শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ১০

 

শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ১০

শুধু তুই

লেখকঃ রিফাত আমিন

পর্বঃ ১০


-আমার কথাটা একবার অন্তত শোন। পাগলামী করলে কি সমাধান আসবে? (প্রহর)


প্রহরভাই বিছানায় বসতে বসতে কথাটা বললেন আমায়৷ আমি বালিশে মুখ গুজে কেঁদেই চলেছি। উনি আরেকবার ধমক দিতেই আমি ফিরে তাকালাম। উনি বলতে শুরু করলেন,


- নাউমি তোকে কি বলেছে স্পষ্ট বল। নাহলে থাপ্পড় খাবি। (প্রহর)


আমি কাঁপা কাঁপা স্বরে জবাব দিলাম, 


-কিছুই বলেনি। আপনাকে ভাবতে হবে না প্লিজ। আপনি আপনার কাজ করুন গিয়ে (আমি)


কথাটা শোনামাত্র উনি রাগী কন্ঠে বললেন, 


- আমার এখন একমাত্র কাজ হলো তোর রাগ ভাঙ্গানো। আমি যা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর দে। (প্রহর)


-কিছু হয়নি (আমি)


আমার কথা শোনা মাত্র উনি খিলখিলিয়ে হাসলেন। উনার কান্ডে আমি ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইলাম। এই সিরিয়াস মহুর্তে কেউ হাসতে পারে আমার জানা ছিলো না। কিন্তু এই ভয়ংকর হাসির সামনে আমার রাগ তো মহুর্তেই হাওয়া হয়ে যাবে! উনি হাসি দমাতে না পেরে বললেন, 


- দুদিন আগে ফেসবুক স্ক্রল করছিলাম বুঝলি। তো হঠাৎ একটা পোষ্ট দেখে আমার চোখ আটকে গেলো৷ পোষ্টটি ছিলো ' বউ যদি রাগ করে থাকে তাহলে আপনি সাধারণত জিজ্ঞেস করবেন, কি হয়েছে? এখানে বউ যদি উত্তর দেয় 'কিছু হয়নি' তাহলে বুঝবেন ডালমে কুচ কালা হে। কিন্তু সাবধান! ভুলেও বলবেন না 'আচ্ছা ঠিক আছে'। তাহলে কিন্তু বউয়ের হাতের মার নিশ্চিত। যারা নতুন বিয়ে করতে যাচ্ছেন, তাদের জন্য বড়ভাইয়ের পক্ষ থেকে ফ্রি টিপস্।  "


কথাটা শেষ করে উনি হাসতেই থাকলেন। হাসি ছাড়া এই মহুর্তে বোধহয় উনার কোনো কাজ নেই। আমি হাসবো নাকি কাঁদবো ঠিক বুঝতে পারলাম না। কিন্তু এটা বুঝতে পারলাম আমার রাগ আর নেই। শত চেষ্টা করেও আর রাগ তৈরী করা সম্ভব নয়। অন্তত এই অসভ্য মানুষটার সামনে নয়। আমি তাকিয়ে থাকতেই উনি বললেন, 


- বড় ভাইকে একটা থ্যাংস দেয়াই যায়। কি বলিস? ভাগ্যিস টিপসটা পেয়েছিলাম। কত উপকার হলো আমার বল! (প্রহর)


আমি চোখ নামিয়ে নিয়ে নতজানু হয়ে বসলাম। উনার দিকে লুকিয়ে তাকাতে ভালো লাগে। কিন্তু সামনে থাকলে তাকানোর সাধ্য থাকে না। আমি বললাম, 


