শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ০৯

 

শুধু তুই - Shudu Tui । ভালবাসার গল্প - পর্বঃ ০৯

শুধু তুই

লেখকঃ রিফাত আমিন

পর্বঃ ০৯


-প্রেম বাসা থেকে বের হয়ে পার্কের দিকে হাঁটছিলো , এমন সময় সারাকে দেখতে পেলো সে। সারাকে এই সকাল বেলা পার্কে হাটতে দেখে মোটেও বিচলিত হয়নি। অবাক হয়েছে সামান্যই। সারা ব্লাক হুডি আর শাল জড়িয়ে রেখেছে পুরো শরীরে। প্রেম হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সকাল ৭ টা ১৫। সূর্য উঠেনি এখনো। চারদিকটা হালকা কুয়াশায় আচ্ছন্ন। ফাল্গুন এসে গেলেও ঠান্ডার রেশ বিন্দুমাত্র কমেনি। যদিও দশটার পর আবহাওয়া অনেকটা পরিবর্তন হয়। সারা প্রেমকে দেখামাত্র ছুটে এসে বললো, 


- সারপ্রাইজ!! তুমি এমন খালি পা'য় হাটছো কেনো? ঠান্ডা লাগে না? (সারা)


প্রেম কালো শালটা খুলতে খুলতে বললো,


- অসহ্য লাগছিলো তাই খুলে রেখেছি। এত সকালে যে! (প্রেম)


সারা অবাক হয়ে বললো, 


- তুমি সারপ্রাইজ হওনি? আমি তো জানতাম তুমি আর ঘুমাতে পারবা না। নিশ্চই বের হবা হাঁটতে। বোহেমিয়ান বলে কথা। তাই আমিও সারপ্রাইজ দিতে এসে গেলাম দেখা করতে এলাম। 


বলেই মুচকি হাসলো সারা। প্রেম স্বহাস্য কন্ঠে বললো, 


- এই সকাল সকাল তোমাকে দেখে ভালো লাগছে। যাই হোক, চলো চা খাই। টঙ দোকানের চা কিন্তু। (প্রেম)


সারা যেনো বিশ্বাস করতে পারলো না প্রেম ওকে চা খাওয়ার অফার করছে। সে উৎফুল্ল কন্ঠে বললো, 


- সত্যি খাওয়াবা? তোমার সাথে বসে সব খাওয়া যায়। আর টঙ দোকান বলে, কি খাবো না নাকি? (সারা)


প্রেম ঠোঁট চেপে হেসে বললো, 


- সব খাওয়া গেলে আমাকেই না'হয় খাও। হা-হা-হা। 


কথাটা বলেই প্রেম তার ভুবন মাতানো হাসিটা দিলো। সারা এই প্রথম প্রেমকে এত সুন্দর করে হাসতে দেখছে। শ্যামসুন্দর মানুষটাকে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর পুরুষ মনে হলো সারার। যদিও এর আগেও প্রেম হেসেছিলো। কিম্তু সেই হাসিতেও যেনো কঠরতা বিরাজ করে। সারা ভয় পায় সেই হাসি। সারা বললো,


-তুমি হাসলে অনেক সুন্দর লাগে প্রেম। নিয়মিত হাসতে থাকবা। বুঝছো? তাহলে মন ভালো থাকে (সারা)


- মানুষ সবসময়'ই হাসার চেষ্টা করে। কিন্তু সব হাসিতে কী সুখ থাকে! কিছু হাসিতে থাকে ব্যার্থতা, অপূুর্ণতা, কষ্ট (প্রেম)


সারা বারবার প্রেমের দিকে তাকাচ্ছে আর মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সারার সন্দেহ হয় প্রেমের সৌন্দর্য নিয়ে। যার ভাই এত ফর্সা, সে কিনা শ্যামলা! বিষয়টা সন্দেহের বটে। কিন্তু কেউ কি নিজের সৌন্দর্য ঢাকতে চাইবে নাকি? সারা প্রেমের জবাবে বললো,


