• জীবনী
  • হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর জীবনী
  • হযরত মুহাম্মদ সাঃ: জীবনী, শিক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর জীবনী

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ: বিশ্ব মানবতার জন্য রহমতস্বরূপ

    পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে যারা মানবসভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন । তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ নবী হলেন হযরত মুহাম্মদ সাঃ । ষষ্ঠ শতাব্দীতে যখন আরবসহ পুরো বিশ্ব অন্ধকার, কুসংস্কার, এবং অরাজকতায় নিমজ্জিত ছিল, তখন তিনি আলোর মশাল নিয়ে আবির্ভূত হন । মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম । শুধু ধর্মীয় নেতা হিসেবেই নয়, তিনি একজন আদর্শ শাসক, দক্ষ সেনাপতি, অনন্য শিক্ষক এবং মানবতার মুক্তির দূত ছিলেন । তাঁর জীবনী শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা ও পথনির্দেশের অমূল্য উৎস । এই ব্লগে আমরা মহানবী (সা.)-এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো বিস্তারিত আলোচনা করব ।

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ জন্ম ও বংশ পরিচয়

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর জন্ম ও বংশ পরিচয় ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বরকতময় অধ্যায়। তাঁর বংশধারা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে পবিত্র এবং সুসংগঠিত বংশতালিকা হিসেবে স্বীকৃত। নিচে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে এই অধ্যায়টি তুলে ধরা হলো:

    ১. পবিত্র জন্মলগ্নের প্রেক্ষাপট

    ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরবের মরুপ্রান্তরে যখন আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক অন্ধকার চরম সীমায় পৌঁছেছিল, তখন এক줄 মহাজ্যোতি হিসেবে হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর আবির্ভাব ঘটে।

    • তারিখ: ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের (হস্তিবাহিনীর ঘটনার বছর) ১২ই রবিউল আউয়াল, সোমবার সুবহে সাদিকের সময় জন্মগ্রহণ করেন।
    • স্থান: আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশের ‘বনু হাশিম’ গোত্রের এক সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ঘরে তিনি ভূমিষ্ঠ হন।
    • অলৌকিক নিদর্শন: তাঁর জন্মের সময় সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ প্রকম্পিত হয়েছিল এবং পারস্যের হাজার বছরের প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা নিভে গিয়েছিল বলে নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত আছে।

    ২. অভিজাত বংশ পরিচয় (নাসাবনামা)

    মুহাম্মদ সাঃ-এর বংশধারা সরাসরি হযরত ইব্রাহিম আঃ-এর পুত্র হযরত ইসমাইল আঃ-এর সাথে মিলিত হয়েছে। তাঁর বংশের প্রতিটি স্তর ছিল অত্যন্ত পবিত্র এবং চারিত্রিক দিক থেকে অনন্য।

    ক) পিতার দিক থেকে বংশধারা:

    মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব বিন হাশিম বিন আব্দে মানাফ বিন কুসাই বিন কিলাব বিন মুররাহ বিন কাব বিন লুয়াই বিন গালিব বিন ফিহর (যাকে কুরাইশ বলা হয়)।

    এই বংশের প্রধান শাখাগুলো হলো:

    1. আব্দুল মুত্তালিব (দাদা): তিনি ছিলেন মক্কার কুরাইশদের নেতা এবং জমজম কূপের পুনঃখননকারী। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
    2. হাশিম (প্রপিতামহ): তাঁর নামানুসারেই এই গোত্রকে ‘বনু হাশিম’ বলা হয়। তিনি হাজীদের আপ্যায়নের প্রথা চালু করেছিলেন।

    খ) মাতার দিক থেকে বংশধারা:

    মুহাম্মদ সাঃ-এর মাতা ছিলেন বিবি আমিনা । তিনি মদীনার বনু জুহরা গোত্রের প্রধান ওয়াহাব বিন আব্দে মানাফের কন্যা ছিলেন। আমিনা ছিলেন সমকালীন আরব নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমতী এবং মার্জিত আচরণের অধিকারিণী।

    ৩. পিতৃহীন শৈশব ও অলৌকিকত্ব

    মুহাম্মদ সাঃ পৃথিবীতে আসার আগেই তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। আব্দুল্লাহ ছিলেন তাঁর পিতার প্রিয় সন্তান এবং অত্যন্ত সুশ্রী যুবক। ব্যবসায়িক সফরে মদীনায় থাকাকালীন তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যান। ফলে নবীজি সাঃ জন্ম থেকেই ছিলেন এতিম।

    পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

    “তিনি কি আপনাকে এতিম হিসেবে পাননি, অতঃপর আশ্রয় দেননি?” (সূরা দোহা: ৬)

    ৪. কুরাইশ বংশের মর্যাদা

    তৎকালীন আরবে ‘কুরাইশ’ বংশ ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী। তারা পবিত্র কাবা ঘরের রক্ষণাবেক্ষণকারী ছিল। আরবের অন্যান্য গোত্রগুলো কুরাইশদের অত্যন্ত সম্মান করত। আল্লাহ তাআলা তাঁর শেষ নবীকে আরবের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বিশুদ্ধ ভাষাভাষী বংশে প্রেরণ করেছেন যাতে তাঁর দাওয়াত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।

