• বিড়াল প্রবন্ধ
  • লেখাপড়া
  • বিড়াল প্রবন্ধ প্রশ্ন উত্তর | বিড়াল প্রবন্ধ class 11

    বিড়াল প্রবন্ধ প্রশ্ন উত্তর

    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিড়াল’ প্রবন্ধটি কেবল একটি প্রাণীর চাতুর্যের গল্প নয়, বরং এটি সমাজতাত্ত্বিক সাম্যবাদ এবং মানবিক মূল্যবোধের এক শাণিত দলিল । লেখক এখানে বিড়ালের প্রতীকী সংলাপের মাধ্যমে সমাজের ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্যের দেয়ালে তীব্র আঘাত করেছেন । প্রবন্ধটি আমাদের শেখায় যে, সমাজে ক্ষুধার্তের ক্ষুধার দায়ভার কেবল ব্যক্তির নয়, বরং তা বিবেকহীন সমাজব্যবস্থারও । মূলত শোষিত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে বিড়ালের যুক্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং কমলাকান্তের বিচারবোধের দ্বৈরথেই এই প্রবন্ধের মূল মাহাত্ম্য নিহিত ।

    প্রশ্নঃ চোর দোষী বটে, কিন্তু কৃপণ ধনী তদপেক্ষা শতগুণ দোষী – এ কথার তাৎপর্য কী?

    উত্তরঃ প্রয়োজনাতীত ধন থাকা সত্ত্বেও কৃপণ ধনী ক্ষুধার্তের জন্য খাবার বা সম্পদ বিতরণ করে না বলেই লোকে চুরী করে । ‘বিড়াল’ রচনায় বিড়ালের সাথে কমলাকান্তের কাল্পনিক কথোপকথনে চোরের চুরি করার কারণ বর্ণিত হয়েছে । বলা হয়েছে, চোর চুরি করে বলে সে দোষী । অথচ ধনীরা প্রয়োজনাতীত ধন থাকা সত্ত্বেও তারা ক্ষুধার্তের প্রতি মুখ তুলে চায় না । তাই চোর চুরি করতে বাধ্য হয় । অতএব, চোরের চেয়েও কৃপণ বেশি অপরাধী ।

    প্রশ্নঃ একটি পতিত আত্মাকে অন্ধকার হইতে আলোকে আনিয়াছি, ভাবিয়া কমলাকান্তের বড়ই আনন্দ হইল – কেন?

    উত্তরঃ কমলাকান্ত যখন চুরির অপরাধে বিড়ালকে শাসন করতে যান, তখন বিড়ালটি কেবল পালিয়ে না গিয়ে উল্টো যুক্তির বাণ ছুড়ে দেয় । বিড়ালের মতে, জগতের সকল খাদ্যে প্রতিটি প্রাণীর ন্যায্য অধিকার রয়েছে। যদি কেউ ক্ষুধার তাড়নায় অন্যের খাবার গ্রহণ করে, তবে সেই ‘চুরির’ জন্য প্রকৃত অপরাধী বিড়াল নয়, বরং সমাজের সেই কৃপণ ধনীরা যারা নিজেদের প্রাচুর্য বিলিয়ে দেয় না ।

    বিড়ালের এই অকাট্য সামাজিক ও সাম্যবাদী যুক্তির সামনে কমলাকান্ত তাত্ত্বিকভাবে পরাস্ত হন । নিজের পরাজয় ঢাকতে তিনি তখন চিরাচরিত নীতিকথার আশ্রয় নেন এবং উপদেশ দিয়ে বিড়ালকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেন । শেষ পর্যন্ত বিড়ালটি শান্ত হলে কমলাকান্ত এই ভেবে আত্মতৃপ্তি পান যে, তার নীতিবাক্যের প্রভাবেই হয়তো একটি ‘পতিত আত্মার’ নৈতিক সংশোধন সম্ভব হয়েছে ।

    প্রশ্নঃ ‘সকল দুশ্চিন্তা পরিত্যাগ করিয়া ধর্মাচরণে মন দাও’- কে, কেন বলেছিল?