- তোমার মাঝে এত কিছু দেখে অবাক হই আমি। এত প্রতিভা কই রাখো? আমারেও কিছু ধার দিও। হিহি। (সারা)


যখন তারা রাস্তার পাশের টঙ দোকানে থামলো চা খাওয়ার জন্য। চারদিকে তখন আলো ফুটেছে অনেকটা। মেইনরোডে গাড়ি চলছে সামন্যই। এটাই সেই দোকান যেখানে প্রহরভাই সোনিয়ার সামনে রশ্নি আপুকে থাপ্পড় মেরে ছিলো৷ ভাগ্যিস ঠিক সময়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম। দোকানে বসতে বসতে প্রেম বললো,


- বন্ধু হও, ধার তো দিতেই পারি। হিহিহি। যাই হোক, চা খাওয়ার পর বাসা ফিরবে নাকি আমাদের যাবে? (প্রেম)


সারার ইচ্ছে হলো আরো কিছুক্ষণ প্রেমের সাথে থাকতে। আরেকটু কথা বলতে, আরেকটু প্রেমের চোখের দিকে তাকানোর সাহস করতে। কিন্তু এখন যাওয়া যাবে না প্রেমের সাথে। নাহলে আজ সারাদিনে একবারো প্রেমের দেখা পাবো না। সারা বললো, 


- এখন চলে যাবো বাসা। বিকালে এখন ভাইয়া আর আপুর সাথে দেখা করতো আসবো। ঠিক আছে? (সারা)


প্রেম মুচকি হাসলো। সদ্য গজে উঠা দাড়িগুলোও যেনো ঝলমল করলো। সারা আরো একবার সেই হাসিটার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। চা শেষ করে সারাকে একটা রিক্সায় উঠিয়ে দিয়ে বিদায় দিলো প্রেম। অতঃপর প্রেম ফোন করলো সোনিয়াকে। আবীর মেসেজটার সাথে সোনিয়ার নাম্বারো এ্যারেন্জ করে দিয়েছিলো গতকাল। এই টঙ দোকানে একবার মিট করলে ক্ষতি কি। দেখি সোনিয়া আসে কি না। প্রেম রিং করার সাথে সাথে'ই রিসিভ করলো সোনিয়া। প্রেম হ্যালো বলার বলার আগেই ওপাশ থেকে সোনিয়া বললো,


-শুভ সকাল প্রেম বাবু। তা এত সকাল সকাল আমাকে মনে করলেন যে!  (সোনিয়া)


সোনিয়ার কথায় প্রেম খানিকটা অবাক হলো৷ প্রেমের নাম্বার তো সোনিয়ার কাছে থাকার কথা না। কিভাবে পেলো সে? প্রেম স্বাভাবিক সুরে বললো,


- শুভ সকাল মিস। ভাবলাম আপনার সাথে একবার মিট করি। একটা ঋণ পরিশোধ করা বাকি। তা আসবেন নাকি? লোকেশনটা সেন্ড করি তাহলে? (প্রেম)


সোনিয়া ফোনের ওপাশ থেকে একটা ভ্যাবলামার্কা হাসি দিয়ে বললো, 


- আপনার লোকেশন অলওয়েজ আমার কাছে থাকে মিষ্টার প্রেম। ওয়েট করেন। ৫ মিনিটের মধ্যে আসছি। (সোনিয়া)