    ৫. নাম রাখা ও নামকরণ

    জন্মের সপ্তম দিনে তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব একটি মেষ জবাই করে আকিকা করেন এবং কুরাইশদের ভোজের দাওয়াত দেন।

    • মুহাম্মদ: দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’, যার অর্থ— “অত্যধিক প্রশংসিত”। আরবরা এই নাম শুনে অবাক হয়েছিল কারণ এটি তৎকালীন সময়ে প্রচলিত ছিল না।
    • আহমদ: তাঁর মাতা বিবি আমিনা স্বপ্নের মাধ্যমে প্রাপ্ত নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর নাম রেখেছিলেন ‘আহমদ’, যার অর্থ— “সর্বাধিক প্রশংসা অর্জনকারী”।

    ৬. দুগ্ধপান ও লালন-পালন (দাই হালিমা)

    আরবের অভিজাত বংশের প্রথা অনুযায়ী, শিশুদের সুস্থ সবল করে গড়ে তোলার জন্য মরুর উন্মুক্ত বাতাসে ধাত্রীদের কাছে পাঠানো হতো।

    • মুহাম্মদ সাঃ-কে লালন-পালনের দায়িত্ব পান বনু সাদ গোত্রের হালিমা সাদিয়া
    • হালিমার ঘরে যাওয়ার পর তাঁর অভাবগ্রস্ত সংসারে বরকত নেমে আসে । তাঁর মরা পশুর ওলান দুধে ভরে ওঠে এবং মরুভূমিতে ঘাস জন্মাতে শুরু করে । দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি দাই হালিমার কাছে অতিবাহিত করেন ।

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ- এর পিতৃ-মাতৃহীন শৈশব

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর শৈশব ছিল বিরহ, ধৈর্য এবং আল্লাহর বিশেষ কুদরতের এক সংমিশ্রণ। জাগতিক কোনো অভিভাবকের ছায়া ছাড়াই আল্লাহ তাআলা তাঁকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর পিতৃ-মাতৃহীন শৈশবের বিস্তারিত ইতিবৃত্ত নিচে আলোচনা করা হলো:

    ১. জন্মের পূর্বেই পিতৃহীনতা

    মুহাম্মদ সাঃ-এর জন্মের প্রায় ছয় মাস আগে তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ব্যবসায়িক সফর থেকে ফেরার পথে মদীনায় ইন্তেকাল করেন । ফলে নবীজি সাঃ যখন পৃথিবীতে আসেন, তখন তিনি ছিলেন এক ‘ইয়াতিম’ বা অনাথ শিশু । আরবের তৎকালীন সমাজে এতিমদের অবস্থা খুব একটা সম্মানজনক ছিল না, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে কুরাইশদের শ্রেষ্ঠ বংশমর্যাদা দিয়ে রক্ষা করেছিলেন ।

    ২. দাই হালিমার গৃহে শৈশব (মরু প্রান্তরে পাঁচ বছর)

    মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোর প্রথা ছিল শিশুদের শুদ্ধ ভাষা শিক্ষা এবং শারীরিক গঠনের জন্য মরুভূমির মুক্ত বাতাসে লালন-পালন করা ।

    • ধাত্রী নির্বাচন: বনু সাদ গোত্রের হালিমা সাদিয়া নামক এক দরিদ্র নারী তাঁকে লালন-পালনের দায়িত্ব পান।
    • বরকতের সূচনা: হালিমা সাঃ-এর কোলে আসার সাথে সাথেই তাঁর অভাবী সংসারে অলৌকিক পরিবর্তন আসে। হালিমার দুর্বল উট ও বকরিগুলো দুধে ভরে ওঠে এবং মরুভূমির শুষ্ক প্রান্তরে ঘাস জন্মাতে শুরু করে।
    • বক্ষ বিদারণ (শাক্কুস সদর): চার বছর বয়সে ফেরেশতা জিবরাঈল আঃ এসে মুহাম্মদ সাঃ-এর বক্ষ বিদীর্ণ করেন এবং তাঁর হৃদয় থেকে একটি কালো অংশ (শয়তানের অংশ বা নফস) অপসারণ করে তা জমজমের পানি দিয়ে ধুয়ে পবিত্র করেন। এই ঘটনার পর হালিমা ভীত হয়ে তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেন।

    ৩. জননী আমিনার ইন্তেকাল ও মাতৃহীনতা

    ছয় বছর বয়সে মুহাম্মদ সাঃ তাঁর মা বিবি আমিনার সাথে মদীনায় যান পিতার কবর জিয়ারত করতে। সফর শেষে মক্কায় ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে বিবি আমিনা গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন।

    • ছয় বছরের ছোট্ট শিশু মুহাম্মদ সাঃ মাঝপথে মাকে হারিয়ে একা হয়ে পড়েন।
    • দাসী উম্মে আয়মান তাঁকে নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। এই সময় থেকে তিনি মাতৃহীন এতিম হিসেবে বড় হতে থাকেন।

    ৪. দাদা আব্দুল মুত্তালিবের স্নেহচ্ছায়া

    মাকেও হারানোর পর তাঁর অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নেন তাঁর বৃদ্ধ দাদা আব্দুল মুত্তালিব। তিনি নাতিকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন।