    উত্তরঃ নিজের জন্য রাখা দুধটুকু যখন বিড়াল সাবাড় করে দেয়, তখন স্বভাবজাত রাগে কমলাকান্ত তাকে লাঠি দিয়ে মারতে যান । কিন্তু বিড়ালটি ভয় পাওয়ার বদলে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় । সে বুঝিয়ে দেয় যে, তার চুরির পেছনে আসলে সমাজের কৃপণ ও হৃদয়হীন মানুষদের বড় ভূমিকা রয়েছে । বিড়ালের এমন তীক্ষ্ণ ও সামাজিক সত্যের সামনে কমলাকান্ত মানসিকভাবে কুপোকাত বা পর্যুদস্ত হয়ে পড়েন ।

    তবে একজন মানুষ হিসেবে বিড়ালের কাছে নিজের হার স্বীকার করা তার আভিজাত্যে বাধে । তাই নিজের দুর্বলতা ঢাকতে এবং নিজের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করতে তিনি বিড়ালকে নানা উপদেশ দিতে শুরু করেন । মূলত বিড়ালের অকাট্য যুক্তির হাত থেকে বাঁচতেই কমলাকান্ত একপ্রকার কৌশলে এই নীতিবাক্যমূলক মন্তব্যটি করেছিলেন ।

    প্রশ্নঃ ‘তাহাদের রূপের ছটা দেখিয়া, অনেক মার্জার কবি হইয়া পড়ে । কার, কেন?

    উত্তরঃ বিত্তবানদের আশীর্বাদপুষ্ট মার্জারীর রূপের ছটা দেখে অনেক মার্জারীর মধ্যেই বিশেষ ভাবনার উদ্রেষ্ট হয় ।
    সমাজে বিত্তহীন শ্রেণি প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হলেও ধনিক শ্রেণি তাদের দিকে দৃষ্টি দেয় না । কদাচিৎ এই শ্রেণির কারো দিকে যদি ধনীদের অনুকম্পার দৃষ্টি পড়ে তবে সে শ্রেণিস্বার্থ ভুলে আপসের মাধ্যমে নাদুসনুদুস হয়ে ওঠে । তখন তার সৌন্দর্য দেখে সগোত্রের অনেকেই ভাবনায় পড়ে যায়, যা কবিরই অনুরূপ ।

    প্রশ্নঃ ‘সমাজের ধনবৃদ্ধির অর্থ ধনীর ধনবৃদ্ধি’ ব্যাখ্যা করো ।

    উত্তরঃ আলোচ্য অংশে সমাজের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং তার সুফল বণ্টন নিয়ে কমলাকান্ত ও বিড়ালের ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে । কমলাকান্তের যুক্তি ছিল প্রচলিত পুঁজিবাদী দর্শনের মতো—সম্পদ অর্জনের নিরাপত্তা না থাকলে এবং চোরের হাত থেকে তা রক্ষা করার ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ সম্পদ বৃদ্ধিতে উৎসাহ হারাবে, যার ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির চাকা থমকে যাবে ।

    তবে বিড়াল এই তথাকথিত ‘সমাজের ধনবৃদ্ধি’র সংজ্ঞাকে এক হাত নিয়েছে । তার মতে, সমাজের এই শ্রী বৃদ্ধি মূলত মুষ্টিমেয় বিত্তশালীদের ভাগ্যোন্নয়ন ছাড়া আর কিছুই নয় । কারণ সাধারণ বা দরিদ্র মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন তাতে ঘটে না । বিড়ালের এই আত্মোপলব্ধি বা স্বগতোক্তির মাধ্যমে লেখক আসলে সমাজের রূঢ় বৈষম্যকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন ।

