ধর্ষিতা বউ - স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার গল্প । পর্বঃ ২২

 

ধর্ষিতা বউ - স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার গল্প । পর্বঃ ২২

ধর্ষিতা বউ

রাবেয়া সুলতানা

পর্বঃ ২২


আবিদ চৌধুরী আয়ানের অফিসে এসে সোজা আয়ানের রুমে চলে গেলেন।নিজের বাবাকে দেখে আয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে, আব্বু তুমি! 


আবিদ চৌধুরী -হ্যাঁ আমি!নিজেকে কি ভাবিস তুই? অনেক মহান? সবার জন্য তোর অনেক মায়া,অনেক ভালোবাসা।শুধু আমি খারাপ তাইনা?


আয়ান -আব্বু তুমি এইসব কি বলছো আমি কিছুই ভাবছিনা।


আবিদ চৌধুরী -ঠিক আছে তাহলে এইবার চলো! আর কোথায় যাবো বা কি করবো কোনো প্রশ্ন করবেনা।এইবার চলো!


আয়ানও কোনো প্রশ্ন না করে আবিদ চৌধুরীর সাথে আসলো।বাড়ির সামনে গাড়ি থামাতেই আয়ানের আর বুজতে বাকি নেই তাকে বাড়িতেই আনা হয়েছে।আবিদ চৌধুরী আয়ানের হাত ধরে টেনে বাড়ির ভেতরে নিচ্ছে।আয়ান চুপচাপ হাঁটছে।মনে হচ্ছে নিজের বাড়িতে নিজেরি লজ্জা লাগছে।ড্রইংরুমে এসে, আয়েশা! আয়েশা!  দেখো কাকে নিয়ে আসছি।আয়েশা বেগম আসতেই,তোমার ছেলেকে তোমার কাছে ফিরিয়ে আনতে গেছিলাম। তোমার ছেলে একা তার বাবা মাকে ভালোবাসেনা। তার বাবা ও তাকে ভালোবাসে। (কথা গুলো বলতে বলতে আবিদ চৌধুরীর গলাটা ভারি হয়ে আসছিলো)তার বাবাও তাকে মিস করে।

কথা গুলো বলেই আয়ানকে জড়িয়ে ধরলো।আকাশ এসে, আব্বু আমি তাহলে পর হয়ে গেলাম? ঠিক আছে তোমার ছোটো ছেলে এখন এসে গেছে এখন আমাকে আর ভালোবাসবেনা।

আয়ান কে ছেড়ে দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আজ আমার ঘর পরিপূর্ণ হলো।প্রাপ্তি!  এই দিকে আসো।(প্রাপ্তি কাছে যেতেই) আয়ান!  সেইদিন এইমেয়েটাকে না ছাড়ার কারণে আমি তোকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেছিলাম আর আজ আমি বলছি তুই এই মেয়েটাকে ডিভোর্স দিসনা।তোদের কি হয়েছে আমি জানিনা।আমি শুধু এইটুকুই বলবো তোরা দুজনের মধ্যে সেই গুলো মিটিয়ে নিবি।প্রাপ্তি কিছু বলতে যাবে এর আগেই আয়ান প্রাপ্তিকে থামিয়ে আব্বু তুমি যা বলবে আমি তাই মেনে নিবো।


আবিদ চৌধুরী -ঠিক আছে। আমার ছেলে আর বউ ঘরে ফিরে এসেছে সেই খুশিতে বাড়িতে পার্টি দেওয়া হবে। আর কখন পার্টি  হবে না হবে সেই গুলো আকাশই ঠিক করবে।


আকাশ -ঠিক আছে আব্বু এখন আর কোনো কথা নয়।তুমি রুমে গিয়ে রেস্ট নাও। আমরা সবাই তো আছিই প্রাপ্তি তুমিও যাও।

আবিদ চৌধুরী নিজের রুমে খাঠের সাথে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে আছে।আয়েশা বেগমও পাশে গিয়ে বসতেই, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে আয়েশা জানো আজ নিজেকে অনেক হালকা লাগছে।মনে হচ্ছে আমার ঘরটা আগের মতো পরিপূর্ণ। তবে আরেকজন আসলে আর কোনো কোথায় নেই আমার সংসার টা ষোলআনাই পূর্ণ।


আয়েশা বেগম -কার কথা বলছো তুমি? কে আসবে? 