    • কাবার চত্বরে আব্দুল মুত্তালিবের জন্য একটি বিশেষ গালিচা বিছানো থাকত, যেখানে অন্য কারো বসার সাহস ছিল না। কিন্তু ছোট্ট মুহাম্মদ সাঃ সেখানে গিয়ে বসতেন এবং দাদা তাঁকে পরম স্নেহে কাছে টেনে নিতেন।
    • দীর্ঘ দুই বছর পর, যখন নবীজির বয়স আট বছর, তখন দাদা আব্দুল মুত্তালিবও ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর পুত্র আবু তালিবকে মুহাম্মদ সাঃ-এর দায়িত্ব দিয়ে যান।

    ৫. চাচা আবু তালিবের আশ্রয় ও কর্মজীবন

    আট বছর বয়স থেকে মুহাম্মদ সাঃ তাঁর চাচা আবু তালিবের পরিবারে বড় হতে থাকেন। আবু তালিব আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন না, কিন্তু তিনি নবীজিকে অত্যন্ত আগলে রাখতেন।

    • রাখাল জীবন: শৈশবে তিনি মক্কাবাসীদের ছাগল চরাতেন। পরবর্তী জীবনে তিনি বলেছিলেন, “আল্লাহ যত নবী পাঠিয়েছেন, তারা সবাই ছাগল চরিয়েছেন।” এটি তাঁর চরিত্রের বিনয় ও কঠোর পরিশ্রমের উদাহরণ।
    • ব্যবসায়িক সফর: ১২ বছর বয়সে চাচার সাথে প্রথম সিরিয়া সফরে যান। পথিমধ্যে ‘বুহাইরা’ নামক এক খ্রিষ্টান পাদ্রি তাঁকে দেখে শেষ নবী হিসেবে চিনতে পারেন এবং আবু তালিবকে সতর্ক করেন যাতে কুরাইশ বা ইহুদিরা তাঁর ক্ষতি করতে না পারে।

    কেন তিনি পিতৃ-মাতৃহীন ছিলেন?

    ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, মুহাম্মদ সাঃ-এর পিতৃ-মাতৃহীন হওয়ার পেছনে গভীর হিকমত বা কারণ ছিল:

    1. মানুষের প্রভাবমুক্ত থাকা: যাতে কেউ বলতে না পারে যে, মুহাম্মদ সাঃ তাঁর পিতা বা দাদার কাছ থেকে ধর্ম বা দর্শন শিখেছেন।
    2. সরাসরি আল্লাহর লালন-পালন: তাঁর শিক্ষক এবং অভিভাবক স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ছিলেন।
    3. এতিমদের প্রতি সহমর্মিতা: তিনি নিজে এতিম হওয়ায় সারা বিশ্বের অসহায় ও এতিম শিশুদের দুঃখ অনুভব করতে পেরেছিলেন এবং তাদের অধিকার আদায়ে আজীবন কাজ করেছেন।

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ- এর শৈশবের বিশেষ ঘটনা

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর শৈশব ছিল অলৌকিকত্ব, পবিত্রতা এবং বিশেষ বিশেষ ঘটনায় ঘেরা । এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ছোটবেলা থেকেই তিনি মহান আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধানে ছিলেন । নিচে শৈশবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ ঘটনাগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

    ১. বক্ষ বিদারণ বা ‘শাক্কুস সদর’ (Heart Cleansing)

    এটি নবীজি সাঃ-এর শৈশবের সবচেয়ে অলৌকিক ও বিস্ময়কর ঘটনা।

    • প্রেক্ষাপট: যখন তিনি দাই হালিমার ঘরে চার বছর বয়সী শিশু, তখন একদিন সমবয়সী শিশুদের সাথে (দুধভাইদের সাথে) বকরী চরাচ্ছিলেন।
    • ঘটনা: হঠাৎ ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ) এবং অন্য একজন ফেরেশতা সাদা পোশাক পরে সেখানে উপস্থিত হন। তাঁরা মুহাম্মদ সাঃ-কে ধরে শুইয়ে দেন এবং তাঁর বুক বিদীর্ণ করেন।
    • পবিত্রতা: তাঁরা তাঁর হৃৎপিণ্ড বের করে আনেন এবং সেখান থেকে একটি কালো জমাট রক্ত (যা শয়তানের প্ররোচনার উৎস বলে ধরা হয়) অপসারণ করেন। এরপর জমজমের পানি দিয়ে সোনার তশতরিতে তাঁর হৃৎপিণ্ড ধুয়ে আবার যথাস্থানে স্থাপন করে বুক জোড়া দিয়ে দেন।
    • ফলাফল: এই ঘটনার পর সাথী শিশুরা ভয় পেয়ে হালিমার কাছে গিয়ে বলে, “মুহাম্মদকে মেরে ফেলা হয়েছে!” হালিমা দ্রুত গিয়ে দেখেন তিনি অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু তাঁর মুখমণ্ডলে এক অপার্থিব আভা। এই ঘটনার মাধ্যমেই তাঁকে ভবিষ্যৎ নবুওয়াতের জন্য অভ্যন্তরীণভাবে পবিত্র করা হয়।

    ২. দাই হালিমার ঘরে বরকতের জোয়ার

    মুহাম্মদ সাঃ যখন বনু সাদ গোত্রে হালিমার কাছে যান, তখন সেই এলাকা ছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে।

