প্রথম প্রেম - Prothom Prem । Valobashar Golpo - পর্ব ৫

প্রথম প্রেম - Prothom Prem । Valobashar Golpo - পর্ব ৫



 

পেছনে তাকিয়ে দেখি রাদিফ ।


ওকে দেখে মেজাজটা একদম বিগড়ে গেলো ।



 

—- এই ফাজিল পোলা, এভাবে কেউ চিল্লায় । আমার সাধের ফোনটা গেলো ।


রাদিফ আমার ফোনটা তুলে নিয়ে বলল


—- কিছু হয়নাই দেখ । তুই এতরাতে ছাদে কী করিস । যদি পেত্নী ধরে নিয়ে যেত ।


—- তুই কী দেখেছিস পেত্নীকে কখনো পেত্নী ধরে ভূত হলে অবশ্য ঠিক ছিল ।


নিবির ভাইয়ের এমন ফোড়নকাটা কথায় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলাম । এই লোক এখানে কী করে?


—- একদম ঠিক বলেছো, নিবির ভাইয়া ।


—- এই পোলা, আমাকে তোর পেত্নী মনে হয় । মানলাম নিবির ভাইয়ার চোখ খারাপ তাই কি তোরও চোখ খারাপ ।


—- কী বললি তুই, আফরা । আমার চোখ খারাপ ।


—- অবশ্যই । না হলে কেউ হীরে রেখে কাঁচ নিয়ে পরে থাকে ।


—- কী বললি তুই ।


—-না কিছু না । আমি নিচে যাচ্ছি, রাদিফ । তোরা থাক ।


—- তোকে যেতে বলেছি আমি?

রাদিফ তুই যা আফরার সাথে আমার কথা আছে ।


“নিবির ভাইয়ার কথায় চোখগুলো ছোটোছোটো করে তার দিকে তাকালাম । আমাকে আবার ছাদ থেকে ফেলে দিবে নাতো ।”


—- কিছু বলবেন ভাইয়া?


—- এতরাতে একা একা ছাদে বসে বয়ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলছিলি মনে হয় ।


—- আমার আর বয়ফ্রেন্ড কই হলো । এই দুবছর আপনার পিছনে যদি ঘুরে টাইমপাস না করতাম তাহলে এতদিনে হাজার খানেক বয়ফ্রেন্ড জুটে যেতো আমার ।


” নিবির ভাইয়ার মুখ দেখেই বোঝা গেল সে আমার এমন জবাব আশা করেনি ।”


—- তা আমার ওপর যে এত ভালোবাসা ছিল তা কি বাতাসে উবে গেলো ।


—- উবে যায়নি তো ভাইয়া শুধু নিজের আত্মসম্মান জাগ্রত হয়ে গেছে ।


—- তাই নাকি ।


—- হুম । আমি নিচে যাচ্ছি ভাইয়া ।


—- নিহান কে, আফরা ।


” নিবির ভাইয়ার কথা শুনে মাথাটা যেন ঘুরতে শুরু করেছে । বারবার কেন এই নামটা আমার সামনে আসে । এই কালো অতীতটাকে আমি যত ভুলে যেতে চাই ততই এই জিনিসটা আমার সামনে চলে আসে ।”


—- আমি কিছু জানতে চাইলাম, আফরা ।


নিবির ভাইয়ার প্রশ্নের কোনো উত্তর আমি দিতে পারছিনা । মাথাটা বনবন করে ঘুরছে । শরীরটাও অস্বাভাবিক ভাবে কাপছে । চোখের সামনে সব ঝাপসা দেখছি আমি ।


—- তোর কী শরীর খারাপ লাগছে, আফরা । তোর,,


নিবির ভাইয়ার পরবর্তী কথা শোনার আগেই তার বুকে লুটিয়ে পড়লাম ।


চোখ খুলেই দেখি সকাল হয়ে গেছে ।

এটা অবশ্য নরমাল । যখনই আমার এ সমস্যা হয় তখন আমাকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয় । আমার

ব্রেনকে এমনসময় শান্ত করার একটাই উপায় হলো লম্বা ঘুম ।  লাস্ট দু বছরে এমনটা অনেক বার হয়েছে ।

মাথাটা এখনো প্রচন্ড ধরে আছে ।


একটু পরেই আম্মু আর মামা রুমে এলো ।

মামা আমার মাথায় হাত রেখে বলল-


—- কাল কী হয়েছিল, মামনি । আমি জানি নিবির নিহানের কথা জানতে চেয়েছিল । তাই বলে তুই এত দুর্বল হলে হবে । নিজেকে শক্ত করতে হবে, মামনি । সবকিছু ভুলতে হবে তোকে ।


