খাদ্য - Bengali Short Story । Moner Rong Website

খাদ্য - Bengali Short Story Bangla Choto Golpo বাংলা ছোট গল্প Bangla Golpo Bengali Story Bangla Premer Golpo Valobashar Golpo Bengali Emotional Story

Bengali Short Story - Moner Rong

খাদ্য - Bengali Short Story



বিয়ে বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ার সময় আমি যখন খাবারের প্লেট পরিষ্কার করে চেটেপুটে খাচ্ছিলাম তখন কোথা থেকে একলোক এসে একবাটি মাংসের তরকারি আমার প্লেটে ঢেলে দিলো । আমি অবাক হয়ে লোকটাকে বললাম,
-- আমি তো আপনার কাছে তরকারি চাই নি । আপনি শুধু শুধু আমার প্লেটে তরকারি ঢেলে দিলেন কেন?
লোকটা হেঁসে উত্তর দিলো,
-" আপনার খাওয়ার সিস্টেম দেখে খুব মায়া হচ্ছিলো । আমার মনে হলো, আপনার পেটে আরো খিদে আছে। তাই তরকারি দিলাম ।"
  এই কথা বলে লোকটা অন্য একজনকে ডেকে বললো,
-"অই এইখানে ভাত দিয়ে যা ।"
এইখানে আমি লোকটাকে পুরো দোষ দিবো না । কারণ আমরা বাঙালিরা বিয়ে বাড়িতে খাবার খাওয়ার চেয়ে নষ্ট করি বেশি । ৩০০ জন লোকের আয়োজন করা বিয়ের দাওয়াতে যে পরিমাণ খাবার নষ্ট হয় সে খাবার দিয়ে অনাহাসে আরো ৫০-৬০ জন লোককে ভরপেট খাওয়ানো যাবে । ১০টা বাঙালি বিয়েতে গেলে দেখা যাবে ৮টা বিয়েতেই শেষে খাবার কম পরেছে । অথচ খাবার যদি ভালোভাবে পরিবেশন করা হতো আর মানুষ যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার না নিতো তাহলে খাবার কম পরার প্রশ্নই আসতো না । আমি এমনো দেখেছি ৪ বছরের বাচ্চার প্লেটে দুইপিস মুরগীর রোস্ট দিতে । বাচ্চার মা ভালো করেই জানে বাচ্চা জীবনেও এই খাবার খেতে পারবে না।কিন্তু তবুও লোক ডেকে বলবে, "আমার বাচ্চাটাকে আরো দুই টুকরো মাংস দেন তো ।"
যেখানে সবাই প্লেটে অর্ধেক খাবার রেখে উঠে পরছে সেখানে আমি চেটেপুটে খাচ্ছি সেটা দেখে লোকটার ধারণা হতেই পারে আমার পেটে আরো খিদে আছে। আমি তখন লোকটাকে ডেকে বললাম,
 --ভাই এমন মায়া অন্তত আমার সাথে দেখান না যে ।  আমি আপনার বাড়ির নতুন জামাই না যে, আমি না চাইতেও পুরো বাটির তরকারি আমার প্লেটে ঢেলে দিবেন । আমি পেট ভরে তৃপ্তি সহকারেই খেয়েছি ।  তাহলে শুধু শুধু এতোটা তরকারি নষ্ট করলেন কেন?
লোকটা মাথা চুলকাতে চুলকাতে আমতা-আমতা করে বললো,
-"আসলে আপনার খাওয়া দেখে মনে হচ্ছিলো...
আমি লোকটাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, 
-- ভাই, আমি জানি আপনার কি মনে হচ্ছিলো । কেউ অর্ধেক খাবার প্লেটে রেখে উঠে পরলেই সে জমিদার বংশের লোক আর আমি প্লেট চেটেপুটে পরিষ্কার করে খাচ্ছি বলেই যে আমি ফকিন্নি বংশের লোক এমন চিন্তাটা মন থেকে বাদ দেন । যে খাবার খেয়ে আমরা বেঁচে থাকি সে খাবার নষ্ট করার কোন অধিকার আমাদের নেই ।
