• মহুয়া গল্প
  • মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর: HSC বাংলা সাহিত্য পাঠ

    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর HSC বাংলা সাহিত্য পাঠ

    প্রেমের অনবদ্য আখ্যান আর সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতার এক অনন্য দলিল— কবি দ্বিজ কানাইয়ের ‘মহুয়া’ পালা । একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য পাঠ্যসূচির এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি শিক্ষার্থীদের যেমন আবেগ তাড়িত করে, তেমনি পরীক্ষার খাতায় সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর করার ক্ষেত্রে গভীর ভাবনার খোরাক জোগায় । উচ্চমাধ্যমিক (HSC) পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে পূর্ণ নম্বর নিশ্চিত করতে উদ্দীপকের সাথে গল্পের মূলভাবের মেলবন্ধন ঘটানো অত্যন্ত জরুরি । শিক্ষার্থীদের সেই প্রস্তুতিকে আরও সহজ ও নিখুঁত করতে আজকের পোস্টে আমরা আলোচনা করেছি “মহুয়া গল্পের সেরা ১০টি সৃজনশীল প্রশ্ন ও তার পূর্ণাঙ্গ উত্তর” নিয়ে, যা পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেতে সরাসরি সাহায্য করবে ।

    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন – ১

    উদ্দীপক: সুমি ও আরিয়ানের ভালোবাসা দুই পরিবারের চরম শত্রুতার কারণে সমাজ মেনে নেয়নি। আরিয়ানের পরিবার সুমিকে মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং সুমিকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সুমি নিজের ভালোবাসার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে সব সামাজিক বাধা ও পারিবারিক চাপ উপেক্ষা করে আরিয়ানের হাত ধরে ঘর ছাড়ে।

    • (ক) ‘মহুয়া’ পালাটি প্রথম কে সম্পাদনা করেন?
    • (খ) হুমরা বাইদ্যা কেন উত্তর দেশে পালিয়ে গিয়েছিল? ব্যাখ্যা করো।
    • (গ) উদ্দীপকের সুমির সিদ্ধান্তের সাথে ‘মহুয়া’ পালার মহুয়ার চরিত্রের কোন দিকটির মিল রয়েছে? আলোচনা করো।
    • (ঘ) “উদ্দীপকটি ‘মহুয়া’ পালার সামগ্রিক সমাজচিত্র ও ট্র্যাজেডিকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি”— মন্তব্যটি মূল্যায়ন করো।

    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর – ১

    (ক) উত্তর: ‘মহুয়া’ পালাটি প্রথম ড. দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন ।

    (খ) উত্তর: যাযাবর বেদে বহরের প্রধান হুমরা বাইদ্যা যখন জানতে পারে যে তার পালিত কন্যা মহুয়ার সাথে বামনকান্দার জমিদার নদের চাঁদের গভীর প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তখন সে সামাজিক গোত্রীয় নিয়ম ও জাত-কুলের ভয়ে রাতের অন্ধকারে দলবলসহ উত্তর দেশে পালিয়ে গিয়েছিল।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের সুমির সিদ্ধান্তের সাথে ‘মহুয়া’ পালার কেন্দ্রীয় চরিত্র মহুয়ার একনিষ্ঠ প্রেম ও সাহসিকতার দিকটি সাদৃশ্যপূর্ণ।

    ‘মহুয়া’ পালায় আমরা দেখি, যাযাবর বেদে কন্যা মহুয়ার সাথে জমিদার নদের চাঁদের প্রেমকে সমাজ ও বেদে সর্দার হুমরা বাইদ্যা কোনোভাবেই মেনে নেয়নি। হুমরা বাইদ্যা সমাজ ও গোত্রের ভয়ে রাতের অন্ধকারে মহুয়াকে নিয়ে উত্তর দেশে পালিয়ে যায়। কিন্তু মহুয়া নদের চাঁদের ভালোবাসার প্রতি এতটাই বিশ্বস্ত ছিল যে, সে সমস্ত সামাজিক ভয় ও গোত্রীয় অনুশাসন উপেক্ষা করে নদের চাঁদের সাথে গভীর অরণ্যে পালিয়ে যায়।

    উদ্দীপকের সুমিও আরিয়ানের ভালোবাসার প্রতি একনিষ্ঠ থেকে পারিবারিক চাপ ও অন্যত্র বিয়ের সিদ্ধান্তকে অমান্য করে আরিয়ানের হাত ধরে ঘর ছেড়েছে। মহুয়াও ঠিক একইভাবে হুমরা বাইদ্যার কঠোর বাধা এবং সমাজের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে নদের চাঁদের হাত ধরেছিল। নিজের ভালোবাসাকে জয় করতে গিয়ে সমস্ত জাগতিক সুখ ও নিরাপত্তা বিসর্জন দেওয়ার এই যে সাহসী মানসিকতা, এখানেই সুমির সিদ্ধান্তের সাথে মহুয়ার চরিত্রের গভীর মিল লক্ষ্য করা যায়।

    (ঘ) উত্তর: “উদ্দীপকটি ‘মহুয়া’ পালার সামগ্রিক সমাজচিত্র ও ট্র্যাজেডিকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি”— মন্তব্যটি চিরন্তন সত্য ও যথার্থ।

    ‘মহুয়া’ পালাটি কেবল দুই তরুণ-তরুণীর ঘর ছাড়ার গল্প নয়, বরং এটি তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক সমাজের কঠোর জাতিভেদ প্রথা এবং যাযাবর বেদে সম্প্রদায়ের কঠোর গোত্রীয় নিয়মের এক বাস্তব দলিল। পালায় আমরা দেখি, একদিকে জমিদারির আভিজাত্যের দেয়াল, অন্যদিকে বেদেদের নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। কাহিনীর শেষ পরিণতিতে মহুয়াকে যখন নদের চাঁদকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন সে নিজের ভালোবাসার মর্যাদা রক্ষার্থে নিজের বুকেই ছুরি বসিয়ে দেয় এবং নদের চাঁদও সেই শোকে আত্মহত্যা করে। এই যে নির্মম সামাজিক বলিদান, এটাই পালার মূল ট্র্যাজেডি।

    উদ্দীপকের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে কেবল দুই পরিবারের শত্রুতা এবং সুমি ও আরিয়ানের ঘর ছাড়ার একটি সাধারণ ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এখানে সামন্ততান্ত্রিক সমাজের সেই উঁচু দেয়াল নেই, নেই যাযাবর জীবনের টানাপোড়েন কিংবা ভণ্ড সাধুর মতো লৌকিক খলনায়কদের চক্রান্ত। সবচেয়ে বড় কথা, উদ্দীপকে প্রেমের জন্য জীবনের চূড়ান্ত আত্মত্যাগ বা আত্মাহুতির মতো কোনো গভীর ট্র্যাজিক পরিণতি দেখানো হয়নি।

    তাই বলা যায়, উদ্দীপকটি পালার একটি খণ্ডিত অংশ প্রকাশ করলেও, ‘মহুয়া’ পালার যে বিশাল সামাজিক ক্যানভাস এবং এর যে মহিমান্বিত ও বেদনাবিধুর ট্র্যাজেডি, তাকে পুরোপুরি ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।


    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন – ২

    উদ্দীপক: জয়নাল সর্দার বেদে বহরের প্রধান। দলের নিয়ম ও নিজস্ব গোত্রীয় আভিজাত্য রক্ষায় সে অত্যন্ত কঠোর। দলের কেউ যদি বহরের বাইরের কারও সাথে সম্পর্ক তৈরি করে, তবে সে তাকে কঠোর শাস্তি দিতে দ্বিধা করে না। তার মতে, গোত্রের নিয়ম ভাঙার অর্থ হলো পুরো দলের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলা।

