শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ০৩

শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ০৩

 

শুধু তুই

লেখকঃ রিফাত আমিন

পর্বঃ০৩


-আপনি কি আমায় ভালোবাসেন প্রহরভাই? (আমি)


প্রহরভাই এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেনো কথাটা বলে আমি ভীষণরকম অপরাধ করে ফেলেছি। এই অপরাধের ক্ষমা হয় না। অথচ নিজেই রোমান্টিকতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রহরভাই সড়ু চোখে চেয়ে বললেন,


-ভালোবাসার কি বুঝিস তুই? (প্রহর) 

-অনেক কিছু৷ আপনার মতো তো আর গোমরামুখো না যে সারাদিন বই নিয়েই পড়ে থাকি। সব কিছু শিখতে হয়। (আমি)


কথাটা বলেই বুঝতে পারলাম আবারো ভূল যায়গায় ভূল কমেন্ট করেছি।  ধুরু! প্রহরভাই দাঁত কেলিয়ে বললেন, 


-বাহ এতো কিছু জানিস? তাহলে তো আন্টিকে সব বলে দিতে হয়। আচ্ছা একটা কথা বলতো, প্রেমকে এত স্বাধীনতা দিয়ে কি আমি ভূল করেছি? (প্রহর)


অত্যন্ত গম্ভীর গলায় কথাটা বললেন প্রহরভাই। যার অর্থ তিনি সিরিয়াস। আমি বিজ্ঞদের স্বরে বললাম,


-মোটেও না৷ তবে স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহার ওকে করতে হবে। খোঁজখবর নিয়মিত রাখাটা জরুরী বোধহয়। (আমি)


-হুমমম (প্রহর) 


রিক্সা এগিয়ে চলছে অপরাহ্নের মিষ্টি রশ্মি ভেদ করে ।  শীতের শেষের দিকে এমন রোদ দারুণ উপভোগ্য। তবে বাতাস থাকলে অন্যকথা। রিক্সাটা যখন টিএসসির মোড়ে দাঁড় করালো তখন বিকেল গড়িয়ে সঁন্ধ্যের কাছাকাছি। সুর্য তার তেজ হারিয়ে তালগাছের ন্যায় বড় বড় বিল্ডিংয়ের নিচে ডুবে গেলো। সাথে নেমে এলো শহরজুড়ে অন্ধকার। 

রিক্সা থেকে নেমেই একটা কফিশপে ঢুকলাম। অনেক ধরনের কাপলে গিজগিজ করছে কফিশপ। ভীষণ অস্বস্তি লাগছে এখানে। প্রহরভাইকে বললাম,


- ভাইয়া চলেন এখান থেকে। ভালো লাগছে না এত মানুষ। তার থেকে একটা সাদামাটা চায়ের দোকানে চা খাই। খাওয়াবেন? (আমি)


প্রহরভাই হেসে হা সূচক মাথা ঝাঁকালেন। আমি ওনার পিছু পিছু আসতে লাগলাম। আচমকা সামনে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে পরায় হকচকিয়ে উঠলাম। চোখ তুলে তাকাতেই থ মেরে গেলাম। আরে! এটাতো ঐশী। তার সাথে আবার একটা হ্যান্ডসাম ছেলে। বোধহয় এটাই ওর বফ। যদিও প্রহরভাইয়ের মতো এত সুন্দর হতে পারবে না কখনো।   প্রহরভাইও একদফা চমকে উঠলেন। সামনের সুদর্শন যুবকটিকে দেখেই হেসে ফেললেন। প্রহরভাই বললেন,


-আরে পূলকভাই যে, ভালো আছো ?  (প্রহর) 


বাহ! পূলক নাম। নামটা তো জোসসস। পূলক ভাইয়া একবার আমার দিকে একবার ঐশীর দিকে তাকালেন। বুঝতে পারলাম তিনি বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। মহাবিভ্রান্তি। নতুনকেউ আমাদের একসাথে দেখলে অদলবদল করতে পারবে না। তিনি হতবিহ্বল হয়ে প্রহরভাইয়ের দিকে হাবলার মতো তাকিয়ে বললেন,


