জাফলং: পাথুরে নদীর দেশে প্রকৃতির মায়াজাল
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায় জাফলংয়ের অবস্থান । খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পর্যটন কেন্দ্রটি মূলত পিয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত । ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে থাকা জাফলংয়ের রূপ ঋতুভেদে পাল্টে যায়, যা পর্যটকদের বারবার এখানে টেনে আনে ।
কেন জাফলং পর্যটকদের এত প্রিয়?
জাফলংয়ের সৌন্দর্যের প্রধান আকর্ষণ হলো এর বৈচিত্র্য । এখানে আপনি একই সাথে কয়েকটি ভিন্ন অভিজ্ঞতার স্বাদ পাবেন:
- পাহাড় ও ঝরনা: ওপারেই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের উঁচু পাহাড়। বর্ষাকালে সেই পাহাড় থেকে অসংখ্য ছোট-বড় ঝরনা নেমে আসতে দেখা যায়, যা এক মায়াবী দৃশ্যের অবতারণা করে।
- পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জল: বালু নয়, বরং পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানি আপনার ক্লান্তি দূর করে দেবে নিমিষেই।
- পাথর উত্তোলন: জাফলংয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নদী থেকে স্থানীয়দের পাথর সংগ্রহের দৃশ্য। শত শত নৌকা আর মানুষের কর্মব্যস্ততা জাফলংকে আলাদা এক রূপ দেয়।
- সংগ্রামপুঞ্জি চা বাগান: জাফলং জিরো পয়েন্টের খুব কাছেই রয়েছে বিস্তীর্ণ চা বাগান, যা আপনার ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় সবুজের ছোঁয়া দেবে।
- খাসিয়া পল্লী: পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী খাসিয়াদের জীবনধারা ও তাদের পানের বরজ দেখার সুযোগ মিলবে এখানে।
জাফলং ভ্রমণ গাইড: এক নজরে সব তথ্য
জাফলং ভ্রমণ সাধারণত সিলেট শহরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা হয় । নিচে ধাপে ধাপে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
জাফলং ভ্রমণের সেরা সময়
জাফলংয়ের আসল রূপ উপভোগ করতে চাইলে একেক জন একেক ঋতুকে প্রাধান্য দেন:
- বর্ষাকাল: পাহাড় থেকে ঝরনা ধারা আর মেঘের খেলা দেখতে চাইলে বর্ষার শেষ দিকে (জুন-সেপ্টেম্বর) যাওয়া সবচেয়ে ভালো । এ সময় পিয়াইন নদী পূর্ণ যৌবন ফিরে পায় ।
- শীতকাল: স্বচ্ছ পানি আর শান্ত প্রকৃতি দেখতে চাইলে শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) আদর্শ । তবে এ সময় নদীতে পানি কিছুটা কম থাকে ।
ঢাকা থেকে সিলেট কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার বেশ কয়েকটি মাধ্যম রয়েছে। আপনি বাস, ট্রেন, বিমান বা নিজস্ব গাড়িতে করে যেতে পারেন। নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. বাস (Bus)
ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার জন্য সবথেকে জনপ্রিয় মাধ্যম হলো বাস। সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে নিয়মিত বাস ছাড়ে।
- বাস কোম্পানি: এনা ট্রান্সপোর্ট, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী, গ্রিন লাইন, সিল্কলাইন ইত্যাদি।
- ভাড়া: নন-এসি ৫০০-৬০০ টাকা এবং এসি ১,০০০-১,৫০০ টাকা (পরিবর্তনশীল)।
- সময়: সাধারণত ৫ ঘণ্টা ৫০ মিনিট থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লাগে।
২. ট্রেন (Train)
আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য ট্রেন একটি চমৎকার বিকল্প। ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে বেশ কিছু আন্তঃনগর ট্রেন সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
- ট্রেনসমূহ: পারাবত এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং কালনী এক্সপ্রেস।
- ভাড়া: সিটের ধরন অনুযায়ী (শোভন চেয়ার, স্নিগ্ধা, এসি বার্থ) ৪০০ থেকে ১,২০০ টাকার বেশি হতে পারে।
৩. বিমান (Flight)