    • (ক) মহুয়ার আসল জন্মদাতা পিতা কে ছিলেন?
    • (খ) “সোনার বরণ কন্যা রে ডাগর চোখের চাওয়া”— চরণটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
    • (গ) উদ্দীপকের জয়নাল সর্দার ‘মহুয়া’ পালার কোন চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে? সাদৃশ্য দেখাও।
    • (ঘ) “হুমরা বাইদ্যার কঠোরতার পেছনে শুধু নিষ্ঠুরতা নয়, বরং গোত্রীয় নিয়ম রক্ষার দায়ও ছিল”— উদ্দীপক ও পালার আলোকে বিশ্লেষণ করো।

    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর – ২

    (ক) উত্তর: মহুয়ার আসল জন্মদাতা পিতা ছিলেন কাঞ্চনপুরের এক ব্রাহ্মণ।

    (খ) উত্তর: চরণটি দ্বারা নদী বা জলাশয়ের ঘাটে জল ভরতে আসা অপূর্ব সুন্দরী মহুয়ার দৈহিক সৌন্দর্য, স্নিগ্ধ রূপ এবং তার ডাগর চোখের আকর্ষণী ক্ষমতাকে বোঝানো হয়েছে।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের জয়নাল সর্দার ‘মহুয়া’ পালার বেদে বহরের প্রধান এবং খলনায়ক হুমরা বাইদ্যা চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে।

    ‘মহুয়া’ পালায় হুমরা বাইদ্যা হলো যাযাবর বেদে দলের সর্দার। সে মহুয়াকে সন্তানের মতো লালন-পালন করলেও তার ওপর গোত্রের নিয়ম ও কর্তৃত্ব ছিল অসীম। যখন সে জানতে পারে মহুয়া বহরের বাইরের একজন জমিদার পুত্রের প্রেমে পড়েছে, তখন সে গোত্রের জাত-কুল ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য চরম নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। সে মহুয়াকে নিয়ে পালিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে নদের চাঁদকে হত্যার জন্য মহুয়ার হাতেই বিষমাখানো ছুরি তুলে দেয়।

    উদ্দীপকের জয়নাল সর্দারও বেদে বহরের প্রধান, যে তার দলের নিয়ম ও গোত্রীয় আভিজাত্য রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর। দলের কেউ নিয়মের বাইরে গেলে তাকে শাস্তি দিতে সে দ্বিধা করে না। হুমরা বাইদ্যাও ঠিক এই মানসিকতারই মানুষ ছিল, যার কাছে গোত্রের নিয়মের চেয়ে বড় কিছু ছিল না। অতএব, নিয়মের দোহাই দিয়ে প্রেমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে জয়নাল সর্দার চরিত্রটি হুমরা বাইদ্যারই প্রতিচ্ছবি।

    (ঘ) উত্তর: “হুমরা বাইদ্যার কঠোরতার পেছনে শুধু নিষ্ঠুরতা নয়, বরং গোত্রীয় নিয়ম রক্ষার দায়ও ছিল”— উক্তিটি উদ্দীপক ও ‘মহুয়া’ পালার আলোকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং সত্য।

    সাধারণ দৃষ্টিতে হুমরা বাইদ্যাকে কেবলই একজন নিষ্ঠুর ও নির্দয় মানুষ মনে হতে পারে, যে দুজন প্রেমিকের জীবন ধ্বংস করেছে। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যাযাবর বেদেদের জীবন ও জীবিকা টিকে থাকে তাদের দলবদ্ধতার ওপর। তৎকালীন সামন্তবাদী সমাজে একজন শক্তিশালী জমিদারের ছেলের সাথে যাযাবর বেদে কন্যার প্রেম জানাজানি হলে পুরো বেদে সম্প্রদায়ের ওপর জমিদারের ক্রোধ নেমে আসতে পারত। হুমরা বুঝতে পেরেছিল, এই অসম প্রেম সমাজ কখনো মেনে নেবে না এবং এর ফলে তার পুরো গোত্র ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

    উদ্দীপকে জয়নাল সর্দারের জবানিতেও এই বাস্তবতাই উঠে এসেছে যে, “গোত্রের নিয়ম ভাঙার অর্থ হলো পুরো দলের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলা।” হুমরা বাইদ্যার মনের ভেতরেও ঠিক এই ভয়টিই কাজ করছিল। সে মহুয়াকে ভালোবাসত বলেই তাকে চুরি করে এনে নিজের মেয়ের মতো বড় করেছিল। কিন্তু যখনই গোত্র বনাম প্রেমের প্রশ্ন সামনে এসেছে, তখন সে সর্দার হিসেবে গোত্রকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। কাহিনীর শেষে মহুয়া ও নদের চাঁদের মৃত্যুর পর হুমরার যে তীব্র অনুশোচনা ও কান্না, তা প্রমাণ করে সে জন্মগতভাবে নিষ্ঠুর ছিল না; বরং পরিস্থিতির শিকার ও গোত্রীয় নিয়ম রক্ষার এক অসহায় দাস ছিল মাত্র।


    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন – ৩

    উদ্দীপক: এক সন্ন্যাসী গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে ধর্মের কথা বলে মুগ্ধ করত। কিন্তু আশ্রমে আসা এক রূপবতী তরুণীর প্রতি তার কুদৃষ্টি পড়ে। তরুণীটি যখন তার কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তখন সন্ন্যাসীটি তাকে জোরপূর্বক বন্দি করার চেষ্টা করে। কিন্তু তরুণীটি নিজের উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে সাধুকে অচেতন করে পালিয়ে যায়।

    • (ক) মহুয়াকে কত বছর বয়সে চুরি করা হয়েছিল?
    • (খ) নদের চাঁদ কেন তার জমিদারির সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করেছিল?
    • (গ) উদ্দীপকের ঘটনাটি ‘মহুয়া’ পালার কোন বিশেষ পর্বের কথা মনে করিয়ে দেয়? ব্যাখ্যা করো।
    • (ঘ) “মহুয়ার বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতা তাকে সাধারণ গ্রামীণ নারী থেকে অনন্য করে তুলেছে”— উদ্দীপকের আলোকে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর – ৩

    (ক) উত্তর: হুমরা বাইদ্যা মহুয়াকে ৬ বছর বয়সে চুরি করেছিল।

    আরও পড়ুন:  মহুয়া পালার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর: সাহিত্য পাঠ একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি

    (খ) উত্তর: যাযাবর বেদে কন্যা মহুয়ার বিরহে এবং তার প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসার টানেই নদের চাঁদ তার রাজকীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও জমিদারির মোহ ত্যাগ করেছিল।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের ঘটনাটি ‘মহুয়া’ পালার অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও গুরুত্বপূর্ণ “ভণ্ড সাধুর পর্ব”-এর সাথে সম্পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ।

    ‘মহুয়া’ পালায় হুমরা বাইদ্যার হাত থেকে বাঁচতে মহুয়া ও নদের চাঁদ যখন রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়, তখন পথিমধ্যে এক গভীর অরণ্যে তাদের সাথে এক সাধু বা সন্ন্যাসীর দেখা হয়। আপাতদৃষ্টিতে সাধুকে পরম ধার্মিক ও দয়ালু মনে হলেও, সে আসলে ছিল এক কামুক ভণ্ড। মহুয়ার অপূর্ব রূপ দেখে সে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং নদের চাঁদকে সরিয়ে মহুয়াকে জোরপূর্বক ভোগ ও বন্দি করার চক্রান্ত করে।