- ভালো ছিলাম, কিন্তু এখন নেই। ঐশী বলেছিলো এরা টুইন। কিন্তু এত সাংঘাতিক ধরনের টুইন জানা ছিলো না। আমি তো বুঝতেই পারছি না ঐশী কোনটা আর রশ্নি কোনটা। তুমি কেমনে বুঝো প্রহর? (পূলক)


প্রহরভাই হালকা হেসে বললেন,


-ভালো করে লক্ষ্য করে দেখো ঐশীর থুতনিতে তিল নেই। কিন্তু রশ্নির আছে। আবার রশ্নির চুল একদম সিল্কি  কিন্তু ঐশীর চুল হালকা কোঁকড়া। আর বাকিটা এমনিতে বুঝা যায়। (প্রহরভাই)


-বাব্বাহ! আসলেই তো৷ কেমন আছো রশ্নি? (পূলক)


আমি এবার লজ্জা পেয়ে বসলাম। একজন অপরিচিত মানুষ হঠাৎ নাম ধরে কেমন আছো জিজ্ঞেস করলে লজ্জা তো আপনাআপনি এসে যায়। স্বলজ্জিত কন্ঠে বললাম,


-আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি? (আমি)


কথার মাঝেই প্রহরভাই আমাকে কফিশপ থেকে বের হওয়ার নির্দেশ দিলেন। সাথে বের হলেন ঐশী আর পূলক৷ দুজনকে দারুণ মানিয়েছে। কিন্তু ঐশী কিভাবে আমাকে না জানিয়ে এই কাজ করলো? আর আমি হলে আগে মাইক দিয়ে পুরো পারা প্রতিবেশীকে জানিয়ে দিতাম। হাউ সুইট মি!

আচ্ছা দেখে তো মনে হচ্ছে প্রহরভাই পূলকভাইয়াকে চিনে। অথচ তিনিও আমাকে জানালেন না। সবাই একটা খাবিশের দল। 

একটু পর পূলকভাইয়া ঐশীকে নিয়ে ঢুকে পড়লেন কফিশপে আর আমরা দুজন চলে এলাম রাস্তার ছোট্ট চায়ের দোকানে৷ হঠাৎ মনে হলো, আজকের এই বিশেষ দিনে ফুচকা না খেলে কি চলে? অবশ্যই ফুচকা খাবো। ফুচকা না খেলে জীবন বৃথা। আমি ইনিয়েবিনিয়ে প্রহারভাইকে বললাম, 


-ভাইয়া চলেন ফুচকা খাই। এখানকার ফুচকা নাকি অনেক সুন্দর! (আমি)


-তুই কিভাবে জানলি এখানকার ফুচকা অনেক সুস্বাধু? কলেজে ক্লাস বাদ দিয়ে এখানে বান্ধুবীদের নিয়ে ঘুরতে আসা তাইনা? বাপের কলেজ হলে যা হয় (প্রহর)


আমি করুণ দৃষ্টিতে চাইলাম। কথাটা বলে কতবড় যে ভুল করছি সেটা হারে হারে বুঝতে পারলাম। কথা এড়িয়ে যেতে বললাম,


- পূলকভাইয়া তো অনেক কিউট। আপনি উনাকে চিনেন? (আমি)


-না চেনার কি আছে? আমার মামাতো ভাইকে আমি চিনবো না? হাউ ফানি! (প্রহর) 


আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকালাম। তলে তলে এত ঘটনা ঘটে গেলো অথচ আমি কিছু বুঝতেই পেলাম না। এজীবন রেখে কি লাভ। আমায় উঠায় নাও হে আল্লাহ। আবারো বললাম,


-পূলকভাইয়া বিয়ে করতে চাচ্ছে খুব তারাতারি এটা আপনি জানেন? (আমি)


- জানবো না কেনো? আমিই তো বিয়ের জন্য তাড়া দিয়েছি। (প্রহর)

 

আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস করলাম না। সবই তো জানে দেখছি। আর এদিকে আমার ক্ষুদ্র হৃদয়টা ভেঙে টুকরো টুকরো হচ্ছে। হায়রে! 