- আজ থেকে আপনার সাথে থাকছি না আমি। আমাদের বিয়ের সময় শুধু পরিবারের কয়েকজন সাথে ছিলো, যতক্ষণ না ঐশীর বিয়ে হচ্ছে। ততদিন আমি এ বাসায় আমি ফিরবো না। তখন অবশ্য ভালোই হবে৷ আপনার পড়াশোনা করা, বিশেষ করে নাউমি আর সোনিয়ার সাথে কথা বলার একটা ভালো স্পেস পাওয়া যাবে৷ আমার মনে হয় আমার পরিবার আর আঙ্কেল আন্টির একই মত থাকবে। (আমি)


আমার কথায় উনি কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো৷ একদম কঠর শব্দে জবাব দিলো, 


- কথাটা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল দেখি, কত সাহস তোর। তুই কার না কার কথায় এমন পাগলামো করছিস।তোর এসব বাচ্চাদের মতো পাগলামো দেখলেই মাথা ঘুরিয়ে যায়। আচ্ছা দাঁড়া আমি নাউমিকে ফোন দিচ্ছি। ওহহ! সরি। নাউমির পরিচয় তো দি....


উনাকে কথাটা শেষ করতে দিলাম না৷ আমি স্বাভাবিক স্বরে বললাম, 


- পরিচয় দিয়ে আর কি হবে? নাউমি আপু, সরি! হবু ভাবি নিজেই বলছে আপনার জিএফ উনি। (আমি)


- ওরে পাগলীরে! আমার রাগ কিন্তু হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। আমার রাগ সম্পর্কে নিশ্চই তোর ধারণা আছে। ঐ নাউমি হলো আমার ক্লাস ৮ এর ফ্রেন্ড। ছোটবেলায় ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছিলাম তুই তো সেটা জানিস। তোকে সেখানে কত নিয়ে গিয়েছিলাম! তখন নাউমি আমার একটা ভালো ফ্রেন্ড ছিলো। ওর বাবা বোধহয় এখন সোনিয়ার বাবার বিজনেস পার্টনার। যাইহোক, ঐ মেয়েটা ক্লাস ৭ এ হুট করে বদলে গেলো। সে নাকি আমায় পছন্দ করে। পছন্দ করে মানে ভালোবাসে। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম ওর কান্ডে। আমি কখনো ওর ভালোবাসায় ফাঁদে পা দেইনি। কারণ আমার বাবা-মা ছোটবেলা থেকেই শিখিয়েছিলো কিভাবে জীবনে চলতে হবে, কার কার সাথে মিশতে হবে, সব শিখিয়েছে। প্রথম প্রথম ভাবলাম হয়তো মজা করছে, যেহেতু আমি ওর বেস্টফ্রেন্ড। তখন সে জানতো না আমি তোকে ভালোবা....। মানে ঠিক ওটা না। আমি তো তোকে ভালোবাসি না। তুই সেটা ভালো করেই জানিস। তারপর ও গোটা স্কুলে বলে বেড়ালো প্রহর আমার বয়ফ্রেন্ড। তখনকার দিনে বয়ফ্রেন্ড শব্দটা তেমন কেউ বুঝতো না। আমি তো ভীষণ রেগে গেলাম। ওকে এসব বন্ধ করতে বললেও করেনি। বরং দিনের পর দিন আমার নামে বিভিন্ন কথা বের করছিলো। তারপর এইট পাশ করে বাধ্য হয়ে ঐ স্কুল ছাড়লাম। তখন থেকেই এই বড়লোকদের এড়িয়ে চলি আমি। এদের আসলে টাকার পাওয়ার ভীষণরকম৷ তবে সব উচ্চবিত্তদের ছেলে মেয়েরা কিন্তু এমন হয় না। যে ফ্যামিলি অবৈধ টাকায় চলে, তাদের ছেলে-মেয়েরা এই টাইপের হয়। স্কুল ছাড়লেও ও আমায় ছাড়েনি, আমার খোঁজ সবসময় নিয়ে বেড়িয়েছে৷ রাস্তাঘাটে বিভিন্নভাবে হেও করেছে। আজকের প্রহর কিন্তু একদিনে হয়নি। ছোটবেলা থেকে মেধাবী হওয়ার খেতাব থাকলেও আমার পড়াশোনায় কোনো ইন্টারেস্ট ছিলো না। আমি ছিলাম মারাত্মক লেভেলের দুষ্টু। কিন্তু কিছু কিছু ধাক্কা খাওয়ার পর জীবনের মানে বুঝেছি। তখন থেকেই বুয়েট হলো আমার স্বপ্ন। এখন সেটা বাস্তবেও রুপ নিয়েছি। এখন আমি পৃথিবীর সব থেকে সুখি মানুষ কেনো জানিস? কারণ আমার সাথে আমার একটা হ্যাপি ফ্যামিলি আছে, আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। যাকে চেয়েছি, তাকেও পেয়েছি। আমার এখন পাওয়ার কিছুই নাই। শুধু যা পেয়েছি তা ধরে রাখতে চাই। বাধা আসবেই, তবে সেসবকে প্রহরকে কখনো পাত্তা দিবেনা। নেভার এভার। আর সোনিয়ার ব্যাপারটা আমি আগেও ক্লিয়ার করেছি। এর বাইরে আমার কোনো লুকানো ইতিহাস নাই। ইভেন তুইও এসব শুনেছিস। কিন্তু মনে করতে পারছিস না। কারণ আমি যখন ক্লাস ৭ এ ছিলাম, তোর বয়স তখন সবে ৫ বছর। (প্রহর)


