শিশুদের হাম হলে কি করণীয় | লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

শৈশব কাল মানেই নতুন নতুন রোগের সাথে পরিচয় । কিন্তু কিছু কিছু রোগ আছে যা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মোকাবিলা করা জরুরি, তাদের মধ্যে একটি হলো হাম (Measles)। এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের আক্রমণ করে। “শিশুদের হাম হলে কি করণীয়” – এই প্রশ্নটি প্রতিটি অভিভাবকের মনেই আসে। সঠিক তথ্য ও দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই রোগকে সহজেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব এবং এর ভয়াবহ জটিলতা থেকে শিশুকে রক্ষা করা যায়।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বে হাম এখনও একটি বড় স্বাস্থ্য হুমকি । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শিশু হামে আক্রান্ত হয় । শুধু তাই নয়, টিকা না নেওয়া বা অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে । চলুন, তাই আজ আমরা হাম নিয়ে বিস্তারিত জেনে নেই এবং জেনে নেই কীভাবে আমাদের ছোট্ট সোনামণিকে এই রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখা যায় ।
আরও পড়ুনঃ
- চিকেন পক্স বা জল বসন্ত রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও করণীয়
- এইডস রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও করণীয়
- যক্ষ্মা রোগের লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা
হাম কী এবং কেন হয়?
হাম মূলত মরবিলিভাইরাস (Morbillivirus) নামক এক ধরনের ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। এই ভাইরাসটি শিশুর শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে । হাম এতটাই সংক্রামক যে, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা টিকা না নেওয়া ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন ।

হাম ছড়ানোর প্রধান কারণগুলো:
- বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানো: আক্রান্ত ব্যক্তি যখন হাঁচি বা কাশি দেন, তখন ভাইরাসযুক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে । সুস্থ শিশু সেই বাতাসের মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাস নিলে আক্রান্ত হতে পারে । আশ্চর্যজনকভাবে, এই ভাইরাস বাতাসে প্রায় ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে ।
- টিকা না নেওয়া: হাম প্রতিরোধের একমাত্র এবং সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো টিকা । যেসব শিশু হামের টিকা (MMR ভ্যাকসিন) নেয়নি, তাদের শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না, ফলে তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে ।
- দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: অপুষ্টিতে ভোগা শিশু বা যাদের অন্য কোনো কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা সহজেই হামে আক্রান্ত হতে পারে এবং তাদের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকিও অনেক বেশি থাকে।
- জনাকীর্ণ পরিবেশ ও ভ্রমণ: স্কুল, ডে-কেয়ার সেন্টার বা জনাকীর্ণ এলাকায় হাম দ্রুত ছড়াতে পারে। এছাড়া, যে দেশগুলোতে টিকার হার কম, সেসব দেশে ভ্রমণের মাধ্যমেও শিশু হামের ভাইরাস বহন করে আনতে পারে।
শিশুদের হামের লক্ষণগুলি কী কী? (পর্যায়ভিত্তিক বিশ্লেষণ)
হামের লক্ষণগুলো সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রকাশ পেতে শুরু করে। এই রোগটি প্রধানত তিনটি ধাপে অগ্রসর হয়।
১. প্রাথমিক লক্ষণ বা প্রোড্রোমাল পর্যায়:
এই সময় সাধারণ জ্বর-সর্দির মতো লক্ষণ দেখা দেয়, যা ২ থেকে ৪ দিন স্থায়ী হয় ।
- জ্বর: সাধারণত ১০২° ফারেনহাইট বা তার বেশি জ্বর থাকে।
- শুকনো কাশি ও সর্দি: ভাইরাসটি শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ করায় প্রচণ্ড শুকনো কাশি এবং নাক দিয়ে পানি পড়তে থাকে।
- চোখ লাল হওয়া: কনজাংটিভাইটিসের মতো চোখ লাল হয়ে যায় এবং চোখ দিয়ে পানি পড়তে পারে। শিশু আলোর দিকে তাকাতে ভয় পায় (ফটোফোবিয়া)।