লাইফে প্রথম এভাবে টঙ দোকানের চা খাচ্ছি। এই চা যে এত সুন্দর হবে জানা ছিলো না। হোক না একদিন অন্যকিছু। যেটা আমার, আমাদের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু মনে আনে এক প্রশান্তি। যে প্রশান্তি কোটি টাকায় পাওয়া যায় না। হঠাৎ সামনে একটা পাজেরো জিপ দাঁড়ালো। হঠাৎ এমন জায়গায় থামায় আমি আর প্রহরভাই থতমত খেয়ে গেলাম। যখন সেই কার থেকে একটা সুন্দরী ফর্সা মেয়ে বের হলো তখন আমি বিষ্ময়ে হা হয়ে গেলাম। এত সুন্দর মেয়ে পৃথিবীতে আছে? 

কিন্তু দেখে তো মনে হচ্ছে বিরাট বড়লোক। তো এই টঙ দোকানে কি করে। হঠাৎ দেখি মেয়েটা দৌড়ে এসে প্রহরভাইকে জড়িয়ে ধরলো। ঘটনার আকষ্মিকতায় প্রহরভাইয়ের হাতের গরম চা ছিটকে এসে আমার হাতে পড়লো। চা টা অত্যন্ত গরম হওয়ার কারণে মুখ দিয়ে আপনাআপনি আহ! শব্দটা বেড়িয়ে গেলো। সাথে সাথে আমার হাতের চা'ও  নিচে পড়ে গেলো। আমার মুখ থেকে  শব্দটা শোনা মাত্র প্রহরভাই মেয়েটাকে দ্রুত সড়িয়ে দিলেন। আমার দিকে তড়িৎ বেগে এসে বললেন, 


- কি হয়েছে তোর? লেগেছে কোথাও? স্পিক আউট!  স্পিক আউট ননসেন্স! (প্রহর)


চিৎকার করে কথাটা বললেন প্রহর ভাই। তার কন্ঠে একই সাথে ভয় আর রাগ। উনার সেই ভয়ংকর আঁখিপল্লবের দিকে তাকিয়ে মহুর্তেই কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললাম। মনে হয় চোখ দিয়েই আমাকে কথা না বলার অপরাধে ভষ্ম করে দিবে। তখন ঐ সুন্দরী মেয়েটা বলে উঠলেন, 


-তোমার মাথা ঠিক আছে প্রহর? তুমি এই রাস্তার চা খাচ্ছো?  আর এই দুটাকার মেয়ের জন্য এত রাফ বিহেব করার কি আছে? আর ইউ ক্রেজি? (মেয়েটা)


প্রহরভাই গর্জে উঠে বললেন,


- ইয়াহ আ'ম ক্রেজি। তুই এক্ষুণি এই জায়গা থেকে লিভ নে। আদারউইস আই উইল কিল ইউ। (প্রহর)


মেয়েটা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,


- কতবার ফোন করেছি জানো? আর তুমি এভাবে কথা বলছো কেনো? (মেয়েটা) 


- তুই যাবি কি না। আমি চাইতেছিনা রাস্তায় কোনো মেয়ের গায়ে হাত তুলি। (প্রহর)


প্রহরভাইয়ের চাহনিতে এত হিংস্রতা আমি আগে কখনো দেখিনি। মেয়েটাও কপট রাগ দেখিয়ে সেখান থেকে কেটে পড়লো। অতঃপর প্রহরভাই সজোড়ে আমার দিকে এগিয়ে আসলেন  আর গায়ের সব শক্তি দিয়ে চড় মারলেন। মহর্তের ঘটনায় বিষ্ময়ে, ভয়ে, আতঙ্কে  স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি। কান দিয়ে যেনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। এত স্পিডে থাপ্পড় আমি কখনো খাইনি। উনি আরো একটা থাপ্পড় মারতে উদ্যত হলেন। এমন সময় সেখানে প্রেম তার সুজুকি জিক্সার নিয়ে  আসলো। আর প্রেমকে দেখে প্রহরভাই থেমে গেলেন। আমি বুুঝতেই পারলাম না কেনো আমি থাপ্পড় খেলাম। আর এই মেয়েটাই বা কে? এই সন্ধার সব মানুষের রঙ্গিন মহুর্তে আমার লাইফে যেনো অন্ধকার নেমে আসলো। দুচোখ দিয়ে টপটপ করে করে পানি পড়তে লাগলো। 



