শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ১১

 

শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ১১

শুধু তুই

লেখকঃ রিফাত আমিন

পর্বঃ ১১


-প্রহরভাই, আপনার বোরিং লাগলে আমাকে নিয়ে একটু ঘুরে আসেন আশপাশে। শুনেছি বউকে নিয়ে ঘোরাফেরা করলে নাকি শরীর ও মন উভয়েই ভালো থাকে৷ (আমি)


প্রহরভাইয়ের এত বোরিং বোরিং মনোভাব শুনে আমার ইচ্ছে হলো একটু বাইরে থেকো ঘুরে আসার। তাই সুযোগ বুঝে কথাটা বলে ফেললাম। প্রহরভাই কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো, 


- এই কথাটা কোন বইয়ে লেখা আছে? ধান্ধাবাজি শিখে গেছিস তাহলে। (প্রহর)


প্রহরভাইয়ের কথায় আমি যেনো আকাশ থেকে পড়লাম। ফট করে উনার কোলে নিয়ে বসে বললাম, 


- এর জন্য'ই তো আমরা প্রাকটিক্যালি ঘুরতে যাবো। তখন বুঝতে পরবো আসলে কথাটা কতটা যুক্তিযুক্ত। (আমি)


আমার কোলে উঠার ঘটনায় উনি হতবাক হয়ে গেলেন। উনার ২৭ বছরের দীর্ঘ জীবনে আমি কখনো এভাবে কোলে উঠেছি বলে উনার মনে পরছে না। উনি আমাকে তারাতারি সরিয়ে দিয়ে বললেন, 


- এত ওজন কেনো রে তোর? তোর না দুমাস আগেও অনেক কম ছিলো৷ তাহলে এভাবে আঙ্কেলের খাবারগুলো ধ্বংস করছিলি! ছিঃ। আমার বাসায় মোটেও তেমনটা হবে না৷ এখানে খেটে খেতে হবে বুঝলি। (প্রহর)


কথাটা শোনামাত্র আমার চোখগুলো রসগোল্লার মতো বড় হয়ে গেলো। দুমাস আগে ওজন কম ছিলো মানে? এটা উনি জানলেন কিভাবে? আমাকে কি কোলে নিয়ে ছিলেন উনি? সর্বনাশ! আমি কৌতুহলী দৃষ্টি রেখে বললাম, 


- এটা আপনি জানলেন কিভাবে প্রহরভাই? আপনি তো মোটেও ভালো না। একটা অবিবাহিত মেয়ের ওজন সম্পর্কে আপনি ধারণা রাখেন কিভাবে! (আমি)


প্রহরভাই হালকা কেশে বললেন, 


- তুই তো এখনো বাচ্চারে। সেদিন তো তোকে কোলে নিয়ে বাজারে চকলেট কিনে দিলাম। মনে নাই? (প্রহর)


উনার কথায় আমি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললাম,


- আপনি খুব খারাপ প্রহরভাই! (আমি)


প্রহরভাই বসা থেকে উঠে টিশার্ট চেন্জ করতে করতে বললো, 


-এখন তোর কমন ডায়ালগটা বন্ধ করে পাঁচ মিনিটের মধ্যে রেডি হ৷ বাইরে ঘুরবে যাবো। পাঁচ মিনিট মানে হলো তিন'শ সেকেন্ড। অনেট সময়। (প্রহর)


প্রহরভাইয়ের কথায় আমি খট করে সোফা থেকে নামলাম। উনি যে আমার কথা রাখতেই বাইরে বেড়াতে যাচ্ছে এটা ভেবে নাগিন ডান্স শুরু করতে ইচ্ছে হলো৷ কিন্তু ডান্স করর সৌভাগ্য তো হবে না৷ তাই দৌড়ে গিয়ে প্রহরভাইকে জড়িয়ে ধরলাম। কিন্তু উনি যে লম্বা! উনি তাৎক্ষণাৎ আমার কাছ থেকে নিজেকে সড়িয়ে নিয়ে বললেন, 


- তোর কথা রাখতে বাইরে যাচ্ছি না মনা। বাইরে যাচ্ছি নিজের মনকে ফ্রেস রাখতে৷ ভাবলাম নিজে যখন বাইরে যাচ্ছি তখন বউ নামক অসহ্য প্রাণীটিকেও নিয়ে যাই। (প্রহর)


মুহুর্তেই আমার মন খারাপ হলো। এই ছেলের জন্য খাটাস নামটাই বেটার। আমি হতাশ কন্ঠে বললাম, 


-আপনি খুবই খারাপ প্রহরভাই। সাথে আনরোমান্টিকও। আপনার কখনো বিয়ে হবে না। (আমি)


প্রহরভাই তীব্রস্বরে হেসে বললেন, 


- একটা বিয়ে করেই কুল পাইনা। যেটাকে বিয়ে করেছি সেটাকে মানুষ করি আগে। তারপর অন্য বিয়ের কথা চিন্তা করবো। নাউ বি রেডি। (প্রহর)


আমি মুচকি হেসে লাজুকস্বরে বললাম, 


- শাড়ি পরবো প্রহরভাই? (আমি)


