প্রেম তুমি - Prem Tumi । মিষ্টি প্রেমের গল্প - পর্বঃ 09

 

প্রেম তুমি - Prem Tumi । মিষ্টি প্রেমের গল্প - পর্বঃ 09

প্রেম তুমি 

ফাবিহা নওশীন 

পর্বঃ ০৯


অর্ষা আর দর্শন প্ল্যান করেছে কি করে অর্পা আর রুশান দু'জনকে মুখোমুখি করে ওদের সমস্যার সমাধান করবে। ভেন্যু হিসেবে সিলেক্ট করেছে অর্ষার বাসা। ওর বাবা রাতে ফিরেন সে হিসেবে বাসা সারাদিন ফাঁকা থাকে। অর্পাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসবে। রুশান আর দর্শন আগে থেকেই থাকবে। গেস্টরুমটা সুন্দর করে সাজাবে। পুরো রুম জুড়ে সরি এণ্ড লাভ প্লেকার্ড দিয়ে সাজাবে। সাথে থাকবে বেলুন। অর্পার জন্মদিন আজ। ফ্রাইডে হওয়ায় অর্পা বাসায় বসে আছে। অর্ষা আর দর্শন শপিংয়ে গেছে। অর্ষা নরমাল পোশাকে। কালো জিন্স, সাদা টপ আর কালো সু। কাঁধে দু বেলের মিনি লেডিস্ ব্যাগ, চুলগুলো ছাড়া। দর্শন ওর সাথে। জিন্স প্যান্ট, চেক শার্ট, সু পরে। ওরা দু'জন এক সাথে হেঁটে যাচ্ছে। অর্ষা একটা শপে ঢুকল। শপে গিয়ে পছন্দ মতো কেনাকাটা করছে। দর্শন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু এদিক সেদিক দেখছে। কেনা শেষ করে দর্শন আর অর্ষা অন্য শপে গেল। দর্শনের চোখে একটা ব্রেসলেট পড়ল। সাদা পাথরের ব্রেসলেট। দূর থেকেই চিকচিক করছে। দর্শন সামনে এগিয়ে গেল। অর্ষা ওর মতো ব্যস্ত। দর্শন ব্রেসলেট হাতে নিয়ে দেখছে। ওর ভীষণ ভালো লাগছে। অর্ষার দিকে চেয়ে মুচকি হাসল। ব্রেসলেটের জন্য প্রে করে পকেটে রাখল। অর্ষার কাছে যেতেই খেয়াল করল পেছনে দুটো ছেলে। অর্ষাকে দেখিয়ে কি যেন বলছে। দর্শন অর্ষার সাথে গিয়ে দাঁড়াল। 


দুটো ছেলের মধ্যে একটা ছেলে অন্য আরেকটা ছেলেকে ধাক্কা মারছে ক্ষনে ক্ষনে। কি যেন বলছে দুজন ফিসফিস করে। মনে হচ্ছে অপর ছেলেটিকে কিছু করার বা বলার জন্য ফোর্স করছে। দর্শন সেটা খেয়াল করছে।


অর্ষা এয়ারিং কেনার পর একটা হেয়ার ব্যান হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছে। হেয়ার ব্যান কম ব্যবহার করে। ও সাধারণত হেয়ার রাবার ব্যান্ড ব্যবহার করে। 

দুটো ছেলের মধ্যে একজন দাঁড়িয়ে আছে আর আরেকজন অর্ষার দিকে এগিয়ে এল। দর্শন ছেলেটাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। অর্ষা তখনও খেয়াল করেনি।

"এক্সকিউজ মি..."

অর্ষা নিজের বাম পাশে কারো অস্তিত্ব আর গলার স্বর অনুভব করে তাকাল।


ছেলেটার দিকে বিস্ময় নিয়ে একবার চেয়ে দর্শনের দিকে তাকাল। তারপর ইতস্তত করে ছেলেটাকে বলল, 

"জি আমাকে বলছেন?"


ছেলেটাও কেমন ইতস্তত করছে। এক হাতে আরেক হাত ঘষতে ঘষতে বলল,

"জি। আমি একটু আপনার সাথে কথা বলতে পারি?"


অর্ষা কিছুই বুঝতে পারছে না। সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। দর্শনের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাল। তারপর ছেলেটাকে বলল,

"আমি কি আপনাকে চিনি?"


"জি না। আগে আমার পরিচয় দেই আমি সাদিফ। আপনার নামটা জানতে পারি?"


অর্ষা ছেলেটার দিকে চেয়ে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল। দর্শন আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছে না। ছেলেটা যখন বলেছে অর্ষা ওকে চিনে না এর মানে ছেলেটা অপরিচিত। রাগে ওর কপালের রগ ফুটে ওঠে। 

অর্ষা কিছু বলতে যাবে তখনই দর্শন ওকে সরিয়ে সামনে এসে বলল, 

"ডোন্ট ইউ সি দ্যাট আ'ম উইথ হার? হাও ডেয়ার ইউ?"


ছেলেটা দর্শনের দিকে চেয়ে কিঞ্চিৎ ভয় পেল। তারপর ওর বন্ধুর দিকে তাকাল। কোন ঝামেলা হচ্ছে বুঝতে পেরে বন্ধু এগিয়ে এল। 

দর্শন কোন উত্তর না পেয়ে আরো রেগে গেল। কান দিয়ে যেন ধোয়া বের হচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত গলায় বলল, 

"আমার সামনে আমার গার্লফ্রেন্ডের সাথে লাইন মারতে আসো?"