    উদ্দীপকের ঘটনাটিতেও আমরা একই চিত্র দেখি, যেখানে ধর্মের কথা বলে মানুষকে মুগ্ধ করা এক সন্ন্যাসী আশ্রমে আসা এক রূপবতী তরুণীর প্রতি কুদৃষ্টি দেয় এবং তাকে জোরপূর্বক বন্দি করার চেষ্টা করে। ‘মহুয়া’ পালার সেই সাধুও ধর্মের মুখোস পরে মহুয়ার পবিত্র প্রেমের ক্ষতি করতে চেয়েছিল। ফলে, ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে কামলালসা ও বলপ্রয়োগের এই ঘৃণ্য চেষ্টার কারণে উদ্দীপকের ঘটনাটি পালার উক্ত পর্বকে সরাসরি স্মরণ করিয়ে দেয়।

    (ঘ) উত্তর: “মহুয়ার বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতা তাকে সাধারণ গ্রামীণ নারী থেকে অনন্য করে তুলেছে”— উদ্দীপক ও ‘মহুয়া’ পালার আলোকে মন্তব্যটি শতভাগ যথার্থ।

    তৎকালীন গ্রামীণ সমাজে নারীদের সাধারণত অবলা, পরনির্ভরশীল এবং যেকোনো বিপদে অসহায় হিসেবে চিত্রিত করা হতো। কিন্তু দ্বিজ কানাইয়ের ‘মহুয়া’ পালার মহুয়া চরিত্রটি এই প্রথার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। সে শুধু প্রেমিকা হিসেবেই একনিষ্ঠ ছিল না, বিপদে তার উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসিকতা ছিল অবিশ্বাস্য। ভণ্ড সাধু যখন নদের চাঁদকে বন্দি করে মহুয়াকে গ্রাস করতে চাইল, তখন মহুয়া কান্নাকাটি বা আত্মসমর্পণ না করে চরম বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়।

    উদ্দীপকের তরুণীটি যেমন নিজের উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে সাধুকে অচেতন করে পালিয়ে যায়, ‘মহুয়া’ পালায় মহুয়াও ঠিক এই কাজটিই করেছিল। সে সাধুর সাথে ছলনা করে, তাকে প্রেমের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিষাক্ত পান তৈরি করে খাওয়ায়। সাধু যখন অচৈতন্য হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তখন মহুয়া কালবিলম্ব না করে নদের চাঁদকে মুক্ত করে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

    বিপদের মুখে এমন ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়া, শত্রুকে নিজের বুদ্ধিতে পরাস্ত করা এবং প্রেমিককে উদ্ধার করার এই যে বীরত্ব, তা তৎকালীন বা বর্তমান যেকোনো সাধারণ নারীর চেয়ে মহুয়াকে অনেক বেশি শক্তিশালী ও অনন্য চরিত্র হিসেবে ফুটিয়ে তোলে।


    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন – ৪

    উদ্দীপক: সামন্ততান্ত্রিক সমাজে জাত-পাত ও কুসংস্কারের দেয়াল এতটাই উঁচু যে, উচ্চবংশীয় তরুণের সাথে নিম্নবংশীয় বা যাযাবর কোনো কন্যার প্রেমকে সমাজ অপরাধ বলে গণ্য করে। এই সামাজিক ব্যবধানের বলি হতে হয় হাজারো প্রেমিক-প্রেমিকাকে, যাদের শেষ পরিণতি হয় অত্যন্ত করুণ ও বেদনাদায়ক।

    • (ক) ‘মহুয়া’ পালাটি কোন সংকলনের অন্তর্ভুক্ত?
    • (খ) “বিষমাখানো ছুরি” মহুয়া পালায় কিসের প্রতীক? ব্যাখ্যা করো।
    • (গ) উদ্দীপকে বর্ণিত সামন্ততান্ত্রিক সমাজের চিত্রটি ‘মহুয়া’ পালার সামাজিক প্রেক্ষাপটের সাথে কীভাবে সংগতিপূর্ণ?
    • (ঘ) “সামাজিক নিষ্ঠুরতাই মহুয়া ও নদের চাঁদের ট্র্যাজেডির মূল কারণ”— মন্তব্যটির যথার্থতা নিরূপণ করো।

    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর – ৪

    (ক) উত্তর: ‘মহুয়া’ পালাটি বিখ্যাত ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ সংকলনের অন্তর্ভুক্ত।

    (খ) উত্তর: “বিষমাখানো ছুরি” মহুয়া পালায় তৎকালীন নির্মম সামাজিক আদেশ, কঠোর গোত্রীয় নিয়ম এবং প্রেমের চরম ও নিষ্ঠুর অগ্নিপরীক্ষার প্রতীক।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকে বর্ণিত সামন্ততান্ত্রিক সমাজের জাত-পাত ও কুসংস্কারের দেয়াল ‘মহুয়া’ পালার রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজচিত্রের সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ।

    ‘মহুয়া’ পালার মূল দ্বন্দ্বটিই গড়ে উঠেছে তৎকালীন সামাজিক অসমতাকে কেন্দ্র করে। পালার নায়ক নদের চাঁদ হলো বামনকান্দার এক সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী জমিদারের পুত্র, আর নায়িকা মহুয়া হলো সমাজের চোখে এক অন্ত্যজ, যাযাবর বেদে কন্যা। তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় জমিদার বংশের আভিজাত্য আর যাযাবর শ্রেণীর লৌকিক জীবন—এই দুইয়ের ব্যবধান ছিল আকাশচুম্বী। সমাজ কোনোভাবেই একজন জমিদারের উত্তরাধিকারীর সাথে একজন বেদেনির মিলন মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।

    উদ্দীপকের সমাজচিত্রটিতেও ঠিক একই চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে উচ্চবংশীয় তরুণের সাথে নিম্নবংশীয় কন্যার প্রেমকে সমাজ অপরাধ বলে গণ্য করে এবং জাত-পাতের উঁচু দেয়াল দিয়ে তাদের আলাদা করে দেয়। ‘মহুয়া’ পালায়ও এই জাত-প্রথার কারণেই নদের চাঁদের পরিবার এবং বেদে সমাজ দুজনেই এই প্রেমের চরম বিরোধী ছিল। অতএব, প্রেমের ওপর সমাজের এই কৃত্রিম আভিজাত্যের দেয়াল চাপিয়ে দেওয়ার দিক থেকে উদ্দীপক ও পালার সমাজচিত্র এক ও অভিন্ন।

    (ঘ) উত্তর: “সামাজিক নিষ্ঠুরতাই মহুয়া ও নদের চাঁদের ট্র্যাজেডির মূল কারণ”— উদ্দীপক ও ‘মহুয়া’ পালার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে মন্তব্যটি অনস্বীকার্য এবং যথার্থ।

    ‘মহুয়া’ একটি খাঁটি লৌকিক ট্র্যাজেডি, যেখানে নায়ক-নায়িকার মৃত্যুর জন্য কোনো অলৌকিক ভাগ্য বা নিজেদের ভুল দায়ী ছিল না; বরং দায়ী ছিল তৎকালীন সমাজের অমানবিক ও নিষ্ঠুর নিয়ম। মহুয়া ও নদের চাঁদের প্রেম ছিল অত্যন্ত পবিত্র ও একনিষ্ঠ। তারা কোনো ধন-সম্পদ বা ক্ষমতার লোভ করেনি। নদের চাঁদ তার সমস্ত রাজকীয় সুখ ত্যাগ করেছিল, আর মহুয়া ত্যাগ করেছিল তার নিশ্চিত জীবনের নিরাপত্তা।