    আরও পড়ুন:  প্রত্যুপকার গল্পের মূলভাব - প্রত্যুপকার গল্পের অনুধাবন প্রশ্ন

    প্রশ্নঃ ‘যখন বিচারে পরাস্ত হইবে তখন গম্ভীরভাবে উপদেশ প্রদান করিবে’ ব্যাখ্যা করো ।

    উত্তরঃ “বিচারে পরাস্ত হইলে গম্ভীরভাবে উপদেশ প্রদান করিবে”—কমলাকান্তের এই উক্তিটি মূলত নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয় ঢাকার একটি ঢাল বা আত্মরক্ষামূলক চাতুর্য ।

    প্রবন্ধটিতে বিড়াল ও কমলাকান্তের মধ্যে যে কাল্পনিক ও দার্শনিক বিতর্ক চলে, তাতে বিড়াল একজন দক্ষ ‘সোশ্যালিস্ট’ বা সমাজতন্ত্রীর মতো যুক্তি উপস্থাপন করে । তার তীক্ষ্ণ সামাজিক ও নৈতিক প্রশ্নের সামনে কমলাকান্ত কার্যত বাকরুদ্ধ ও পরাজিত হয়ে পড়েন । বিড়ালের এই অকাট্য যৌক্তিকতার কাছে হার মেনেও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য কমলাকান্ত উপদেশের আশ্রয় নেন । মূলত নিজের অসহায়ত্বকে হাস্যরসের মাধ্যমে প্রকাশ করতেই লেখক এখানে এই বিদ্রূপাত্মক বা শ্লেষাত্মক বাক্যটি ব্যবহার করেছেন ।

    প্রশ্নঃ ‘পরোপকারই পরম ধর্ম’ – ব্যাখ্যা করো ।

    উত্তরঃ ‘বিড়াল’ প্রবন্ধে ‘পরোপকারই পরম ধর্ম’—এই চিরন্তন সত্যটি এক ভিন্নধর্মী ও কৌতুকপূর্ণ প্রেক্ষাপটে ফুটে উঠেছে । কমলাকান্তের জন্য রাখা দুধটুকু যখন বিড়াল খেয়ে ফেলে, তখন তিনি শাসনের পরিবর্তে এক অভাবনীয় দার্শনিক তর্কের সম্মুখীন হন । বিড়ালটি অত্যন্ত চতুরতার সাথে যুক্তি দেয় যে, কমলাকান্তের সঞ্চিত দুধ পান করার মাধ্যমে তার ক্ষুধা নিবৃত্ত হয়েছে, যা আসলে একটি বড় ধরনের ‘পরোপকার’ ।

    বিড়ালের মতে, যেহেতু এই কাজের ফলে তার উপকার হয়েছে, তাই পরোক্ষভাবে কমলাকান্তই এই মহৎ পুণ্য বা ‘পরম ধর্ম’ পালনের ফল লাভ করেছেন । বিড়ালের এই বাকচাতুর্যের আড়ালে লেখক আসলে মানুষের চিরাচরিত মানবতাবাদী দর্শনকেই তুলে ধরেছেন । এর মূল নির্যাস হলো—অন্যের কল্যাণ সাধনই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কাজ, তা সে মানুষ হোক বা অন্য কোনো ক্ষুধার্ত প্রাণী ।

    প্রশ্নঃ ‘ধনীর দোষেই দরিদ্র চোর হয়’ – উক্তিটি ব্যাখ্যা করো ।

    উত্তরঃ ধনীর কৃপণতার জন্যই দরিদ্র চোরে পরিণত হয় । একজন মানুষ কেন চোর হয় তা ‘বিড়াল’ রচনায় যুক্তিসংগত বিশ্লেষে বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে । ধনী দরিদ্রকে বঞ্চিত করে নিজের সম্পদ সংগ্রহ করে । তাই বেঁচে থাকার জন্য দরিদ্র খাদ্য চুরি করতে বাধ্য হয় । তাই দরিদ্র চুরি করলেও চুরির মূল কারণ কৃপণের মাত্রাতিরিক্ত ধন সঞ্চয় ।

    প্রশ্নঃ বিড়াল কেন বলে, ‘দরিদ্রের আহার সংগ্রহের দণ্ড আছে, ধনীর কার্পণ্যের দণ্ড নাই কেন?’