    • অলৌকিক পরিবর্তন: হালিমা সাদিয়া ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র এবং তাঁর গাধাটি ছিল চলৎশক্তিহীন। কিন্তু মুহাম্মদ সাঃ-কে কোলে নেওয়ার সাথে সাথেই তাঁর গাধাটি দ্রুত চলতে শুরু করে।
    • প্রাণীর সজীবতা: হালিমার যে বকরীগুলো এক ফোঁটা দুধ দিত না, মুহাম্মদ সাঃ-এর বরকতে সেগুলোর ওলান দুধে ভরে যায়। মরুভূমির শুকনো ঘাস সবুজ হয়ে ওঠে। হালিমার নিজের সন্তানরা যেখানে ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদত, সেখানে মুহাম্মদ সাঃ-এর আসার পর থেকে ঘরে খাবারের অভাব দূর হয়ে যায়।

    ৩. মেঘের ছায়া প্রদান

    নবীজি সাঃ যখন ছোটবেলায় মক্কার উত্তপ্ত রোদে হাঁটতেন বা কাজ করতেন, তখন দেখা যেত একটি মেঘখণ্ড তাঁর মাথার ওপর সব সময় ছায়া দিয়ে রাখত।

    • এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর জন্য বিশেষ সুরক্ষা।
    • এই মেঘের ছায়া দেখেই পরবর্তীতে সিরিয়া সফরের সময় পাদ্রিরা তাঁকে চিনেছিলেন যে, তিনিই সেই প্রতিশ্রুত শেষ নবী।

    ৪. বুহাইরা পাদ্রির ভবিষ্যদ্বাণী

    ১২ বছর বয়সে চাচা আবু তালিবের সাথে প্রথম সিরিয়া সফরে যান মুহাম্মদ সাঃ।

    • সাক্ষাৎ: পথিমধ্যে ‘বুসরা’ নামক স্থানে বুহাইরা নামের একজন খ্রিস্টান পাদ্রি লক্ষ্য করেন যে, একটি কাফেলা আসার সময় গাছপালা এবং পাথর সিজদাবনত হচ্ছে এবং মেঘ তাদের ওপর ছায়া দিচ্ছে।
    • সনাক্তকরণ: তিনি কাফেলাটিকে দাওয়াত দেন এবং ছোট মুহাম্মদ সাঃ-এর সাথে কথা বলেন। তাঁর পিঠে ‘মোহরে নবুওয়াত’ (নবুওয়াতের সীল) দেখে তিনি আবু তালিবকে বলেন, “আপনার এই ভ্রাতুষ্পুত্রকে মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যান এবং ইহুদিদের থেকে সাবধানে রাখুন। কারণ ভবিষ্যতে এ শিশুটি পৃথিবীর মহান ব্যক্তি হতে যাচ্ছে।”
    আরও পড়ুন:  হযরত আবু বকর (রাঃ): জীবনী, খিলাফত ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলি

    ৫. ‘হিলফুল ফুজুল’ বা শান্তি সংঘ গঠন

    কৈশোরের শেষ দিকে তিনি মক্কায় গোত্রে গোত্রে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ (হারবুল ফিজার) দেখেন।

    • উদ্যোগ: যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে তাঁর কোমল হৃদয় কেঁদে ওঠে। তিনি শান্তি ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য সমমনা কিছু যুবকদের নিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলেন, যার নাম ‘হিলফুল ফুজুল’
    • শপথ: এই সংঘের মূল উদ্দেশ্য ছিল— অসহায়দের সাহায্য করা, জুলুম বন্ধ করা এবং মক্কায় আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটি তাঁর সমাজ সংস্কারক গুণের প্রথম সার্থক বহিঃপ্রকাশ।

    ৬. ‘আল-আমিন’ উপাধি লাভ

    শৈশব ও কৈশোর থেকেই তাঁর সততা ছিল প্রবাদতুল্য। মক্কায় মানুষ যখন একে অপরকে বিশ্বাস করত না, তখন সবাই তাদের মূল্যবান ধন-সম্পদ মুহাম্মদ সাঃ-এর কাছে আমানত রাখত। কোনোদিন তিনি মিথ্যে বলেননি এবং কারো সাথে প্রতারণা করেননি। একারণেই মক্কাবাসীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁকে ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্ত) উপাধিতে ভূষিত করে।


    হযরত মুহাম্মদ সাঃ- এর বিবাহ ও পারিবারিক জীবন

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর বিবাহ এবং পারিবারিক জীবন ছিল প্রেম, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য এবং ত্যাগের এক অনন্য সংমিশ্রণ । তাঁর পারিবারিক জীবনের প্রতিটি পর্যায় থেকে আধুনিক বিশ্বের মানুষের জন্য শেখার মতো বহু আদর্শ রয়েছে । নিচে বিস্তারিতভাবে তাঁর বিবাহ ও পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হলো:

    ১. বিবি খাদিজা (রাঃ)-এর সাথে প্রথম বিবাহ

    নবীজি সাঃ-এর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘ অধ্যায় ছিল বিবি খাদিজা (রাঃ)-এর সাথে তাঁর দাম্পত্য জীবন।