    উদ্দীপকে বলা হয়েছে, সামাজিক ব্যবধানের বলি হতে হয় হাজারো প্রেমিক-প্রমিকাকে, যাদের শেষ পরিণতি হয় অত্যন্ত করুণ। পালায় আমরা দেখি, সমাজ ও গোত্রের এই নিষ্ঠুরতার কারণে তারা বনে জঙ্গলে পালিয়েও শান্তি পায়নি। হুমরা বাইদ্যার শিকারী দল তাদের খুঁজে বের করে এবং মহুয়াকে আদেশ দেয় নদের চাঁদকে হত্যা করতে। সমাজ ও গোত্রের এই পৈশাচিক আদেশের মুখোমুখি হয়ে মহুয়া নিজেকে শেষ করে দেয় এবং নদের চাঁদও তার বুকে প্রাণ হারায়।


    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন – ৫

    উদ্দীপক: রফিক একজন জমিদারের পুত্র হয়েও অহংকারহীন। সে গ্রামের সাধারণ মানুষের সাথে মেশে। একদিন নদীর ঘাটে এক সাধারণ মেয়ের সরল রূপ দেখে সে মুগ্ধ হয় এবং নিজের বংশমর্যাদার কথা ভুলে তাকে নিজের জীবনসঙ্গী করার সিদ্ধান্ত নেয়।

    • (ক) নদের চাঁদ কোন গ্রামের অধিবাসী ছিল?
    • (খ) মহুয়া নদের চাঁদকে হত্যার নির্দেশ পেয়েও কেন তা করতে পারেনি?
    • (গ) উদ্দীপকের রফিকের সাথে ‘মহুয়া’ পালার নায়ক নদের চাঁদের চরিত্রের বৈসাদৃশ্য ও সাদৃশ্যগুলো তুলে ধরো।
    • (ঘ) “নদের চাঁদের প্রেম ছিল আত্মত্যাগী ও আভিজাত্যের ঊর্ধ্বে”— উদ্দীপক ও পাঠ্যবইয়ের আলোকে উক্তিটি প্রমাণ করো।

    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর – ৫

    (ক) উত্তর: নদের চাঁদ বামনকান্দা গ্রামের অধিবাসী ছিল।

    (খ) উত্তর: হুমরা বাইদ্যা নদের চাঁদকে হত্যার জন্য মহুয়ার হাতে বিষমাখানো ছুরি তুলে দিলেও, নদের চাঁদের প্রতি গভীর ও অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে মহুয়া তাকে আঘাত করতে পারেনি।

    (গ) উত্তর (পদ্ধতি): উদ্দীপকের রফিকের সাথে ‘মহুয়া’ পালার নায়ক নদের চাঁদের আভিজাত্যহীন ও একনিষ্ঠ প্রেমের ক্ষেত্রে গভীর সাদৃশ্য থাকলেও পরিস্থিতির দিক থেকে বৈসাদৃশ্য রয়েছে।

    সাদৃশ্যগত দিক: উদ্দীপকের রফিক একজন জমিদারের পুত্র হয়েও অহংকারী নয় এবং নদীর ঘাটে দেখা হওয়া এক সাধারণ মেয়ের রূপ ও সরলতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে জীবনসঙ্গী করতে চায়। ‘মহুয়া’ পালার নদের চাঁদও বামনকান্দার জমিদারের পুত্র হওয়া সত্ত্বেও আভিজাত্যের অহংকার ছুড়ে ফেলে জল ভরার ঘাটে দেখা হওয়া যাযাবর বেদে কন্যা মহুয়ার প্রেমে পড়েছিল এবং তাকেই নিজের জীবনের ধ্রুবতারা বানিয়েছিল।

    বৈসাদৃশ্যগত দিক: উদ্দীপকের রফিক নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার বা চেষ্টা করার একটি সহজ ক্ষেত্র পেয়েছে। কিন্তু নদের চাঁদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি জটিল ও প্রতিকূল। নদের চাঁদকে তার প্রেমের মূল্য দিতে গিয়ে নিজের মা, বাড়ি ও রাজ্য ছেড়ে বনে জঙ্গলে যাযাবর হতে হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত বেদেদের নিষ্ঠুর সামাজিক আদেশের মুখোমুখি হয়ে মৃত্যুকে বরণ করতে হয়েছিল, যা রফিকের জীবনে ঘটেনি।

    (ঘ) উত্তর (পদ্ধতি): “নদের চাঁদের প্রেম ছিল আত্মত্যাগী ও আভিজাত্যের ঊর্ধ্বে”— উদ্দীপক ও পাঠ্যবইয়ের আলোকে উক্তিটি সম্পূর্ণ ধ্রুব সত্য।

    সত্যিকারের প্রেম যে কোনো সামাজিক পদবি, ধন-সম্পদ কিংবা বংশের আভিজাত্যের তোয়াক্কা করে না, নদের চাঁদ চরিত্রটি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। একজন জমিদারের একমাত্র পুত্র হিসেবে তার জীবন কাটার কথা ছিল পরম বিলাসিতা ও রাজকীয় সুখে। কিন্তু মহুয়ার ডাগর চোখের চাহনি আর সরল প্রেমের টানে সে তার সমস্ত বৈভবকে এক পলকে তুচ্ছ করে দেয়।

    পালায় আমরা দেখি, মহুয়াকে যখন তার দল নিয়ে হুমরা বাইদ্যা উত্তর দেশে পালিয়ে যায়, তখন নদের চাঁদ রাজপ্রাসাদে বসে থাকেনি। সে সুউচ্চ জমিদারির অহংকার ভুলে সাধারণ মানুষের মতো পায়ে হেঁটে, বনে-জঙ্গলে, চেনা-অচেনা দেশে মহুয়াকে খুঁজতে বের হয়। সে তার বৃদ্ধা মায়ের কান্না, নিজের ভবিষ্যৎ—সব কিছু বিসর্জন দিয়ে যাযাবর জীবন বেছে নেয়। এমনকি বনের কুটিরে যখন তারা একসাথে ছিল, তখনো জমিদারের কোনো অহংকার তার মধ্যে ছিল না।

    কাহিনীর শেষ মুহূর্তেও যখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তখনও সে মহুয়াকে ত্যাগ করার কথা ভাবেনি। প্রেমের জন্য নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার এই যে মানসিকতা, তা প্রমাণ করে নদের চাঁদের প্রেম কোনো ক্ষণিকের মোহ ছিল না, তা ছিল আভিজাত্যের ঊর্ধ্বে এক অবিনশ্বর আত্মত্যাগ।


    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন – ৬

    উদ্দীপক: নদীমাতৃক বাংলার গ্রামীণ জীবনের জলপথ, হাওর ও প্রান্তর জুড়ে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল নানা রূপকথা ও গাথা। এই গাথাগুলোতে রাজা-বাদশার কাহিনীর চেয়ে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, লৌকিক প্রেম এবং বিরহের চিত্রই বেশি ফুটে উঠত, যা মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিত।

    • (ক) ‘মহুয়া’ পালার রচয়িতা কে?
    • (খ) গীতিকা সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী? সংক্ষেপে লেখো।
    • (গ) উদ্দীপকে লোকসাহিত্যের যে রূপ ফুটে উঠেছে, তার সাথে ‘মহুয়া’ পালার আঙ্গিকগত সম্পর্ক আলোচনা করো।
    • (ঘ) “‘মহুয়া’ পালা লৌকিক জীবনের সহজ-সরল প্রেম ও ক্যাথারসিসের এক অনন্য উদাহরণ”— উদ্দীপকের আলোকে বিশ্লেষণ করো।
    আরও পড়ুন:  মহুয়া পালার মূল বিষয়বস্তু ও মূলভাব: সাহিত্য পাঠ একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি

    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর – ৬

    (ক) উত্তর: ‘মহুয়া’ পালার রচয়িতা কবি দ্বিজ কানাই।

    (খ) উত্তর: গীতিকা সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এটি কোনো কাগজে লেখা থাকত না, বরং সাধারণ মানুষের মুখে মুখে গীত হয়ে বা গেয়ে গেয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকত এবং এতে সাধারণ মানুষের লৌকিক জীবনের কাহিনী প্রাধান্য পেত।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকে লোকসাহিত্যের যে মৌখিক ও লৌকিক রূপের কথা বলা হয়েছে, তার সাথে ‘মহুয়া’ পালার আঙ্গিকগত ও রূপতাত্ত্বিক সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়।

    ‘মহুয়া’ পালাটি হলো বিখ্যাত ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ লোকগাথা। গীতিকা বা ব্যালাড (Ballad)-এর মূল বৈশিষ্ট্যই হলো—এটি কোনো রাজদরবারের পণ্ডিতদের দ্বারা লিখিত জটিল সাহিত্য নয়, বরং গ্রামীণ চারণ কবিদের মুখে মুখে তৈরি হওয়া এবং সাধারণ মানুষের গেয়ে গেয়ে বাঁচিয়ে রাখা সাহিত্য। এই পালার ভাষা, উপমা এবং বর্ণনারীতি খাঁটি ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ও লৌকিক রূপকে ধারণ করে আছে।

    উদ্দীপকে ঠিক এই কথাটিই বলা হয়েছে যে, নদীমাতৃক বাংলার গ্রামীণ জীবনের জলপথ ও প্রান্তর জুড়ে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল নানা গাথা, যেখানে রাজা-বাদশার চেয়ে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও বিরহের চিত্র ফুটে উঠত। ‘মহুয়া’ পালায়ও কবি দ্বিজ কানাই কোনো কাল্পনিক দেবী বা রাজার যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনা দেননি, বরং ঘাটের জল ভরা, বেদেদের খেলা দেখানো এবং দুটি সাধারণ হৃদয়ের লৌকিক প্রেমের গান গেয়েছেন। তাই আঙ্গিকের দিক থেকে উদ্দীপকের লোকগাথার ধারণাই হলো ‘মহুয়া’ পালার মূল ভিত্তি।

    (ঘ) উত্তর: “‘মহুয়া’ পালা লৌকিক জীবনের সহজ-সরল প্রেম ও ক্যাথারসিসের এক অনন্য উদাহরণ”— মন্তব্যটি উদ্দীপক ও পালার রস আস্বাদনের আলোকে সম্পূর্ণ যথার্থ।

    ‘ক্যাথারসিস’ (Catharsis) হলো এমন একটি সাহিত্যিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো করুণ বা ট্র্যাজিক কাহিনীর শেষ পরিণতি দেখে পাঠকের মনের ভয়, দুঃখ ও করুণা উথলে ওঠে এবং এক ধরণের আত্মিক পরিশুদ্ধি ঘটে। ‘মহুয়া’ পালাটি পড়ার পর প্রতিটি পাঠকের হৃদয়ে ঠিক এই অনুভূতিটিই জাগ্রত হয়।

    পালায় কবি দ্বিজ কানাই অত্যন্ত সহজ ও সরল ভাষায় মহুয়া ও নদের চাঁদের প্রেমের সূচনা করেছেন। কংস নদীর ঘাটে জল ভরার দৃশ্য বা বেদেদের বাঁশের খেলার মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের যে স্নিগ্ধ রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা যেমন সহজ, তেমনি সুন্দর। কিন্তু কাহিনীর অগ্রগতির সাথে সাথে যখন সমাজ ও গোত্রের নিষ্ঠুরতা এই সরল প্রেমকে গ্রাস করে নেয়, তখন কাহিনীর মোড় বদলে যায়।

    শেষ দৃশ্যে যখন মহুয়া নিজের বুকেই বিষমাখানো ছুরিটি বসিয়ে দেয় এবং নদের চাঁদও তার মৃতদেহের ওপর আছড়ে পড়ে প্রাণ হারায়, তখন পাঠকের চোখ অশ্রুসিক্ত না হয়ে পারে না। এই যে সাধারণ মানুষের লৌকিক প্রেমের এমন করুণ পরিণতি দেখে পাঠকের মনে গভীর বেদনার সৃষ্টি হওয়া—এটাই হলো নিখুঁত ক্যাথারসিস। উদ্দীপকের সুর ধরেই বলা যায়, ‘মহুয়া’ পালাটি তার সহজ লৌকিক আবেদন এবং গভীর ট্র্যাজিক সমাপ্তির কারণেই বাংলা লোকসাহিত্যের এক অমর ও কালজয়ী সৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে।


    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন – ৭

    উদ্দীপক: লতিফ ও সালমা গভীর অরণ্যে এক কুটির বেঁধে সংসার শুরু করে। তারা সমাজ ও পরিবারের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজেদের মতো সুখে শান্তিতে দিন কাটাচ্ছিল। কিন্তু তাদের এই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। একদিন সালমার ক্ষুব্ধ ভাই দলবল নিয়ে তাদের আস্তানায় চড়াও হয় এবং লতিফকে আক্রমণ করে।

    • (ক) বেদে দলের পুরুষরা শিকারের জন্য কোন পাখি ব্যবহার করত?
    • (খ) হুমরা বাইদ্যা শেষ মুহূর্তে কেন তীব্র অনুশোচনায় ভুগেছিল?
    • (গ) উদ্দীপকের কুটিরের জীবন ‘মহুয়া’ পালার কোন অংশের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ? বর্ণনা করো।
    • (ঘ) “উভয় ক্ষেত্রেই প্রকৃতির কোলে আশ্রিত প্রেমকে সমাজের হিংস্র রূপটি ধ্বংস করে দিয়েছে”— মন্তব্যটি মূল্যায়ন করো।

    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর – ৭

    (ক) উত্তর: বেদে দলের পুরুষরা শিকারের জন্য বাজ পাখি ব্যবহার করত।

    (খ) উত্তর: মহুয়া ও নদের চাঁদের পবিত্র প্রেমের গভীরতা এবং নিজের আদেশের কারণে তাদের দুজনের এমন নির্মম ও করুণ পরিণতি দেখে হুমরা বাইদ্যা শেষ মুহূর্তে তীব্র মানবিক অনুশোচনায় ভুগেছিল।

    (গ) উত্তর (পদ্ধতি): উদ্দীপকের লতিফ ও সালমার অরণ্যের কুটিরের জীবন ‘মহুয়া’ পালার “গভীর বনের পাতা কুটিরের আশ্রয় পর্ব”-এর সাথে সম্পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ।

    ‘মহুয়া’ পালায় ভণ্ড সাধুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পর মহুয়া ও নদের চাঁদ সমাজের সমস্ত কোলাহল এবং ভয় থেকে দূরে এক গভীর অরণ্যে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা নিজেদের হাতে একটি পাতার কুটির বা ঘর তৈরি করে। গাছপালার ফলমূল এবং প্রকৃতির শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে তারা সমস্ত সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে কিছুদিনের জন্য পরম সুখে ও শান্তিতে সংসার শুরু করেছিল। তাদের সেই দিনগুলো ছিল ভয়হীন এবং অনাবিল আনন্দে ভরা।

