সারজিস আলম: তারুণ্যের এক নতুন কণ্ঠস্বর
বর্তমান বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সারজিস আলম একটি অত্যন্ত পরিচিত ও প্রভাবশালী নাম । বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় থেকে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে সাহসের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের অন্যতম সমন্বয়ক হয়ে ওঠার এই যাত্রাটি মোটেও সহজ ছিল না । কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নয়, বরং সাধারণ ছাত্রদের অধিকার আদায় এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার যে লড়াই তিনি শুরু করেছেন, তা আজ দেশের কোটি তরুণের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা । আজ আমরা আলোচনা করবো সারজিস আলমের সেই আপসহীন নেতৃত্ব এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে তার ভূমিকা নিয়ে ।
সারজিস আলমের জন্ম
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক সারজিস আলম পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলায় ২ জুলাই ১৯৯৮ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ।
সারজিস আলমের পারিবারিক পরিচয়
সারজিস আলমের জন্ম পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলার ধামোর ইউনিয়নের একটি মুসলিম পরিবারে। তার বাবার নাম আফসার আলী এবং মায়ের নাম মোছাঃ সালেহা বেগম ।
তার পরিবার এলাকায় অত্যন্ত সজ্জন এবং পরিশ্রমী হিসেবে পরিচিত । সারজিস তার পরিবারের সন্তানদের মধ্যে পড়াশোনা ও মেধার স্বাক্ষর রেখে ছোটবেলা থেকেই সবার প্রিয় ছিলেন । মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা খুব কাছ থেকে দেখেছেন বলেই হয়তো ছাত্রজীবনে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি এতোটা সোচ্চার হতে পেরেছেন ।
একনজরে সারজিস আলম
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ২ জুলাই ১৯৯৮ সাল |
| পিতার নাম | আফসার আলী |
| মাতার নাম | মোছাঃ সালেহা বেগম |
| জেলা | পঞ্চগড় |
| উপজেলা | আটোয়ারী |
| ইউনিয়ন | ধামোর |
| বয়স | ২৭ বছর |
সারজিস আলমের শিক্ষাজীবন
সারজিস আলমের শিক্ষাজীবন অত্যন্ত মেধাদীপ্ত। গ্রামীণ পরিবেশ থেকে উঠে এসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি ও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নিচে তার শিক্ষাজীবনের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো:
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা
সারজিস আলমের পড়াশোনার হাতেখড়ি তার নিজ জেলা পঞ্চগড়ে। তিনি আলোয়াখোয়া তফশিলী স্কুল এন্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি (SSC) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী সারজিস এই পরীক্ষায় জিপিএ ৫.০০ (গোল্ডেন প্লাস) পেয়ে উত্তীর্ণ হন।
উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা
মাধ্যমিক শেষ করে তিনি উন্নত শিক্ষার উদ্দেশ্যে ঢাকায় চলে আসেন। এখানে তিনি দেশের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকা (BAF Shaheen College) থেকে এইচএসসি (HSC) সম্পন্ন করেন। সেখানেও তিনি কৃতিত্বের সাথে মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
উচ্চশিক্ষা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
উচ্চ মাধ্যমিকের পর তিনি ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
- বিভাগ: প্রাণিবিদ্যা বিভাগ (Zoology)।
- শিক্ষাবর্ষ: ২০১৬-১৭ সেশন।
- ডিগ্রি: তিনি এখান থেকে সফলভাবে বিএসসি (অনার্স) এবং এমএসসি (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেছেন।
- বিতার্কিক হিসেবে পরিচয়: সারজিস আলম একজন দক্ষ বিতার্কিক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির অধীনে তিনি জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পুরস্কার জিতেছেন।
- সংগঠক হিসেবে মেধা: ছাত্রাবস্থায় তিনি অমর একুশে হলের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং ডাকসু (DUCSU) নির্বাচনে হল সংসদে সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
- বিসিএস প্রস্তুতি: আন্দোলনের পাশাপাশি তিনি পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী ছিলেন এবং ৪৬তম বিসিএস (BCS) প্রিলিমিনারি পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হয়েছেন।
সারজিস আলমের বৈবাহিক অবস্থা
সারজিস আলম বর্তমানে বিবাহিত । তিনি ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি পারিবারিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন । তার বৈবাহিক জীবন সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
- বিবাহের তারিখ: ৩১ জানুয়ারি, ২০২৫ ।
- স্ত্রীর পরিচয়: তার স্ত্রীর নাম রাইতা । তিনি একজন পবিত্র কোরআনের হাফেজা এবং সবসময় পর্দা মেনে চলেন। রাইতার পৈতৃক নিবাস বরগুনা জেলায় ।
