• ভ্রমণ গাইড
  • সাফারি পার্ক
  • গাজীপুর সাফারি পার্ক ভ্রমণ গাইড ২০২৬: টিকেট মূল্য ও যাতায়াত

    সাফারি পার্ক গাজীপুর

    সাফারি পার্ক গাজীপুর

    গাজীপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের মোট আয়তন প্রায় ৩,৯০৮ একর (প্রায় ১,৫৮২ হেক্টর) । এটি আয়তনের দিক থেকে এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফারি পার্ক । সাধারণ চিড়িয়াখানায় আমরা প্রাণীদের খাঁচায় বন্দি দেখি, কিন্তু সাফারি পার্কে চিত্রটা সম্পূর্ণ উল্টো । এখানে প্রাণীরা থাকে উন্মুক্ত, আর মানুষ থাকে সুরক্ষিত খাঁচাবন্দি গাড়িতে । প্রকৃতির কোলে বন্যপ্রাণীদের আদিম জীবনযাত্রা দেখার জন্য সাফারি পার্কের চেয়ে দারুণ জায়গা আর হয় না ।

    সাফারি পার্কের মূল বৈশিষ্ট্য

    • মুক্ত বিচরণ: এখানে বাঘ, সিংহ, হরিণ বা জেব্রার মতো প্রাণীরা বিশাল এলাকা জুড়ে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে।
    • প্রাকৃতিক পরিবেশ: প্রাণীদের কৃত্রিম আবাসের বদলে তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের (জঙ্গল বা তৃণভূমি) মতো করে পার্কটি সাজানো হয়।
    • শিক্ষা ও গবেষণা: বিনোদনের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং তাদের জীবনচক্র নিয়ে গবেষণার জন্য সাফারি পার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

    কেন সাফারি পার্ক ভ্রমণ করবেন?

    ১. অ্যাডভেঞ্চার ও রোমাঞ্চ: খোলা জায়গায় বাঘ বা সিংহের গর্জন শোনা এবং তাদের গাড়ির খুব কাছ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা এক অন্যরকম শিহরণ তৈরি করে। ২. ফটোগ্রাফি: বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রীদের জন্য এটি একটি স্বর্গরাজ্য। এখানে কৃত্রিমতা ছাড়াই প্রাণীদের স্বাভাবিক ভঙ্গি ক্যামেরাবন্দি করা যায়। ৩. পারিবারিক বিনোদন: শিশুদের বন্যপ্রাণী সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দিতে এটি সেরা জায়গা।


    গাজীপুর সাফারি পার্ক কোথায় অবস্থিত

    গাজীপুর সাফারি পার্ক (আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক) গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নে অবস্থিত । এটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাঘের বাজার থেকে ৩ কিমি পশ্চিমে সাফারি পার্ক রোডে অবস্থিত ।

    আপনার সুবিধার্থে পার্কটির অবস্থান এবং যোগাযোগের তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

    • ঠিকানা: ১৩৪০ সাফারি পার্ক রোড, শ্রীপুর, গাজীপুর।
    • অবস্থান: ঢাকা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪০ কিমি এবং গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে প্রায় ২০ কিমি উত্তরে।
    • অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: safariparkgazipur.info.bd
    • ফোন নম্বর: +৮৮০ ১৮৪২-৪৩৪৪০১

    ভ্রমণের সময় মনে রাখুন: পার্কটি সাধারণত মঙ্গলবার বন্ধ থাকে (তবে বিশেষ ছুটির দিনে খোলা থাকতে পারে)। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে সকাল ৯:০০ টা থেকে বিকাল ৫:০০ টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।


    ঢাকা থেকে গাজীপুর সাফারি পার্ক কিভাবে যাব

    ঢাকা থেকে গাজীপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে যাওয়ার জন্য যাতায়াত ব্যবস্থা বেশ সহজ। আপনি বাস বা নিজস্ব গাড়ি—উভয় মাধ্যমেই যেতে পারেন। নিচে বিস্তারিত রুট দেওয়া হলো:

    ১. বাসে করে যাওয়ার উপায় (সবচেয়ে সহজ)

    ঢাকা থেকে যাওয়ার জন্য আপনাকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী বাসে উঠতে হবে।

    • কোথা থেকে উঠবেন: মহাখালী বাস টার্মিনাল, আব্দুল্লাহপুর বা উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকা থেকে বাসে ওঠা সুবিধাজনক।
    • কোন বাসে উঠবেন: ময়মনসিংহ বা শ্রীপুরগামী যেকোনো ভালো মানের বাসে উঠতে পারেন (যেমন: এনা ট্রান্সপোর্ট, সৌখিন পরিবহন, রাজদূত ইত্যাদি)। এছাড়া ঢাকা-গাজীপুর রুটে চলাচলকারী ‘প্রভাতী-বনশ্রী’ বা ‘গাজীপুর পরিবহন’ দিয়েও যাওয়া যায়।
    • কোথায় নামবেন: বাসের হেল্পারকে আগেই বলে রাখবেন যেন আপনাকে ‘বাঘের বাজার’ নামিয়ে দেয়। গাজীপুর চৌরাস্তা পার হয়ে আরও কিছুটা উত্তরে গেলে এই বাজারটি পড়ে।
    • বাঘের বাজার থেকে পার্ক: বাস থেকে নামার পর রাস্তার পশ্চিম পাশে দেখবেন সাফারি পার্কের বড় সাইনবোর্ড। সেখান থেকে অটোরিকশা বা লেগুনায় করে ৩ কিলোমিটার ভেতরে পার্কে পৌঁছাতে পারবেন। (জনপ্রতি ভাড়া ২০-৩০ টাকা, আর রিজার্ভ নিলে ৮০-১০০ টাকা)।

    ২. নিজস্ব গাড়ি বা মাইক্রোবাসে

    যদি নিজস্ব গাড়ি নিয়ে যান, তবে সরাসরি গুগল ম্যাপ অনুসরণ করে চলে যেতে পারেন।

    • রুট: ঢাকা -> উত্তরা -> আব্দুল্লাহপুর -> গাজীপুর চৌরাস্তা -> রাজেন্দ্রপুর -> বাঘের বাজার -> বাম দিকে মোড় নিয়ে ৩ কিমি ভেতরে সাফারি পার্ক।
    • সময়: যানজট না থাকলে ২ ঘণ্টার মতো সময় লাগতে পারে। তবে গাজীপুর চৌরাস্তা এবং টঙ্গী এলাকায় প্রায়ই জ্যাম থাকে, তাই হাতে সময় নিয়ে বের হওয়া ভালো।

    ৩. ট্রেন যোগে

    ট্রেনে যেতে চাইলে আপনাকে ঢাকার কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে গাজীপুরের শ্রীপুর বা জয়দেবপুর স্টেশনে নামতে হবে। তবে ট্রেন থেকে নেমে আবার বাসে বা সিএনজিতে করে বাঘের বাজার আসতে হয়, যা কিছুটা ঝামেলার হতে পারে। তাই বাসে যাওয়াই সবচেয়ে আরামদায়ক।

    কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য:

    • পার্ক খোলার সময়: সকাল ৯:০০ টা থেকে বিকেল ৫:০০ টা পর্যন্ত।
    • বন্ধের দিন: সাধারণত প্রতি মঙ্গলবার পার্ক বন্ধ থাকে।

    টিপস: দ্রুত পৌঁছাতে চাইলে সকাল ৭টার মধ্যে ঢাকা থেকে রওনা দেওয়া সবচেয়ে ভালো । এতে যানজট এড়িয়ে অনেকটা সময় পার্কে কাটানো যায় ।


    সাফারি পার্কের ধরণ

    সাফারি পার্ক সাধারণত কয়েক ধরণের হয়ে থাকে:

    আরও পড়ুন:  কুয়াকাটা ভ্রমণ গাইড | সুন্দরবন ও সমুদ্রের মিতালী

    ১. কোর সাফারি

    গাজীপুর সাফারি পার্কের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং প্রধান আকর্ষণ হলো কোর সাফারি (Core Safari) । কোর সাফারির আয়তন প্রায় ১৩৩৫ একর । এটি এমন একটি এলাকা যেখানে বন্যপ্রাণীরা বিশাল বনভূমিতে সম্পূর্ণ মুক্ত অবস্থায় বিচরণ করে এবং দর্শনার্থীরা সুরক্ষিত গাড়িতে বসে তাদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান ।

    কোর সাফারির প্রধান জোনসমূহ

    কোর সাফারিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীরা তাদের নিজস্ব পরিবেশে থাকতে পারে:

    • টাইগার জোন: এখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারদের প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
    • লায়ন জোন: সিংহের বিশাল এলাকা যেখানে সিংহ পরিবারকে রোদ পোহাতে বা ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
    • বিয়ার জোন: এখানে এশীয় কালো ভাল্লুকদের দেখা মেলে।
    • হরিণ ও জেব্রা জোন: এখানে শত শত চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, জেব্রা এবং সাম্বার হরিণ দল বেঁধে ঘাস খায়।
    • জিরাফ জোন: লম্বা ঘাড়ের জিরাফদের উঁকিঝুঁকি দেখতে পর্যটকরা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন।

    ভ্রমণের মাধ্যম (সাফারি বাস)

    কোর সাফারিতে আপনি পায়ে হেঁটে প্রবেশ করতে পারবেন না। আপনাকে পার্ক কর্তৃপক্ষের বিশেষ এসি বাসে উঠতে হবে।

    • বাসের ধরণ: বাসগুলো লোহার নেট দিয়ে সুরক্ষিত থাকে যাতে বন্যপ্রাণী কোনো ক্ষতি করতে না পারে।
    • সময়: একটি বাস সাধারণত ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় নিয়ে পুরো কোর সাফারি এলাকাটি ঘুরিয়ে দেখায়।

    টিকেট মূল্য ও সময়সূচী

    • প্রাপ্তবয়স্ক: ১০০ টাকা।
    • অপ্রাপ্তবয়স্ক/ছাত্র: ৫০ টাকা।
    • সময়: সকাল ১০:০০ টা থেকে বিকেল ৪:৩০ টা পর্যন্ত টিকিট পাওয়া যায়। (তবে ভিড় থাকলে অনেক সময় টিকিট আগে শেষ হয়ে যায়)।

    দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ টিপস

    • সেরা ভিউ: বাসে ওঠার পর জানালার পাশের সিট দখল করার চেষ্টা করুন, এতে প্রাণীদের ছবি তোলা সহজ হবে।
    • সকাল বনাম বিকেল: দুপুরের কড়া রোদে অনেক সময় বাঘ-সিংহ ঝোপের আড়ালে ঘুমিয়ে থাকে। তাই সকাল ১০টা থেকে ১১টা অথবা বিকেল ৩টার পর কোর সাফারি করা ভালো।
    • নিরাপত্তা: বাসের ভেতরে থাকাকালীন কোনোভাবেই জানালার কাঁচ বা নেট দিয়ে হাত বাইরে বের করবেন না।
    • রেস্টুরেন্ট: কোর সাফারির পাশেই টাইগার ও লায়ন রেস্টুরেন্ট আছে। সেখানে দুপুরের খাবার খেতে খেতে কাঁচের দেয়ালের ওপাশে বাঘ বা সিংহ দেখা যায়, যা এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

    মনে রাখবেন: কোর সাফারির ভেতরে বন্যপ্রাণীদের উচ্চস্বরে চিৎকার করে ডাকা বা বাসের জানালায় আঘাত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ । এতে প্রাণীরা আতঙ্কিত বা রাগান্বিত হতে পারে ।