    উত্তরঃ ধনীরা সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার কারণে দরিদ্র চুরি করতে বাধ্য হয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হয় বলেই একথা বলা হয়েছে । ধনী ব্যক্তিরা নির্দয়ের মতো সমস্ত ধনসম্পদ আগলে রাখে অথচ ক্ষুধা-দারিদ্র্যপীড়িত কারো পাশে গিয়ে দাঁড়ায় না । তারা একা অনেক সঞ্চয় করে যার দরুন গরিবকে বাধ্য হয়ে চোর হতে হয় । কিন্তু সমাজে চোরের জন্যে শাস্তির বিধান থাকলেও চুরির মূলে দায়ী ধনীদের কোনো শাস্তির বিধান নেই বলে একথা বলা হয়েছে ।

    প্রশ্নঃ বিড়াল চোরকে সাজা দেওয়ার পূর্বে বিচারককে তিন দিন উপবাস করার কথা বলেছে কেন?

    উত্তরঃ বিচারক যদি অপরাধীর বেদনা বুঝতে পারেন তাহলে বিচার সার্থক হয়- এ কারণে চোরকে সাজা দেওয়ার আগে বিচারককে তিন দিন উপবাস করার কথা বলা হয়েছে ।
    বিচারকের কাজ সর্বদা ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং নিরপেক্ষভাবে অপরাধের কারণ বের করে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া । ক্ষুধা না লাগলে কেউ চুরি করে না । তাই চোরের বিচার করার আগে বিচারক যদি তিন দিন উপবাস করেন তবেই তিনি বুঝতে পারবেন ক্ষুধার জ্বালা কেমন এবং চোরের চুরির কারণ কী। বিষয়টি বোঝাতেই প্রশ্নোক্ত কথাটি বলা হয়েছে ।

    প্রশ্নঃ ‘কেহ মরে বিল ছেঁচে, কেহ খায় কই’- উক্তিটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?

    উত্তরঃ কাজ করে একজন কিন্তু তার ফল ভোগ করে অন্যজন- এটি বোঝাতে প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করা হয়েছে ।
    প্রসন্ন গোয়ালিনী কমলাকান্তের জন্য এক বাটি দুধ রেখে যায় । কিন্তু সে নেশার ঘোরে অন্যমনস্ক থাকার সুযোগে বিড়াল তার দুধটুকু খেয়ে নেয় । দুধ খাওয়ার পর পরিতৃপ্ত বিড়ালের আচরণ দেখে কমলাকান্তের মনে হয়, বিড়াল ভাবছে, কেহ মরে বিল ছেঁচে, কেহ খায় কই । অর্থাৎ কমলাকান্তের জন্য দুধ রাখা হলেও তা সে পান করতে পারল না, বিড়ালই তা পান করল ।

    আরও পড়ুন:  সোনার তরী কবিতার লাইন বাই লাইন ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ

    প্রশ্নঃ দরিদ্রের ব্যথায় ব্যথিত হওয়া লজ্জার কথা কেন?

    উত্তরঃ তথাকথিত সমাজব্যবস্থায় দরিদ্রকে সবাই এড়িয়ে চলতে চায় বলে দরিদ্রের ব্যথায় ব্যথিত হওয়াকে সবাই লজ্জাজনক মনে করে । মানুষের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধানকে প্রকট করে তুলেছে । সকলেই ধনীদের সুখে সুখী আর দুঃখে দুঃখী হয় । দরিদ্রের জন্য সহমর্মিতা অনুভব করতে আমাদের যেন বাধে। দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তির জন্য সকলের চোখে থাকে অবজ্ঞার ভাব । তাই দরিদ্রের ব্যথায় ব্যথিত হওয়াকে লজ্জার বলে মনে হয় ।

