শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ০৪

 

শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ০৪

শুধু তুই

লেখকঃ রিফাত আমিন

পর্বঃ ০৪


প্রেয়সী সকাল থেকেই মনমরা হয়ে বসে আছে। এমন ঘনঘটা করে মন খারাপ এর আগে কখনো হয়নি। কোনো কাজেই মন বসাতে পারছে না সে। গতরাতে ঐশীর ফোন দিয়ে ইউটিউবে ঢুকেছিলো। সেখানে ছাদবাগানে কালো গোলাপের সুন্দর একটা ভিডিও দেখেছিলো তারপর থেকে সে বায়না ধরেছে কালো গোলাপ লাগবে। লাগবে মানে এক্ষুনি লাগবে। ছাদে লাল, সাদা গোলাপ থাকলেও কালো গোলাপ আনানো হয়নি। কিন্তু সকাল সকাল কে বের হবে ফুলগাছ আনতে? প্রেয়সীর বাবা কলেজ যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। কিন্তু ফিরতে ফিরতে তো বিকেল গড়িয়ে রাত হয়ে যাবে। প্রেয়সীর ইচ্ছে করছে নিজে গিয়ে কালো গোলাপের পুরো রাজ্যটাই কিনে নিয়ে আসবে। একমাত্র অবলম্বন প্রহর দাভাই। কিন্তু গতকাল রাতে তার মনমেজাজ প্রচুর খারাপ ছিলো। আজ তার সামনে যাওয়া যাবে না। প্রেম দাভাইকে বলা যায়। প্রেয়সী সিদ্ধান্ত নিলো  প্রেমকে পাঠাবে ফুলগাছ আনতে। মনে মনে এই স্বপ্ন নিয়ে ছাদে উঠলো সে। মিষ্টি রোদ উঠেছে পূর্ব আকাশে, সেই রোদের ছোঁয়ায় রশ্নির প্রতিটা গোলাপ যেন হেসে হেসে রোদ পোহাচ্ছে। প্রেয়সী সেদিকে একবার তাকিয়েই ছাদের ছোট মই দিয়ে প্রহরদের ছাদে উঠে গেলো। আর সেখান থেকে সরাসরি ভীতরে ঢুকলো। প্রেমদাভাইয়ের দরজা খোলা, প্রেয়সী একবার উঁকি দিলো রুমের ভীতরে। বাব্বাহ! দাভাই পড়তেছে। প্রেয়সী ছোট ছোট পায়ে ভীতরে ঢুকলো। এমন সময় প্রেয়সী পিছন ভয় দেখাবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো। 


-ভাউউউউ (প্রেয়সী)


হঠাৎ কারো কন্ঠে হকচকিয়ে গেলো প্রেম। কেমিস্ট্রির পিরিওডিক ট্যাবল মুখস্থ করছিলো সে। কিন্তু যখন পিছনে ফিরলো৷ তখন হাসি বিস্তৃত হলো প্রেমের। স্বহাস্য কন্ঠে বললো,


- কিরে পিচ্চু কি খবর? কখন এলি?(প্রেম)


প্রেয়সী ছোট ছোট পা দিয়ে রুমের ভীতরটা পাইচারি করছে। ভীষণ সুন্দর ছোট্ট রুমটা! পছন্দ হয়েছে তার। কিন্তু তাঁর রশ্নি আপুর রুম কখনো এমন সুন্দর থাকেই না। বিষয়টা ভেবে প্রচন্ড হতাশ হলো সে। প্রেমের প্রশ্নের জবাবে সে হতাশ কন্ঠে বললো,


-এই মাত্র বাসা থেকে পালিয়ে এসেছি দাভাই। আমার কালো গোলাপ লাগবে। কেউ এনে দিচ্ছে না। একমাত্র তুমি বাকি আছো৷ প্লিজ এনে দাও৷ (প্রেয়সী)


প্রেয়সীর কথায় প্রেমের প্রচন্ড হাসি পেলো। কিন্তু মনমরা ভাব এনে বললো,


-আহারে পিচ্চি। আমাদের ছাদে তো অনেক কালো গোলাপ আছে। ওসব থেকে নিয়ে নে যত লাগবে। আমি দরকার হলে পরে কিনে নেবো। (প্রেম)