    ২. সাফারি কিংডম

    গাজীপুর সাফারি পার্কের অন্যতম জনপ্রিয় এবং বৈচিত্র্যময় অংশ হলো সাফারি কিংডম (Safari Kingdom)। এটি মূলত পার্কের প্রবেশ পথের কাছাকাছি অবস্থিত এবং এটি প্রায় ৫৭৫ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।

    কোর সাফারিতে যেমন আপনি গাড়িতে বসে প্রাণী দেখেন, সাফারি কিংডমে আপনি পায়ে হেঁটে বিভিন্ন খাঁচা ও ঘেরা টোপের মধ্যে থাকা দেশি-বিদেশি পশুপাখি দেখার সুযোগ পাবেন।

    সাফারি কিংডমের প্রধান আকর্ষণগুলো নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

    • প্যারট এভিয়ারি (পাখি জোন): এটি অনেক পর্যটকের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। এখানে বিশাল একটি নেটের ঘেরাওয়ের ভেতর কয়েকশ প্রজাতির রঙিন তোতা বা প্যারট রাখা হয়েছে। আপনি এই নেটের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পাখিগুলো আপনার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে আফ্রিকান গ্রে প্যারট, ম্যাকাউ, এবং বিভিন্ন লরিকেট।
    • ম্যাকাউ ল্যান্ড: এখানে দক্ষিণ আমেরিকার রঙিন ও বিশাল ম্যাকাউ পাখি দেখা যায়। এদের গায়ের উজ্জ্বল লাল, নীল ও হলুদ রঙ সবাইকে মুগ্ধ করে।
    • মেরিন অ্যাকুরিয়াম: সাফারি কিংডমের ভেতরেই আছে বিশাল এক আধুনিক অ্যাকুরিয়াম। এখানে শত শত প্রজাতির রঙিন মাছ এবং জলজ প্রাণী রয়েছে। সাগরের নিচে হাঁটার অনুভূতি পেতে এটি দারুণ একটি জায়গা।
    • প্রজাপতি বাগান (Butterfly Garden): অসংখ্য প্রজাতির রঙিন প্রজাপতি এখানে ফুলের ওপর উড়ে বেড়ায়। এটি মূলত একটি কৃত্রিম বাগান যেখানে প্রজাপতির জীবনচক্র সম্পর্কেও জানা যায়।
    • অর্কিড হাউজ ও ফেন্সড এনিমেলস: ১) অর্কিড হাউজ: এখানে বিরল ও সুন্দর সব অর্কিডের সমারোহ রয়েছে । ২) ফেন্সড এনিমেলস: পায়ে হাঁটা পথের পাশে ঘেরাও করা জায়গায় ক্যাঙ্গারু, উটপাখি, ইমু, মান্দারিন হাঁস এবং নানা ধরণের বিদেশি প্রাণী দেখা যায়।
    • টাইগার ও লায়ন রেস্টুরেন্ট: সাফারি কিংডমের ঠিক পাশেই এই দুটি বিশেষ রেস্টুরেন্ট অবস্থিত। এই রেস্টুরেন্টগুলোর বিশেষত্ব হলো, আপনি বড় কাঁচের দেয়ালের পাশে বসে দুপুরের খাবার খাবেন, আর ওপাশে বাঘ বা সিংহ ঘুরে বেড়াবে।
    আরও পড়ুন:  কুসুম্বা মসজিদ: ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ তথ্য

    খরচ ও সময়:

    • টিকিট: সাফারি কিংডমের ভেতরে প্রতিটি আলাদা পয়েন্টে (যেমন: অ্যাকুরিয়াম বা বার্ড পার্ক) ঢোকার জন্য ১০ থেকে ২০ টাকার আলাদা টিকিট কাটতে হয়।
    • পরিবেশ: এই এলাকাটি অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং হাঁটার জন্য সুন্দর রাস্তা রয়েছে। পরিবার ও শিশুদের নিয়ে সময় কাটানোর জন্য এটি পার্কের সেরা অংশ।

    টিপস: সাফারি কিংডমের ভেতরে অনেক সুন্দর সুন্দর স্পট আছে ছবি তোলার জন্য। তাই ক্যামেরা বা ফোনের চার্জ পর্যাপ্ত আছে কি না তা আগেভাগেই নিশ্চিত করে নিন!