শীতের শেষ। তবুও এই শেষ সময়ে শীতটা যেনো একটু জেঁকেই বসেছে। কম্বলের নিচ থেকে উঠা দায়।  সকাল ছটায় ঘুম থেকে উঠলো প্রহর। রাত দুটোর সময় ঘুমিয়ে সকাল ছ'টায় ঘুম থেকে উঠা কতটা কষ্টকর তা হারে হারে টের পাচ্ছে সে। সারারাত জেগে পড়াশোনা করা,আর দিনের বেশীরভাগ সময় দরকারে বাইরেই কাটায় সে। কিন্তু ইদানিং রশ্নির সাথে দেখা হচ্ছে  না। সেদিন ওকে থাপ্পড় মারার পর থেকে অপরাধবোধে ভূগছি, রশ্নি নিজেও নিজেকে হাইড রাখার চেষ্টা করছে। কি অসহ্য যন্ত্রণা। আজ বিশ ফেব্রয়ারী। প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে। এই সাতটা দিনে রশ্নি প্রহরের সামনে এসে দাঁড়ায় নি। অবশ্য দাঁড়ানোর কোনো কারণও দেখছি না। প্রহর ফজরের নামাজটা পরে নিয়ে ফোন করলো তার পূলকভাইকে। আজকে ঐশীকে দেখতে যাবার কথা। গতকাল রাগের বসে সরাসরি না করে দিয়েছিলো প্রহর। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে রশ্নির সাথে দেখা করা খুব জরুরী। যদিও এমনিতেই ওদের বাসা যাওয়া যায়। কিন্তু বারবার একজন যুবতী মেয়ের বাড়ি যাওয়াটা দৃষ্টিকটু। কয়েকবার রিং হবার পর পূলকভাই ফোন ধরলো। প্রহর বললো,


- ঘুমে ডিস্টার্ব করলাম বোধহয়। আজকে কি সত্যিই ঐশীকে দেখতে যাবা? (প্রহর) 


পূলক ঘুমু ঘুমু কন্ঠে বললো,


-হ্যাঁ। তোমাকে তো বলা হলো আমাদের সাথে আসো। তাও তো রাজি হলে না। (পূলক)


-সমস্যা নেই ভাই। আজ যেতে পারবো। আসার সময় মামা মামিকে নিয়ে আমাদের বাসায় উঠিও আগে। ঠিক আছে? (প্রহর) 


-হুম ওকে। থ্যাংস ফর জয়েনিং আস। (পূলক)


কথা বলার পর ফোন কাটলো প্রহর। রশ্নির সামনে কিভাবে দাঁড়াবে, কিভাবে তাঁর রাগ ভাঙ্গানো যায় সেই চিন্তায় বিভোর হলো সে। শুধু বয়সে বড় হলেই সবসময় প্রেয়সীর উপর কর্তৃত্ব থাকে না, কর্তৃত্ব রাখতে হলে তাঁর মনযুগীয়ে চলতে হয়। নাহলে ছোট্ট রমণীর আকাশ সমান অভিমানে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেখান হতে উদ্ধারের সদুপায় আবিষ্কার হয়নি। ভয়ানক যন্ত্রণা! 