-না না আমার এক্ষুনি লাগবে। তোমারগুলা নিবো না। (প্রেয়সী)


প্রেম হতাশ হলো। অগত্যা পড়ার টেবিল থেকে উঠে এই সকাল সকাল প্রেয়সীকে নিয়ে ফুলের দোকানে ছুটে চললো। বোন ছারা পুরো বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। প্রেয়সী তার বোনের অভাব পূরণ করিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে প্রেয়সী যখন ছোট ছোট আবদার নিয়ে আসে,  তখন সেই আবদার পূরণ করাই যেন প্রেমের মুখ্য কর্ম হয়ে যায়। 


🌦️


সকালে উঠেই একটা নষ্টামার্কা নিউজ শুনে মাথাটা হ্যাং হয়ে গেলো আমার। অবশ্য এটা সকাল নয়, প্রায় দুপুর বলা যায়। স্কুল কলেজ আগামী ১৪ দিনের জন্য বন্ধ। এটা কোনো কথা? সাথে লকডাউন। তাহলে তো ঐশীর বিয়েটাও পিছিয়ে যাবে। আর আমার কলেজে যাওয়ার কি হবে? কিছুদিনের জন্য খুলে আবার বন্ধ। উফফ! 

প্রহরভাইও বোধহয় চলে যাচ্ছে না আর। হঠাৎ গতকাল রাতের কথা মনে পরে নিজের প্রতি প্রাউড ফিল করলাম। কাল ভালোমতোন বাঁশ দিয়ে দিয়েছি। গার্লফ্রেন্ডের সাথে সারাদিন ঘুরে বেড়াবে আর আমার কাছে এসে রোমান্টিক ডায়ালগ ছাড়বে। কি মনে করেন উনি নিজেকে? এখানে কি তাহলে প্রাকটিজ করতে আসেন নাকি? 


গতকাল রাতে, 


যখন আমার হাতে নীল চিরকুট আর নীল শাড়িটা দিলেন। তখন আমার মন পাখিটা এতটাই খুশি হলো যে সেটা প্রহর নামক শত্রুকেও অতি আপন ভেবে নিলো। আমি মুগ্ধচোখে উনার দিকে তাকালাম। ডিম লাইটের মসৃণ আলোয় উনার মুখশ্রীটা অতি মায়াবী ঠেকলো। খুঁজে পেলো আমার একটা বিশ্বস্ত হাত। ছোটবেলা থেকেই প্রহরনামক মানবকে ভয় করে আসলেও উনার প্রতিই আমার এক আকাশ দূর্বলতা কাজ করে। এটা ভালোবাসা কি না জানি না। হতে পারে তার প্রতি আমার মন থেকে তৈরী হওয়া একটা সম্মানের যায়গা। কিন্তু সম্মানটাই কি ভালোবাসা নয়? যেখানে সম্মান নেই সেখানে কিসের ভালোবাসা। 

উনার ব্যাবহার গুলো আমাকে কাঁদাতে বাধ্য করে । উনার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার কথা বলার সাহস হয় না। নিজেকে প্রচন্ড খাপছাড়া লাগে। কন্ঠ শুকিয়ে আসে। এমন একটা উদ্ভট পরিস্থিতিতে উনাকে আর সামনে পেতে ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া আম্মি উপস্থিত হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমি স্বাভাবিক কন্ঠে বললাম,


- আপনার প্রতি আমার কোনো রাগ নেই প্রহর ভাই। আপনি এখান থেকে দয়া করে চলে যান। (আমি)


এমন সময় ফোন আসলো উনার। ভাইভ্রেট করা ফোনটা হলুদ পান্জাবীর পকেটে তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। তিনি ফোনটা বের করে দেখলেন একটা অপরিচিত নাম্বার। কলটা ধরে সালাম দিতেই ওপাশ থেকে একটা নারীকন্ঠ ভেসে আসলো। 


- হ্যালো প্রহর। তোমাকে আমি কতবার ফোন করেছি জানো? তুমি আমাকে ব্লাকলিস্টে রাখছো কেনো? (মেয়েটা)


- শোনো সোনিয়া, তোমাকে আমি ব্লকলিস্টে রাখিনি। তোমার নাম্বারটা রাখছিলাম শুধু। তোমার লজ্জা করে না একটা ছেলেকে এভাবে ডিস্টার্ব করতে। কি চাচ্ছো তুমি? (প্রহর)