ছেলেটা ঢোক গিলে বলল,

"সরি ভাই, আমি বুঝতে পারিনি যে আপনি উনার সাথে এসেছেন।"


"বুঝতে পারেননি? আমাকে কি চোখে দেখা যায় না? এতবড় জলজ্যান্ত মানুষকে চোখে দেখে না আর মেয়েদের ঠিকই দেখা যায়। অনেকক্ষণ ধরে দেখছি ওর দিকে বাজেভাবে তাকাচ্ছেন। দুজন মিলে ফুসুরফাসুর করছেন।"


ছেলেটার বন্ধু বলল,

"সরি ভাই, সরি আমরা বুঝতে পারিনি। মাফ করেন আমরা আসি।"


দর্শন ওদের ছাড়ছেই না।

"বুঝতে পারেননি? সবই বুঝতে পেরেছেন। মেয়ে দেখলে চুলকানি শুরু হয়। তার সাথে ভাই, বাবা, স্বামী, বয়ফ্রেন্ড যেই থাকুক না কেন চোখে পড়ে না। ইনফ্যাক্ট কেয়ার করেন না। আপনাদের নামে আমি কমপ্লেইন করব। আপনার নাম সাদিফ তো।"


"আরে ভাই, কি বাড়াবাড়ি শুরু করেছেন। বললাম তো বুঝতে পারিনি। আপু, বোঝান আপনার বয়ফ্রেন্ডকে।"

দর্শন ওর কথা শুনে তেড়ে যাচ্ছিল। দোকানের সবাই ওদের দিকে চেয়ে আছে। 


অর্ষা তাড়াতাড়ি দর্শনের হাত ধরে থামিয়ে দিল। তারপর জোর করে বাইরে নিয়ে গেল। 

"দর্শন বাদ দেও। চলো চলো। ওদের কাজই এমন।"


অর্ষা জোর করে দর্শনকে মার্কেটের বাইরে নিয়ে এল। দর্শন তখনও রাগে গজগজ করছে। 

"দর্শন, কুল। বাদ দেও। আমরা যে কাজ করছি তাতে কনসেন্ট্রেশন করো।"


"আমাকে না-কি দেখেই নি? কথা শুনেই মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে।"

দর্শন বাইক নিয়ে এল। অর্ষা ওর বাইকে চেপে বসল। পুরো রাস্তায় দর্শন কোন কথা বলেনি। অর্ষাও কোন কথা তুলেনি। ওদের বাড়ির সামনে গিয়ে বাইক থামাল। অর্ষা বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল। দর্শন চাবি হাতে নিয়ে নামছে। গেট দিয়ে একটা ছেলে বের হয়ে অর্ষা আর দর্শনের দিকে তাকাল। ওর দৃষ্টিটা কেমন জানি ছিল। অর্ষা সামনের দিকে চেয়ে দেখে প্লাবন বিস্ময়কর দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে আছে। অর্ষার বুক ধুক করে উঠল। দর্শনের দিকে তাকাল। দর্শন চাবি পকেটে রাখছে। তারপর পকেট থেকে রুমাল বের করল। অর্ষা প্লাবনকে দেখেও না দেখার ভান করছে। ওরা দুজন ব্যাগ ভাগাভাগি করে নিল। প্লাবন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় ওরা যেতে পারছে না। দর্শন ওর দিকে চেয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল, 

"আরে ভাই, সাইড না দিলে ভেতরে যাব কী করে?"


প্লাবন চকিত হলো। তারপর মিনমিন করে কি যেন বলল সেটা ওদের বোধগম্য হয়নি। দর্শন সামনে আর অর্ষা পেছনে। অর্ষা প্লাবনের দিকে আরেকবার তাকাল। ও তখনও স্থির দৃষ্টিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অর্ষা দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। দর্শনকে অনুসরণ করে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল। অর্ষা আর দর্শন লিফটে ঢুকে পড়ল। স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয় অর্ষা। অনেকদিন পরে সামনে পড়েছে প্লাবন। তাও এমন একটা দিনে। সাথে দর্শন ছিল। এভাবে চেয়ে থাকার পরেও কিছু বুঝতে পারেনি সেটাই সৌভাগ্য। লিফট থেকে নেমে আরেক বিপত্তিতে পড়ল অর্ষা। লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্লাবন। দর্শনের দৃষ্টি পড়ল প্লাবনের উপর। কিছুক্ষণ আগে নিচে দেখে এসেছে সেটাও স্মৃতিতে বিরাজমান। নিচ থেকে উপরে এসে আবার লিফটের সামনে অপেক্ষা করছে কেন সেটা মাথায় ঢুকছে না। দর্শন ছেলেটাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ছেলেটা যে বারবার অর্ষার দিকে তাকাচ্ছে সেটা বুঝতে বাকি নেই। শুধু তাকাচ্ছেই না আড়চোখে ফলো করছে ওর কার্যকলাপ। 


অর্ষার ফ্লাটের দরজার সামনে পৌঁছে গেছে। দর্শন সেখানেই দাঁড়িয়ে। প্লাবনের দিকে চেয়ে আছে। প্লাবন অর্ষাতে এতটাই বিভোর যে ওর সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, তার দৃষ্টি ওরই দিকে সেটা খেয়ালই করেনি। 

"কী ভাই?"