দ্রুততম সময়ে পৌঁছাতে চাইলে আকাশপথ বেছে নিতে পারেন। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রতিদিন ফ্লাইট থাকে।
- এয়ারলাইনস: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, নভোএয়ার এবং এয়ার অ্যাস্ট্রা।
- সময়: মাত্র ৪৫-৫০ মিনিট।
- ভাড়া: সাধারণত ৩,৫০০ থেকে ৭,০০০ টাকার মধ্যে (টিকিট কাটার সময়ের ওপর নির্ভর করে)।
৪. নিজস্ব গাড়ি বা ড্রাইভিং (Driving)
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক (N2/AH1) দিয়ে আপনি নিজস্ব গাড়ি নিয়ে যেতে পারেন।
- দূরত্ব: প্রায় ২৩৬ কিমি।
- সময়: ট্রাফিক এবং রাস্তার অবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রায় ৫ ঘণ্টা ৫০ মিনিট থেকে ৭ ঘণ্টা লাগতে পারে।
পরামর্শ: যদি আপনি ছুটির দিনে বা উৎসবের সময় (যেমন ঈদ) যেতে চান, তবে ট্রেন বা বাসের টিকিট অন্তত ৪-৫ দিন আগে সংগ্রহ করা ভালো।
রাজশাহী থেকে সিলেট কিভাবে যাবেন
রাজশাহী থেকে সিলেটে সরাসরি ট্রেন বা বিমানের ব্যবস্থা না থাকলেও আপনি বাস বা ভেঙে ভেঙে অন্য মাধ্যমে যেতে পারেন। নিচে বিস্তারিত গাইড দেওয়া হলো:
১. বাস (Bus) – সরাসরি ও সবথেকে সহজ মাধ্যম
রাজশাহী থেকে সিলেটে যাওয়ার জন্য সরাসরি বেশ কিছু বাস সার্ভিস রয়েছে। এটিই যাতায়াতের সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায়।
- বাস অপারেটর: দেশ ট্রাভেলস, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী এনআর ট্রাভেলস, এবং গ্রিন লাইন (ভায়া ঢাকা)।
- রুট: রাজশাহী — বগুড়া — সিরাজগঞ্জ — ঢাকা (বাইপাস) — সিলেট।
- ভাড়া: নন-এসি ৮০০ – ১,০০০ টাকা; এসি ১,৫০০ – ২,২০০ টাকা (অপারেটর ভেদে)।
- সময়: সাধারণত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগে।
২. ট্রেন (Train) – সরাসরি নেই (ভায়া ঢাকা)
রাজশাহী থেকে সরাসরি সিলেটে যাওয়ার কোনো ট্রেন নেই। আপনাকে দুই ধাপে যেতে হবে:
- ধাপ ১: রাজশাহী থেকে বনলতা, সিল্কসিটি বা পদ্মা এক্সপ্রেস দিয়ে ঢাকা (কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন) আসতে হবে।
- ধাপ ২: ঢাকা থেকে পারাবত, উপবন বা কালনী এক্সপ্রেস দিয়ে সিলেট যেতে হবে।
- পরামর্শ: সময় বাঁচাতে আপনি রাজশাহী থেকে ট্রেনে ঢাকা এসে সেখান থেকে বাসে করে সিলেট যেতে পারেন।
৩. বিমান (Flight) – সরাসরি নেই (ভায়া ঢাকা)
রাজশাহী (শাহ মখদুম বিমানবন্দর) থেকে সিলেটে সরাসরি কোনো ফ্লাইট নেই। আপনাকে ঢাকা হয়ে যেতে হবে।
- এয়ারলাইনস: বিমান বাংলাদেশ, ইউএস-বাংলা।
- পদ্ধতি: রাজশাহী থেকে ঢাকা (৩৫-৪০ মিনিট), তারপর ঢাকা থেকে সিলেট (৪৫-৫০ মিনিট)।
- ভাড়া: দুই ফ্লাইটে মিলিয়ে ৭,০০০ – ১২,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
৪. নিজস্ব গাড়ি বা মাইক্রোবাস
রাজশাহী থেকে নিজস্ব গাড়িতে সিলেট যেতে প্রায় ৮-১০ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে (রাস্তার ট্রাফিকের ওপর নির্ভর করে)। দূরত্ব প্রায় ৪৪০-৪৫০ কিমি।
প্রয়োজনীয় তথ্য: রাজশাহী থেকে সরাসরি বাসে যেতে চাইলে আগের দিন টিকিট বুক করে রাখা ভালো, কারণ সরাসরি বাসের সংখ্যা তুলনামূলক কম।
চট্টগ্রাম থেকে সিলেট কিভাবে যাবেন
চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে যাওয়ার জন্য বাস, ট্রেন এবং আকাশপথ—তিনটি মাধ্যমই বেশ জনপ্রিয়। আপনার সুবিধা অনুযায়ী যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন:
১. ট্রেন (সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম)
চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে সরাসরি দুটি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। এটি আরামদায়ক এবং জনপ্রিয় রুট।
- ট্রেনের নাম ও সময়:
- পাহাড়িকা এক্সপ্রেস: প্রতিদিন সকাল ৯:০০টায় চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ে এবং সিলেটে পৌঁছায় সন্ধ্যা ৬:০০টার দিকে। (সোমবার বন্ধ)।