প্রহরভাই ভ্রু কুঁচকে চাইলেন। সন্দেহাতীত কন্ঠে বললেন, 


- পরলে পরবি। কিন্তু আমি হেল্প করতে পারবো না। আম্মির কাছ থেকে পড়িয়ে নিবি। (প্রহরভাই)


আমি বিরবির করে বললাম, 


- আনরোমান্টিক একটা (আমি)


প্রহরভাই আমার কথা শোনামাত্র আবারো ভ্রু কুঁচকালেন। কিন্তু জবাব দিলেন না অথবা জবাব দেয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না। বেটা আমার সামনেই নির্লজ্জের মতো শুভ্র পান্জাবীটা গায়ে দিলেন। চুলগুলো মোটামুটি ঠিক আছে। উনাকে তো সবসময়'ই সুন্দর লাগে! ধুর। আমাকে কবে সুন্দরী লাগবে? যেহেতু উনি সাদা পান্জাবী পরলেন তাই আমিও সাদা শাড়ি পরার চিন্তা মাথায় আনলাম। কিন্তু সাদা শাড়ি পরলে তো বিধবা লাগবে। কি যন্ত্রণা! অতঃপর ভাবলাম আমি আর প্রহরভাই হচ্ছে বিপরীত গ্রহের মানুষ। তাই উনি শুভ্র পান্জাবী পরলে আমি কৃঞ্চ শাড়ি পরবো৷ দ্যাটস ফাইনাল। আমি ড্রয়ার খুঁজে একটা কালো শাড়ি বের করলাম। এটা তো দামি মনে হচ্ছে। এটাও কি প্রহরভাই আমার জন্য রেখেছিলেন? আমি শাড়িটা উনার সামনে ধরিয়ে বললাম, 


- আপনার গার্লফ্রেন্ডকে দেয়ার জন্য রেখেছিলেন তাইনা? সেটি আর হচ্ছে না। রশ্নি যেহেতু আপনার রুমে একবার ঢুকে পরেছে। তাহলে আপনার জীবনের মোর ঘুরিয়ে ছাড়বে। এই শাড়িটা আমি নিজের নামে করে নিলাম। (আমি)


প্রহরভাই শরীরে পারফিউম লাগাতে লাগাতে বললেন, 


- নিলে নিবি। দাম পরিশোধ করে তারপর পরবি। (প্রহরভাই)


আমি ঠোঁট বাকিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে আসলাম। এ্যাঁ! ভালো করে এখন টাকা পরিশোধ করবো। ড্রইংরুমে এসে দেখলাম এখনো আন্টি সারার সাথে কথা বলছে। দুজনেই হেসে হেসে আড্ডা দিচ্ছে। সারা মেয়েটা বেশ লক্ষী। আমার নিষ্পাপ মন বলছে সারা এখন প্রেমের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছ। কিন্তু সে যে কি লেভেলের রোবোটের প্রেমে পড়ছে সেটা কি জানে? জানলে হয়তো কখনো এই ভূল করতো না৷ আমি আন্টির সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, 


- আম্মি আমাকে এই শাড়িটা পরিয়ে দিন তো। উনার সাথে একটু বাইরে যাবো। অতঃপর সারার দিকে দৃষ্টি রেখে বললাম, আমাদের সাথে যাবে বাইরে? একটু ঘুরে আসবে না'হয়। প্রেম যে কবে আসবে কে জানে? (আমি)


সারা হয়তো যেতো। কিন্তু একটা কাপলের মাঝে থাকাটা কাবাব মে হাড্ডি হবে তাই আর রাজি হলো না। আমি কয়েকবার জোর করার পরও রাজি হলো না। আমি শাড়িটা পরে এসে রুমে ঢুকতে যাবো তখনই নজর পরলো সারার প্রতি। সে প্রেমের রুমে ঢুকে মন খারাপ করে এদিক ওদিক হাটছে। প্রেমের সাজানো গোছানো রুমটা বারবার দেখছে। বুঝতে পারলাম অলরেডি এই মেয়ে ফলেন অন লাভ৷ এই মেয়ে শেষ। টা টা! বায় বায়। আমি আর ওকে ডাকলাম না। প্রেমটা যে কবে আসবে। একটা গেস্ট আসছে বাড়িতে অথচ তাকে সঙ্গ দেয়ার মানুষ নেই। আমি প্রহরভাইয়ের রুমে ঢুকে দেখলাম উনি রেডি-ফেডি হয়ে একেবারে ফিটফাট। আমাকে দেখে খানিক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। মনে হয় আমাকে সুন্দরী লাগছে। তাই আমিও একটু ভাব নিতপ ধরলাম। উনি আমার ভাব দেখে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বললেন, 


- তোকে যে ভুতের বউ পেত্নী লাগছে সেটা কি তুই জানিস? আচ্ছা যাই হোক, রেডি হয়েছিস তো? এখন চল। (প্রহর)


আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,


- রেডি হয়েছি মানে? এখনো তো মেকাপ করাই বাকি। আরো কত কি বাকি? (আমি)


প্রহরভাই হতাশ হলেন। রাগ করতে চেয়েও পারলেন না। স্বাভাবিক স্বরে বললেন, 


- আচ্ছা রেডি হ তারাতারি। (প্রহর)