প্রেম ফোন কাটার ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় বাইকে করে সেখানে উপস্থিত হলো সোনিয়া। মনে হয় কিছুক্ষণ আগে ঘুম ভেঙ্গেছে। প্রেম বাইকটার সামনে গিয়ে শরীর থেকে শালটা বের করে গলায় পেঁচিয়ে নিলো। অতঃপর কোনো কথা বার্তা ছাড়াই সজোড়ে থাপ্পড় মারলো সোনিয়াকে। মহুর্তেই নিশ্চুপ হয়ে গেলো চারপাশটা। ছাদের উপরে থাকা দুটো দাঁড়কাক উড়ে গেলো। সাথে সাথেই তিনটা বাইকে উপস্থি হলো তিন মানব। রাফি, সাব্বির আর আবীর। চায়ের দোকানি ভাবতেই পারেনি এই শান্তশিষ্ট ছেলেটা মারপিট করতে পারে। একটু আগেই কতটা ভদ্র আচরণ করলো উনার সাথে। প্রেমের হাতের থাপ্পড় খেয়ে বাইক থেকে পরে গেলো সোনিয়া। সাথে সাথেই সেখানে উপস্থিত হলো সোনিয়ার দুই বডিগার্ড। প্রেম গলার শালটা রাস্তায় ছুড়ে ফেলে চায়ের দোকানে ছুটে গেলো। সামনে থাকা লাঠিটা তুলে নিলো সে। সোনিয়ার বডিগার্ডদুটি অলরেডি সোনিয়াকে তুলতে ব্যস্ত। আর এদিকে তিন মানব তাদের সেম কালারের ড্রেসআপ সো অফ করতে ব্যস্ত। প্রেম লাঠিটা নিয়ে আসতে আসতেই সোনিয়াকে রাস্তা থেকে উঠানো হয়ে গেছে। প্রেম আবারো কথা বার্তা ছাড়াই সোনিয়ার লোকের উপর চড়াও হলো। ছোট ছেলেটার মারপিটের কৌশল দেখে তাদের চোখ ছানাবড়া। সাথে যুক্ত হলো সাব্বির, রাফি, আবীর। সকাল সকাল শরীরের ব্যায়াম হওয়ায় প্রচন্ড খুশি সবাই। বডিগার্ড দুটির অবস্থা নাজেহাল করে ঘামতে থাকা প্রেম সোনিয়ার সামনে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো, 


- তোর জন্য সেদিন এইখানে রশ্নি আপু ভাইয়ার হাতে থাপ্পড় খেয়েছে। ইচ্ছে ছিলো আপুর হাতে তোকে থাপ্পড় খাওয়ানোর। কিন্তু আপসোস। তারা দুজন বাসর করতে ব্যস্ত। তাই আমি'ই সেই কাজটা পূরণ করলাম। যাই হোক, সরি এভাবে মাঝ রাস্তায় থাপ্পড় মারার জন্য। এই কাজের জন্য আমার বাপের চাকরি যদি চলে যায়। তাহলে তোর সুন্দর শরীরটায় আর প্রাণ থাকবে না সুইটি। আল্লাহ হাফেজ। (প্রেম)


কথাটা বলেই হাতের লাঠিটা নিয়ে চায়ের দোকানে ফেরত দিতে গেলো প্রেম। সোনিয়ার এখনো ঘোর কাটেনি। এক থাপ্পড়ে কানে তালা লেগে গেছে। মাথাটা এখনো ভনভন করছে। এদিকে সামান্য আগের ঘটনায় দোকানি ভয়ে চুপসে গেছে। প্রেম গিয়ে যখন বললো, কত বিল হয়েছে আঙ্কেল। তখন দোকানি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো, টটাকা ললাগবে নে ভাইজান। প্রেম মুচকি হেসে বললো, 


-আমাকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই আঙ্কেল। আপনার মতো সাধারণ মানুষ আমি। কোনো পাতি নেতা না। আপনার যতটুকু যোগ্যতা আছে। আমার সেটাও নেই। (প্রেম)


কথাটা বলেই একশো টাকার একটা নোট হাতে গুজিয়ে দিলো প্রেম। দোকানি এখনো বিষ্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কে এই ছেলে? মেয়েটার সাথে যখন কথা বলছিলো তখন মনে হয়েছে, পৃথিবীর সব থেকে ভদ্র ছেলেটা বোধহয় এই ছেলে ছাড়া কেউনা। আর মহুর্তেই এত এত পরিবর্তন! 


