• ফুলের বিবাহ গল্প
  • লেখাপড়া
  • ফুলের বিবাহ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

    ফুলের বিবাহ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

    ফুলের বিবাহ গল্পের অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর

    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়েরফুলের বিবাহ’ একটি সার্থক রূপক গল্প, যেখানে ফুলের জগতের আড়ালে উনিশ শতকের বাঙালি সমাজের বিয়ের রীতি ও কুপ্রথাগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে । লেখক এখানে মল্লিকা ফুলের বিয়েকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সমাজের আভিজাত্যবোধ, বর্ণবিভেদ এবং লৌকিক আচার-অনুষ্ঠানের এক হাস্যরসাত্মক অথচ বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরেছেন ।

    প্রশ্নঃ ক্ষুদ্র বৃক্ষটি কেন বিরক্ত হয়েছিল?

    উত্তরঃ ক্ষুদ্র বৃক্ষটির বিরক্ত হওয়ার মূল কারণ ছিল ভ্রমরের অপেশাদার আচরণ এবং স্বার্থপরতা । বিয়ের আলাপ করতে এসে ভ্রমর কনের গুণাবলি বর্ণনার চেয়ে নিজের পাওনা বা মধু প্রাপ্তির দিকেই বেশি নজর দিচ্ছিল । ঘটকালির বিনিময়ে তার আগাম সুযোগ-সুবিধা চাওয়ার ভঙ্গিটি বৃক্ষটির কাছে অনভিপ্রেত ও সময়ক্ষেপণ বলে মনে হয়েছিল । মূলত ভ্রমরের এই ব্যবসায়িক মনোভাব এবং মূল আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার কারণেই ক্ষুদ্র বৃক্ষটি ধৈর্য হারিয়ে সরাসরি বরের বিষয়ে জানতে চায় ।

    প্রশ্নঃ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘ফুলের বিবাহ’ কেন রচনা করেছেন?

    উত্তরঃ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মূলত একটি রূপক কাহিনির আড়ালে বাঙালি সমাজের চিরায়ত বিয়ের রীতিনীতি তুলে ধরতে ‘ফুলের বিবাহ’ রচনা করেছেন । নসী বাবুর বাগানে বসে লেখকের কল্পনাপ্রসূত এই রচনায় একটি মল্লিকা ফুলের বিয়েকে কেন্দ্র করে বাঙালির গার্হস্থ্য জীবনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে ।

    গল্পটিতে বিয়ের ঘটকালি থেকে শুরু করে উপযুক্ত পাত্রের খোঁজ, পণপ্রথা, বরযাত্রী এবং বিয়ের বিচিত্র আচার-অনুষ্ঠানকে অত্যন্ত সরস ও হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছে । লেখক এখানে দেখিয়েছেন যে, মানুষের সমাজের মতো ফুলের জগতেও বিয়ের প্রথাগুলো কতটা প্রগাঢ় হতে পারে । মূলত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বর-কনেরা যাতে বাঙালি বিয়ের সামাজিক রীতিনীতি ও এর বিবিধ দিক সম্পর্কে হাস্যরসের ছলে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারে, সেই উদ্দেশ্যেই তিনি এই চমৎকার প্রবন্ধটি সৃষ্টি করেছেন ।

    প্রশ্নঃ ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে কন্যার পিতার অবস্থা সম্পর্কে লেখো ।

    উত্তরঃ ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বিবাহের কেন্দ্রীয় চরিত্র বা পাত্রী হলো মল্লিকা, যে প্রস্ফুটিত হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে অর্থাৎ কুঁড়ি অবস্থায় আছে । তার পিতা এক অতি সাধারণ ‘ক্ষুদ্র বৃক্ষ’, যার আর্থিক সামর্থ্য সীমিত । তবে অভাবের চেয়েও বড় দুশ্চিন্তা হলো তার অনেকগুলো অবিবাহিত কন্যা । মল্লিকার জন্য একজন উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পাওয়াই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য ।

    এমন এক সংকটময় সময়ে ভ্রমররাজ ঘটকালির দায়িত্ব নিয়ে উপস্থিত হয় । কিন্তু শুরু থেকেই তার আচরণ ছিল অস্বাভাবিক; পাত্রের গুণগান গাওয়ার বদলে সে অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তায় মেতে ওঠে । এমনকি মূল আলোচনা বাদ দিয়ে সে যখন ঘটকালির পারিশ্রমিক বা মধু আগাম দাবি করে বসে, তখন বিচলিত পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষ আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারে না । কন্যার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন পিতার কাছে ভ্রমরের এই স্বার্থপরতা ও সময়ক্ষেপণ বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় ।

    প্রশ্নঃ মল্লিকা ফুলের বিয়ের জন্য বর পাওয়া যাচ্ছিল না কেন?

    উত্তরঃ মল্লিকা ফুলের বিয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পাওয়া ছিল এক কঠিন কাজ, কারণ প্রতিটি সম্বন্ধের মধ্যেই কোনো না কোনো অপূর্ণতা বা সামাজিক বাধা দেখা দিচ্ছিল । বাগানের অধিপতি স্থলপদ্ম ব্যক্তিগতভাবে নির্দোষ হলেও বংশমর্যাদা ও সামাজিক মর্যাদায় তিনি অনেক উঁচুতে অবস্থান করেন । শ্রেণিবিভেদপূর্ণ সমাজে মল্লিকার মতো সাধারণ ঘরের মেয়েকে গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল ।

    অন্যদিকে, জবা ফুল বিয়ের জন্য আগ্রহী হলেও তাঁর উগ্র মেজাজ ও ক্রোধের কারণে কন্যার পিতা সেই সম্বন্ধ নাকচ করে দেন । আবার গন্ধরাজ পাত্র হিসেবে বেশ গুণী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রচণ্ড অহংকার ও আভিজাত্যের দম্ভ ছিল প্রধান বাধা । এভাবেই পাত্রদের চারিত্রিক ত্রুটি কিংবা সামাজিক মর্যাদার পার্থক্যের কারণে মল্লিকার জন্য একটি নিখুঁত সম্বন্ধ খুঁজে পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়েছিল ।

    প্রশ্নঃ ‘ফর্দ দিবেন, কড়ায় গন্ডায় বুঝাইয়া দিবে’—ব্যাখ্যা করো।

    উত্তরঃ আলোচ্য মন্তব্যটি মূলত কন্যার পিতার আর্থিক সামর্থ্য এবং বরপক্ষের যেকোনো চাহিদা পূরণের মানসিকতা প্রকাশ করতে ব্যবহৃত হয়েছে । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘ফুলের বিবাহ’ রচনায় রূপকের আশ্রয়ে বাঙালি সমাজের বৈবাহিক রীতিনীতি ও যৌতুক প্রথার এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন ।

    গল্পে দেখা যায়, মল্লিকার জন্য উপযুক্ত পাত্র খুঁজতে যখন বেগ পেতে হচ্ছিল, তখন চতুর ভ্রমর ঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয় । আলোচনার এক পর্যায়ে ভ্রমর যখন কৌশলে পাত্রীর পরিবারে মধুর মজুত বা পরিমাণের কথা জানতে চায়, তখন কন্যার পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষ দৃঢ়তার সাথে উত্তর দেয় যে, চাহিদাপত্র বা ফর্দ দিলেই সে পাইপাই করে সব বুঝিয়ে দেবে । এই ‘মধু’ মূলত বাঙালি বিয়ের ‘পণ’ বা ‘যৌতুক’-এর প্রতীক । এর মাধ্যমে লেখক বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় পাত্রপক্ষের দাবি মেটাতে কন্যার পিতারা কতটা প্রস্তুত বা বাধ্য থাকতেন ।

    প্রশ্নঃ ‘বর অতি সুপাত্র ।’—বরকে অতি সুপাত্র বলার কারণ ব্যাখ্যা করো ।

    উত্তরঃ উদ্দীপকের মন্তব্যটি মূলত বর হিসেবে গোলাপের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে মল্লিকা ফুলের উপযুক্ত জীবনসঙ্গী নির্বাচনের গুরুদায়িত্ব পালন করে চতুর ঘটক ভ্রমররাজ ।

    ভ্রমরের বর্ণনা অনুযায়ী, পাত্র হিসেবে গোলাপ কেবল আকর্ষণীয়ই নয়, বরং আভিজাত্যেও অতুলনীয়। গোলাপকে ‘সুপাত্র’ বলার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, তার বংশমর্যাদা বা ‘কুলীন’ পরিচয় সমাজস্বীকৃত । দ্বিতীয়ত, সে বাঞ্ছামালির নিজ হাতে রোপিত সন্তান হওয়ায় তার মর্যাদা ও গুরুত্ব অন্য সবার চেয়ে বেশি। গোলাপের এই বংশগৌরব এবং বিশেষ লালন-পালনের ইতিহাস তাকে অনন্য করে তুলেছে । মূলত এই চারিত্রিক ও বংশগত বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণেই ভ্রমররাজ তাকে মল্লিকার জন্য সবচেয়ে যোগ্য পাত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন ।

    প্রশ্নঃ ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে মৌমাছি বরযাত্রীর সঙ্গে যেতে পারেনি কেন?