আমি পেয়ে গেলাম সুযোগ। ড্রেসিংয়ের সামনে বসে প্রহরভাইকে বললাম, 


- ভাইয়া আমার চুলটা ঠিক করে দিন তো। এতদিন ঐশী দিতো। কিন্তু এখন আপনি ছাড়া আর কে দিবে? (আমি)


প্রহরভাই বিরক্ত হলেন। কিন্তু উঠে দাঁড়ালেন। নিজের ফোনটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 


-কি পারিস তুই? একটা কাজও তো করতে জানিস না দেখি অতঃপর ভ্রুকুটি করে বললেন, আচ্ছা নিজে খেতে জানিস তো? (প্রহর)


আমি ঠোঁট উলটে বললাম, 


- না, আম্মি খাওয়ায় দেয়। (আমি)


প্রহরভাইয়ের চোখদুটো রসগোল্লার মতো গোল হয়ে গেলো। অবাক স্বরে বললেন, 


- একা বাথরুমে যেতে পারিস তো? না পেলে আমাকে বলবি। আমি হেল্প করবো৷ (প্রহর)


আমি প্রহরভাইয়ের মুখে এমন নির্লজ্জ মার্কা কথা শুনে চোখমুখ কুঁচকে ফেললাম৷ লজ্জায় পরে বললাম, 


- আপনি খুবই খারাপ প্রহরভাই। (আমি) 


প্রহরভাই এবার বিরক্তের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গিয়ে বললেন,


- চুপচাপ বসে থাক। বেশী কথা বললে তুলে দেবো একটা আছাড়। তখন বুঝবি মজা। (প্রহর) 


--------😎


বিকাল গড়িয়ে সঁন্ধ্যা হলো৷ আকাশটা ক্রমেই অন্ধকার হতে শুরু করছে৷ আমি আর প্রহরভাই এখন রিক্সার হুডের নিচে বসে আছি। আকাশটা খারাপ করেছে। কখন জানি বৃষ্টি নামে বলা যায় না। তাই আগেভাগেই হুডটা উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বাড়িতে সারা মেয়েটার কথা ভেবে খারাপ লাগছে। বেচারি এখন কি যে করছে! আমি প্রহরভাইয়ের কাছ থেকে ফোনটা চেয়ে নিয়ে প্রেমকে কল করলাম। কিন্তু আশ্চর্যভাবে প্রেমের ফোন বন্ধ দেখালো। ভেবেছিলাম ও ফোনটা পিক করলে তারাতারি বাসায় পাঠাবো৷ তা আর হলো কই? আমি ফোনটা উনাকে ফেরত দিয়ে চুপ করে বসে থাকলাম। প্রহরভাই আমার কাপলে হাত রেখে বললেন, 


- শরীর ঠিক আছে? এখন তো নিজের থেকেও তোকে যত্ন করতে হবে৷ এখন যদি তোর শরীর খারাপ হয় তাহলে আঙ্কেলকে কি জবাব দেবো? (প্রহর)


আমি উনার উদ্ভব প্রসঙ্গে বিরক্ত হলাম। রিক্সাওয়ালা একবার আমাদের মুখের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করলেন। হয়তো ভেবেছিলো প্রেমিক-প্রেমিকা। এখন হয়তো ভাবছে ভাই-বোন৷ কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এই দুটোর কিছুই নয়। আমরা এখন স্বামী-স্ত্রী৷ কি অদ্ভুত! রিক্সাওয়ালা মামা বললেন, 


- আকাশডা মেলা খারাপ। এই সন্ধের সময় বের হইছেন কেন আব্বা? (রিক্সাওয়ালা)


প্রহরভাই নম্রস্বরে বললেন, 


- বউকে নিয়ে একটু ঘুরতে বের হইছি মামা। মনে রাখবেন, বউ একটি শান্তশিষ্ট কখনো লেজবিশিষ্ট প্রাণী। সবসময় আদর করে রাখতে হয়৷ ক্ষেপে গেলে কিন্তু জীবনটা শেষ করে ফেলবে। (প্রহরভাই)


রিক্সাওয়ালা হো-হা করে হেসে উঠলেন। আর আমি উনার কথায় ভ্রু কুঁচকে ফেললাম। আমি প্রেমের টেনশনে বাঁচি না। আর উনি আছেন মজা-মাস্তি নিয়ে। মামা অতিকষ্টে হাসি থামিয়ে বললেন, 


- তোমাগো দেখে মনে হয় ভাই-বোন। হা-হা-হা (মামা)


প্রহরভাইও উনার সাথে তাল মিলিয়ে মুচকি হাসলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশটা ঘন-কালো অন্ধকারে ছেঁয়ে গেলো। এবার বোধহয় বৃষ্টি নামবেই। চারিপাশে হালকা বিদ্যুৎের ঝলকানিও দৃষ্টিপাত করা গেলো। হালকা শীতল বাতাসে কোষের নিউরনগুলো অতিদ্রুত মস্তিষ্কে সংকেত পাঠাচ্ছে। প্রহরভাই নিজের বলিষ্ঠ হাত দিয়ে আমাকে নিজের সাথে একটু চেপে বসালেন। উনার শরীরের তাপে এখন একটু আরাম লাগছে। প্রহরভাই গম্ভীর স্বরে বললেন, 