প্লাবন পুনরায় চকিত হলো। ধরা পড়ে যাওয়ায় কাচুমাচু হয়ে উত্তর দিল, 

"জি।"


"ওদিকে কী দেখছেন? ফলো করতে করতে নিচ থেকে উপরে চলে এসেছেন।"


"আমি ফলো কেন করব? ওকে তো আমি চিনি। আর ও আমাকে চিনে। সো ফলো করার কী আছে? আমি তো উপর তলায় যাচ্ছি।"


প্লাবন দ্রুতগতিতে সিড়ির দিকে গেল। অর্ষা দরজার সামনে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দর্শন কিছুই বুঝতে পারল না। কোন একটা গড়বড় তো আছেই। নয়তো ছেলেটা ওদের পেছনে পেছনে সিড়ি দিয়ে এল। তারপর লিফটের সামনে এসে দাঁড়াল। অর্ষার দিকে নজর রাখল। তারপর আবার এক সিড়ি পার করে উপরে গেল। সরাসরি সিড়ি দিয়ে উপরে না গিয়ে এই ফ্লোরে কেন থামবে? আর কেনই বা লিফটের সামনে এসে দাঁড়াবে? 

দর্শন অর্ষার দিকে তাকাল। ও দৃষ্টি লোকাচ্ছে, ওকে নার্ভাস লাগছে। বারবার ঘাম মুছছে টিসু দিয়ে। 

দর্শন ওর সামনে যেতেই বলল,

"তুমি ভেতরে আসবে?"


"ছেলেটা কে?"


অর্ষা তোতলালে তোতলাতে বলল, 

"কোন ছেলেটা?"


"মাত্র উপর তলায় যে ছেলেটা গেল। কে সে? তুমি না-কি চিনো? ওয়েট ওয়েট উপর তলা মানে সেই ছেলেটা নয়তো?"


দর্শনের প্রশ্ন শুনে অর্ষা হকচকিয়ে গেল। কপাল বেয়ে চিকন ঘামের রেখা ফুটে ওঠে। ঠোঁট নড়াচ্ছে কিন্তু কিছু বলতে পারছে না। এই মুহুর্তে দর্শনকে রাগাতে চায় না। চায় না দিতে কোন টেনশন। তাই অন্যকিছু বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করতেই দর্শন বলল,

"বুঝে-শুনে বলবে কিন্তু।"


দর্শনের একরোখা দৃষ্টির দিকে চেয়ে নির্বিঘ্নে মিথ্যা বলে ফেলল অর্ষা।

"না, উনারা উপর তলায় থাকে। আমি ছোট থেকে এখানেই বড় হয়েছি তাই চেনাজানা আছে। একটা ছেলেকে সাথে দেখে উনার কৌতূহল হচ্ছে তাই হয়তো এভাবে দেখছে।"

দর্শন আর কথা বাড়ালো না। ওরা ভেতরে গেল। প্রিয়া ওদের দেখে এগিয়ে এল। 

"আমি গেস্ট রুম গুছিয়ে ফেলেছি। কিন্তু অর্পা আপু আসবে তো? আমাদের প্ল্যান সাকসেস হবে তো?"


অর্ষা দৃঢ় কন্ঠে বলল, 

"অবশ্যই হবে। আমি যে করেই হোক অর্পা আপুকে নিয়ে আসব। এখন চল কাজে লেগে পড়ি।"


দর্শন ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। অর্ষা আর প্রিয়া বিস্ময় নিয়ে সেদিকে তাকাল। 

দর্শন ওদের দু'জনকে এভাবে তাকাতে দেখে বলল, 

"এভাবে চেয়ে আছো কেন তোমরা? ভূত বা এলিয়েন দেখছো? এতক্ষণ ধরে শপিং করে এতটা পথ জার্নি করে এলাম গলা ভেজাতেও বলবে না?"


অর্ষা জিভে কামড় দিল। এই জিনিসটা কখনোই ওর মাথায় থাকে না। কেউ বাসায় এলে তাকে চা- কফি, কোল্ড ড্রিংক অফার করতে হয় এটা বুঝেই উঠতে পারে না।

"সরি সরি আমি তোমার জন্য ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা কিছু নিয়ে আসছি।"


"না একটা ব্লাক কফি বানিয়ে আনো। মাথা ধরেছে খুব।"


অর্ষা আর প্রিয়া চাওয়াচাওয়ি করল। তারপর অর্ষা নিচু কন্ঠে বলল, 

"আচ্ছা।"


প্রিয়ার কাছ থেকে গোপনে কফি বানানো শিখে কিচেনে গেল। প্রিয়া শপিং ব্যাগগুলো নিয়ে গেস্ট রুমে গেল। অর্ষা কি দিয়ে কি করবে বুঝতে পারছে না। খুব নার্ভাস লাগছে। ঠিকমতো কিছু খুঁজেও পাচ্ছে না। কখনো কিচেনে কাজ করেনি। দর্শন এই প্রথম বড় মুখ করে কিছু চাইল ওকে হতাশ করা যাবে না। অর্ষা প্রাণপণ চেষ্টা করছে। বুয়া বাজারে গিয়েছে। অর্ষা সুন্দর দেখে একটা মগ নামাল তাক থেকে। হাত থেকে আচমকা কফির মগ পড়ে গেল। শুধু পড়ে যায়নি। পড়ে গিয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। দর্শন ড্রয়িংরুমে বসে থাকায় শব্দ পেয়ে দৌড়ে আসে। এসে দেখে কিচেনে এলাহি কারখানা। জিনিসপত্র সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। অর্ষার দিকে হতবাক দৃষ্টিতে তাকাল। অর্ষা চোখ নামিয়ে নিল। 


দর্শন ফিক করে হেসে দিল। হাসতে হাসতে বলল,

"এক মগ কফি বানাতে গিয়ে এই হাল করেছো? দেখি দেখি কী কফি বানিয়েছো?"