    উত্তরঃ আলোচ্য প্রসঙ্গের মূল কারণ হলো মৌমাছির দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা, যার ফলে সে সানাই বাদক হওয়া সত্ত্বেও বিয়ের মিছিলে যোগ দিতে পারেনি ।

    বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর এই রূপক রচনায় বাঙালির বিবাহ উৎসবের যে বর্ণাঢ্য চিত্র এঁকেছেন, তাতে বরযাত্রার এক আমুদে বর্ণনা পাওয়া যায় । বিয়ের বাদ্যযন্ত্র বা সানাই বাজানোর দায়িত্বটি মূলত মৌমাছির ওপর ন্যস্ত ছিল । কিন্তু বিয়ের লগ্ন নির্ধারিত হয়েছিল গোধূলি বেলায়, আর রাত ঘনিয়ে আসতেই মৌমাছির চোখের জ্যোতি ক্ষীণ হয়ে পড়ে । নিশাচর না হওয়ার দরুন অন্ধকারে পথ চলা তার পক্ষে অসম্ভব ছিল । শেষ পর্যন্ত মৌমাছির পরিবর্তে উচ্চিঙ্গড়া পোকা নহবত বা সানাই বাজানোর দায়িত্বটি পালন করে । মূলত এই প্রাকৃতিক কারণেই সানাইয়ের বায়না থাকা সত্ত্বেও মৌমাছি বরযাত্রার আড়ম্বরে অংশ নিতে ব্যর্থ হয় ।

    প্রশ্নঃ রাজকুমার স্থলপদ্ম কেন বিবাহে আসতে পারেনি?

    উত্তরঃ প্রাসঙ্গিক তথ্যমতে, প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা ও শারীরিক অসুস্থতার কারণেই রাজকুমার স্থলপদ্ম বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি ।

    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর এই কালজয়ী রূপক গল্পে বাঙালি সংস্কৃতির বিবাহ-আড়ম্বরের এক চমৎকার প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন । কাহিনীর বর্ণনা অনুযায়ী, পাত্র গোলাপ যখন গোধূলি বেলায় মহাসমারোহে বিয়ের যাত্রা শুরু করেন, তখন বাগানের অনেক ফুলই বরযাত্রী হিসেবে তাঁর সঙ্গী হয় । তবে এই আনন্দযাত্রায় রাজকুমার স্থলপদ্ম অংশ নিতে পারেননি । এর মূল কারণ ছিল তাঁর বিশেষ শারীরিক প্রকৃতি—সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথেই তিনি নিস্তেজ বা অসুস্থ হয়ে পড়েন । মূলত সূর্যালোকের অনুপস্থিতিতে তাঁর এই শারীরিক প্রতিকূলতার দরুনই তিনি জাঁকজমকপূর্ণ এই বিয়ের আসরে যোগ দিতে ব্যর্থ হন ।

    প্রশ্নঃ ‘কোন বিবাহে না এরূপ বরযাত্রী জোটে, আর কোন বিবাহে না তাহারা হুল ফুটাইয়া বিবাদ বাধায়?’ বুঝিয়ে লেখো।

    উত্তরঃ আলোচ্য অংশটিতে অত্যন্ত সার্থকভাবে বাঙালি সমাজব্যবস্থার বিয়েবাড়ির এক নেতিবাচক কিন্তু বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে ।

    বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর এই রূপক রচনায় দেখিয়েছেন যে, আমাদের সমাজের প্রতিটি উৎসবে এমন একদল মানুষের উপস্থিতি থাকে, যাদের প্রধান লক্ষ্যই হলো তুচ্ছ কারণে বিবাদ সৃষ্টি করা । এরা সাধারণত চাটুকারিতা বা পরনিন্দার মাধ্যমে উৎসবের আনন্দময় পরিবেশে বিঘ্ন ঘটায় । গল্পের প্রেক্ষাপটে এই অনভিপ্রেত চরিত্রগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেছে একদল পিপীলিকা । তারা বিয়ের অনুষ্ঠানে কোনো গঠনমূলক কাজে অংশ নেওয়ার বদলে হুল ফুটিয়ে অনর্থক বিশৃঙ্খলা ও ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করে । মূলত এই পিপীলিকাদের আচরণের মাধ্যমেই লেখক বাঙালি বিয়ের আসরে উপস্থিত সেই সব সুযোগসন্ধানী ও কলহপ্রিয় মানুষদের কটাক্ষ করেছেন ।

    প্রশ্নঃ ‘দেখিলাম, সেই মালায় আমার বর কন্যা রহিয়াছে’—ব্যাখ্যা করো ।

    উত্তরঃ আলোচ্য উক্তিটি মূলত লেখকের হৃদয়ে লালিত স্বপ্নিল রূপকথা এবং রূঢ় বাস্তবতার মধ্যবর্তী এক অপূর্ব সেতুবন্ধনকে প্রকাশ করে ।

    গল্পের প্রেক্ষাপটে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর নিপুণ ভাবনায় গোলাপমল্লিকার যে বর্ণাঢ্য বিয়ের আয়োজন করেছিলেন, তা ছিল নিছক এক কল্পনার জগত । তবে এই ঘোরের পরিসমাপ্তি ঘটে নসী বাবুর কন্যা কুসুমলতার আহ্বানে। লেখকের তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব কাটলে তিনি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেন যে, তাঁর কল্পিত সেই বর-কনে অর্থাৎ গোলাপ ও মল্লিকা রক্ত-মাংসের মানুষের হাতে ধরা দিয়েছে । কুসুমলতা যে সুন্দর মালাটি গেঁথেছে, তাতে বাস্তবিকই সেই ফুলগুলোর স্থান হয়েছে । এভাবেই লেখকের মস্তিস্কে সৃষ্ট কাল্পনিক বিয়ের চরিত্রগুলো বাস্তবের একটি সুতোয় গাঁথা মালার মাধ্যমে পূর্ণতা পায় ।

    ফুলের বিবাহ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

    গল্পটিতে বিয়ের পাত্র নির্বাচনে আভিজাত্যের লড়াই এবং ঘটকালির নামে ব্যবসায়িক মনোভাবের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে । পাত্র হিসেবে গোলাপের বংশীয় মর্যাদা বনাম জবা বা স্থলপদ্মের চারিত্রিক সীমাবদ্ধতা মূলত তৎকালীন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের প্রতীক। বিশেষ করে, ভ্রমর ঘটকের ‘মধু’ বা পণের দাবিটি আমাদের সমাজব্যবস্থার যৌতুক প্রথার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে ।

    সৃজনশীল প্রশ্ন – ১

    উদ্দীপক: করিম সাহেব তাঁর বড় মেয়ের বিয়ের জন্য অনেক সম্বন্ধ দেখছেন । কিন্তু কোনো পাত্রই তাঁর মনের মতো হচ্ছে না । কেউ অতি উচ্চবংশীয় হওয়ায় নিচু ঘর বলে নাক সিঁটকাচ্ছে, আবার কারও মেজাজ চড়া । অবশেষে একজন ঘটক এসে এক সুপাত্রের খবর দিল যার বংশমর্যাদা অনেক। তবে ঘটক সাহেব আলোচনার শুরুতেই নিজের বকশিশ এবং পাত্রপক্ষের ‘দাবি-দাওয়া’ নিয়ে এমনভাবে কথা শুরু করলেন যে করিম সাহেব বিরক্ত হয়ে উঠলেন ।

    প্রশ্নসমূহ:

    (ক) ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে পাত্রী কে?

    (খ) ভ্রমররাজ কেন ঘটকালির কাজে বিরক্ত হয়েছিল? (অথবা ক্ষুদ্র বৃক্ষ কেন বিরক্ত হয়েছিল?)

