শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ০৫

 

শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ০৫

শুধু তুই

লেখকঃ রিফাত আমিন

পর্বঃ ০৫


ঘড়িতে রাত বারোটা বেজে নয় মিনিট। বদ্ধ রুমে টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। সেই ল্যাম্পের মোলায়েম আলোয় বইয়ের পাতায় নজর বুলিয়ে যাচ্ছে প্রেম। একটু ঘুমু ঘুমু ভাব। অবচেতন মন বিছানা টানছে। হটাৎ টেবিলের উপরে রাখা ফোনটা কেঁপে উঠায় চমকে উঠলো প্রেম। এতো রাতে কে কল করলো? একটা আননোন নাম্বার দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো প্রেম। ফোনটা ধরলো সে, 


- আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন? (প্রেম)


ওপাশের মানুষটা কথা বললো না। প্রেম আবারো ধৈর্য্য ধারণ করে বললো,


- এত রাতে কল দিয়ে হয়তো ডিস্টার্ব করবেন না বোধহয়। কোনো দরকার থাকলে বলুন। (প্রেম)


- আমি সারা। আপনাকে ধন্যবাদ দেয়ার জন্য ফোন করেছিলাম। সেদিন আপনি না থাকলে হয়তো আমি শেষ হয়ে যেতাম৷ অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। (সারা)


- আপনাকেও ধন্যবাদ। সবসময় সব মানুষকে বিশ্বাস করতে নেই। আপনি শুরুতে আমার বাইকে না উঠে বোকামি করেছেন৷ কিন্তু আপনার দিক থেকে সঠিক কাজটাই করেছেন৷ আচ্ছা রাখি তাহলে। ঘুম পাচ্ছে। (প্রেম)


- আপনি কি এক্ষুনি ঘুমাবেন? না মানে একটু কথা ছিলো। সেদিন আপনার মানি ব্যাগটা ভুলবসত আমার কাছে রেখেছিলেন। পরে নিতে ভূলে গেছেন। ওটা কি কাল নিতে পারবেন? (সারা)


-ওহহ তাই তো বলি। নাম্বার পেলেন কই। (প্রেম)


প্রেম দুদিন থেকে তার মানিব্যাগ খুঁজছে। অথচ পাচ্ছে না। কোথায় রেখেছে সেটাও মনে করতে পারছে না। ভেবেছিল হয়তো পকেটমার নিয়ে গেছে। কিন্তু এখন মনে পরলো সেদিন দোকান থেকে বের হবার সময় ওনাকে মানিব্যাগটা ধরতে দিয়েছিলাম। 


- কি হলো? আসবেন?  (সারা)


-তেমন কড়াকড়ি লকডাউন তে দেয়নি। আমি একসময় আপনার থেকে নিয়ে নেবো৷ আপাতত মানিব্যাগে তেমন টাকাও নেই। তেমন দরকারও নেই। তাই যখন খুশি নেয়া যাবে। (প্রেম)


-বাব্বাহ। এত বিজি আপনি? এইযে আপনাকে মানিব্যাগ ফেরৎ দিয়ে একটা মহৎ কাজ করতে চাইলাম। এর জন্য একটু ট্রিট দিতেও তো পারেন। অথচ কেমন গম্ভীরভাবে চলাফেরা করেন। আপনি কি সবসময় এরকম? (সারা)


প্রেম হালকা হাসলো৷ ক্লান্ত কন্ঠে বললো, 


- তেমন বিজি না। আচ্ছা আপনি বলুন কি ট্রিট চান? (প্রেম)


- আপনার কন্ঠটা অসাধারণ। আমাকে আরেকটা বিকেল আপনার সাথে নিন। নদীর কিনারে বসে দুটো গান শোনান৷ এটাই চাচ্ছি। (সারা)


-আপনি না আমায় সহ্য করতে পারেন না? তাহলে আমার উপস্থিতি চাইছেন যে৷ (প্রেম)


- আপনি কি ইনডিরেক্টলি আমায় ছ্যাঁচড়া ভাবছেন? শুনুন। আপনি যা ভাবছেন। ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। আমি জাস্ট আপনার গান শুনতে চেয়েছি। দ্যাটস ইট। (সারা)