    উদ্দীপকের লতিফ ও সালমাও ঠিক একইভাবে সমাজ ও পরিবারের চোখ ফাঁকি দিয়ে গভীর অরণ্যে কুটির বেঁধে নিজেদের মতো সুখে-শান্তিতে দিন কাটাচ্ছিল। উভয় কাহিনীর প্রেমিক-প্রেমিকাই সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রকৃতির কোলে নিজেদের একটি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিল। ফলে, অরণ্যের বুকে গড়ে ওঠা এই সাময়িক স্বর্গের চিত্রটি ‘মহুয়া’ পালার উক্ত অংশের সাথে হুবহু মিলে যায়।

    (ঘ) উত্তর: “উভয় ক্ষেত্রেই প্রকৃতির কোলে আশ্রিত প্রেমকে সমাজের হিংস্র রূপটি ধ্বংস করে দিয়েছে”— উদ্দীপক ও ‘মহুয়া’ পালার প্রেক্ষিতে মন্তব্যটি অত্যন্ত সত্য এবং গভীর অর্থবহ।

    প্রকৃতি সবসময়ই প্রেমিক হৃদয়ের জন্য উদার ও নিরাপদ, কিন্তু মানুষের তৈরি সমাজ ও তার নিয়ম সবসময়ই নিষ্ঠুর ও আক্রমণাত্মক। ‘মহুয়া’ পালা এবং উদ্দীপক—উভয় গল্পেই আমরা দেখি, প্রেমিক-প্রেমিকারা যখন সমাজ থেকে পালিয়ে বনের নির্জনতায় আশ্রয় নেয়, প্রকৃতি তাদের ফিরিয়ে দেয়নি। বনের গাছপালা, নদী ও শান্ত পরিবেশ তাদের ভালোবেসেছিল এবং আশ্রয় দিয়েছিল।

    কিন্তু সমাজের হিংস্র চোখ তাদের সেই শান্ত আশ্রয়টুকুকেও সহ্য করতে পারেনি। উদ্দীপকে যেমন সালমার ক্ষুব্ধ ভাই দলবল নিয়ে তাদের বনের আস্তানায় চড়াও হয় এবং লতিফকে আক্রমণ করে, ঠিক তেমনি ‘মহুয়া’ পালায়ও হুমরা বাইদ্যার শিকারী দল বনের সেই পাতা কুটিরে হানা দেয়। তারা ঘুমন্ত নদের চাঁদ ও মহুয়াকে বন্দি করে এবং তাদের সেই সাজানো সুখের স্বর্গকে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দেয়।

    সমাজ তার তৈরি জাত-পাত এবং গোত্রীয় অহংকারকে এতটাই উচ্চে রাখে যে, বনের গভীরে লুকিয়ে থাকা দুটি মানুষের সাধারণ সুখকেও সে ক্ষমা করে না। বনের কুটিরের সেই পবিত্র শান্ত পরিবেশকে কলঙ্কিত করে সমাজের এই যে হিংস্র আক্রমণ এবং শেষ পর্যন্ত প্রেমকে রক্তাক্ত করা—এই নির্মম বাস্তবতার দিক থেকে উদ্দীপক ও ‘মহুয়া’ পালার পরিণতি একই সূত্রে গাঁথা।


    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন – ৮

    উদ্দীপক: মীনাক্ষী তার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেনি। শত্রুরা যখন তার স্বামীকে মারতে আসে, তখন সে নিজের বুক পেতে দেয়। মীনাক্ষীর এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, সত্যিকারের ভালোবাসার কাছে মৃত্যুর ভয় কতটা তুচ্ছ।

    • (ক) মহুয়া জল ভরতে কোন ঘাটে যেত?
    • (খ) নদের চাঁদের মা কেন পুত্রশোকে অন্ধপ্রায় হয়েছিলেন?
    • (গ) উদ্দীপকের মীনাক্ষীর আত্মত্যাগ ‘মহুয়া’ পালার মূল চরিত্রের কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে স্মরণ করায়?
    • (ঘ) “মহুয়া শাশ্বত ও পবিত্র প্রেমের এক অবিনশ্বর প্রতীক”— উদ্দীপক ও পালার আলোকে মহুয়ার শেষ পরিণতির গুরুত্ব আলোচনা করো।

    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর – ৮

    (ক) উত্তর: মহুয়া জল ভরতে কংস নদীর ঘাটে (বামনকান্দার ঘাট) যেত।

    (খ) উত্তর: একমাত্র পুত্র নদের চাঁদ যাযাবর বেদে কন্যার টানে ঘর ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পর, তার কোনো খোঁজ না পেয়ে মা পুত্রশোকে কেঁদে কেঁদে অন্ধপ্রায় হয়েছিলেন।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের মীনাক্ষীর আত্মত্যাগ ‘মহুয়া’ পালার চূড়ান্ত পরিণতি পর্বে মহুয়ার নিজের বুকে বিষমাখানো ছুরি বসিয়ে আত্মাহুতি দেওয়ার মহান সিদ্ধান্তকে স্মরণ করায়।

    ‘মহুয়া’ পালার শেষ দৃশ্যে আমরা দেখি, হুমরা বাইদ্যা নদের চাঁদকে হত্যার জন্য মহুয়ার হাতে একটি বিষমাখানো ছুরি তুলে দেয় এবং আদেশ করে তাকে হত্যা করতে। মহুয়ার সামনে তখন দুটি পথ ছিল—হয় গোত্রের আদেশ মেনে নিজের প্রেমিককে হত্যা করা, না হয় নিজে মরে প্রেমের পবিত্রতা রক্ষা করা। মহুয়া এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে নিজের ভালোবাসার মর্যাদা রক্ষার্থে সেই বিষাক্ত ছুরিটি নিজের বুকেই চালিয়ে দেয়।

    উদ্দীপকের মীনাক্ষীও ঠিক একইভাবে তার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য শত্রুদের সামনে নিজের বুক পেতে দিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে। মীনাক্ষী যেমন ভালোবাসার মানুষের জীবনের জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ করেছে, মহুয়াও ঠিক তেমনি নদের চাঁদের জীবন রক্ষা ও নিজের প্রেমের পবিত্রতা বজায় রাখতে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। অতএব, ভালোবাসার মানুষের জন্য নিজের প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার এই চূড়ান্ত আত্মত্যাগের দিক থেকে মহুয়ার সিদ্ধান্তের সাথে মীনাক্ষীর কাজের গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।

    (ঘ) উত্তর: “মহুয়া শাশ্বত ও পবিত্র প্রেমের এক অবিনশ্বর প্রতীক”— উদ্দীপক ও পালার আলোকে মন্তব্যটি সম্পূর্ণ যথার্থ এবং অনস্বীকার্য।

    আরও পড়ুন:  মহুয়া দ্বিজ কানাই: HSC বাংলা সাহিত্য পাঠ একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি

    জগতে প্রেম আসে মানুষের জীবনে এক পরম আশীর্বাদ হয়ে, আর সেই প্রেম যখন মৃত্যুর চেয়েও শক্তিশালী রূপ ধারণ করে, তখন তা শাশ্বত হয়ে ওঠে। ‘মহুয়া’ পালার মহুয়া চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যে সেই অমর ও পবিত্র প্রেমেরই এক অনন্য প্রতিমূর্তি। সে কোনো সাধারণ রাজকুমারী ছিল না, কিন্তু তার হৃদয়ের গভীরতা ছিল যেকোনো মহাকাব্যের নায়িকার চেয়েও বিশাল।

    উদ্দীপকের মীনাক্ষীর মতো মহুয়ার এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, সত্যিকারের ভালোবাসার কাছে মৃত্যুর ভয় কতটা তুচ্ছ। হুমরা বাইদ্যা ভেবেছিল ছুরি দিয়ে সে নদের চাঁদকে শেষ করবে এবং মহুয়াকে গোত্রের নিয়মে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু মহুয়া তার নিজের বুকের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করে দিল যে, দেহকে বন্দি করা গেলেও আত্মাকে কখনো গোত্রের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। সে নদের চাঁদের গায়ে একটি আঁচড়ও লাগতে দেয়নি, বরং নিজের জীবন দিয়ে নদের চাঁদের প্রতি তার ভালোবাসাকে চিরকালের জন্য অমর করে গেছে।