-আমি তো শুধু তোমাকে চাই প্রহর। শুনো তোমার বাসার পাশে যে একটা মেয়ে আছে। কি জানি নাম? রশ্নি নাকি রশ্মি। ওর কাছে কি আছে এত বলো তো? ছোট একটা মেয়ে। ছোটলোকের বাচ্চার পিছনে পরে থাকো! আশ্চর্য! (সোনিয়া)


সোনিয়ার মুখ থেকে নিজের বাবার নামে এহেন প্রসংশা শুনতে পেয়ে মহুর্তেই রাগ উঠে গেলো আমার। প্রহরভাই দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,  


- তুই আজ থেকে যদি আর একবার আমাকে ফোন করিস তাহলে তোকে দেখে নেবো আমি। বায়! 


কথাটা বলেই ফোন কাটলেন উনি। আমার দিকে ভয়ার্ত চোখে চাইলেন। মনে হচ্ছে অপরাধটা উনিই করেছিলেন। ভাগ্যিস ফোনটা চাপ লেগে স্পিকারে ছিলো। উনি নম্রস্বরে বললেন, 


- কিছু মনে করিস না। মেয়েটা আমাকে জ্বালিয়ে মারছে। ওর  বাবা আমার বাবার অফিসের এমডি। তো সেই স্বার্থে একদিন ওর বার্থডেতে আমাদের ফুল ফ্যামিলি ইনভাইটেড ছিলো। আমি কখনই এসব অনুষ্ঠান পছন্দ করি না। কিন্তু তখন সদ্য বুয়েটে চান্স পাওয়ার খুশিতে বাবা-মায়ের সব কথা অক্ষরে অক্ষরে মানতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওর বার্থডেতে গিয়ে শুরু হলো বিপত্তি। ওর সাথে কথা হলো। ও নিজেরো নাকি ইন্জিনিয়ারিং পড়ার শখ। দিলাম ফোন নাম্বার, সেই যে নাম্বার নিলো। তারপরেই নাকি সে আমাকে ভালোবাসে। রইলো তার ইন্জিনিয়ারিং। বল এটা কোনো কথা? প্রথম প্রথম মজা ভাবলেও এখন বিরক্ত লাগে। আর একটা সমস্যা হলো ওর বাবা প্রভাবশালী বিজনেসম্যান। আর আমার বাবার অফিসের এমডি। মনমেজাজ বিক্ষিপ্ত করে দেয় একেবারে। 


আমি মনে মনে কঠিন কথাগুলো গুটিয়ে নিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিলাম। কঠিনস্বরে বললাম,


-কি মনে করেন নিজেকে আপনি? আপনার পার্সোনাল ইস্যু নিয়ে আমার সামনে কথা বলবেন কেনো? আমি এতো এক্সকিউজ শুনতে চেয়েছি? আমার বাবা ছোটলোক নাকি বড়লোক সেটা ঐ মেয়ের কাছ থেকে বারবার কেনোই বা শুনতে হচ্ছে আমায়? এর সবকিছুর জন্য আপনি দায়ী। আপনি প্লিজ আমার রুম থেকে বিদেয় হন। নাহলে কিন্তু আম্মিকে ডেকে আপনার চরিত্র সম্পর্কে সবাইকে অবগত করে দিবো। (আমি)


রাগের মাথায় অনেক কথাই বলে ফেললাম। প্রহরভাই নিজেকে স্বাভাবিক রেখে আরেকটু কাছে চলে এসে বললেন,


-সেদিন তোকে মারছি বলে রাগ করছিস? রাগ করা ভালো। রাগ করে মাঝে মাঝে কেঁদে ফেলাও ভালো। মন হালকা হয়। আমি জানি তুই এই ধাঁচের মানুষ। এইযে আমাকে কঠিন কিছু কথা শুনালি। এটাও কিন্তু মনের সাথে যুদ্ধ করে বের করেছিস তুই। আমি চাই তুই স্টোং হ। আরো স্ট্রোং। 