----------🌱


পরদিন সকাল আটটায় ঘুম ভাঙলো আমার। প্রহরভাইয়ের বিছানায় এত সুন্দর ঘুম হয় আগে জানা ছিলো না তো৷ জানলে বিয়ের আগে প্রহরভাইকে আমার রুমে ট্রান্সফার করে আমি এখানে থাকতাম৷ অতঃপর ঘুমু ঘুমু চোখে চারপাশে একবার তাকালাম। প্রহরভাই কোথায় গেলো? কম্বলটা বিছানার একপাশে রেখে বিছানা থেকে নামতে যাবো এমন সময় মেঝেতে চোখ আটকে গেলো আমার। প্রহরভাই কিনা মেঝেতে শুয়ে আছে! আর আমি উনার স্ত্রী হয়ে উপরে শুয়ে আছি! শুধু একটা কম্বল গায়ে দিয়ে থাকছে কিভাবে মেঝেতে? ভীষণ অপরাধবোধে চোখমুখ কুঁচকে গেলো আমার। আমি ঝটপট বিছানা থেকে নামলাম। উনার সামনে গিয়ে বললাম, 


- এখানে ঘুমাইছেন কেনো প্রহরভাই? এইযে হ্যালো। উঠেন প্লিজ৷ আপনি মানুষ নাকি অন্য কিছু। এভাবে কেউ মেঝেতে ঘুমায়। 


প্রহরভাই আমার কথায় চোখ খুললেন না। জেগে উঠেছেন বোধহয়। উনি চোখ বন্ধ করেই বললেন, 


- আহ!! ডিস্টার্ব করিস না তো। কাল রাতে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে একটা শিপ ডিজাইন করছিলাম। হঠাৎ করে ঘুম পেয়ে যাওয়ায় এখানেই দুমিনিটের জন্য মাথা রেখেছিলাম। সেখানে দুমিনিটের যায়গায় সকাল হলো কিভাবে কে জানে?  এত তারাতারি দুই মিনিট হয়? (প্রহর)


আমি উনার কান্ডে হতবাক হয়ে গেলাম। উনি তো একটা বালিশও নেয়নি দেখি। কি পাগল মানুষের পাল্লায় পরলাম ধুর। কপালে হাত দিয়ে জ্বর চেক করার ইচ্ছে হলো আমার৷ কিন্তু প্রহরভাইকে এভাবে এর আগে কখনো  স্পর্শ না করায় দ্বিধায় পরে গেলাম আমি৷ তবুও কাঁপা কাঁপা হাতে উনার কপালে হাত রাখলাম৷ মহুর্তেই কেঁপে উঠলেন উনি৷ নাহ! জ্বর নেই। তবে হালকা শরীর গরম। উনি চোখ খুলে আমার দিকে তাকালেন। আমি অনুভূতি শুন্য স্বরে বললাম,


-প্রতিটা মানুষের কাছেই বাসররাত হয় জীবনের সেরা রাত। কিন্তু আপনি কি পাগল? এভাবে শুয়ে আছেন যে। (আমি)


উনি চুপ করে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, 


- বিছানায় শুয়ে থাকলে, আমার আজন্ম প্রেয়সী কপালে হাত রেখে কখনই দেখতো না আমার জ্বর আছে কি না। 

এটা কি তোর পাগলামো মনে হয়?

তাহলে আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্য এমন পাগলামো করবো। পাগলামো করবো তাঁর রাগে ভরা ঐ দৃষ্টি দেখার জন্য। পাগলামো করবো আমার প্রতি তার ভালোবাসায় ভরা মনটা উপলব্ধি করার জন্য। আমি সম্ভবত এই ছোট্ট কারণগুলোর জন্যই পাগলামো করবো৷ হয়তো পাগলামো করবো আমার জন্য তার ভয় হওয়া ঐ চোখ দুটোর জন্য। (প্রহর)


কথাটা বলেই উনি মুচকি হাসলেন। আমি উনার ঘুমুঘুমু কন্ঠে আবারো প্রেমে পরে গেলাম৷ এই প্রেম যে কি ভয়ানক৷ সেটা প্রেমিক মানুষগুলোই জানে। আমি ঠোঁট বাকিয়ে বললাম,