দর্শন একটা মগে কফি নিয়ে মুখে দিল। এক ঢোক খেয়ে অর্ষার দিকে তাকাল। অর্ষা ফ্যাকাশে মুখে ওর দিকে চেয়ে আছে। 

"আমি কখনো কফি বানাইনি।"


দর্শন মৃদু হাসল। কফি ভালো হয়নি। কিন্তু অর্ষা ওর জন্য চেষ্টা করেছে এটাই অনেক। এর চেয়ে বড় পাওয়া হয়না। দর্শন মুচকি হেসে বলল, 

"অনেক ভালো হয়েছে।"


.....


বিকেল চারটা। অর্ষা আর প্রিয়া রেডি হচ্ছে অর্পাকে আনতে যাবে। অর্ষা ড্রেসের সাথে ম্যাচ করে কানে দুল পরল। যেটা সকালে কিনে এনেছে। স্টনের ছোট দুলও ওর কাছে ভারী লাগছে। ও কানে কিছু পরে অভস্ত্য নয়। তাই হয়তো এমন লাগছে। প্রিয়া দেখে বলল, 

"বাহ! ভারী সুন্দর তো। ঠোঁটে একটু লিপস্টিক দে। দাঁড়া আমি দিচ্ছি।"

প্রিয়া অর্ষার ঠোঁটে জোর করে লিপস্টিক দিয়ে দিল। অর্ষা নিজেকে আয়নায় দেখে হাসফাস করছে।

"প্রিয়ু ভালো দেখাচ্ছে তো? আমার কেমন জানি লাগছে। মনে হচ্ছে বিশ্রী লাগছে। মুছে ফেলি?"


"মুছবি না খবরদার! সুন্দর লাগছে ট্রাস্ট মি।"


"আমার লজ্জা লাগছে। ধুর, দর্শন দেখলে কি বলবে?"


"বলবে সুন্দর লাগছে। এখন চল।"

অর্ষাকে ওই অবস্থায়ই জোর করে প্রিয়া নিয়ে গেল। 


অর্পাকে এক প্রকার জোর করেই অর্ষা আর প্রিয়া ওদের বাসায় নিয়ে আসে। অর্পা ওদের সাথে এসেছে ঠিক কিন্তু অর্ষার বাসায় আসার পর কেমন অস্বস্তি লাগছে। অর্পা ওকে বলছে,

"আমাকে হঠাৎ বাসায় কেন আনলে? রুশানের কথায় না তো?"


"আপু তুমি যদি বলতে দর্শনের কথায় কি-না তবে মানা যেত কিন্তু রুশান ভাইয়া? কে আমার আপন বেশি তুমি না রুশান ভাইয়া?"

অর্পা প্রতিউত্তরে কিছু বলল না। অর্ষা ওর হাত ধরে বলল, 

"আসো তোমাকে একটা জিনিস দেখাই ভয় পাবে না তো?"

"কি দেখাবে?"

ভ্রু কুঁচকে অর্পা বলল।

"চলোই না।"

অর্ষা জোর করে ওর হাত ধরে গেস্ট রুমে নিয়ে গেল। গেস্ট রুম পুরো অন্ধকার। 

"রুম অন্ধকার কেন?"

"আমি লাইট অন করছি ওয়েট।"

অর্ষা লাইট অন করার আগেই ঠাস করে বেলুন ফুটে। অর্পা ভয়ে চিৎকার করে। সাথে সাথে লাইট জ্বলে উঠে। অর্পার মাথার উপর ফুলের পাপড়ি আর জড়ি কাগজ। অর্পা হতবাক, হতবিহ্বল। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। সামনে চেয়ে দেখে রুশান। রুশান রেড কালার লাভ সেপ বেলুন হাতে সামনে এগিয়ে আসে।

"হ্যাপি বার্থডে টু ইউ। হ্যাপি বার্থডে ডেয়ার অর্পা।"

অর্পা রুশানকে দেখে রেগে যায়। রুশান ওর রাগের ইয়ত্তা না করে ওর একদম কাছে এসে বলে,

"হ্যাপি বার্থডে জান। সরি এন্ড আই লাভ ইউ। প্লিজ সরি। আর হবে না।"

অর্ষা আর প্রিয়া পেছনে থেকে সরে যায়। দর্শন কিচেনে কফি বানাচ্ছে। অর্ষা কিচেনে গেল। দর্শন যত্ন সহকারে কফি বানাচ্ছে। একটা জিনিসও এলোমেলো নেই। সব গুছানো, সাজানো। কিচেন একটুও নোংরা হয়নি। অথচ সকাল বেলায় কফি বানাতে গিয়ে ও পুরো কিচেন নাজেহাল করে ফেলেছিল। দর্শন ওকে দেখে বলল,

"খালাকে জিজ্ঞেস করে সরঞ্জাম কি কোথায় আছে জেনে নিয়েছি। তোমাকে বিরক্ত করিনি নিজেই বানাচ্ছি।"

অর্ষা মনে মনে বলছে আমি ভালো পারি না তাই নিজে বানাচ্ছো আমি বুঝেছি মিস্টার। 

দর্শন কফিতে একবার চুমুক দিয়ে অর্ষার দিকে তাকাল। ওর দিকে কিছুটা এগিয়ে এল। অর্ষা ওর কাছে আসায় ঘাবড়ে গেল। বুক ধুকপুক করছে। ওর মোহনীয় চাহুনিতে হকচকিয়ে গেল। দর্শন এভাবে দেখছে কেন ওকে। 

"তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। নিজেকে এভাবেই সাজাবে ভালো লাগবে।"

অর্ষার কিছু মুহুর্তের জন্য নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। দর্শন মুচকি হেসে সরতেই শ্বাস এল।