🌦️


সকাল থেকেই নিজেকে সাঁজাতে ব্যস্ত ঐশী। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই বারবার আয়নায় নিজেকে দেখছে সে। পার্লারেল দুটো মেয়ে এসে দক্ষহাতে সাজিয়ে দিচ্ছে তাকে। আর হাতে মেহেদী লাগানোর কাজটা আমিই করে দিচ্ছি।  এ জেনো বিয়ের আগেই প্রস্তুতিমূলক বিয়ে। উত্তেজনায় হাত-পা রীতিমত কাঁপছে ঐশীর। সাথে এক আকাশ ভালোলাগা আর বিষণ্নতায় অনুভূতিগুলো কেমন ফ্যাকাসে হয় কর্পূরের মতো উড়ে যাচ্ছে। পাশে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে আমার মেহেদী দেয়ার কাজ নিরীক্ষণ করছে প্রেয়সী। কিছুক্ষণ পর বোর লাগায় আমারটা ফোন হাতে নিলো সে। সদ্য ফোন চালানো শিখতে পাওয়া প্রেয়সী শুরুতেই কললিস্টে ঢুকলো। উদ্দেশ্য তার প্রহরভাইকে ফোন দিয়ে জানানো যে, রশ্নি আপু মেহেদী দিচ্ছে ঐশী আপুকে। ঘটনাটা অতি সিরিয়াস। শুরুতেই ডায়ালে গিয়ে মুখস্থ নাম্বারটা লিখেই কাল করলো সে। সামনে আসলো খাটাশ নাম। এটা আবার কি নাম! যাই হোক। প্রহরভাই ফোনটা সাথে সাথে ধরে বললেন, 


-তুই ফোন ধরছিস না কেন? কখন থেকে ফোন দিচ্ছি জানিস? (প্রহর)


প্রহরভাইয়ের কাটকাট গলা শুনে হাসি বিস্তৃত হলো প্রেয়সীর। সে হাস্যজ্বল স্বরে বললো,


- আমি প্রেয়সী দাভাই। একটা ভয়াভয় খবর জানাতে ফোন করেছি। সেটা হচ্ছে ঐশী আপুর মেহেদীর কালার বেগুণী হচ্ছে কেনো? অথচ আমারটা লাল। (প্রেয়সী)


ঠিক তখনই আমার কানে গেলো কথাটা। প্রেয়সীর মুখ থেকে দাভাই নামটা শুনে মনটা বিষাক্ত হয়ে উঠলো আরো। আমি রক্তিমস্বরে বললাম,


-ফোনটা কাট প্রেয়সী। নাহলে তোকে আজ শেষ করে ফেলবো। ফোন দেএএএএ! (আমি)


শেষের কথাটা এতটাই উচ্চস্বরে বললাম যে রুমের বাকি কয়েকজন ভয়ে কেঁপে উঠলো৷ প্রেয়সী গুটিয়ে যাওয়া হাতে ফোনটা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। আমি জানি, এখন মা আমার রুমে বিচার নিয়ে আসবে৷ কেনো প্রেয়সীকে মারলাম? কি ওর অপরাধ। হেনতেন। এদিকে এখনো প্রহর ভাই লাইনে আছে। আমি বিছানা থেকে ফোনটা নিয়েই বললাম, 


- প্রেয়সী ফোন করেছিলো। আর আমার নাম্বার থেকে ডিস্টার্ব করার জন্য দুঃখিত। আল্লাহ হাফেজ। (আমি)


প্রহরভাই সাথে সাথে শান্তস্বরে বললেন, 


-আমি আসছি পুলকভাইয়ের সাথে। প্রস্তুত তো তুই। এতো রাগ শরীরের জন্য ক্ষতিকার (প্রহর)


আমি কোনো কথা বললাম না। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। মানুষটার প্রতি দিনদিন ঘৃণা যেনো বেড়েই চলেছে। রাগ হয়, কিন্তু রাগ প্রকাশ করার ওয়ে থাকে না। আমি উনার মতো পাষাণ মনের মানুষ না যে সময় নেই অসময় নেই মেরেই চলবো। ভাগ্যিস সেদিন প্রেম এসেছিলো সময় মতো। নাহলে নিজের গার্লফ্রেন্ডের জন্য মেরেই ফেলতো আমায়। একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে ফোনটা রেখে কাজে মন দিলাম। জীবন অদ্ভুত। 


নদীর ধারে আপন মনে সিগারেট টানছে প্রেম। যদিও সিগারেট নিয়মিত খাওয়া হয় না। সবটা মুডের উপর নির্ভর করে। আজ মুড সিগারেট খাওয়ার সাথে ম্যাচিং হয়েছে।  হাতে ব্লাক কালারের গিটার। একটা গান গাওয়া হবে। মন খারাপের একটা গান। হাতের সিগারেট টা নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে গান ধরলো সে,