    • প্রেক্ষাপট: ২৫ বছর বয়সে মুহাম্মদ সাঃ বিবি খাদিজার ব্যবসায়িক প্রতিনিধি হয়ে সিরিয়া যান। তাঁর অভাবনীয় সততা, আমানতদারিতা এবং ব্যবসায়িক সাফল্য দেখে বিবি খাদিজা অভিভূত হন।
    • বিয়ের প্রস্তাব: তৎকালীন আরবের অত্যন্ত সম্পদশালী ও বিদুষী নারী হওয়া সত্ত্বেও, খাদিজা (রাঃ) নিজেই তাঁর বান্ধবী নাফিসার মাধ্যমে নবীজিকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান।
    • দাম্পত্য জীবন: মুহাম্মদ সাঃ-এর বয়স তখন ২৫ এবং খাদিজা (রাঃ)-এর বয়স ছিল ৪০ বছর। তাদের এই দাম্পত্য জীবন দীর্ঘ ২৫ বছর স্থায়ী হয়েছিল। খাদিজা (রাঃ) বেঁচে থাকতে নবীজি আর কোনো বিয়ে করেননি।
    • প্রথম ঈমানদার: নবুওয়াত লাভের পর যখন নবীজি ভীত ও শঙ্কিত ছিলেন, তখন খাদিজা (রাঃ) তাঁকে সাহস দিয়েছিলেন এবং তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

    ২. নবীজি সাঃ-এর সন্তানসন্ততি

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর মোট ৭ জন সন্তান ছিলেন (৬ জন বিবি খাদিজার গর্ভে এবং ১ জন মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে)।

    সন্তানের নামমাতাবিশেষ তথ্য
    কাসেমখাদিজা (রাঃ)শৈশবেই ইন্তেকাল করেন। তাঁর নামানুসারেই নবীজিকে ‘আবুল কাসেম’ ডাকা হতো।
    জয়নব (রাঃ)খাদিজা (রাঃ)জ্যেষ্ঠ কন্যা। আবু আল-আস বিন আল-রাবির সাথে বিবাহ হয়।
    রুকাইয়া (রাঃ)খাদিজা (রাঃ)হযরত উসমান (রাঃ)-এর সাথে বিবাহ হয় এবং মদীনার প্রথম হিজরতকারী।
    উম্মে কুলসুম (রাঃ)খাদিজা (রাঃ)বোন রুকাইয়ার ইন্তেকালের পর হযরত উসমান (রাঃ) তাঁকে বিয়ে করেন।
    ফাতিমা (রাঃ)খাদিজা (রাঃ)নবীজির সবচেয়ে প্রিয় কন্যা। হযরত আলী (রাঃ)-এর স্ত্রী এবং হাসান-হোসাইনের মা।
    আব্দুল্লাহখাদিজা (রাঃ)তিনিও শৈশবে ইন্তেকাল করেন।
    ইব্রাহিমমারিয়া কিবতিয়া (রাঃ)মদীনার জীবনে জন্ম নেন এবং শিশু অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।

    ৩. মদীনার জীবনে পরবর্তী বিবাহসমূহ

    বিবি খাদিজা (রাঃ)-এর ইন্তেকালের পর নবীজি সাঃ বিভিন্ন সময়ে আরও একাধিক বিয়ে করেন। ইসলামের সমালোচকরা অনেক সময় এটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, কিন্তু প্রতিটি বিয়ের পেছনে ছিল গভীর সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কারণ।

    • হযরত সাওদা (রাঃ): প্রথম হিজরতকারীদের একজন এবং বয়স্ক বিধবা ছিলেন। তাঁর দেখাশোনার জন্য নবীজি তাঁকে বিয়ে করেন।
    • হযরত আয়েশা (রাঃ): ইসলামের জ্ঞান ও বিধান নারীদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই বিয়ে ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। তিনি ছিলেন ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও মুহাদ্দিস।
    • হযরত হাফসা (রাঃ): ওমর (রাঃ)-এর কন্যা। যুদ্ধে স্বামী হারানোর পর তাঁকে সামাজিক মর্যাদা দিতে নবীজি বিয়ে করেন।
    • রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য: জুওয়াইরিয়া (রাঃ) ও সাফিয়া (রাঃ)-এর সাথে বিয়ের মাধ্যমে বড় দুটি গোত্রের সাথে ইসলামের শত্রুতা শেষ হয় এবং পুরো গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে।
    • উম্মুল মুমিনীন: নবীজির সকল স্ত্রীদের কুরআনের ভাষায় ‘উম্মুল মুমিনীন’ বা মুমিনদের মা বলা হয়।

    ৪. পারিবারিক জীবনে নবীজির আদর্শ

    নবীজি সাঃ ছিলেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ স্বামী এবং শ্রেষ্ঠ পিতা। তাঁর পারিবারিক আচরণের কিছু বৈশিষ্ট্য:

    1. স্ত্রীদের কাজে সাহায্য: আয়েশা (রাঃ) বলতেন, নবীজি ঘরে নিজের কাপড় নিজে সেলাই করতেন, জুতো মেরামত করতেন এবং ঘরের কাজে স্ত্রীদের সহায়তা করতেন।
    2. উত্তম ব্যবহার: নবীজি সাঃ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ, যে তার পরিবারের কাছে শ্রেষ্ঠ।”
    3. সন্তানদের প্রতি স্নেহ: তিনি বড় মেয়ে ফাতিমা (রাঃ) ঘরে এলে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে দিতেন। শিশুদের সাথে খেলাধুলা করতেন এবং তাদের কপালে চুমু খেতেন।
    4. ন্যায়বিচার: তিনি তাঁর সকল স্ত্রীদের মাঝে সময় ও ভরণপোষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোরভাবে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার বজায় রাখতেন।