- কপলিক স্পটস (Koplik Spots): এটি হামের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। জ্বর শুরু হওয়ার ২-৩ দিন পর শিশুর গালের ভেতরের দিকে ছোট ছোট সাদা বা ধূসর বর্ণের দানা দেখা যায়, যাকে কপলিক স্পটস বলে। ফুসকুড়ি ওঠার আগে এই দাগ দেখা যায়।

২. ফুসকুড়ি ওঠার পর্যায় বা এক্সানথেমাটাস পর্যায়:
প্রাথমিক লক্ষণগুলোর পর শুরু হয় ফুসকুড়ি ওঠার ধাপ।
- লাল ফুসকুড়ি: প্রথমে কানের পিছন দিক, মুখ ও ঘাড়ে ছোট ছোট লাল দানা (ম্যাকুলোপ্যাপুলার র্যাশ) দেখা দেয়। এরপর ৩-৫ দিনের মধ্যে এই ফুসকুড়ি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে—বুক, পিঠ, হাত-পা সব জায়গায়। ফুসকুড়ি ওঠার সময় জ্বর আরও বেড়ে যেতে পারে, এমনকি ১০৫° ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
৩. আরোগ্যলাভের পর্যায় বা কনভালেসেন্ট পর্যায়:
ফুসকুড়ি ওঠা শুরু করার ৩-৫ দিন পর থেকে জ্বর কমতে শুরু করে এবং শিশু ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকে। ফুসকুড়িগুলো গাঢ় বাদামি রং ধারণ করে এবং পরে খসখসে হয়ে উঠে। এই দাগ কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থেকেই মিলিয়ে যায়।
শিশুদের হাম হলে কি করণীয়: করণীয় ও বর্জনীয়
হামের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। মূল চিকিৎসা হলো লক্ষণগুলোর উপশম করা এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা।
👉 করণীয় (Do’s):
- বিশ্রাম ও বিচ্ছিন্নতা: শিশুকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখুন। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায়, ফুসকুড়ি ওঠার ৫ দিন আগে থেকে ৪ দিন পর পর্যন্ত তাকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখুন। তাকে একটি আলাদা, বায়ু চলাচল করে এমন রুমে রাখুন।
- তরল খাবার ও পুষ্টি: জ্বর ও সংক্রমণের কারণে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। তাই শিশুকে বারবার পানি, স্যালাইন, ফলের জুস, ডাবের পানি ইত্যাদি খাওয়ান। পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য খাবার (যেমন খিচুড়ি, স্যুপ) দিন।
- জ্বর কমানো: শিশুর জ্বর ও শরীরের ব্যথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়াতে পারেন।
- চোখের যত্ন: চোখ লাল ও ফোলা থাকায় শিশুকে কম আলোয় রাখুন। তুলা বা নরম কাপড় হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে আলতো করে চোখ পরিষ্কার করে দিন।
- ভিটামিন এ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, হাম আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো জরুরি। এটি হামের জটিলতা, বিশেষ করে অন্ধত্ব প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুটি ডোজ দেওয়া হয়—রোগ নির্ণয়ের পরপরই একটি এবং পরের দিন আরেকটি।

👉 বর্জনীয় (Don’ts):
- এসপিরিন দেওয়া যাবে না: শিশুদের জ্বর কমানোর জন্য কখনোই এসপিরিন (Aspirin) দেবেন না। এটি ‘রেই’ সিনড্রোম (Reye’s Syndrome) নামক একটি মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
- অ্যান্টিবায়োটিক নয়: হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এতে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কখনোই অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না। তবে, হামের কারণে যদি কানের ইনফেকশন বা নিউমোনিয়ার মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন।
- ঘরোয়া টোটকা নয়: অনেকে হামের ফুসকুড়িতে বিভিন্ন প্রলেপ দেন, যা ক্ষতিকর হতে পারে। কোনো প্রকার ক্রিম বা ওষুধ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া লাগাবেন না।
- কাশির সিরাপে সতর্কতা: ৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণ কাশির সিরাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকাই ভালো। পরিবর্তে, রুমে গরম পানির ভাপ দিলে কাশি থেকে আরাম পাওয়া যায়।
কখন ডাক্তার দেখাবেন জরুরি?