    ৩. বায়োডাইভার্সিটি পার্ক

    গাজীপুর সাফারি পার্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে শান্তিময় অংশ হলো বায়োডাইভার্সিটি পার্ক (Biodiversity Park)। এটি মূলত জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং গবেষণার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

    এই অংশটি প্রায় ৮২০ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। কোর সাফারিতে যেমন রোমাঞ্চ থাকে, বায়োডাইভার্সিটি পার্কে থাকে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা এবং শিক্ষার সুযোগ।

    বায়োডাইভার্সিটি পার্কের প্রধান আকর্ষণসমূহ:

    • বিরল ও ঔষধি উদ্ভিদের সংগ্রহ: এখানে বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় এবং বিরল প্রজাতির দেশীয় গাছপালা সংরক্ষণ করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরণের ভেষজ বা ঔষধি গাছের বাগান এখানে দেখা যায়, যা উদ্ভিদবিদ্যার শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল গবেষণাগার।
    • অর্কিড হাউজ (Orchid House): এখানে দেশি-বিদেশি অসংখ্য প্রজাতির রঙিন ও বিরল অর্কিড চাষ ও প্রদর্শন করা হয়। এটি পার্কের অন্যতম সুন্দর একটি অংশ যেখানে পর্যটকরা ছবি তুলতে পছন্দ করেন।
    • ক্যাকটাস হাউজ (Cactus House): মরুভূমির বিভিন্ন আকৃতি ও প্রজাতির ক্যাকটাস এখানে বিশেষ পরিবেশে রাখা হয়েছে। ক্যাকটাসের এই বৈচিত্র্য সচরাচর অন্য কোথাও দেখা যায় না।
    • ভলচার কনজারভেশন সেন্টার (শকুন সংরক্ষণ কেন্দ্র): পরিবেশের পরম বন্ধু শকুন বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়। এই পার্কে শকুনদের বংশবৃদ্ধির জন্য একটি বিশেষ সংরক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রাণিবিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
    • প্রজাপতি বাগান (Butterfly Garden): যদিও এটি সাফারি কিংডমের কাছাকাছি, তবে এটি বায়োডাইভার্সিটি পার্কেরই একটি অংশ। এখানে প্রজাপতির প্রজনন এবং তাদের জীবনচক্র নিয়ে কাজ করা হয়।

    কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

    • পরিবেশের ভারসাম্য: এই অংশটি মূলত বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
    • শিক্ষা ও গবেষণা: স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের জন্য এটি একটি সমৃদ্ধ ক্ষেত্র। এখানে গাছের নাম ও প্রজাতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ফলক দেওয়া থাকে।
    • শান্ত পরিবেশ: কোর সাফারির হইচই থেকে দূরে একটু নিরিবিলি সময় কাটাতে চাইলে এই এলাকাটি সেরা।

    দর্শনার্থীদের জন্য টিপস: ১) আপনি যদি গাছপালা বা বাগান পছন্দ করেন, তবে এখানে অন্তত ১ ঘণ্টা সময় বরাদ্দ রাখুন । ২) এখানে হাঁটার সময় গাছের পাতা ছেঁড়া বা বাগানের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ । ৩)সাথে একটি নোটবুক রাখতে পারেন যদি আপনি বিভিন্ন বিরল গাছের নাম ও গুণাগুণ লিখে রাখতে চান।