    ৫. দুঃখ ও ধৈর্যের পরীক্ষা

    পারিবারিক জীবনে নবীজি সাঃ চরম দুঃখের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর জীবদ্দশায় একমাত্র ফাতিমা (রাঃ) ছাড়া তাঁর সকল সন্তান ইন্তেকাল করেন। তিনি প্রতিটি মৃত্যুতে সবর (ধৈর্য) ধারণ করেছেন এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থেকেছেন।


    হযরত মুহাম্মদ সাঃ হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের ঘটনা

    হাজরে আসওয়াদ বা পবিত্র কালো পাথর স্থাপন ছিল হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির আগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঘটনা। এই ঘটনার মাধ্যমে তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞা, ন্যায়পরায়ণতা এবং বিবাদ মীমাংসার ক্ষমতা ফুটে ওঠে, যা আরবদের রক্তক্ষয়ী সংঘাত থেকে রক্ষা করেছিল। নিচে বিস্তারিতভাবে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি তুলে ধরা হলো:

    ১. কাবা ঘরের পুনর্নির্মাণ ও প্রেক্ষাপট

    নবীজি সাঃ-এর বয়স যখন ৩৫ বছর, তখন মক্কায় এক ভয়াবহ বন্যা হয়। এই বন্যায় পবিত্র কাবা ঘরের প্রাচীর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। কুরাইশরা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা সম্মিলিতভাবে কাবা ঘর পুনর্নির্মাণ করবে। তবে তাদের একটি শর্ত ছিল— এই নির্মাণকাজে কেবল ‘হালাল’ বা পবিত্র অর্থ ব্যয় করা হবে; কোনো সুদ, ঘুষ বা অনৈতিক উপায়ে উপার্জিত অর্থ ব্যবহার করা হবে না।

    ২. বিরোধের সূত্রপাত

    কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্র মিলে কাবা ঘরের কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করে। কিন্তু যখন ‘হাজরে আসওয়াদ’ বা জান্নাতি কালো পাথরটি তার নির্দিষ্ট স্থানে বসানোর সময় আসে, তখন শুরু হয় চরম বিবাদ।

    • প্রতিটি গোত্রই চাচ্ছিল এই বরকতময় পাথরটি স্থাপনের মর্যাদা কেবল তারাই লাভ করুক।
    • বনূ আবদুদ্দার এবং বনূ আদি গোত্র দুটি রক্তশপথ করে ফেলে যে, তারা জীবন দেবে কিন্তু অন্য কাউকে এই কাজ করতে দেবে না।
    • এই বিবাদ চার দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং আরবে একটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়।

    ৩. আবু উমাইয়া ইবনে মুগিরার প্রস্তাব

    বিবাদ যখন চরমে, তখন কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি আবু উমাইয়া ইবনে মুগিরা একটি চমৎকার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন—

    “আগামীকাল সকালে যে ব্যক্তি প্রথম কাবা ঘরের ‘বাবুস সাফা’ গেট দিয়ে প্রবেশ করবে, সে-ই হবে আমাদের বিচারক। সে যে ফয়সালা দেবে, আমরা সবাই তা মেনে নেব।”

    সবাই এই প্রস্তাবে রাজি হলো এবং গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে পরদিন সকালের অপেক্ষা করতে লাগল।

    ৪. ‘আল-আমিন’-এর আগমন

    পরদিন ভোরে দেখা গেল, প্রথম ব্যক্তি হিসেবে যিনি কাবার আঙিনায় প্রবেশ করছেন, তিনি হলেন তরুণ মুহাম্মদ সাঃ। তাঁকে দেখামাত্রই উপস্থিত সবাই সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল— “হাযা আল-আমিন, রাযিনা বিহি!” (এই তো আল-আমিন, আমরা তাঁর ওপর সন্তুষ্ট!)

    সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, কারণ মুহাম্মদ সাঃ-এর ন্যায়পরায়ণতার ওপর মক্কার প্রতিটি মানুষের অগাধ বিশ্বাস ছিল।

    ৫. মুহাম্মদ সাঃ-এর কালজয়ী ফয়সালা

    মুহাম্মদ সাঃ শান্তভাবে সব শুনলেন এবং অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে একটি সমাধান বের করলেন। তিনি চাইলেন এই মহান সম্মান থেকে কোনো গোত্রই যেন বঞ্চিত না হয়।

    1. তিনি নিজের গায়ের একটি চাদর খুলে জমিনে বিছিয়ে দিলেন।
    2. তারপর নিজের হাতে হাজরে আসওয়াদ পাথরটি তুলে চাদরের ঠিক মাঝখানে রাখলেন।
    3. তিনি প্রতিটি গোত্রের প্রধানকে ডাকলেন এবং চাদরের চারপাশ ধরে পাথরটি উপরে তুলতে বললেন।
    4. যখন চাদরটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছাল, তখন তিনি নিজ হাতে পাথরটি তুলে কাবার দেয়ালে নির্ধারিত স্থানে স্থাপন করলেন।

    ৬. ঘটনার গুরুত্ব ও প্রভাব

    এই একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মুহাম্মদ সাঃ আরবের বংশীয় আভিজাত্যের লড়াই এবং সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ থামিয়ে দিলেন।

