শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ০৬

 

শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ০৬

শুধু তুই

লেখকঃ রিফাত আমিন

পর্বঃ ০৬


-তোর সাহস দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে রশ্নি। এখন তুই তোর বাড়ির সামনে। আর আমার ক্লান্ত শরীর, সবকিছু ধুলোয় মাখামাখি। এমন নোংরা অবস্থায় কেউ জড়িয়ে ধরে? (প্রহর)


প্রহর ভাইয়ের কথায় ওনার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম। লজ্জায় মাথাটা নোয়ানো, উঠানোর সাহসটুকু পাচ্ছি না। প্রহরভাই আবার তার শুকনো গোলাপটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, 


- রুমের ভীতর চলে যা। 


আবার আমার দিকে ক্ষণকাল তাকিয়ে বললেন, 


- বাব্বাহ, শাড়িটা পরেছিস তাহলে। তোকে  অনেক সুন্দর লাগছে তো। প্রশংসা করেছি বলে আহ্লাদে ভেসে যাস না আবার। শাড়িটা আমার পছন্দের বলেই প্রশংসা করলাম। নাহলে তোর মতো পেত্নিকে কখনো সুন্দর লাগে? এই খুশিতে একটা থ্যাংকস আমাকে দিতেই পারিস। (প্রহর)


আমি নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে ওনার দিকে তাকালাম। এই মহুর্তে ঝগড়া করার একদম মুড নেই। তাছাড়া ওনার রেস্ট দরকার। সিলেট থেকে এসে নিজের বাসায় না ঢুকে আমাকে একপলক দেখার জন্য গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এটাই বা কম কি? এই কাজটার জন্যই গত একমাস আমার সাথে যোগাযোগ না করার শাস্তিটা মৌকুফ করে দিলাম৷ একদিকে অদ্ভুত আনন্দে মন ছুঁয়ে যাচ্ছে, আরেকদিকে ওনার শরীরের দিকে তাকিয়ে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমি স্বল্পস্বরে মাথা নোয়ানো অবস্থায় বললাম, 


- আপনি বাসায় চলে যান প্রহরভাই। ফ্রেস হয়ে, খাওয়া-দাওয়া করে ফোন দিয়েন। (আমি)


- ব্যালেন্স নাই। তোর মতো বড়লোক না আমি। (প্রহর)


ওনার এই পাগলামোগুলো অসহ্য লাগছে। সোজা কথা সোজা ভাবে নিতে পারেনা। যতক্ষণ না আমি ক্ষেপছি, ততক্ষণ চলতেই থাকবে। আমি যথাসম্ভব ধৈর্য ধারণ করে বললাম, 


- থাক, আপনাকে ফোন করতে হবে না। আমি নিজেই করবো। (আমি)


- বাহ! আঙ্কেলের টাকা চুরি করে এখন বড়লোক সাজা হচ্ছে  তাইনা? (প্রহর)


- আমি মোটেও চোর নই প্রহরভাই। বাবাকে বললেই টাকা রিচার্জ করে দেয়। আপনি বিশ্বাস না করলে আমার করার কিছুই নেই। থাকেন, আমি চললাম। (আমি)


কপট রাগের সুরে কথাটা বলেই চলে যেতে ধরলাম। গেটের ভীতর পা ঢুকাবো, তার আগেই আমার বাঁ হাতটা টেনে ধরলো কেউ। হেচকা কানে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলেন উনি। আমি লম্বায় ওনার বক্ষ সমান। উত্তপ্ত শরীরের মাঝ থেকে উনার মুখশ্রী দেখার চেষ্টা করলাম। প্রধান ফটকের সামনে, ল্যাম্পপোস্টের মসৃণ আলোয় অদ্ভুত মায়াবী ঠেকলো তার সৌন্দর্য। সাথে অনুভব করলাম ভীষণ জ্বর তার। এই জ্বরের শরীরে এখনো বাসায় ঢোকেনি। আমি নিজেকে ছাড়ানোর জোর চেষ্টা লাগালাম। এই জেদী মানুষটার প্রতি রাগ হলো। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম,


- আপনার গায়ে ভীষণ জ্বর প্রহরভাই। নিজের খেয়াল রাখতে পারেন না! তারাতারি বাসায় যান প্লিজ৷ (আমি)