রুশান অবশেষে অর্পাকে মানাতে সক্ষম হয়েছে। অর্পার রাগ ভেঙেছে। ওরা সবাই মিলে কেক কেটে আড্ডা দিয়ে যে যার বাড়ি গিয়েছে। 


দর্শনের ঘুম হচ্ছে না। ছটফট করছে। অর্পা আর রুশানের সম্পর্ক তো ঠিক করে এল কিন্তু ওর আর অর্ষার সম্পর্ক? কেমন নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। অর্ষা আজ ওকে মিথ্যা বলেছে। অর্ষার চোখ দেখেই বুঝেছে অর্ষা মিথ্যা বলেছে। দর্শন সব জেনে-বুঝেও চুপ ছিল। অর্ষা কেন মিথ্যা বলল? ছেলেটা যে প্লাবন কেন বলেনি? শপিংমলে, কলেজে, রাস্তাঘাটে এমনকি ওর বিল্ডিংয়ে কত মানুষ আছে যারা ওকে চায়। একদিন তো দর্শন ব্যস্ত হয়ে পড়বে। সামনে ওর প্রি টেস্ট তারপর টেস্ট তারপরই এইচএসসি পরীক্ষা। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি। কত লড়াই, কত পরিশ্রম, কত টেনশন। এতকিছুর মধ্যে যদি অর্ষাকে সময় দিতে না পারে অর্ষাকে কি ওকে ভুলে যাবে? বেছে নেবে এদের মধ্যে একজন? ওর ভালোবাসার পরিণতি কি হবে? তামিমের মতো? 

দর্শন অন্ধকারে হাতরে ব্রেসলেটটা বের করল। অর্ষাকে আজ দিতে ভুলে গেছে। দর্শন ব্রেসলেটের দিকে গভীর ভাবে তাকাল। তারপর চোখে ভয়াবহতা ফুটিয়ে বিরবির করে বলল, "এর কৈফিয়ত তোমাকে দিতে হবে অর্ষা।" 


অর্ষা কলেজে গিয়ে হুলস্থুল কাণ্ড বাঁধিয়েছে। তার কারণ দর্শনের পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার পর দু'জন দেখা করে, ক্লাসের ফাঁকে সময় কাটায়। কিন্তু আজ কলেজে গিয়ে দর্শনের দেখা পায়নি। কল করেও রেসপন্স পায়নি। ওর খুঁজে ক্লাসে গেলে ততক্ষণে ওর ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। অপেক্ষা করতে করতে ওর নিজের ক্লাস শুরু হয়ে যায়। দু ক্লাস শেষ করে দর্শনকে আবারও কল দেয় কিন্তু এবারেও কোনো রেসপন্স নেই। তাই নিজের পরের ক্লাস রেখে রাগান্বিত হয়ে দর্শনের ক্লাসে গেল। দর্শন ক্লাসে নেই, লাইব্রেরিতে নেই এমনকি ক্যান্টিনেও নেই। হঠাৎ যেন উধাও। কিন্তু এমন হওয়ার কথা নয়। দর্শন কি ইচ্ছে করে ওকে এড়িয়ে চলছে? কিন্তু কেন? গতকাল অবধি তো সব ঠিক ছিল। আজ হঠাৎ কি হলো? অর্ষার মনে ভয়ের দানা বেঁধেছে। দর্শন এমন করছে কেন? মনটা অশান্ত, বিভ্রান্ত। চোখ ছলছল করছে। কিছু ভালো লাগছে না। চুপচাপ বসে আছে ক্যাম্পাসে। 

দর্শন ওর বাম পাশ দিয়ে বন্ধুদের সাথে যাচ্ছে। দর্শনের কন্ঠ শুনে অর্ষা বামে তাকায়। দর্শন ওকে দেখেনি। দেখেনি না-কি দেখেও না দেখার ভান করছে? অর্ষা ওর দিকে চেয়ে আছে। কিছুদূর যাওয়ার পর যে যার মতো আলাদা হয়ে গেল। দর্শন লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছে। অর্ষা দৌড়ে গেল দর্শনের কাছে। দর্শনের সামনে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। বোঝার চেষ্টা করছে দর্শনকে। দর্শনের চেহারা দেখে কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। 


দর্শন ওর ভাবনায় ছেদ ধরিয়ে বলল,

"কিছু বলবে? আমাকে লাইব্রেরিতে যেতে হবে।"


অর্ষা শুধু বলল,

"তুমি কি আমাকে এভয়েড করছো?"

অর্ষার চোখে কাতরতা। 


দর্শন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 

"এভয়েড কেন করব?"


অর্ষা স্মিত হাসল,

"ফোন বন্ধ, দেখা করছো না, কথা বলতে চাইলে বলছো আমি কিছু বলব কি-না।"


দর্শন ব্যস্ততা দেখিয়ে বলল, 

"পড়ার চাপ যাচ্ছে প্রচুর। সামনে পরীক্ষা জানোই তো। পড়ার চাপ থাকলে তোমাকে সময় কম দেব এটা তো আগে থেকেই বলা। তবুও তোমার মনে হচ্ছে আমি এভয়েড করছি।"


দর্শন ক্ষনিকের জন্য থামল তারপর আবারও বলল, 

"কিছুদিন পরে সময় দেই না এই অজুহাতে ব্রেক আপও করতে চাইবে। চারপাশে তোমাকে চাওয়ার মানুষ তো কম না।"


অর্ষা খানিকটা বিস্মিত হলো। দর্শন কোন স্বরে কথা বলছে? কেন বলছে? চাওয়ার মানুষ কম না মানে কি?