প্রহরভাইয়ের দীর্ঘ লেকচারটা আমি বাধ্য মেয়ের শুনছিলাম। শেষ কথাটায় ভীষণরকম আশ্চর্য হয়ে গিয়ে বললাম, 


- তখন আমার বয়স মাত্র ৫ ছিলো! আপনার এখন বয়স কত ভাইয়া? 


প্রহরভাই মুচকি হেসে বললেন, 


- টুয়েন্টি সেভেন, মানে ২৭। আর তোর এখন ১৮। সাধে কি পিচ্চি বলি। হা-হা-হা। (প্রহর) 


আমি বিষ্ময়ে হা হয়ে গেলাম,


-কিহহহহহ! আপনি আমার এত বড়? ভেবেছিলাম ২৪/২৫ হবে হয়তো৷ আপনি তো দেখি বুইড়া ব্যাটা। যদিও চেহারা দেখে বোঝা যায় না। (আমি)


উনি মুচকি হেসে বললেন, 


-রাগ কাটলো তাহলে! বাঁচা গেলো। (প্রহর)


উনার কথা শোনামাত্র আমি থ হয়ে গেলাম৷ উফফফ! রাগটা থাকে না কেন? ঠিক তখনি ঐশী আর প্রেয়সী সেজেগুজে রুমের ভীতর প্রবেশ করলো। প্রেয়সী রুমে এসেই সোজা ওর দাভাইয়ের কাছে চলে গেলো। পায়ের কাছে গিয়ে টাওয়ার দেখার মতো উপরের দিকে হা করে তাকিয়ে বললো, 


- উফ! তুমি খাতো হবা। আমার তাকাতে পবলেম হয়। আমার চকলেট কই? (প্রেয়সী)


প্রহরভাই হাঁটুগেড়ে বসে বললেন, 


- এটা পবলেম না, প্রবলেম হবে পিচ্চু৷ ড্রয়ারে আছে চকলেট। প্রতিদিন আসবি আর নিয়ে যাবি। মনে থাকবে? (প্রহরভাই) 


প্রেয়সী কথা না বাড়িয়ে আগে ড্রয়ারে তল্লাসি চালাতে গেলো। উফফফ! আমি জানলে আগেই সাবার করে দিতাম৷ ঐশী বললো,


- তোমাকে আম্মি আমাদের বাসায় ডাকছে ভাইয়া। আবার বোধহয় সবাই আলোচনায় বসবে, বিয়ের অনুষ্ঠান করার বিষয়ে মেবি। (ঐশী)


প্রহরভাইয়া গম্ভীরস্বরে বললেন, 


- কয়টার দিকে রে? 