- তুই আমার মেডিসিন হয়ে যা সুন্দরী। (প্রহর)


আমি আর কথা বললাম না। উত্তপ্ত হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলাম ওনার বাসার সামনে। মনে হচ্ছে কোনো শক্তি নেই শরীরে। আমি বাসার সামনে ওনাকে দাঁড় করিয়েই নিজের বাসার দিকে দ্রুতপায়ে হাঁটতে লাগলাম। ত্রিশ সেকেন্ডের পথ মাত্র। 


----🌦️


রাত দশটা বাজতে চললো। প্রেম এখনো বাসায় ফিরেনি। সাব্বিরকে সাথে নিয়ে ওর বাসায় ল্যাপটপের কিবোর্ডে দ্রুত হাত চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু ইনফরমেশন দরকার সোনিয়ার সম্পর্কে আর ওর বাবার। ওর বাবার বিষয়টা এতটা জরুরী না। কিন্তু এই সোনিয়া নামের মেয়েটা কেনো প্রহরভাইয়ের পেছনে পরে আছে সেটাই বুঝতে পারছে না প্রেম। সোনিয়ার সাথে একবার দেখা হয়েছিলো প্রেমের। প্রেম মানুষ চিনতে পারে। মেয়েদেরকে একটু বেশীই। ওর সামনে কোনো মেয়ে মিথ্যা বলার সাহস দেখাতে পারবে না। সোনিয়াকে একপলক দেখেই প্রেম বুঝতে পেরেছিলো মেয়েটা অদ্ভুত। সুন্দরী বটে। তবে সুন্দরী মেয়েদের বাইরে থেকে মনের সৌন্দর্য বোঝা কঠিন। প্রেম সাব্বিরের কাঁধে হাত দিয়ে ওর কাজ দেখছে। লোকেশন ট্রেকিং চলছে। এই মহুর্তে সোনিয়া ঠিক কোন যায়গায় সেটা খোঁজার চেষ্টা চলছে। প্রেম বিরক্ত হয়ে বললো,


-আমায় বাসা ফিরতে হবে। তারাতারি কর। (প্রেম)


-তারাতারি বললেই আর হয় না। সময় লাগবে তো নাকি? আমি কি এখানে লিগ্যাল কাজ করছি? অবৈধ কাজ করতে গেলে ধৈর্য লাগে। (সাব্বির)


-হ কর। বাসায় টেক্সট পাঠিয়ে দিচ্ছি আজ ফিরবো না। যদিও আজ ভাইয়া আসার কথা। আসছে কি না কে জানে? (প্রেম)


- হুমম পাঠিয়ে দে। তোর ভাইয়ের সামনে আমায় কখনো নিয়ে যাস প্লিজ। ভয় লাগে প্রচুর। (সাব্বির)


প্রেম মুচকি হেসে বললো, 


- ভাইয়াকে চিনলি না তুই। হা-হা-হা (প্রেম)


ঠিক তখনি সাব্বিরের কাজ সমাপ্ত হলো৷ পিসির স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করলো 'সাকসেকফুল' শব্দটা। সোনিয়ার লোকেশন দেখালো বারের মধ্যে। প্রেমের ঠোঁটে ফুটে উঠলো তৃপ্তির হাসি৷ ঠিক সেটাই ভেবেছিলো, যেটা স্ক্রিনে দেখাচ্ছে। প্রেম বিছানা থেকে কালো জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে বললো, 


- জেগে থাকিস। আমি একটু লেট করে ফিরবো। আর আন্টি যেনো কিছু টের না পায়। (প্রেম)


সাব্বির হতাশ স্বরে বললো, 


- আমি যাই সাথে? (সাব্বির) 


- আমি ওখানে এমন কিছুই করবো না যেখানে তোদের প্রয়োজন। আর লাইফে প্রথম বারে ঢুকবো। অনুভূতিটা নিখুঁতভাবে শুষে নিতে চাই। চিল। (প্রেম)