- উদয়ন এক্সপ্রেস: প্রতিদিন রাত ৯:৪৫ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ে এবং সিলেটে পৌঁছায় ভোর ৫:৪৫ মিনিটে। (শনিবার বন্ধ)।
- ভাড়া: সিটের ধরন অনুযায়ী জনপ্রতি ৪৫০ টাকা (শোভন চেয়ার) থেকে শুরু করে ১,৫০০ টাকা (এসি বার্থ) পর্যন্ত হতে পারে।
২. বাস (সহজ যাতায়াত)
চট্টগ্রামের দামপাড়া, অলংকার মোড় বা এ কে খান থেকে সরাসরি সিলেটের বাস পাওয়া যায়।
- বাস কোম্পানি: এনা ট্রান্সপোর্ট, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী এনআর, গ্রিন লাইন, লন্ডন এক্সপ্রেস এবং ইউনিক সার্ভিস।
- সময়: সাধারণত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে।
- ভাড়া: নন-এসি ৮০০-৯০০ টাকা এবং এসি বাস ১,৫০০-২,২০০ টাকা পর্যন্ত (অপারেটর ভেদে)।
৩. আকাশপথ (দ্রুততম উপায়)
চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিলেটে সরাসরি ফ্লাইট খুব একটা থাকে না। সাধারণত ঢাকা হয়ে কানেক্টিং ফ্লাইটে যেতে হয়।
- এয়ারলাইনস: বিমান বাংলাদেশ, ইউএস-বাংলা।
- ভাড়া: সাধারণত ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকার মধ্যে থাকে (সময় অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়)।
ভ্রমণের টিপস:
- আপনি যদি পাহাড় ও প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে চান, তবে দিনের বেলা পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনে যাওয়া সেরা সিদ্ধান্ত হবে।
- ট্রেনের টিকিট অন্তত ৪-৫ দিন আগে অনলাইনে (eticket.railway.gov.bd) বা স্টেশন থেকে সংগ্রহ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
সিলেট থেকে জাফলং কিভাবে যাবেন
সিলেট শহর থেকে জাফলং যাওয়ার বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. দূরত্ব ও সময়
সিলেট শহর থেকে জাফলংয়ের দূরত্ব প্রায় ৫৮.১ কিলোমিটার। নিজস্ব গাড়ি বা মাইক্রোবাসে যেতে সাধারণত ১ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টা সময় লাগে। তবে লোকাল বাসে গেলে সময় একটু বেশি লাগতে পারে।
২. যাতায়াতের মাধ্যমসমূহ
- বাস (Bus):
- সিলেট শহরের সোবহানীঘাট বা কদমতলী বাস টার্মিনাল থেকে জাফলংয়ের উদ্দেশ্যে নিয়মিত বাস ছেড়ে যায়।
- ভাড়া: জনপ্রতি ১০০-১৫০ টাকার মধ্যে।
- সিএনজি অটো-রিকশা (CNG):
- ছোট গ্রুপ (৩-৫ জন) হলে সিএনজি রিজার্ভ নেওয়া সবচেয়ে ভালো। আপনি সারা দিনের জন্য সিএনজি ভাড়া করতে পারেন যাতে ফেরার সময় সমস্যা না হয়।
- ভাড়া: আসা-যাওয়া মিলিয়ে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা (অবশ্যই দামাদামি করে নেবেন)।
- লেগুনা বা হিউম্যান হলার:
- আম্বরখানা পয়েন্ট থেকেও লেগুনা পাওয়া যায়। এটি সাশ্রয়ী কিন্তু খুব একটা আরামদায়ক নয়।
- প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস:
- পরিবার বা বড় গ্রুপ হলে কার বা মাইক্রোবাস রিজার্ভ করতে পারেন।
- ভাড়া: ৩,০০০ থেকে ৪,৫০০ টাকা (গাড়ির ধরন ও সময়ের ওপর নির্ভর করে)।
৩. রুট বা রাস্তা
সিলেট থেকে জাফলং যাওয়ার প্রধান রুট হলো সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক (AH1)। এই রাস্তাটি বেশ সুন্দর এবং দুই পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার মতো।
৪. গুরুত্বপূর্ণ টিপস:
- সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে রওনা দিলে জাফলং ঘুরে বিকেলের মধ্যেই সিলেট ফিরে আসা সম্ভব ।
- যাওয়ার পথে আপনি তামাবিল জিরো পয়েন্ট দেখে নিতে পারেন ।
- বর্ষাকালে রাস্তা কিছুটা পিচ্ছিল থাকতে পারে, তাই সাবধানে যাতায়াত করবেন ।
- পাথর এবং পানিতে হাঁটার জন্য আরামদায়ক স্যান্ডেল বা জুতা সাথে রাখুন ।
জাফলং গিয়ে কোথায় থাকবেন?
