শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ১২

 

শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ১২

শুধু তুই

লেখকঃ রিফাত আমিন

পর্বঃ ১২


-বদ্ধ রুমের এককোণে ল্যাপটপে দ্রুত হাত চালিয়ে যাচ্ছে প্রহর। পুরো রুমটায় অন্ধকার বিরাজ করছে। ভয়ানক অন্ধকার। শুধু একটা ড্রিম লাইটে অন্ধকার দূরীভূত করার প্রচেষ্টা চলছে। অর্জন ফোনে নাউমির বর্তমান ফেসবুক আইডিটা ঘেটে ঘেটে দেখছে। একদম নরমাল আইডি। আট দশটা সাধারণ আইডির মতো। অর্জন মুখকালো করে প্রহরের উদ্দেশ্য বললো, 


'কিছুই তো নাই মামা। কিভাবে কি হবে? আচ্ছা, তোর সাথে নাউমির শেষ কবে দেখা হয়েছে?' (অর্জন)


প্রহর ল্যাপটপ থেকে মুখ সড়িয়ে বললো, 


'দুবছর আগে মেবি। তারপর সে হঠাৎ জাপান চলে যায়। তাই ওর জ্বালাতন থেকে একপ্রকার রেহাই পেয়েছিলাম। কিন্তু আবার কি শুরু করলো?' (প্রহর)


কথাটা বলে প্রহর একবার দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালো। এখন রাত ১১ টা ২১। অর্জনের কোনো প্রতুত্তর না পেয়ে প্রহর আবার বললো, 


'দেখ তো প্রেম জেগে আছে কি না। জেগে থাকলে একটু ডেকে পাঠা৷' (প্রহর)


অর্জন কোনো জবাব না দিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। যাওয়ার আগে পুরো রুমটাকে বাল্ব জালিয়ে আলোকিত করে গেলো। প্রেমের সাথে ঐ ঘটনার পর দশটা দিন পেরিয়ে গেছে। প্রেম এখন মোটামুটি সুস্থ। তাই গত পরশু ওকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে৷ প্রেমের সাথে ঐ ঘটনার পর বাড়ির সবাই একপ্রকার ঝিমিয়ে গেছে। আম্মু তো একেবারে বিধ্বস্ত । সারাদিন মন খারাপ করে বসে থাকে। আগের মতো তেমন কথা বলতে চায় না৷ হাসিখুশি থাকে না৷ একটু পর আস্তে আস্তে রুমের ভীতর প্রবেশ করলো প্রেম। তার পিছু পিছু অর্জন। প্রেমকে দেখামাত্র প্রহর উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, 


'হাঁটতে পারিস একা?' (প্রহর)


প্রেম মুচকি হেসে বললো, 


' হ্যাঁ, সমস্যা হবে না ' (প্রেম)


প্রেম আর অর্জন এসে বিছানায় বসে পরলো। প্রহর আবারো ল্যাপটপে মনোযোগ দিয়ে বললো, 


'বিয়েরদিন রাতে তুই রাস্তায় ঝামেলায় পরেছিলি। বলছিলি মাইক্রোজিপটাতে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে ছিলো৷ মেয়েটার মুখে কি মাস্ক ছিলো? ' (প্রহর)


প্রেম খানিকক্ষণ মাথায় প্রেসার দিয়েও ঠিক মনে করতে পারলো না। প্রহর ল্যাপটপটা প্রেমের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,


'দেখতো এই মেয়েটা কি না?' (প্রহর)


প্রেম একপলক দেখেই বললো, 


' এটা তো নাউমি। মাইক্রো জিপটাতে সে ছিলো না। তবে আমার খুব পরিচিতই মনে হয়েছিলো' (প্রেম)


প্রহর এবার সিওর হলো যে রেস্টুরেন্টে বসে থাকা দুটো মেয়েই ছিলো নাউমি আর সোনিয়া। কারণ প্রেমের বন্ধু সোনিয়াকে ভালো করেই চিনে। কিন্তু নাউমিকে কখনো দেখেনি। তাই রেস্টুরেন্টে সোনিয়াকে চিনতে পারলেও নাউমিকে চিনে নি। প্রহর প্রেমের ফোনে নাউমির পিক সেন্ট করলো। অতঃপর বললো, 