-হইছে, আর হুমায়ুন আহমেদ স্যারকে কপি করতে হবে না। এখন উঠে বিছানায় ঘুমিয়ে পরেন৷ আম্মি যদি জানতে পারে বাসর রাতে তাঁর আদরের ছেলেকে মেঝেতে ঘুমাতে বলেছি৷ তাহলে বিয়ের পরদিনই এই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবেন আমায়। উঠেন প্লিজ। (আমি)


উনি আমার কথা শুনলেন না। শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা কম্বলটা বাম হাত দিয়ে সড়িয়ে দিলেন৷ তার সাথে সাথেই হেচকা টানে উনার শরীরের সাথে  মিশিয়ে নিলেন আমায়। ঘটনার আকষ্মিকতায় আমি স্তব্ধ, হতবাক হয়ে গেলাম। উনার উত্তপ্ত শরীরে আমাকে মিশিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলেন বোধহয়। উনি ভিলেনমার্কা হাসি দিয়ে বললেন, 


-  সবাই তো বাসররাত পালন করে। আমরা নাহয় বাসর সকাল পালন করি। কি বলিস? (প্রহর)


আমি উনার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে বললাম, 


- আপনার সোনিয়াকে নিয়ে বাসর সকাল পালন করুন।  এখন ছাড়ুন আমায়। অসভ্য! 


-আচ্ছা প্রহরভাই আপনি এত পড়াশোনা করেন কেন? পড়তে পড়তে বইয়ের ভীতরে ঢুকে যেতে চান নাকি? (আমি)


প্রহরভাই ব্রেকফাস্ট করে এসে মাত্র পড়ার টেবিলে বসলেন, এদিকে আমি আবারো বিষ্ময়ে চোখ বড় বড় করে ওনার দিকে তাকালাম। কেউ বিয়ের পরদিন বউকে পাত্তা না দিয়ে পড়তে বসতে পারে তা এই জন্মে ভাবিনি। তাই মনে হাজারো কৌতুহল নিয়ে এই প্রশ্নটা করলাম। উনি বিরক্ত হয়ে পিছনে ঘুরে বললেন, 


- চাকরি খুঁজছিরে পিচ্চি, চাকরি! ভালো একটা চাকরি পেতে হলে ভালো স্টাডি করতে হবে। তোর ভাগ্য ভালো যে আঙ্কেল আমার মতো বেকারের হাতে তোকে তুলে দিছে। এই জন্য মসজিদে আজকেই ১০ টাকা দিবি। তোর কাছে টাকা না থাকলে আমার মানিব্যাগ থেকে নিয়ে নিবি। তবুও দিবি। এখন মনোযোগ দিয়ে কাজ কর। (প্রহরভাই)


কথাটা বলেই প্রহরভাই ঘুরে বসলেন টেবিলে। আমি কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লাম, 


- আমার লাক ভালো হতে যাবে কেনো হ্যাঁ? আপনার লাক ভালো যে আমার মতো শান্তশিষ্ট ভদ্র মেয়েকে নিজের বউ হিসেবে পেয়েছেন। এর জন্য আজ'ই মসজিদে আপনার ৫০ টাকা দোয়া উচিত। হু! নিজের কাছে টাকা না থাকলে আমার কাছে নিতে পারেন। মাইন্ড করবো না। (আমি)


প্রহরভাই আমার কথায় যেনো আকাশ থেকে পড়লেন। টেবিল থেকে উঠে বললেন, 


- তুই যে কতটা ভদ্র সেটা ভালো করে জানা আছে। একটা কাজ কর। আমার কিছু শার্ট-প্যান্ট ধুয়ে দে। কাজের লোক কাজ করে খাবি। একদম হেয়ালি চলবে না। (প্রহরভাই)


কথাটা বলতে বলতেই উনি আমার হাতে কিছু শার্ট আর প্যান্ট এগিয়ে দিলেন। সবগুলা একদম নতুন। একটু ময়লাও হয়নি। এগুলা কোন আক্কেলে ধুবো আমি?ঠিক তখনি ছোট ছোট পা ফেলে রুমে প্রবেশ করলো প্রেয়সী। আমি সুযোগ পেয়েই প্রেয়সীর উদ্দেশ্যে বললাম, 


- দেখ দেখ পিচ্চু, তোর দাভাই বিয়ের পরদিন'ই আমাকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে। আন্টিকে ডাক দে প্লি..