সেদিন আমার মাথাটা খুব গরম হয়ে গিয়েছিলো। এমনিতে মেয়েটা আমার মাথা গরম করে দিয়েছিলো, সাথে তোর হাতে গরম চা পরেছিলো। আমি যখন তোকে বললাম কোথায় লেগেছে তুই তখন কথা বললি না। আমি বারবার জিজ্ঞেস করার পরও তুই কথা বললি না। একটাবার বললেই তো আমি কিছু একটা করতাম। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে বোবার মতো যদি থাকে তাহলে কতটা রাগ উঠে আমার! তুই ছাড়া আর কে ভালো জানে? তবুও এমন করিস কেন? আচ্ছা যা হয়েছে হয়েছে। আমি সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাইছি। কারো কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাস প্রহরের  নেই। কিন্তু ছোট্ট অভিমানিনী থাকলে তার কাছে এত অভ্যাস টভ্যাস খাটে না। বুঝলি? 


আমি বিরক্ত হলাম। মহাবিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে বললাম,


-আপনি বিদেয় হন প্লিজ। 



সকালের নাস্তাটা করে নিলাম দুপুর বারোটায়। এদিকে আম্মি তো রেগেমেগে আগুন। তার প্রশ্ন কোন দুনিয়ার মানুষ সকাল ১১ টায় ঘুম থেকে উঠে? এর অবশ্য একটা সুবিধা আছে। ফ্রিতে জমিদারের মেয়ে হওয়া যায়। আমি টপাটপ দুইটা রুটি মুখে দিয়েই ঐশীর রুমে আসলাম। বেচারীর মন খারাপ। এই মন খারাপে করোনা নামক বস্তুটাকে হত্যা করতে ইচ্ছে করছে তার। কত শখ করে ছিলো সামনেই ভালোবাসার মানুষটাকে কাছে পাবে সে। কিন্তু সে আশায় জল ঢেলে দিলো এই করোনা। আমি শান্তনা দিতে ওর রুমে গেলাম। সে মুখ ফুলিয়ে ফোন হাতে নিয়ে বিছানায় ঠেস দিয়ে আছে। আমাকে দেখা মাত্র বিরক্তি বাড়লো তার। তাঁর ধারণা আমার কারণেই এই দুনিয়ায় আবার করোনা সংক্রমণ বেড়েছে৷ এর জন্য মনে মনে বিশাল একটা লো ক্লাস এক্সপ্লেইনেশনও রেডি করেছে। আমি বিছানায় বসতে বসতে বললাম, 


-বিয়েটা কবে করছিস? আসলে কাউকে কষ্ট দিয়ে কিছু করতে নেই। তুই আমাকে না জানিয়ে ফটাফট প্রেম করে নিলি। আর পৃথিবী সেটা মেনে নেবে? এটাই হলো রিভেঞ্জ অফ নেচার। (আমি)


আমার কথায় সে বড্ড হতাশ হলো। সাথে বাড়লো তাঁর বিরক্তি। চোখে মুখে বিষণ্নতাভাব টেনে এনে বললো,


- কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিচ্ছিস? ভালো হচ্ছে না কিন্তু। (ঐশী)


-আরে রাগ করছিস কেন? বিয়েটা হবে। খুব তারাতারি হবে মাই ডিয়ার। (আমি)


সে হাসলো। হাসলো বোধহয় পুরো রুমটা। মন খারাপের পাট চুকে গেলো। অল্পতেই খুশি হয়ে যাওয়ার ভয়ংকর রোগ আমাদের আছে। আর এটাতেই আমরা স্যাটিসফাইড। ঐশীর রুম থেকে বেড়িয়ে ছাদের দিকে পা বাড়ালাম। ছাদে প্রচন্ড রোদ। ফাল্গুনের ছোঁয়ায় সারা পৃথিবী যেনো রং মেখেছে৷ গাছে গাছে ফুলের সমারোহ। ফাল্গুনী বাতাসে মন পালিয়ে যেতে চায়। অজানা এক দেশে, অজানা এক প্রান্তরে। যেখানে শুধু সে আর আমি। আমি আর সে। 