দর্শন অর্ষার চোখের দিকে তাকাল। এক ঝিল পানি টইটম্বুর সেখানে। তবুও কঠিন হলো। কঠিন স্বরে কথা বলবে আজ।

অর্ষার ছলছলে চোখে বলল,

"এমন করে কেন বলছো? আমি কি করেছি?"


কন্ঠে কাঠিন্যে এনে বলল, 

"এত দ্রুত ভুলে গেলে? প্রতিটি সম্পর্কের মূল হলো ভরসা, বিশ্বাস। তুমি কি তার যোগ্য? গতকাল কেন মিথ্যা বললে অর্ষা? প্লাবন ছেলেটাকে কেন লুকালে?"


অর্ষা ধরা পড়ে যাওয়ায় মিইয়ে গেল। চোখ নামিয়ে নিল। দর্শন তাহলে গতকাল জেনে ফেলেছে। জেনেও না জানার ভান করে ছিল। ভেতরে ভেতরে ফুঁসেছে। দর্শনের দিকে আড়চোখে তাকাল। তারপর আবার চোখ সরিয়ে নেয়। দর্শনের মুখে ব্যথাতুর হাসি।

"বলেছি না তোমাকে চাওয়ার লোকের অভাব নেই। আমাকে কী প্রয়োজন?"


অর্ষা ওর চোখের দিকে অসহায় ভাবে চেয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে বলল, 

"তোমাকেই আমার প্রয়োজন। আমাকে ভুল বোঝো না। গতকাল শপিংমলের ছেলেদের উপরে রেগে গিয়েছিল। আমি চাইনি তোমার মুড খারাপ হোক। শুধুমাত্র তোমার মুডের কেয়ার করেছি আর কিছু না।"


"আচ্ছা, তোমাকে একটা পায়েল দিয়েছিলাম বলেছিলাম সব সময় পায়ে রেখো তুমি কি করেছো?"


অর্ষা মিনমিন করে বলল, 

"আসলে আমি অভ্যস্ত নই আর তাছাড়া আমি চাইনি তোমার দেওয়া উপহারটি নষ্ট হয়ে যাক। আমি সেটা যত্ন করে রেখে দিয়েছি।"


"উপহারদাতা কি তাই চেয়েছিল?"


অর্ষা নিশ্চুপ। কোন উত্তর নেই ওর কাছে। ওর চিন্তাভাবনা আর দর্শনের চিন্তাভাবনা যে এক নয়।

"আমার বুঝতে ভুল হয়েছে। তাই বলে এভাবে শাস্তি দেবে?"


দর্শন প্রচন্ড রেগে গেল। চিৎকার করে বলল, 

"আরে ভাই আমিও মানুষ। আমারও কষ্ট হয়, ব্যথা পাই। তুমি জানো গতকাল রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। কতশত চিন্তা মাথায় কিলবিল করেছে। তোমাকে তো কিছুই বলিনি। তুমি এর চেয়ে বেশি শাস্তির যোগ্য।"


দর্শন ওকে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্ষা ওর পেছনে পেছনে যাচ্ছে। 

আকুতি মিনতি করছে। 

"দর্শন প্লিজ আমাকে মাফ করে দেও। তুমি যা বলবে আমি তাই করব। যেভাবে বলবে সেভাবেই চলব। প্লিজ আমাকে মাফ করে দেও। আমি আর কখনও এমন ভুল করব না।"


দর্শন থেমে গেল। ওর দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে ধমকে বলল, 

"দেখো আমার মাথা গরম হয়ে আছে। পেছনে পেছনে একদম আসবে না। লিভ মি এলোন।"


অর্ষা চুপসে গেল। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। না ঠিক দাঁড়াতে পারছে না। পায়ের তল থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে৷ দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা যেন হারিয়ে ফেলেছে। দর্শন ওর দিকে আর তাকাল না। একবারের জন্যও তাকাল না। নিজের গন্তব্যে হেঁটে চলে গেল। 


দর্শন লাইব্রেরিতে গিয়ে বসে তো আছে কিন্তু পড়াশোনা কিছু করতে না। সবার থাকে আড়ালে থাকার জন্য। দু'হাতে মাথা চেপে ধরে মাথা নিচু করে আছে। চোখ ফেটে কান্না আসছে৷ কিন্তু ও তো ছেলে! ছেলেদের কান্না করতে নেই। তাও আবার লোকালয়ে জনসম্মুখে। অর্ষাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছে। এতটা ভালো বেসেছে যে ওকে হারানোর কথা ভাবতে পারে না। ওকে নিজের কন্ট্রোলে রাখতে চায়। অর্ষার মনে ওকে, ওর ভালোবাসাকে এমন ভাবে স্থাপন করতে চায় যাতে হাজার মাইল দূরে কিংবা হাজার হাজার দিন কথা না হলে, দেখা না হলেও যাতে ওকে ভুলতে না পারে, ওকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসতে না পারে। এর জন্য অর্ষাকে কষ্ট দিবে, বোঝাবে, অর্ষাকে নিজের মতো গড়বে। 


....


