বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের ধারায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অপরিচিতা’ একটি ব্যতিক্রমী ও কালজয়ী সংযোজন । বিশ শতকের গোড়ার দিকে লেখা এই গল্পে কেবল একটি অসমাপ্ত ভালোবাসার কাহিনী ফুটে ওঠেনি, বরং ফুটে উঠেছে তৎকালীন সমাজের অন্যতম অভিশাপ যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে এক অদম্য প্রতিবাদের গল্প । উচ্চশিক্ষিত কিন্তু ব্যক্তিত্বহীন যুবক অনুপমের আত্মবিবৃতির মধ্য দিয়ে রূপায়িত হয়েছে একদিকে পরিবারতন্ত্রের সংকীর্ণতা, আর অন্যদিকে শম্ভুনাথ সেন ও তাঁর কন্যা কল্যাণীর আত্মসম্মানবোধ ও বলিষ্ঠ মানসিকতা । ‘অপরিচিতা’ তাই কেবল একটি সামাজিক গল্প নয়; এটি প্রাচীন কুপ্রথা ভেঙে নারীপ্রগতির সূচনার এক অনন্য প্রামাণ্য দলিল, যা একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সাহিত্য ও বাস্তব জীবনের এক গভীর শিক্ষা বহন করে ।
অপরিচিতা গল্পের মূল কথা
‘অপরিচিতা’ গল্পের মূল কথা হলো যৌতুকপ্রথার অবমাননাকর রূপ প্রকাশ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ এবং আত্মমর্যাদাবোধে বলীয়ান আধুনিক নারীর উত্থান । গল্পের নায়ক অনুপম উচ্চশিক্ষিত হয়েও মামা ও পরিবারতন্ত্রের কাছে ব্যক্তিত্বহীন এক পুতুলমাত্র । বিয়ের আসরে বরপক্ষ কর্তৃক গহনা মেপে দেখার মতো কুরুচিপূর্ণ ঘটনার জবাবে কল্যাণীর বাবা শম্ভুনাথ সেন বিয়ে ভেঙে দিয়ে সামাজিক কুপ্রথা ও বরপক্ষের অহংকারকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন । অন্যদিকে, লগ্নভ্রষ্ট হওয়ার ভীতিকে পেছনে ফেলে কল্যাণী জীবনকে অর্থপূর্ণ করতে নারীশিক্ষা ও দেশসেবার ব্রত গ্রহণ করে । এই ঘটনার মধ্য দিয়ে অনুপমের ভেতরের ভীরুতার বিনাশ ঘটে এবং তার মধ্যে গভীর অনুশোচনা ও আত্মোপলব্ধির জন্ম নেয় । সংক্ষেপে, গল্পটির মূল কথা হলো— অন্ধ সামাজিক প্রথা ও যৌতুকলোভী মানসিকতাকে ছুড়ে ফেলে ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মান ও দেশপ্রেমে জাগ্রত হওয়ার আহ্বান ।
Views: 0