ছাদে উঠে দেখলাম প্রেম আর প্রেয়সী মনোযোগ দিয়ে ফুলের গাছ লাগানোর ট্রাই করছে। সবটা একা হাতে করছে প্রেম। আর প্রেয়সী ভিডিও করছে। এটা সে ঐশী আপুর ফেসবুকে আপলোড করবে। সবাইকে দেখাবে তাঁর ছাদে কালো গোলাপ আছে। হ্যাশট্যাগ ব্লাক রোজ। আমি ছাদে উঠেই চুপিচুপি প্রেয়সীর পিছনে গেলাম। ওখানে পৌঁছেই ছোঁ মেরে হাত থেকে ফোনটা কেরে নিলাম। আমার এহেন কান্ডে আকাশ কাঁপিয়ে কাঁদতে বসলো প্রেয়সী। প্রেম আমাকে দেখেই হাসলো। প্রেয়সীর কান্না থামাতে থামাতে বললো, 


- কখন এলে আপু? (প্রেম)


-এইতো এক্ষুনি। এই মেয়েটা কাঁদছে কেন বলতো? ঢং দেখলে বাঁচি না। (আমি)


হালকা একটু কান্না থেমে ছিলো। এই কথা শোনার পর আবারো কান্নার গতি বৃদ্ধি পেলো। প্রেম আমার দিকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, 


- আহ! যাওতো এখান থেকে। ওহ একটা কথা। ভাইয়া তোমায় ডাকছিলো আমাদের বাসায়। কি জানি দরকার আছে আমায় বললো। 


আমি সরু দৃষ্টিতে প্রেমকে পর্যবেক্ষণ করলাম। বেচারা মিথ্যা বলছে না তো? আর প্রহর ভাই ডাকছিলো মানে কি? কালকের ব্যবহারে কি উনি রাগ করেছেন? এবার কি হবে আমার। যদি না যাই তাও তো মারবেন আবার গেলে যদি রুমের ভীতর বন্দি করে রাখে? অথবা বাথরুমে। ইয়াক!

আমি সিওর হওয়ার জন্য প্রেমকে বললাম,


-কেনো ডাকছিলো রে? (আমি)


- আমি কেমনে জানবো কেনো ডাকছে? উফফ! তুমি এখান থেকে যাও তো। আমাদের কাজ করতে দাও। 


🌦️


প্রহর ভাইদের বাসার সামনে গিয়ে কলিংবেলে চাপ দেবো এমন সময় ছাদে চোখ গেলো আমার। সাথে চোখে পড়লো তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে থাকা শুভ্র মানবটিকে। আমার দিকে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। শরীরে তার শুভ্র টি শার্ট। এই টি-শার্ট টি পড়লে উনাকে অনেক সুন্দর লাগে। ভালোভাবে কখনো লক্ষ্য করা হয় নি। আমাকে দেখেই হাসি দিয়ে বললেন,


- ছাদে চলে আয়। এখানে প্রচুর রোদ। (প্রহর)


আমি কোনো উত্তর দিলাম না। ওনাদের বাসায় না ঢুকে আমাদের বাসার ছাদ দিয়ে ওনার কাছে চলে আসলাম। প্রচুর রোদে চোখ মেলতে পারছেন না ঠিকমতো। আমারো একই অবস্থা। আমার দিকে সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,


- আমার দেয়া শাড়িটা ফেরত দিয়ে কি খুব ভালো করলি? এত রাগ কই থেকে আসে? (প্রহর)


আমি উনার দিকে একপলক তাকিয়েই উত্তর দিলাম, 


- আপনার রাগ থাকলে কি আমার থাকতে পারে না? (আমি)


- শোন একটা দরকারে তোকে ডেকে পাঠিয়েছি। ঐশীর বিয়েটা ছোট পরিসরে করলে কেমন হয়? যে লকডাউন পরছে তাতে মনে এখন আর শেষ হবে না। আজ একটু আব্বু-আম্মুসহ আলোচনা করবো আঙ্কেল আন্টির সাথে। পুলকভাই তো দেখি ঐশীর থেকেও বিয়ে পাগল। বিয়েটা ভালোয় ভালোয় হলে আমাদেরও সুবিধা। (প্রহর)


-আমাদের সুবিধা মানে কি প্রহরভাই? (আমি)


- আমি জানতাম তুই বুঝবি না। ছোটদের এত কিছু বুঝতে হয় না। মাথায় ওড়নাটা দে। অনেক রোদ তো। আবার দেখবি কালো হয়ে গেছিস। এমনিতেই তো ভূত। পরে আবার হবি লো ক্লাস পেত্নী। শেষে দেখা যাবে আমার বাচ্চাগুলোকে উগান্ডা থেকে ট্রান্সফার করতে হচ্ছে। বিরাট টেনশন রশ্নি! (প্রহর)


