আমার পাগলি মা - Latest Short Story in Bengali

আমার পাগলি মা - Latest Short Story in Bengali , Short Story in Bengali, Short Story Bangla, Valobashar Golpo, Bangla Romantic Golpo, Love Story Bangla, bangla short story, bengali short story online, Bangla Uponnash

আমার পাগলি মা - Latest Short Story in Bengali


আমার পাগলি মা - Latest Short Story in Bengali 


শীত এলেই মায়ের পাগলামোটা বেড়ে যায় । মা তখন হিতাহীত জ্ঞান হারিয়ে বাড়ির পাশে দিয়ে আস্তে আস্তে টিপ টিপ করে হাটতে যাওয়া মানুষটা পায়ের শব্দ শুনে চিৎকার করে গালি গালাজ শুরু করেন – কোন বান্দির পুত যায়রে? আমার খোয়াড়ের হাস মুরগা গুলান সব চুরি পালাস কেন রে ? আমি ছুটে গিয়ে মাকে শান্ত করি – তোমার ভুক লাগছে মা ? চলো তোমারে গা গোসল ধোয়াইয়া গরম গরম ভাত মাইখা খাওয়াই দেই ।


– এহ্ বান্দির মাইয়া আইছে আমারে গরম ভাত খাওয়াইতে ! ওই কুত্তার ছাও ! আমার কোলের পোলাডারে চুরি কইরা হাউস মিডে নাই ? আবার আইছস আমার হাস মুরগা চুরি করতে ? কাছে আয় , কোপায়া তগো কল্লা ফালাই দিমু ।



বছর ছয়েক আগে আমার দুই বছরের ভাইটা পুকুরে ডুবে মরে যাওয়ার পর থেকে মায়ের পাগলামো শুরু হয়েছে । গরমে ভালোই থাকেন । শীতের ৬ মাস মাকে নিয়ে খুব কষ্ট ! এই সময়টায় মাকে রান্নাঘরের সামনের বড় আম গাছটায় বেধে রাখতে হয় ! ছাড়া পেলেই বটি হাতে দৌড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান ! বলাতো যায়না কখন কাকে কুপিয়ে জখম করে বসেন তাই বেধে রাখি । মা হাত পা ছুড়ে কাঁদেন – কোন বান্দির পুতে আমারে বাইন্ধা থুইছস ? আমারে ছাইড়া দে এ এ এ । মায়ের কান্না শুনে বাবা আর আমি আড়ালে কাঁদি । একবার ছাড়া পেলে ২/৩ দিন আর খোঁজ পাওয়া যায়না !


একবার এমন কান্না জুড়ে দিলেন ! বাধন না খুলে উপায় ছিলোনা ! আমার আর বাবার চোখে ফাকি দিয়ে মূহুর্তের মধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন ! ৩ দিন পর পাওয়া গেলো কয়েক গ্রাম পরের এক ধানক্ষেতে অচেতন হয়ে পরে আছেন । সেই থেকে আজ পর্যন্ত মায়ের বাধন খোলা হয়না ! পুত্রশোক মাকে স্থায়ীভাবে মানসিক রোগী বানিয়ে রেখেছে ! গ্রামের বাজারে বাবার একটা ছোট মুদি দোকান আছে । সকাল সকাল পা টিপে টিপে পেয়াজ মরিচ ডলে একথালা পান্তা খেয়ে বাবা দোকানে যান । পাছে মা শব্দ পেয়ে গালি শুরু করেন তাই এই সাবধানতা ।


মাঝে মাঝে কেমন করে যেনো টের পেয়ে যান । তক্ষুনি শুরু হয় মায়ের বকা – রাক্ষসের বাচা রাক্ষস ! আমার পোলাডারে তুই কব্বরে থুইয়া আইলি কেমনে রে ! ঐ গোলামের পুত গোলাম আমার পোলারে কব্বর খুইড়া তুইল্যা আইন্যা দে । বাবা চুপচাপ পেছনের দরজা পেরিয়ে চলে যান । ফিরে ফিরে মাকে দেখেন আর পাঞ্জাবীর খুটে চোখ মুছেন ! বছরের পর বছর পার হয়ে যায় ! বাবার সামর্থ অনুযায়ী ডাক্তারী চিকিৎসা করিয়েও মায়ের সুস্থ হয়ে উঠা হয়না ! এখন টুকটাক ঝাড়ফুক আর তাবিজের মাদুলিই ভরসা !