    (গ) উদ্দীপকের করিম সাহেবের পাত্র খোঁজার সমস্যার সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো ।

    (ঘ) “উদ্দীপকের ঘটকের আচরণ এবং ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ভ্রমররাজের উদ্দেশ্য একই সূত্রে গাঁথা”— মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

    সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর:

    (ক) উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে পাত্রী হলো মল্লিকা ফুল

    (খ) উত্তর: পাত্রের গুণগান গাওয়ার চেয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে বেশি মনোযোগী হওয়ায় ক্ষুদ্র বৃক্ষ ভ্রমররাজের ওপর বিরক্ত হয়েছিল। বিয়ের আলাপ করতে এসে ভ্রমররাজ মূল প্রসঙ্গের চেয়ে নিজের পাওনা বা মধু প্রাপ্তির দিকেই বেশি নজর দিচ্ছিল । ঘটকালির বিনিময়ে তার এই ব্যবসায়িক মনোভাব এবং আগাম সুযোগ-সুবিধা চাওয়ার ভঙ্গিটি কন্যার পিতার কাছে সময়ক্ষেপণ ও অনভিপ্রেত মনে হয়েছিল, তাই তিনি বিরক্ত হন ।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের করিম সাহেবের পাত্র নির্বাচনের জটিলতা ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মল্লিকার পিতার পাত্র খোঁজার সংকটের সাথে পুরোপুরি সাদৃশ্যপূর্ণ ।

    আরও পড়ুন:  ফুলের বিবাহ গল্পের MCQ । ফুলের বিবাহ গল্পের বহুনির্বাচনি প্রশ্ন উত্তর

    গল্পে দেখা যায়, মল্লিকার পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষ তাঁর কন্যার জন্য উপযুক্ত বর খুঁজে পাচ্ছিলেন না । স্থলপদ্ম নির্দোষ হলেও আভিজাত্যের কারণে সাধারণ মল্লিকাকে গ্রহণে নারাজ ছিলেন । আবার জবা ছিল অতি রাগী এবং গন্ধরাজ ছিল অত্যন্ত অহংকারী । অর্থাৎ পাত্রদের চারিত্রিক ত্রুটি বা সামাজিক মর্যাদার পার্থক্যের কারণে বিয়ে ঠিক হচ্ছিল না ।

    উদ্দীপকেও দেখা যায়, করিম সাহেবের মেয়ের জন্য আসা পাত্রদের মধ্যে কেউ উচ্চবংশীয় অহংকারী, আবার কেউ বদমেজাজি । গল্পের এই বাস্তব চিত্রটিই উদ্দীপকের করিম সাহেবের অভিজ্ঞতায় প্রতিফলিত হয়েছে, যা বাঙালি সমাজের উপযুক্ত পাত্র নির্বাচনের চিরায়ত সমস্যাকে তুলে ধরে ।

    (ঘ) উত্তর: “উদ্দীপকের ঘটকের আচরণ এবং ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ভ্রমররাজের উদ্দেশ্য একই সূত্রে গাঁথা”— মন্তব্যটি যথার্থ ও যৌক্তিক ।

    ফুলের বিবাহ’ গল্পে ভ্রমররাজ যখন ঘটক হিসেবে আসে, তখন সে বিয়ের পবিত্র সম্পর্কের চেয়ে নিজের ‘মধু’ বা পারিশ্রমিকের ফর্দ নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিল । সে রূপক অর্থে তৎকালীন সমাজের পণপ্রথা ও ঘটকদের লোভী মানসিকতাকে তুলে ধরেছে। তার কাছে বিয়ের সম্বন্ধ মানেই ছিল নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়া ।

    উদ্দীপকের ঘটকও একইভাবে পাত্রের গুণের চেয়ে নিজের বকশিশ এবং পাত্রপক্ষের ‘দাবি-দাওয়া’ বা যৌতুক নিয়ে আগে কথা শুরু করেন । গল্পের ভ্রমররাজ যেমন মধুকে পণ হিসেবে দাবি করেছিল, উদ্দীপকের ঘটকও তেমনি আর্থিক লেনদেনকে প্রধান্য দিয়েছে ।

    সুতরাং বলা যায়, উভয় ক্ষেত্রেই ঘটক চরিত্রগুলো সামাজিক দায়িত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভ এবং কুপ্রথাকে (পণপ্রথা) প্রশ্রয় দিয়েছে । এই চারিত্রিক মিলের কারণেই বলা যায় তাদের উদ্দেশ্য একই সূত্রে গাঁথা ।

    সৃজনশীল প্রশ্ন – ২

    উদ্দীপক: অপু তার বোনের বিয়ের জন্য খুব উৎসাহী । সে ভেবেছিল বিয়ে মানেই শুধু আনন্দ আর উৎসব । কিন্তু বিয়ের দিন সে দেখল, বরযাত্রী আসার সময় একদল প্রতিবেশী তুচ্ছ খাওয়ার মেনু নিয়ে ঝগড়া শুরু করল । আবার মূল গেটে বরপক্ষ এবং কন্যাপক্ষের মধ্যে গেট ধরা নিয়ে বেশ উত্তেজনা তৈরি হলো । অপুর মনে হলো, সুন্দর এই সামাজিক অনুষ্ঠানটি কিছু মানুষের অকারন বিবাদ ও বিশৃঙ্খলার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ।

    প্রশ্নসমূহ:

    (ক) ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে সানাই বা নহবত বাজাচ্ছিল কে?

    (খ) মৌমাছি কেন বরযাত্রীদের সঙ্গে যেতে পারেনি?

    (গ) উদ্দীপকের বিয়েবাড়ির বিশৃঙ্খলার সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের কোন দিকটি সাদৃশ্যপূর্ণ? ব্যাখ্যা করো ।

    (ঘ) “অপুর উপলব্ধি এবং ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের লেখকের সামাজিক পর্যবেক্ষণ একই সত্য প্রকাশ করে”— মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো ।

    সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর:

    (ক) উত্তর: ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে সানাই বা নহবত বাজাচ্ছিল উচ্চিঙ্গড়া পোকা

    (খ) উত্তর: মৌমাছির দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা বা রাতে দেখতে না পাওয়ার কারণে সে বরযাত্রীদের সঙ্গী হতে পারেনি । গল্পে বিয়ের লগ্ন নির্ধারিত হয়েছিল গোধূলি বেলায় । কিন্তু মৌমাছিরা নিশাচর নয় এবং অন্ধকারে তাদের দেখার ক্ষমতা নেই । সানাই বাজানোর বায়না বা চুক্তি থাকা সত্ত্বেও রাতের অন্ধকারে চলাফেরা করতে অক্ষম হওয়ায় মৌমাছি শেষ পর্যন্ত বিবাহযাত্রায় অংশ নিতে ব্যর্থ হয় ।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের বিয়েবাড়িতে প্রতিবেশীদের অকারন বিবাদ ও বিশৃঙ্খলার চিত্রটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের পিপীলিকা বাহিনীর আচরণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ।

    বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর গল্পে দেখিয়েছেন যে, শুভ অনুষ্ঠানে একশ্রেণির মানুষ থাকে যারা পরশ্রীকাতরতা বা চাটুকারিতার মাধ্যমে ঝামেলা পাকায় । ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে পিপড়ার দল কোনো গঠনমূলক কাজ না করে বরং হুল ফুটিয়ে বিয়ের আনন্দময় পরিবেশে বিবাদ সৃষ্টি করেছিল । তারা সমাজ জীবনের সেই সব মানুষের প্রতিনিধি যারা অন্যের আনন্দে ঈর্ষান্বিত হয়ে ঝগড়া বাধানোর সুযোগ খোঁজে ।

    উদ্দীপকের অপুর বোনের বিয়েতেও ঠিক একই দৃশ্য দেখা যায় । সেখানে একদল প্রতিবেশী খাওয়ার মেনু বা গেট ধরার মতো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করে উৎসবের আমেজ নষ্ট করে দেয় । গল্পের পিপীলিকা এবং উদ্দীপকের এই প্রতিবেশী দল—উভয়েই সমাজের বিশৃঙ্খলাকারী শ্রেণির প্রতিফলন ।

    (ঘ) উত্তর: “অপুর উপলব্ধি এবং ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের লেখকের সামাজিক পর্যবেক্ষণ একই সত্য প্রকাশ করে”— মন্তব্যটি অনস্বীকার্য ।

    ফুলের বিবাহ’ গল্পে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রূপকের আশ্রয়ে দেখিয়েছেন যে, বাঙালি সমাজব্যবস্থায় বিয়ে কেবল দুই হৃদয়ের মিলন নয়, বরং এটি নানাবিধ সামাজিক জটিলতার আবর্ত । লেখকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, বিয়েবাড়িতে চাটুকার ও স্বার্থান্বেষী মহলের (পিপীলিকা) কারণে প্রায়ই বিবাদ বাধে । আবার কেউ শারীরিক অক্ষমতায় (মৌমাছি বা স্থলপদ্ম) আসতে পারে না, কেউবা পণের (মধু) জন্য চাপ সৃষ্টি করে । এই সবকিছু মিলিয়ে একটি সামাজিক বিশৃঙ্খলার চিত্র ফুটে ওঠে ।

    উদ্দীপকের অপুর ক্ষেত্রেও একই অভিজ্ঞতা হয়েছে । সে শুরুতে বিয়েকে কেবল আনন্দের উৎসব মনে করলেও বাস্তবে দেখেছে মানুষের ক্ষুদ্র মানসিকতা ও অহেতুক কলহ কীভাবে একটি সুন্দর অনুষ্ঠানকে কলুষিত করে । অপুর এই মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধি আর লেখকের শ্লেষাত্মক বর্ণনা আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ । লেখক এবং অপু উভয়েই বুঝতে পেরেছেন যে, বাঙালি বিয়ের আচার-অনুষ্ঠানের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এই সামাজিক ব্যাধিগুলো উৎসবের মূল সুরকে ব্যাহত করে ।

    পরিশেষে বলা যায়, বঙ্কিমচন্দ্রের তীক্ষ্ণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং উদ্দীপকের অপুর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা—উভয়ই বাঙালি বিয়ের রীতিনীতির আড়ালে থাকা নেতিবাচক ও বিশৃঙ্খল দিকটিকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেছে ।

    সৃজনশীল প্রশ্ন – ৩

    উদ্দীপক: নীলু তার বাগানে বসে ছিল । হঠাৎ দেখল একটি প্রজাপতি উড়ে গিয়ে একটি গোলাপ ফুলের ওপর বসল । সে ভাবল, আহা! যদি ফুলদেরও মানুষের মতো বিয়ে হতো! সে মনে মনে একটি কাল্পনিক বিয়ের দৃশ্য সাজাল— যেখানে জুই হবে কনে আর গোলাপ হবে বর । কিন্তু তার ভাবনায় ছেদ পড়ল যখন তার ছোট বোন রিনি এসে তাকে এক তোড়া গাঁদা আর রজনীগন্ধা দিয়ে বলল, “আপু দেখ, এই ফুলগুলো দিয়ে মা আজ আমাদের নতুন অতিথির জন্য ঘর সাজাতে বলেছেন ।” নীলু বুঝতে পারল, তার কল্পনাগুলো আসলে বাস্তবের এই সুন্দর ফুলগুলোর মধ্যেই মিশে আছে ।

    প্রশ্নসমূহ:

    (ক) ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বরের নাম কী ছিল?