- এই সময়ে বের হওয়াটা উচিত হয়নি তাইনা? এখন ফিরে গেলেও সময় লাগবে। কিছু খাবি? (প্রহরভাই)


আমার এখন প্রচন্ড মন খারাপ লাগছে। আকাশটা মেঘলা থাকার কারণে বোধহয় মনখারাপটা আরো ঘনীভূত হচ্ছে। আমি কোনো জবাব দিলাম না। নিজের চিন্তায় জর্জরিত মাথাটা উনার কাঁধে ঢেলে দিয়ে উনার বামহাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। উনি সচকিত হয়ে বললেন, 


- খারাপ লাগছে রশ্নি? চল বাসা ফিরবো। আরেকদিন ঘুরবো এখন। (প্রহরভাই)


উনার কন্ঠে আমার নামটা এত মিষ্টি শোনালে যে বারবার এই কন্ঠটা শুনতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু উনি তো আর বলবেন না। কিছু সুন্দর মহুর্ত হয়তো খুব স্বল্প পরিমানে পাওয়া যায়। প্রতিনিয়ত পেলে সেই সুন্দর মহুর্তটার আর মুল্য থাকে না। অথবা আমরা মুল্য দিতে চাইনা। 

আমি স্বল্পস্বরে বললাম,


- আজ রাতটুকু আপনার সাথে থাকবো শুধু প্রহরভাই। কাল থেকে আবার আগের জীবন শুরু। আম্মিকে রাগের মাথায় বলেছিলাম আপনার সাথে থাকবো না। কিন্তু রাজি হবে কে জানতো? (আমি)


প্রহরভাইয়ের মুখ-চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। উনি কথা না বলে চুপ করে থাকলেন। আর দুমিনিট পরপর আমার শরীরের তাপমাত্রা মাপার অব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলেন৷ হঠাৎ অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামতে শুরু করলো। প্রহরভাই রিক্সাওয়ালাকে সাইডে দাঁড় করিয়ে ভাড়া দিয়ে দিলেন। এই বৃষ্টিতে আর এগোনো যাবে না মনে হচ্ছে। বাতাসটাও বেড়েছে ক্রামাগত। কিছুক্ষণ পর এমন অবস্থা হলো যে বৃষ্টির গতিতে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ফুটপাতের ছাদের নিচ দিয়ে হাটার চেষ্টা করতে লাগলেন প্রহরভাই  আমি তার পিছু পিছু হাটতে লাগলাম। কিছুদূর যেতেই রাস্তার যে ছেলেই প্রহরভাইকে দেখছে আর বলছে "কেমন আছেন ভাই? " "কি অবস্থা প্রহর" আসসালামু আলাইকুম প্রহরভাই "। মনে হচ্ছে প্রহরভাই একজন সেলিব্রেটি৷ কিন্তু আমার সবকিছুই যেনো বিষাক্ত লাগছে। হঠাৎ একটা ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে প্রহরভাইয়ের সামনে হাজির হলো৷ ছেলেটা বৃষ্টিতে ভিজে চুপসে গেছে। প্রহরভাই শশব্যস্ত হয়ে বললো, 


- কি হয়েছে মিলন? এমন অবস্থা কেন তোর? (প্রহরভাই)


মিলন নামের ছেলেটা নিজেকে একটু সময় না দিয়েই বললো, 


- তোমার ছোটভাই প্রেম না? ওরে তো আমরা সবাই চিনি। ওরে আর ওর তিন বন্ধুকে পঁচিশ-ত্রিশটা ছেলে কু-ত্তার মতো পি-টাচ্ছে। সামনের মোরেই। আমি তোমাকে খবর দেয়ার জন্যই ফোন করছিলাম। কিন্তু তুমি ফোন ধরছিলে না৷ বোধহয় ফোন সাইলেন্ট। (মিলন)


প্রহরভাই কথাটা শুনেই হতভম্ব হয়ে গেলেন৷ অবশেষে যে ভয়টা ছিলো সেটা বাস্তবে রুপ নিতে চলেছে বোধহয়। উনি শুধু আমার দিকে একবার দৃষ্টি রেখে বললেন, 


-তুই কষ্ট করে একটু বাসা যা। (প্রহরভাই)


এদিকে মিলনের মুখে ভয়ংকর কথাটা শোনামাত্র আমার কলিজার পানিটুকু নিঃশেষ হবার জোগাড়। আমার হাত-পা রিতীমত কাঁপছে। প্রহরভাইকে দেখে মনে হলো উনি নিজেকে শান্ত রাখার যথেষ্ট চেষ্টা করছে। আর কোনো দিকবিদিক না দেখেই এই অঝোর বৃষ্টিতে মিলিয়ে গেলেন উনি৷ আমাকে মিলন নামক ছেলেটা শুধু বললো, 


-আপু আপনাকে বাসা পৌঁছে দেই? নাহলে প্রহরভাই আমার সাথে রাগ করবে। (মিলন)