আবিদ চৌধুরী -আকাশ বিয়ে করেছে অনেক গুলো বছর ফেরিয়ে গেলো।কিন্তু কোনো নাতিনাতনি এই ঘরে আসে নাই। এখন যদি আমার আয়ানের ঘরে ছোট্র আয়ান দুনিয়েতে আসে তাহলে আর কোনো কথায় নেই।

আয়েশা বেগম -কথাটা খারাপ বলোনি।


প্রাপ্তি ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শাড়ি ঠিক করছে।আয়ান পিছন থেকে এসে জড়িয়ে প্রাপ্তির কাঁধে নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে, thanks বললে তোমাকে ছোটো করতে চাইনা। কিন্তু তোমার এই ঋণ 

আমি কিভাবে শোধ করবো বলোতো?

আমার কাছে তো তোমার কোনো ঋণ নেই উল্টো আমিই সবমসময় তোমার কাছ থেকে নিয়ে এসেছি।তুমি আমাকে যে সম্মান টা দিয়েছো পৃথিবীতে কোনো স্বামী তার ধর্ষিতা স্ত্রীকে এতো সম্মান দিয়েছে কিনা আমার জানা নেই।তুমি আমাকে শিখিয়েছ কিভাবে এইসমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়।তুমি আমাকে শিখিয়েছ  সমাজের সবাই আমার পক্ষ হয়ে কথা বলবেনা।যারা বলবে, যারা আমাকে ভালোবাসবে, তাদেরকে নিয়ে পৃথিবী গড়ে নিতে।

আয়ান প্রাপ্তির কথা গুলো শুনে প্রাপ্তিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে।


প্রাপ্তি -কি দেখছো ওইভাবে তাকিয়ে?


আয়ান -আমার পাগলিটাকে।আমার লক্ষ্মী বউটা কে কতো দিন হলো কাছে পাইনা।আমার অবস্থা এখন কেমন জানো? একটা তৃষ্ণাত্ব কাকা এক ফোটা পানির  খোঁজ  পেয়েছে ঠিক তোমাকে পেয়ে আমার অবস্থাও সেইরকম। 

প্রাপ্তি -কথাটা খুব ভালো হয়েছে কবিদের ধারেকাছে দিয়ে গেছে।এখন যাও ফ্রেশ হয়ে এসে খাওয়া খেয়ে রেস্ট নিয়ে তারপর গিয়ে রেশীকে নিয়ে আসো।


আয়ান প্রাপ্তিকে ছেড়ে দিয়ে,ও মাই গড! আমি একদম ভুলে গেছিলাম রেশীর কথা।পরে ফ্রেশ হবো আগে রেশীকে গিয়ে নিয়ে আসি।মা ও বলেছে সকালে চলে যাবে, মেয়েটা একা একা জানি কি করছে কি জানে।আয়ানকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে ঝিনুক বললো কিরে,  তুইনা রুমে গেলি ফ্রেশ হতে?  ফ্রেশ না হয়ে কোথায় যাচ্ছিস? 


আয়ান -আপু!  আর বলিসনা রেশী বাসায় একা আছে ওকে নিয়ে আসতে হবে।আমার একদম মনে নেই রেশীর কথা।আমি এসে তোদের সাথে কথা বলছি।বলেই আয়ান চলে গেলো।


মিনু রেশীর কথা শুনে, আপু রেশীটা কে? আয়ান কোন রেশীর জন্য এতো তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলো?


ঝিনুক মিনুকে ঘাবড়িয়ে দেওয়ার জন্য বললো, আয়ানের ছোটো বোন।আয়ানের খুব আদরের বোন।আয়ান তো তার ছোটো বোনকে চোখে হারায়।


মিনু -আপু কি যা তা বকছিস। বোন মানে?


প্রাপ্তি এসে রান্নাঘরের দিকে যাবে এমন সময়,

মিনু - প্রাপ্তি এই দিকে শুনোতো! রেশী কে? 


