উত্তরা গণভবন এর ইতিহাস
নাটোর শহর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে দিঘাপতিয়া নামক স্থানে অবস্থিত এই রাজপ্রাসাদটি বর্তমানে ‘উত্তরা গণভবন‘ নামে পরিচিত । এর বিশাল চত্বর, সুদৃশ্য ফটক এবং চমৎকার স্থাপত্যশৈলী পর্যটকদের মুগ্ধ করে ।
১. উত্তরা গণভবন কে নির্মাণ করেন
উত্তরা গণভবন মূলত ছিল দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের বাসভবন। এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দয়ারাম রায়। তিনি ছিলেন নাটোর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামজীবনের অত্যন্ত বিশ্বস্ত দেওয়ান। ১৭০৬ সালে রাজা রামজীবন উপহার হিসেবে দয়ারাম রায়কে দিঘাপতিয়া পরগণা দান করেন। এরপর ১৮০৬ সালে রাজা প্রমদানাথ রায়ের আমলে এই প্রাসাদের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
২. ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণ
১৮৯৭ সালের ১২ই জুন এক প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে প্রাসাদটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে রাজা প্রমদানাথ রায় প্রায় চার বছর ধরে বিদেশি প্রকৌশলী এবং দক্ষ কারিগরদের সহায়তায় প্রাসাদটি পুনর্নির্মাণ করেন। বর্তমান আমরা যে রাজকীয় কাঠামোটি দেখি, তা মূলত ১৯০২ সালে সম্পন্ন হওয়া সেই পুনর্নির্মিত রূপ।
৩. নামকরণ ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রাজপ্রথা বিলুপ্ত হলে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হয়। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার প্রাসাদটিকে ‘গভর্নর হাউস’ হিসেবে ঘোষণা করে।
- ১৯৭২ সাল: স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এটিকে ‘উত্তরা গণভবন’ হিসেবে নামকরণ করেন।
- তখন থেকেই এটি উত্তরবঙ্গের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং এখানে মাঝে মাঝে মন্ত্রিসভার বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়।
৪. স্থাপত্যশৈলী ও প্রধান আকর্ষণ
উত্তরা গণভবন প্রায় ৪১.৪৩ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর চারপাশ ঘিরে রয়েছে গভীর পরিখা, যা একসময় নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত হতো।
- বিশাল প্রবেশদ্বার: প্রাসাদের প্রধান ফটকটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। এর ওপরে একটি বিশাল ঘড়ি রয়েছে, যা এখনো সচল এবং এর ঘণ্টা অনেক দূর থেকে শোনা যায়।
- গ্রিক ভাস্কর্য: প্রাসাদের ভেতরে এবং বাগানে ছড়িয়ে আছে শ্বেতপাথরের তৈরি অনেকগুলো গ্রিক মূর্তির ভাস্কর্য, যা রাজাদের রুচির পরিচয় দেয়।
- ইতালীয় বাগান: প্রাসাদের সামনে রয়েছে একটি চমৎকার বাগান, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আনা বিরল প্রজাতির সব উদ্ভিদ রয়েছে।
- সংগ্রহশালা: প্রাসাদের ভেতরে রাজাদের ব্যবহৃত তলোয়ার, পালকি, সিংহাসন এবং প্রাচীন আসবাবপত্রের একটি সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা রয়েছে।
৫. পর্যটন ও বর্তমান গুরুত্ব
বর্তমানে উত্তরা গণভবন পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। এর শান্ত পরিবেশ, বিশাল দিঘি এবং ঐতিহাসিক কাঠামো মানুষকে অতীত দিনের আভিজাত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। সরকারিভাবে এর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় এবং এটি বাংলাদেশের অন্যতম সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ।
উত্তরা গণভবন ভ্রমণ গাইড
নাটোর ভ্রমণ এবং উত্তরা গণভবন দর্শনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ গাইড নিচে দেওয়া হলো । এটি আপনাকে ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে সাহায্য করবে:
উত্তরা গণভবন কোথায় অবস্থিত
উত্তরা গণভবন বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের নাটোর জেলায় অবস্থিত । এটি নাটোর শহর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে দিঘাপতিয়া নামক স্থানে অবস্থিত । এর সুনির্দিষ্ট ঠিকানা হলো: দিঘাপতিয়া, নাটোর-৬৪০০ ।
এটি দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রাচীন প্রাসাদ যা বর্তমানে উত্তরবঙ্গের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ।
নাটোর থেকে উত্তরা গণভবন কিভাবে যাবেন
নাটোর শহর থেকে উত্তরা গণভবনে যাওয়া খুবই সহজ এবং এতে সময় খুবই কম লাগে। নিচে যাওয়ার উপায়গুলো দেওয়া হলো:
১. দূরত্ব ও সময়: নাটোর শহর থেকে উত্তরা গণভবনের দূরত্ব প্রায় ৫.৭ কিলোমিটার । গাড়ি বা সিএনজিতে যেতে সাধারণত মাত্র ৯ থেকে ১০ মিনিট সময় লাগে ।
২. পরিবহনের মাধ্যম:
- অটো-রিকশা বা সিএনজি: নাটোর শহরের যেকোনো মোড় (যেমন: মাদরাসা মোড় বা স্টেশন এলাকা) থেকে আপনি সহজেই অটো-রিকশা বা সিএনজি পাবেন । এটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম ।
- ভাড়া: সাধারণত ২০ থেকে ৩০ টাকা জনপ্রতি ভাড়ায় আপনি উত্তরা গণভবনের প্রধান ফটকের সামনে নামতে পারবেন ।
৩. যাতায়াতের পথ: আপনি ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক (N6) এবং এরপর বগুড়া-নাটোর মহাসড়ক (N502) ধরে সোজা দিঘাপতিয়ার দিকে গেলেই রাজপ্রাসাদটি দেখতে পাবেন । রাস্তাটি বেশ ভালো এবং যাতায়াত আরামদায়ক ।
রাজশাহী থেকে উত্তরা গণভবন কিভাবে যাবেন
রাজশাহী থেকে নাটোরের উত্তরা গণভবনে যাওয়া বেশ সহজ। আপনি সড়কপথ বা রেলপথে যেতে পারেন। নিচে বিস্তারিত যাতায়াত ব্যবস্থা দেওয়া হলো:
১. সড়কপথে (বাস বা ব্যক্তিগত গাড়ি)
রাজশাহী থেকে উত্তরা গণভবনের দূরত্ব প্রায় ৫০.৬ কিলোমিটার। সড়কপথে যেতে সাধারণত ১ ঘণ্টা ৮ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় লাগতে পারে।
- বাস: রাজশাহীর ভদ্রা মোড় বা শিরোইল বাস টার্মিনাল থেকে নাটোরগামী বাসে উঠতে পারেন। বাস আপনাকে নাটোর শহরের মাদ্রাসা মোড় বা বনবেলঘড়িয়া বাইপাসে নামিয়ে দেবে। সেখান থেকে অটো-রিকশা বা সিএনজি নিয়ে সরাসরি উত্তরা গণভবনে যেতে পারবেন।
- ড্রাইভিং: আপনি যদি নিজস্ব গাড়ি বা মাইক্রোবাসে যান, তবে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক (N6) ধরে নাটোরে প্রবেশ করবেন এবং সেখান থেকে বগুড়া রোড ধরে দিঘাপতিয়ায় অবস্থিত গণভবনে পৌঁছাবেন।
২. রেলপথে (ট্রেন)
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন থেকে নাটোর যাওয়ার জন্য বেশ কিছু আন্তঃনগর ট্রেন রয়েছে।
- ট্রেনসমূহ: টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, বরেন্দ্র এক্সপ্রেস, তিতুমীর এক্সপ্রেস বা বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস ব্যবহার করতে পারেন।
- সময়: ট্রেনে নাটোর পৌঁছাতে প্রায় ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা সময় লাগে।
- স্টেশন থেকে: নাটোর রেলওয়ে স্টেশনে নামার পর সেখান থেকে অটো-রিকশা করে সরাসরি উত্তরা গণভবনে যাওয়া যায়।
কিছু দরকারি তথ্য:
- যাতায়াত খরচ: বাসে ভাড়া সাধারণত ৬০-১০০ টাকার মধ্যে। নাটোর শহর থেকে গণভবন পর্যন্ত অটো ভাড়া ২০-৩০ টাকা।
- পরামর্শ: খুব সকালে রওনা দিলে আপনি উত্তরা গণভবন দেখার পাশাপাশি নাটোর রাজবাড়ি এবং বিখ্যাত কাঁচাগোল্লার স্বাদ নিয়ে বিকেলের মধ্যেই রাজশাহী ফিরে আসতে পারবেন।
ঢাকা থেকে উত্তরা গণভবন কিভাবে যাবেন