সাব্বিরের ইচ্ছে হলো আরেকবার জোর করতে। কিন্তু প্রেম ও তার ভাই প্রহর দুজনেই সবসময় নিজের সিদ্ধান্তে অটল। একমুহূর্তের জন্যও পিছু হটে না। প্রেম বাইক চালিয়ে দ্রুত বারের দিকে রওনা দিলো। এখান থেকে ১০ মিনিটের পথ। জ্যাম থাকলে আগামী ১ ঘন্টায় পৌঁছানো যাবে কি না সন্দেহ। তাঁর আগে বাসায় কথা বলে নিলো। প্রেমের আম্মু কখনো এসব পছন্দ করেনা। ছেলের অধঃপতনের সব দোষ প্রহরের উপর চাপিয়ে দেয়। 

প্রেম যখন বারে পৌঁছালো, তখন রাত ১০ টা বেজে ৩৭। তেমন রাত হয়নি৷ তবে রাতে অযথা বাইরে থাকা কখনো পছন্দ করে না সে। প্রেম বাইক থেকে নেমেই দেখলো রাফি ঢ্যাংঢ্যাং করে তার সামনে বসে ফোন টিপছে। প্রেম মহাবিরক্ত হলো, 


- যার কথায় এসেছিস। তাকে বলে দে এত টেনশন করতে হবে না। আর তুই বাসায় চলে যা। রাত হয়েছে অনেক। পরীক্ষায় সব তো আমার দেখে লেখার ধান্দায় থাকিস। (প্রেম) 


রাফির মুখটা মহুর্তেই চুপসে গেলো। পড়ালেখায় সে একটু কাঁচা। সবসময় প্রেমের সাপোর্টে ভালো রেজাল্ট করে । তাই বলে এত অপমান৷ 

প্রেম বাইক স্টান্ড করে রাফিকে পাত্তা না দিয়ে ভীতরে ঢুকে গেলো। বিভিন্ন আলোকসজ্জায় সজ্জিত বারের চারপাশ। এখানে সবাই এডাল্ট। শুধু প্রেম ছাড়া। তবে তাকে দেখে কখনো ছোট মনে হবে না। বয়স কম হলেও প্রহরের থেকে একটু বেশীই লম্বা আর সুঠাম দেহের অধিকারী সে। প্রেম চারপাশের ভীরে সোনিয়াকে খোঁজার চেষ্টা চালালো। সোনিয়াকে পাশ্চাত্য পোষাকে যখন ড্রিংক করতে দেখা গেলো। তখন তার সামনে গিয়ে ধপাস করে বসে পড়লো প্রেম। মুখ থেকে কালো মাস্কটা খুলে বললো,


- লেট মি ট্রাই ডিয়ার। (প্রেম)


---------🌦️


রাতে ঘুমুতে গিয়ে এপাশ ওপাশ করছি শুধু। কিছুতেই ঘুম আসছে না। বারবার ইচ্ছে করছে প্রহরভাইকে ফোন করতে৷ কিন্তু ফোন করলেই অপমান করবে জানি৷ আমায় অপমান করে তাঁর কি শান্তি বুঝি না। ঠিক তখনি ফোন বাজলো আমার। তড়িৎ বেগে ফোনটা তুলে দেখলাম প্রহরভাই ফোন করেছে। মনে মহুর্তেই রঙ্গিন প্রজাপতি উড়াল দিলো। ফোনটা রিসিভ করে বললাম,


- কি করছেন? (আমি)


- আমি কি করছি সেটা তোকে জানতে হবে? একটা দরকারে ফোন করেছিলাম। (প্রহর)


আমার হাসিখুশি ভাবটা মহুর্তেই হারিয়ে গেলো। মানুষ শুধু দরকারেই খোঁজ রাখে। এইযে স্নেহা মাঝে মাঝে ফোন করে। তাও শুধু প্রহরভাইয়ের খোঁজ নেয়ার জন্য। সবাই স্বার্থপর। আমি স্বাভাবিক স্বরে বললাম,


- কি দরকার? (আমি)


- প্রেম যে আজ বাসায় ফিরবে না। এই বিষয়ে তোকে কিছু জানিয়েছে? (প্রহর)


- না তো। কেনো? ও এখন কোথায়? (আমি)


- বললো তো ওর বন্ধুর বাসায়। তবে ওকে আমি ভালো করে চিনি। কোনো ঘাপলা তো নিশ্চই আছে। (প্রহর)


- আমি ফোন করবো পরে। আপনার জ্বর কমেছে? (আমি)