—- আমি পারিনা গো, মামা । কিছুতেই ঐ রাতটাকে ভুলতে পারিনা ।


—- আচ্ছা বাদ দে এসব । আফিয়া তুই খাবার নিয়ে আয় । মামনি তুই ফ্রেশ হয়ে আয় । আমি আজ তোকে খায়িয়ে দিবো ।


—- আচ্ছা ।


মামা আমায় খায়িয়ে দিয়ে চলে গেলো । একটু পরে নাকি নানীকে নিয়ে হাসপাতালে যাবে । কিন্তু আমার মাথায় একটাই প্রশ্ন নিবির ভাইয়া নিহানের ব্যাপারে কী করে জানলো । কোনো ভাবে কী আরাব ভাইয়া বলেছে । কিন্তু আরাব ভাইয়া বললে তো সবটাই বলতো ।


ঘরে বসে বিরক্ত হচ্ছিলাম তাই বাইরে গেলাম । রাদিফ এসে বলল-


—- এই আফরা, নদীরধারে যাবি অনেক কাশফুল হয়েছে ওখানে ।


রাদিফের কথাশুনে মনটা ভালো হয়ে গেলো । এখানকার নদীটা খুব সুন্দর । যদিও ৪-৫ বছর আগে এসেছিলাম এখানে । সবাই কাশফুলের সাথে এতএত ছবি পোস্ট করেছে । আমি একটাও ছবি দিতে পারিনি বলে মন খারাপ হয়েছিল এবার অনেক ছবি তুলবো । আর এফবিতে পোস্ট করবো । ভেবেই মনটা ভালো হয়ে গেলো ।


বিকেলে আমি আরাব ভাইয়া, নিবির ভাইয়া, রাদিফ আর রাদিফের এক কাজিন তাহা মিলে ওখানে গেলাম ।


বেশ সুন্দর জায়গাটা । অনেক ছবি তুললাম সবাই মিলে । আমি একটা কাশফুল ছেড়ার চেষ্টা করছি । কিন্তু পারছি না । একটা ডাল ধরে টানতেই বেশ খানিকটা হাত ছিলে গেলো ।

তখন নিবির ভাইয়া এসে কয়েকটা ফুল ছিড়ে আমার হাতে দিলো । আর বলল


—- এখনো একটা ফুল ছেড়ার শক্তি হয়নি তুই আবার আমায় বিয়ে করতে চাস । বিয়ের পর আমার ভারটা সামলাবি কী করে?


কথাগুলো বলেই নিবির ভাইয়া চলে গেলো । তার কথাটা বুঝতে খানিকক্ষন সময় লাগল আমার বোঝা মাত্র আমার চোখদুটো গোল গোল হয়ে গেলো ।


খানিকক্ষণ ঘুরে ফিরে চলে এলাম ।



সন্ধ্যেবেলা সবাই মিলে নানার ঘরে বসে ছিলাম । নানার নাকি খুব জরুরী কোনো কথা আছে ।


—- দেখো আমি বুঝতেই পারছি আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না  আর আফরা হলো এ বংশের একমাত্র মেয়ে । আর আমি চাই না ও বাইরে কোথাও যাক । (নানী)


—- তুমি ঠিক কী বলতে চাচ্ছো, মা ।(মামা)


—- আমি জানি আফরার বয়সটা কম, তবুও আমি চাই আরাব আর আফরার বিয়ে দিতে ।


নানীর কথা শোনামাত্র আমার আর আরাব ভাইয়ার মাথায় আকাশ ভেঙো পড়লো । আরাব ভাইয়া বললো


—- এটা সম্ভব না, নানী । আমি আফরাকে সবসময় নিজের বোনের মতো দেখছি ।


—- আমি কিছু জানতে চাইনা । আমার কথাই শেষ কথা ।


বাকিদের কথা শোনার আগেই ওখান থেকে উঠে চলে এলাম ।

কেন জানি নানীর এই কথাটা কিছুতেই মানতে পারছিনা । খুব কষ্ট হচ্ছে । যদি নানী আরাব ভাইয়ার জায়গায় নিবির ভাইয়ার সাথে আমার বিয়ে দিতে চাইতো তাহলে কী খুব ক্ষতি হতো? আচ্ছা নিবির ভাইয়া কী খুশি হয়েছে এ খবরে?