আমি অবাক চোখে তাকালাম। উনি যে অশ্লীলতার চরম পর্যায়ে চলে যাচ্ছেন তা ভালোয় বুঝতে পারছি। আমার আম্মি জানে উনি একজন সাধু বাবা। উনার মাঝে পাপ বলতে কিছু থাকে না। কিন্তু আম্মি কি উনার চরিত্র সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখে? এই ভেবে বরাবরের মতো হতাশ হলাম। আমির কাছে প্রহর মানেই দ্য জিনিয়াস। আমি কথা বললাম না। উনি আবারো বললেন,


-ট্রুথ ডেয়ার খেলবি? তুই আমাকে একটা ডেয়ার দিবি। আমি তোকে একটা দেবো। ব্যাস! জানি তুই পারবি না। গাধা লেভেলের মানুষরা কিছু পারে না। (প্রহর)


পদে পদে এমন অপমান আর নিতে পারছি না। আমি জানি উনি আমাকে জ্বালাতেই সব করছেন। আমি প্রহরভাইদের ছাদ থেকে আমাদের ছাদে অবস্থান করা প্রেম আর প্রেয়সীকে জরুরী তলব করলাম। সাথে সাথে হাজির হলো দুই মানব-মানবী। তাঁদের কাজে ব্যাঘাত ঘটায় তারা বরাবরের মতো বিরক্ত। ওদের বললাম,


-এখন ট্রুথ ডেয়ার খেলা হবে তোর ভাইয়ের সাথে। দেখা যাক কি হয়? বল তোরা কে কার পক্ষে? (আমি)


কথাটা বলার সাথে সাথেই প্রেম আমার দিকে এগিয়ে আসলো। প্রেয়সী আমার আর ওর দাভাইর দিকে তাকিয়ে ক্ষণকাল চিন্তাভাবনা করে ওর দাভাইর দিকে এগিয়ে গেলো৷ আমি জানতাম তুই ওদিকে যাবি। তুই তো ঘরের শত্রু। ঘরে তোর মতো শত্রু থাকলে আর বাইরের শত্রুর কি প্রয়োজন?

মনে মনে কয়েকটা গালি দিয়ে প্রহরভাইয়ের দিকে তাকালাম। উনি বললেন, 


-যেহেতু এটা ডেয়ারের খেলা। সুতরাং তুই আগে একটা ডেয়ার দে। আমি তোকে একটা ডেয়ার দেবো। আর চিটিং যাতে করতে না পারিস সেটা প্রেম আর প্রেয়সী লক্ষ্য রাখবে। সো লেটস স্টার্ট। (প্রহর) 


প্রথমে যেহেতু আমার ডেয়ার দেয়ার সুযোগ। সেই সুযোগটা হাতছাড়া করা যাবে না। কি দেয়া যায়? কি দেয়া যায় চিন্তুভাবনার জালে মাথাটা আওলিয়ে গেলো। সঠিক সময়ে সঠিক চিন্তাভাবনা মাথায় কেনো যে আসে না বুঝি না। হঠাৎ ভাবলাম পুশআপ দিতে বলি একশ'টা। বুঝবে মজা কত ধানে কত চাল। আমি একটা ভিলেন মার্কা হাসি দিয়ে বললাম,


- একশ'টা পুশআপ দিন ভাইয়া। বুঝবো আপনি কতটা পারদর্শী। 


আমার কথা শুনেই প্রেয়সী বললো,


-আমি গুনবো। আমি ১-১০০ গুনতে পারি। তোমরা পারবা?(প্রেয়সী) 


আমি হলকা কেশে বললাম,


-না আমরা কেউ পারি না। তুই মোবাইল বের করে ফেসবুক লাইভে আয়। প্রহরভাইয়ের মানসম্মান আজ প্লাস্টিক করেই ছাড়বো। (আমি)


-আরে এটাতে লাইভে আসার কি দরকার? আমি তো এসবে পটু সেটা কে না জানে? তুই তো হেরে যাবিই আজ। সাথে নিজের ডেয়ারের জন্য প্রস্তুত হ। (প্রহর)