সবেমাত্র ক্লাশ সেভেনে উঠেছি , তখন থেকেই মায়ের এই অবস্থা । মাকে একা রেখে স্কুলে যাওয়ার আর সাহস হলোনা ! ঘর সংসার সামলে , মাকে গোসল খাওয়ার ভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছি ৭/৮ বছর আগে । বড়মামা বাবাকে প্রায়ই বলেন – বিন্তুরে আর কতোদিন ঘরে রাখবা ? ওর বিয়ার বয়স চইলা যাইতাছে । আর কিছুদিন পর বিন্তুর লাইগা আর পাত্র খুইজা পাইবানা ।


– হ ভাইজান সবইতো বুজি ! কিন্তু হেরে বিয়া দিলে আমাগো সংসার কেমনে চলব ? বিন্তুর মারে গা গোসল কে ধোয়াইব ? মাইয়া ডাঙ্গর হইছে , তারেও আর কতোদিন ঘরে থুইয়া দেওন যাইব ? অসহায় বাবার বুক চিড়ে দীর্ঘস্বাস বেরোয় ! আমারও একটা সংসারের লোভ হয় । ছোট একটা ঘরে ছোট মিটসেফে কিছু হাড়িপাতিলের সংসারের লোভ ! ছোট ছোট দুটো বাচ্চা উচ্চস্বরে মা মা বলে দৌড়ে আমার কোলে ঝাপিয়ে পরবে এই লোভে পেয়ে বসে আমাকে ।


আমিহীনা এই সংসারের কথা ভেবে লোভটাকে বাড়তে দেইনা ! আমার অভাবে বাবা না খেয়ে থাকতে হবে , মায়ের গোসল খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে ভাবতেই আমার স্বপ্নগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে যায় । মামারা আজকাল প্রায়ই ঘটক নিয়ে বাবার কাছে আসেন । বাবাকে মায়ের কথা বলে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঘটক বিদেয় করি । মেঝ মামি এবার আটঘাট বেধে এসেছেন । যে করেই হোক আমাকে রাজি করিয়ে ছাড়বেন – তোর বয়সি একটা মাইয়া দেখাতো যার এহনো বিয়া হয় নাই ।

– মামি আমি সবই বুজি ! কিন্তু মা আর বাবার কি উপায় হইব ভাইবা দেকছ ?

– আমি সব ভাইবাই তোর লগে কতা কইতে আইছি । তোর বাপ মায়ের ব্যাবস্থা কইরাই তোরে বিয়া দিমু মা !

– কি ব্যাবস্তা করবা কওতো দেহি ।


হ্যা মেঝ মামির ব্যাবস্থাটা আমার পছন্দ হয়েছে । সামনের ফাল্গুনে মেঝ মামির বিধবা সন্তানহীনা ননদের সাথে বাবার বিয়ে ঠিক করেছি । বিধবা হওয়ার পর থেকেই তিনি খালার কাছেই থাকেন । দক্ষতার সাথে তিনি খালার বিশাল সংসার সামলান । শান্ত শিষ্ট এই মানুষটার সাথে আগে মায়ের খুব ভাব ছিলো । নতুন মাকে সংসারের দায়িত্বের সাথে আমার মায়ের দায়িত্বও বুঝিয়ে দিচ্ছি । নতুন মাকে ঘরে তুলে বাবা লজ্জায় সারাদিন আর বাড়িমুখো হননি । মায়ের বাধন খুলে নতুন মাকে তার সামনে বসিয়ে বলি – দেহতো মা তোমার নতুন বান্ধবীরে পছন্দ হয় নাকি ? অনেক বছর পর মা শিশুদের মতো হাত পা ছুড়ে খিলখিল করে হেসে উঠেন – তোর নাম কিগো ? রাগ করিসনা ! তোর নামডা ভুইলা গেছি !

– বুবু আমার নাম রেহেনা । আবার ভুইলা গেলে কিন্তু রাগ করুম ।

– আর ভুলুম না । যাহ্ ছোড ছোড হাড়ি পাতিল লইয়া আয় আমরা রান্দা বারি খেলমু ।

মাকে এখন আর বেধে রাখতে হয়না । তিনি তার নতুন বান্ধবীর সাথে হাড়ি পাতিল খেলেন । নতুন মা তার পাশে বসিয়ে নিজের কাজের সাথে সাথে মায়ের সাথে হাড়ি পাতিল খেলেন । আজকাল দেখি দুজন মিলে সাপ লুডুও খেলেন । মাঝে মাঝে দেখি বাবাও ওদের মাঝের জায়গাটা দখল করে লুডু খেলতে বসে গেছেন । ওদের এই ছেলেমানুসি আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি । মায়ের জন্য আসলেই এখন আমার চিন্তা হয়না । নতুন মা কোন যাদুতে যেনো মাকে বশ করে নিয়েছেন ।

আজ শ্রাবণের ৯ তারিখ । দুই মায়ের আশির্বাদ নিয়ে আমি শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছি । পলক মানে আমার স্বামী আমার কনুইতে চিমটি কেটে বলে – তাড়াতাড়ি না করলে ট্রেন মিস হবে কিন্তু । বাবার হাত ধরে আমি দ্রুত পা চালাই । চলতে চলতে পেছন ফিরে দেখি আমার দুই মা ই আচলে চোখ মুছেন । ওদের চোখে মেয়ের শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার আনন্দের অশ্রু টুপটাপ ঝরে পরা দেখে আমিও সামনের দিকে পা চালাই ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url