    (খ) স্থলপদ্ম কেন বিবাহে উপস্থিত হতে পারেনি?

    (গ) উদ্দীপকের নীলুর ভাবনার সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের লেখকের ভাবনার সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো ।

    (ঘ) “কল্পনা ও বাস্তবের মিলনই ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূল সার্থকতা”— উদ্দীপক ও গল্পের আলোকে উক্তিটি বিশ্লেষণ করো ।

    সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর:

    (ক) উত্তর: ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বরের নাম ছিল গোলাপ

    (খ) উত্তর: সূর্য অস্ত যাওয়ার পর শারীরিক নিস্তেজতা বা অসুস্থতার কারণে রাজকুমার স্থলপদ্ম বিবাহে উপস্থিত হতে পারেননি । স্থলপদ্ম বিশেষ প্রাকৃতিক স্বভাবের অধিকারী । তিনি সূর্যালোক ছাড়া সতেজ থাকতে পারেন না । গল্পের বিবাহযাত্রাটি ছিল গোধূলিলগ্নে, আর রাত বাড়ার সাথে সাথে স্থলপদ্ম অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি আড়ম্বরপূর্ণ সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ব্যর্থ হন ।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের নীলুর কল্পনাপ্রসূত জগত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সৃজনশীল ভাবনার সাথে গভীরভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ ।

    গল্পে দেখা যায়, লেখক নসী বাবুর ফুলবাগানে বসে দিবাস্বপ্নে বিভোর হন এবং ফুলদের এক বিশাল বিয়ের আয়োজন কল্পনা করেন । তাঁর সেই ভাবনায় গোলাপ, মল্লিকা, ভ্রমর—সবাই মানুষের মতো আচরণ করে । উদ্দীপকের নীলুও একইভাবে বাগানে বসে প্রজাপতি আর গোলাপ দেখে একটি কাল্পনিক বিয়ের দৃশ্য মনে মনে সাজিয়ে তোলে । লেখক এবং নীলু উভয়েই প্রকৃতির জড় উপাদানগুলোর ওপর মানুষের আবেগ ও সামাজিক রীতিনীতি আরোপ করেছেন, যা উভয়ের কল্পনার জগতের প্রধান মিল ।

    (ঘ) উত্তর: “কল্পনা ও বাস্তবের মিলনই ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূল সার্থকতা”— মন্তব্যটি গল্পের উপসংহার ও উদ্দীপকের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত যথার্থ ।

    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর গল্পে যে রাজকীয় বিয়ের বর্ণনা দিয়েছেন, তা ছিল তাঁর একান্তই নিজস্ব কল্পনা । তিনি গোলাপকে বর এবং মল্লিকাকে কনে বানিয়ে বাঙালি সমাজের পনপ্রথা, ঘটকালি ও বরযাত্রার এক নিখুঁত চিত্র এঁকেছিলেন । কিন্তু গল্পের শেষ পর্যায়ে যখন নসী বাবুর মেয়ের ডাকে লেখকের ঘোর ভেঙে যায়, তখন তিনি দেখেন যে তাঁর কল্পিত সেই ফুলগুলো বাস্তবেই কুসুমলতার হাতের মালায় গাঁথা রয়েছে । অর্থাৎ লেখকের আকাশচুম্বী কল্পনা বাস্তবের একটি সাধারণ ফুলের মালার মাধ্যমে মাটিতে নেমে আসে ।

    উদ্দীপকের নীলুর ক্ষেত্রেও একই পরিনতি দেখা যায়। সে যখন গোলাপ ও জুঁইয়ের বিয়ের কাল্পনিক জগত তৈরি করছিল, ঠিক তখনই তার বোনের আনা বাস্তবের ফুলের তোড়া তার সেই ঘোরে ছেদ ঘটায় । নীলু বুঝতে পারে যে তার কল্পনাগুলো আসলে এই বাস্তব ফুলগুলোর মধ্যেই নিহিত ।

    সুতরাং বলা যায়, ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পটি কেবল একটি রূপকথা নয় । লেখক যেভাবে কল্পনার রঙিন জগতকে নসী বাবুর মেয়ের হাতের বাস্তব মালার সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন, তা গল্পটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন দান করেছে । এই কল্পনা ও বাস্তবের চমৎকার সমন্বয়ই গল্পের মূল সার্থকতা ফুটিয়ে তুলেছে ।

    সৃজনশীল প্রশ্ন – ৪

    উদ্দীপক: একটি বেসরকারি সংস্থার প্রধান হিসেবে জনাব আফজাল সাহেব সবসময় যোগ্য কর্মী খোঁজেন। সম্প্রতি তিনি এক মেধাবী তরুণকে ইন্টারভিউতে ডাকলেন। কিন্তু কথা বলতে গিয়ে আফজাল সাহেব দেখলেন, সেই তরুণ নিজের মেধার চেয়ে তার উচ্চবংশ এবং প্রভাবশালী আত্মীয়দের পরিচয় দিতেই বেশি ব্যস্ত। অন্যদিকে, ইন্টারভিউ নিতে আসা এক দালাল আগেই আফজাল সাহেবকে অনুরোধ করে রেখেছেন যে, এই তরুণকে নিয়োগ দিলে তিনি একটি মোটা অঙ্কের কমিশন পাবেন। আফজাল সাহেব বিরক্ত হয়ে সেই তরুণের ফাইলটি বন্ধ করে দিলেন।

    প্রশ্নসমূহ:

    (ক) ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পটি বঙ্কিমচন্দ্র কাদের শিক্ষার্থে রচনা করেছেন?

    (খ) “ফর্দ দিলেই কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দেওয়া হবে”— উক্তিটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?

    (গ) উদ্দীপকের ইন্টারভিউ নিতে আসা দালালের সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের কোন চরিত্রের মিল পাওয়া যায়? ব্যাখ্যা করো।

    (ঘ) “উচ্চবংশ বা গুণের দম্ভ কীভাবে যোগ্যতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়”— উদ্দীপক ও ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করো।

    সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

    (ক) উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পটি ভবিষ্যৎ বর-কন্যাদিগের শিক্ষার্থে রচনা করেছেন।

    (খ) উত্তর: উক্তিটি দ্বারা কন্যার পিতার আর্থিক সচ্ছলতা এবং বরপক্ষের যেকোনো চাহিদা বা যৌতুক মেটানোর সক্ষমতাকে বোঝানো হয়েছে। গল্পে ভ্রমর যখন কুটিলভাবে কনের বাড়িতে মধুর মজুত বা পরিমাণের কথা জানতে চায়, তখন কন্যার পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষ আত্মবিশ্বাসের সাথে জানায় যে, চাহিদাপত্র দিলেই সে পাইপাই করে সব মিটিয়ে দেবে। এখানে ‘মধু’ মূলত বাঙালি বিয়ের ‘পণ’ বা ‘যৌতুকে’র রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের ইন্টারভিউ নিতে আসা দালালের সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ভ্রমররাজ বা ঘটক চরিত্রের স্পষ্ট মিল পাওয়া যায়।

    গল্পে ভ্রমররাজ ঘটকালির দায়িত্ব নিয়ে এলেও তার মূল লক্ষ্য ছিল নিজের স্বার্থসিদ্ধি। সে পাত্রের গুণের চেয়ে নিজের পারিশ্রমিক বা মধু প্রাপ্তির দিকেই বেশি মনোযোগী ছিল। বিয়ের মতো একটি সামাজিক পবিত্র বিষয়কে সে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছিল।

    উদ্দীপকের দালালটিও ঠিক একই কাজ করেছে। সে তরুণের মেধা বা প্রতিষ্ঠানের উপকারের চেয়ে নিজের ‘কমিশন’ বা ব্যক্তিগত লাভের বিষয়টিকে বড় করে দেখেছে। এই স্বার্থপরতা ও ব্যবসায়িক মনোভাবের কারণেই উদ্দীপকের দালাল এবং গল্পের ভ্রমররাজ একই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।