প্রাপ্তি -আপু একটু ওয়েট করো আসলেই সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো।

ঘন্টা দুয়েক পর আয়ান রেশীকে নিয়ে আসলো।রেশী লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে সবাইকে সালাম দিলো। আবিদ চৌধুরী প্রাপ্তির দিকে তাকিয়ে, প্রাপ্তি একে তো চিনলাম না!  প্রাপ্তি রেশীর কাছে এসে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে আবিদ চৌধুরীর কাছে নিয়ে বাবা তোমার পারমিশন না নিয়ে তোমার ছেলেকে বলেছি ওকে নিয়ে আসতে। আমাকে ক্ষমা করে দাও।

তারপর আস্তে আস্তে প্রাপ্তি রেশীর ব্যাপারে সব বললো।আবিদ চৌধুরী সব শুনে আমার কোনো আপত্তি নেই। ও এই বাড়িতেই থাকবে এই পরিবারের একজন হয়ে।আয়েশা বেগম রেশীর কাছে এগিয়ে এসে অনেক লক্ষ্মী একটা মেয়ে অভ্রর সাথে ওর বিয়ে এই বাড়িতেই হবে। 

সুমি -প্রাপ্তি!  তুই গিয়ে আয়ান আর রেশীকে  খেতে দে । ওদের লেট দেখে তো সবাই খেয়ে নিয়েছে।রেশী আগে আমার সাথে আসো তোমাকে তোমার থাকার রুমটা দেখিয়ে দিই।

কথাটা শুনে রেশী প্রাপ্তির কানের  কাছে এসে, ভাবী তুমি আমার সাথে চলো।

প্রাপ্তি -আচ্ছা ঠিক আছে চল।(আয়ানের দিকে তাকিয়ে) এইবার গিয়ে তো ফ্রেশ হয়ে নাও।


প্রাপ্তি রেশীকে নিয়ে তার রুমে গিয়ে, রেশী তুই ফ্রেশ হয়ে খেতে আয়।ভাবী নিছে যাই।কথাটা বলে প্রাপ্তি এগুতেই, রেশী পিছন থেকে, 

রেশী-ভাবী!


প্রাপ্তি ভাবী ডাক শুনে পিছনে ফিরে, কিছু বলবি?

রেশী এসে প্রাপ্তিকে জড়িয়ে ধরে, তুমি এতো ভালো কেনো বলো তো? তোমার আমার জন্য কতো চিন্তা।আমার বোন থাকলে আমার জন্য এতো চিন্তা করতো কিনা আমি জানিনা।তুমি যে আমায় বার বার ঋণী করে দিচ্ছো।তোমার এই ঋণ আমি শোধ করবো কি দিয়ে?

প্রাপ্তি রেশীকে ছাড়িয়ে, স্ট্রং হয়ে দাঁড়া। আর শুন তুই আমার কাছে কোনো ঋণী না।ঋণী যদি হয়ে থাকিস সেটা একজনের কাছেই। শুধু তুই না,  আমি যে তার কাছে ঋণী।কিন্তু সে কোনো প্রতিদান চায়না।চায় শুধু সবার একটু খানি ভালোবাসা।


রেশী -ভাইয়ার কথা বলছো তাইতো?


প্রাপ্তি-হুম আর কোনো কথা নয়। তাড়াতাড়ি নিছে আয়।আর শুন নিছে গিয়ে এইভাবে চুপচাপ থাকিসনা। কথাটা যেনো মনে থাকে।


রাতে সবাই যখন আড্ডা দিচ্ছে প্রাপ্তি আর আয়ান নিজেদের রুমের বারান্দায় বসে গল্প করছে।

প্রাপ্তি-আচ্ছা দুপুরে বাবাকে সত্যি কথাটা বলতে দিলেনা কেনো?


আয়ান -কোন সত্যি?


প্রাপ্তি -ডিভোর্সের ব্যাপারটা।বাবাকে যে আমি কথাটা মিথ্যা বলেছিলাম সেটা বাবাকে বলে দেওয়া উচিত ছিলনা?


আয়ান প্রাপ্তির কাঁধে হাত দিয়ে মিথ্যা থেকে যদি দারুণ কিছু হয় তাহলে মিথ্যাই ভালো।

প্রাপ্তি কিছু না বলে আয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে।সব কিছু কতো সহজে মেনে নেয়।এইলোকটাকে কোনো মেয়েই ভালো না বেসে থাকতে পারবে না।যতো দেখি ততোই তার মায়ায় আমি নিজেকে হারাই।

আয়ান প্রাপ্তিকে এইভাবে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রাপ্তির চোখের সামনে তুড়ি মেরে কি ব্যাপার!  ওই ভাবে তাকিয়ে কি ভাবছো?