বাসে: ঢাকার গাবতলী বা কল্যাণপুর থেকে নাটোরগামী নন-এসি বা এসি বাসে (যেমন: হানিফ, শ্যামলী, দেশ ট্রাভেলস) যেতে পারেন। সময় লাগবে প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা।
ট্রেনে: কমলাপুর থেকে ‘রংপুর এক্সপ্রেস’, ‘লালমনি এক্সপ্রেস’ বা ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনে করে নাটোর স্টেশনে নামতে পারেন।
নাটোর শহর থেকে: শহর থেকে অটো-রিকশা বা সিএনজি নিয়ে সরাসরি উত্তরা গণভবনে যাওয়া যায় (ভাড়া ২০-৩০ টাকা)।
উত্তরা গণভবন কবে বন্ধ থাকে
উত্তরা গণভবন সাধারণত সপ্তাহে একদিন এবং নির্দিষ্ট কিছু সরকারি ছুটিতে বন্ধ থাকে। আপনার ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আগে নিচের সময়সূচীটি দেখে নিন:
- সাপ্তাহিক বন্ধ: উত্তরা গণভবন সাধারণত প্রতি রবিবার পূর্ণদিবস বন্ধ থাকে।
- অর্ধদিবস: সাধারণত সোমবার এটি দুপুর পর্যন্ত বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ থাকতে পারে (তবে বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রবিবারই মূল বন্ধের দিন হিসেবে ধরা হয়)।
- সরকারি ছুটি: বড় কোনো জাতীয় দিবস বা বিশেষ সরকারি ছুটির দিনে এটি দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকতে পারে।
সাধারণ দর্শনের সময়সূচী:
- শীতকাল: সকাল ৯:০০ টা থেকে বিকেল ৪:৩০ টা পর্যন্ত।
- গ্রীষ্মকাল: সকাল ১০:০০ টা থেকে বিকেল ৫:০০ টা পর্যন্ত।
টিপস: যেহেতু এটি একটি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন, তাই অনেক সময় ভিভিআইপি মুভমেন্ট বা মন্ত্রিসভার বৈঠক থাকলে হুট করে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়া হয়। যাওয়ার আগে নাটোর জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট বা স্থানীয় পরিচিত কারো মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো।
🕒 উত্তরা গণভবন দর্শনের সময় ও টিকিট
- সময়সূচী: সাধারণত প্রতিদিন সকাল ৯:০০ টা থেকে বিকেল ৫:০০ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। (শুক্রবার বা বিশেষ ছুটির দিনে সময় পরিবর্তন হতে পারে, তাই যাওয়ার আগে খোঁজ নেওয়া ভালো)।
- টিকিট: গণভবনের প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা (পরিবর্তনশীল)। ভেতরে ক্যামেরা বা ভিডিও করার জন্য আলাদা ফি লাগতে পারে।
📍 উত্তরা গণভবনের আশেপাশে আর কী দেখবেন?
নাটোরে গেলে উত্তরা গণভবন দেখার পাশাপাশি আরও কয়েকটি জায়গা মিস করবেন না:
- নাটোর রাজবাড়ি (রানী ভবানীর প্রাসাদ): এটি শহরের ভেতরেই অবস্থিত।
- চলনবিল: বর্ষাকালে গেলে নৌকা ভ্রমণের জন্য এটি সেরা।
- মিনি কক্সবাজার (পাটুল): বিকেলে সময় কাটানোর জন্য সুন্দর একটি জায়গা।
🍴 খাবার ও স্পেশালিটি
- কাঁচাগোল্লা: নাটোর গিয়ে বিখ্যাত ‘কাঁচাগোল্লা’ না খেয়ে ফিরবেন না। এটি সারা বিশ্বে সমাদৃত। শহরের ‘মৌচাক’ বা পুরোনো বাজারের দোকানগুলো থেকে আসল স্বাদ পাবেন।
- খাবারের হোটেল: নাটোর শহরে সাধারণ মানের বেশ কিছু হোটেল আছে যেখানে দেশি খাবার পাওয়া যায়।
🏨 উত্তরা গণভবন গিয়ে কোথায় থাকবেন?
আপনি যদি রাত কাটাতে চান, তবে নাটোর শহরে সাধারণ মানের বেশ কিছু আবাসিক হোটেল আছে (যেমন: হোটেল ভিআইপি, রাজকীয় প্যালেস)। উন্নত মানের হোটেলের জন্য রাজশাহী শহরে চলে যেতে পারেন (নাটোর থেকে মাত্র ১ ঘণ্টার পথ)।
💡 কিছু জরুরি টিপস:
- পরিচ্ছন্নতা: রাজবাড়ি চত্বরে কোনো প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলবেন না।
- পোশাক: ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে মার্জিত পোশাক পরিধান করা ভালো।
- গাইড: ভেতরে অনেক সময় গাইড পাওয়া যায়, যারা ইতিহাস বিস্তারিত বুঝিয়ে দিতে পারে।