    আরও পড়ুন:  সোনার তরী কবিতার মূলভাব বা সোনার তরী কবিতার মূলকথা

    (ঘ) উত্তর: “উচ্চবংশ বা গুণের দম্ভ যোগ্যতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়”— মন্তব্যটি উদ্দীপক ও ‘ফুলের বিবাহ’ উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত সত্য।

    ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে দেখা যায়, মল্লিকার জন্য অনেক পাত্র থাকলেও বংশের অহংকার ও চারিত্রিক দম্ভের কারণে বিয়ে ঠিক হচ্ছিল না। যেমন— স্থলপদ্ম নিজেকে অনেক উচ্চবংশীয় মনে করায় নিচু জাতের মল্লিকাকে বিয়ে করতে রাজি হননি। আবার গন্ধরাজ পাত্র হিসেবে ভালো হলেও তার ছিল প্রচণ্ড আভিজাত্যের দেমাক। এই দম্ভ ও আভিজাত্যবোধই মল্লিকার যোগ্য পাত্র পাওয়ার পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

    উদ্দীপকেও ঠিক একই চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। ইন্টারভিউ দিতে আসা তরুণটি মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও সে তার মেধা বা যোগ্যতা প্রদর্শনের চেয়ে নিজের উচ্চবংশ ও প্রভাবশালী আত্মীয়দের পরিচয় দিতেই বেশি ব্যস্ত ছিল। তার এই অতিরিক্ত বংশগৌরব প্রদর্শন আফজাল সাহেবের মনে বিরক্তির উদ্রেক করে, ফলে তার নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়।

    পরিশেষে বলা যায়, যোগ্যতা থাকলেও যখন মানুষ তার বংশ বা আভিজাত্যের অহংকারকে বড় করে দেখে, তখন তার প্রকৃত গুণ ঢাকা পড়ে যায়। ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের পাত্ররা এবং উদ্দীপকের সেই তরুণ—উভয়েই তাদের দম্ভের কারণে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে।

    সৃজনশীল প্রশ্ন – ৫

    উদ্দীপক: করিম চাচা তার গ্রামের একজন অভিজ্ঞ মুরুব্বি। গ্রামের যেকোনো বিয়েতে তাকে ছাড়া চলে না। একবার এক ধনী ব্যবসায়ীর ছেলের বিয়েতে তিনি দেখলেন, আয়োজন অনেক বড় হলেও মানুষের মধ্যে আন্তরিকতার খুব অভাব। গয়নাগাটি আর পণের হিসেব নিয়ে দুই পক্ষ এমনভাবে তর্ক করছে যেন এটি কোনো বিয়ে নয়, বরং একটি বাণিজ্যিক চুক্তি। বরযাত্রীরাও খাবারের মান নিয়ে নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা করছে। করিম চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, “বিয়ের পবিত্রতা আজ লোকদেখানো আড়ম্বর আর স্বার্থের কাছে হার মেনে যাচ্ছে।”

    প্রশ্নসমূহ:

    (ক) ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বরের বংশপরিচয় কী?

    (খ) জবা ফুলকে কেন পাত্র হিসেবে বাতিল করা হয়েছিল?

    (গ) উদ্দীপকের করিম চাচার পর্যবেক্ষণ ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের কোন বিশেষ দিকটিকে নির্দেশ করে? ব্যাখ্যা করো ।

    (ঘ) “আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আড়ালে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ই লেখক ও করিম চাচার মূল উদ্বেগের বিষয়”— বিশ্লেষণ করো ।

    সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

    (ক) উত্তর: ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বরের বংশপরিচয় হলো— সে বাঞ্ছামালির স্বহস্তরোপিত সন্তান এবং অতি উচ্চ বংশীয় বা কুলীন

    (খ) উত্তর: অতিরিক্ত উগ্র মেজাজ ও রাগী স্বভাবের কারণে জবা ফুলকে পাত্র হিসেবে বাতিল করা হয়েছিল। মল্লিকা ফুলের বিয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র খুঁজতে গিয়ে তার পিতা দেখেন যে, জবা ফুল যদিও বিয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল, কিন্তু তার স্বভাব ছিল অত্যন্ত ক্রোধপূর্ণ। শান্ত স্বভাবের মল্লিকার জন্য এমন রাগী বর উপযুক্ত হবে না ভেবেই কন্যার পিতা এই সম্বন্ধ থেকে পিছিয়ে আসেন।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের করিম চাচার পর্যবেক্ষণ ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের বিবাহপ্রথার বাণিজ্যিকীকরণ ও লৌকিকতার নেতিবাচক দিকটিকে নির্দেশ করে।

    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর গল্পে দেখিয়েছেন যে, বিয়ে কেবল একটি সামাজিক মিলন নয়, বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে পণের আদান-প্রদান এবং চাটুকারিতার মঞ্চে পরিণত হয়। গল্পের ভ্রমররাজ যেমন বিয়ের আলাপ করতে এসে বারবার ‘মধু’ বা পারিশ্রমিকের কথা তুলছিল, তা মূলত বিয়ের বাণিজ্যিক রূপেরই বহিঃপ্রকাশ। উদ্দীপকের করিম চাচাও একই দৃশ্য দেখেন, যেখানে বিয়ের পবিত্রতা ছাপিয়ে গয়নাগাটি আর পণের হিসেব-নিকেশ বড় হয়ে দাঁড়ায়। দুই পক্ষই একে অপরের ওপর টেক্কা দেওয়ার যে মানসিকতা দেখায়, তা গল্পের সেই রূপক সমাজব্যবস্থার সাথেই সাদৃশ্যপূর্ণ।

    (ঘ) উত্তর: “আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আড়ালে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ই লেখক ও করিম চাচার মূল উদ্বেগের বিষয়”— মন্তব্যটি উদ্দীপক ও গল্পের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

    ফুলের বিবাহ’ গল্পে লেখক রূপকের আড়ালে দেখিয়েছেন যে, বিয়ের মতো একটি আনন্দময় আয়োজনে কীভাবে স্বার্থপরতা ঢুকে পড়ে। সেখানে ভ্রমর তার ঘটকালির লাভের জন্য ব্যস্ত, পিপীলিকারা অনর্থক ঝগড়া বাধাতে উন্মুখ, আর পাত্রপক্ষ তাদের বংশগৌরবের অহংকারে অন্ধ। বাহ্যিকভাবে এটি একটি বর্ণাঢ্য বিয়ের আয়োজন হলেও এর ভেতরে সহানুভূতি বা পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাব ছিল স্পষ্ট।

    উদ্দীপকের করিম চাও একই পরিস্থিতির সাক্ষী হন। তিনি দেখেন যে, বিয়ের আয়োজনে জৌলুস বা আড়ম্বরের কোনো কমতি নেই, কিন্তু মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা বা স্নেহের টান নেই। বরযাত্রীদের কানাঘুষা আর দুই পক্ষের ব্যবসায়িক দরকষাকষি প্রমাণ করে যে, সামাজিক প্রথার নামে আমরা আজ মানবিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দিচ্ছি। লেখকের এই শ্লেষাত্মক পর্যবেক্ষণ এবং করিম চাচার দীর্ঘশ্বাস আসলে একই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে।

    পরিশেষে বলা যায়, মানুষ যখন সম্পর্কের চেয়ে সম্পদকে এবং উৎসবের চেয়ে আড়ম্বরকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন মানবিকতার অবক্ষয় ঘটে। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে এই সামাজিক সত্যটিই ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে তুলে ধরেছেন, যা আজও আমাদের সমাজে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

    সৃজনশীল প্রশ্ন – ৬

    উদ্দীপক: ধনী ব্যবসায়ী হারুন সাহেব তার একমাত্র ছেলের জন্য পাত্রী খুঁজছেন। গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে সুমীকে তার খুব পছন্দ হয়। মেয়েটি শিক্ষিত এবং গুণবতী। কিন্তু হারুন সাহেবের স্ত্রী এতে ঘোর আপত্তি জানিয়ে বলেন, “আমাদের পরিবারের একটা আলাদা মর্যাদা আছে। আমাদের ছেলে কেন এমন ঘরে বিয়ে করবে যাদের বংশের কোনো নামডাক নেই? সমানে-সমানে লড়াই না হলে সে বিয়ে টেকে না।” শেষ পর্যন্ত আভিজাত্যের লড়াইয়ে সুমীর গুণগুলো ঢাকা পড়ে যায় এবং বিয়েটি ভেঙে যায়।

    প্রশ্নসমূহ:

    (ক) ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে কোন পোকা সানাই বাজাচ্ছিল?

    (খ) “সে বড় রাগী”—কাকে কেন এই বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়েছে?

