প্রেম তুমি - Prem Tumi । মিষ্টি প্রেমের গল্প - পর্বঃ 10

 

প্রেম তুমি - Prem Tumi । মিষ্টি প্রেমের গল্প - পর্বঃ 10

প্রেম তুমি 

ফাবিহা নওশীন 

পর্বঃ ১০


অর্ষা ফুটপাতে বসে বসে চিপস আর কোক খাচ্ছে। বড় রাস্তার উপারে একটা বাড়ি তার পাশে বড় পুরনো কোয়ার্টার। তার পাশে একটা অফিস। অর্ষা বাড়ি, অফিসগুলো দেখছে। ওর পেছনে সারি সারি নারকেল আর সুপারি গাছ। কিছুক্ষণ পর পর পাপচারীরা উদ্ভট দৃষ্টি দিয়ে ওর দিকে তাকায়। অর্ষা এসব কেয়ার করছে না। ও ওর মতো খাচ্ছে। 

কাঁধের ব্যাগটা পাশে রেখেছে। ব্যাগের উপর একটা ড্রাই কেক। তার পাশে কোক। অর্ষা চিপ্সের প্যাকেট ফেলে ড্রাই কেকটা হাতে নিল। প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে। প্যাকেট ছিড়ে ভেতরের দিকে তাকাতেই মোবাইল বেজে উঠল। অর্ষা বিরক্ত হলো কিঞ্চিৎ। কে ওর শান্তি নষ্ট করছে। কেকটা রেখে মোবাইল বের করল। মোবাইল বের করে স্কিনের দিকে তাকাল। প্রিয়া কল করেছে। অর্ষা কল রিসিভ করল। 


প্রিয়ার বিচলিত কন্ঠস্বর,

"অর্ষা কই তুই?"


অর্ষার বেখেয়ালি উত্তর, 

"জানি না।"


প্রিয়া রেগে বলল,

"এই এটা কেমন উত্তর? তুই কোথায় বল।"


অর্ষার ভাবান্তর হলো না। 

"আমি সত্যিই জানি না। একচুয়েলি জানার চেষ্টা করছি না। শুধু সময় আর পরিবেশটা উপভোগ করতে চাই।"


প্রিয়া ওর কথার আগামাথা বুঝতে পারছে না। 

"কী উপভোগ করতে চাস? সময় আর পরিবেশ! মানে কী? কই তুই?"


অর্ষা রাগের সুরে বলল, 

"বললাম তো আমি জানি না। কল কাট।"


প্রিয়া ওকে শান্ত করে বলল, 

"ওকে ওকে। শুধু বল তোর সাথে কে আছে?"


"কেউ নেই। আমি একা। রাস্তার ধারে বসে কেক খাচ্ছি। খাবি?"

অর্ষা কেকে এক বাইট দিল।


প্রিয়া আতংকিত হলো। আতংকের সুরে বলল, 

"কলেজে আসিস নি কেন?"


"কলেজেই এসেছিলাম কিন্তু ভেতরে যেতে ভালো লাগছিল না। অস্থির লাগছিল। মুক্ত বাতাসের প্রয়োজন ছিল। তাই একা একা হাঁটতে হাঁটতে এখানে চলে এসেছি।"


প্রিয়া কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল,

"এই অর্ষা কোথায় গিয়ে বসে আছিস তুই? আমার ভয় লাগছে খুব। ঠিকানা বল আমি আসছি।"


"কাউকে লাগবে না আমার। কল রাখ।"

অর্ষা কল কেটে দিল। প্রিয়া মোবাইলের স্কিনের দিকে চেয়ে রইল। অর্ষার মাথায় পাগলামি চেপেছে এখন কী করবে বুঝতে পারছে না। 


দর্শন ক্লাসে দ্বিতীয় বেঞ্চে বসে চুপচাপ খাতায় কি যেন লিখছে। প্রিয়া দ্রুতগতিতে ক্লাসে ঢুকে দর্শনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঝাড়ের বেগে আসার জন্য দর্শনসহ আশেপাশের অনেকেই টের পেল। দর্শন চকিত হয়ে ওর দিকে তাকাল। প্রিয়া হাপাচ্ছে। কিছু একটা বলতে চাইছে। আগে ওর শ্বাস প্রয়োজন। ওর আশেপাশে অর্ষাকে না দেখে একটু অবাক হলো। 

"কী হয়েছে প্রিয়া?"