কথাটা বলার আগেই প্রহরভাই আমার মুখ চেপে ধরলেন। প্রেয়সী সাথে সাথে ছুটে গেলো আন্টিকে এই খবর জানাতে। বর্তমানে এটাই ওর কাছে ব্রেকিং নিউজ। প্রেয়সী চলে যেতেই উনি মুখ থেকে হাত সারালেন। উনি বিরক্তকন্ঠে বললেন, 


-কি করলি এটা? আম্মু আসলে কি হবে? (প্রহরভাই)


-কি আর হবে? আম্মি বকা দেবে। আমার কাছে এটাই পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর মহুর্ত। (আমি)


প্রহরভাই আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, 


- বউ থাকা যে কি ঝামেলা তা এবার ভালো করে বুঝতে পারছি। একটু পড়তে বসতেও পারিনা। ধুর! থাক আমি ছাদে চললাম। যদি একটু শান্তি পাওয়া যায় সেখানে। আম্মি আসলে বলিস বাথরুমে। (প্রহর)


কথাটা বলেই চলে গেলেন প্রহরভাই। উনি চলে যেতেই আমি হাসতে হাসতে শেষ। আচ্ছা জব্দ করা গেছে। এতদিন আমায় জ্বালাইছে। এখন আমি জ্বালাবো। এটাকেই বলে রিভেঞ্জ অফ নেচার। উনার বস্তার মতো প্যান্টগুলোর কি ওজন মাইরি৷ এগ্লা পড়ে বাইরে যায় কেমনে! কিছুক্ষণ ঘর গুছানোর পর হঠাৎ প্রহরভাইয়ের ফোন বেজে উঠলো। আমি গিয়ে দেখলাম একটা আননোন নাম্বার থেকে ফোন এসেছে। প্রথমবার ধরলাম না। কিন্তু আবার যখন ফোন বাজলো তখন ভাবলাম, আমি তো প্রহরভাইয়ের স্ত্রী। আমার নিশ্চই অধিকার আছে ওনার ফোন টাচ করার। আমি ফোনটা ধরে সালাম দিতেই ফোনের ওপাশে একটা মেয়েলি কন্ঠস্বর ভেসে উঠলো। 


- আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন? (আমি)


- আমি নাউমি। প্রহর কোথায়? আর আপনি'ই বা কে? (মেয়েটি)


-প্রহরভাই তো ছাদে গেছে। উনার সাথে কি প্রয়োজন আপনার? (আমি)


উনি আমার কথা শুনতেই বিরক্ত হয়ে উত্তরগুলা দিচ্ছেন। উনি বললেন, 


- কি প্রয়োজন সেটা আপনাকে বলতে হবে নাকি? আমি ওর গার্লফ্রেন্ড। আমার কি কথা বলার অধিকার নেই নাকি? (নাউমি)


নাউমি নামের মেয়েটার কথা শোনা মাত্র আমার হৃদপিন্ড সেকেন্ড দুয়েকের জন্য অফ হয়ে গেলো। আর সাথে সাথে উচ্চগতিতে হৃৎপিণ্ড ছুটতে লাগলো। কপালে দিয়ে ঘাম ছুটলো। পায়ের নিচ থেকে মাটি সড়ে গেলো বোধহয়। আমি কথা বলতে পারলাম না।  এতদিন মজার ছলে বলতাম প্রহরভাইয়ের জিএফ আছে। এটা যে বিয়ের পর সত্যি হবে সেটা কখনো ভাবিনি। আমি কষ্ট করে শুধু একটা কথাই বললাম, 


- জি আপনার অধিকার আছে। দুমিনিট ওয়েট করেন ফোনটা দিচ্ছি। (আমি)