    মহুয়ার এই আত্মাহুতি কেবল একটি আত্মহত্যা নয়, এটি ছিল তৎকালীন নিষ্ঠুর ও রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার মুখে এক চরম চড়। মৃত্যুর মাধ্যমে সে তার প্রেমকে কলঙ্কমুক্ত ও পবিত্র রেখেছে। তাই উদ্দীপকের সুরের সাথে একাত্ম হয়ে বলা যায়, যুগের পর যুগ ধরে মহুয়ার এই আত্মত্যাগের কাহিনী মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে এবং সে শাশ্বত ও পবিত্র প্রেমের এক অবিনশ্বর প্রতীক হিসেবেই বন্দিত হবে।


    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন – ৯

    উদ্দীপক: একটি যাযাবর সার্কাস দল বছরের নির্দিষ্ট সময়ে গ্রামে এসে তাঁবু খাটাত। তাদের শারীরিক কসরত, দড়ির খেলা এবং নাচ-গান দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত। গ্রামের জমিদারেরা তাদের পুরস্কৃত করতেন এবং এই খেলা ছিল তৎকালীন গ্রামীণ বিনোদনের প্রধান অনুষঙ্গ।

    • (ক) বেদে বহরে মহুয়া প্রধানত কী কাজ শিখে বড় হয়?
    • (খ) হুমরা বাইদ্যা কেন নদের চাঁদের সাথে মহুয়ার বিয়ে দিতে চাননি?
    • (গ) উদ্দীপকে বর্ণিত বিনোদনের চিত্রটি ‘মহুয়া’ পালার সূচনা পর্বের পরিবেশকে কীভাবে ফুটিয়ে তোলে?
    • (ঘ) “এই লৌকিক উৎসবের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল মহুয়া ও নদের চাঁদের প্রথম দেখার ঐতিহাসিক মুহূর্ত”— মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর – ৯

    (ক) উত্তর: বেদে বহরে মহুয়া প্রধানত শারীরিক কসরত ও দড়ির খেলা শিখে বড় হয়।

    (খ) উত্তর: নদের চাঁদ সম্ভ্রান্ত জমিদার বংশের ছেলে হওয়ায় এবং বেদে সমাজের নিজস্ব গোত্রীয় কঠোর নিয়মের কারণে হুমরা বাইদ্যা তাদের বিয়ে দিতে চাননি।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকে বর্ণিত যাযাবর দলের খেলা ও গ্রামীণ বিনোদনের চিত্রটি ‘মহুয়া’ পালার সূচনা পর্বের আনন্দঘন পরিবেশকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।

    ‘মহুয়া’ পালার একদম শুরুতে আমরা দেখি, যাযাবর বেদে বহরের প্রধান হুমরা বাইদ্যা তার দলবল এবং পালিত কন্যা মহুয়াকে নিয়ে বামনকান্দা গ্রামে এসে উপস্থিত হয়। তাদের প্রধান জীবিকাই ছিল গ্রামে গ্রামে ঘুরে শারীরিক কসরত, জাদুর খেলা ও দড়ির খেলা দেখানো। গ্রামের এক বিশাল প্রান্তরে বাঁশ পুঁতে, দড়ি বেঁধে মহুয়া যখন শূন্যে হেঁটে চমৎকার খেলা দেখাত, তখন সেই লৌকিক মেলা বা বিনোদন দেখার জন্য পুরো গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়ত।

    উদ্দীপকের সার্কাস দলটির চিত্রও ঠিক একই রকম, যারা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে গ্রামে এসে তাঁবু খাটাত এবং যাদের খেলা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত এবং জমিদারেরা তাদের পুরস্কৃত করতেন। ‘মহুয়া’ পালায়ও জমিদার পুত্র নদের চাঁদ বেদেদের এই খেলা দেখতে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাদের প্রচুর টাকা ও শাল কাপড় পুরস্কার দিয়েছিলেন। অতএব, তৎকালীন বাংলার গ্রামীণ বিনোদন ও লৌকিক মেলার এই আবহ তৈরির ক্ষেত্রে উদ্দীপকটি পালার সূচনা পর্বের হুবহু প্রতিফলন।

    (ঘ) উত্তর: “এই লৌকিক উৎসবের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল মহুয়া ও নদের চাঁদের প্রথম দেখার ঐতিহাসিক মুহূর্ত”— মন্তব্যটি উদ্দীপক ও পালার কাহিনীর সূত্রপাতের আলোকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং যথার্থ।

    যেকোনো বড় ট্র্যাজেডি বা মহাকাব্যিক কাহিনীর পেছনে একটি সাধারণ কিন্তু ঐতিহাসিক শুরুর প্রয়োজন হয়। ‘মহুয়া’ পালার ক্ষেত্রে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি এসেছিল এই লৌকিক খেলার উৎসবের হাত ধরেই। যদি হুমরা বাইদ্যার বেদে দলটি বামনকান্দা গ্রামে খেলা দেখাতে না আসত, তবে জমিদার পুত্র নদের চাঁদের সাথে যাযাবর কন্যা মহুয়ার কোনোদিন দেখাই হতো না।

    উদ্দীপকে যেভাবে বিনোদনের জন্য মানুষের ছুটে আসা এবং জমিদারের পুরস্কৃত করার কথা বলা হয়েছে, পালার মূল জটটি ঠিক সেখানেই লেগেছিল। নদের চাঁদ যখন দর্শকদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে মহুয়ার দড়ির ওপর হাঁটার শারীরিক কসরত এবং তার অপূর্ব রূপ দেখছিল, তখন সে কেবল খেলাই দেখেনি, বরং নিজের মনটি মহুয়ার কাছে হারিয়ে ফেলেছিল। এই খেলার সূত্র ধরেই নদের চাঁদ বেদে দলকে পুরস্কৃত করে এবং পরবর্তীতে কংস নদীর ঘাটে মহুয়ার সাথে তার দ্বিতীয়বার দেখা হয়, যা তাদের গভীর প্রেমের দিকে নিয়ে যায়।

    তাই বলা যায়, উপরিতল থেকে এটিকে কেবল একটি সাধারণ গ্রামীণ মেলা বা সার্কাসের মতো বিনোদন মনে হলেও, এই উৎসবের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল দুটি ভিন্ন জগতের মানুষের এক হওয়ার প্রথম বীজ। এই লৌকিক উৎসবই মহুয়া ও নদের চাঁদের অবিনশ্বর ও ট্র্যাজিক প্রেমের পটভূমি তৈরি করেছিল, যা পুরো কাহিনীকে এক অনিবার্য পরিণতির দিকে চালিত করে।


    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন – ১০

    উদ্দীপক: সমাজ সংস্কারক রহমান সাহেব বলেন, “আমাদের প্রাচীন সমাজে ধর্মের নামে ভণ্ডামি এবং কঠোর জাতিভেদ প্রথা মানুষের স্বাভাবিক অধিকারকে হরণ করত। বিশেষ করে নারীদের নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ছিল না, তাদের পুরুষতান্ত্রিক ও গোত্রীয় নিয়মের অধীন হয়েই বাঁচতে হতো।”