প্রিয়া হাপানো বন্ধ করে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল, 

"আপনি এটা কী করলেন? অর্ষা পাগলামি করছে।"


দর্শন খাতা কলম রেখে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। ওর কপালে চিন্তার রেখা। অজানা আতংকে বুক কেঁপে উঠল।  

"কী করেছে?"


"সকালে কলেজের সামনে নেমেও ভেতরে ঢুকেনি। একা একা কোথাও একটা চলে গেছে। কিন্তু কোথায় তা জানে না। আমি কল করেছি ও বলল জানে না কোথায় আছে ইনফ্যাক্ট জানার প্রয়োজন মনে করছে না। ওখানে না-কি ওর ভালো লাগছে। অচেনা জায়গা কোন বিপদ হলে? আর ও যেমন মেয়ে কেউ এসে উল্টাপাল্টা কিছু বললে স্থান, পাত্র বিবেচনা করবে না। নিজেই গণ্ডগোল শুরু করে দিবে। ওর সাথে কেন এমন করেন? জানেন তো ও কতটা ক্রেজি।"


দর্শনের মনে অনুতাপের চেয়ে চিন্তা হচ্ছে বেশি। অর্ষা কোথাও চলে গেল। দর্শন মোবাইল বের করে কল করল। কিন্তু কল রিসিভ হচ্ছে না। কিছুক্ষণ পরে সুইচড অফ বলছে। দর্শন আরো চিন্তায় পড়ে গেল। সেই সকাল থেকে মেয়েটা রাস্তায় ঘুরছে। ও ব্যাগপত্র গুছিয়ে কলেজ থেকে বের হয়ে গেল। বাইকে করে কলেজের ডানে-বামে রাস্তায় খুঁজে এসেছে কিন্তু পায়নি। ওকে না পেয়ে কান্না পাচ্ছে। নিজের প্রতি ভীষণ রাগ হচ্ছে। কেন ওর সাথে রাগারাগি করতে গিয়েছিল। ওকে না পেয়ে দুইটা নাগাদ কলেজে ফিরে এল। ওর বন্ধুদের সব জানাল। প্রথমত রুশান কতক্ষণ ওকে ঝারল তারপর সবাই এক সাথে খোঁজাখুঁজি করলো। প্রিয়া গেছে ওর বাসায় যদি বাসায় যায় কিন্তু না অর্ষা ফিরেনি। বাসায় না ফেরায় আরো ভয় পেয়ে গেল প্রিয়া। ওর বাবাকে জানাতে চাইল একবার তারপর আবার সময় নিল। প্রিয়া দর্শনকে জানিয়েছে অর্ষা বাসায় আসেনি। দর্শন কেঁদে দিচ্ছে প্রায়। ওর বন্ধুরা শান্তনা দিচ্ছে। কি করবে বুঝতে পারছে না। অর্ষা এমন কেয়ারলেস, হাইপার মেয়ে জানা ছিল না।


পাঁচটা বেজে গেছে। দর্শন এখনো বাসায় ফেরেনি। ওর বন্ধুরা ওর সঙ্গ দিচ্ছে। সবার তাড়া থাকলেও বন্ধুকে এ অবস্থায় একা ফেলে যেতে পারেনি। বন্ধুও তো সুখ-দুঃখের সঙ্গী। গাছের গুড়ির উপর চুপ করে বসে আছে দর্শন। ওর মোবাইল বাজছে। তামিম কল রিসিভ করল। 

"হ্যালো ভাইয়া, অর্ষা কিছুক্ষণ আগে বাসায় এসেছে। আমি ল্যান্ডলাইনে কল দিয়েছিলাম।"

তামিম কল কেটে দিয়ে চিৎকার করে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,

"অর্ষা বাসায় ফিরেছে।"


দর্শন ওর কথা শুনে যেন প্রাণ ফিরে পেল। ঢোক গিলে উঠে দাঁড়ায়। শুষ্ক ঠোঁটে হাসি ফুটেছে। চোখ চকচক করছে। 

উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল, 

"আমি যাচ্ছি।"


......