ফোনটা কেটে দিয়ে বিছানায় ধপ করে বসে পড়লাম। জীবনে প্রেম-ভালোবাসা কি জিনিস বুঝিনি। কারণ আমার সবকিছুতেই প্রহরভাই মাথা ঘামিয়েছেন। কোথায় পড়বো, কোন টিচারের কাছে প্রাইভেট পড়বো, কখন পড়বো, সবকিছুতেই উনার বাধ্যবাধকতা থাকতো। একমাত্র উনার জন্যই রাস্তাঘাটে কোনো ছেলে আমার দিকে তাকানোর সাহস পেতো না। এসবের জন্য উনার প্রতি আমি ছিলাম বিরক্ত। সাংঘাতিক লেভেলের বিরক্ত। উনাকে সহ্য করতে পারতাম না। কিন্তু একটা সময় উপলব্ধি করলাম এই অসহ্য মানুষটাই আমার ভালোলাগার কারণ হবে। আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন হবে৷ কে ভেবেছিলো এই বিয়েটা আদৌও সম্ভব? আমি ফোনটা হাতে নিয়ে দ্রুতপায়ে রুম ত্যাগ করলাম। চোখের পানিটা দ্রুত মুছে ছাদের দিকে পা বাড়ালাম। কিন্তু মাঝপথেই আন্টি বাধা হয়ে দাঁড়ালেন, 


-কিরে? প্রেয়সী বললো, তোকে দিয়ে নাকি প্রহর কাজ করাচ্ছে। ঐ লম্পট কোথায়? (আন্টি)


আমি চোখদুটোকে আন্টির থেকে আড়াল করার চেষ্টা করে বললাম,


- ছাদে আছে আম্মি। মজা করছিলো তখন। আমি সেখানেই যাচ্ছি। (আমি)


-তোর চোখ লাল কেনো? কি হয়েছে বল? (আন্টি)


-কিছুনা। আচ্ছা আমি আসছি। 


আমি দ্রুত ছাদে উঠে আসলাম। দেখলাম উনি ছাদের ফুলের গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে। শরীরে সাদা সেন্টু গেন্জি আর নেভিব্লু থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। রোদের তীক্ষ্ণ আলোয় উনার ফর্সা শরীর যেনো গোলাপী আকার ধারণ করছে। এই রুপ যে কি ভয়ংকর! প্রহরভাইয়ের রুপ একটা মেয়েকে ঘায়েল করতে সক্ষম। আমিও কি এভাবেই প্রেমে পড়েছি? নাহহ! এটা কখনই নয়৷ আমি উনার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম,


- এইযে আপনার ফোন। নাউমি আপি কল করেছে। আপনার জিএফ। (আমি)


প্রহরভাই সাথে সাথেই পিছনে ঘুরে তাকালেন। আমার চোখ জ্বলছে। ভয়ংকার কান্না পাচ্ছে। ইচ্ছে করছে হাত পা ছাড়িয়ে কাঁদতে। এই প্রখর রোদ আমার চোখকে যেনো আরো পুড়িয়ে দিচ্ছে। উনার হাতে ফোন দিয়েই দৌড়ে সেখান চলে যেতে ধরলাম। উনি হাতের পানির পাইপটা ফেলে দিয়ে কঠোর কন্ঠে বললেন, 


- আর একপা এগোলে কিন্তু ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেবো। কে তোকে কি বলেছে আর তুই সেটা শুনেই কান থাকতে চিলের পিছনে ছুটলি। (প্রহরভাই)


আমার কথা বলার ইচ্ছে হলো না। তবুও শক্তকন্ঠে জবাব দিলাম, 


- ইট'স ইওর পার্সোনাল ম্যাটার। নট মাইন। (আমি)


কথাটা বলেই সেখান থেকে ছুটে রুমে চলে আসলাম। চারদিকটা অসহ্য লাগছে। পৃথিবীতে এত ছেলে থাকতে প্রহরকেই কেনো পছন্দ হতে হবে সবার। আমি কেনো এত সুন্দরী হলাম না। তবুও উনি বিয়ে করলেন। এখন কি আমাকে আর ভালো লাগছে না? বিয়ের পরদিন এটাই উপহার ছিলো আমার জন্য! 