আমি আবারো ডেভিলমার্কা হাসি দিয়ে বললাম, 


- মুখ থাকলে অনেক কিছুই বলা যায়। একশ'টা পুশ আপ কখনো দিতেই পারবেন না হু। (আমি)


আমি প্রেমের ফোন বের করে লাইভে আসলাম। প্রহরভাই আমার ফোন বের করা দেখে মুখে একটা মাস্ক পরে নিলেন। উফফ ঢং। মনে হয় উনাকে দেখলে মানুষরা পাগল হয়ে রাস্তায় ভিক্ষা করতে নামবে। তাই এতো সেফটি। তপ্ত ছাদের প্লাস্টারে একটা চট বিছিয়ে নিলেন। আমি ভালো করে উনারকে আবার স্ক্যান করে নিলাম। উনি ব্লাক থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর হোয়াইট টি-শার্ট পরেছেন। ভালোই লাগছে। উনি পুশআপ দেয়া শুরু করলেন। আর আমি ফোনটা প্রেয়সীকে দিয়ে দিলাম। প্রেয়সী সুউচ্চ স্বরে ১,২ গুনতে শুরু করলো। আর প্রহরভাই আপন মনে পুশআপ দিতেই থাকলেন। উনার সুঠাম দেহের প্রতিটা অংশ কাঠকাঠ হয়ে বাইরে ধরা দিচ্ছে। আমি মুগ্ধ চোখে পর্যবেক্ষণ করতেই থাকলাম। পেশীবহুল হাতদুটো মহুর্তেই টসটসে লাল হয়ে গেলো। মানুষ ফর্সা হলে যা হয়। একটু গরমেও লাল হয়ে যায় উনার মুখ। সাদা বিলাই। আমার ধ্যান ভাঙ্গলো যখন প্রেয়সী ৫০,৫১,৫২ গোনা শুরু করলেন। এদিকে প্রহরভাইয়ের অবস্থা নাজেহাল। সাদা-শার্টটা ভিজে চুপচুপে হয় গেছে। সারা শরীর দিয়ে যেনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। কানদুটো আরো লাল। অথচ উনি নির্লিপ্ত ভাবে পুশআপ দিয়েই চলেছেন। পেশীগুলো যেনো টিশার্ট ছিঁড়ে বেড়িয়ে আসবে এমন অবস্থা। আমি বললাম, 


-আচ্ছা বাদ দিন ভাইয়া। আমি জানি আপনি আর পারবেন না। থাক আর কষ্ট করতে হবে না। (আমি)


প্রহরভাই ইচ্ছামতো পুশআপ দিতেই থাকলেন। সাথে উত্তেজনা বাড়লো প্রেয়সীর। মনে হচ্ছে সে নিজেই পুশআপ দিচ্ছে। 


- ৯১, ৯২ আর একটা দাভাই। হয়েছে, হয়েছে। আর একটু। আপুকে হারায় দিতেই হবে। ৯৩,৯৪। (প্রেয়সী)


এদিকে হারার লগ্ন যেনো আমার উপস্থিত। আমি প্রেয়সীর থেকে ফোনটা কেরে নিয়ে লাইভটা ক্যান্সেল করে দিলাম। লাইভটা হয়েছিলো প্রেমের ফোন থেকে। এদিকে ফোন কেরে নেওয়ার প্রেয়সী গগনবিদারী চিৎকার দিলো। প্রহরভাই একশোটা পুশআপ দিয়ে সেখানেই শুয়ে পরলো। শরীরে আর কিছুই নাই যেনো। 


- পানি দে রশ্নি। পানি খাবো। (প্রহর)


হঠাৎ একথা বলেই নোংরা চটের মধ্যে শরীরের ভার মেলিয়ে দিলেন উনি৷ আমি উনার আচমকা কান্ঠে চমকে উঠলাম। সচারাচর তো উনি নোংরা পছন্দ করে না। আজ নোংরা চটেই 

 শুয়ে পরতেই টনক নড়লো আমার। উনি যখন আবার বললেন,


-পানি দে। (প্রহর)