অর্ষা গোসল করে লং স্কাট পরে ভেজা চুলে রুম থেকে বের হয়ে চিৎকার করে বলল, 

"আমার মাথা ধরেছে একটু কফি দেন, খালা।"


তারপর ওর চোখ চড়কগাছ। দর্শন ওর বাড়িতে। সাথে প্রিয়া। প্রিয়ার মুখ থমথমে। দর্শনের দিকে তাকাল। ওর চোখমুখ লাল হ'য়ে আছে। মনে হচ্ছে আস্ত খেয়ে ফেলবে। অর্ষা ভয়ভয় চোখে তাকাল। 

অর্ষা নার্ভাস হয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, 

"তুমি?"


প্রতি উত্তরে দর্শন ওর দিকে এগিয়ে গেল। অর্ষার দৃষ্টি দর্শনের দিকে। দর্শন ওর সামনে গিয়ে আচমকা কষিয়ে চড় মারল অর্ষাকে। অর্ষা আকস্মিক ঘটনায় বিস্মিত, হতবাক, হতবিহ্বল। বিস্ময়ে ওর মুখ হা হয়ে গেল। গালে হাত দিয়ে অবিশ্বাসের চোখে দর্শনের দিকে চেয়ে আছে। প্রিয়া নিজেও হতবাক। প্রিয়া নিজের জায়গা থেকে এক চুলও নড়েনি। অর্ষা তারপর প্রিয়ার দিকে তাকাল। প্রিয়া ওর দিকেই চেয়ে ছিল। চোখে চোখ পড়তে সরিয়ে নিল। তারপর আবার দর্শনের দিকে তাকাল। 


দর্শন চোখমুখ শক্ত করে বলল, 

"কোথায় গিয়েছিলে তুমি? সবাইকে টেনশন দিতে মজা লাগে? আমাকে শাস্তি দিচ্ছিলে তাই না? পেয়েছি তো আমি। চার চারটে ঘন্টা ছটফট করেছি, হন্য হয়ে এদিক সেদিক খুঁজে বেরিয়েছি।

তুমি জিতে গেছো। তালি দেওয়া উচিত। হ্যাপি নাও?"


অর্ষা কিছুই বুঝতে পারছে না। দর্শন ওকে খুঁজেছে! কেন? নিশ্চয় প্রিয়া বলেছে। অর্ষার গাল বেয়ে পানি পড়ছে। কান্নারত অবস্থায় বলল, 

"বেশ করেছি। আমাকে কষ্ট দিলে এভাবেই হারিয়ে যাব। আমাকে তুমি খুঁজে পাবে না যদি না ধরা দেই। অভিমান বেশি হলে ধরাও দেব না।"

অর্ষা ঠোঁটে ফোলাল। দর্শনের বুক ধুক করে উঠল। আচমকা অর্ষাকে জড়িয়ে ধরল। অর্ষা আরেক দফা বিস্মিত, হতবাক, হতবিহ্বল। চোখ গোলগোল করে চেয়ে আছে। শরীর কাঁপছে ব্যাপকভাবে। অর্ষার ভেজা চুলের পানি দর্শনের মুখে পড়ছে।

"আ'ম সরি অর্ষা। প্লিজ আর এমন করো না। প্রাণ পাখিটা উঠে যাচ্ছিল। খুব কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল একবার তোমাকে পেলে সারাজীবনের জন্য বুকে জড়িয়ে রাখব। কোথাও যেতে দেব না। তোমাকে বড্ড ভালোবাসি আমি।"

প্রিয়া ওদের এভাবে দেখে বসার ঘর থেকে রান্নাঘরে চলে গেল। 

ওরা দু'জন দু'জনার মান-অভিমান মিটিয়ে নিচ্ছে।

দর্শন যাওয়ার সময় ব্যাগ থেকে ওর জন্য কেনা ব্রেসলেটটা ওর ঘরে রেখে যায়।


নভেম্বর একুশ। আগামীকাল দর্শনের আঠারোতম জন্মদিন। সবাইকে বাসায় ইনভাইটেশন দিয়েছে। অর্ষা ভেবে পাচ্ছে না দর্শনকে কি গিফট দেওয়া যায়। সবার সাথে আলোচনা করেও লাভ হয়নি। রাতে ভিডিও কলে কথা বলার সময় তাই দর্শনকেই জিজ্ঞেস করল,

"আচ্ছা তোমাকে কী গিফট দেব?"