- রাতে যেকোনো একটা সময় আঙ্কেল - আন্টিকে নিয়ে যেতে বলছে। 


প্রহরভাই বললেন, 


- আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তোর কি হই জানিস? (প্রহর)


ঐশী থতমত খেয়ে গিয়ে বললো, 


-কি ভাইয়া? (ঐশী)


- কি ভাইয়া ভাইয়া করছিস? দুলাভাই বলবি! ঠিক আছে? কি বলবি বল দেখি। (প্রহর)


ঐশী কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো, 


- দদুলাভাই ভাইয়া। (ঐশী)


প্রহরভাই শব্দকরে হেসে বললেন, 


- তাহলে তুই তো আমার শালি। সামনে একটা চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে বুঝলি। তো তুই যেহেতু আমার শালি। তাই তোর আর প্রেয়সীর একটা শখ আমি আজ পূরণ করবো। হয়তো দেখলি চাকরি পেয়ে আর তোদের খোঁজ নিলাম না। তাই বলছি এক্ষুনি ঝটপট আবদার করে ফেল।(প্রহর)


ঐশী আবারো বিভ্রান্তিতে পরে গেলো। বিয়ের পর মাথাটা গেলো নাকি। যে প্রহরভাইয়ের গম্ভীর কন্ঠ ছাড়া কিছু শোনা যেতো না। সেই প্রহরভাই কি না এত হেসে হেসে ফ্রিলি কথা বলছে। ঐশী নিজে খানিকক্ষণ ভেবে বললো, 


- সাজেক যাবো ভাইয়া। আমার বহুদিনের শখ। (ঐশী)


প্রেয়সী চকলেট খেতে খেতে বললো, 


- আমাকে প্রতিদিন চকলেট এনে দিলেই হবে দাভাই (প্রেয়সী)


প্রহরভাই ওর কথা শোনামাত্র গালটা টেনে দিয়ে বললো, 


- টাকা দিবি এনে দেবো। (প্রহর)


প্রেয়সী মুখকালো করে বললো, 


-তুমি কবে থেকে কিপ্টা হলে দাভাই? তোমার তো এত্তো টাকা। সেগুলা আবার বড় বড়। (প্রেয়সী)


ওদের কথার মাঝে আমি শুধু চাওয়া-চাওয়ি করছি। কথা বলার সুযোগটুকু পাচ্ছিনা। শেষে প্রহরভাই বললেন, 


- আচ্ছা দুজনের কথাই আমি রাখলাম৷ আর আমারো একটা অবুঝ মেয়েকে নিয়ে পাহাড় দেখার শখ। ঐটারে নিয়ে গিয়ে পাহাড় থেকে ফালায় দেবো। যত্তসব ঝামেলা। কি বলিস ঐশী? (প্রহর)


ঐশী জীবনে প্রথম প্রহরভাইয়ের সাথে এত কথা বলার সুযোগ পেলো বোধহয়। আমরা দুবোনেই ছোটবেলা থেকে প্রহরভাইকে যমের মতো ভয় পাই। সেখানে প্রহরেভাইয়ের চেন্জনেস সত্যি চোখে পড়ার মতো। এদিকে সাজেক যাওয়ার আনন্দে ঐশী পাগলপ্রায়। 