ঠিক তখনি দরজায় উপস্থিত হলেন প্রহরভাই। কঠোরস্বরে বললেন,


-আমার চোখে তুই মায়ের পর একমাত্র বিশ্বসুন্দরী। তোকে তো আমি কখন'ই সুন্দর অসুন্দর দিয়ে বিচার করতে চাইনা। নিজেকে কখনো ভালো করে আয়নায় দেখেছিস? প্রহর কখনো খারাপ কিছু নিজের জীবনের সাথে জড়ায় না। তুই জীবনে সবার থেকে হয়তো নিজের সৌন্দর্যের জন্য প্রসংশা পেয়েছিস। একমাত্র আমি'ই করিনি। আজ করলাম, এখন লক্ষী মেয়ের মতো কান্না বন্ধ করে এদিকে তাকা। তাকা বলছি। থাপ্পড় খাবি কিন্তু!


----------🤍


প্রেম মাত্র বাড়িতে ফিরেছে। রাস্তার সব ঝামেলা মিটিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে সকাল ১১ টা বেজে গেলো। ফ্রেস হয়ে খাওয়ার টেবিলে আসবে এমন সময় প্রেমের আম্মু বললো, 


- কোথায় ছিলি এতক্ষণ? সকাল থেকেই দেখলাম হাওয়া হয়েছিস! তোর জন্য আমার কতটা টেনশন হয় জানিস? (আম্মু)


প্রেম মুচকি হেসে বললো, 


- মর্নিং ওয়াকে গিয়েছিলাম আম্মু। ইট’স সাউন্ড গুড ফর হেল্থ। এখন খিদা লাগছে, খাইতে দাও। (প্রেম)


আম্মু কথা বাড়ালেন না। ভাত বেড়ে দিতে দিতে বললেন, 


- তোর আব্বুর সাথে আজ সব আত্মীয়দের বাসা যেতে হবে। লকডাউন শেষ হলেই পুলক আর ঐশীর বিয়ে হবে। ভাবছি তখন প্রহর আর রশ্নির বিয়ের অনুষ্ঠানটাও সেড়ে ফেলবো। সবাইকে দাওয়াত দিবি গিয়ে। পরে পালিয়ে যাস না আবার। (আম্মু)


প্রেম বিরক্ত কন্ঠে বললো, 


-আহ! আম্মু। কারো বাসা যেতে ইচ্ছে করে না আমার। এটা বুঝো না কেনো? (প্রেম)


- খুব বড় হয়ে গেছিস তাইনা। সবাই ডাকে তোকে। নিজেকে কি ভাবিস তুই? বাপের মতে হয়েছিস একটা। (আম্মু)


প্রেম কথা বললো না। কথা বললেই কথা বাড়বে। খাওয়া শেষ করে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলো। সকাল থেকে প্রচুর ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। এবার একটু রেস্ট নেয়া দরকার।  সোনিয়াকে থাপ্পড় মেরে শান্তি লাগছে। অদ্ভুত রকমের শান্তি। প্রেম ফোন চেক করে দেখলো সারার মিস কল। উফফ! মেয়েরা এত এগ্রেসিভ কেনো? নিশ্চই বলবে এখন নতুন প্রাইভেট ঠিক করেছি। চাইলে পড়তে পারো। মনে মনে কথাটা ভাবতেই প্রেম কল ব্যাক করলো। সারা ফোন ধরেই বললো, 


- শোনো। দারুণ একটা নিউজ আছে। এখানকার বেষ্ট ফিজিক্স টিচার আমাকে পড়াবে। যদিও আমি নিজের বাসায় পড়বো না। উনার বাসায় গিয়ে পড়বো। আমি চাই তুমি আমার সাথে পড়বা। এবার না করবা না প্লিজ। পড়াশোনায় মনোযোগ দাও একটু। (সারা)


প্রেম মুচকি হাসলো। এই মেয়েটা চায় কি? 



চলবে?

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url