    (গ) উদ্দীপকের হারুন সাহেবের স্ত্রীর মানসিকতা ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের কোন দিকটি প্রতিফলিত করে? ব্যাখ্যা করো।

    (ঘ) “বংশমর্যাদার দম্ভ যোগ্যতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠাই গল্পের ও উদ্দীপকের মূল ট্র্যাজেডি”— মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

    সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

    (ক) উত্তর: ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে উচ্চিঙ্গড়া পোকা সানাই বা নহবত বাজাচ্ছিল।

    (খ) উত্তর: গল্পে জবা ফুলকে ‘বড় রাগী’ বলা হয়েছে। মল্লিকা ফুলের বিয়ের জন্য যখন সুপাত্রের সন্ধান করা হচ্ছিল, তখন জবা ফুল বর হিসেবে রাজি থাকলেও তার উগ্র মেজাজ ও ক্রোধের কারণে তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। শান্ত ও সুকুমার মল্লিকার সাথে জবা ফুলের এই চারিত্রিক বৈপরীত্যের কারণেই লেখক তাকে এই বিশেষণে চিহ্নিত করেছেন।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের হারুন সাহেবের স্ত্রীর মানসিকতা ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের শ্রেণিবিভেদ এবং আভিজাত্যের অহংকারকে প্রতিফলিত করে।

    গল্পে দেখা যায়, বাগানের রাজা স্থলপদ্ম অত্যন্ত নির্দোষ এবং সুন্দর পাত্র হওয়া সত্ত্বেও আভিজাত্যের কারণে মল্লিকাকে বিয়ে করতে রাজি হননি। তাঁর মতে, তিনি অত্যন্ত উঁচু বংশের বা উঁচু স্তরের ফুল, আর মল্লিকা সাধারণ বা নিচু স্তরের। এই যে সামাজিক উঁচু-নিচু ভেদাভেদ, তা-ই উদ্দীপকের হারুন সাহেবের স্ত্রীর মধ্যে দেখা যায়। তিনি সুমীর গুণ বা মেধার চেয়ে তাদের বংশমর্যাদাকে বড় করে দেখেছেন এবং ‘সমানে-সমানে’ সম্পর্কের দোহাই দিয়ে গুণবতী মেয়েটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

    (ঘ) উত্তর: “বংশমর্যাদার দম্ভ যোগ্যতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠাই গল্পের ও উদ্দীপকের মূল ট্র্যাজেডি”— মন্তব্যটি অনস্বীকার্য।

    ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বঙ্কিমচন্দ্র দেখিয়েছেন যে, মল্লিকা একটি সুকুমার ও পবিত্র ফুল হওয়া সত্ত্বেও কেবল তার পিতার (ক্ষুদ্র বৃক্ষ) সামাজিক অবস্থান এবং নিজের বংশমর্যাদা কম হওয়ার কারণে বারবার যোগ্য পাত্র থেকে বঞ্চিত হয়। গন্ধরাজ বা স্থলপদ্মের মতো পাত্ররা মল্লিকার গুণের চেয়ে নিজেদের বংশের অহংকারকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে একটি সুন্দর সম্পর্কের সম্ভাবনা শুরুতেই নষ্ট হয়ে যায়। এটি তৎকালীন সমাজব্যবস্থার এক কঠোর বাস্তবতা যেখানে মানুষের গুণের চেয়ে তার বংশ পরিচয়ই বড় হয়ে দাঁড়াত।

    উদ্দীপকের ক্ষেত্রেও একই ট্র্যাজেডি ঘটেছে। সুমী একজন শিক্ষিত ও গুণবতী মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও হারুন সাহেবের স্ত্রীর আভিজাত্যের মোহের কাছে তার যোগ্যতা হার মেনেছে। পরিবারের ‘নামডাক’ বা ‘মর্যাদা’ রক্ষা করতে গিয়ে একটি সুন্দর জীবনের সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে।

    পরিশেষে বলা যায়, যোগ্যতা ও গুণ যখন বংশ পরিচয়ের কাছে পরাজিত হয়, তখন সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। লেখক বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর গল্পে এই সামাজিক সংকীর্ণতাকেই বিদ্রূপ করেছেন, যা উদ্দীপকের ঘটনার মধ্য দিয়ে আধুনিক সমাজেও প্রতিফলিত হয়েছে।

    সৃজনশীল প্রশ্ন – ৭

    উদ্দীপক: গ্রামের দয়াল কাকা তার মেয়ের বিয়ের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। অবশেষে শহরের এক ধনাঢ্য পরিবারের ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হলো। কিন্তু বিয়ের পিঁড়িতে বসার ঠিক আগমুহূর্তে ছেলের পক্ষ থেকে হঠাৎ একটি নতুন দাবি তোলা হলো—বিয়েতে একটি দামী মোটরসাইকেল দিতে হবে। দয়াল কাকা করজোড়ে বললেন, “বাবা, আমি সামান্য কৃষক, আমার যা ছিল সব তো দিয়েই দিয়েছি।” কিন্তু বরপক্ষ তাদের দাবিতে অটল। শেষে নিরুপায় পিতা তার শেষ সম্বলটুকুও দিতে বাধ্য হলেন। বিয়ের আনন্দ যেন দয়াল কাকার কাছে এক বিষাদে পরিণত হলো।

    প্রশ্নসমূহ:

    (ক) ক্ষুদ্র বৃক্ষ কেন ভ্রমররাজকে সরাসরি বরের কথা জিজ্ঞেস করেছিল?

    (খ) “আমরা বাঞ্ছামালির সন্তান”—উক্তিটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?

    (গ) উদ্দীপকের বরপক্ষের দাবির সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের কোন বিষয়টির সাদৃশ্য রয়েছে? ব্যাখ্যা করো।

    (ঘ) “ক্ষুদ্র বৃক্ষ এবং দয়াল কাকা—উভয়ই একই সামাজিক ব্যাধির শিকার”— উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।

    সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

    (ক) উত্তর: ভ্রমররাজ ঘটকালির মূল আলোচনা বাদ দিয়ে নিজের পারিশ্রমিক বা মধু প্রাপ্তি নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক কথা বলছিল বলে ক্ষুদ্র বৃক্ষ বিরক্ত হয়ে সরাসরি বরের কথা জিজ্ঞেস করেছিল।

    (খ) উত্তর: উক্তিটি দ্বারা পাত্র হিসেবে গোলাপের আভিজাত্য, বংশগৌরব এবং বিশেষ যত্নে লালিত হওয়ার পরিচয়কে বোঝানো হয়েছে। গল্পে ভ্রমররাজ গোলাপকে অতি সুপাত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে গিয়ে বলে যে, সে বাঞ্ছামালির নিজ হাতে রোপিত সন্তান। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, গোলাপ কেবল একটি ফুল নয়, বরং সে অত্যন্ত উচ্চবংশীয় এবং বিশেষ মর্যাদার অধিকারী, যা তাকে অন্য সব পাত্রের থেকে শ্রেষ্ঠ করে তুলেছে।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের বরপক্ষের অন্যায্য দাবির সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ভ্রমররাজ বা ঘটকের মধু (পণ) চাওয়ার বিষয়টি সাদৃশ্যপূর্ণ।

    বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর গল্পে রূপকের আশ্রয়ে দেখিয়েছেন যে, বিয়ের মতো পবিত্র বন্ধনেও মানুষের লোভ কীভাবে কাজ করে। ভ্রমররাজ যখন পাত্রীর বাড়িতে গিয়ে পাত্রের গুণগান গাওয়ার বদলে ‘ঘরে মধু কত আছে’ বা কতটুকু মধু সে পাবে—তার হিসেব চায়, তা মূলত তৎকালীন সমাজের যৌতুক বা পণপ্রথার প্রতিফলন। উদ্দীপকের বরপক্ষও একইভাবে বিয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে মোটরসাইকেলের যে দাবি তুলেছে, তা গল্পের ভ্রমররাজের সেই ‘মধু’ চাওয়ার আধুনিক ও রূঢ় রূপ। উভয় ক্ষেত্রেই বিয়ের চেয়ে আর্থিক লাভ বা বস্তুবাদী চাহিদা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    (ঘ) উত্তর: “ক্ষুদ্র বৃক্ষ এবং দয়াল কাকা—উভয়ই একই সামাজিক ব্যাধির শিকার”— মন্তব্যটি অত্যন্ত সত্য এবং সমাজবাস্তবতার প্রতিফলন।

    ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে ক্ষুদ্র বৃক্ষ একজন অসহায় পিতার প্রতিনিধি। তার অনেকগুলো অবিবাহিত কন্যা, আর তাদের বিয়ে দিতে গিয়ে তাকে নানা লাঞ্ছনা ও শোষণের শিকার হতে হয়। চতুর ভ্রমররাজ যখন তার কাছে মধু দাবি করে, তখন ক্ষুদ্র বৃক্ষ বিরক্ত হলেও মূলত সে অসহায়। তাকে ‘কড়ায় গণ্ডায়’ সব বুঝিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়, কারণ সমাজব্যবস্থাটিই এমন যেখানে কন্যার পিতাকে সবসময় মাথা নিচু করে থাকতে হয়।