যদি নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে অবশ্যই শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান:
- শিশুর জ্বর ১০৫° ফারেনহাইটের উপরে উঠে গেলে।
- শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হলে বা দ্রুত শ্বাস নিলে (নিউমোনিয়ার লক্ষণ)।
- শিশু অতিরিক্ত ঘুমিয়ে পড়লে বা চেতনা হারালে।
- যদি খিঁচুনি শুরু হয়।
- শিশু যদি কোনো তরল পদার্থই গলাধঃকরণ করতে না পারে বা খেতে না পারে।
- কানে ব্যথার কথা বললে বা কান দিয়ে পুঁজ পড়লে।
- ফুসকুড়ি ৩ দিনের বেশি স্থায়ী হলে বা ফুসকুড়ির রং বেগুনি হয়ে গেলে।
হামের সম্ভাব্য জটিলতাগুলি কী কী?
হামকে সাধারণ রোগ ভাবলে ভুল হবে। এটি মারাত্মক কিছু জটিলতা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে। প্রায় ৩০% হাম রোগী এক বা একাধিক জটিলতার শিকার হন।
- নিউমোনিয়া: এটি হামজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ।
- ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা।
- কানের ইনফেকশন (ওটিটিস মিডিয়া): যা স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি নষ্ট করতে পারে।
- এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ): এটি একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জটিলতা, যা মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
- অন্ধত্ব: ভিটামিন এ-এর অভাবে থাকা শিশুদের মধ্যে হাম অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।
হাম প্রতিরোধের উপায়: টিকাই মূলমন্ত্র
হাম প্রতিরোধের একমাত্র অস্ত্র হলো টিকা। বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়।
- এমআর (MR) ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ: শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে।
- এমআর (MR) ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ (বুস্টার): শিশুর বয়স ১৫ মাস পূর্ণ হলে।
এই দুটি ডোজ শিশুকে হাম থেকে ৯৭% এর বেশি সুরক্ষা দেয়। টিকা দেওয়ার পরও হাম হলে তা খুবই মৃদু আকারে হয় এবং জটিলতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা:
- যদি আপনার শিশু (৬-৯ মাস বয়সী) কোনো হাম আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসে, তাহলে তাকে ইমিউনোগ্লোবুলিন ইনজেকশন দেওয়া যেতে পারে (সংস্পর্শে আসার ৭ দিনের মধ্যে)।
- যদি শিশুর বয়স ৯-১২ মাস হয় এবং হাম রোগীর সংস্পর্শে আসে, তাহলে সংস্পর্শে আসার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এমআর ভ্যাকসিনের একটি ডোজ দিলে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা ও সঠিক তথ্য
- ভুল ধারণা: “হাম হলে গোসল করানো যাবে না।”
- সঠিক তথ্য: বরং হাম হলে নিয়মিত হালকা গরম পানিতে গোসল করালে বা ভেজা তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে দিলে জ্বর কমে এবং আরাম পাওয়া যায়।
- ভুল ধারণা: “হাম হলে লাল রং দেখলে বা ইলিশ মাছ খেলে ফুসকুড়ি বাড়ে।”
- সঠিক তথ্য: এটি সম্পূর্ণ কুসংস্কার। হামের ফুসকুড়ি রোগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। এতে কোনো খাবারের প্রভাব নেই। শিশুকে পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে।
- ভুল ধারণা: “একবার হাম হলে আর হয় না।”
- সঠিক তথ্য: হামের জীবাণুতে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হলে শরীরে আজীবনের জন্য প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু টিকা না নেওয়া শিশুও হামে আক্রান্ত হতে পারে।
উপসংহার
শিশুদের হাম হলে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য্যের সাথে সঠিক যত্ন নিতে হবে। হামের সঠিক লক্ষণগুলো জানা, দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া এবং ঘরোয়াভাবে শিশুর আরামের ব্যবস্থা করাই হলো মূল চাবিকাঠি। মনে রাখবেন, হাম প্রতিরোধে টিকার কোনো বিকল্প নেই। সময়মতো টিকা দেওয়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের শিশুদের এই সংক্রামক ও সম্ভাব্য প্রাণঘাতী রোগ থেকে রক্ষা করতে পারি। আপনার সচেতনতাই আপনার শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করবে।
Disclaimer: এই ব্লগ পোস্টটি শুধুমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি। শিশুর হাম হলে অবশ্যই নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