আমি মিলনের কথাটুকু শোনার সময় নিলাম না। প্রহরভাই যেদিকে চলে গেলেন সেদিকেই আমিও ছুটলাম। বৃষ্টিতে নামার সাথে সাথেই ভিজে গেলো শাড়ি। এত মুশলধারায় বৃষ্টি এই বছরে এটাই প্রথম। আমি সেসবকে পাত্তা না দিয়ে প্রহরভাইয়ের পিছু পিছু ছুটছি। বৃষ্টিতে মনে হচ্ছে চোখ বন্ধ হয়ে যাবে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আর বিদ্যুতের ঝলকানিতে প্রহরভাই ভেজা শরীরটা বারবার চোখে পড়ছে। কিছুদূর আগাতেই দেখলাম প্রহরভাই থেমে গেছে। সামনে পরে আছে তিনজনের একই কালার, একই ব্রান্ডের সুজুকি জিক্সারগুলো। এই বাইকটা কিনে নিতে প্রেমের সে কি জেদ! সেখানেই অচেতন হয়ে পরে আছে তিনটা মানুষ৷ প্রহরভাই শুধু বারবার চুলগুলো চোখের সামনে থেকে সড়িয়ে দিচ্ছেন। কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তিনজনের অবস্থাই বোধহয় খারাপ। প্রহরভাই ফোন বের করে এ্যাম্বুলেন্সে ফোন করতে ধরলেন। কিন্তু উনার হাত-পা কাঁপছে। এই কঠোর মানুষটা নিজের সব থেকে কঠোর মহুর্তটা বোধহয় উপলব্ধি করছেন। আমার চোখ-মুখ ইতোমধ্যে আকাশের পানি আর চোখের পানিতে মিশে গেছে। প্রহরভাইয়ের হাতে পানি থাকায় ফোনটা কাজ করছে না। এলোমেলো কাজ করছে। আমি দ্রুত উনার সামনে গিয়ে শাড়ির শুকনো আচলটা মেলে ধরলাম৷ উনি দ্রুত এ্যাম্বুলেন্সকে ফোন লাগালেন। যাই হয়ে যাক, মাথা ঠিক রাখতে হবে। বেশী সময় নষ্ট করলে নিজেদের'ই ক্ষতি। এ্যাম্বুলেন্সকে ফোন করে সামনের প্রেম, সাব্বির, আবীর, রাফির দিকে এগিয়ে গেলেন প্রহরভাই। প্রেম ছাড়া সবাই প্রায় অক্ষত। রাফিকে এখনো নড়তে দেখা যাচ্ছে। আমার এখানকার সবকিছুকে কেমন স্বপ্ন মনে হচ্ছে। এমনটা তো কেবল স্বপ্নতেই সম্ভব। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে একটা জিনিস'ই চাইলাম। এবারের মতো ছেলেগুলোকে বাঁচিয়ে দাও৷ প্রহরভাই প্রেমের দিকে এগিয়ে গেলেন। সারা শরীরে মারের দাগ। নিশ্চই এগুলো হকিস্কিকের। শরীর ফেটে এখনো রক্ত বের হচ্ছে প্রেমের। প্রহরভাই প্রেমের মাথাটা নিজের কোলে রাখলেন। সাথে সাথে প্রহরভাইয়ের শুভ্র পান্জাবীটা লাল বর্ণ ধারণ করতে শুরু করলো৷ এদিকে মনেই ছিলো না রক্তে আমার ফোবিয়া। যতদ্রুত সম্ভব সেখান থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম৷ তবুও মাথাটা ঘুরছে। চেতনা হারার আগে শুধু এম্বুলেন্সের আওয়াজটা শুনতে পেলাম। 



তুমুল বর্ষণে ঢাকা শহর প্রায় জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে পরে রয়েছে। এতটাই তীব্র বর্ষণ যে একমুহূর্তের জন্যও সেই বর্ষণ থামতে নারাজ৷ এখন যে বেলা দুপুর বারোটা সেটা কোনোভাবেই বোঝা যাচ্ছেনা। মনে হচ্ছে সঁন্ধ্যা মাত্র। আকাশ ঘনকালো মেঘের নিচে মন খারাপ করে তার বিভৎস রুপ ধারণ করে আছে৷ ঢাকা শহরের রাস্তাগুলো প্রশস্ত নদীর মতো পানিতে থই-থই করছে৷ মেইনরোডে গাড়ি চলার পাশাপাশি মাঝে-ফাঁকে একটা নৌকা চলতেও দেখা যাচ্ছে। সেই নৌকাটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রহরভাই। প্রাইভেট হসপিটালটার তিনতলায় বেলকণিতে আমরা দুজন দাঁড়িয়ে আছি। উনার হাতে ধোঁয়া উঠা কফির মগ। দুমিনিট আগে এখানকার এক নার্স দিয়ে গেছে। আমার কাঁদতে কাঁদতে শরীরের বেহাল দশা। চোখের কোঠর ভেদ করে নোনাজল যেনো আপনাআপনি বের হতে চাচ্ছে৷ আমি গ্রিলে হেলান দিয়ে স্বল্পস্বরে বললাম, 


- কফিটা তো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। খেয়ে নিন৷ (আমি)


উনি গ্রিলের থেকে চোখ সড়িয়ে আমার দিকে একবার চাইলেন৷ চোখদুটো রক্ত লালবর্ণ। উনি কফিতে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, 