- জ্বরের ইচ্ছে হলে যাবে, নাহলে যাবে না। তাতে আমার যায় আসে না কিছু। ওকে? আচ্ছা থাক। আমার ব্যালেন্স ফুরিয়ে যাচ্ছে।  (প্রহর)


প্রহরভাই ফোন কেটে দিলেন৷ আমার খারাপ লাগলো অনেক। একটু কথা বলতেও এত বিরক্তি উনার। কখন কি হয় বুঝি না আমি। একবার রোমান্টিক তো একবার কঠোর৷ তাঁর ভাইটাও হয়েছে তেমন৷ একবার হিমু হয় তো একবার মিসির আলি। এদের ঠিক বুঝি না আমি। ঠিক তখনি আমার ফোনে মেসেজ এলো। '' belknir drja khl, Ami driye asi! " সাথে সাথেই মনটা ফুরফুরে হলো৷ আবার ভয় হলো এই ভেবে যে, রাত এখন এগারোটা। এই রাতে ওনার আগমনটা ঠিক মানায় না। তবুও কাঁপা কাঁপা হাতে দরজাটা খুললাম আমি৷ দরজা খোলার সাথে সাথেই চমকে উঠলাম। দরজার সামনে একটা কিউট টেডি। তার সামনে মরিচা বাতি দিয়ে বেলকনির গ্রিলে লেখা " I LOVE YOU " । তবে রাস্তা থেকে সেটা কেউ চাইনিজ ভাষা হিসেবেই চিনবে। প্রহরভাইয়ের পাগলামোতে আমার ঠোঁটে ফুটে উঠলো তৃপ্তির হাসি। তবে ব্যালকনির দরজাটা ভালোভাবে লাগিয়ে দিতে হবে। ওনার সবসময় আগমন দৃষ্টিকটু। 



-লেট মি ট্রাই ডিয়ার (প্রেম)


হঠাৎ সামনের চেয়ারে প্রেম বসে পরায় মহুর্তেই হকচকিয়ে গেলো সোনিয়া। গ্লাসটা টেবিলের সামনে রেখে নিজেকে সাধু হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করতে লাগলো। প্রেম আরেকটা গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে বললো, 


- মদ কখনো খাইনি। এর স্বাদ কেমন? (প্রেম)


সোনিয়া তটস্থ ভঙ্গিতে বললো,


- খেলেই বুঝতে পারবে। তুমি এখানে কেনো? তোমার ভাইয়াকে বলে দেবো কিন্তু। (সোনিয়া) 


প্রেম আয়েশ করে চেয়ারটায় বসে পড়লো। অতঃপর সামনের গ্লাসটার দিকে অসীম কৌতুহল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,


- ভাইয়াকে জানানো উচিত বলেই আমি মনে করি। জানাবো? (প্রেম)


সোনিয়া কম্পিত স্বরে তোতলাতে তোতলাতে বললো,


-কককি জানাবে তুমি। (সোনিয়া)


- রিলেক্স। এখানে কি কাপলদের ডান্স হয়? আই মিন, ডু ইউ হ্যাভ পার্টনার? (প্রেম)


সোনিয়া উত্তর দিলো না। প্রেম আবারো বললো,


- ভাইয়ার লাইফে এন্ট্রি নেয়ার কি দরকার? এখানে তো তোমার পার্টনারের অভাব নেই। (প্রেম)


- প্রেম! তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো তুমি কার সাথে কথা বলছো। নেহাত তুমি প্রহরের ভাই বলে কিছু বলছিলাম না এতক্ষণ। এখানে তোমাকে গুম করে ফেললেও কেউ কিচ্ছুটি জানবে না। তুমি আমাকে যতটা চিনো। তাঁর থেকে তোমায় ভালো করে চিনি আমি। (সোনিয়া)


প্রেম মুচকি হাসলো। টেবিলের উপর থেকে মদের গ্লাসটা তুলে  জীবনের প্রথম চুমুকটা দিয়েই দিলো। সবকিছুর অভিজ্ঞতা দরকার জীবনে৷ প্রেম হালকা হেসে বললো,


-কি জানো আমার সম্পর্কে? (প্রেম)


- নিজের বয়সের দিকে তাকিয়ে চলাফেরা করো বাবু। নাউ গেট আউট৷ আদারউইস আই মেইক এ মিস্টেক। (সোনিয়া) 