প্রাপ্তি-হুম? কই কিছুনা।

আয়ান-মুখ টিপে হাঁসি দিয়ে সত্যিই কিছুনা?

প্রাপ্তি নিছের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে না বুজালো।

বাহিরের চাঁদের আলোই প্রাপ্তিকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।চাঁদের আলোয় মানুষকে এতোটা সুন্দর লাগতে পারে আয়ানের এইটা জানা ছিল না।প্রাপ্তি কোনো কথা বলছেনা দেখে আয়ান বললো রুমে চলো তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।

আয়ানেয় কথায় রুমে এসে দাঁড়াতেই আয়ান আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করে রেশীকে আনতে যাওয়ার সময় এইটা নিয়েছিলাম।আমার পরীটাকে শাড়িটা পরিয়ে আমি মন ভরে দেখতে চাই।প্রাপ্তি কিছু না বলে শাড়িটা হাতে নিলো। প্রাপ্তি শাড়ি হাতে নিতেই,আমি পরিয়ে দিই?


প্রাপ্তি-তুমি শাড়ি পরাতে পারো?

আয়ান -তেমন ভালো পারিনা।কিন্তু ইচ্ছে করছে তোমাকে নিজের হাতে শাড়ি পরাতে,ইচ্ছে করছে সাজাতে।প্রাপ্তি আবার আয়ানের হাতে শাড়িটা দিয়ে, পরিয়ে দাও।

প্রাপ্তির কথায় শাড়িটা হাতে নিয়ে প্রাপ্তিকে নিজের কাছে টেনে নিলো।আগের  শাড়িটা খুলে নতুন শাড়িটা পরাতে লাগলো আয়ান।আয়ানের প্রতিটা ছোঁয়া প্রাপ্তির যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে।আয়ান এই প্রথম প্রাপ্তিকে  এতোটা কাছ থেকে ছোঁয়ার সাহস পেয়েছে।শাড়িটা পরিয়ে প্রাপ্তির দিকে তাকিয়ে একদম পরীর মতো লাগছে।ইচ্ছে করছে যুগের পর যুগ তোমাকে সামনে বসিয়ে তাকিয়ে দেখি।

প্রাপ্তি আয়ানকে নিজের আরো কাছে টেনে এনে আজ ভালো করে দেখো কেউ তোমায় বাধা দিবেনা। আয়ান প্রাপ্তিকে কোলে তুলে নিয়ে খাঠের উপর শুয়ে দিয়ে সত্যি কেউ বাধা দিবেনা।আয়ানের কথা শুনে প্রাপ্তি লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। আয়ান প্রাপ্তির লজ্জার কারণ বুজতে পেরে প্রাপ্তিকে আর কিছু জিজ্ঞাস না করে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো।সারারাত দুজোনে ভালোবাসায় বিভোর হয়েছিল।ভোররাতে প্রাপ্তি আয়ানের বুকে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়লো।আয়ানও আর বাধা দিলোনা।আয়ানও প্রাপ্তিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লো।



সকালে সবাই বসে নাশতা করছে।আবিদ চৌধুরী প্রাপ্তি আর আয়ানকে না দেখে কি ব্যাপার সুমি আয়ান এখনো উপরের থেকে আসেনি?

সুমি -না বাবা আপনারা নাশতা করুণ আমি ডেকে আনছি।


আবিদ চৌধুরী -তোমার যেতে হবে না ওদের সময় হলে ওরাই নিছে নেমে আসবে।আকাশ!  পার্টির কথা কি ভাবলে?পার্টিতে কেউ জেনো বাদ না পড়ে।প্রাপ্তিদের বাড়ির নাম্বার আছে তোমার কাছে?


আকাশ -আছে! কথা বলবে?