    ৪. এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি

    গাজীপুর সাফারি পার্কের সবচেয়ে বড় এবং প্রাকৃতিক জোন হলো এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি (Extensive Asian Safari)। এটি প্রায় ১,০৬৯ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।

    নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে, এখানে মূলত এশীয় অঞ্চলের বন্যপ্রাণীদের তাদের আদি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে লালন-পালন করা হয়। এই জোনটি তৈরি করা হয়েছে এমনভাবে যাতে প্রাণীরা মনে করে তারা তাদের চিরচেনা বনের ভেতরেই আছে।

    এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারির মূল আকর্ষণসমূহ:

    • হাতি সাফারি (Elephant Safari): এই জোনের প্রধান আকর্ষণ হলো বিশালাকার এশীয় হাতি। এখানে হাতিদের জন্য বিশাল চারণভূমি ও গোসলের জন্য জলাশয় রয়েছে। দর্শনার্থীরা দূর থেকে হাতিদের দলবেঁধে বিচরণ ও খেলাধুলা দেখতে পারেন।
    • তৃণভোজী প্রাণীদের বিশাল চারণভূমি: এখানে এশিয়ার বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ (যেমন: চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, সাম্বার), নীলগাই এবং বুনো মহিষ মুক্ত অবস্থায় থাকে। এই বিশাল তৃণভূমি এলাকাটি তাদের প্রজনন ও অবাধ বিচরণের জন্য আদর্শ।
    • জলহস্তী ও জলজ প্রাণী: এই জোনের জলাশয়গুলোতে জলহস্তীদের (Hippopotamus) পানি নিয়ে খেলা করতে বা রোদ পোহাতে দেখা যায়। এছাড়া নানা ধরণের জলজ পাখির আনাগোনাও এখানে লক্ষণীয়।
    • বিরল নীলগাই সংরক্ষণ: বাংলাদেশে এক সময় নীলগাই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এই জোনে উদ্ধারকৃত নীলগাইদের সংরক্ষণ এবং বংশবৃদ্ধির বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা পরিবেশবিদদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    কেন এই জোনটি আলাদা?

    • সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক: কোর সাফারিতে যেমন বাঘ-সিংহকে নির্দিষ্ট বাউন্ডারিতে রাখা হয়, এখানে প্রাণীরা অনেক বেশি জায়গা পায় এবং মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে।
    • পর্যবেক্ষণ টাওয়ার: এই জোনের প্রাণীদের দেখার জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার বা ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। সেখান থেকে দূরবীন দিয়ে বনের গভীরে প্রাণীদের গতিবিধি দেখা যায়।
    • শান্ত ও নিরিবিলি: সাফারি কিংডমের তুলনায় এই এলাকাটি অনেক বেশি শান্ত। যারা একদম বন্য পরিবেশ পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি সেরা জায়গা।

    দর্শনার্থীদের জন্য পরামর্শ: ১) দূরবীন সাথে রাখুন: এই জোনটি অনেক বড় হওয়ায় প্রাণীরা অনেক সময় দূরে থাকে। তাই সাথে একটি বাইনোকুলার বা দূরবীন থাকলে খুব ভালো হয় । ২) ইজি-বাইক ব্যবহার: যেহেতু এটি ১০৬৯ একরের বিশাল এলাকা, তাই পায়ে হেঁটে ঘোরা বেশ কষ্টসাধ্য । পার্কের ভেতর যে ছোট ইজি-বাইকগুলো চলে, সেগুলোতে করে এই জোনটি ঘুরে দেখা সুবিধাজনক । ৩)সময়: বিকেলে এই জোনে প্রাণীদের বেশি দেখা যায় কারণ তারা রোদের তেজ কমলে জলাশয়ের ধারে বা খোলা জায়গায় আসে ।