প্রেম চেয়ার ছেরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, 


- এ্যালকোহল স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তবে টেস্ট টা ভালো। যদি ক্ষতিকর না হতো, তাহলে নিয়মিত খেতাম। বাই দ্য ওয়ে, ডন্ট ফলো মি ডিয়ার। (প্রেম)


কথাটা বলেই সেখান থেকে দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে গেলো প্রেম। সোনিয়া অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রেমের যাওয়ার পানে। এই ছেলেটাকে সে যথেষ্ট ভয় পায়। প্রহর যেমন অদ্ভুত। এই ছেলেটা তাঁর থেকেও অদ্ভুত। পার্থক্য হলো প্রহর অসম্ভব সুন্দর। যে কেউ তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়তে বাধ্য। কিন্তু প্রেম যথেষ্ট গম্ভীর, প্রহরের থেকেও। প্রেম যখন হাসে তখন মনে হয় এই হাসিটাই রাগের প্রতিচ্ছবি। বারের বাইরের অংশটা যতটা চমৎকার, ভেতরের অংশটা তার থেকেও জঘন্য। এরকম জঘন্য জায়গায় দ্বিতীয়বার আসতে চায় না প্রেম। বার থেকে বেরিয়েই দেখলো রাফি এখনো বাইকে মুর্তির মতো বসে আছে। প্রেম এসে বললো, 


- এখনো আছিস? তোর বিরক্ত লাগে না?(প্রেম)


- লাগলেও করার কিছু নেই। রশ্নি আপু কল করেছিলো আমায়। তোর ফোন নাকি অফ? (রাফি)


-হুমমম৷ চল যাবো এখন। আজ সাব্বিরের বাসায় থাকবো। তুই চলে যা বাসা। (প্রেম) 


------🌦️


দেখতে দেখতে কেটে গেলো আরো এক সপ্তাহ। ঐশীর বিয়ের তোরজোর চলছে। এই লকডাউনেই বিয়ে হবে৷ পরিবারের দুএকজন সদস্য থাকবে উপস্থিত আর আত্মীয় নেই বললেই চলে। পুরো বাড়িতে মানুষ গিজগিজ করছে। যেনো নিশ্বাস নেবার উপায় নেই। আগামি শুক্রবার বিয়ে। আজ বুধবার, মানে আর একদিন বাকি। বাসায় প্রহরভাইয়ের পরিবারের সবাই আর পুলকভাইয়ের পরিবারের থেকে কয়েকজন উপস্থিত। এখন কিভাবে বিয়েটা হবে সেই ভাবনায় ব্যাস্ত সবাই। প্রহরভাইও সেখানে উপস্থিত।  আমি প্রহরভাইয়ের থেকে নিজেকে আত্মগোপন করে রাখার জোর চেষ্টা চালাচ্ছি। এই মানুষটার সাথে গতকাল ঝগড়া হয়েছে৷ ঝগড়াটা অবশ্যই আমি শুরু করিনি। করেছে দ্য গ্রেট প্রহরভাই। শুধু বলেছিলাম পড়াশোনা করতে আর ভালোলাগে না। তারপর শুরু হলো উনার লেকচার। এভাবে কি জীবন চলে। প্রেমটাও ওখানে বসে খুটুরখাটুর করছে। এদিকে আয় ভাই, একটু গল্প করি,  ধুর! তারপর ভাবলাম প্রেমকে কল করে এখানে ডাকবো। ওর ভাইয়ের প্রতি যত রাগ, সব ঝারবো। ঐশী তো রুমের ভীতর লজ্জায় মরে যাচ্ছে একেবারে। ঢং দেখলে মরে যাই। আর প্রেয়সী, সে তো প্রহরভাইকে কাছে পেয়ে, কোলে বসে তার ফোন টিপছে। এই শয়তানটা কখনো আমার পক্ষ নিবে না। যত্তসব! ওর থেকে প্রেমের সাথে কথা  বলে শান্তি। সবসময় ও আমার পক্ষ নিবে। আমি প্রেমের নাম্বারে ডায়াল করলাম। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম সে ফোনটা কেটে দিয়ে উঠলো সেখান থেকে। তারপর গুটিগুটি পায়ে আমার রুমের দিকে এগিয়ে আসলো। বাহ! এবার শান্তি। কিন্তু শান্তিটা বেশিক্ষণ টিকলো না। প্রহরভাই বুদ্ধি করে প্রেয়সীকে আমার রুমের দিকে যেতে বললো। আর প্রেয়সীতো তার দাভাইয়ের আদেশ মান্য করতে একপায়ে রাজি। প্রেম আমার রুমে ঢুকলো, সাথে ঢুকলো পিচ্চুটা। প্রেম ওকে দেখেই হাসি দিয়ে বললো, 