'আবীর, রাফি সেদিন রাতে দুটো মেয়েকে নিশ্চয়ই চিনে থাকবে। তার মধ্যে একটা মেয়ে সোনিয়া ১০০%। আর অন্য মেয়েটা নাউমি কি না সেটা সিওর হতে হবে। তুই ওদের দুজনকে নাউমির ফটোটা ফরওয়ার্ড করে দে। বল সেদিন দেখেছে কি না। ' (প্রহর)


প্রেম প্রহরের কথা অনুযায়ী সব করলো। অর্জন এবার বিরক্ত হয়ে বললো, 


'এভাবে কি কিছুর সমাধান আসবে? তোদের পিছনে লাগার মেইন কারণটা জানা জরুরী। সেটা জানবো কিভাব?' (অর্জন) 


প্রহর বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বললো,


'পৃথিবীতে অসম্ভব কিছুই নাই। আস্তে আস্তে জানা যাবে। ' (প্রহর)


ঠিক তখনই প্রেম সহাস্য কন্ঠে বললো, 


'ঠিকই বলেছো ভাইয়া। রেস্টুরেন্টে সোনিয়া আর নাউমি'ই ছিলো৷ মানে তাঁদের দুজনের মাঝে কোনো বিশেষ কানেকশন আছে। যার জন্য তারা রেস্টুরেন্টে মিট করতে গেছিলো। কিন্তু তাঁদের মতো উচ্চবিত্ত পরিবারের দুটো মেয়ে কেনো সাধারণ একটা রেস্টুরেন্টে মিট করতে গেলো? এটা জেনেও যে আমি অথবা আমার ফ্রেন্ড খুব তারাতারি ওদের কাছে পৌঁছে যাবো' (প্রেম)


প্রহর হো-হা করে হেসে ফেললো। ল্যাপটপটা অফ করতে করতে বললো,


'তোদের চারজনকে কিন্তু সচরাচর বাইরে পাওয়া যায় না। পেলেও চারজন একসাথে থাকিস। যখন তোদের ক্ষতি করা খুব কঠিন হয়ে দ্বারায়। কিন্তু সেদিন রাতে আবীর আর রাফি যখন রেস্টুরেন্টে ছিলো, তখন তুই আর সাব্বির ওখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলি। তখন ছিলো গভীর রাত। কিন্তু এটাই ছিলো বড় ভুল। কারণ ওরা চেয়েছিলো তোরা ছাড়াছাড়ি থাকিস। যাতে রাস্তায় তোর উপর এ্যাটাক হলেও ওরা কোনো হেল্প না করতে পারে। আর তোদের গ্রুপের একজন আহত মানে পুরো টিম আহত। আবীর, রাফি সেদিন সঠিক সময় বেড়িয়ে না আসলে ওদেরও বিপদ হতে পারতো। বুঝলি কিছু? ' (প্রহর)


প্রেমের চোখ চকচক করে উঠলো। বিষয়টা বুঝতে পেরে এখন শান্তি লাগছে। এতদিন একটা যন্ত্রণার মধ্যে দিন কেটে ছিলো। প্রহর মুচকি হেসে বললো, 


'কাল সাজেক যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে যা। হাঁটতে না পারলেও সমস্যা নাই। যেতে হবেই। তোর কোনো ফ্রেন্ড যাবে কি? ' (প্রহর)


প্রেম মনখারাপ করে বললো, 


'ওদের বাসা থেকে বের হওয়া বন্ধ। যাবে না কেউ। '(প্রেম)


'আচ্ছা ঘুমা গিয়ে। কাল বিকালে রওনা হবো। সবকিছু রেডি করে নে ' (প্রহর)


অর্জন প্রহরের উদ্দেশ্যে বললো, 


'আমি এখানে ঘুমালাম। ভীষণ মাথা ব্যাথা করছে। তুই গেস্ট রুমে ঘুমা' (অর্জন)


প্রহর মুচকি হেসে বললো, 


- বউ থাকতে গেস্টরুমে কেনো ঘুমাবো ব্রো? (প্রহর)


-------☕


বেলকনিতে ঠকঠক আওয়াজ আসছে। আওয়াজটা খুবই ক্ষীণ। প্রথম দফায় আওয়াজ আসতেই ভুতের ভয়ে কম্বলের নিচে লুকিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আসতে আসতে বুঝতে পারলাম ভুত নয়। নিশ্চয়ই প্রহরভাই, কারণ এই রাস্তাটা একমাত্র প্রহরভাই জানে। আর কেউ জানে না। ঠিক তখনই ফোনে একটা টুং করে মেসেজের নোটিফিকেশন আসলো। আমি কম্বলটা একপাশে রেখে ফোনটা অন করে মেসেজটা দেখলাম, 