আমার হঠাৎ কি হলো জানি না। কোথায় কি আছে বুঝলাম না। আম্মি বলে একটা চিৎকার দিলাম। মাথাটা কোনো কাজ করছে না। চিৎকার দিয়েই আমাদের বাসার দিকে ছুট লাগালাম। একটু সাবধানে পার হতে হয় এই ছাদ থেকে ঐ ছাদ টা। সেই মইটা কত সেকেন্ডের মধ্যে পার হয়েছি জানি না। হাত-পা জেনো ঠকঠক করে কাঁপছে। মন বলছে প্রহরভাইয়ের কিছু হয়েছে। উনি তো কখনো এমন করে না। তাহলে কি আমাকে হারাতেই এতকিছু করলো। আমি সরাসরি কিচেনে এসে গ্লুকোজের প্যাকেট আর একগ্লাস পানি নিয়ে ছুট লাগালাম ছাদের মধ্যে। ঘটনার আকষ্মিকতায় ভুলে গিয়েছিলাম। ওনাদের ছাদ থেকে উনার রুম কাছাকাছি আর পানি নেওয়া অনেক ইজি ছিলো। এদিকে আম্মি বারবার বলছে 'কি হয়েছে? কি হয়েছে? '

সেদিকে আমার কোনো ধ্যান নেই। পানিটা নিয়ে যত তারাতারি সম্ভব উনার কাছে চলে আসলাম। দেখলাম আশেপাশে প্রেম আর প্রেয়সী নেই। আমি ওনার দিকে পানিটা এগিয়ে দিতেই ঢকঢক করে পুরো পানিটা খেয়ে নিলেন উনি। আমার ভয়টা এখনো কমতে চাইছে না। হৃদপিন্ড উচ্চস্বব্দে নিজের দাপদ দেখিয়ে চলছে। উনি পানিটা খেয়েই আস্তে আস্তে উঠে পরলেন। আমি ধরবো না ধরবো না করেও উনাকে উঠাতে হেল্প করলাম। উনার যে দামরামার্কা শরীর।  তাতে আমার মতো পাঁচটা মানুষও বোধহয় উনাকে সামলাতে পারবে না। সেখান থেকে উঠে ছাদের ছোট আমগাছটার তলায় আবার শুয়ে পরলেন। আমার ভয় এখনো কাটছে না। প্রহরভাইয়ের জন্য এতো ভয় লাইফে প্রথমবার পেলাম৷ উনি আমার দিকে পিটপিট চোখে তাকিয়ে বললেন,


- ভেবেছিলাম একশ'টা পুশআপ অনায়াসে দেয়া যাবে। আগেও দিয়েছি। কিন্তু অনেকদিন থেকে না দেয়ায় সত্তরবার দিতেই হাঁপিয়ে উঠছিলাম। কিন্তু কিছু বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। প্রেয়সীটাও মনে মনে আশা করে আছে আমি পারবো৷ ওর ক্ষুদ্র মন থেকে চাওয়াটা অপূর্ণ রাখলাম না। আর তুই তো লাইভে এসেছিলি৷ মানসম্মান তো যেতই,  সাথে প্রহর হেরে যেতো। ইউ নো, প্রহর কখনো হারে না। (প্রহর)


আমার কান্না পেয়েগেলো। আমার জন্য জীবনে প্রথম এই  মানুষটাকে বোধহয় এতটা কষ্ট সহ্য করতে হলো। আর আমার মস্তিষ্কও কারো জন্য এতটা দুশ্চিন্তায় কাহিল হওয়ার অভিজ্ঞতাটা রপ্ত করলো। আমি অপরাধী দৃষ্টিতে উনার দিকে তাকালাম। উনি ডেভিলমার্কা হাসি দিয়ে বললেন,


- এবার তোর ডেয়ারের পালা । তোর ডেয়ার হচ্ছে আমার আম্মুকে ভুলবসত  বলবি ' আম্মি, আপনার ছেলের কাছে নাকি একটা নীল শাড়ি আছে। ওটা আমাকে পড়িয়ে দিন তো ' (প্রহর)


এমন পরিস্থিতেও কেউ উদ্ভট ডেয়ার দেয়? আমার রাগ হলো। রাগ হলো এমন একটা পাগল মানুষের পাল্লায় পরায়। আমি স্বল্পস্বরে বললাম, 


- অসম্ভব। 



চলবে?

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url