সময়টা এখন বিকাল-সঁন্ধ্যার মাঝামাঝি। সূর্যটা তাঁর কঠোরতা কমিয়ে একটু মিষ্টি হতে চলেছে। আলোতেও একটু কমলাভ ভাব। ছাদের কার্নিশে দোলনায় হেলান দিয়ে হাতে রাখা গিটারটায় টুংটাং আওয়াজ করে চলেছে প্রেম। দুমিনিট আগে সারা ওদের বাসায় এসেছে, এখন সে প্রেমের ঠিক পেছনে। প্রেম সেটা উপলব্ধি করছে, কিন্তু ফিরে তাকাচ্ছে না। তাকালেই তো সারার সারপ্রাইজ নষ্ট হয়ে যাবে। সারা চায় প্রেমকে না জানিয়ে তার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতে, কিছুক্ষণ, আরো কিছুক্ষণ। সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা ইতোমধ্যে অবগত হয়েছে প্রেম। বাসায় ঢোকার পর নিশ্চই সারাও জেনে গেছে বিষয়টা, আর এখন সে কোনো ভাবে হলেও আমাকে বলবে 'আমিও যেতে চাই তোমাদের সাথে'। প্রেমের ভাবনার মাঝেই সারা উপস্থিত হলো প্রেমের সামনে। প্রেম না চাইতেও অবাক দৃষ্টিতে তাকালো সারার পানে। সারা প্রেমের এই বিষ্ময়ভরা চোখদুটো দেখে খিলখিল করে হেসে উঠে বললো, 


- আমি যে এতক্ষণ তোমার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম বুঝতে পারো নি তাইনা? (সারা)


প্রেম মুচকি হেসে বললো, 


-হুমমম সেটাই। কখন এলে? (প্রেম)


সারা আবারো হেসে প্রেমের থেকে একটু সাইড নিয়ে দোলনায় বসে পড়লো৷ দোলনায় একটু ধাক্কা দিতেই সেটা মৃদু গতিতে এপাশ ওপাশ চলতে থাকলো। সারা প্রেমের হাত থেকে গিটারটা নিজের কোলে নিয়ে বললো, 


- আমিও শিখবো। শিখাবা? (সারা)


প্রেম সারার থেকে খনিকটা স্পেস নিয়ে বসে বললো, 


- শিখানো যায়। তবে তোমাকে অনেক টাইম ওয়েস্ট করতে হবে। আর এটা অনেক ধৈর্যের কাজ। তার থেকে না শেখাই ভালো। (সারা)


সারা যেনো এটাই চেয়েছিলো। প্রেমের কাছাকাছি থাকলে তার অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করে। অদ্ভুত সুখপ্রাপ্তি হয়। এই ভালোলাগার অর্থ সে জানে না। তবে প্রেমের উপস্থিতি সে খুব করে চায়। সারা অকপট স্বরে বললো, 


- যাই হয়ে যাক। আমি শিখবই৷ তুমি শিখাবা কি'না সেটা বলো? (সারা)


প্রেম গম্ভীর স্বরে বললো, 


- না শিখাবো না। (প্রেম)


সারা অবাক হয়ে গেলো। কেমন মুখের উপর না করে দিলো! সারা মন খারাপ করে বললো, 


- কেনো শিখাবা না? আমাকে তুমি ফ্রেন্ড'ই ভাবো না তাইনা। (সারা)


প্রেম মুচকি হেসে বললো, 


- বিষয়টা তেমন না সারা। আমার গিটার নিয়ে পরে থাকার সময় হয়না। আমার দিনের বেশীরভাগ সময় কেটে যায় ব্যস্ততায়। পড়াশোনাও করতে হয়। আমার যখন ভালোলাগে অথবা সময় বের করতে পারি, ঠিক তখনই এসব নিয়ে বসি। (প্রেম) 


ঠিক তখন'ই ছাদে নাস্তার ট্রে নিয়ে হাজির হলাম আমি। হালকা কানে বাজলো ওদের কথোপকথন। আমি আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বললাম, 


- কি নিয়ে কথা হচ্ছে বাচ্চারা? নাস্তা রেডি। (আমি)


প্রেম ঝটপট উঠে দাঁড়ালো। দোলনা থেকে উঠে আমার হাত থেকে নাস্তার ট্রে'টা নিয়ে বললো, 