    প্রশ্নঃ ‘তেলা মাথায় তেল দেওয়া মনুষ্য জাতির রোগ’- ব্যাখ্যা করো ।

    উত্তরঃ উক্তিটিতে সাধারণ মানুষ কর্তৃক ধনীদের তোষণের দিকটি ব্যস্ত হয়েছে ।
    বিড়ালের মতে ধনীকে তোষণ করা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য । যাদের ধন-সম্পদ আছে তারা দরিদ্র-অসহায়কে তা দান করে না অথচ ধনী লোককে আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করে । দরিদ্ররা অভুক্তই থেকে যায়, তাই বলা হয়েছে, ‘তেলা মাথায় তেল দেওয়া মনুষ্য জাতির রোগ ।’

    প্রশ্নঃ ‘অতএব চোরের দণ্ডবিধান কর্তব্য’ – ব্যাখ্যা করো ।

    উত্তরঃ চোরকে শাস্তি না দিলে সমাজের সাধারণ মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে না বলে কমলাকান্ত প্রশ্নোক্ত কথা বলেছে । চুরি সমাজের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নষ্ট করে । এতে সমাজে বিশৃঙ্খল ও অশান্তিকর অবস্থা গড়ে ওঠে । সমাজ ভারসাম্যহীনতার সম্মুখীন হয়। চোরকে শাস্তি না দিলে এই সমস্যা দিন দিন বাড়তে থাকে । এজন্য চোরের দণ্ডবিধান কর্তব্য ।

    প্রশ্নঃ সামাজিক ধনবৃদ্ধি বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

    উত্তরঃ আলোচ্য অংশে সমাজের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং তার সুফল বণ্টন নিয়ে কমলাকান্ত ও বিড়ালের ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে । কমলাকান্তের যুক্তি ছিল প্রচলিত পুঁজিবাদী দর্শনের মতো—সম্পদ অর্জনের নিরাপত্তা না থাকলে এবং চোরের হাত থেকে তা রক্ষা করার ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ সম্পদ বৃদ্ধিতে উৎসাহ হারাবে, যার ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির চাকা থমকে যাবে । তবে বিড়াল এই তথাকথিত ‘সমাজের ধনবৃদ্ধি’র সংজ্ঞাকে এক হাত নিয়েছে । তার মতে, সমাজের এই শ্রী বৃদ্ধি মূলত মুষ্টিমেয় বিত্তশালীদের ভাগ্যোন্নয়ন ছাড়া আর কিছুই নয় । কারণ সাধারণ বা দরিদ্র মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন তাতে ঘটে না । বিড়ালের এই আত্মোপলব্ধি বা স্বগতোক্তির মাধ্যমে লেখক আসলে সমাজের রূঢ় বৈষম্যকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন ।

    প্রশ্নঃ চোর অপেক্ষা ধনী শতগুণ দোষী কেন? – ব্যাখ্যা করো ।

    উত্তরঃ প্রয়োজনাতীত ধন থাকা সত্ত্বেও কৃপণ ধনী ক্ষুধার্তের জন্য খাবার বা সম্পদ বিতরণ করে না বলেই লোকে চুরী করে । ‘বিড়াল’ রচনায় বিড়ালের সাথে কমলাকান্তের কাল্পনিক কথোপকথনে চোরের চুরি করার কারণ বর্ণিত হয়েছে । বলা হয়েছে, চোর চুরি করে বলে সে দোষী । অথচ ধনীরা প্রয়োজনাতীত ধন থাকা সত্ত্বেও তারা ক্ষুধার্তের প্রতি মুখ তুলে চায় না । তাই চোর চুরি করতে বাধ্য হয় । অতএব, চোরের চেয়েও কৃপণ বেশি অপরাধী ।

    প্রশ্নঃ ‘খাইতে দাও – নহিলে চুরি করিব’- বিড়ালের এমন মন্তব্যের কারণ কী?