আবিদ চৌধুরী -তুমি ফোন করে বলো বিকেলে আমি প্রাপ্তি আর আয়ানকে নিয়ে ওদের বাড়ি যাবো।


আকাশ -আচ্ছা ঠিক আছে।আব্বু পার্টির তারিখটা দুই দিন পর দিই।


আবিদ চৌধুরী -এতো তাড়াতাড়ি দিয়ে সবকিছু সামলাতে পারবিতো?(রেশীর দিকে নজর পড়তেই) কি ব্যাপার রেশী তুমি খাচ্ছ না কেনো?এই বাড়ির কাউকে তোমার ভালো লাগেনি?

রেশী লজ্জা ভাব নিয়ে, খাচ্ছি তো আংকেল।আর এই বাড়ির সবাইকে আমার খুব ভালো লেগেছে।সবাই আমাকে কতো ভালোবাসে। কথা গুলো বলতেই রেশীর চোখের কোনে পানি আসতেই রেশী চুপ হয়ে গেলো।

আয়েশা বেগম রেশীর কাঁধে হাতরেখে মন খারাপ করো না।আমরা সবাই তোমার আপনজন। 


আবিদ চৌধুরী -আকাশ কতো দিন হলো অফিসে যাচ্ছিনা। আজ না হয় গিয়ে একবার আমি ঘুরে আসি।


আকাশ-আব্বু তুমি এই শরীর নিয়ে অফিসে যাবে?আরো কয়েকদিন যাক তারপর না হয় যেও।


আবিদ চৌধুরী -কিচ্ছু হবেনা।তোরা এতো টেনশন করছিস কেনো।(টেবিলের উপর থেকে ফোন নিয়ে উঠে যেতে যেতে)আমি গিয়ে রেডি হয়ে আসি।


আয়ান ফোনের শব্দ শুনে ফোনটা বালিশের পাশ থেকে খুঁজে ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখে অভ্রর ফোন।আয়ান ফোন রিসিভ করে চুপ করে আছে,আর অভ্র বলেই যাচ্ছে,আয়ান!  তুই এখনো অফিসে আসিস নাই কেনো।কয়টা বাজে দেখেছিস।আজ না মিটিং আছে।তুই নিজেই মিটিং ডেকে এখন তুই নেই।আয়ান টাইমের কথা মনে পড়তেই ফোনটা কান থেকে সামনে এনে টাইম দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেছে।১০.৪০ কখন রেডি হবো আর কখন অফিসে যাবো।


আয়ান -অভ্র! আমি একঘণ্টার ভিতরেই আসছি।ফোনটা রেখে রাতের কথা মনে পড়তেই প্রাপ্তির কপালে একটা চুমু দিয়ে প্রাপ্তিকে কাছ থেকে সরিয়ে উঠতেই প্রাপ্তি আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে।আয়ানেরও ইচ্ছে করছেনা যেতে। কিন্তু সে আজ যেতেই হবে অফিসে কাল সে নিজেই আজকের জন্য মিটিং ডেকেছে।আয়ান মনে মনে ভাবছে যদি সে জানতো প্রাপ্তি তার ভালোবাসার ডাকে সাড়া দিয়ে তাকে আপন করে নিবে তাহলে মিটিং তো দূরের কথা অফিসের নামও মাথায় আনতো না।প্রাপ্তিকে আস্তে করে সরিয়ে আয়ান উঠে ওয়াশ রুমে গেলো ফ্রেশ হতে।


সুমি, ঝিনুক, রেশী, মিনু  ড্রইরুমে সোফায় বসে গল্প করছে । আয়ানকে তাড়াহুড়ো করে নিছে নামতে দেখে, সুমি উঠে একটু এগিয়ে গিয়ে, আয়ান তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাচ্ছো নাশতা করবে না?


আয়ান -সুইট হার্ট হাতে একদম সময় নেই।বাহিরে পরে খেয়ে নিবো।


সুমি -প্রাপ্তি কোথায়?  ও জানেনা সকালে তোমার অফিস আছে তারপর ও তোমাকে ঘুম থেকে ডাকিনি কেনো? তাহলে তো আর দেরি হতো না।

আয়ান -আয়ান মুচকি হেঁসে ও নিজেই ঘুম থেকে এখনো উঠেনি আমাকে কি ডাকবে? 