প্রেম হাসলো৷ ফোনটা কেটে দিয়ে বইয়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। মেয়েদের মন পড়া কঠিন, তার থেকে সামনের বইটা মুখস্থ করা অনেকটাই সোজা। 


🌦️


মাঝরাত পর্যন্ত জেগে থাকা আমার সচারাচর অভ্যাস। কিন্তু  আজ অন্য কোনো অদ্ভুত কারণে চোখে ঘুম আসছে না । শতচেষ্টা করেও দুচোখের পাতা এক করতে পারছি না। বারবার মনে পড়ছে সেই ডেয়ারের কথা। কি উদ্ভব একটা ডেয়ার দিয়েছিলেন উনি৷ সেটা আবার আমাকে ডান করতেও হয়েছে৷ আন্টির সামনে গিয়ে চোখ বন্ধ করে গড়গড় করে সব বলে দিয়েছি। আন্টিতো সব শোনার পর শক। পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছি তিনি তার ছেলেকে বিয়ে দিবেন। বিয়ে দিবেন সেটা অতিশীঘ্রই, তাও পুলকভাইয়ের সাথে একসাথে বিয়ে দিবেন। তখনকার মহুর্তটা ভাবলেও আমার হাসিতে পেট ফেটে যাচ্ছে । 


তখন,


আমি রান্নাঘরের দেয়ালের পাশ থেকে আন্টির রান্না মনোযোগ সহকারে দেখছি। পেছনে প্রহরভাই বারবার ওখানে গিয়ে ডেয়ার ডান করার জন্য তারা দিচ্ছে। আর আমার বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে যাচ্ছে। আমি মনে মনে একবার দোয়া দরূদ যা পাই পরে নিলাম। আন্টি যেনো বিষয়টা আবার নেগেটিভলি না নেয়। ওখানে গিয়ে যা বলবো তা মনে মনে সেট করে নিলাম। অতঃপর সাতপাঁচ না ভেবে সামনে এগিয়ে গেলাম। 


- আম্মি, আপনার কাছে নাকি প্রহরভাইয়ের দেয়া একটা নীল শাড়ি আছে। ওটা আমাকে পড়িয়ে দিন তো। (আমি)


আমি চোখ বন্ধ করে হরহর করে সবটা বলে দিলাম। আন্টি যেনো বিষয়টা মজা হিসেবেই নেয়, সেটাই প্রত্যাশা করতে থাকলাম। কিন্তু ঘটনা ঘটলো অন্যকিছু। তিনি স্বহাস্য কন্ঠে  প্রহরভাইকে উচ্চশব্দে ডাকতে থাকলেন। আমি হতভম্ব দৃষ্টিতে উনার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। 


- বাবু, এই বাবু। (আন্টি)


প্রহরভাই ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে আন্টির সামনে এসে বললেন,


- কি হয়েছে আম্মু। রশ্নি এখানে কেনো? (প্রহর)


প্রহরভাইয়ের কথায় হা হয়ে গেলাম আমি। উনি তো দেখি সেই অভিনয় করতে পারেন। আমি দাঁতে দাঁত চেপে সবটা সহ্য করতে না পেরে বললাম,


- এটা ডেয়ার ছিলো আন্টি। আপনার এই অধম ছেলেটা আমায় এরকম উদ্ভদ ডেয়ার দিছিলো। (আমি)


- না না আম্মু। তুমি যা ভাবছো তা সম্পূর্ণ ভুল। তুমি যে আমার ছেলেকে পছন্দ করো তা সিওর হয়ে নিলাম। আমি আগে থেকেই চিন্তা করে এসেছি তোমার আর বাবুর বিয়েটা দেবো। কিন্তু তোমাদের সাপে নেউলে সম্পর্কে বিষয়টা তলানিতে পরে গিয়েছিলো। (আন্টি)


আন্টির কথার মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে না পেরে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। প্রহরভাই ভাব মেরে বললেন,


- অসম্ভব! এই মেয়েকে বিয়ে করা অসম্ভব। যাকে আমি দুচোখে সহ্য করতে পারি না। তাকে বিয়ে করবো সেটা ভাবলে কি করে। তোমার আরো কাজের লোক লাগবে আগে বলবে তো। যদিও রশ্নি কাজের মেয়ে হিসেবে পার্ফেক্ট। তবুও ওর তো একটা মানসম্মান আছে। (প্রহর)


-চুপ! তুই চুপ যা। রশ্নির মায়েরও একই ইচ্ছা। বাড়ির সকলের মতামত হয়ে গেছে। তোদের আবার কিসের মতামত। কি হবে আমি জানি না, আমার মেয়ে চাই, সেটা রশ্নিকেই চাই। আমার বাড়িতে একটা পাগলাটে মেয়ে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াবে সেই সুযোগটা পেয়েও হাতছাড়া করবো তুই ভাবলি কিভাবে? 