জাফলং ভ্রমণের সময় আপনি দুইভাবে থাকার পরিকল্পনা করতে পারেন: জাফলংয়ের আশেপাশে অথবা সিলেট শহরে।
১. জাফলংয়ের আশেপাশে থাকার ব্যবস্থা
আপনি যদি পাহাড় আর নদীর খুব কাছে থাকতে চান, তবে জাফলংয়ের আশেপাশে থাকতে পারেন। তবে এখানে হোটেলের সংখ্যা সীমিত।
- জাফলং ইন (Jaflong Inn): এটি জাফলংয়ের মোটামুটি ভালো মানের একটি হোটেল।
- হোটেল রিভার ভিউ: পিয়াইন নদীর পাশেই এর অবস্থান।
- জেলা পরিষদ বাংলো: সরকারি এই বাংলোতে থাকতে হলে আগে থেকে অনুমতি নিতে হয়। এখান থেকে জাফলংয়ের চমৎকার ভিউ পাওয়া যায়।
২. সিলেট শহরে থাকার ব্যবস্থা (সবচেয়ে ভালো বিকল্প)
অধিকাংশ পর্যটক দিনে জাফলং ঘুরে এসে রাতে সিলেট শহরে থাকতেই পছন্দ করেন। কারণ শহরে অনেক ভালো মানের হোটেল ও রেস্টুরেন্ট আছে। সিলেট শহরের কিছু জনপ্রিয় হোটেলের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| হোটেলের নাম | মান (Star Rating) | আনুমানিক খরচ (প্রতি রাত) | বৈশিষ্ট্য |
| হোটেল নূরজাহান গ্র্যান্ড | ৪-তারা হোটেল | ৩,৩২৪৳ | জিম, সিনেমা হল ও রেস্টুরেন্ট সুবিধা আছে। |
| Holy Inn | ৪-তারা হোটেল | ২,৭৭৮৳ | পরিপাটি রুম ও ব্রেকফাস্টের সুবিধা। |
| গ্র্যান্ড ইমারাহ হোটেল | – | ২,০৮৪৳ | ভালো রেটিং ও আধুনিক সুবিধা। |
| বটম হিল প্যালেস হোটেল | ৩-তারা হোটেল | ১,২২৯৳ | সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো সুবিধা। |
| থে গ্র্যান্ড হোটেল | ৩-তারা হোটেল | ১,১৩১৳ | বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য চমৎকার। |
থাকার জন্য কিছু পরামর্শ:
- বাজেট: আপনি যদি খুব কম খরচে থাকতে চান, তবে থে গ্র্যান্ড হোটেল বা বটম হিল প্যালেস বেছে নিতে পারেন।
- বিলাসবহুল অভিজ্ঞতা: একটু ভালো মানের জন্য হোটেল নূরজাহান গ্র্যান্ড বা শহরের কাছে থাকা শুকতারা নেচার রিসোর্ট বা নাজিমগড় রিসোর্ট দেখতে পারেন।
- বুকিং: ছুটির দিনে বা পর্যটন মৌসুমে যাওয়ার আগে অবশ্যই রুম বুক করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
জাফলং গিয়ে কোথায় খাবেন?