' ঘুমিয়ে গিয়েছিস নাকি? এদিকে তোর জামাই যে  মশার কামর খাচ্ছে। সেটার খোঁজ রেখেছিস? তুই তো ভীষণ স্বার্থপর রশ্নি ' 


আমি মেসেজটা দেখেই ঝটপট বেলকণির দরজাটা খুলতে গেলাম। ইচ্ছে ছিলো খুলবো না। কিন্তু মশার কামর খাচ্ছে শুনে মায়া হলো। আমি দরজাটা খুলতেই হুরমুরিয়ে ভীতরে ঢুকলেন উনি। আমাকে চেনেই না এমন ভাব করে বিছানায় শুয়ে পরলেন। আমি উনার কান্ডে হতবাক হয়ে গেলাম। কি আজব মানুষ রে বাবা! দরজাটা লাগিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বললান, 


'এখানে কি করছেন? বেড়িয়ে যান রুম থেকে' (আমি)


উনি আমাকে পাত্তাই দিলেন না। আমার শরীরের তাপে উষ্ণ হওয়া কম্বলটা ভালোভাবে শরীরে পেচিয়ে নিলেন। আমি জবাব না পেয়ে কঠোর স্বরে বললাম,


'আম্মিকে ডাকবো কিন্তু। সারাদিনে বেঁচে আছি কি নাই সেটার খোঁজ নেয় না কেউ। এখন ঢং দেখাতে আসছে। আমার ঘুম পাচ্ছে ভীষণ। আপনি বেড়িয়ে গেলেই খুশি হবো। ' (আমি)


উনি কম্বলের নিচ থেকে মাথা উঠিয়ে বললো, 


'কিছু বললি? ঘুমালে এখানে আয়। নাহলে ওখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে আমাকে পাহারা দে। ঘুম পাচ্ছে ভীষণ' (প্রহর)


উনার ঢংমার্কা কথায় অতিষ্ট হয়ে যাচ্ছি। একপ্রকার রাগ দেখিয়ে বিছানায় শুয়ে পরলাম আমি। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো কম্বল নিয়ে। সাপের মতো সারা শরীরে কম্বল পেচিয়ে নিয়েছেন, তাহলে আমি কি গায়ে দিবো? কম্বলের ধরে টান দিলেও আসছে না। আমি এবার হুংকার দিয়ে বললাম, 


'দেখেন প্রহরভাই। আ. (আমি)


উনি আমার কথা শেষ করতে না দিয়ে বললেন,


'কি দেখবো? তোকে দেখবো? তুই কি সুন্দরী? ' (প্রহর)


আমি দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বললাম, 


' আমি আপনাকে রুমে ঢুকতে দিয়েছি এটাই বেশী। আপনার কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা থাকলে বলে বেড়িয়ে যান। সারাদিন যখন বিজি থাকতে পারেন, তাহলে রাতেও নিশ্চই পারবেন ' (আমি)


উনি দাঁত কেলিয়ে হাসলেন। বামহাত দিয়ে রুমের লাইটটা অফ করে দিলেন। এখন শুধু ডিম লাইট জ্বলছে। ডিম লাইটের মসৃণ, মোহনীয় আলোয় উনার মুখশ্রী পবিত্র ঠেকছে। আদুরে। উনি বললেন, 


' কিরে! রুমে তোর রুপের আলো নাই কেন? সেদিন টিভিতে একটা এড দেখলাম। সেখানে একটা ছেলে মোমবাতি নিভিয়ে দেয়! কেনো জানিস? কারণ তার বউ এতটাই রুপবতী যে রাতে মোমবাতি লাগে না। রুপের আলোতেই রাত্রিযাপন করে। তোর রুপের আলো কই?' (প্রহর)


আমি ভেবেই নিলাম আজ আর ঘুমাতে পারবো না। বালিশে মাথা ঠেকিয়ে বললাম, 


'আমি যে আপনার মনের মতো না সেটা ভালো করেই জানি। তো আপনি বিয়ে করতে গেলেন কেন? '(আমি)


উনি ক্লান্তস্বরে বললেন, 


'সেসব কথা বাদ দে। তুই আমাকে জামাই ডাকবি! জামাই! মনে থাকবে? একটা কাজ কর তো। মাথা টিপে দে। কাজ করে খেতে হয়৷ বুঝলি। ' (প্রহর)