    ৫. লেক জোন

    গাজীপুর সাফারি পার্কের সবচেয়ে প্রশান্তিময় এবং সুন্দর এলাকা হলো লেক জোন (Lake Zone)। এটি প্রায় ১০৯ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। কৃত্রিমভাবে তৈরি হলেও এই লেকটি এখন বন্যপ্রাণী এবং পরিযায়ী পাখিদের এক নিরাপদ আবাসে পরিণত হয়েছে।

    আরও পড়ুন:  উত্তরা গণভবন: নাটোরের রাজকীয় ইতিহাস ও পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ গাইড ২০২৬

    সাফারি পার্কের হইচই আর রোমাঞ্চের মাঝে একটু শান্তির নিঃশ্বাস নিতে এই লেক জোনের তুলনা হয় না।

    লেক জোনের প্রধান আকর্ষণসমূহ:

    • পরিযায়ী পাখির মেলা (Migratory Birds): শীতকালে (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) এই লেক জোন এক অপরূপ রূপ ধারণ করে। সাইবেরিয়া এবং হিমালয়ের উত্তরাঞ্চল থেকে হাজার হাজার অতিথি পাখি এখানে আসে। লেকের জলে তাদের জলকেলি এবং কিচিরমিচির শব্দ পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
    • বোট রাইডিং বা নৌকা ভ্রমণ: দর্শনার্থীদের জন্য লেকের স্বচ্ছ পানিতে নৌকায় চড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। নৌকায় করে লেকের মাঝখান দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় চারপাশের ঘন সবুজ বন এবং দূর থেকে বন্যপ্রাণীদের পানি খেতে আসার দৃশ্য দেখা যায়।
    • ওয়াচ টাওয়ার (Observation Tower): লেকের পাড়ে একটি উচুঁ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার রয়েছে। এখান থেকে পুরো লেক এবং আশেপাশের এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারির বিশাল এলাকা একসাথে দেখা যায়। বিশেষ করে ফটোগ্রাফারদের জন্য এটি সেরা পয়েন্ট।
    • বিশ্রাম ও পিকনিক স্পট: লেকের চারপাশে বসার জন্য বেঞ্চ এবং ছায়াযুক্ত স্থান রয়েছে। দীর্ঘ পথ হাঁটার পর পর্যটকরা এখানে বসে বিশ্রাম নেন এবং লেকের শীতল বাতাস উপভোগ করেন।

    দর্শনার্থীদের জন্য কিছু তথ্য:

    • টিকিট: লেক জোনে প্রবেশের জন্য আলাদা টিকিটের প্রয়োজন হয় না (মূল প্রবেশ মূল্যেই অন্তর্ভুক্ত), তবে বোট রাইডিং করতে চাইলে জনপ্রতি সামান্য ফি দিতে হয়।
    • সেরা সময়: আপনি যদি পাখি দেখতে চান, তবে অবশ্যই ভোরবেলা বা খুব সকালে অথবা সূর্যাস্তের আগে এখানে সময় কাটান। শীতকাল হলো লেক জোনের আসল সৌন্দর্য দেখার সেরা সময়।
    • ফটোগ্রাফি: লেকের স্থির পানিতে গাছের প্রতিফলন এবং পাখিদের ওড়াউড়ির ছবি তোলার জন্য এটি একটি স্বর্গরাজ্য। তাই সাথে ভালো ক্যামেরা রাখতে ভুলবেন না।

    সতর্কতা: লেকের পানিতে কোনো ধরণের খাবার বা প্লাস্টিক ফেলবেন না, কারণ এটি পাখিদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।


    এক নজরে সাফারি পার্কের ৫টি জোন:

    জোনমূল আকর্ষণ
    কোর সাফারিবাঘ, সিংহ, ভাল্লুক (গাড়িতে ভ্রমণ)
    সাফারি কিংডমপাখি, অ্যাকুরিয়াম, রেস্টুরেন্ট (পায়ে হেঁটে)
    বায়োডাইভার্সিটি পার্কবিরল গাছপালা, অর্কিড, ক্যাকটাস
    এশিয়ান সাফারিহাতি, নীলগাই, বুনো মহিষ
    লেক জোননৌকা ভ্রমণ, অতিথি পাখি, ওয়াচ টাওয়ার