লোকটা আমার কথা শুনে কিছুটা রেগে গিয়ে বললো,
-"ভাই আপনি মেহমান দেখে এতক্ষণ কিছু বলি নি । খাবার তো আপনার নষ্ট হয় নি যে এতো জ্ঞান দিচ্ছেন। আপনায় খাবার দিয়েছি ইচ্ছে হলে খাবেন না হলে ফেলে চলে যাবেন । এত কথা বলার তো কিছু নেই এইখানে ।"
আমি আর কিছু না বলে চুপচাপ চলে এলাম । এক বন্ধুর সাথে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ১১টা বেজে গেলো ।  বাসায় ঢুকতে দেখে বাবা আমায় ডেকে বললো,
-" কিরে, খাওয়া-দাওয়া কেমন হয়ছে?"
আসলে বিয়েটা বাবার বন্ধুর মেয়ের ছিলো ।  বাবা অসুস্থ ছিলো তাই যেতে পারে নি । তাই আমি গিয়েছিলাম।আমি বাবাকে বললাম,
--সবাইকে যত্ন করে জামাই-আদর করে খাইয়েছে ।
বাবা তখন চিন্তিত গলায় বললো,
-" ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দামের গরু,  ২৫০টা মুরগী আর ৫টা খাসী জবাই করেও ৪০০ জন লোকের খাওয়া হলো না । হামিদ( বাবার বন্ধু) ফোন দিয়েছিলো কিছুক্ষণ আগে । ও বললো শেষে নাকি খাবার কম পরেছিলো আর এজন্য নাকি ছেলে বাড়ির লোক নানা রকম কথা শুনিয়েছে ।"  
আমি হেঁসে বাবাকে বললাম,
-- যারা উপরওয়ালার নিয়ামতকে বিনষ্ট করে তাদের ১টা কেন ৫টা গরু জবাই করে খাওয়ালেও ওদের তৃপ্তি হবে না...।
---
------
আমার ফুফাতো বোন ওর ৫বছরের বাচ্চাটাকে নিয়ে আমাদের বাসায় এসেছিলো । মা ওদের জুস বানিয়ে  দিলো ।  বাচ্চা ছেলেটা জুসের গ্লাসটা হাতে নিয়ে যখন খাবে তখন আপু চোখ বড়বড় করে বাচ্চাটার দিকে তাকালো । আমি খেয়াল করলাম বাচ্চা ছেলেটা তখন অল্প একটু জুস খেয়ে রেখে দিলো । 
দুপুরে যখন সবাইকে ভাত খেতে দেওয়া হলো বাচ্চা ছেলেটা অল্প একটু খেয়েই রেখে দিলো ।  আমি তখন বললাম,
-- বাবা, পুরো প্লেটের খাবারটা খাও ।  খাবার নষ্ট করতে নেই । 
বাচ্চাটা তখন বললো,
 -" পুরো খাবার শেষ করলে আম্মু বকা দিবে । আম্মু বলেছে, বাসায় যত ইচ্ছে খাও কিন্তু বাহিরে কারো বাসায় গেলে অল্প খাবে ।  বেশি খেলে মানুষ নাকি আমায় রাক্ষস বলবে । তাই আম্মু বলেছে কারো বাসায় গেলে কোন খাবার পুরো না খেয়ে অল্প খেয়ে রেখে দিতে। "
বাচ্চাটার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম ।  খেয়াল করে দেখি, আপু চোখ বড়বড় করে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আছে । 
বিকাল দিকে আপু যখন চলে যাবে  তখন আমি আপুকে বললাম,
-- বাচ্চাটাকে এইসব কি শিখাচ্ছো? বাচ্চাদের যেখানে শিখাবে খাবার কখনো নষ্ট করতে নেই আর তুমি সেখানে শিখাচ্ছো কিভাবে খাবার নষ্ট করতে হয় ! 
আপু তখন বললো,