জাফলং ভ্রমণে খাবারের জন্য আপনার কাছে দুটি প্রধান বিকল্প আছে: হয় জাফলং বাজারে স্থানীয় খাবার খাওয়া, অথবা ফেরার পথে সিলেট শহরের বিখ্যাত রেস্টুরেন্টগুলোতে ভোজনবিলাস করা।
নিচে বিস্তারিত সাজেশন দেওয়া হলো:
১. জাফলং বাজারে (দুপুরের খাবারের জন্য)
জাফলং বাজারে খুব বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট না থাকলেও, দেশি খাবারের জন্য বেশ কিছু ভালো হোটেল আছে।
- জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট: জাফলং ভিউ রেস্টুরেন্ট, হোটেল পিয়াইন বা পর্যটন মোটেল রেস্টুরেন্ট।
- কী খাবেন: এখানে পিয়াইন নদীর টাটকা মাছ (যেমন: আইড়, বাচা বা বোয়াল) এবং দেশি মুরগির মাংসের তরকারি খুব জনপ্রিয়। পাহাড়ি আলু বা ভর্তা দিয়ে গরম ভাত আপনার দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি দূর করে দেবে।
২. সিলেট শহরে (রাতের খাবারের জন্য)
সিলেট শহরে ফিরলে আপনি খাবারের অনেক বৈচিত্র্য পাবেন। সিলেটের খাবারের কথা বললে এই নামগুলো সবার আগে আসে:
- পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্ট (জিন্দাবাজার): ভর্তার জন্য বিখ্যাত। এখানে প্রায় ২০-৩০ রকমের ভর্তা পাওয়া যায়। এছাড়া এদের হাঁসের মাংস ও খিচুড়ি অবশ্যই ট্রাই করবেন।
- পানসী রেস্টুরেন্ট: পাঁচ ভাইয়ের মতোই জনপ্রিয়। এদের খাবারের মান এবং দ্রুত সার্ভিস পর্যটকদের খুব পছন্দ। বিশেষ করে এদের নাস্তা ও বিভিন্ন ধরনের ভাজি-ভর্তা দারুণ।
- উন্দাল (জিন্দাবাজার): আপনি যদি একটু প্রিমিয়াম পরিবেশে কাবাব বা মোগলাই খাবার খেতে চান, তবে উন্দাল সেরা পছন্দ হতে পারে।
- সিলেটের সাতকড়া দিয়ে গরুর মাংস: সিলেটে গিয়েছেন কিন্তু ‘সাতকড়া’ (এক ধরনের লেবু জাতীয় ফল) দিয়ে গরুর মাংস খাননি, তা কি হয়? যেকোনো ভালো মানের রেস্টুরেন্টে এটি ট্রাই করতে পারেন।
৩. হালকা নাস্তা ও চা
- সাত রঙের চা: শ্রীমঙ্গল না গেলেও সিলেট শহরের অনেক ক্যাফেতে এখন নীলকণ্ঠের সেই বিখ্যাত সাত রঙের চা পাওয়া যায়।
- সংগ্রামপুঞ্জি চা বাগান: জাফলং জিরো পয়েন্টের কাছে চা বাগানে বসে টাটকা লিকার চা খেতে ভুলবেন না।
কিছু প্রয়োজনীয় টিপস:
- দামাদামি: জাফলংয়ের স্থানীয় রেস্টুরেন্টে খাওয়ার আগে অবশ্যই মেনু বা খাবারের দাম জেনে নেবেন।
- পরিচ্ছন্নতা: স্থানীয় ছোট হোটেলে খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্নতা দেখে নিন।
- পানির বোতল: জাফলং জিরো পয়েন্টে বা নৌকায় ঘোরার সময় সাথে সবসময় মিনারেল ওয়াটার রাখুন।
জাফলং এর দর্শনীয় স্থান
জাফলং-এর আশেপাশে এবং সিলেট জেলায় বেশ কিছু চমৎকার দর্শনীয় স্থান রয়েছে। আপনি জাফলং ভ্রমণে গেলে নিচের জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে পারেন:
১. জাফলং-এর একদম কাছে (১-৫ কিমি মধ্যে)
- জাফলং জিরো পয়েন্ট: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের এই স্থানটি জাফলং-এর মূল আকর্ষণ। এখান থেকে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ এবং ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ দেখা যায়।
- সংগ্রামপুঞ্জি ঝরনা (মায়াবী ঝরনা): জিরো পয়েন্ট থেকে নৌকা নিয়ে বা হেঁটে ১৫-২০ মিনিটের দূরত্বে এই সুন্দর ঝরনাটি অবস্থিত। বর্ষাকালে এটি পূর্ণ যৌবন ফিরে পায়।