    • (ক) দ্বিজ কানাই কোন যুগের কবি ছিলেন?
    • (খ) ময়মনসিংহ গীতিকা কোন আন্তর্জাতিক সংস্থায় সমাদৃত হয়েছে এবং কেন?
    • (গ) উদ্দীপকের রহমান সাহেবের বক্তব্যের সাথে ‘মহুয়া’ পালার সমাজচিত্রের যে মিল পাওয়া যায়, তা ব্যাখ্যা করো।
    • (ঘ) “‘মহুয়া’ পালা কেবল একটি প্রেমের গল্প নয়, বরং তৎকালীন রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজের এক বাস্তব দলিল”— উদ্দীপকের আলোকে উক্তিটির যথার্থতা নিরূপণ করো।

    মহুয়া গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর – ১০

    (ক) উত্তর: দ্বিজ কানাই মধ্যযুগের কবি ছিলেন।

    (খ) উত্তর: ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ তার অনন্য সাহিত্যিক মূল্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বিশ্ব লোকসাহিত্যে বাঙালি সংস্কৃতির গৌরবময় নিদর্শনের কারণে ইউনেস্কো (UNESCO) ও বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনে সমাদৃত হয়েছে।

    (গ) উত্তর: উদ্দীপকের রহমান সাহেবের বক্তব্যের সাথে ‘মহুয়া’ পালায় বর্ণিত তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক ও রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজের অন্ধকার দিকগুলোর গভীর মিল রয়েছে।

    ‘মহুয়া’ পালাটি কেবল একটি প্রেমের গল্প নয়, এটি তৎকালীন সমাজবাস্তবতার এক নিখুঁত আয়না। রহমান সাহেব তাঁর বক্তব্যে তিনটি প্রধান সমস্যার কথা বলেছেন: ধর্মের নামে ভণ্ডামি, কঠোর জাতিভেদ প্রথা এবং নারীর স্বাধীন ইচ্ছার অভাব। ‘মহুয়া’ পালার দিকে তাকালে আমরা এই তিনটি বিষয়েরই স্পষ্ট উপস্থিতি দেখতে পাই।

    প্রথমত, পালায় ভণ্ড সাধুর চরিত্রটি ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও নৈতিক স্খলনের চরম উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, জমিদার বংশের সাথে যাযাবর বেদে কন্যার প্রেমকে সমাজ ও গোত্র যেভাবে অপরাধ হিসেবে দেখেছে, তা কঠোর জাতিভেদ প্রথারই রূপ। তৃতীয়ত, মহুয়াকে হুমরা বাইদ্যা নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করেছে, সমাজ তাকে নিজের ভালোবাসার মানুষকে বেছে নেওয়ার অধিকার দেয়নি; যা রহমান সাহেবের বলা “নারীদের পুরুষতান্ত্রিক ও গোত্রীয় নিয়মের অধীন হয়ে বাঁচা”-র কথাকেই প্রমাণ করে। অতএব, উদ্দীপকের সমাজ বিশ্লেষণটি পালার সমাজচিত্রের সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ।

    (ঘ) উত্তর: ‘”‘মহুয়া’ পালা কেবল একটি প্রেমের গল্প নয়, বরং তৎকালীন রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজের এক বাস্তব দলিল”— উদ্দীপক ও পালার সামগ্রিক মূল্যায়নে উক্তিটি অনস্বীকার্যভাবে যথার্থ।

    সাধারণ পাঠক হয়তো ‘মহুয়া’ পালাকে কেবল মহুয়া ও নদের চাঁদের বিরহ ও মৃত্যুর একটি রোমান্টিক গল্প হিসেবেই দেখেন। কিন্তু একজন সমাজতাত্ত্বিক বা সাহিত্য সমালোচকের দৃষ্টিতে এটি মধ্যযুগীয় বাংলার গ্রামীণ সমাজের এক জীবন্ত ঐতিহাসিক দলিল, যা উদ্দীপকের রহমান সাহেবের বক্তব্যের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়েছে।

    দ্বিজ কানাই এই পালায় কোনো কাল্পনিক স্বর্গের গল্প বলেননি। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সামন্ততান্ত্রিক জমিদারি প্রথা সাধারণ মানুষের ওপর অবদমন চালাত। নদের চাঁদের মা যখন যাযাবর মেয়ের কথা শুনে কেঁদে আকুল হন, তখন সেখানে প্রকাশ পায় উচ্চবংশের আভিজাত্যের অহংকার। আবার অন্যদিকে, বেদে সম্প্রদায়ের ভেতরকার গোত্রীয় অন্ধত্ব ও সর্দারের নির্মম শাসন দেখায় যে, নিম্নবর্গের সমাজও কতটা রক্ষণশীল ছিল।

    সবচেয়ে বড় কথা, নারীর কোনো নিজস্ব সত্ত্বা বা অধিকার সমাজ স্বীকার করত না। মহুয়াকে শৈশবে চুরি করা থেকে শুরু করে, তাকে উপার্জনের হাতিয়ার বানানো এবং শেষ পর্যন্ত তাকে খুনি হতে বাধ্য করার যে চেষ্টা—তা গ্রামীণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিষ্ঠুর রূপটিকেই উন্মোচিত করে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় লেবাসধারী সাধুদের ভণ্ডামি।

    প্রেমের এই করুণ বলিদানের মাধ্যমেই কবি আসলে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি অমানবিক সমাজব্যবস্থা দুটি পবিত্র প্রাণকে পিষে মেরে ফেলে। তাই বলা যায়, প্রেম এখানে মূল সুর হলেও, এর পটভূমিতে থাকা রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজের এই নিখুঁত ও বাস্তব চিত্রায়ণের কারণেই ‘মহুয়া’ পালাটি তৎকালীন বাংলার এক অনন্য সামাজিক দলিল হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।


    পরিশেষে বলা যায়, ‘মহুয়া’ পালা কেবল অতীত গ্রামীণ সমাজের একটি প্রেমের উপাখ্যান নয়, বরং এটি শাশ্বত মানব-মানবীর আবেগ ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ । পরীক্ষার খাতায় এই অধ্যায়ের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় কেবল কাহিনীর ওপর ভাসমান ধারণা থাকলে চলে না, বরং এর ভেতরের সামাজিক শোষণ ও মনস্তাত্ত্বিক রূপটি ফুটিয়ে তুলতে হয়। আশা করি, আজকের এই পোস্টে সংকলিত ১০টি সৃজনশীল প্রশ্ন ও তাদের মানসম্মত উত্তর তোমাদের এইচএসসি (HSC) পরীক্ষার প্রস্তুতিকে এক ধাপ এগিয়ে দেবে । দ্বিজ কানাইয়ের এই অমর সৃষ্টিকে হৃদয়ে ধারণ করে পরীক্ষার খাতায় তোমরা তোমাদের সর্বোচ্চ মেধার স্বাক্ষর রাখবে—এই শুভকামনা রইল ।

    Admin

    Moner Rong (মনের রঙ) একটি সৃজনশীল বাংলা ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম, যেখানে আমরা জীবনবোধ, সাহিত্য এবং ভ্রমণের মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা করি । আমাদের পাঠকদের জন্য আমরা নিয়মিত মৌলিক কবিতা, হৃদয়স্পর্শী গল্প, জীবনমুখী মোটিভেশনাল আর্টিকেল এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের নিখুঁত ট্রাভেল গাইড শেয়ার করি । মানসম্মত কন্টেন্ট এবং সঠিক তথ্যের মাধ্যমে পাঠকদের মনের খোরাক জোগানোই আমাদের মূল লক্ষ্য । আপনি যদি সাহিত্যপ্রেমী হন বা নতুন কোনো ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তবে 'মনের রঙ' হতে পারে আপনার প্রতিদিনের সঙ্গী । আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।"
    1 mins

    Share with

    Right Menu Icon