- ভাইয়া পাঠালো? (প্রেম)


প্রেয়সী সন্দিহান দৃষ্টিতে প্রেমের দিকে তাকালো। অতঃপর বললো,


- তোমাকে বলবো কেনো? তুমি আমাকে চকলেট দাওনি। (প্রেয়সী)


- ওলে ওলে বাবুটা। আচ্ছা আজ অবশ্যই চকলেট কিনে দেবো। ঠিক আছে? (প্রেম)


-হু (প্রেয়সী)


কথাটা বলেই নাচতে নাচতে আমার বিছানায় বসে পরলো প্রেয়সী। আমি প্রেয়সীর উদ্দেশ্যে বললাম, 


- সিসি ক্যামেরা হয়ে আমার রুমের দরজায় সেট হয়ে যেতে পারিস না? (আমি)


প্রেয়সী আমার কথাটার অর্থ উদ্ধার করতে পারলো না। কিন্তু বুঝতে পারলো, এই কথায় তাকে ভীষণ অপমান করা হয়েছে৷ মুখ ফুলিয়ে প্রেমের উদ্দেশ্যে বললো, 


- দাভাই তোমার মোবাইলটা দাও। গেম খেলবো। (প্রেয়সী)


প্রেম বাধ্য ছেলের মতো প্রেয়সীকে ফোনটা দিয়ে বিছানায় বসে বললো, 


- বলো, কি খবর তোমার? (প্রেম)


- আমার খবর বাদ দে। তোর খবর বল। দিনদিন তো মাস্তান হয়ে যাচ্ছিস। চুল কাটার টাকা নাই নাকি? (আমি)


কথাটা বলেই ওর ঝাকড়া চুলগুলো বুলিয়ে দিলাম। চুলগুলো বড় হয়ে ভালোই লাগছে। প্রেম বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বললো, 


-টাকা আছে। কিন্তু ইচ্ছে নাই। সাথে সময়ও নাই। সেলুনে গেলেই লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়৷ (প্রেম)


-বাহ, তুইতো দেখি বড়লোক রে। তোর ভাইকে একটু টাকা-পয়সা দান করিস। তিনি কথা বলার জন্য ফোনে রিচার্জ করার টাকা পায়না। (আমি)


প্রেম কথাটা শোনা মাত্রই হো হা করে হাসতে হাসতে বললো, 


- ভাইয়াই তো আমাকে টাকা পয়সা সরবরাহ করে। আম্মু-আব্বুর কাছে চাইলেই বলে কি দরকার? হেন তেন। (প্রেম)


হঠাৎ প্রেয়সী গেম থেকে মাথা তুললো। প্রেমের ফোনটা কানে দিয়ে বললো,


- আমি ভাইয়ার ফোনে গেম খেলছি। ভাইয়াও আপুর সাথে কথা বলতে ব্যাস্ত। পরে ফোন করিয়েন। (প্রেয়সী) 


প্রেয়সীর কথা শোনা মাত্র প্রেম বললো, 


- দেখি ফোনটা। কে ফোন করেছে? (প্রেম)


প্রেয়সী ফোনটা দিয়ে দিলো প্রেমকে। প্রেম নাম্বারটা একপলক দেখেই বললো, 


-হ্যাঁ সারা বলো। (প্রেম)

- তুমি যে কেমেস্ট্রি প্রাইভেটের কথা বলছিলা। আমি স্যার ম্যানেজ করেছি। তুমি প্রতিদিন আমার বাসায় পড়তে আসবা। (সারা)

 

প্রেম হাসতে হাসতে বললো, 


-তোমার মাথা ঠিক আছে? তোমার ভাই আমাকে দেখলে আস্ত রাখবে? হা-হা-হা। (প্রেম)