দর্শন ক্যালকুলেটরে কিছু একটা হিসাব করছিল। ওর কথা শুনে স্মিত হাসল। তারপর ওকে কিছুক্ষণ অপলক দেখে ঘোর লাগা কন্ঠে বলল, 

"তোমাকে দেবে। অন্য এক তোমাকে চাই যে নিজেকে আমার নিকট উপহার স্বরূপ সমর্পণ করবে, আমাকে মুগ্ধ করবে। পারবে তো?"


অর্ষা আগামাথা কিছু বুঝতে পারল না বোকার মতো শুধু মাথা নাড়াল। দর্শন আবারও হাসল। 


অর্ষা পড়েছে বিপদে। দর্শনের কথা কিছুই বুঝেনি অথচ হ্যা বলে এসেছে। তাই প্রিয়াকে কল দিল।প্রিয়া সব শুনে কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে বলল,

"ছিহ! দর্শন ভাইয়া এটা বলেছে?"


"হ্যা, ছিহ এর কি হলো?"


"ছিহ নয়তো কী? আমার তো মনে হচ্ছে তোকে রুম ডেটে নিতে চায়।"


"থাপ্পড় খাবি। ও এমন না।"


"এ কথার মানে তো এটাই দাঁড়ায়। সমর্পণ মানে কী?"


দু'জনেই কিছুক্ষণ চুপ থাকল। দু'জনের মধ্যে নিরবতা। অর্ষা নীরবতা ভেঙে সন্দেহ আর ভয় নিয়ে বলল,

"আসলেই কী দর্শন তাই চাইছে?"


প্রিয়া কনফিউজড হয়ে বলল,

"জানি না।"


ভোরের ঘুম অন্য সময়ের চেয়ে শীতল, আরামদায়ক ও নেশালো। প্রিয়া সেই নেশায় ডুবে আছে। গভীর ঘুমে যখন আচ্ছন্ন তখন কারো হিংসে হলো। ওর স্বাদের ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিল ফোন কল। খানখান হয়ে যাওয়া ঘুমের জন্য ভীষণ কান্না পেল। কল ধরবে না ভেবে বালিশে মুখ গুজল। কিন্তু আবারও রিং বাজল। ঘুমঘুম চোখে বাধ্য হয়ে মোবাইল হাতরে কাছে আনে প্রিয়া। কল রিসিভ করে চোখ বন্ধ করেই বলল,

"হ্যালো!"


"হ্যালো প্রিয়ু!"


প্রিয়া চোখ মেলল। মোবাইলের স্কিনে অর্ষার নাম্বার দেখে বিরবির করে বলল, 

"এই মেয়ে জীবনটা জ্বালিয়ে খেল। এই রাত-দুপুরে কোন ভূত চেপেছে আল্লাহ মালুম।"

তারপর সময় দেখল ভোর পাঁচটা বাজে। ওর কন্ঠও অনেক স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ ধরে জেগে আছে।

"এই তুই কী সারারাত ঘুমাসনি?"


"না, রিসার্চ করছিলাম।"


প্রিয়া খানিকটা অবাক হয়ে বলল,

"ঘুম বাদ দিয়ে কী রিসার্চ করছিলি?"


অর্ষা কিছুটা আমতা-আমতা করছিল,

"ওই আসলে দর্শন গতকাল কী বলেছিল।"


"রেজাল্ট?"


"পেয়েছি মেবি।"


"মেবি!"