'আমার রুমে এসে আমাকেই আদেশ করছেন। হাউ ফানি।  আপনি এবার বিদেয় হন তো। নাহলে সবাইকে ডেকে আপনার চরিত্রের বারোটা বাজাবো' (আমি)


উনি গায়ে না মাখা ভাব ধরে বললেন, 


'খুব ভালো। বিয়ে করেছি কি এগ্লা শোনার জন্য। আন্টি পরে তোকেই ধোলাই দিবে। দেখে নিস ' (প্রহর)


আমি আর জবাব দিলাম না। সিদ্ধান্ত নিলাম এই জীবনে আর কোনো কথাই বলবো না এই উদ্ভদ মানুষটার সাথে। চুপ করে উনার বিপরীতে শুয়ে পরলাম। ঠান্ডা লাগলেও কম্বল চাইবো না। হু! দেখলাম উনিও আর কথা বলছেন না। একটু পর আলো জালিয়ে বললেন, 


'কয়টা বাজে?' (প্রহর)


আমি জবাব দিলাম না। উনি নিজেই নিজের ফোন থেকে দেখে নিলেন। অতঃপর কম্বলের একমাথা আমার শরীরে এলিয়ে দিলেন। আমি সাথে সাথেই রাগ দেখিয়ে কম্বলটা সড়িয়ে ফেললাম। আমাকে দিলেন কেনো? উনি নিজেই নিক৷  উনিই শান্তিতে থাকুক৷ আমি না'হয় অশান্তিতেই থাকি। আবারো কম্বলটা এগিয়ে দিলেও আমি সেম কাজ করলাম। এবার উনি কম্বলটা নিজের গায়ের উপর ভালোভাবে বিছিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসলেন৷ আমি আঁড়চোখে উনার ভাবভঙ্গি বুঝার চেষ্টা করছি৷ ভাবভঙ্গি তো সুবিধার নয়। অতঃপর আমাকে ভাবার সময়টুকু না দিয়েই আমাকে একপ্রকার কোলবালিশ বানিয়ে নিলেন উনি৷ সাথে সাথেই সারা শরীরে কম্বলটা বিছিয়ে দিলেন। হাতদুটো উনার বেশী বহুল হাতদুটো দিয়ে আঁকড়ে ধরলেন। এদিকে উনার শরীরের চাপে আমি ভর্তা প্রায়। উনি হাসিমুখে বললেন, 


' তোরও রাগ আছে? ভালো ভালো। ' (প্রহর)


এ্যাঁ! মনে হচ্ছে দুনিয়ার সব রাগ উনার৷ আমার কিছুই নাই৷ কঠোরস্বরে বললাম, 


' আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ৷ ভর্তা হয়ে যাবো নাহলে।' (আমি)


'নো ছেড়ে দেয়া দেয়ি। অনলি জড়িয়ে ধরাধরি। এখন আমি এখানে  ঘুমাবো। তুইও ঘুমাবি৷ সমস্যা নেই! ফজরের দিকে উঠে চলে যাবো। ভালো ভালোয় শান্ত মেয়ের মতো শুয়ে পর।' (প্রহর)


উনার অশ্লীলমার্কা কথা শুনেই চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে বললাম, 


'আপনার মতো চরিত্রের লোককে আমি জড়িয়ে ধরবো? এই জীবনে ভাবলেন কিভাবে? ' (আমি)


'এই জীবনে নয়রে পাগ্লা। মাত্রই ভাবলাম। এবং ভাবলাম, তুই  আমার দুগালে দুটো চুমু দিবি। ' (প্রহর)


কথাটা বলেই দু’সেকেন্ড বিরতি নিলেন উনি৷ আমি রেগে কিছু বলবো তার আগেই টুপ করে একটা চুমু দিলেন ৷ মহুর্তের কান্ডে আমি হতবাক, বিমূঢ়। এদিকে উনার কান্ডে লজ্জায় কম্বলের নিচে ঢুকে গেলাম। উনি উনার শরীর দিয়ে আরো চেপে ধরলেন আমায়। কাজটা যে ইচ্ছেকৃত আমাকে জ্বালানোর জন্য করতেছে তা ভালোই বুঝতে পারলাম। এদিকে শরীরের ভারে নিঃশ্বাস নিতেও সমস্যা হচ্ছে । আমি দ্রত বললাম,