    আরও পড়ুন:  বিড়াল প্রবন্ধ প্রশ্ন উত্তর | বিড়াল প্রবন্ধ class 11

    উদ্দীপকের দয়াল কাকাও ঠিক একই পরিস্থিতির শিকার। তিনি একজন দরিদ্র কৃষক হয়েও মেয়ের সুখের আশায় নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। কিন্তু বরপক্ষের অতিরিক্ত লোভের কাছে তিনি জিম্মি হয়ে পড়েন। বিয়ের আনন্দ তাঁর কাছে বিষাদে পরিণত হয় কারণ সমাজ আজও পণপ্রথা বা যৌতুকের মতো অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারেনি।

    পরিশেষে বলা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র আজ থেকে অনেক বছর আগে ফুলের গল্পের মাধ্যমে সমাজের যে পচনশীল দিকটি (পণপ্রথা) দেখিয়েছিলেন, দয়াল কাকার অভিজ্ঞতায় আজও সেই একই ব্যাধি বিদ্যমান। যুগের পরিবর্তন হলেও কন্যার পিতাদের অসহায়ত্ব আর শোষিত হওয়ার চিত্রটি একই রয়ে গেছে। তাই উভয় চরিত্রই মূলত আমাদের ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থার বলি।

    সৃজনশীল প্রশ্ন – ৮

    উদ্দীপক: শিক্ষক ক্লাসে বলছিলেন, “একটি বিয়ে কেবল দুটি পরিবারের মিলন নয়, এটি সমাজের দর্পণও বটে।” ছাত্র রবিন প্রশ্ন করল, “স্যার, তাহলে কেন বিয়েতে এত লোকদেখানো আয়োজন হয়?” শিক্ষক উত্তর দিলেন, “মানুষ অনেক সময় নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও ধুমধাম করে কেবল লোকলজ্জার ভয়ে। আবার কেউ কেউ আমন্ত্রিত হয়ে এসেও খাবারের মান বা আয়োজন নিয়ে আড়ালে সমালোচনা করে। এই লৌকিকতা আর সমালোচনা অনেক সময় বিয়ের মূল উদ্দেশ্যকেই ম্লান করে দেয়।”

    প্রশ্নসমূহ:

    (ক) ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে ঘটক কে ছিলেন?

    (খ) “সে বড় দেমাক”— গন্ধরাজ সম্পর্কে কেন এ কথা বলা হয়েছে?

    (গ) উদ্দীপকের শিক্ষকের বর্ণনায় যে নেতিবাচক মানুষদের কথা বলা হয়েছে, ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের কোন চরিত্রগুলোর আচরণে তার প্রতিফলন ঘটে? ব্যাখ্যা করো।

    (ঘ) “বাস্তব সমাজ জীবনের বিয়ের বিড়ম্বনাগুলোই বঙ্কিমচন্দ্র ‘ফুলের বিবাহ’ রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন”— মন্তব্যটি উদ্দীপক ও গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করো।

    সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

    (ক) উত্তর: ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে ঘটক ছিলেন ভ্রমররাজ

    (খ) উত্তর: পাত্র হিসেবে গন্ধরাজ অত্যন্ত সুগন্ধি ও গুণী হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে প্রচণ্ড আভিজাত্যের অহংকার ছিল বলে তাকে ‘বড় দেমাক’ বলা হয়েছে। মল্লিকা ফুলের বিয়ের জন্য যখন পাত্রের খোঁজ করা হচ্ছিল, তখন দেখা যায় গন্ধরাজ নিজের গুণ ও সৌন্দর্যের কারণে কাউকে পাত্তা দেন না। তাঁর এই দম্ভ ও নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবার মানসিকতার কারণেই কন্যার পিতা বা ঘটক তাঁকে দেমাকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের শিক্ষকের বর্ণনায় বিয়েবাড়ির যে নেতিবাচক মানুষদের কথা বলা হয়েছে, ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে তার প্রতিফলন ঘটে মূলত পিপীলিকা বা পিঁপড়াদের আচরণের মাধ্যমে।

    শিক্ষক তাঁর বর্ণনায় এমন একদল মানুষের কথা বলেছেন যারা দাওয়াত খেতে এসে আন্তরিক হওয়ার বদলে আয়োজনের খুঁত ধরে সমালোচনা ও বিবাদ সৃষ্টি করে। গল্পের বিয়ের আসরেও আমরা দেখতে পাই, পিপীলিকারা কোনো গঠনমূলক কাজে অংশ না নিয়ে বরং বিয়ের মাঝপথে হুল ফুটিয়ে অনর্থক কামড়া-কামড়ি ও ঝগড়া শুরু করে। তারা বিয়েবাড়ির সেই সব মানুষদের প্রতিনিধি যারা উৎসবে আনন্দ করার চেয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতেই বেশি পছন্দ করে। এছাড়া মৌমাছি বা উচ্চিঙ্গড়াদের বায়না নিয়ে দরকষাকষিও এই লৌকিকতার একটি অংশ।

    (ঘ) উত্তর: “বাস্তব সমাজ জীবনের বিয়ের বিড়ম্বনাগুলোই বঙ্কিমচন্দ্র ‘ফুলের বিবাহ’ রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন”— মন্তব্যটি অত্যন্ত যথাযথ।

    ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বঙ্কিমচন্দ্র দেখিয়েছেন যে, মানুষের সমাজের মতো ফুলের জগতেও বিয়েতে নানা বিড়ম্বনা থাকে। বরযাত্রীর সাজসজ্জা, নহবতের বাদ্যি, ঘটকের লোভী মানসিকতা (মধু চাওয়া) এবং আভিজাত্যের লড়াই (স্থলপদ্ম বা গন্ধরাজ)—এই সবকিছুই আসলে মানুষের সমাজের ত্রুটিপূর্ণ প্রথার প্রতিফলন। গল্পের শেষে দেখা যায়, অনেক আড়ম্বর সত্ত্বেও পিপীলিকাদের ঝগড়ায় বিয়ের পবিত্রতা বিঘ্নিত হয়।

    উদ্দীপকের রবিনের পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষকের বক্তব্যও একই বাস্তবতাকে সমর্থন করে। সমাজে বিয়ের মূল আনন্দের চেয়ে লোকদেখানো ধুমধাম আর নিন্দুকদের সমালোচনাই বেশি গুরুত্ব পায়। মানুষ নিজের মর্যাদা রক্ষায় বা অন্যের মুখ বন্ধ করতে গিয়ে লৌকিকতার আড়ালে হারিয়ে যায়। গল্পের লেখক এবং উদ্দীপকের শিক্ষক—উভয়ই বোঝাতে চেয়েছেন যে, বিয়ের মতো একটি সুন্দর সম্পর্ক কীভাবে সামাজিক কুপ্রথা ও নীচমনা মানুষদের কারণে বিড়ম্বনায় রূপ নেয়।

    পরিশেষে বলা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র রূপকের আশ্রয়ে সমাজ জীবনের যে সত্যটি উনবিংশ শতাব্দীতে লিখেছিলেন, তা আজও উদ্দীপকে বর্ণিত আধুনিক সমাজের রূঢ় বাস্তবতা হিসেবে টিকে আছে।

    সৃজনশীল প্রশ্ন – ৯

    উদ্দীপক: নীলা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কর্মরত। তার বিয়ের জন্য পারিবারিকভাবে কথা চলছে। পাত্রপক্ষ নীলার মেধা বা কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সে দেখতে কেমন, রান্নাবান্না জানে কি না এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা নীলাদের চেয়ে বেশি কি না। নীলার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক; তিনি পাত্রপক্ষের এমন সংকীর্ণ মানসিকতা দেখে ব্যথিত হন। তার মনে হলো, আধুনিক যুগেও একটি মেয়েকে কেবল তার বাহ্যিক রূপ আর বংশপরিচয় দিয়েই বিচার করা হচ্ছে, তার ব্যক্তিত্ব বা গুণের কোনো মূল্য নেই।

    প্রশ্নসমূহ:

    (ক) মল্লিকা এখন কী অবস্থায় আছে?