- ঠান্ডা হয়ে গেছে৷ আর খাবো না। তুই ঠিক আছিস? (প্রহরভাই)


আমি সচকিত হয়ে উনার দিকে তাকালাম। রাস্তায় পরে যাবার পর জ্ঞান ফিরেছে হসপিটালে আসার পর'ই। এখন শরীরটা যদিও দূর্বল। তবে সমস্যা নেই। আমি গ্রিলের বাইরে ডানহাতটা বের করে বৃষ্টিকে ছোঁয়ার চেষ্টা করতে করতে বললাম, 


-আমি ঠিক আছি৷ প্রেমের জন্য কি আরো ব্লা'ডের প্রয়োজন পড়বে? (আমি)


প্রহরভাই কফির মগটা সামনের টেবিলে রেখে বললেন, 


- জানি না। ডক্টর তো কিছু'ই জানায় নি৷ শুধু বললো অবস্থা খুব একটা ভালো না৷ ওর বেঁচে থাকাটা আমার কাছে খুব জরুরী। (প্রহর)


আমার প্রহরভাইকে খুব কথা শোনাতে ইচ্ছে হলো৷ উনার সাপোর্ট পেয়ে'ই প্রেমের আজ এই অবস্থা। কি দরকার ঝামেলায় জড়ানোর। অযথা জীবনের ঝুঁ'কি। প্রেমের কি বয়স হয়েছে এতকিছু বোঝার? তবুও ওকে শাষণে রাখতে পারলো না কেউ৷ এখন প্রহরভাইয়ের'ও যে শরীরের অবস্থা! একটু আগে প্রেমকে ব্লা'ড দিলেন। আবার একা হাতে সবকিছুর দেখা শোনা করছেন! আমি উনার কঠোর দৃষ্টিতে আর কর্মে অবাক হয়ে যাই। এত শক্ত থাকেন কিভাবে? অথচ আমার কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি যেনো শুকিয়ে গেছে। প্রেমের বাকি বন্ধুগুলোর জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু প্রেম এখন মৃ'ত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। কি দরকার এসব করার? ছেলেমানুষ, ছেলেমানুষের মতো থাকবে। অযথা বড়দের মতো মারা'মারি, কাটা'কাটিতে যাওয়া! প্রহরভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একটা সাধারণ ব্লাক টিশার্ট পড়েছে। সারা শরীর অগোছালো। গোছালো মানুষটা হঠাৎ এমন অগোছালো হলে খারাপ দেখায়। ভীষণ খারাপ। প্রহরভাইয়ের ইচ্ছে ছিলো আঙ্কেল-আন্টিকে এসবে অবগত না করানোর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার জন্য করতে হয়েছে। যদিও শুধু একবার দেখা করতে এসেছিলেন তারা৷ বৃষ্টির দোহাই দিয়ে আবার ফিরে যেতে বলেছিলো প্রহরভাই। অনেক ঝামেলা, চড়াই-উতরাই পার করে এখন একটু শান্তভাবে বসে থাকার সময় পেলেন উনি। প্রেমের বাকি তিন বন্ধুকে কৌশলে ভিন্ন ভিন্ন হসপিটালে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে অর্জন ভাইয়া আর উনার ফ্রেন্ডগুলোর জন্য। সবার ফ্যামিলিকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে সামান্য এক্সিডেন্ট করেছে। যাতে বিশ্বাসযোগ্য হয় তার সব ব্যবস্থা করে রেখেছে প্রহরভাই। আর প্রেমের বন্ধুদের তেমন ক্ষতি হয়নি। দেখে মনে হচ্ছে সব রাগ প্রেমের উপর'ই ঝেরেছে।  একটু পর ডক্টর বের হলেন অপারেশন রুম থেকে। উনাকে দেখার সাথে সাথেই আমি ছুটে গেলাম। অথচ প্রহরভাই এখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। আমি উৎকন্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 


- ডক্টর, এখন কেমন আছে প্রেম? সবকিছু ঠিক আছে তো? (আমি)


ডক্টর সাথে সাথে হেসে ফেললেন। মুচকি হেসে প্রহরভাইকে ডাক দিয়ে বললেন, 


-তোমার ভাইয়ের শরীরের গঠন অন্য সবার থেকে ভিন্ন। শরীরে এত যায়গায় আঘাত করার পরও ওর মস্তিষ্কে তেমন প্রভাব পরেনি৷ আমি তো খুব টেনশনে ছিলাম কি না কি হয়৷ কিন্তু ও এখন মোটামুটি সুস্থ বলা যায়। যদিও জ্ঞান না ফিরলে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবুও ধরে নাও সব ঠিকঠাক। (ডক্টর)


প্রহরভাই নিরুত্তর চেয়ে রইলেন। এদিকে আমি আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ করতে'ই আছি। প্রহরভাই ক্লান্তস্বরে বললেন, 


- ধন্যবাদ ভাইয়া। মহান আল্লাহকে অসংখ্য ধন্যবাদ আর আপনার জন্য'ই সব সম্ভব হয়েছে। কি ভাবে যে তোমার এই ঋণ শোধ করবো। (প্রহরভাই)