    • সর্বজনীনতা: তিনি প্রমাণ করলেন যে, নেতৃত্ব মানে কেবল ক্ষমতা নয়, বরং সবাইকে সাথে নিয়ে চলা।
    • শান্তি প্রতিষ্ঠা: এই ঘটনা তাঁকে মক্কার সমাজে একজন শ্রেষ্ঠ ‘মীমাংসাকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
    • নবুওয়াতের ইঙ্গিত: এটি ছিল এক মহান নেতার আগমনের পূর্বাভাস, যিনি ভবিষ্যতে পুরো মানবজাতিকে একতাবদ্ধ করবেন।

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ নবুওয়ত লাভ

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর জীবনে ‘নবুওয়ত লাভ’ বা ঐশী বার্তা প্রাপ্তি ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে যুগান্তকারী ঘটনা। ৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকাকালীন তিনি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে শেষ নবী হিসেবে মনোনীত হন। নিচে এই মহিমান্বিত অধ্যায়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

    ১. নির্জনতা ও হেরা গুহায় ধ্যান

    নবুওয়ত লাভের কয়েক বছর আগে থেকেই মুহাম্মদ সাঃ-এর মধ্যে এক গভীর আধ্যাত্মিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

    • চিন্তাশীলতা: মক্কার মানুষের মূর্তিপূজা, অন্যায় এবং সামাজিক অবক্ষয় দেখে তাঁর মন কেঁদে উঠত। তিনি এর থেকে মুক্তির পথ খুঁজতেন।
    • হেরা গুহা: মক্কা থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে ‘জাবালে নূর’ বা নূর পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি ছোট গুহায় (হেরা গুহা) তিনি নির্জনে কাটাতে শুরু করেন।
    • ইবাদত: তিনি সেখানে দিনের পর দিন, কখনো সপ্তাহের পর সপ্তাহ ছাতু ও পানি নিয়ে চলে যেতেন এবং একমনে মহান সৃষ্টিকর্তার ধ্যানে মগ্ন থাকতেন।

    ২. সত্য স্বপ্ন দর্শন

    নবুওয়ত প্রাপ্তির ঠিক ছয় মাস আগে থেকে তিনি যা কিছু স্বপ্নে দেখতেন, তা হুবহু দিবালোকের মতো সত্য হয়ে ধরা দিত। একে বলা হয় ‘মুবাশশিরাত’ বা সুসংবাদবাহী সত্য স্বপ্ন। এটি ছিল মূলত ওহী বা ঐশী বার্তা গ্রহণের জন্য তাঁর মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি।

    ৩. জিবরাঈল (আঃ)-এর আগমন ও প্রথম ওহী

    ৬১০ খ্রিস্টাব্দের রমজান মাসের এক শেষ রাতে (লাইলাতুল কদর), যখন মুহাম্মদ সাঃ হেরা গুহায় গভীর ধ্যানে নিমগ্ন, তখন হঠাৎ সেখানে এক জ্যোতির্ময় সত্তার আবির্ভাব ঘটে। তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রধান ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ)

    • আলিঙ্গন ও আদেশ: ফেরেশতা এসে তাঁকে বললেন, “ইকরা” (পড়ুন)। মুহাম্মদ সাঃ উত্তরে বললেন, “মা আনা বি-কারি” (আমি তো পড়তে জানি না)।
    • তিনবার আলিঙ্গন: ফেরেশতা তাঁকে তিনবার সজোরে বুকে চেপে ধরলেন এবং তৃতীয়বার আলিংগনের পর পবিত্র কুরআনের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিল হলো।

    “পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়ুন এবং আপনার প্রতিপালক মহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।” (সূরা আলাক: ১-৫)

    ৪. নবীজির মানসিক অবস্থা ও বিবি খাদিজার ভূমিকা

    প্রথম ওহী লাভের পর মুহাম্মদ সাঃ প্রচণ্ডভাবে আতঙ্কিত ও কম্পিত হয়ে পড়েন। তিনি দ্রুত বাড়িতে ফিরে বিবি খাদিজা (রাঃ)-কে বললেন, “যাম্মিলুনি, যাম্মিলুনি” (আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও)।

    বিবি খাদিজা (রাঃ) তাঁকে আশ্বস্ত করে ঐতিহাসিক কিছু কথা বলেছিলেন, যা আজও অনুপ্রেরণার উৎস:

    “কখনো নয়! আল্লাহর কসম, তিনি আপনাকে কক্ষনো লাঞ্ছিত করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখেন, অসহায়দের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বদের অন্ন জোগান এবং মেহমানদারী করেন।”

    ৫. ওরাকা বিন নওফলের সাক্ষ্য

    বিবি খাদিজা (রাঃ) তাঁকে তাঁর চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নওফলের কাছে নিয়ে যান, যিনি হিব্রু ভাষা ও আসমানি কিতাব সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন। সব শুনে ওরাকা বললেন:

    “ইনি সেই ‘নামুস’ (জিবরাঈল), যিনি মূসা (আঃ)-এর কাছে আসতেন। আফসোস! আমি যদি সেদিন যুবক থাকতাম, যেদিন আপনার জাতি আপনাকে দেশ থেকে বের করে দেবে!”