আমি মা-ছেলের কান্ডে হতবাক, বাকরুদ্ধ হয়ে মুর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। প্রহরভাই অতি চালাকি চাল চেলেছে সেটা ভালোয় বুঝতে পারছি। উনার মস্তিষ্কে যে সবসময় শয়তানি বুদ্ধি ঘুরে এটা আরো একবার প্রমাণিত হলো। উনি যখন সেখান থেকে নিজের রুমে আসলেন। তখন আমি ওনাকে চেপে ধরে সব কথা বের করবো ভেবে নিলাম। ওনার রুমের ভীতর উইথআউট পারমিশনে ঢুকে গেলাম। দেখলাম উনি লালালালা গান গাইতে গাইতে ফোন টিপছেন। আমাকে দেখেই উনি ভিলেনমার্কা হাসি দিলেন। 


- আমাকে তখন  কি বললেন? কাজের মেয়ে? আমাকে কোন এঙ্গেলে আপনার কাজের মেয়ে মনে হয় বলেন তো। আর আপনারা মা-ছেলে কি করলেন ওখানে?  তা আমার মাথার ১৪ কিমি উপর দিয়ে চলে গেলো।  আপনাকে সব উত্তর দিতে হবে। (আমি)


প্রহর ভাই তার ফোন চাপা অফ করে আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,


- কি আর হবে? তোর আমার বিয়ে হবে। বুঝিস নি? (প্রহর)


-মানেএএএএ? আপনার মতো খাটাশ মানুষকে বিয়ে করবো ভাবলেন কি করে? (আমি)

 

প্রহরভাই তার মনমাতানো হাসিটা দিয়ে বললেন,


- তাহলে কি সোনিয়াকে বিয়ে করবো? আমার মনে হয় সে আমার জন্য পার্ফেক্ট। কি বলিস? 


-হ্যাঁ করেন। আবার কিছুক্ষণ থেমে বললাম, না, সোনিয়াকে বাদ দিয়ে সবাইকে করেন। (আমি)


- তাহলে তোকে বিয়ে করি। তুই আমাকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়েছিস। তার সব হিসেব তুলবো, বিয়েটা আগে হয়ে যাক। আমি আগে থেকে জানতাম আমার আর তোর বিয়ের প্লানিং হচ্ছে। নেহাত তোর আর আমার এমন সম্পর্কে তাঁদের মনে ভয় জেঁকে যায় যে আমাদের বিয়েটা আদৌ হবে কি না। আমি আম্মুর সাথে বাজি নিয়ে বললাম, "যদি দুদিনের ভীতর রশ্নি তোমাকে আম্মি ডাকে, তাহলে বুঝবা যে বিয়েটা হচ্ছে। আর যদি না ডাকে তাহলে হবে না। "এই কথা শোনার পর তো আম্মু তোর মুখ থেকে আম্মি ডাক শোনার জন্য নানা চিন্তা ভাবনা করছে।  কিন্তু তার পরদিনেই যে এমন সারপ্রাইজ পাবে। ভাবতে পারেনি আমম্মু। আম্মুতো এখনো আসল সত্যিটা জানেই না। এখন দেখ, আম্মু তোদের বাসায় গিয়ে খবরটা পৌঁছে দিয়েও ফেলেছে। "


দুপুরের কথাগুলো ভাবতেই হাসিতে পেট ফেটে যাচ্ছে আমার। প্রহর ভাই নাকি আমাকে বিয়ে করবে? এটা ভাবা যায়! আমার হঠাৎ মনে পরলো। প্রহরভাইয়ের দেয়া চিঠিটা খুলে দেখা হয়নি। এখন প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। থাক! কালকে দেখবো। 