-তুমি কষ্ট করে আসতে গেছো কেনো? আমাকে বললেই হতো। (প্রেম)


আমি কপট রাগের স্বরে বললাম, 


- হইছে! আর বলতে হবে না৷ নিজের গেস্ট আসছে আর উনার কোনো খবর'ই নাই। শেষ পর্যন্ত গেস্টকেই ছাদে উঠে আসতে হচ্ছে। তুই আমাদের মানসম্মান কিছু রাখবি বলে মনে? (আমি)


প্রেম হো-হা করে হেসে উঠলো। আমি কঠোর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। এদের দুই ভাইয়ের কি অসময়ে হাসার রোগ আছে নাকি? সারা দোলনা থেকে উঠে এসে বললো, 


- আরে আমি তো প্রেমের ফ্রেন্ড। আমি কিছু মনে করিনি ভাবি। (সারা)


সারার মুখে ভাবি ডাকটা শুনেই আমার মগজ চিনচিন করে উঠলো। গত কালও ভাবিনি আমি এত তারাতারি কারো বউ হতে চলেছি। আর আজ কিনা কারো বউ, কারো ভাবি হয়ে গেলাম! আমি প্রেমের দিকে দৃষ্টি রেখে বললাম, 


- শোন, সাজেক যাচ্ছে তোর ভাই। আমরা তো যাচ্ছি'ই। আর  সাথে যাচ্ছে সারা। আমি জানি তুই এখন না, না করবি। কিন্তু কিছুই শুনছি না আমি। (আমি)


প্রেম ক্ষণকাল নিশ্চুপ থেকে বললো, 


- কিভাবে যাবে ও? ওর ফ্যামিলি যদি জানতে পারে কার সাথে যাচ্ছে তাহলে অনেক ঝামেলা বাঁধবে। তুমি হয়তো জানো না ওর ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক খারাপ। এখন ওকে যদি জিজ্ঞেস করে ও কোন ফ্রেন্ডের সাথে যাচ্ছে। তাহলে কি বলবে? ওর ফ্যামিলির কি উচিত হবে না কোন ফ্রেন্ডের সাথে যাচ্ছে সেটার খবর নেয়া। তাও আবার ছেলে ফ্রেন্ড। (প্রেম)


প্রেমের যুক্তিযুক্ত কথা শোনামাত্র'ই ভাবনায় পরে গেলাম আমি। কিন্তু মেয়েটা কত আশা করে আমাদের সাথে যেতে চাইছিলো! আমরাও তখন হ্যাঁ বলে দিলাম। কিন্তু প্রেমের সাথে যে সারার ভাইয়ের সম্পর্ক খারাপ সেটা কে জানবে? সারার দিকে তাকিয়ে দেখলাম বেচারি মন খারাপ করে মাথা নিচু করে বসে আছে। সারা হঠাৎ বললো, 


- আচ্ছা আজ যাই তাহলে ভাবি। (সারা)


সারা যে ভীতরে ভীতরে আহত হয়েছে সেটা ভালো'ই বুঝতে পারছি। এদিকে প্রেম নিরুত্তর। এর ভীতরে কি কোনো অনুভূতি নাই? আমি ঝটপট বললাম, 


- কোথাও যাচ্ছো না তুমি। আগে নাস্তা করো, আমাদের সাথে আড্ডা দাও। আর তুমি অবশ্যই আমাদের সাথে যাচ্ছো সাজেক। সেটার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করবে প্রেম। আমি কিছুই শুনতে চাইনা। (আমি)


আমার কথা শোনামাত্র প্রেম কঠোর দৃষ্টিতে তাকালো। কিন্তু ওর কঠোর দৃষ্টির মাঝেই ব্যাঘাত ঘটালো ফোন৷ ফোনটা পকেট থেকে বের করে রিসিভ করলো শুধু। ওপাশ থেকে কে কি বললো তা বুঝতে পারলাম না৷ প্রেম হু হা করেই চলেছে। ওর কথা বলা শেষ করে আমাদের দিকে দৃষ্টি রেখে বললো, 