"হ্যা, মেবি। কজ তুই আমার মাথায় উল্টো পালটা জিনিস ঢুকিয়ে দিয়েছিস তাই মেবিতে আঁটকে আছে। এখন আসল কথা শোন, আমাকে কলেজ ছুটির পর দু'ঘন্টা সময় দিবি।"


প্রিয়া চোখ বড়বড় করে বলল, 

"এটাই বলার জন্য কল দিয়েছিস?"


"হ্যা।"


প্রিয়ায় মেজাজ তুঙ্গে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 

"খুব ভালো করেছিস। মরে যাচ্ছিলি তো তাই কল করে আমার কাছ থেকে অক্সিজেন সাপ্লাই নিলি। তাই না? কু*ত্তী কলেজে গিয়ে বলা যেত না? এত ভোর বেলায় কল করেছিস কেন? ফোন রাখ।"

প্রিয়া ঝারি মেরে কল কেটে দিল। অর্ষা বোকা বোকা মুখ করে বসে রইল। যাকগে এখন একটু ঘুমানো যাক। অর্ষা ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিন্তু উত্তেজনায় ঘুম আসছে না। আজ দর্শনের জন্মদিন। সন্ধ্যায় ওদের বাড়িতে যাবে। নিজেকে কিভাবে সাজাবে এগুলোই শুধু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতে চোখের পাতায় ঘুম চলে এল। 


সকালে আকস্মিক ঘুম ভাঙতেই অর্ষা লাফিয়ে ওঠে। বিছানায় কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থাকে। বড় দেয়াল ঘড়ির দিকে চোখ যেতে বিছানা থেকে এক প্রকার দৌঁড়ে নামে। দ্রুত রেডি হয়ে নিল। আজ দর্শনের জন্মদিন। লেট করা চলে? তবুও লেট হয়ে গেল। দর্শন নিশ্চয়ই গাল ফুলিয়ে রেখেছে। 