অর্ষা কলেজের তিনতলা বিল্ডিংয়ের পেছনে চুপচাপ বসে আছে। ঝোঁপের মধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকা দিন দুপুরে ডাকছে। অর্ষার কানে ভীষণ লাগছে। মাথা ধরে গেছে। মাথা ধরে চোখের পানি ফেলছে। প্রিয়াকে মেসেজ করেছে। প্রিয়া ওকে খুঁজতে খুঁজতে বিল্ডিংয়ের পেছনে চলে এসেছে। ওকে এভাবে বসে থাকতে দেখে বুকটা ধুক করে উঠল। কিছু একটা হয়েছে তবে সেটা অবশ্যই সাংঘাতিক। প্রিয়া বিচলিত হয়ে ছুটে গেল অর্ষার কাছে। 

ওর পায়ের শব্দে চোখ তুলে তাকাল অর্ষা। ওর লাল কান্নারত চোখ দেখে প্রিয়া আতংকিত হয়ে পড়ে। 


ওর গালে হাত রেখে বিচলিত কন্ঠে বলল, 

"কী হয়েছে অর্ষা? এখানে এভাবে বসে আছিস কেন? আর কাঁদছিস কেন? কী হয়েছে বল। কি অবস্থা করেছিস চেহারার?"

প্রিয়া ওর কপালের উপর থেকে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিচ্ছে।


অর্ষা প্রিয়াকে সব খুলে বলল। প্রিয়া সব শুনে বলল,

"একটু রাগ হয়েছে ভাইয়ার। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই শান্ত হ।"


অর্ষা কান্না আরো বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 

"ওকে এত রাগতে কখনো দেখিনি। আমি ভুল করেছি কিন্তু তাই বলে.... ও যদি আমাকে ক্ষমা না করে? যদি ব্রেক আপ করে দেয়? আমি বাঁচব না প্রিয়া। অনেক কষ্ট সহ্য করে, অনেক সাধনা করে ওকে পেয়েছি। আবার যদি হারিয়ে ফেলি? আমার ভয় করছে প্রিয়া।"


প্রিয়া ওকে শান্তনা দিয়ে বলল, 

"কিচ্ছু হবে না। ধৈর্য ধর। ভাইয়ার রাগ কমলে সামনে গিয়ে সব বুঝিয়ে বলিস।"


অর্ষার চেহার হঠাৎ পালটে গেল। কান্না রাগে পরিণত হলো। তীক্ষ সুরে চোখে আগুন নিয়ে বলল, 

"এসব তামিম করেছে। তামিম ওর মনে সন্দেহ ঢুকিয়েছে। ওর সাথে যা হয়েছে তা দর্শনের সাথে হবে সেটাই বুঝিয়েছে। দর্শনকে সম্মোহন করে নিয়েছে। দর্শন তাই ভাবছে আমিও ওকে ধোকা দেব৷ চলে যাব ওকে ছেড়ে। তামিমকে আমি ছাড়ব না।"


প্রিয়া ওকে বাঁধা দিয়ে বলল, 

"কাম ডাউন। বোকামি করিস না। এতে দর্শন আরো রেগে যাবে। কে কি বলল তাতে কী? তুই ওকে ভালোবাসিস এটা তো সত্য। তোর ভালোবাসা সত্য হলে দর্শন ঠিক বুঝবে। বুঝে নিজেই তোর কাছে আসবে। তুই একটু অপেক্ষা কর।"


"পারছি না আমি। কিছু ভালো লাগছে না। অসহ্য লাগছে সব। আমি বাসায় যাচ্ছি। আজ আর ক্লাস করব না।"


প্রিয়া দেখতে পাচ্ছে অর্ষা কিভাবে ভেঙে যাচ্ছে। ওর ভেতরের অবস্থা বুঝতে পেরে বলল,

"ঠিক আছে বাসায় চলে যা৷ কিন্তু রাগের মাথায় কোন স্টেপ নিবি না। তামিমের সাথে উল্টো পালটা কিছু করবি না। রাতের আগে দর্শনকে কল দিবি না। আমি তোকে কল করে সব খোঁজ নেব। চল তোকে গেটের বাইরে ছেড়ে আসি।"

অর্ষার সাথে প্রিয়া গেট অবধি গেল। গেট পার করে একটা রিকশা নিল। গাড়ি আসতে অনেক সময় লাগবে। তাই রিকশা নিয়ে নিল।


....


কলেজ ছুটি। দর্শন ওর ববন্ধুদের সাথে বের হচ্ছে ক্লাস থেকে। বন্ধুরা হাসোজ্জল গল্পে মশগুল। রুশান এটা সেটা বলে যাচ্ছে বাকিরা সঙ্গ দিচ্ছে। হঠাৎ দর্শনের দিকে চোখ গেল। ও চুপচাপ, অন্য চিন্তায় বিভোর। ওকে দেখে বুঝা যাচ্ছে কিছু একটা হয়েছে। অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে হাঁটতে হালকা হুচট খেল তবুও ভাবনা থেকে বের হলো না। রুশান ভালো করে ওর মুখের দিকে তাকাল। মুখটা ফ্যাকাশে, বিষন্নতায় ঘেরা। 

রুশান ওর হাত ধরল। দর্শন চমকে গেল। চকিত দৃষ্টিতে রুশানের দিকে তাকাল। 

"কি হয়েছে তোর? এমন মনমরা লাগছে কেন?"


দর্শন সামনের দিকে তাকাল। সামনের দিকে চেয়ে নিজেকে লুকিয়ে বলল,

"কই কিছু হয়নি। টায়ার্ড লাগছে খুব। তাই হয়তো এমন দেখাচ্ছে।"


"কি লোকাচ্ছিস? অর্ষার সাথে কিছু হয়েছে?"


দর্শন নিশ্চুপ কোন উত্তর দিচ্ছে না। নিরবতা সম্মতির লক্ষণ। রুশান যা বোঝার বুঝে নিল। গেটের বাইরে বের হয়ে দর্শনকে রাস্তার এক পাশে নিয়ে গেল।

"এইবার ঝট করে কাহিনি বল তো?"