ডক্টর একগাল হেসে বললেন, 


-আরে আরে এভাবে বলছো কেনো? তুমি যেমন আমার কাছে ছোটভাইয়ের মতো। প্রেমও তেমন ছোট ভাই। তবে খুব তারাতারি হসপিটালে পৌঁছানোর জন্য নিজেকে ধন্যবাদ দিতেই হচ্ছে। এই তুমুল বর্ষণেও যে আসতে পেরেছি, এটাই অনেক। আর তোমরাও ঠিক টাইমে ওকে নিয়ে এসেছো। আচ্ছা আসি হ্যাঁ। প্রেমের জ্ঞান ফিরলে তোমরা দেখা করতে পারবে। তখন আমাকেও ইনফর্ম করবে। (ডক্টর)


ডক্টর চলে যাওয়ার পর প্রহরভাই নিজের শরীরের ভার দেয়ালে ঠেলে দিয়ে বেঞ্চিতে বসে পরলেন। চোখ দুটো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেলো বোধহয়। আমি সচকিত হয়ে ওনার পাশে বসে পরলাম। হাতদুটো কপালে রাখতেই উপলব্ধি করলাম উনার শরীরে ভীষণ জ্বর। শরীরে গা পুরে যাচ্ছে একদম৷ আমি উৎকুন্ঠিত হয়ে বললাম, 


-আপনার তো শরীর পুরে যাচ্ছে একদম। নিজের খেয়াল তো রাখতে হবে এবার। প্লিজ আপনি এখন বাসা ফিরে যান। (আমি)


প্রহরভাই চোখ বন্ধ করে হাসতে হাসতে বললেন, 


- বলতে পারিস তোর জন্যই আমার জ্বর এসেছে। তোর কেবিনটাতে আমার আর তোর থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো ঐ ডক্টর, মানে তোদের কলেজের সাবেক বড়ভাই। কিন্তু তুই এতটাই ঘুম কাতুরে যে ছোট্ট ঐ বেডে আমার যায়গা হওয়া অসম্ভব ছিলো৷ তাই আর রাতে ঘুমাতে পারলাম না৷ একজন দায়িত্ববান হাসবেন্ড হিসেবে তোর পাশে বসে রইলাম৷ এবার তুই ভেবে দেখ, তুই কি হীরার টুকরা ছেলে পাইছিস৷ (প্রহর)


অসময়ে উনার এসব পাগলামো আমার বিষাক্ত ঠেকলো৷ আমি রাগীস্বরে বললাম, 


-আপনার ফোনটা দিন আমাকে। (আমি)


উনি কপালে হাত দিয়ে চুলগুলো ঠিক করতে করতে বললো, 


-ফোনটা বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। আর সিমটা অর্জন খুলে নতুন ফোনে লাগাতে গেছে। এসে যাবে। (প্রহর)


কিছুক্ষণ পর সারার আগমন ঘটলো হসপিটালে৷ বাইরে এখনো তীব্র বর্ষণ। থামা-থামির কোনো লক্ষণ নেই। আমি সারাকে দেখা মাত্র ছুটে গেলাম ওর কাছে। মেয়েটার শরীরের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। কালকেই দেখলাম কত সুশ্রী মুখমণ্ডল। আর একদিনেই কি অবস্থ! মনে হচ্ছে রাতে একবিন্দুও ঘুমায়নি। সারা আমাকে সামনে পেয়েই জড়িয়ে ধরলো। আবারো বর্ষণ ঘটলো আমার চোখে। কিছু সময়ের জন্য চোখদুটো হাসিখুশি থাকলেও সারাকে দেখে মনটা কুঁকিয়ে উঠলো। মেয়েটা হিচকি তুলতে তুলতে কাঁদছে। জড়িয়ে ধরা অবস্থাই সে বলতে থাকলো, 


-প্রেম ঠিক আছে তো ভাবি? প্লিজ খারাপ কিছু বলিও না। (সারা)


আমি ওকে ছেড়ে দিয়ে হালকা হাসার চেষ্টা করে বললাম, 


- সব ঠিক আছে৷ কাঁদছো কেনো পিচ্চি মেয়ে। সব ঠিক হয়ে যাবে। (আমি)


সাথে সাথেই বজ্রপাতের আওয়াজে পুরো বিল্ডিং কেঁপে উঠলো৷ সাথে সাথেই প্রচন্ড কান্নায় আবার ভেঙে পড়লো সারা। আমি ওর পিঠে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে শান্তনা দিতে থাকালাম। ও কান্না বন্ধ করার বৃথা চেষ্টা করে বলতো থাকলো, 


- কাল রাতে আন্টির মুখ থেকে খবরটা শোনার পর আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তখন আসতে পারিনি হসপিটালে। বাবা আমায় নিতে আসছিলো, প্রচন্ড বষ্টি না'হলে আমি সত্যি আসতাম৷ (সারা)


আমি ওকে ছেড়ে দিয়ে বললাম, 


- এসব বাদ দাও তো। প্রেম ঠিক আছে, এটাই আমাদের জন্য অনেক। দোয়া করিও ওর জন্য (আমি)


হঠাৎ লক্ষ্য করলাম সারার হাতে কয়েকটা টিফিন বক্স। আমি আবারে বললাম, 


-এসব কি? (আমি)