- খাসিয়া পুঞ্জি: পিয়াইন নদীর ওপাড়ে খাসিয়া আদিবাসীদের গ্রাম। তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা এবং পান বাগান দেখার মতো।
- তামাবিল জিরো পয়েন্ট: এটি বাংলাদেশ ও ভারতের একটি স্থলবন্দর। জাফলং যাওয়ার পথেই এটি পড়ে।
২. জাফলং থেকে ২০-৩০ কিমি-এর মধ্যে
- লালাখাল: জাফলং থেকে ফেরার পথে এটি ঘুরে দেখা যায়। এখানকার স্বচ্ছ নীল জল এবং নদীর দুই ধারের পাহাড় আপনাকে মুগ্ধ করবে। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ভ্রমণ এখানে প্রধান আকর্ষণ।
- পান্তুমাই ঝরনা: গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত এই ঝরনাটি মূলত ভারতের সীমানায় পড়লেও বাংলাদেশ থেকে এর অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
- ডিবির হাওর (শাপলা বিল): শীতকালে এখানে হাজার হাজার লাল শাপলা ফোটে, যা এক অসাধারণ দৃশ্যের সৃষ্টি করে।
৩. সিলেটের অন্যান্য জনপ্রিয় স্থান
আপনি যদি হাতে সময় নিয়ে বের হন, তবে সিলেটের এই জায়গাগুলোও তালিকায় রাখতে পারেন:
- বিছনাকান্দি: পাথর বিছানো শীতল পানির স্রোত আর পাহাড়ের মিতালি দেখার জন্য এটি অন্যতম সেরা জায়গা।
- ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর: বর্তমানে এটি সিলেটের সবথেকে জনপ্রিয় পর্যটন স্পট। সাদা পাথরের স্তূপ আর স্বচ্ছ নীল পানির জন্য একে ‘সিলেটের লাদাখ’ বলা হয়।
- রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট: এটি বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির জলাবন। নৌকায় করে বনের ভেতর ঘুরে বেড়ানো এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
- চা বাগান: সিলেটের মালনীছড়া (সবথেকে পুরনো) বা লাক্কাতুড়া চা বাগান ঘুরে দেখতে পারেন।
ভ্রমণের পরিকল্পনা সাজাতে টিপস:
- আপনি যদি একদিনের জন্য বের হন, তবে জাফলং, সংগ্রামপুঞ্জি ঝরনা এবং লালাখাল—এই তিনটি জায়গা একসাথে রাখা সুবিধাজনক।
- বিছনাকান্দি বা ভোলাগঞ্জ জাফলং-এর উল্টো দিকে হওয়ায় সেগুলোর জন্য আলাদা দিন রাখাই ভালো।
পরিশেষে বলা যায়, জাফলং কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং এটি পাহাড়, নদী আর পাথরের এক জীবন্ত কাব্য। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেতে এবং প্রকৃতির খুব কাছাকাছি কিছু সময় কাটাতে জাফলংয়ের কোনো বিকল্প নেই। স্বচ্ছ পিয়াইন নদীর জল আর মেঘালয়ের পাহাড়ের মায়াবী হাতছানি আপনাকে দেবে এক প্রশান্তির ছোঁয়া।
যদিও সময়ের সাথে সাথে এবং পাথর উত্তোলনের কারণে এর প্রাকৃতিক পরিবেশে কিছু পরিবর্তন এসেছে, তবুও এর চিরাচরিত সৌন্দর্য আজও পর্যটকদের বিমোহিত করে। একজন সচেতন ভ্রমণকারী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো এই প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করা এবং পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখা।
তাই দেরি না করে আপনার পরবর্তী ছুটির তালিকায় যুক্ত করুন প্রকৃতির কন্যা জাফলং-কে। পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে এই ভ্রমণটি আপনার স্মৃতিতে এক অমলিন অধ্যায় হয়ে থাকবে।