-আসলেই তো। আচ্ছা চলো মিট করি। তারপর ভেবে দেখা যাবে। 


প্রেম মুচকি হাসলো। সারা বারবার শুধু দেখা করার ছল খুঁজে কেনো বুঝে উঠে না প্রেম। প্রেম বললো, 


- আচ্ছা আমি জানাবো। আল্লাহ হাফেজ । (প্রেম)


সাথে সাথেই ফোনটা কেটে দিয়ে প্রেয়সীর হাতে ফোন ধরিয়ে দিলো প্রেম। আমি সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম, 


- নতুন নতুন প্রেম শুরু করছিস তাহলে? কি করলাম এই জীবনে? বড় হয়ে ছোট ভাইবোনের প্রেম দেখতে হচ্ছে। অথচ আমি এখনো সিঙ্গেল। (আমি)


কথাটা বলেই ব্রোকেন হার্টের একটা ফিলিংস নিলাম। প্রেম কথা শুনে হো-হা করে হাসলো। অতঃপর বললো, 


- আমার প্রেমিকা সিলেক্ট করবে অনলি দ্য প্রেট রশ্নি আপু। হা-হা-হা। তার আগে নো প্রেমিকা। আচ্ছা ভালো কথা, তোমার আর ভাইয়ার বিয়ের কথাও চলছে কিন্তু। খুব তারাতারি বনু থেকে ভাবিতে কনভার্ট হচ্ছো। (প্রেম)


কথাটা শোনা মাত্র আমার হার্টবিট দ্রুত ছুটতে চললো। অজানা আনন্দে মনে খুশির ঠেউ বইতে লাগলো। অবশেষে সেই মানুষটা আমার হতে চলছে। কিন্তু বিয়ে হলে তো আমার জীবনটা তেজপাতা হয়ে যাবে। আবার ওনাকে ছাড়াও থাকতে পারি না। আমার জীবনের সবটা জুড়ে উনি। আমার বিরক্তিতে উনি, আমার আনন্দেও উনি। প্রহরময় এই জীবনে উনাকে ছাড়া আমার একটা প্রহরও কাটে না। আমি লজ্জামাখা কন্ঠে বললাম, 


- তোর ভাইকে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই। (আমি)


- ওকে। তাহলে সোনিয়া আপুই বেস্ট। তাছাড়া সোনিয়া আপু ভাইয়াকে অনেক ভালোবাসে। (প্রেম)


প্রেমের কথাটা শোনামাত্র আমার মেজাজ মহুর্তেই খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু রাগটা প্রকাশ না করে বললাম, 


- ভালো। তবে ঐ মেয়েকেই ভাবি বানা। এখানে কি করছিস। ভাগ। (আমি)


- সোনিয়া আপু এতটাই ভাইয়াকে ভালোবাসে যে বারে গিয়ে ড্রিংকস করে আর ছেলেদের সাথে আড্ডা দেয়। ঐ মেয়েকে তো আমি দেখে ছাড়বো। (প্রেম)


- কি বলিস? তুই কেমনে চিনলি সোনিয়াকে? (আমি)


প্রেম বিরক্ত কন্ঠে বললো, 


- আরে ভাইয়া যেদিন ওদের বাসায় গিয়েছিলো সেখানে তো আমিও ছিলাম তাইনা? তো চিনবো না কেনো? (প্রেম)


ঠিক তখনি ভেতরের রুম থেকে আওয়াজ আসতে শুরু করলো। আমি আর প্রেম দরজার সামনে গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার মাথার ভীতর পাঁচশো ভোল্টের বাল্ব জ্বলে উঠলো। সোনিয়া আমাদের বাসায়! তাও আবার প্রহরভাইকে জড়িয়ে ধরেছে। ভাগ্যিস সেখানে প্রহরভাই ব্যাতিত অন্য কেউ নাই। প্রহরভাই নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,


- এটা কোন ধরনের ভদ্রতা সোনিয়া? রশ্নিদের বাসায় তুমি কিভাবে এলে? (প্রহর)


-মনের টান থাকলে অবশ্যই আসা যায়। বাই দ্য ওয়ে, কোথায় রশ্নি? তোমার আদরের বোন বলে কথা। একটু দেখা করতে এলাম। (সোনিয়া) 



চলবে?

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url