সারা বললো, 


- তোমাদের জন্য নিজের হাতে রেঁধে নিয়ে এসেছি। প্রেমের জন্যও এনেছি। যদিও আমার হাতের রান্না প্রেম  কখন'ও খাবে না৷ (সারা)


- কেনো খাবে না? একশো বার খেতে হবে৷ ওর কথায় সব হবে নাকি? আর পিচ্চি মেয়ে, প্রেমের জন্য এত কান্না কেনো হু? আবার নিজের হাতের রান্না! (আমি)


সারা আমার কথা শোনামাত্র লজ্জায় মিইয়ে গেলো। জবাব দেয়ার চেষ্টাটুকুও করলো না। ঘড়ির কাটা দেখতে দেখতে তিনঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে প্রেমের জ্ঞান ফিরেছে৷ আমি আর প্রহরভাই দুজনেই দেখা করে এসেছি। প্রেম এখন মোটামুটি সুস্থ। তবে কন্ঠের তেজ শুনলে মনে হবে এখনো সে একদম ফিট৷ শুধু সারা এখনো ভীতরে ঢুকেনি৷ আমি সারাকে বললাম,


- খাবারটা নিয়ে ভেতরে যাও সারা। দেখো খায় কি না। (আমি)


সারা মাথা নিচু করে বললো, 


- যদি রাগ করে? ও আমাকে তেমন সহ্য করতে পারে না৷ (সারা)


আমি মুচকি হেসে বললাম, 


- প্রেম কোনো মেয়েদেরকেই সহ্য করতে পারে না। কিন্তু তোমার সাথে একটু হলেও বন্ধুত্ব আছে মানে তোমার ভীতর এমন কিছু আছে যা প্রেমরে ভালো লাগে। (আমি)


আমার কথায় সারার চোখমুখ চকচক করে উঠলো। আবারো লজ্জামাখা হাসি দিয়ে ভেতরে চলে গেলো সারা। আমি দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে ওদের কান্ড দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। সারা ভেতরে প্রবেশ করতেই প্রেম যেনো একটু অবাক'ই হলো। সে হয়তো ভাবেনি সারা আসবে। যদিও মানুষের ভাবনা সবসময় সত্যি হয় না। প্রেম উঠে বসার চেষ্টা করতেই সারা কান্নাস্বরে বললো, 


- আরে বসো বসো। এখন কেমন লাগছে? (সারা)


প্রেমের মাথায়, ঘাড়ে সব যায়গায় প্রায় ব্যান্ডেজ। অথচ তেজ একটুও কমে নাই। সে অবাক হয়ে বললো, 


- তুমি এখানে কি করছো সারা? (প্রেম)


- এমনিতে আসলাম। কেনো আসতে পারি না? (সারা)


প্রেম মাথা নিচু করে বললো, 


- এত কষ্ট করে আসতে গেছো কেনো? আমার মতো বেয়াদব ছেলেকে কেউ দেখতে আসবে এটা ভাবিনি। (প্রেম)


সারা কান্না থামানোর চেষ্টা করতে করতে বললো, 


- এসব কি বলছো? একদম চুপ। তোমার জন্য নিজের হাতে রান্না করেছি। আমি জানি এখন তুমি খেতে চাইবে না। কিন্তু তোমাকে খেতেই হবে৷ ভাবির আদেশ। (সারা)


সারার কথায় প্রেম ফেললো। সহাস্যে বললো, 


- তুমি খাইয়ে দিলে খেতে তো বাঁধা নেই। মায়ের পর কোনো মেয়ের হাতে খাওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করে নেই তাহলে।  (প্রেম)


সারা অবাক হয়ে গেলো। আজ মনে হচ্ছে ওর ঈদের দিন। সে এখন কি করবে ভেবে পাচ্ছে না৷ এতটা খুশি সে আগে কখনো হয়েছিলো বলে মনে পরে না ওর। ঠিক তখনই অর্জন ভাইয়া আর প্রহরভাইয়ের কথার আওয়াজ পাওয়া গেলো। আমি একটু সাইডে সড়ে গিয়ে ওনাদের গম্ভীর কন্ঠস্বর শোনার চেষ্টা করলাম। প্রহরভাই শক্তকন্ঠে অর্জনকে বললো, 


- লাইফে কয়টা মা'র্ডার করেছিস? (প্রহরভাই)


অর্জন ভাইয়া থতমত খেয়ে বললো, 


- তুই ভালো জানিস। কেনো? (অর্জন)


- নিজের পড়াশোনার চাপে আর বিয়ের চাপে এসব থেকে দূরে ছিলাম বলে সবার ডানা গজিয়েছে মনে হচ্ছে। প্রেম একটু সুস্থ হলেই আমি সাজেক যাবো সবাইকে নিয়ে। তোর কাজ হবে প্রেমের সাথে সোনিয়া অথবা নাউমির কোনো ঝামেলা বা সম্পর্ক আছে কি না বের করতে। প্রেমকে কারা এভাবে মার'লো তা খুঁজে বের কর। খুব তারাতারি। (প্রহরভাই)


প্রহরভাইয়ের কথা শোনামাত্র আমার কলিজার পানিটুকু উড়ে গেলো৷ এ কেমন খেলা শুরু হলো সবার মাঝে? 



চলবে? 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url