ব্যাস্ততার মাঝেও প্রেম তাঁর বন্ধুদের নিয়ে পুরো হিরোদের স্টাইলে সারার সাথে দেখা করতে এলো। অযথাই এখানে আসা। প্রেমের মোটেও এই মানিব্যাগের প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট নেই যে তাঁর জন্য একটা মেয়ের সাথে দেখা করবে। প্রেম যখন পার্কে পৌঁছালো তখন সদ্য বিকেল। ফাল্গুনের শুরুর দিবস হলেও হালকা ঠান্ডা আর গরমের মিশ্রণ আবহাওয়ায়। আবহাওয়াটা মোটেও পছন্দ হলো না প্রেমের। কেমন জানি বিষণ্ণতা এই ফাল্গুনীর৷ বোধহয় ভাষার মাসে তাঁদেরও মন খারাপের জোয়ার এসেছে। প্রেমের পেছনে তিনটা বাইক। তিনটা বাইক দখল করে আছে তিন মানব। আবীর, রাফি আর সাব্বির। তিনজনই প্রেমের বন্ধু। প্রেম কোনো মেয়ের সাথে প্রথমবারের মতো দেখা করতে যাচ্ছে, শুরুতে বিষয়টা কেউ এতো গুরুত্ব সহকারে দেখেনি। কখনো বিশ্বাস করবে বলেও ভাবেনি। যে ছেলে স্বেচ্ছায় কোনো মেয়ের সাথে কথা বলেনা। সে নাকি কোনো মেয়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে বিষয়টা কেউ শুরুতে বিশ্বাস করেনি। যখন বুঝতে পারলো সিরিয়াস। তখন সবাই তাঁদের সেম ড্রেস আর বাইক নিয়ে প্রেমের পিছু ধরলো। প্রেম তাঁদের কান্ডে হতাশ। পার্কে এসে যখন সবাই একসাথে নামলো, তখন প্রেম ছিলো সবার সামনে। মনে হলো এই পার্কে কোনো হিরো তাঁর ইন্ট্রো দিচ্ছে। পার্কের সব প্রেমিকযুগল হা করে তাকিয়ে রইলো এই কিশোর গ্যাংয়ের দিকে। প্রেমকে শুরুতে  এমনভাবে দেখায় হকচকিয়ে গেলো সারা। এই প্রথম ভয়াভয়ভাবে কোনো ছেলের প্রতি ক্রাশ খেলো । প্রেম সারার সামনে এসে তার এ্যাপলওয়াচের দিকে একপলক তাকিয়ে বললো, 


- ঠিকসময়ে এসেছি মনে হচ্ছে। দিন, আমার মানিব্যাগটা দিন। (প্রেম)


সারা এখনো ধ্যানে বিভোর। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা কি সেই অগাছো প্রেম? যাকে সে এতদিন বিরক্তি চাহনিতে দেখে এসেছে। প্রেম তার জবাব না পেয়ে আবার বললো,


- কি হলো? দিন। (প্রেম)


-আপনার কথা ছিলো আমাকে নিয়ে নদীর পারে গান শোনাবেন৷ কিন্তু পেছনে তো দেখছি পুরো সেনাবাহিনী নিয়ে এসেছেন। কি ব্যাপার? এলাকাটা বোধহয় আপনার। (সারা)


প্রেম তাঁর ব্লাক রোদচশমাটা খুললো। সারাকে একবার দেখে নিলো ভালো করে৷ একটা বাসন্তী শাড়ি পড়েছে, খোঁপায় ফুল৷ ঠিক কি ফুল বুঝতে পারলো না প্রেম। মুখে কোনো কৃত্রিম প্রসাধনী নেই। বাহ! ভেরী ইন্টারেস্টিং। প্রেম হালকা হেসে বললো,


- ওরা সেনাবাহিনী না। ওরা আমার বডিগার্ড। আমার সবরকম আপদে বিপদে তাঁরা সদা প্রস্তুত। (প্রেম)


প্রেমের কথায় ক্ষেপে গেলো পেছনের তিনবন্ধু। সাব্বির বিরক্ত কন্ঠে বললো, 


- বডিগার্ড কিনা পরে বুঝাবো তোকে। এই পাবলিক প্লেসে কিছু বললাম না। (সাব্বির)