    (খ) “বর বড় কুলীন”— উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।

    (গ) উদ্দীপকের নীলার বাবার ব্যথিত হওয়ার সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ক্ষুদ্র বৃক্ষের মানসিক অবস্থার তুলনা করো।

    (ঘ) “পাত্রী নির্বাচনে গুণের চেয়ে লৌকিকতা ও আভিজাত্যই প্রাধান্য পায়”— উদ্দীপক ও গল্পের আলোকে মন্তব্যটির যথার্থতা বিচার করো।

    সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

    (ক) উত্তর: ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে মল্লিকা এখন কলি বা কুঁড়ি অবস্থায় আছে (যা আজকালের মধ্যেই প্রস্ফুটিত হবে)।

    (খ) উত্তর: উক্তিটি দ্বারা পাত্র হিসেবে গোলাপের আভিজাত্য এবং উচ্চ সামাজিক মর্যাদা বা বংশীয় কৌলীন্যকে বোঝানো হয়েছে। তৎকালীন সমাজে ‘কুলীন’ বলতে উচ্চবংশীয় বা বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বোঝানো হতো। গল্পে গোলাপকে ‘বাঞ্ছামালির স্বহস্তরোপিত সন্তান’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে তার বংশগৌরব প্রকাশ করা হয়েছে। ঘটক ভ্রমররাজ বোঝাতে চেয়েছেন যে, গোলাপ কেবল গুণী নয়, বরং তার পারিবারিক ইতিহাস অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের নীলার বাবার মানসিক অবস্থা এবং ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ক্ষুদ্র বৃক্ষের দুশ্চিন্তা মূলত একই সূত্রে গাঁথা, যা হলো কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার অসহায়ত্ব

    গল্পে দেখা যায়, ক্ষুদ্র বৃক্ষ তার কন্যা মল্লিকার বিয়ের জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। তিনি অনেকগুলো কন্যার পিতা হওয়ায় এবং আর্থিক সামর্থ্য সীমিত থাকায় সমাজের নানা কটু কথা ও পাত্রপক্ষের অবজ্ঞা সহ্য করেন। আবার পাত্র নির্বাচনে গিয়ে দেখেন সবাই কেবল বংশ বা জাত নিয়ে ব্যস্ত। উদ্দীপকের নীলার বাবাও একজন সজ্জন ব্যক্তি হয়েও মেয়ের মেধার চেয়ে তার বাহ্যিক বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব পেতে দেখে ব্যথিত হন। উভয় পিতাই তাদের কন্যার প্রকৃত গুণাবলী বুঝতে ব্যর্থ সমাজব্যবস্থার কাছে নিজেকে অসহায় বোধ করেন।

    (ঘ) উত্তর: “পাত্রী নির্বাচনে গুণের চেয়ে লৌকিকতা ও আভিজাত্যই প্রাধান্য পায়”— মন্তব্যটি উদ্দীপক ও ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সত্য।

    গল্পে মল্লিকা একটি পবিত্র ও সুন্দর ফুল হওয়া সত্ত্বেও পাত্র হিসেবে গন্ধরাজ বা স্থলপদ্ম তাকে গ্রহণ করেনি কেবল তাদের বংশীয় আভিজাত্যের কারণে। স্থলপদ্ম নিজেকে অনেক ‘উঁচু’ স্তরের মনে করায় সাধারণ মল্লিকাকে অবজ্ঞা করেছেন। এমনকি ঘটক ভ্রমরও কনের রূপ বা গুণের চেয়ে মধুর (পণ) হিসেব নিতেই বেশি ব্যস্ত ছিল। এখানে মল্লিকার নিজস্ব অস্তিত্বের চেয়ে সামাজিক লৌকিকতাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

    উদ্দীপকের নীলার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। নীলা শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও পাত্রপক্ষ তার কর্মদক্ষতা বা মেধার চেয়ে তার রূপ এবং তাদের নিজেদের বংশীয় গৌরবের পাল্লা ভারী করার চেষ্টা করছে। আধুনিক সমাজেও বিয়ের ক্ষেত্রে একজন নারীর ব্যক্তিসত্তার চেয়ে তার বাহ্যিক অলংকার ও বংশীয় পরিচিতিই মুখ্য হয়ে ওঠে।

    পরিশেষে বলা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র রূপক গল্পের মাধ্যমে উনিশ শতকের যে সংকীর্ণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিলেন, উদ্দীপকের নীলার অভিজ্ঞতায় আজও তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। উভয় ক্ষেত্রেই পাত্রী নির্বাচনের মাপকাঠি হিসেবে গুণকে উপেক্ষা করে আভিজাত্য ও লৌকিকতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

    সৃজনশীল প্রশ্ন – ১০

    উদ্দীপক: চিত্রশিল্পী রফিক সাহেব অনেক রাত জেগে একটি তৈলচিত্র আঁকলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে—একটি বিশাল রাজপ্রাসাদ, কিন্তু তার ভেতরে কোনো মানুষ নেই, কেবল একঝাঁক রঙিন প্রজাপতি আর ফুল। সকালে তাঁর বন্ধু ছবিটি দেখে হাসলেন এবং বললেন, “এ তো তোমার অলীক কল্পনা! বাস্তবে কি এমন হয়?” রফিক সাহেব শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “বন্ধু, আমার এই কল্পনার তুলিতেই আমি মানুষের সমাজের ভিড়, কোলাহল আর স্বার্থপরতাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। রূপকের আড়ালেই অনেক সময় গভীর সত্য লুকিয়ে থাকে।”

    প্রশ্নসমূহ:

    (ক) নসী বাবুর মেয়ের নাম কী?

    (খ) “নহবৎ আর বসিল না”—কেন?

    (গ) উদ্দীপকের রফিক সাহেবের চিন্তাধারার সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের লেখকের সাহিত্যিক কৌশলের সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।

    (ঘ) “কল্পনার ছলে বাস্তবতাকে ব্যবচ্ছেদ করাই ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য”— মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

    সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

    (ক) উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে নসী বাবুর মেয়ের নাম কুসুমলতা

    (খ) উত্তর: বিবাহযাত্রার অন্যতম বাদ্যযন্ত্র ‘সানাই’ বা নহবত বাজানোর কারিগর মৌমাছি রাতের অন্ধকারে দেখতে পায় না বলে নহবত আর বসেনি। গল্পে দেখা যায়, সানাই বাজানোর জন্য মৌমাছির সাথে চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু বিবাহ লগ্নটি ছিল গোধূলি বেলায়। রাত নামতেই মৌমাছির দৃষ্টিশক্তি লোপ পাওয়ায় সে আসতে পারেনি। যদিও উচ্চিঙ্গড়া পোকা বিকল্প হিসেবে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মৌমাছির মতো দক্ষ বাদকের অভাবে সেই আড়ম্বরপূর্ণ নহবত শেষ পর্যন্ত আর জমেনি।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের রফিক সাহেবের চিত্রকর্মের কৌশলের সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের লেখকের রূপকধর্মী (Allegorical) সাহিত্য শৈলীর গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।

    রফিক সাহেব যেমন মানুষের সমাজের কোলাহল ও স্বার্থপরতাকে সরাসরি না এঁকে প্রজাপতি ও ফুলের রূপকের আড়ালে ফুটিয়ে তুলেছেন, বঙ্কিমচন্দ্রও ঠিক তাই করেছেন। লেখক তাঁর গল্পে মানুষের সরাসরি বর্ণনা না দিয়ে ফুল, ভ্রমর, মৌমাছি ও পিঁপড়াদের চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। রফিক সাহেবের ছবির মতোই লেখকের এই রূপক জগতটি বাহ্যিকভাবে অলীক মনে হলেও তার গভীরে উনিশ শতকের বাঙালি সমাজের বিবাহপ্রথা, কৌলীন্য প্রথা ও নীচমনা মানুষদের চরিত্র নিখুঁতভাবে অঙ্কিত হয়েছে। উভয়ের মূল লক্ষ্যই হলো সরাসরি সমালোচনার পরিবর্তে প্রতীকের মাধ্যমে সত্যকে উন্মোচন করা।

    (ঘ) উত্তর: “কল্পনার ছলে বাস্তবতাকে ব্যবচ্ছেদ করাই ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য”— মন্তব্যটি গল্পের বিষয়বস্তু ও উদ্দীপকের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত যথার্থ।

    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর গল্পে এক চমৎকার কাল্পনিক জগত তৈরি করেছেন। সেখানে গোলাপ বর, মল্লিকা কনে এবং ভ্রমর হলো চতুর ঘটক। এই রূপকথার মতো আবহের আড়ালে তিনি সমকালীন সমাজের জটিল ব্যাধিগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। বিয়ের পণের জন্য ভ্রমরের দরকষাকষি, বংশমর্যাদার কারণে স্থলপদ্মের দম্ভ, কিংবা পিঁপড়াদের অহেতুক ঝগড়া—এসবই মানুষের সমাজের রূঢ় বাস্তবতা। লেখক কল্পনার রঙ চড়িয়ে সমাজকে আয়না দেখিয়েছেন যেন পাঠক হাসি-ঠাট্টার ছলে নিজের সমাজের কদর্য রূপটি চিনতে পারে।

    উদ্দীপকের রফিক সাহেবও ঠিক এই কথাই বলেছেন। তাঁর কাছে রূপক হলো সত্য প্রকাশের মাধ্যম। গল্পের শেষে যখন নসী বাবুর মেয়ের ডাকে লেখকের ঘোর কাটে এবং তিনি দেখেন যে কাল্পনিক ফুলগুলো বাস্তব মালার ভেতরেই আছে, তখন এটি প্রমাণিত হয় যে কল্পনা এবং বাস্তব আলাদা কিছু নয়। লেখক তাঁর কল্পনার তুলিতে বাস্তবের পচনশীল সমাজকেই ব্যবচ্ছেদ করেছেন।

    পরিশেষে বলা যায়, ‘ফুলের বিবাহ’ কেবল একটি রূপকথা নয়; বরং এটি একটি তীক্ষ্ণ সামাজিক ব্যঙ্গ সাহিত্য। কল্পনার মাধ্যমে বাস্তবতাকে বিচার করার এই অসাধারণ কৌশলের কারণেই গল্পটি আজো সার্থক।

    1 mins
    Right Menu Icon