' নিশ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে প্রহরভাই। ছেড়ে দিন '(আমি)


সাথে সাথেই ছেড়ে দিলেন উনি। গম্ভীর স্বরে বললেন, 


'রাত হয়েছে অনেক। ঘুমিয়ে পর' (প্রহর)


কথাটা বলে আমাকে আলতো করে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিলেন। আমাকে জবাব দেয়ার কোনো ওয়ে দিলেন না। পুরো রুম জুরে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করতে শুরু করলো। শুধু আমার কানে বাজলো কারো হৃৎপিণ্ডের ধিকধিক আওয়াজ। এবং আমার অন্তর উপলব্ধি করলো এই শব্দটা শুধু আমার নাম'ই উচ্চারণ করছে। রশ্নি! রশ্নি! রশ্নি!


পাখির কিচিরমিচির ডাকে ঘুম ভাঙলো আমার। পাশে ফিরে দেখলাম প্রহরভাই নেই। নিশ্চই না বলে চলে গেছে! একটাবার তো ডাকতে পারতো, ধুর। বালিশ হাতরে ফোনটা বের করে দেখলাম সকাল ১০ টা বাজে! আশ্চর্য! ঘড়ির মাথা খারাপ হয়েছে নাকি আমার চোখের সমস্যা হলো? এত তারাতারি সকাল দশটা বেজে গেলো! বেলকনির পর্দাটা সড়িয়ে দিয়ে দেখলাম বাইরে রৌদ্রজ্বল সকাল বেলা৷ ঘড়ির মাথা তাহলে ঠিকই আছে। আমি ফ্রেস না হয়েই ছাদে উঠলাম। ছাদে উঠে দেখলাম প্রেম হাঁটাহাঁটি প্রাকটিজ করছে৷ গতরাতে ঘুম ভালো হওয়ার কারণে মনটাও বেশ ফুরফুরে। কিন্তু প্রহরকে এই অবস্তায় দেখে খারাপ লাগলো। বেচারার কি অবস্থা। প্রেম আমাকে দেখেই একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললো, 


'গুড মর্ণিং জানু।'(প্রেম)


আমি ওর কথায় সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম, 


'শরীর ঠিক নাই, নাকি মাথা ঠিক নাই? আমারে জানু বলিস কেন? ' (আমি)


প্রেম আবারো ভুবনমাতানো হাসি দিয়ে বললো, 


'কিছুই ঠিক নাই। এত তারাতারি ঘুম থেকে উঠলে যে? '(প্রেম)


'সবতো তোর ভা...' (আমি)


আমি সোজা প্রহরভাইয়ের দোষ দেবো এমন সময় থেমে গেলাম। উনি যে গতকাল রাতে লুকিয়ে আমার কাছে এসেছিলো সেটা তো বলা যাবে না। বললেই তো মানসম্মান প্লাসটিকে হয়ে যাবে দুজনার। কথাটা এড়িয়ে যেতে দাঁত কেলিয়ে বললাম, 


'তোর সারার কি খবর? সব কি ঠিকঠাক? ' (আমি)


প্রেম হাঁটা বন্ধ করে দোলনায় বসে পানি খাচ্ছিলো। আমার কথা শোনার সাথে সাথে সব পানি ছিটকে বেরিয়ে গেলো। প্রেম চোখ বড় বড় করে বললো, 


'আমার সারা মানে? মাথা ঠিক আছে? সি জাস্ট মাই ফ্রেন্ড। '(প্রেম)


আমি চোখটিপে বললাম,


'হ বুঝি বুঝি। আর বুঝাতে এসো না মনা। ' (আমি)


এমন সময় প্রেমের ফোন বেজে উঠলো। ফোনটা ছাদের ছোট টেবিলটাতে থাকায় ফট করে প্রেমের আগে ফোনটা তুলে নিলাম আমি। স্ক্রিনে সারা নামটা ভেসে উঠতেই আড়চোখে প্রেমের দিকে তাকিয়ে বললাম, 


'ঘটনা তাহলে ঘটিয়ে ফেলছো। বিয়ে করছিস কবে? '(আমি)


'বিয়ে ! কিসের বিয়ে! কার বিয়ে?" (প্রেম)


আমি ওর কথা না শুনে ফোনটা রিসিভ করলাম। রিসিভ করার সাথে সাথেই সারার কন্ঠ ভেসে আসলো। আমি ফোনটা লাউডে দিয়ে প্রেমের পাশে বসে পরলাম, 