সারা হেসে বললো, 


- আপনারা চলে যান ভাইয়া। আপনার বন্ধুর কোনো ক্ষতি করবো না আমি। (সারা)


বলেই হাসিতে ফেটে পড়লো সারা। প্রেম চোখের ইশারায় তার প্রিয় গিটারটা দিতে বললো আবীরকে। আবীর বিরক্ত হাতে প্রেমকে গিটার দিলো। কেনো যে তারা এখানে এসেছে। অযথায় সময় নষ্ট। অবশ্য প্রেমের কাছাকাছি থাকাটা খুবই দরকার। বিপদ তো আর বলে কয়ে আসে না। প্রেম বললো,


- তোরা যা। আমি উনাকে নদী ঘুরিয়ে আনি৷ (প্রেম)


প্রেমের সব বন্ধুরা সেখান থেকে চলে গেলো৷ ঠিক চলে যাওয়া নয়৷ কাছাকাছাই থাকবে তাঁরা। প্রেম আবার বললো,


-আজ নির্দিধায় বাইকে উঠতে পারেন। আপনাকে আবার মনে করিয়ে দিতে চাই যে আমি আপনার ভাইয়ের মতো না। (প্রেম)


কথাটা বলেই মুচকি হাসলো প্রেম। সারার কথাটা শোনামাত্র মন খারাপ হয়ে গেলো৷ তার নিজের ভাইয়ের জন্য এত অপমান সহ্য করতে হয়। সারা বাইকে উঠে বললো,


- সেদিন বুঝলেন কি করে আমার বিপদ হয়েছে? (সারা)

- আমার কাছে একটা জাদুর আংটি আছে। ওখানে আমি সব দেখতে পারি। (প্রেম)

-আহ! বলেন না। (সারা)

- তেমন কিছু না। আমার সাথে যে বন্ধুগুলা দেখলেন। ওরা সবসময় আমার সাথে থাকে। আর আপনার ভাইকে পিটানোর জন্য ওরাই ধরে এনেছে। আবার সত্যি সত্যি ভাববেন না ওরা আমার বডিগার্ড। ওরা হারামী। ওদের ছাড়া আমি অসহায়। এইযে বললাম ওদের চলে যেতে? কিন্তু ওরা যায়নি৷ আশেপাশেই আছে৷ (প্রেম)

-ওহহ৷ আপনি কোন ক্লাসে পড়েন? (সারা)

- এসএসসি পরীক্ষার্থী। আপনি? (প্রেম)

-কি বলেন? আপনাকে দেখে তো মনে হয় আপনি কলেজে। বাই দ্য ওয়ে, আমরা কিন্তু সেম ব্যাচ। তুমি করে বলতে পারেন। (সারা)


প্রেম হাসলো। মেয়েদের মন পড়ে ফেলার এই অদ্ভুত ক্ষমতাটা কিভাবে আয়ত্ত্ব করলো জানে না সে। তবে ভালোই লাগছে। অদ্ভুত আনন্দ। 


🌦️


আস্তে আস্তে কেটে গেলো একদিন, এক সপ্তাহ, এক মাস। সময় বহমান, তাকে থামানো যেমন যায়না। তাকে খুব গতিতে চলে যেতেও বলা যায় না। সে ভীষণ জেদী। নিজের খেয়ালখুশি মতো চলে। একমাস হতে চললো কিন্তু প্রহরভাই লাপাত্তা। সেদিন দুপুরে ঐ যে দেখা হলো। তারপর আর কোনো খবর নেই তাঁর। প্রথম দুয়েকদিন তাঁকে ছাড়া ভালোথাকলেও হঠাৎ মনে হলো আমি ভীষণ একা। এই একাকিত্ব মিটাতে পারে শুধু একজন মানুষ। তিনি প্রহর ভাই। যাকে আমি দুচক্ষে সহ্য করতে পারি না। এই অসহ্যকার মানুষটাই যেনো আমার দুচোখের তৃষ্ণা হয়ে গেলো৷ যাকে ছাড়া রশ্নি নামক মানবী শুন্য পাতালে একাকিত্বে ভোগে। আমি সারাটাদিন, সারাটারাত উনার অপেক্ষায় প্রহর গুনি।  উনার দেয়া নীল শাড়িটা আজ পরেছি। শাড়িটা পড়েই এক আলাদা অনুভূতি হলো। শাড়িটা অনেক সুন্দর। সুন্দর বললে ভুল হবে। অতি সুন্দর। উনার দেয়া চিঠিটাও বের করলাম। চিঠিটা মাঝে মাঝেই বের করা হয়। প্রহরভাই কোথায় চলে যাবার পর এই চিঠিটা পড়া ছাড়া যেনো আমার কোনো কাজ থাকে না। চিঠিটা আবার খুললাম পড়ার জন্য। আবারো তীব্র কোনো অনুভুতিতে চোখ মুখ কুঁচকে গেলো। 


