছোট শিশু বা শারীরিক অসুস্থতা থাকলে গুহায় প্রবেশ না করে বাইরের ভিউ পয়েন্টে সময় কাটানো বুদ্ধিমানের কাজ ।
৬. গুহায় প্রবেশের জন্য কোন ধরনের জুতা পরা উচিত?
উত্তর: পিচ্ছিল পাথুরে পথে হাঁটার জন্য ভালো গ্রিপ আছে এমন কেডস বা রাবারের স্যান্ডেল পরা সবচেয়ে নিরাপদ । হিল জুতা বা পিচ্ছিল তলার জুতা পরে ভেতরে ঢোকা উচিত নয় ।
৭. আলুটিলা গুহা ভ্রমণের সেরা সময় কোনটি?
উত্তর: বছরের যেকোনো সময় যাওয়া যায় । তবে শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক । বর্ষাকালে গুহার ভেতরে পানির পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকে এবং পথ বেশি পিচ্ছিল হয়, যা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের জন্য বাড়তি আনন্দ দেয় ।
৮. গুহাটি কি সারারাত খোলা থাকে?
উত্তর: না, এটি একটি নিয়ন্ত্রিত পর্যটন কেন্দ্র । সাধারণত সকাল ৯:০০টা থেকে বিকেল ৫:০০টা বা সন্ধ্যা ৬:০০টা পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে ।