' হ্যালো প্রেম। তোমার শরীর এখন কেমন আছে? ' (সারা)


প্রেম খানিকটা বিরক্তস্বরে বললো, 


'দু'ঘন্টা আগেই তো বললাম ভালো আছি। এর মধ্যে আর কি উন্নতি হবে শরীরের? ' (প্রেম)


প্রেমের কঠিন স্বরে ঘাবড়ে গেলো সারা। ভয় ভয় কন্ঠে বললাম, 


' আচ্ছা সরি। রাখি তাহলে। ' (সারা)


সারার কথা শেষ হতেই আমি বললাম, 


' তোমার বন্ধু এখন আমার পাশে আছে মনা। রশ্নি! হিহিহি। ' রেডি হয়ে যাও। আজ সাজেক যাবে না? '(আমি)


সারা উৎফুল্ল হয়ে বললো,


' বাবা তো কাল রাতেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছে৷ কিন্তু প্রেম বোধহয় আমার যাওয়াটা মেনে নিবে না। আমি ওর পাশে থাকলে ও বোরিং ফিল করে ' (সারা)


আমি প্রেমের দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম, 


' কোনো কিন্তু হবে না। প্রেম যাবে, দরকার হলে প্রেমের বাপও যাবে, থুক্কু প্রেমের ভাই আর ভাবি যাবে। সাথে তুমিও যাবা। এবং সবাই যাবে। পরে আমি প্রেমকে দেখে নেবো নে। '(আমি)


---


প্রেমের সাথে কিছুসময় কাটিয়ে নিচে নেমে আসলাম৷ ফ্রেস হয়ে খেতে বসবো এমন সময় আম্মি বললো, 


'ঐশীর বিয়েটা খুব তারাতারি দেবো। আজকে আবারো কথা ফাইনাল করতে তোর পুলক ভাইয়ারা আসবে। রুমের ভীতর হারিয়ে যাস না আবার। ' (আম্মি)


আমি মনোযোগ দিয়ে খেতে খেতে বললাম,


'আজ তো আমরা সাজেক যাচ্ছি। জানো না? ' (আমি)


আম্মি মুচকি হেসে বললো, 


' প্রহরবাবু আমাকে তোর আগেই বলেছে। ও সব কথা আগে আমার সাথেই শেয়ার করে। কত ভালো ছেলে! আমি তোর ভবিষ্যত নিয়ে কত টেনশনে ছিলাম রে। ভাগ্যিস প্রহর তোর মতো একটা গাঁধাকে পছন্দ করে বিয়ে করলো ' (আম্মি)


আম্মির কথায় ঠোঁট বাকালাম। তুমি তো আর জানে না কোন বান্দ'রের সাথে আমায় বিয়ে দিছো। আম্মি আবারো বললো, 


' একটু পরই সবাই আসবে। তোরা তো যাবি বিকেল বেলা। সমস্যা হবে না। ' (আম্মি)


আমি হা হু কিছুই করলাম না। মনোযোগ দিয়ে খাওয়াদাওয়া করে রুমের ভীতর ঢুকে পরলাম। কিন্তু তখন-ই প্রেয়সী চকলেট খেতে রুমে প্রবেশ করলো। এসেই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে বললো, 


'দাভাই তোমাকে ছাদে ডাকে। যাও ' (প্রেয়সী)


আমি ওর নির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে বললাম, 


'আমায় একটা চকলেট দে। লক্ষী বোন আমার। '(আমি)


আমার মিষ্টি কথায় প্রেয়সীর মন গললো না। সে চোখ পাকিয়ে বললো, 


'না। এটা দেয়া যাবে না। তোমাকে দাভাই ডাকে। যাও' (প্রেয়সী)


'শুনছি! এহন বিদেয় হ। তুই বোন তো না.. বোন নামে কলঙ্ক। যা, বেড়িয়ে যা রুম থেকে। (আমি)


আমার কথা প্রেয়সীর গায়ে লাগলো বলে মনে হলো না। সে চকলেট খেতে খেতে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। মনে হচ্ছে আমি ওকে আদর করে রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে বলেছি৷ সিদ্ধান্ত নিলাম এখন আর ছাদে যাবো না। ভালো লাগছে না। শুধু ঘুম পাচ্ছে। কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর ঘুমটা কেবল আসবে এমন সময় বিছানা কেঁপে ফোন বেজে উঠলো। চোখ খুলে দেখি প্রহরভাই চোখের সামনে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পরনে সেন্টু গেন্জি আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। আমি ওনার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলাম। এই মহুর্তে কিছু বলা মানেই ভুল। উনি কঠোরস্বরে বললেন, 