- শ্বশুর: তার শ্বশুর ব্যারিস্টার লুৎফর রহমান ।
- অনুষ্ঠান: গাজীপুরের একটি রিসোর্টে ঘরোয়াভাবে এবং পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন হয় । এই অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হাসনাত আব্দুল্লাহসহ অন্যান্য ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন ।
“ব্যক্তিগত জীবনে সারজিস আলম অত্যন্ত সাদামাটা এবং পর্দানশীন জীবন পছন্দ করেন । ২০২৫ সালের শুরুতেই তিনি জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন । তার জীবনসঙ্গিনী রাইতা যেমন মেধাবী, তেমনি ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল । রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যস্ততার মাঝেও পারিবারিক বন্ধনকে তিনি সবসময় গুরুত্ব দিয়ে থাকেন ।”
২০২৪ সালের আন্দোলনে সারজিস আলমের ভূমিকা
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সারজিস আলম একজন অন্যতম প্রধান রূপকার এবং কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার আন্দোলনের এই অধ্যায়টি নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো, যা আপনি আপনার কন্টেন্টের জন্য ব্যবহার করতে পারেন:
আন্দোলনের শুরু ও সমন্বয়
২০২৪ সালের জুন মাসে যখন সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে, তখন যে কয়জন প্রথম সারির ছাত্রনেতা এই আন্দোলনকে সুসংগঠিত করেছিলেন, সারজিস আলম তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ প্ল্যাটফর্মের একজন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আপসহীন নেতৃত্ব ও আলোচিত বক্তব্য
আন্দোলন চলাকালে তার স্পষ্টভাষী বক্তব্য এবং যুক্তিনির্ভর উপস্থাপনা সাধারণ শিক্ষার্থীদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। বিশেষ করে ১৮ জুলাই তার একটি ফেসবুক পোস্ট যেখানে তিনি লিখেছিলেন—
“একপাশে গুলি, অন্যপাশে সংলাপের ডাক। আমার ভাইয়ের রক্ত মাড়িয়ে আমরা সংলাপে বসতে পারি না।”
তার এই দৃঢ় অবস্থান আন্দোলনকে কেবল কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি বৃহত্তর গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দিতে সাহায্য করে।
ডিবি হেফাজতে আটক ও অনশন
আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে জুলাই মাসের শেষদিকে সারজিস আলমসহ আরও কয়েকজন সমন্বয়ককে (নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রমুখ) ডিবি পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে এবং তার সহযোদ্ধাদের দীর্ঘ সময় আটকে রেখে জবরদস্তি করে আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতি দেওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। তবে তারা ডিবি হেফাজতেও অনশন পালন করে তাদের দাবি আদায়ে অটল ছিলেন। অবশেষে আগস্টের শুরুতে ছাত্র-জনতার প্রবল চাপের মুখে ডিবি তাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
এক দফা ও সরকার পতন
ডিবি হেফাজত থেকে মুক্তির পর সারজিস আলম পুনরায় রাজপথে সক্রিয় হন। কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন সরকার পতনের ‘এক দফা’ দাবিতে রূপ নেয়, তখন তিনি সারাদেশে ছাত্র-জনতাকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে নিরলস কাজ করেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত তিনি মাঠের লড়াইয়ে সামনের সারিতে ছিলেন।
আন্দোলন পরবর্তী ভূমিকা
সরকার পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের কাজেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তিনি ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শহীদ পরিবারের সহায়তা ও আহতদের চিকিৎসায় কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটির অন্যতম মুখ্য সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
“জুলাই বিপ্লবের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যখন পুরো দেশ অনিশ্চয়তার মুখে, তখন সারজিস আলমের কণ্ঠস্বর ছিল কোটি মানুষের সাহস। ডিবি হেফাজতের বন্দিশালা হোক কিংবা রাজপথের টিয়ারশেল—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ গড়ার যে ডাক তিনি দিয়েছিলেন, তা আজ দেশের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।”
সারজিস আলমের রাজনৈতিক উত্থান
সারজিস আলমের রাজনৈতিক উত্থান কেবল একটি নির্দিষ্ট আন্দোলন থেকে নয়, বরং তার দীর্ঘদিনের ছাত্র রাজনীতির অভিজ্ঞতা এবং সংস্কারমুখী চিন্তা থেকে শুরু হয়েছে। তার রাজনৈতিক জীবনের মোড় পরিবর্তনের পর্যায়গুলো নিচে ইউনিক ও কপিরাইট-মুক্তভাবে দেওয়া হলো:
১. ছাত্র রাজনীতির হাতেখড়ি (২০১৭-২০২২)