-এই শহরে নেই তুমি, এ শহর আমার নয়। 

কাটছে দিন বছর হয়ে, পড়ছে মনে তোমায় বারেবার। 


তুমি ছাড়া আমি একা,  শহরটা বড্ড ফাঁকা। 

এ শহর আমার জন্য নয়, ভালো থেকো তুমি সবসময়। 


এ শহর আমার জন্য নয়, ভালো থেকো তুমি সবসময়। "


তোমার আমার দিনগুলো, মনে পরে ভীষণ। 

তোমার ভালোবাসায়, ছিলো আদরমাখা শাষণ। 


তুমি ছাড়া, আমি একা শহরটা বড্ড ফাঁকা। 

এ শহর আমার জন্য নয়,  ভালো থেকো তুমি সবসময়। 

এ শহর আমার জন্য নয়, ভালো থেকো তুমি সবসময়। 


ভালো লাগেনা এই শহর, আমি ফিরে যাবো বাড়ি 


হাঁটবো এক সাথে আবার, আর নেইতো বেশী দেরী। 😌


হঠাৎ করেই গানটা থামিয়ে দিলো প্রেম। মুড নেই, এখন আর গান গাওয়া হবে না। গিটারটা নিয়ে উঠে পরবে এমন সময় সামনে দাঁড়ালো একটা মেয়ে। আরে এইটা তো সেদিনের মেয়েটা, যে আমার এক্সিডেন্টের সময় আমার সামনে ছিলো।মেয়েটা হেঁসে বললো,


-ভয় নেই, আজ আর বলবো না আপনি আমার পিছু পিছু এসেছেন। বরং আমিই আপনার গান শুনে থেমে গেলাম (মেয়েটা)


-ওহহ আচ্ছা। ভালো আছেন? (প্রেম)


-জি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি,? বাই দ্য ওয়ে, আমার নাম আফিয়া বিনতে সারা । আপনি তো প্রেম তাইনা ? (সারা)


-আলহামদুলিল্লাহ। হ্যাঁ আমি প্রেম। (প্রেম)


-আপনার নামটা সুন্দর। (সারা)


-আপনারটাও। (প্রেম)


কিছুক্ষণের মধ্যেই সুর্যটা তেজ হারিয়ে বিলুপ্ত হবার উপক্রম হলো। প্রেম বাইকের চাবিটা হাতে নিয়ে বললো,


-উঠে পরুন। আমি মেইনরোডে নামিয়ে দেবো। এই জায়গাটা তেমন ভালো না। ভয় পাচ্ছেন নাকি? ভয় পাবেন না৷ আমি আপনার ভাইয়ের মতো না। নিশ্চিন্ত থাকুন৷ (প্রেম)


নিজের ভাইয়ের নামে এমন গুনগান শুনে সারা কপট রাগ দেখিয়ে বললো, 


-  আপনি বারবার আমার ভাইকে টানেন কেন? আপনি নিজেও তো আমার সাথে ফ্লার্ট করার চেষ্টা করছেন। নিজেকে সাধু হিসেবে শো অফ করার কারণ নেই। (সারা)


প্রেম হালকা হেসে বললো,


- মেয়েদের সাথে যেছে কথা বলা আমার সিলেবাসে নেই। এটা আমার ভাইয়ের থেকে শেখা। মেয়েরা হচ্ছে দূর্বলতা, সেই দূর্বলতাটুকুও আমার নেই। কিন্তু আমার ভাইয়ের আছে। তাই একটামাত্র দিক দিয়ে ভাইয়া পিছিয়ে আছে আর আমার মতো এত বেপরোয়া হতে পারে নাই। আশা করি চিরদিন মনে থাকবে। আর যায়গাটা ভালো না। সাবধানে ফিরেন। আল্লাহ হাফেজ। 


সাথে সাথেই বাইক স্টার্ট করে তীব্র গতিতে ধুলো উড়িয়ে যায়গাটা ত্যাগ করলো প্রেম। কিছুক্ষণ পর আলো কমে এলো। আলো নিভলেই এই শহর চেনা যায়। শহরের ভদ্র মানুষদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মুখোশটা খুলে যায়। সারার ভয় লাগছে এখন। আসলেই জায়গাটা কেমন ভয়ানক। বেড়িয়ে যাবো কখন আল্লাহ। কোন শখে যে উঠলাম না বাইকে। 