'আমাকে জমিদারি দেখাস। তোকে ছাদে ডাকিনি? ' (প্রহর)


আমি ভয়ভয় কন্ঠে জবাব দিলাম, 


'ঘুম পেয়েছিলো৷ তাই আরকি! ' (আমি)


উনি কথা না বলে হরহর করে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলেন। ধুর! আমার কাঁচা ঘুমটাই যা নষ্ট হলো। এতকিছু না ভেবে আবারো ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন বাইরে মানুষের কোলাহল। দেয়ালঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম দুপুর দুটো বাজে। ওহহ সিট! নিশ্চয়ই পুলক ভাইয়ারা এসে গেছে। আর এদিকে আমি গোসলটা পর্যন্ত করিনি! আম্মি এই অবস্থায় আমাকে দেখলে তো মে'রেই ফেলবে একদম।  বিছানা থেকে নেমে রুমের দরজা থেকে আড়চোখে বাইরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। সোফায় প্রেম, প্রহর, আঙ্কেল-আন্টি আর পুলক ভাইয়ার পরিবার বসে আছে। সারাও দেখছি আছে। আর এদিকে অলসতার কারণে আমি ওখানে নাই! অতঃপর আম্মি আসার আগেই কোনোমতে গোসল সেরে নিয়ে একটু সেজেগুজে ড্রইংরুমে প্রবেশ করলাম। 


---


সময় তখন বিকাল ৩ বেজে ১৯ মিনিট। প্রহরের বাসার সামনে তিন তিনটা মাইক্রো জিপ দাঁড়িয়ে আছে৷ সবগুলোর কালার ব্লাক। প্রহর যখন ড্রাইভারদের সাথে কথায় ব্যস্ত তখন হুট করে সেখানে উপস্থিত হলো অর্জন। প্রহর তৎক্ষনাৎ ড্রাইভারকে বললো, 


' যারা যারা যাবে তাদের সবাইকে গাড়িতে উঠায় নিয়ো, ঠিক আছে? এখান থেকে সাজেকে রওনা দেবো ঠিক বিকাল ৪ টায়। তার আগেই যেনো সবাই উঠে পরে৷ আমি ঠিক চারটায় এখানে আসবো। ওকে? ' (প্রহর)


ড্রাইভার প্রহরের পরিচিত। তাই বেশিকিছু বুঝাতে হলো না তাকে। চারটার সময় রওনা হবে মানে তাঁর একসেকেন্ড আগেও না, পরেও না৷ আর সাজেকেও অলরেডি হোটেল বুকিং করা হয়ে গেছে। প্রহর আর কোনো কথা না বলে অর্জনের বাইকে উঠে পরলো। মুখে দুজনার কালো মাস্ক৷ সারা শরীর কালো জ্যাকেট দিয়ে আবৃত। পকেটে রিভ'লবার। একটু পরই নাউমি আর সোনিয়ার সাথে দেখা হবে। ইতোমধ্যে অর্জন রাস্তার বিভিন্ন গলিতে প্রহর গ্যাংয়ের লোক সেট করে রেখেছে। যেকোনো বিপদে তারা এগিয়ে আসবে৷ যদিও প্রহর সেটা জানে না। প্রহর আর অর্জন নাউমির লোকেশন অনুযায়ী একটা পরিত্যক্ত তেল কারাখানায় এসে দাঁড়ালো। সোনিয়া তো এখানেই ডেকেছিলো। কিন্তু এমন একটা বাজে পরিবেশে ওরা থাকবে কেনো? খুব সাবধানে মুল ফটকের ভীতর প্রবেশ করলো দুজন। চারপাশটা খুব সাবধানতার সাথে চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো ভীতরে কেউ আছে কি না। অতঃপর গুটিগুটি পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে চললো। কারখানার দরজাটা ভেদ করে ভীতরে ঢুকার পর পরই দরজাটা আপনা আপনি বন্ধ হয়ে গেলো। সাথে সাথেই প্রহর আর অর্জন সাবধান হয়ে গেলো। অর্জন অলরেডি সব ছেলেদের এলার্ট করে দিছে। একটু পর তারা এসে যাবে কারখানার বাইরে। ভেতরটা গভীর অন্ধকার। এতই অন্ধকার যে কোনো ক্রমেই বুঝা যাবে না বাইরে এখন দিন নাকি রাত চলছে। তার ঠিক একমিনিট পর হঠাৎ করে পুরো কারখানার সব লাইট জ্বলে উঠলো। প্রহর নিজেকে স্বাভাবিক রাখার যথেষ্ট চেষ্টা করছে। এখন একটা উদ্ভদ এলাকায় এর আগে কখনো এসেছিলো বলে মনে করতে পারছে না সে। প্রহর অর্জন দুজন দুজনার দিকে চাওয়া-চাওয়ি করছে। এমন সময় একটা লম্বা চওড়া ছেলে প্রবেশ করলো ভীতরের রুমে। চারপাশে ময়লা আবর্জনার স্তুপ। বিভিন্ন যায়গায় পরিত্যক্ত তেলের ড্রাম পরে আছে। ছেলেটাকে দেখেই একপ্রকার অবাক হয়ে গেলো প্রহর আর অর্জন। ছেলেটার মাথায় বড় বড় চুল। হাতে ব্যান্ডেজ। ছেলেটি বিকট শব্দে হাসতে হাসতে বললো, 