সেই যে রুমে এসেছি, এখনো বের হইনি । কেঁদে কেঁদে একদম চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলেছি । রাত প্রায় বারোটা বাজে । সবাই খাওয়ার জন্য ডাকাডাকি করছে ।


আমি ঠিক করেছি আজ কিছুতেই বের হবো না । খানিকপর নিবির ভাইয়ার গলা পেলাম


—- আফরা, দরজাটা খোল । না খেয়ে থেকে কী বোঝাতে চাইছিস তুই । আরাবকে বিয়ে করবি না সরাসরি বললেই তো পারিস । এত নাটক করার কী আছে ।


“নিবির ভাইয়ার কথায় খুব কষ্ট পেলাম । সবটাই উনার নাটক মনে হচ্ছে উনি কী জানে না আমার মনে কী আছে? কেন বোঝেন না উনি সেটা নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করে ।”


পরদিন সকালে আমি ভাইয়ার সাথে ঢাকা ফিরে এলাম । ওখানে থাকলে দম বন্ধ হয়ে মরেই যেতাম । পুরো রাস্তা চুপ করে ছিলাম । ভাইয়াও কোনো প্রশ্ন করেনি । সে তো সবটাই জানে ।


বিকেলে এককাপ কফি নিয়ে ছাদে বসে ছিলাম । রাহাকে সেই কখন ফোন করছি এখনও আসছে না ।

 

মা ফোন করেছিল । তারা নাকি রওনা দিয়েছে আব্বু আর নিবির ভাইয়া নাকি মানা করে দিয়েছে । তারা এখনই আমার বিয়ে দিতে চাই না । আর আমার মতের বিরুদ্ধে তো একদম না এ নিয়ে নাকি আব্বুর সাথে নানার ছোটোখাটো একটা ঝামেলাও হয়েছে ।

আব্বুর ব্যাপারটা তো বুঝলাম কিন্তু নিবির ভাইয়া এমন কেন করলো?


—- কী ভাবসিস, আফরা ।


—- তুই, ইডিয়েট এত দেরি করে এলি কেন?


—- একটুই তো দেরি করছি । তুই কী বলবি বলছিলি ।


“রাহাকে সবকিছু খুলে বললাম ।”


—- আফরা, আমার মনে হয় তোর এভাবে নিবির ভাইয়ার পেছনে পরে থাকা উচিত না । উনি তোকে এত অপমান করে ।


—- কী করবো বলতো? নিহানকে ভুলে থাকার একমাত্র উপায় তো নিবির ভাই ।


—- নিহানকে মনে রাখা নিতান্তই তোর বোকামি ।


—- কী করবো বল? কোনো ভাবেই তো ঐ বেইমানকে আমি ভুলতে পারিনা ।


—- আচ্ছা বাদ দে এসব আন্টিরা কখন আসবে ।


—- রাত হবে ।


কিছু সময় থেকে রাহা চলে গেলো । সন্ধ্যা নেমে গেছে বলে আমিও নিচে নেমে এলাম ।


এসে দেখি ফোনে অনেকগুলো মিসডকল । আমি কল ব্যাক করলাম কিন্তু প্রথমবার রিসিভ হলো না । দ্বিতীয় বার রিসিভ হলো । ওপাশের লোকের কথা শুনেই ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেলো ।


আমি বুঝি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা হারিয়ে ফেললাম ।


দেড় ঘন্টা ধরে হাসপাতালে বসে আছি ।

নানী বাড়ি থেকে আসার সময় আব্বু-আম্মুর গাড়ি এক্সিডেন্ট করছে । দুজনের অবস্থাই খুব খারাপ ।


অপারেশন থিয়েটারে আছে তারা । ভাইয়াও ভেতরে আছে ।

কিছুক্ষন পড়ে একজন ডাক্তার বেড়িয়ে এলো ।

তাকে দেখেই তার দিকে ছুটে গেলাম ।


ডাক্তার বলল- ওরা নাকি দুজনের কাউকেই বাঁচাতে পারেনি ।


কথাটা আমার কানে প্রবেশ মাত্রই আমার পুরো শরীর কেঁপে উঠলো । আমার পুরো দুনিয়াটাই যেন থেমে গেল ।

“আব্বু” বলে একটা চিৎকার দিয়েই মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লাম ।

(চলবে)

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url