দর্শন ওকে সব খুলে বলল। রুশান সব শোনার পর এমন ভান করল যেন কিছুই হয়নি। তারপর প্রশ্ন করল, 

"ওকে কারণ জিজ্ঞেস করিসনি?"


"হ্যা, বলে কি-না আমার মুড খারাপ করতে চায়নি। ওই মুহূর্তে নাকি আমার মুড ভালো থাকা জরুরি ছিল।"


রুশান মৃদু হাসল। তারপর বলল, 

"অর্ষাকে আমি বাচ্চা মানুষ মনে করতাম। ওর আচরণগুলোই এমন বাট ও অনেক বুদ্ধিমান।"


"মানে?"


"তুই আমাকে মানে জিজ্ঞেস করছিস? বেকুব একটা। ও তো ঠিকই বলেছে। তখন তোর মুড অফ হলে অর্ষারও মুড অফ হত। সব আয়োজন ভেস্তে যেত কিছুই হত না। এত প্লান, এত আয়োজন।"


"তাই বলে এতকিছু লুকাবে আমার কাছ থেকে? ওই ছেলে ওকে এতদিন ধরে বিরক্ত করছে, ঘটনা দুই পরিবারের মধ্যে যাওয়ার পরও আমাকে জানায়নি। সিম চেঞ্জ করায় কথায় কথায় বলে ফেলেছিল। নিজ থেকে বলেনি। মানে আমার গুরুত্বই নেই?"


"তোকে বলেনি মানে তোর কোন গুরুত্ব নেই ওর কাছে এটা কোন লজিক্যাল কথা না। কারণ আরো অনেক থাকতে পারে। অল্প সময়ের সম্পর্ক তোদের। কতদিন হলো? এত অল্প সময়ে তুই ওর মনের কতটুকু জায়গা স্পর্শ করতে পেরেছিস? যতটুকু পেরেছিস ততটুকুই জেনেছিস সিম্পল।"


"মানে আমি সময় দিতে পারছি না। ভবিষ্যতে হয়তো আরো পারব না। আমার অবস্থাও কী তামিমের মতো হবে?"


 রুশান হতাশ হলো ওর কথা শুনে। বিরক্ত নিয়ে বলল, 

"উফফ! তামিম তামিম করে পাগল হয়ে যাচ্ছিস। তামিমের সাথে যা হয়েছে তা কি সবার সাথে হবে? এত ইনসিকিউর হলে হয় না। অর্ষা যদি তোকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসে আর তুই নিজের ভালোবাসা দিয়ে ওকে ধরে রাখতে পারিস তবে এ-সব ফ্যাক্ট না। শুধু শুধু নিজের মাথাটা খারাপ করিস না। অর্ষার সাথে সব ঠিক করে নে।"


অর্ষা সারাদিন থম মেরে বসে থেকে রাতে মোবাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করেও কল দেয়নি দর্শনকে। ভীষণ অভিমান জমেছে মনে। অভিমানগুলো অশ্রু হয়ে ঝড়েছে। একটু না-হয় ভুল করেছে তাই বলে এত কথা শোনাবে, এমন রুড ব্যবহার করবে? ওকে না ভালোবাসে? ভালোবাসার মানুষকে কেউ এভাবে কষ্ট দেয়? খারাপ ব্যবহার করার পর একবার সরি পর্যন্ত বলল না। এতটা অবহেলা অর্ষা মেনে নিতে পারছে না। সব মেনে নিলেও মানুষের অবহেলা মেনে নিতে পারে না। যারা অবহেলা করে তাদের থেকে ডিস্টেন্স বজায় রাখে। একা থাকবে তবু কারো অবহেলা নিয়ে বাচবে না। তাই তো করে এসেছে ছোট থেকে। 

এভাবে একটা দিন একটা রাত পার হয়ে গেল। দর্শন কল মেসেজ কিছুই দেয়নি। অর্ষা বুঝতে পারছে না এই মুহূর্তে কি করা উচিত। কলেজে যেতে ইচ্ছে করছে না। কলেজে না গেলে বাবার কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে। তাই কলেজের ড্রেস পরে বের হয়েছে ঠিকই কিন্তু কলেজে যাবে না। শাহবাগ যাবে। ফুলের রাজ্যে গিয়ে হারিয়ে যাবে। তারপর টিএসসি চত্বরে ঘুরবে, ঢাকা ভার্সিটির ক্যাম্পাসে ঘুরবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। কলেজের সামনে গাড়ি থামায় রোজকার মতোই। কলেজে যেতে ইচ্ছে করছে খুব। দর্শনকে দেখতে ইচ্ছে করছে। বাসায় থেকে যেসব প্ল্যান করেছে তার কিছুই এখন মনে ধরছে না। অর্ষা কলেজের গেট থেকে সামনের দিকে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে জানা নেই। হেঁটে চলেছে নিজের মতো। যখন ক্লান্ত তখন বাজে বেলা বারোটা। নিরিবিলি রাস্তা। মাঝেমধ্যে দু একটা মানুষ হেঁটে যায় আর উচ্চস্বরে সাইরেন বাজিয়ে টেক্সি, প্রাইভেট কার আর মোটর বাইক যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে সিএনজি আসছে দু একটা। অর্ষা রাস্তার পাশে গাছের ছায়ায় বসল। ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করল। ক্ষিধে পেয়েছে খুব। আশেপাশে দোকানও নেই। ব্যাগ থেকে পানি বের করে পিপাসা মেটাল। অর্ষা দোকানের খুঁজে উঠে দাঁড়াল। 



চলবে?

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url