সারজিস আলমের রাজনীতির শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই । ২০১৭ সালে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত হন । ২০১৯ সালের ডাকসু (DUCSU) নির্বাচনে তিনি অমর একুশে হল সংসদে সদস্য হিসেবে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন । তবে গতানুগতিক রাজনীতির ধারা এবং সংগঠনের ভেতরকার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে ২০২২ সালে তিনি ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করেন এবং নিজেকে মূলধারা থেকে সরিয়ে নেন ।
২. বিতার্কিক ও সংগঠক হিসেবে প্রস্তুতি
রাজনীতি থেকে বিরতি নেওয়ার সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সাথে যুক্ত হয়ে নিজের বাকপটুতা এবং যুক্তিনির্ভর নেতৃত্বের দক্ষতা বাড়ান। এই দক্ষতা তাকে পরবর্তীতে আন্দোলনের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে একজন প্রভাবশালী বক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে।
৩. ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শীর্ষ নায়ক
২০২৪ সালের জুন-জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন শুরু হয়, তখন সারজিস আলম তার কৌশলী ও সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে এই আন্দোলনকে গণ-বিস্ফোরণে রূপ দেন। ডিবি হেফাজতে বন্দি থাকা এবং পরে মুক্তি পেয়ে পুনরায় রাজপথে সক্রিয় হওয়া তাকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দেয়। তার নেতৃত্ব কেবল ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা সাধারণ জনগণের মধ্যেও এক নতুন রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয়।
৪. জাতীয় নাগরিক কমিটি ও জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি সরাসরি রাষ্ট্রীয় সংস্কার কাজে যুক্ত হন। তিনি ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং একইসাথে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনে ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’-র প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৫. জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP) গঠন ও নতুন অধ্যায়
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (NCP)। সারজিস আলম এই দলের প্রধান সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) হিসেবে মনোনীত হন। ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি তার নিজ এলাকা পঞ্চগড়-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে পরাজিত হলেও তিনি রাজপথের রাজনীতি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে নিজের কণ্ঠস্বর বলিষ্ঠ রেখেছেন।
“সারজিস আলম কেবল একজন ছাত্রনেতা নন, তিনি এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের প্রবর্তক। ছাত্রলীগের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে শুরু করা তার এই যাত্রা আজ তাকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিকল্প নেতৃত্বের শীর্ষে নিয়ে এসেছে। ক্ষমতার লিপ্সা নয়, বরং ‘বৈষম্যহীন সমাজ’ গড়ার দাবিতে তার এই দীর্ঘ লড়াই তাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ধারার পথিকৃৎ করে তুলেছে।”
সারজিস আলমের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান
সারজিস আলম বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতির একজন সক্রিয় এবং প্রভাবশালী তরুণ নেতা । ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর তিনি মাঠের আন্দোলনের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন । তার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানকে কয়েকটি প্রধান পয়েন্টে সাজানো যায়:
১. জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP) গঠন: ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (NCP)। সারজিস আলম এই দলের অন্যতম প্রধান কারিগর এবং বর্তমানে তিনি এই দলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে এই দলটি নতুন প্রজন্মের কাছে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
২. ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচন ও ফলাফল: ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারজিস আলম তার নিজ এলাকা পঞ্চগড়-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থীর কাছে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হন। তবে পরাজয় মেনে নিয়ে তিনি বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়ে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
৩. জাতীয় নাগরিক কমিটির ভূমিকা: দলের বাইরেও তিনি ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’-র মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি এবং জনগণের নাগরিক অধিকার আদায়ে সোচ্চার রয়েছেন। বিশেষ করে প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধে তিনি নিয়মিত জনমত গঠন করছেন।