প্রিয় রশ্নি, 

প্রেমের চিঠি কখনো লেখা হয়নি। জীবনে প্রথম তোমাকে লিখতে বসে অনুভব করলাম। এই চিঠি লেখার থেকে ফিজিক্সের ল মুখস্ত করা সহজ। আমি ইউটিউবে সার্চ করলাম। তারা কত শত উপায় দেখালো। অনেকের থাম্বনেইল দেখলাম "দুমিটেই প্রেমের চিঠি লিখে প্রেমিকাকে পটিয়ে ফেলুন। " যা দেখার পর ইউটিবের হেল্প নেবার শখ মিটে গেছে আমার। তুই বলে সম্মোধন না করায় অবাক হলে বুঝি? অবাক হওয়া ভালো। মাঝে মাঝে অবাক নাহলে এই জীবনে বেঁচে থাকার ইচ্ছা থাকে না৷ সবকিছু অসহ্যকর লাগে। তোমার সাথে আমার চিঠির সম্পর্ক হবে তুমিময়। তোমাকে আমার তুমি বলে ডাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বলার আগেই জেনো কোনো জড়তা কাজ করে। এটা কেনো হয় বলতে পারো? তোমার আর আমার পরিবারে প্রহর নাম এলেই যেনো সবজান্তা, সাহসী ছেলের টাইটেল উঠে আসে। কিন্তু তাঁরা কি জানে? তাদের গুনধর ছেলেটা রশ্নি নামক মানবীকে তুমি বলে ডাকার সাহস রাখে না। 

তোমাকে নিজের করে নেয়ার প্রয়াস চালাচ্ছি। আমার পরিশ্রমে তুমি সবসময় উজ্জ্ব কিন্তু দিপ্তীমান। অমুল্য।  সেদিন তোমাকে শাড়িতে দেখার পর যে অনুভুতিটা হয়েছিলো, তা বলে হয়তো বুঝানো যাবে না। তবে মনে রেখো। তুমি খুব শীঘ্রই আমার হতে চলেছো। শুধুই আমার। আল্লাহ হাফেজ। 

ইতি 

তোমার অসহ্য মানব (প্রহর)


চিঠিটা পড়ার পর আমার মন খুশিতে বাকুম বাকুম করলো। ঠিক যেমনটা হয়েছিলো আজ থেকে একমাস আগে। নাহহ! এবার সকল লাজলজ্জা কাটিয়ে প্রহরভাইকে কল করতেই হবে৷ উনিই বা কেমন মানুষ? একটা কল করতে পারে না। ভালোই তো চিঠি লিখে হারিয়ে গেলো৷ এবার দেখা হলে কথাই বলবো না। আমি উনার নাম্বার তুলে কল লাগালাম৷ কল করার সাথে সাথেই রিসিভ করলেন উনি৷ 


- আসসালামু আলাইকুম প্রহরভাই। (আমি)


-ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কে বলছেন? (প্রহর)


-আমি রশ্নি। আমার নাম্বার সেভ রাখেননি? ( আমি)


-ওহহ তুই। তা ফোন করলি কেনো? (প্রহর)


আমি উনার এমন ব্যাবহারে হকচকিয়ে গেলাম। মহুর্তেই আমার হাসিমুখটা হাওয়া হীন বেলুনের মতো চুপসে গেলো। মানুষটা একমাস থেকে আমার খোঁজ নেয়নি। মানলাম নেয়নি। আজ আমি নিজেই ফোন করলাম। অথচ এমন ভাব করছে যেনো কিছুই জানে না। রশ্নিহীন তার পৃথিবীটা আগেরমতোই রঙ্গিন। আমি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললাম,