- একটা জরুরী কাজে বাইরে যেতে হবে। সারা তুমি আড্ডা দাও। আর রাতের খাবারটা এখানেই আমাদের সাথে খাবে। আমি আসছি এক্ষুনি। (প্রেম)


আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই প্রেম তড়িৎ গতিতে ছাদ থেকে নেমে গেলো। মিনিট খানেকের মাথায় বাসা থেকে ওর বাইকটা নিয়ে বেড়িয়ে পরতে দেখা গেলো। সারা অস্থির হয়ে বললো, 


- ও কোথায় গেলো ভাবি? (সারা)


আমি হতাশকন্ঠে বললাম, 


- ওর যাওয়ার যায়গার অভাব? মিনিটেই দেখবা বাসায়। আবার মিনিটেই দেখবা ওর বন্ধুর বাসায়। ওর কথা বাদ দাও তো। 


ঠিক তখনই ছাদে উপস্থিত হলো প্রহরভাই। আমাদের দু'জনকে একসাথে দেখে মুচকি হাসলো। প্রহরভাই বললো, 


-প্রেম কোথায় গেলো রে? জিজ্ঞেস করলাম কই যাচ্ছে, উত্তর দিলো না৷ তুই কিছু জানিস? 


আমি উনার কাছাকাছি গিয়ে বললাম, 


- ও কখন কোথায় যায় বসে যায়? (আমি)


আমার কথা প্রহরভাই কর্নপাত করলো না। সারার দিকে তাকিয়ে বললো, 


- তোমার বাবার নাম্বারটা দিয়ো তো। নাম কি জেনো বললা? (প্রহরভাই)


সারা নম্রস্বরে জবার দিলো, 


- জি সৌরভ চৌধুরী। ব্যাংক ম্যানেজার। (সারা)


প্রহরভাই হাস্যজ্বল স্বরে জবাব দিলো, 


- হুম চিনে ফেলেছি। তোমার বাবার সাথে একসময় ক্রিকেট খেলতাম। তখন তোমার বাবা ছিলো আমার বয়সী। আর আমি ছিলাম দুধভাত। মানে শুধু বল কুড়িয়ে এনে দিতাম। উনি আমাকে যথেষ্ট ভালোবাসেন। তোমার কোনো টেনশন করতে হবে না। তুমি আমাদের সাথে অবশ্য'ই যাচ্ছো।(প্রহর)


---------👻


সারার সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে আমি আর প্রহরভাই নিচে নেমে আসলাম। সারা এখনো ছাদের মধ্যে প্রেমের গিটারটা নিয়ে বসে আছে। ওকে ভীতরে ডাকলাম কিন্তু সে বললো উপরেই ভালোলাগছে। এখন বাসাটা একদম নিরিবিলি। কোথাও কোনো আওয়াজ নেই। থাকবে কিভাবে? আন্টি আর আঙ্কেল তো এখন বিয়ের দাওয়াত দিতে আত্মীয়দের বাসায় বাসায় ঘুরছে। প্রেমকে ডেকেছিলো সাথে। কিন্তু সে কি যাওয়ার পাত্র? বাতাসে বেলকনির পর্দাটা দপদপ করে কাঁপছে। আকাশটা বোধহয় খারাপ করবে। এখন প্রহরভাই আমার সামনে মুর্তির মতো বসে আছেন। কথাবার্তা বলছেন না। শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমি উনার দৃষ্টিতে বিরক্ত হয়ে বললাম, 


- আহ! কি ওমন করে দেখছেন? (আমি)


প্রহরভাই যেনো আরো বিরক্ত হয়ে গেলেন। আশ্চর্য! এখানে বিরক্ত হওয়ার কি আছে। উনি কন্ঠে বিরক্তিভাব রেখে বললেন, 