অর্ষা দ্রুত কলেজে গেল। বেল পড়ে গেছে। ক্লাসে সম্ভবত টিচার চলে গেছে। দর্শনকে আঠারোতম জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো হলো না। কত কষ্ট করে রাত জেগে ইউটিউব দেখে কার্ড বানিয়েছে। অর্ষা কার্ডের দিকে চেয়ে মন খারাপ করল। এত আশা করে বানিয়েছে। বাধ্য হয়ে নিজের ক্লাসে চলে গেল। স্যার চলে গেছে। অনুমতি নিয়ে ক্লাসে গিয়ে বসল। মনে হচ্ছে সময় আজ যাচ্ছে না। বারবার ঘড়িতে সময় দেখছে। স্যারের পড়ানোর দিকে আগ্রহ নেই। তা কোন কালেই ছিল না তবে আজ একটু বেশিই নেই। ক্লাস শেষ হতেই দৌড়ে দর্শনের ক্লাসে যায় কিন্তু লাভ হলো না পরের ক্লাসের স্যার চলে গেছেন। অর্ষা হতাশা আর রাগ নিয়ে ফিরে এল। পুরো দিন এভাবেই গেল। দর্শনের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়নি। দর্শনকেও তৎপর হতে দেখা যায়নি। মনে হয় না ও দেখা করতে চায়। নিজ থেকে তো আসতে পারত কিন্তু আসেনি। হয়তো রাগ করে আছে। একদম ছুটির পর দর্শনের দেখা পেল। কিন্তু পার্সোনালি কথা বলা হয়নি। ওর বন্ধুরা ওকে ঘিরে ছিল বার্থডে বয় বলে কথা। তার উপর প্রিয়া পাগল করে ফেলছিল। ওর বাসায় যাওয়ার তাড়া আছে। এখুনি যদি ওর সাথে না যায় তবে সময় দিতে পারবে না। সব মিলিয়ে অর্ষা পড়েছিল বিপাকে। দর্শনকে ছোট করে একটা বার্তা পাঠিয়ে চলে যায় প্রিয়ার সাথে। 


~~~

সন্ধ্যা সাতটা। দর্শনের বাড়িতে পার্টি চলছে। পার্টিতে শুধু ওর কাজিন, পাড়ার বন্ধু আর কলেজের বন্ধুরা। ওর বাবা-মা, বোন ছাড়া অন্য কোন আত্মীয় এলাও নয় এই এই পার্টিতে, আত্মীয়দের মধ্যে শুধু সমবয়সী কাজিনরা থাকছে। দর্শন বাইরে কোথাও পার্টি রাখেনি বাবা-মার জন্য। তারা দু'জনেই ডক্টর। ব্যস্ত মানুষ। এত সময় করে উঠতে পারবে না। তাই বাড়িতেই এরেঞ্জ করেছে সব। দিশার দু'চার জন বন্ধুও এসেছে। ও ওদের নিয়ে ব্যস্ত। অর্পা আজ খুব সুন্দর করে সেজেছে। রুশান রসিয়ে রসিয়ে ওর রুপের প্রসংশা করছে। দর্শন কালো রঙের স্যুট, কালো সু পরেছে। ফর্মাল লুকে বেশ হ্যান্ডসাম লাগছে। ও কয়েকবার অর্ষাকে কল করেছে। কিন্তু অর্ষা কল রিসিভ করছিল না। শেষ বার কল রিসিভ করে বলেছে লেট হবে পৌঁছাতে। দর্শনের বেশ অভিমান হয়েছে। 

একটা চেয়ার টেনে বসে আছে চুপচাপ। অর্ষার প্রতি রেগে আছে। মনে মনে বলছে, কলেজেও লেট করে এসেছে। কাছে গিয়ে একবারও উইশ করেনি। ভালো করে কথা বলেনি। যাওয়ার সময় টেক্স করে চলে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। আজকে ওর জন্য এত স্পেশাল একটা ডে কিন্তু অর্ষা তার কোন মূল্যই দিল না। ভালোবাসার মানুষের কী উচিত ছিল না দিনটা আরো স্পেশাল করার? পার্টিতেও আসতে লেট হবে। আসার কী দরকার ছিল। না আসতো। দর্শন এসব ভাবতে ভাবতে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। 


অর্ষা আর প্রিয়া দর্শনদের ফ্ল্যাটের সামনে। দরজা খোলা রাখা তবুও ভেতরে ঢুকতে অস্বস্তি আর লজ্জা লাগছে। প্রিয়া বারবার ধাক্কাচ্ছে আর ফিসফিস করে বলছে,

"চল, তুই না গেলে আমি যাব কী করে?"


"আমার অস্বস্তি লাগছে।"


প্রিয়া পড়েছে মুশকিলে। অর্ষার এত অস্বস্তির কারণ ওর অজানা নেই। তাই ও নিজেই আগে ঢুকে পড়ল। ভেতরে আসার সময় অর্ষার হাত শক্ত করে ধরেছিল। রুশানের অর্পার সাথে গল্প করতে করতে হঠাৎ দরজার দিকে চোখ গেল। অর্পাকে আলতোভাবে ধাক্কা মেরে ওকে দেখিয়ে বলল, 