-" আসলে সবাইতো আর সমান না । বাচ্চা যদি সমানে এটা ওটা খেতে থাকে তাহলে মানুষ ভাবতেই পারে, বাচ্চাকে হয়তো কখনো ভালো কিছু খাওয়ায় না তাই বাচ্চা রাক্ষসের মতো ভালো খাবার দেখে এটা ওটা খাচ্ছে ।"
এইকথা বলে আপু চলে গেলো আর আমি অবাক হলাম শিক্ষিত বোনের অশিক্ষিত মন-মানসিকতা দেখে....
---
------
রেস্টুরেন্টে খাওয়ার সময় আমাকে মুরগীর হাড্ডি চিবাতে দেখে আমার গার্লফ্রেন্ড অর্পিতা রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, 
 -- ক্ষেত মানুষের মতো হাড্ডি চিবাচ্ছো কেন?
আমি অবাক হয়ে বললাম,
  -- এইখানে ক্ষেতের কি আছে?  মুরগীর হাড্ডি চিবিয়ে খেলে কি কেউ ক্ষেত হয়ে যায়? 
অর্পিতা আরো রেগে গিয়ে বললো,
-"এটা তোমার বাসা না যে হাড্ডি সহ খেয়ে ফেলবে ।  এটা একটা রেস্টুরেন্ট । এইখানে একটু স্মার্ট ভাবে খেতে হয় । একটু পরে যখন ওয়েটার এসে প্লেট গুলো নিয়ে যাবে তখন তোমার চিবানো হাড্ডিগুলো দেখে মনে মনে তোমাকে সহ আমাকেও ক্ষেত বলবে ।"
অর্পিতার কথা শুনে আমি অর্পিতার প্লেটের দিকে তাকিয়ে দেখি অর্পিতা অল্প খেয়েছে আর বেশিভাগ খাবারটা প্লেটে রয়েছে । আমি অর্পিতাকে বললাম, 
-- তুমি খাবারটা শেষ করো
অর্পিতা রাগে লাল হয়ে বললো,
 -আমি তোমার মতো এতো ক্ষেত না যে রাক্ষসের মতো পুরোটা খাবো ।  
আমি শান্ত গলায় অর্পিতাকে বললাম,
-- খাবারটা আমি আমার টাকাতে খাওয়াচ্ছি । আমার টাকাতে কিনা খাবার তুমি আমার চোখের সামনে নষ্ট করবে তা তো হবে না ।যদি খাবারটা খেতে ভালো না লাগে তাহলে সেটা অন্য বিষয় কিন্তু স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে খাবার নষ্ট করবে সেটা তো হবে না।তাই ভালোই ভালোই পুরো খাবারটা শেষ করো তা নাহলে এই কাঁচের প্লেট তোমার মাথায় ভাঙবো ।
আমার কথা শুনে অর্পিতা ভয়ে ভয়ে পুরো খাবারটা শেষ করলো ।  খাবার শেষ করে ও কাঁদতে কাঁদতে বললো, 
-"তোমার মত একটা ছোটলোকের সাথে আমি কখনোই সম্পর্ক রাখবো না ।"
আমি হেঁসে বললাম,
-- তোমার মতো বড়লোকের সাথে আমিও সম্পর্ক রাখতে চাই না । যে খাবার খেয়ে বেঁচে থাকো সে খাবারকে অসম্মান করো কোন সাহসে? 
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিমাসে সারা বিশ্বে  ১০হাজার শিশু মারা যায় খাদ্যের অভাবে । প্রতিদিন সারাবিশ্বে ৮২কোটি মানুষ রাতে না খেয়ে ঘুমায় । অথচ প্রতি বছর সারা বিশ্বে ২২কোটি ২০লাখ টন খাদ্য মানুষ নষ্ট করে । আমাদের দেশে কিছু আল্ট্রা-মর্ডাণ বড়লোক আছে যাদের খাবার নষ্ট করতে নিষেধ করলে ওরা বলে,
"আমার টাকার কিনা খাবার আমি নষ্ট করবো তাতে তোমার কি?"
হয়তো এমন একদিন আসবে যেদিন মানুষ আর ক্যান্সার, এইডস, ব্রেইন-টিউমারে মরবে না, মরবে খাদ্যের অভাবে😓

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url