    উত্তরঃ ‘খাইতে দাও – নহিলে চুরি করিব’ বিড়ালের এমন মন্তব্যের কারণ সমাজের ধনীদের দ্বারা গরিবের অধিকার বঞ্চনা । আমাদের সমাজে যারা দরিদ্র, অসহায় তাদের প্রায়শই অনাহারে দিন কাটাতে হয় । অথচ তাদের এই অবস্থা দেখে কেউ সমব্যথী হয় না, তাদের দিকে ফিরে তাকায় না, এমনকি তাদের প্রতি সহযোগিতার হাতও বাড়িয়ে দেয় না । তাই কখনো কখনো তারা চুরির মতো হীন কাজ করতে বাধ্য হয় । অর্থাৎ ধনীর কৃপণতাই দরিদ্রকে চুরি করতে বাধ্য করে । তাই সমাজের ধনীদের দ্বারা গরিবের এমন অধিকার বঞ্চনাই বিড়াল কর্তৃক আলোচ্য মন্তব্যটির কারণ ।

    প্রশ্নঃ ‘অধর্ম চোরের নহে – চোরে যে চুরি করে, সে অধর্ম কৃপণ ধনীর’ – ব্যাখ্যা করো ।

    উত্তরঃ সমাজের বিত্তবানদের কাছ থেকে সাহায্য না পেয়ে অন্নাভাবে, অর্থাভাবে অনেকে চুরি করতে বাধ্য হয় ।
    চুরি করা নিঃসন্দেহে একটি অপরাধ । যার জন্য শাস্তির বিধানও রয়েছে । কিন্তু চোরের এই চুরি করার দায় সমাজের কৃপণ ধনীর ওপরও অনেকখানি বর্তায় । দরিদ্র শ্রেণির মানুষরা দিন অন্তে খাদ্যের কষ্টে ভোগে । অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কৃপণ ধনীরা তাদের অর্থ বা খাদ্য দিয়ে সহায়তা করে না বলে তাদের অনেকেই জীবন বাঁচাতে চুরির পথ বেছে নিতে বাধ্য হয় । তাই এই চুরির দায়, চোরের সাথে সাথে কৃপণ ধনীর ওপরও বর্তায় বলে গল্পের বিড়ালের অভিমত ।

    আরও পড়ুন:  ফুলের বিবাহ গল্পের MCQ । ফুলের বিবাহ গল্পের বহুনির্বাচনি প্রশ্ন উত্তর

    প্রশ্নঃ বিড়ালের মতে চোর কেন চুরি করে?

    উত্তরঃ যা বেড়ালের মতে, খেতে না পেয়ে চোর চুরি করে ।
    ‘বিড়াল’ শীষক বঙ্গধর্মী রচনায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দরিদ্র, নিষ্পেষিত ও শোষিত মানুষের বঞ্চনা ও অধিকারের কথা বিড়ালের জবানীতে তুলে ধরেছেন । বেড়ালের মতে, চোর ক্ষুধার জ্বালায় চুরি করতে বাধ্য হয় । তার এই চুরির জন্য সে একা দায়ী নয় । সমাজের ধনিক ও উঁচু শ্রেণির মানুষরাও পরোক্ষভাবে এর জন্য দায়ী । চোরের যদি দুবেলা দুমুঠো অন্ন জুটতো, থাকা পরার অভাব না থাকতো, তবে সে চুরি করতো না । কিংবা সমাজের ধনী শ্রেণি যদি তাদের উদ্বৃত্ত খাদ্য ও অর্থ নিয়ে দরিদ্র মানুষদের পাশে দাঁড়াতো তবেও চোর চুরি করতো না । তাই অভাবের তাড়নায় এক প্রকার বাধ্য হয়েই চোর চুরি করে ।