- তাকানোর জিনিস তাকাবো না? বউয়ের দিকে তাকানো যাবে না এটা কোন আইনে লেখা আছে? (প্রহরভাই)


আমি উনার কথায় আশ্চর্য হয়ে বললাম, 


- তাকানোর জিনিস মানে? আমি তাকানোর জিনিস? (আমি)


প্রহরভাইয়ের বিরক্তিভাব কাটলো না। উনি চুপ করে রইলেন। সোফার মধ্যে হাত পা ছাড়িয়ে বললেন, 


- নে এবার স্বামীসেবা কর। স্বামীসেবা করলে আল্লাহ খুশি হন। পা'টা টিপে দে। (প্রহরভাই)


আমি পরে গেলাম ফ্যাসাদে। এমনিতে বললে হয়তো কখনো পা টিপে দিতাম না। কিন্তু উনার কথায় আমার নিষ্পাপ মনটা গলে গেলো৷ তাই হাত বাড়িয়ে উনার পা টেপা শুরু করলাম। কিন্তু যখনই উনার পায়ে হাত দিলাম। ঠিক তখনই বিদ্যুৎ গতিতে ছিটকে গেলেন প্রহরভাই। একেবারে সোজা সোফা থেকে মেঝেতে। মহুর্তের ঘটনায় আমি হতবাক, বাকরুদ্ধ । এটা কি হলো? উনি মেঝেতে বসে বিষ্ময় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, 


- কি হলো প্রহরভাই? আমি তো স্বামীসেবা করলাম। (আমি)


উনি আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, 


-আমি কখনো ভাবিনি তুই আমার পা টিপে দিবি। তুই জানিস না আমার পায়ে কাতুকুতু? ছোটবেলায় গোসলের সময় আম্মু আমার পা ধরলেই আমি কান্না করে ভাসিয়ে দিতাম। (প্রহরভাই)


প্রহরভাইয়ের ব্যাথিত এই বাক্যে আমার মনে আনন্দের খই ফুটলো৷ যাই হোক, প্রহরভাইকে জ্বালানোর আরেকটা উপায় পেয়ে গেলাম৷ এতদিন উনি আমাকে জ্বালিয়েছেন। এখন আমি জ্বালাবো। একটু সবার বাসায় দাওয়াত কম্প্লিট করে আঙ্কেল-আন্টি বাসায় ফিরলো। সারাকে দেখে উনারা অনেক খুশি। প্রেমের যে একটা মেয়ে বন্ধু জুটেছে এটা শুনে আন্টিতো একেবারো বিষ্মিত৷ অবশেষে প্রেম মেয়েদের সাথে তাও কথা বলে! সারা কিছুক্ষণ আন্টির সাথে আড্ডা দিলে প্রহরভাই আমাকে টেনে নিয়ে গেলেন রুমের ভীতর। দরজাটা লাগিয়ে বললেন, 


- বোরিং লাগছে কেনো রে? তোকে বিয়ে করেছি কি বোরিং লাগার জন্যে? কিছু একটা কর। (প্রহর)


আমি বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বললাম, 


- তাহলে কিসের জন্য বিয়ে করেছেন আমায় প্রহরভাই? আর আপনার বোরিং লাগা কিভাবে আমি কাটাবো? (আমি)


প্রহরভাই বিরক্ত হয়ে বললেন, 


- আনরোমান্টিকের বাচ্চা (প্রহর)


আমি উনার কথায় হতবাক হয়ে গিয়ে বলাম, 


- তাহলে কি আপনি রোমান্টিক প্রহরভাই? (আমি)


প্রহরভাই হালকা কেশে বললেন, 


-তোর থেকে আমি ৯ বছরের বড়। বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় ভুলে গেছিস? (প্রহর)




চলবে?

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url