"এই মেয়ে আবার কে? চেনা চেনা লাগছে। দেখো তো আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের কেউ কিনা?"


অর্পা দরজার দিকে তাকাল। অর্ষাকে দেখে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। 

"মাশাল্লাহ!"


ওর মুখে মাশাল্লাহ আর চোখে বিস্ময় দেখে রুশান ভরকে গেল। তারপর আবার অর্ষার দিকে তাকাল। ও নিজেও দাঁড়িয়ে গেল। 

"ও অর্ষা। ওকে কত সুন্দর লাগছে দেখেছো?"

রুশান ভালো করে দেখে বলল, "তাই তো। অর্ষাই তো।"


অর্পা উৎফুল্ল হয়ে বলল,

"দর্শন ওকে দেখলে কী রিয়েকশন দেবে তাই ভাবছি।"


"তুমি মেয়ে হয়ে যখন এত দাপাদাপি করছো সেখানে তো দর্শন বেহুশ হয়ে যাবে। ওর হুশে থাকা জরুরি। ও বেহুশ হলে সবাইকে পার্টি রেখে হাসপাতালে দৌড়াতে হবে কিন্তু আমার তাতে মুড নেই। আমি এখন পার্টি মুডে আছি।"


অর্পা কনুই দিয়ে ওকে মেরে বলল, 

"ওর বাবা-মা ডাক্তার সমস্যা নাই। তুমি বকবক বন্ধ করে চুপ করে দাঁড়াও। আমি দর্শনের রিয়েকশন দেখতে চাই। আর তুমি মোবাইল নিয়ে রেডি থাকো। ওর রিয়েকশন ভিডিও করা চাই।"


"ওকে মহারাণী।"


অর্পা দর্শনের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। অর্ষা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দর্শনকে খুঁজছে। ওকে একবার দেখে দর্শনের কাঁধে হাত রেখে বলল, 

"দর্শন!"


দর্শন ওর কাজিনের সাথে কথা বলছিল। অর্পার ডাকে পেছনে ঘুরে। চোখের ইশারায় কী বলল। অর্পাও চোখ দিয়ে ইশারা করে অর্ষাকে দেখাল। দর্শন মুগ্ধ হয়ে অর্ষাকে দেখছে। ওর চোখের পলক পড়ছে না। মুখের বিস্ময়টা এখন ঠোঁটের কোনে হাসিতে পরিণত হয়েছে। চোখ বিস্ময়ে চকচক করছে। অর্ষা এতটা মুগ্ধ করবে সেটা ভাবতে পারেনি। ওর চোখে মুখে মুগ্ধতা জড়ানো আভা ছড়িয়ে পড়েছে। অর্ষা ঘরোয়া পার্টির জন্য মানানসই সিম্পল ডিজাইনের, সিম্পল লেহেঙ্গা পরেছে। সাথে রাতের উপযোগী হালকা মেক আপ। লেহেঙ্গার সাথে ম্যাচ করে জুয়েলারি, বাম হাতে ওর দেওয়া ব্রেসলেট। ঠোঁটে ম্যাচিং লিপস্টিক, খোলা চুল, পায়ে হাই হিল সাথে মুখে উপচে পড়া লাজুক আভা। অর্ষার চোখে চোখ পড়ল ওর। অর্ষা এতক্ষণ ওকে খুঁজলেও এখন কাছে যেতে লজ্জা লাগছে। দর্শনের দৃষ্টি দেখে আরো লজ্জা লাগছে। তাই ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। অর্পা দর্শনকে ঠেলে অর্ষার কাছে নিয়ে গেল। এহেন ঠেলাঠেলির কারণে দর্শন নিজেও লজ্জা পেয়ে গেল। অর্ষা চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। অর্পা ওদের সামনে থেকে চলে গেল। দর্শন আশেপাশে তাকাল। বাবা-মা এখনো আসেনি। তাই অর্ষার সাথে টেনশন ফ্রি কথা বলতে পারে। 


দর্শন আচ্ছন্ন করা কন্ঠে বলল,

"এত সৌন্দর্য কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলে বলো তো? ভারী অন্যায় করেছো।"


অর্ষা চোখ তুলে ওর দিকে তাকাল। লজ্জা আর অস্বস্তি নিয়ে বলল, 

"আমার খুব লজ্জা লাগছে। আমি কখনো এমন ভাবে.....


দর্শন মৃদু হেসে বলল, 

"এভাবে নিজেকে সাজাবে ভালো লাগবে।"


অর্ষা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দর্শন ওকে আর অস্বস্তিতে ফেলতে চাইছে না। 

"এসো, এসে বসো। প্রিয়াকে ডাকো।"