'হ্যাল্লো মি. প্রহর। ওয়েলকাম টু মাই হোম ' (ছেলেটি)


প্রহর চরম আশ্চর্য হয়ে বললো, 


' মাহিম তুই? তুই এখানে কি করছিস? তুই না অস্ট্রেলিয়ায়? ' (প্রহর)


তার সাথে অর্জনও সুর তুলে বললো, 


'এসব কি মাহিম। তোর সাথে আমাদের এমনিতেই ছোটখাটো ঝামেলা ছিলো। কিন্তু এখন তো নাই। এসব কি শুরু করছিস?' (অর্জন)


মাহিম হাসতে হাসতে একটা ড্রামের উপর বসে পড়লো। সাথে সাথেই দুটো ছেলে দুদিক দিয়ে দুজনার মাথায় শর্ট'গা'ন ঠেকালো। প্রহর অর্জন খুব একটা অবাক হলো না। মাহিম উদ্ভটস্বরে হাসতে হাসতেই বললো, 


' সব ভুলে যাবো? তোকে ভুলে যাবো? রশ্নিকেও? আর আমাকে দেয়া তোদের যন্ত্রণা অপমানগুলোও? (মাহিম)


প্রহর নিজেকে শান্ত রেখে বললো, 


' আমি তোকে মোটেও অপমান করিনি মাহিম। আমি রশ্নিকে ভালোভাসি তোকে আগেও বলেছিলাম। বরং তুই আগ বাড়িয়ে ওকে প্রতিনিয়ত ডিস্টার্ব করেছিলি। আর রশ্নির সাথে মিসবিহেভ করলে তার পরিণতি কি হয় তা নিশ্চই জানিস? ' (প্রহর)


মাহিম ড্রাম থেকে উঠে পা দিয়ে সজোড়ে ড্রামটাকে আঘাত করলো। অতঃপর বললো, 


' ওসব বাদ দে৷ তোর ভাইও দেখি তোর মতো হয়েছে। বরং বলা যায় তোর থেকেও বেশী ডেঞ্জারাস। সেদিন দেখ, ওকে মার'তে গেলাম৷ উলটা ওর ফ্রেন্ড আমার হাতের চৌদ্দটা বাজিয়ে দিলো৷ ভেরি গুড জব ' (মাহিম)


অর্জন বিরক্তিকর কন্ঠে বললো, 


'দিস ইজ টু মাচ। নাউমি আর সোনিয়া কই? ' (অর্জন)


' ওর আর কোথায় থাকবে? নাউমি তো আমার বউ। আর সোনিয়া আমার বাজি পার্টনার। হা-হা-হা। তবে আমার বারবার তোর ভাইয়ের প্রসংশা করতেই হয়। ওকে কত চেষ্টা করলাম মার'তে'। কিন্তু সে এত ধুরুন্ধর তা জানা ছিলো না। (মাহিম)


প্রহর মুচকি হাসলো। সাথে সাথেই বাইরে গোলাগুলির আওয়াজ শোনা গেলো। প্রহর, অর্জন সাথে সাথেই নিজেদের সেফটির জন্য নিজেদের শর্ট'গান বের করলো... 



চলবে?

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url