    সাফারি পার্ক টিকিট মূল্য

    গাজীপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের টিকিটের মূল্য সাধারণত নির্ধারিত থাকে, তবে সময়ভেদে বা বিশেষ দিনে এটি সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে । ২০২৫ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী একটি সাধারণ ধারণা নিচে দেওয়া হলো:

    প্রবেশ মূল্য

    ক্যাটাগরিপ্রবেশ মূল্য
    প্রাপ্তবয়স্ক (দেশি পর্যটক)৫০ টাকা
    অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছরের নিচে)২০ টাকা
    ছাত্র-ছাত্রী (পরিচয়পত্র দেখিয়ে)১০ টাকা
    বিদেশি পর্যটক৫ মার্কিন ডলার (বা সমপরিমাণ টাকা)

    সাফারি পার্ক বিভিন্ন রাইডের টিকিট ফ্রী

    আকর্ষণের নামপ্রবেশ মূল্য
    ম্যাকাউ পার্ক১০ টাকা
    মেরিন অ্যাকুরিয়াম২০ টাকা
    প্যারট এভিয়ারি১০ টাকা
    প্রকৃতি বীক্ষণ কেন্দ্র১০ টাকা
    ক্রোকোডাইল পার্ক১০ টাকা
    প্রজাপতি বাগান১০ টাকা

    সাফারি পার্ক পার্কিং ফি (যদি নিজস্ব গাড়ি থাকে)

    যানবাহনের ধরনপার্কিং চার্জ
    বাস / কোচ২০০ টাকা
    মাইক্রোবাস / মিনিবাস১০০ টাকা
    কার / জিপ৬০ টাকা
    অটোরিকশা / মোটরসাইকেল২০ টাকা

    সাফারি পার্ক গাজীপুর সাপ্তাহিক বন্ধ

    বিষয়তথ্য
    সাপ্তাহিক বন্ধমঙ্গলবার

    কাছাকাছি দর্শনীয় স্থানসমূহ

    ক্রমিক নংদর্শনীয় স্থান
    ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান
    নুহাশ পল্লী
    ড্রিম স্কয়ার রিসোর্ট
    সারা রিসোর্ট
    জল ও জঙ্গল
    ভাওয়াল রাজবাড়ী
    শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ি
    বেলাই বিল

    পরিশেষে, গাজীপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক কেবল একটি বিনোদন কেন্দ্র নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার এক অনন্য মাইলফলক । ইটের শহরের যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে এবং প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থেকে বাঘ, সিংহ কিংবা হাতিদের আদিম জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ করতে এটি দেশের সেরা গন্তব্য ।

    এখানে একদিকে যেমন রয়েছে কোর সাফারির রোমাঞ্চ, অন্যদিকে লেক জোন বা বায়োডাইভার্সিটি পার্কের শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ । পরিবার নিয়ে একদিনের ভ্রমণে আনন্দ আর শিক্ষার এক চমৎকার সমন্বয় ঘটে এই পার্কে । তবে এই বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব । ভ্রমণের সময় প্লাস্টিক বর্জ্য না ফেলে এবং বন্যপ্রাণীদের বিরক্ত না করে আমরা যেমন নিজেদের ভ্রমণকে স্মরণীয় করতে পারি, তেমনি প্রকৃতিকেও রাখতে পারি নিরাপদ ।

    তাই আর দেরি না করে, প্রকৃতির ডাক শুনতে এবং বন্যপ্রাণীর সান্নিধ্যে একটি রোমাঞ্চকর দিন কাটাতে ঘুরে আসতে পারেন এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই সাফারি পার্ক থেকে ।

    1 mins
    Right Menu Icon