    প্রশ্নঃ ‘তাহাতে সমাজের ধনবৃদ্ধি হইবে না’ উক্তিটি ব্যাখ্যা করো ।

    উত্তরঃ যার যত ক্ষমতা, সে যদি তত ধন সঞ্চয় করতে না পারে, তাহলে সমাজের ধন বৃদ্ধি হবে না মনে করে কমলাকান্ত আলোচ্য উক্তিটি করেছিল ।
    ‘বিড়াল’ রচনায় লেখক বিড়ালের সোশিয়ালিস্টিক কথা শুনে অনেকটা পরাজিত মনোভাব নিয়ে বলেন, যদি যার যত ক্ষমতা, সে তত ধন সঞ্চয় করতে না পারে অথবা সঞ্চয় করে চোরের জ্বালায় নির্বিঘ্নে ভোগ করতে না পারে, তবে কেউ আর ধন সঞ্চয়ে যত্নবান হবে না । তাতে সমাজের ধনবৃদ্ধিও হবে না । মূলত সমাজের ধনিকশ্রেণির পক্ষ সমর্থন করতেই কথাগুলো বলেছিল কমলাকান্ত ।

    প্রশ্নঃ কমলাকান্ত বিড়ালকে ‘পতিত আত্মা’ বলার কারণ কী? বুঝিয়ে লেখো ।

    উত্তরঃ বিড়াল ক্ষুধার জ্বালায় পাপ কাজেও পিছপা হয় না বলে কমলাকান্ত বিড়ালকে ‘পতিত আত্মা’ বলেছে ।
    সাধারণত মানুষের নৈতিক অধঃপতনকে পতিত আত্মা বোঝানো হয় । বিড়াল পথে পথে ঘুরে বেড়ায় আর ক্ষুধার জ্বালায় মানুষের খাবার চুরি করে । সেই অপরাধে নির্যাতনের শিকার হয়েও সে চুরির পক্ষেই সাফাই গায় । এ কারণে কমলাকান্ত বিড়ালকে পতিত আত্মা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ।

    প্রশ্নঃ ‘তোমাদের পেট ভরা, আমার পেটের ক্ষুধা কী প্রকারে জানিবে?’- লাইনটি ব্যাখ্যা করো ।

    উত্তরঃ অন্ন না পাওয়ার ক্ষোভে ও ক্ষুধার যন্ত্রণায় অধীর হয়ে ‘বিড়াল’ আলোচ্য উক্তিটি করেছে ।
    তখন বিড়ালটি ভয় না পেয়ে ফিরে দাঁড়ালে কমলাকান্তের মনে সাম্যচেতনা জাগ্রত হয় । কমলাকান্ত যেন দিব্যকর্ণ প্রাপ্ত হয়ে বিড়ালের ক্ষোভের কথা শুনতে পান । বিড়াল যেন বলছে, তোমরা তো ক্ষুধার্ত নও, ‘তোমাদের পেট ভরা, আমার পেটের ক্ষুধা কী প্রকারে জানিবে?’ এখানে বিড়ালের এ উক্তিতে একটি অর্থনৈতিক বৈষম্যপূর্ণ সমাজের চিত্র ফুটে উঠেছে । ‘বিড়াল’ রচনায় কমলাকান্তের জন্য রাখা দুধ খেয়ে ফেলার অপরাধে তিনি মার্জারীকে লাঠিপিঠা করতে উদ্যত হন ।

    পরিশেষে বলা যায় যে, ‘বিড়াল’ প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কেবল এক ক্ষুধার্ত বিড়ালের আর্তনাদ তুলে ধরেননি, বরং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রবন্ধটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ব্যক্তিগত নৈতিকতার চেয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন অনেক বেশি জরুরি। মূলত, বিড়ালের শাণিত যুক্তি আর কমলাকান্তের মৌন সম্মতির মধ্য দিয়ে লেখক একটি বৈষম্যহীন সাম্যবাদী সমাজ গঠনের যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও চিরন্তন।

    1 mins
    Right Menu Icon