কথা গুলো বলতে বলতে আয়ান বেরিয়ে গেলো। আয়ানের কথা শুনে সুমি হিসাব মিলাতে পারছেনা।প্রাপ্তি তো এতো লেট করে ঘুম থেকে উঠেনা তাহলে আজ কি হলো?প্রাপ্তি আসুক ওকে পরে জিজ্ঞাস করে নিবো।


আয়ান অফিসে গিয়ে প্রাপ্তির ফোনে কল দিচ্ছে।

প্রাপ্তি ফোন হাতে নিয়ে দেখে আয়ানের নাম্বার। অবাক হয়ে পাশে তাকিয়ে আয়ানকে না দেখে মুচকি হেঁসে ফোন রিসিভ করলো।


আয়ান -আমার পাগলিটা এখনো ঘুম থেকে উঠেনি?

প্রাপ্তি-কোথায় থেকে ফোন দিয়েছো? কাছে আসো তোমাকে দেখবো।

আয়ান -এখন তো আসতে পারবো না জান। আমি অফিস শেষ করেই চলে আসবো।


প্রাপ্তি-(অবাক হয়ে)তুমি অফিসে? আমাকে ডাকোনি কেনো? 


আয়ান মিটমিট করে হাঁসছে প্রাপ্তির কথা শুনে কারণ প্রাপ্তির মুখে এইরকম কথা সে আগে কখনোই শুনেনি।আয়ানের মাথায় প্রাপ্তিকে খেপানোর জন্য বুদ্ধি এলো,ডাকলে কি আবার ভালোবাসা দিতে।তাহলে আমি তো মিস করে ফেলেছি আমার বউয়ের সকালের ভালোবাসাটা।


প্রাপ্তি- ধ্যাত তোমার সাথে কোনো কথা নেই।


আয়ান-এই শুনো শুনো আসলে তোমাকে ডাকতে ইচ্ছে করছিলো না।তুমি যখন ঘুমাচ্ছিলে তোমাকে এমদম পরীর মতো লাগছিলো।মনে হয়েছে কোনো একটা পরী ভুলে আমার রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়েছে।আমার এই পরীকে কতোটা ভালোবাসি আমার পরী কি জানে?

প্রাপ্তির আয়ানের কথা গুলো শুনতে ভালোই লাগছে।তাই আয়ানকে বাধা দিচ্ছেনা চুপচাপ শুনেই যাচ্ছে।


মিনু এসে প্রাপ্তিকে এখনো খাটে বসে থাকতে দেখে, প্রাপ্তি তুমি এখনো ফ্রেশ হওনি। আর আব্বু ফোন করে বলেছে তোমাকে নিয়ে শপিং এ যেতে।


প্রাপ্তি ফোন রেখে দিয়ে, আপু এখন কিসের শপিং করবো? 


মিনু -তোমাদের জন্য আব্বু এতো আয়োজন করে পার্টি দিচ্ছে আর তুমি বলছো কিসের শপিং?  এখন উঠে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিছে আসো বাকি কথা ওইখানেই হবে।


মিনু সুমি আর প্রাপ্তি শপিং করতে গেলো।আয়ানকে আবিদ চৌধুরী ফোন দিয়ে আসতে বলেছে তাদের সাথে শপিং এ যাওয়ার জন্য।আয়ান মিটিং শেষে তাদের সাথে যোগ দিলো শপিং করতে।শপিং শেষ করে বাহিরে খাওয়া খেয়েই সবাই বাড়িতে আসলো।সুমি বাড়িতে এসে সবাইকে সবকিছু দেখাচ্ছে।প্রাপ্তি আর আয়ান উপরে উঠতে যাবে এমন সময় আবিদ চৌধুরী এসে, আয়ান! বিকেলে তুকে আর প্রাপ্তিকে নিয়ে ওদের বাড়িতে যাবো।আমরা গিয়ে তাদের ইনভাইট করে আসি।কথাটা শুনে প্রাপ্তি খুশি হয়ে বাবা সত্যিই আপনি আমাদের বাড়িতে যাবেন? 