অর্ষা প্রিয়াকে ডাকল। ওরা দু'জন এক জায়গায় গিয়ে বসল। দর্শন দূর থেকে বারবার অর্ষাকে দেখছে। অর্ষার এ লাবণ্য রুপ ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। যত দেখে তত মোহিত হয়। অর্ষা এখন অনেকটা ইজি ফিল করছে। দর্শন অর্ষার সামনে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, 

"তোমাকে বেশি সময় দিতে পারছি না, বুঝতেই পারছো ফ্যামিলি আছে সন্দেহ করবে।"


অর্ষা মৃদু হেসে বলল, 

"ইটস ওকে।"


অর্পা, অর্ষা, প্রিয়া এক সাথে বসে গল্প করছে। দর্শনের বাবা-মা এসে পড়েছে। অর্ষা ওদের দেখে মনে মনে বলছে হবু শ্বশুর শাশুড়ী আমার। তারপর নিজ মনেই লজ্জা পাচ্ছে। কেক কাটার জন্য সবাইকে ডাকা হলো। দর্শনের কেক কাটাকাটি বাচ্চাদের মতো মনে হচ্ছে। ওর কি এখন কেক কাটার বয়স? কিন্তু মায়ের জোড়াজুড়িতে বাধ্য হয়েছে কেক অর্ডার করতে। দর্শন ইশারায় অর্ষাকে ডাকল। সাথে দাঁড় করাতে না পারলেও পেছনে ঠিক ঘাড়ের ওপর অর্ষা। কেক কাটা শেষ করে মা'কে খাইয়ে দিয়ে বলল, 

"এনাফ, মা। আমি আর কেক নিয়ে আদিখ্যেতা করতে পারব না। প্লিজ।"


দর্শনের মমতাময়ী মা হেসে ফেলল। ছেলে বেশ জব্দ হয়েছে। তিনি কেক সরিয়ে ফেললেন। তারপর সবাইকে খাবার সার্ভ করা হলো। অর্ষা দর্শনকে আলাদাভাবে কথা বলার জন্য খুঁজছে। ওর জন্য একটা গিফট এনেছে সেটা দিতে চায়। খাওয়া শেষ করে সবাই যে যার মতো পার্টি এঞ্জয় করছে। অর্ষা দর্শনকে মেসেজ করে জানাল,

"বাবা আমাকে নিতে আসবে, আমি চলে যাব। তোমার জন্য কিছু এনেছি। আলাদা করে দিতে চাই।"


দর্শন মেসেজ দেখা মাত্রই ওর বেডরুম দেখাল। অর্ষা ওর বেডরুমে চলে গেল। ওর বেডরুমে গিয়ে অর্ষা চারদিকে হা করে চেয়ে আছে। একটা ছেলের রুমের সবকিছু এত গোছানো, সাজানো। সেখানে ও মেয়ে হয়ে রুমের নাজেহাল অবস্থা করে রাখে। ঘর তো নয় আফ্রিকার গভীর জঙ্গল। দর্শন দেখলে শিওর ছিহ! ছিহ! করবে। 

এ-সব ভাবতে ভাবতে দর্শন চলে এসেছে। দরজায় পাহারায় রুশানকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। 

"তোমার উপর আজ আমি অনেক রেগে ছিলাম। তুমি আমাকে আজ পাত্তাই দেওনি। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে তোমার উপর আমার একটুও রাগ নেই। জানো তো সব সময় আমি তোমাকে এভাবে দেখতে চাইতাম কিন্তু বলতে পারতাম বা যদি রাগ করো তাই। আজ তোমাকে এভাবে দেখে ভীষণ ভালো লাগছে।"


অর্ষার আবারও অস্বস্তি লাগছে। এত লজ্জা জীবনেও পায়নি। মনে হচ্ছে মরেই যাবে আজ লজ্জায়। অর্ষা একটা বক্স রাখল ওর বিছানার উপরে। তারপর একটা কার্ড বের করে দর্শনকে দিয়ে বলল, 

"সারারাত জেগে এটা করেছি কেমন হয়েছে?"


দর্শন কার্ডটা খুলল। অর্ষার যে এত সৃজনশীল গুন আছে জানা ছিল না। দর্শন অর্ষার হাত ধরে বলল, 

"বলব?"


অর্ষার হাত কাঁপছে। এর আগেও হাত ধরেছে কিন্তু আজ কেমন শিহরিত হচ্ছে। অর্ষা চোখের পলক ফেলল। দর্শন আচমকা ওর হাতের পাতার উপর ঠোঁট ছুয়ালো। অর্ষা আরো কেঁপে উঠল। সারা শরীর কাঁপছে। বুকে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। মনে হচ্ছে নিশ্বাস নিতে পারছে না। এখানে থাকলে মারা যাবে। আর এক মুহূর্ত এখানে থাকা যাবে না। এ কেমন অনুভূতি!



চলবে?

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url