• শবে বরাত
  • শবে বরাত ২০২৬ কত তারিখে? ফজিলত, আমল ও পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন

    শবে বরাত ২০২৬

    ইসলামি সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘শবে বরাত’ । ফারসি শব্দ ‘শব’ মানে রাত আর ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি বা নিষ্কৃতি । পবিত্র শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটিই মুসলিম বিশ্বে লাইলাতুল বরাত বা মুক্তির রাত হিসেবে সমাদৃত । ২০২৬ সালে আমরা যখন একটি নতুন সময়ের মুখোমুখি, তখন এই রাতের প্রাসঙ্গিকতা ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব অনুধাবন করা প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য । এই নিবন্ধে আমরা শবে বরাত ২০২৬-এর তারিখ, ফজিলত, শরিয়তসম্মত আমল এবং সমাজ ও সংস্কৃতির প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব ।

    শবে বরাত ২০২৬ কত তারিখে হবে?

    হিজরি ক্যালেন্ডার বা চান্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী প্রতিটি মাস ২৯ বা ৩০ দিনে সম্পন্ন হয় । গত মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রজব মাসের ৩০ দিন পূর্ণ হয়েছে । অর্থ্যাৎ বুধবার (২১ জানুয়ারি) থেকে শাবান মাস গণনা শুরু হয়েছে । সে হিসাবে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) দিবাগত রাতে পবিত্র শবেবরাত পালিত হবে । শাবান মাসের চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করেই শবে বরাতের চূড়ান্ত দিন নির্ধারিত হয় ।

    • তারিখ: ৩ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) ।
    • উদযাপন সময়: ৩ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) সূর্যাস্তের পর থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) ফজর পর্যন্ত ।
    • ২০২৬ সালের বিশেষত্ব: এই বছর শবে বরাত এমন এক সময়ে আসছে যখন বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহ নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন । তাই এই রাতের দোয়া ও মোনাজাত আত্মিক শক্তির অন্যতম উৎস হতে পারে ।

    শবে বরাতের ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট

    শবে বরাত নিয়ে আলেমদের মধ্যে নানা মত থাকলেও, এর ফজিলত অস্বীকার করার উপায় নেই। হাদিস শাস্ত্রে একে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা ‘অর্ধ-শাবানের রাত’ বলা হয়েছে।

    ক. কুরআন ও হাদিসের আলোকচ্ছটা

    মুফাসসিরগণের একটি বড় অংশ সূরা আদ-দুখানের শুরুর আয়াতগুলোর (নিশ্চয়ই আমি একে বরকতময় রাতে নাজিল করেছি) ব্যাখ্যায় শবে বরাতকে বুঝিয়েছেন, যদিও অধিকাংশের মতে এটি শবে কদর। তবে হাদিসের বিশদ বিবরণ এই রাতের বিশেষত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রাখতেন। যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো কেন, তিনি বললেন— “এটি এমন এক মাস যা রজব ও রমজানের মাঝে পড়ে এবং মানুষ এ সম্পর্কে গাফেল থাকে। অথচ এই মাসেই বান্দার আমলসমূহ আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়।”

    খ. হাদিসের বিশুদ্ধতা

    হযরত আয়েশা (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত আবু মুসা আশআরি (রা.)-সহ অনেক সাহাবী থেকে এই রাতের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। যদিও কোনো কোনো হাদিসের সনদ নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে সামগ্রিকভাবে বহু হাদিসের সমষ্টি এই রাতকে ‘হাসান’ বা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত করেছে।

    শবে বরাতের ফজিলত: কেন এটি অনন্য?

    শবে বরাত মূলত তিনটি কারণে অনন্য:

    1. সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা: আল্লাহ তায়ালা এই রাতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং রহমতের আহ্বান জানান। তিনি মুশরিক এবং অন্তরে হিংসা পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি দেন।
    2. তকদির ও ফয়সালা: অনেক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, এই রাতে পরবর্তী এক বছরের জন্ম, মৃত্যু এবং রিজিকের বাজেট ফেরেশতাদের কাছে ন্যস্ত করা হয়। যদিও প্রকৃত জ্ঞান আল্লাহর কাছে, তবে বান্দা এই রাতে দোয়ার মাধ্যমে তার আগামীর কল্যাণ প্রার্থনা করে।
    3. রমজানের প্রস্তুতি: শবে বরাত হলো পবিত্র রমজানের আগমনী বার্তা। এটি মুমিনকে আধ্যাত্মিক ও মানসিকভাবে সিয়াম সাধনার জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

    শবে বরাতের শরিয়তসম্মত আমল (বিস্তারিত গাইড)

    এই রাতে ইবাদতের কোনো ধরাবাঁধা পদ্ধতি নেই। তবে সালাফদের অনুসরণ করে আমরা নিম্নোক্ত আমলগুলো করতে পারি:

    ক. নফল নামাজ ও দীর্ঘ সিজদা

    এই রাতে মাগরিবের পর থেকেই ইবাদত শুরু করা যায়। আপনি দুই রাকাত করে যত ইচ্ছা নফল নামাজ পড়তে পারেন। নামাজের কোনো বিশেষ সুরা বা সংখ্যা নির্দিষ্ট নেই। তবে সিজদায় অধিক সময় থাকা এবং আল্লাহর কাছে রোনাজারি করা উত্তম।