আবিদ চৌধুরী -আমার মেয়ের খুশির জন্য এইটুকু করতেই পারি।

নিজের বাবার মুখে কথা গুলো শুনতে আয়ানের অনেক ভালো লাগছে।বাবার প্রতি ভালোবাসা আরো দ্বিগুণ বেড়ে গেলো আয়ানের।আবিদ চৌধুরী নিজের ভুল গুলো এইভাবে বুজতে পারবে আয়ান কখনোই ভাবিনি।প্রাপ্তির মতো মেয়েরা এই সমাজের বোঝা নয় বরং ভালোবাসা একটা অংশ। আমার আব্বু এইটা বুজতে পেরেছে এতেই আমিই খুশি।

আয়ান আর কিছু না বলে নিজের রুমে চলে গেলো,সাথে প্রাপ্তিও।


আয়ান রুমে এসে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে মেয়েদের সাথে শপিং এ যাওয়া মানে নিজের কাঁধে নিজেই বিপদ ডেকে আনা।শুধু আব্বু ফোন করেছে বলেই এতো গুলো প্যারা সহ্য করতে হয়েছে।

কথাটা শুনে প্রাপ্তি রাগি ভাব নিয়ে আয়ানের দিকে তাকিয়ে, আমি প্যারা? 

আয়ান -এই কথা তোমাকে বলিনি।আমার লক্ষ্মী কি কখনো প্যারা হতে পারে? ওর জন্য তো পৃথিবীর সব কষ্ট সহ্য করতে রাজি।প্রাপ্তি কাছে এসে বসতে বসতে, একটু আগে যে বললে? 


আচ্ছা তুমিই বলো শপিং টা ওরা গিয়ে করলেই তো হয়।তুমি আর আমি আলাদা ভাবে যেতাম। কিছুটা আলাদা ভাবে সময় কাটাতাম।কথাটা বলে প্রাপ্তিকে কাছে টেনে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরেছে আয়ান।

প্রাপ্তিও বাধা না দিয়ে আয়ানের বুকে মাথা রেখে, বাবা এতোটা পাল্টাবে আমি ভাবতেই পারিনি।তোমাকে আমি বলেছিলাম না ওনি হয়তো গম্ভীর থাকে, তবে মনটা অনেক ভালো।

সুমি এসে রুমে ঢুকে দেখে আয়ানের বুকে প্রাপ্তি মাথা দিয়ে শুয়ে শুয়ে কথা বলছে,ভুল সময় এসে পড়লাম নাকি?

প্রাপ্তি উঠে বসে, ভাবী তুমি?


সুমি-হুম আমি! ভাবলাম তোর সাথে বসে আড্ডা দিবো।কিন্তু এখন দেখছি ভুল সময় এসে গেছি।

আয়ান মুচকি হেঁসে এইখানে ভুলের কি আছে এমনিতেই আমিও উঠে যেতাম।

আব্বু বলছে প্রাপ্তিকে নিয়ে ওদের বাড়িতে যাবে তাই রেডি হতে হবেনা?


সুমি-ওহ।আচ্ছা রেশীর দিয়েটা নিয়ে কি ভেবেছো?  


আয়ান -অভ্র সাথে কথা বলে ওর বাবা মাকে বলবো এই বাড়িতে আসতে।প্রাপ্তি এক কাজ করলে কেমন হয়? পার্টির দিন ওর আর অভ্র engaged টা করে পেললে কেমন হয়? সেইদিন বিয়ের ডেট টাও ফাইনাল করা যাবে।


প্রাপ্তি- তাহলে তো ভালোই হবে।কি বলো ভাবী?


সুমি -আমারো তাই মনে হয়।আয়ান তুমি বাবার সাথে একবার কথা বলে নিও।


নিলিমা বেগম আর নীরা খুব ব্যস্ত, আবিদ চৌধুরী আসছে।সাথে মেয়ে আর জামাইকে নিয়ে।নানা রকমের খাবার তৈরি করেছে নিলিমা বেগম।আসিফ তাদেরকে বিভিন্ন কাজে হেল্প করছে।

কলিংবেলের শব্দ শুনে আজাদ সাহেব গিয়ে দরজা খুলে দিলো। আবিদ চৌধুরী আর আজাদ সাহেব কোলাকোলি করে বাসায় ঢুকলেন।পিছন পিছন আয়ান আর প্রাপ্তিও ।নীরা প্রাপ্তিকে দেখে জড়িয়ে ধরে কেমন আছো আপু?