- আপনি কোথায় প্রহরভাই? আপনাকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। (আমি)


নিজের সব লজ্জাসংকোচ বিসর্জন দিতে বাধ্য হলাম। তাও আবার এই মানুষটার জন্য। প্রহরভাই ডন্টকেয়ার ভাব নিয়ে বললো, 


-আমি আবার কোথায় থাকবো? আমি আমার বাসায় আছি। আর আমাকে দেখার কি আছে? আচ্ছা তোদের মেইনগেটের সামনে আয়। আমি দাঁড়িয়ে আছি। জাস্ট দুমিনিটের মধ্যে আসবি বলে দিলাম। (প্রহর)


মানুষটার কাছে আমি কতটা মূল্যহীন তা এই প্রথম উপলব্ধি করলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম এই মানুষটার সাথে আর কখনো কথা বলবো না। রাগ করে বসে থাকলাম মিনিটখানেক। কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত বেশীক্ষণ অটল থাকলো না। সেই অসহ্যকর মানুষটাকে একপলক দেখার জন্য আমার বেহায়া মন অস্থির ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো। আম্মিকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলাম মেইনগেটে৷ রহিম চাচা লাঠিতে ভর দিয়ে ঘুমুচ্ছে। উনি আমাদের গেটম্যান। উনাকে আর ডিস্টার্ব করলাম না৷ সাবধানে গেট খুলে দেখলাম গেটের সামনে দাঁড়াতেই দেখলাম পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে এক ক্লান্ত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই একটা ভ্যাবলা মার্কা হাসি দিলো প্রহরভাই। 


- সিলেট গিয়েছিলাম একমাসের প্রোগ্রাম করতে। আর চাকরির পিছনেও একটু ছুটতে হয়েছে। একটু বললে ভুল হবে। ভালো একটা চাকরি পাওয়া ভীষণ টাফ রশ্নি। (প্রহর)


আমি ভেবেই পেলাম না মানুষটা মিথ্যা বললো কেনো আমাকে। উনি যে এতটা পথ জার্নি করার পর এখনো বাসায় ফিরেনি, তার আগেই আমার সাথে দেখা করতে এসেছে তা ভালো ভাবেই অনুমান করতে পারলাম। কিন্তু এসেই পড়ালেখা নিয়ে লেকচার দেয়া শুরু করলো। অসহ্য! 

আমার মন খারাপ যেনো তীব্র থেকে তীব্রতর হলো। 


-আপনি আমাকে মিথ্যা কেনো বললেন প্রহরভাই? (আমি)


উনি আমাকে পাত্তাই দিলেন না। পকেট থেকে একটা লাল গোলাপ বের করে বললেন,


- সিলেট থেকে তোর জন্য এনেছি। ব্যাগে করে আনছি তাই শুকিয়ে ঝরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। দাম নিয়েছে ২০ টাকা। ভাবা যায়? এটা ডাকাতী বৈ আর কিছু নয়। দেশের অধপতন বুঝতে পারছিস তুই রশ্নি? (প্রহর)


আমি কোনো জবাব দিলাম না৷ উনার শরীরের দিকে তাকিয়ে মায়া হলো। একমাসে যেনো শুকিয়ে গেছে অনেকটা। দাঁড়ি গুলো কাটেনি তাই অগোছালো আর বড় লাগছে। চুলগুলোও অগোছালো। আমি নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। চোখ দিয়ে এতক্ষণের জমে থাকা পানিগুলো কপোল বেয়ে পরতে লাগলো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুঠাম দেহের মানুষটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। শুষ্ক কন্ঠে বললাম,


- আপনি খুবই খারাপ প্রহরভাই। একটাবার আমাকে কল করেননি। একটা কল করে জানালে কি এমন ক্ষতি হতো? আমাকে এমন মানসিক কষ্টে রাখার অধিকার কে দিয়েছে আপনাকে? (আমি)


- তোর সাহস দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে রশ্নি। এখন তুই তোর বাড়ির সামনে। আর আমার ক্লান্ত শরীর, সবকিছু ধুলোয় মাখামাখি। এমন নোংরা অবস্থায় কেউ জড়িয়ে ধরে? 



চলবে?

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url