    খ. সালাতুত তাসবিহ

    রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর চাচা হযরত আব্বাস (রা.)-কে এই নামাজ শিক্ষার দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন এটি সম্ভব হলে প্রতিদিন, না হলে সপ্তাহে বা মাসে বা জীবনে অন্তত একবার পড়তে। শবে বরাতের নিস্তব্ধতায় এই নামাজ পড়া অত্যন্ত বরকতময়।

    গ. তওবা ও ইস্তিগফার

    এই রাতের আসল উদ্দেশ্য হলো তওবা। অতীতের গুনাহের জন্য লজ্জিত হওয়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা।

    ঘ. কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির

    পবিত্র কুরআনের সুরা ইয়াসিন, সুরা আর-রাহমান, সুরা ওয়াকিয়া এবং সুরা মুলক তিলাওয়াত করা যেতে পারে। এছাড়া সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ এবং দরুদ শরিফ পাঠ করা মুমিনের হৃদয়কে সজীব করে।

    ঙ. কবর জিয়ারত

    রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছিলেন। তাই আপনার আত্মীয়-স্বজন যারা কবরে আছেন, তাদের জন্য দোয়া করা সুন্নাত সমর্থিত আমল।

    শবে বরাতের রোজা ২০২৬

    হাদিস অনুযায়ী, শাবান মাসের ১৫ তারিখ (অর্থাৎ শবে বরাতের পরের দিন) রোজা রাখা মুস্তাহাব । ২০২৬ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) এই রোজা রাখার সুযোগ রয়েছে ।

    ২০২৬ সালে আমাদের করণীয় ও বর্জনীয়: একটি সচেতনতামূলক আলোচনা

    ইবাদতের আড়ালে আমরা অনেক সময় এমন কিছু কাজ করি যা আমাদের সওয়াব নষ্ট করে দেয়।

    বর্জনীয় বিষয়সমূহ:

    1. আতশবাজি ও পটকা ফোটানো: এটি কেবল ইসলাম পরিপন্থীই নয়, বরং অমানবিক। অসুস্থ রোগী বা বৃদ্ধদের কষ্টের কারণ হয় এমন কোনো কাজ ইবাদতের রাতে করা জঘন্য অপরাধ।
    2. হালুয়া-রুটির অতি বাড়াবাড়ি: খাবার রান্না করা দোষের নয়, কিন্তু একেই যদি শবে বরাতের প্রধান লক্ষ্য বানানো হয়, তবে তা মূল ইবাদত থেকে আমাদের বিচ্যুত করে।
    3. মসজিদে হইচই: অনেকে দলবদ্ধভাবে মসজিদে গিয়ে গল্পগুজব করেন, যা অন্যদের ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়।
    4. অসতর্ক চলাফেরা: অনেক তরুণ মোটরসাইকেল নিয়ে রেসিং বা অহেতুক ঘোরাঘুরি করে। মনে রাখতে হবে, এটি উৎসবের রাত নয়, এটি কান্নার রাত।

    বর্তমান আধুনিক বিশ্বে শবে বরাতের প্রাসঙ্গিকতা

    ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল যুগে মানুষ যখন মানসিক অবসাদ ও একাকিত্বে ভুগছে, তখন শবে বরাতের মতো রাতগুলো আধ্যাত্মিক থেরাপি হিসেবে কাজ করে। আল্লাহর সাথে নিরিবিলি কথা বলা, নিজের ভুলগুলো স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে মানুষের মানসিক প্রশান্তি অর্জিত হয়। এটি কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং নৈতিক পুনর্জাগরণের রাত।

    শবে বরাত নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা ও সংশোধন

    • ভুল ধারণা ১: শবে বরাতে হালুয়া-রুটি না খেলে ইবাদত কবুল হয় না।
      • সংশোধন: এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। হালুয়া-রুটির সাথে ইবাদতের কোনো সম্পর্ক নেই।
    • ভুল ধারণা ২: এই রাতে ১০০ রাকাত নামাজ পড়তে হবে।
      • সংশোধন: নফল নামাজের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। আপনি ২ রাকাত বা ৪ রাকাত পড়লেও সওয়াব পাবেন, যদি তা ইখলাসের সাথে হয়।
    • ভুল ধারণা ৩: এই রাতে ভাগ্য লেখা হয়, তাই চেষ্টার প্রয়োজন নেই।
      • সংশোধন: ইসলামে দোয়া ও চেষ্টা দুটিরই গুরুত্ব সমান। দোয়া ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটায়, কিন্তু অলস বসে থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়।

    মুক্তির আশায় এক রজনী

    শবে বরাত ২০২৬ আমাদের জন্য এক নতুন সুযোগ। জীবনের ব্যস্ততা, পাপের বোঝা আর না পাওয়ার বেদনা ভুলে এই এক রাতে আমরা মালিকের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে পারি। ১লা মার্চ দিবাগত রাতে যখন সারা বিশ্ব ঘুমিয়ে থাকবে, তখন একজন মুমিনের সিজদায় অবনত হওয়া আর চোখের পানিই হতে পারে জান্নাতের চাবিকাঠি।

    আসুন, আমরা প্রস্তুতি নিই। হিংসা ভুলে মানুষকে ক্ষমা করি, যাতে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করেন । ২০২৬ সালের শবে বরাত আমাদের জীবনে রহমত, বরকত ও হেদায়েতের আলো ছড়িয়ে দিক ।

    1 mins
    Right Menu Icon