প্রাপ্তি -আমি ভালো।নীরা! (আবিদ চৌধুরীকে দেখিয়ে)ইনি হচ্ছে আমার আরেকজন বাবা মানে তোমার ভাইয়ার বাবা।


নীরা আবিদ চৌধুরীকে সালাম করে দাঁড়াতেই আবিদ চৌধুরী কোর্টের পকেট থেকে সোনার চেইনের বাক্স বের করে আমি জানি এইবাড়িতে নতুন একজন মেম্বার আছে আর তাকে তো আমাকে কিছুনা কিছু উপহার দেওয়া উচিত। তাই চেইন টা নিয়ে আসতে ভুলিনি।আয়ান নিজের বাবাকে যতো দেখছে তোতোই ভালো লাগছে।সবাই একসাথে আড্ডা দিয়ে রাতে খাওয়াদাওয়া শেষ করে বাড়ি ফিরলেন তারা।ফ্রেশ হয়ে এসে ইজিচেয়ারে বসতে বসতে জানো আয়েশা এখন আর নিজেকে একা মনে হয়না। সবাই একসাথে থাকাটা যে অনেক আনন্দের ব্যাপার প্রাপ্তি না থাকলে হয়তো আমি কখনোই বুজতাম না।মেয়েটা বড্ড ভালো।মেয়েটার মাঝে এমন কিছু আছে যেটা সকলের বুজার ক্ষমতা নেই।এমন কি আমারো ছিল না।


আয়েশা বেগম -তুমি যে সবকিছু বুজেছ  এটাই অনেক আমাদের কাছে।আমি তো ভেবে ছিলাম আমার ছেলেকে হয়তো আমি আর কাছেই পাবোনা।


___বাবা আসবো! কথাটা শুনেই দুজনে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে নিহাদ আর রাহাত, সাথে ঝিনুক, মিনু, আর আকাশ।


আবিদ চৌধুরী -কি ব্যাপার জামাইদের এখন আসার সময় হলো আসো ভিতরে আসো।নিহাদ আর রাহাত দুজনকেই সালাম করে,

নিহাদ-বাবা আপনার শরীর এখন কেমন আছে?

আবিদ চৌধুরী -যেই ঘরে প্রাপ্তি আর সুমির মতো বউ থাকে সেই ঘরে শ্বশুরের অসুস্থ থাকতে নেই।মনের জোর দিয়ে হলেও সুস্থ থাকার দরকার।তোহ, তোমরা কখন এলে?


রাহাত -কাজে ছাপে তো সময় পাইনা বাবা।আকাশ ভাইয়া ফোন দিয়ে বলেছে আজকে আসতেই হবে। 


রাহাত বাকি গুলো বলার আগেই আকাশ বলতে লাগলো আব্বু তুমি বলো বাড়িতে এতো বড় একটা পার্টির আয়োজন করা হচ্ছে আর জামাইরা সব কাজ ফাঁকি দিয়ে বসে থাকবে।

আকাশের কথা শুনে সবাই হাঁসতে লাগলো।

আবিদ চৌধুরী -আকাশ সবাইকে ইনভাইট করা শেষ তো? তোকে তো একটা কথা বলতে ভুলেই গেছি আমার অনেক পুরোনো ফ্রেন্ড জামিল আর ওর ছেলে নাকি দেশে আসছে ওদের ইনভাইট করতে ভুলিসনা যেনো।


আকাশ -জামিল আংকেল ওনার ছেলেকে নিয়ে তিন বছর আগে বাহিরে চলে গেছিলোনা? তবে আব্বু জামিল আংকেলের একমাত্র ছেলে।কিন্তু ছেলেটাকে মানুষ বানাতে পারিনি।


আবিদ চৌধুরী -ঠিক বলেছিস। তাহলে কাল থেকে সবাই কাজে লেগে পড়ো।


ঝিনুক- আব্বু প্রাপ্তিদের বাড়িতে আসার পর থেকে তো কিছু খাওনি।এখন খাবেনা?


আবিদ চৌধুরী -ওইটা সম্ভব না।শুধু একটা কথায় বলবো তাদের আপ্যায়নে আমি মুগ্ধ।

একটা পরিবারে শুধু টাকা থাকলেই ভালোবাসা থাকেনা।টাকা দিয়ে ভালোবাসা কিনাও যায়না।ওদের ফ্যামিলিটা না দেখলে আমি বুজতাম না।




চলবে...!!!

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url