৪. জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন: তিনি এই ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন (বর্তমানে সাবেক)। শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং আহতদের দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনে তার অবদান জনমানুষের কাছে তাকে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য করেছে।
“রাজনীতি মানে কেবল জয়-পরাজয় নয়, বরং আদর্শের লড়াই—এটিই প্রমাণ করেছেন সারজিস আলম। ২০২৬ সালের নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসনে ফলাফল নিজের পক্ষে না এলেও, মানুষের ভালোবাসা আর আস্থায় তিনি হারেননি। নির্বাচনের পর বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানানো থেকে শুরু করে উত্তরাঞ্চলের মানুষের অধিকার আদায়ে তার বর্তমান ভূমিকা তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি এখন রাজপথের অতন্দ্র প্রহরী।”
সারজিস আলমের স্যোশাল মিডিয়া আইডি
সারজিস আলমের ভেরিফাইড এবং অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া আইডিগুলো খুঁজে পাওয়া অনেক সময় কঠিন হতে পারে, কারণ তার নামে অসংখ্য ফ্যান পেজ ও ফেক আইডি রয়েছে। তবে তার আসল আইডিগুলো নিচে দেওয়া হলো:
অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া লিঙ্ক
- ফেসবুক প্রোফাইল (ID): Sarjis Alam এটি তার ব্যক্তিগত প্রোফাইল যেখানে তিনি নিয়মিত আপডেট এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে থাকেন । (সাধারণত নীল ভেরিফাইড টিক চিহ্নযুক্ত) ।
- ইউটিউব (YouTube): সাধারণত তিনি নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলের চেয়ে বিভিন্ন বড় নিউজ চ্যানেল এবং ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (NCP) এর অফিসিয়াল চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে তার ভিডিও বার্তা প্রচার করেন ।
জুলাই আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য সমন্বয়ক ও পরিচিত মুখ
| নাম | পরিচয় ও ভূমিকা | বর্তমান অবস্থান (মার্চ ২০২৬ অনুযায়ী) |
| হাসনাত আবদুল্লাহ | প্রধান সমন্বয়ক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। | সংসদ সদস্য (কুমিল্লা-৪) ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা। |
| সারজিস আলম | অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক, আন্দোলনের তুখোড় বক্তা। | জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা । |
| নাহিদ ইসলাম | আন্দোলনের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য। | তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার)। |
| আসিফ মাহমুদ | অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক। | যুব ও ক্রীড়া এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। |
| আবু বাকের মজুমদার | অন্যতম কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক। | জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কার্যক্রমে সক্রিয়। |
| নুসরাত তাবাসসুম | নারী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার প্রধান মুখ। | সামাজিক ও মানবাধিকার নিয়ে সক্রিয় কাজ করছেন। |
| আব্দুল হান্নান মাসউদ | আন্দোলনের অন্যতম তেজস্বী বক্তা ও সমন্বয়ক। | জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ও মুখ্য সংগঠক। |
| আরিফ সোহেল | জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সমন্বয়ক। | শিক্ষা ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাথে যুক্ত। |
| উমামা ফাতেমা | অন্যতম কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক। | জাতীয় নাগরিক পার্টির অন্যতম শীর্ষ নারী নেতৃত্ব। |
উপসংহার: তারুণ্যের এক অবিরাম যাত্রা
“পরিশেষে বলা যায়, সারজিস আলম কেবল একটি আন্দোলনের নাম নয়, বরং তিনি বাংলাদেশের ছাত্র-রাজনীতি ও সমাজ সংস্কারের এক নতুন অধ্যায়ের পথপ্রদর্শক । ২০২৪ সালের রক্তঝরা দিনগুলোতে রাজপথ কাঁপানো সেই তরুণ আজ জাতীয় রাজনীতির মূলধারায় নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন । নির্বাচনী জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সততা, সাহস আর আদর্শ থাকলে সাধারণ পর্যায় থেকেও দেশ পরিবর্তনের ডাক দেওয়া সম্ভব । ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে ফলাফল যাই হোক না কেন, তার রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আপসহীন লড়াই তাকে এদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অনন্য ধ্রুবতারা হিসেবে টিকিয়ে রাখবে । একটি বৈষম্যহীন এবং ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন, সেই পথচলা এখন আর কেবল তার একার নয়, বরং কোটি বাঙালির সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে ।”