🌦️


ঐশীকে দেখতে এসেছে পুলকভাই।  সাথে এসেছে উনার বাবা মা, প্রহরভাইয়া আর আন্টি৷ আঙ্কেল হয়তো অফিসে তাই আসতে পারে নাই। প্রহরভাই আসার পর থেকে নিজে রুমের ভীতর বন্দি রেখেছি। কোনোভাবেই উনার সামনে দাঁড়ানো যাবে না। উনার মুখ আমি দেখতেই চাইনা। কিন্তু সে আশা সম্ভবত দুরাশা। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার আম্মিজান আমারে ডাক দিলেন। কিন্তু আমি তো বের হবো না। বের হলেই শরবত দেয়ার বাহানা হলেও প্রহরভাইয়ের সামনে যেতে হবে বোধহয়। কোনোভাবে আম্মিকে ম্যানেজ করলাম 

কিন্তু ঘটলো এক বিপত্তি। প্রহরভাই যখন নিজে এসে বাইরে আমাকে ডাকলেন তখন ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হবার উপক্রম হলো। কিছুক্ষণ পর উনি থেমে গেলেন আর আমি যেনো প্রাণ ফিরে পেলাম। কিন্তু শেষ হাসিটা উনিই হাসলেন। বেলকনির সরু রাস্তা দিয়ে ছাদ থেকে রুমে ঢুকা যায়। দরজাটা আজকেও খোলা থাকায় সেই রাস্তা দিয়ে প্রহর ভাই আমার রুমে ঢুকলেন। রুমের লাইট অন করার সাথে সাথেই চমকে উঠলাম। যে মুখটা দেখবো না দেখবো না বলে এত কাহিনি করলাম। শেষ পর্যন্ত দেখতেই হলো। পরনে সেদিনের ড্রেসআপ। উনি কি চায়? সেদিনের ড্রেসআপ দেখিয়ে আবার কি মনটা তিতিয়ে তুলতে চান। আমি বিরক্তস্বরে বললাম, 


- লজ্জা লাগছে না? লজ্জা করে না বিনা অনুমতিতে একট মেয়ের রুমে ঢুকতে। এতদিন ভাবতাম আমি নিজেই শুধু নির্লজ্জ। তাইতো আপনার মতো পাষাণ মানুষের হাতের মার খাওয়ার পরও আপনাকে সম্মান করেছি। কিন্তু আপনি তো আপনিই। সেই স্থানটা ধরে রাখতে পারলেন কই? (আমি)


প্রচন্ড রাগের মাথায় কথাটা বলেই জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিতে থাকলাম। উনি আমার দিকে এগিয়ে এসে হাতে একটা নীল কাগজ আর একটা নীল শাড়ি ধরিয়ে দিলেন। রুমের লাইটটা অফ করে এসে বললেন, 


- বল। কি বলবি বল। আজ তোর সব কথা শুনবো। আমার জন্য এই সাতটা দিন তোর মনের মধ্যে কি ভয়ানক রাগ জমে আছ সব আমার উপর ঝাড়। লাইটটা অফ করলাম কারণ রাগলে তোকে আরো সুন্দর লাগে। একটা গান আছে না, রাগলে তোমায় লাগে আরো ভালো। ঠিক ওরকম। এমন সুন্দর মহুর্তে তোর দিকে তাকানো পাপ। এই ভয়ানক পাপটা এখন করা উচিত হবে না। 

 

আমি মানুষটার দিকে ছলছল দৃষ্টিতে তাকালাম। এই মহুর্তে কি বলা উচিত জানি না। কখনো আমার মাঝে এমন সুন্দর মহুর্ত আসেনি । আশ্চর্য! আমি রাগ করতে পারছি না কেনো? এমন হুট করে রাগ হারিয়ে যাওয়ায় নিজের প্রতি ভীষণ বিরক্ত হয়ে গেলাম৷ ভীষণরকম বিরক্ত! 



চলবে?

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url