    এটিই ছিল মুহাম্মদ সাঃ-এর নবুওয়াতের প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

    আরও পড়ুন:  হযরত ওমর (রাঃ) এর জীবনী: জন্ম, ইসলাম গ্রহণ, খিলাফত ও শাসনব্যবস্থা

    ৬. দাওয়াতের সূচনা (গোপন পর্যায়)

    নবুওয়াত লাভের পর প্রথম তিন বছর তিনি অত্যন্ত সংগোপনে দাওয়াত দেন।

    • প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী: নারীদের মধ্যে বিবি খাদিজা (রাঃ), পুরুষদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ), বালকদের মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) এবং দাসদের মধ্যে হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রাঃ)।
    • দারুল আরকাম: সাহাবীরা গোপনে আরকাম বিন আবিল আরকামের বাড়িতে একত্র হতেন এবং সেখানে নবীজি সাঃ তাঁদের দ্বীন শিক্ষা দিতেন।

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ- এর মক্কী জীবন

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর নবুওয়াত পরবর্তী ১৩ বছরের জীবনকে ‘মক্কী জীবন’ বলা হয়। এই সময়টি ছিল চরম ধৈর্য, ত্যাগ, অমানবিক নির্যাতন এবং ইসলামের ভিত্তি গড়ার এক কঠিন পরীক্ষা। নিচে মক্কী জীবনের প্রতিটি পর্যায় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

    ১. প্রকাশ্যে দাওয়াত ও সাফা পাহাড়ের ঘোষণা

    প্রথম তিন বছর গোপনে দাওয়াত দেওয়ার পর আল্লাহর নির্দেশ আসে— “আপনার নিকট আত্মীয়-স্বজনকে সতর্ক করুন।” (সূরা শুয়ারা: ২১৪)।

    • সাফা পাহাড়ের ভাষণ: নবীজি সাঃ সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে মক্কার সকল গোত্রকে ডাকলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যদি বলি এই পাহাড়ের ওপাশে এক বিশাল বাহিনী তোমাদের আক্রমণ করতে আসছে, তোমরা কি বিশ্বাস করবে?” সবাই একস্বরে বলল, “অবশ্যই, কারণ আমরা আপনাকে কোনোদিন মিথ্যা বলতে শুনিনি।” * আসল ঘোষণা: তখন তিনি বললেন, “তবে শোনো, আমি তোমাদের এক কঠিন আযাবের ব্যাপারে সতর্ক করছি। এক আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।” * প্রতিক্রিয়া: তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব চিৎকার করে বলে উঠল, “ধ্বংস হও তুমি! একারণেই কি আমাদের ডেকেছ?” এখান থেকেই কুরাইশদের সাথে নবীজির প্রকাশ্য বিরোধ শুরু হয়।

    ২. কুরাইশদের নির্যাতন ও সাহাবীদের ত্যাগ

    মক্কার কাফেররা যখন দেখল ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ছে, তখন তারা ঈমানদারদের ওপর অকথ্য নির্যাতন শুরু করে।

    • বিলাল রাঃ: তাঁর গলায় রশি বেঁধে তপ্ত বালুর ওপর টেনে নেওয়া হতো এবং বুকের ওপর বিশাল পাথর চাপা দেওয়া হতো। তবুও তিনি বলতেন— “আহাদ, আহাদ” (আল্লাহ এক)।
    • সুমাইয়া রাঃ: ইসলামের ইতিহাসে প্রথম শহীদ নারী, যাঁকে আবু জাহেল বর্শা বিদ্ধ করে হত্যা করে।
    • খাব্বাব রাঃ: তাঁকে জ্বলন্ত কয়লার ওপর শুইয়ে রাখা হতো যতক্ষণ না তাঁর পিঠের চর্বি গলে আগুন নিভে যেত।

    ৩. হাবশায় হিজরত (প্রথম ও দ্বিতীয়)

    মক্কায় যখন টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ল, তখন নবীজি সাঃ সাহাবীদের একটি দলকে আফ্রিকার হাবশায় (আবিসিনিয়া) হিজরত করার নির্দেশ দেন। সেখানকার ন্যায়পরায়ণ রাজা নাজাশী মুসলমানদের আশ্রয় দেন। কুরাইশরা সেখানে প্রতিনিধি পাঠিয়েও মুসলমানদের ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়।

    ৪. শেবে আবু তালিবে বন্দি ও বর্জন

    নবুওয়াতের সপ্তম বছরে কুরাইশরা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রকে পুরোপুরি সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বর্জন (Boycott) করে।

    • তিন বছরের জেল: নবীজি সাঃ এবং তাঁর অনুসারীদের মক্কার উপকণ্ঠে ‘শেবে আবু তালিব’ নামক গিরিসঙ্কটে বন্দি থাকতে হয়।
    • খাদ্যসংকট: অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সাহাবীরা গাছের পাতা এবং শুকনো চামড়া চিবিয়ে ক্ষুধা মেটাতেন। দশম হিজরীতে এই বর্জন শেষ হয়।

    ৫. শোকের বছর ও তায়েফ সফর

    নবুওয়াতের দশম বছরে নবীজির প্রধান দুই স্তম্ভ— চাচা আবু তালিব এবং প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা রাঃ ইন্তেকাল করেন। ইতিহাসে এই বছরকে ‘আমুল হুজন’ বা শোকের বছর বলা হয়।

    • তায়েফ গমন: মক্কায় কোণঠাসা হয়ে নবীজি সাঃ তায়েফে যান ইসলামের আশায়। কিন্তু সেখানকার মানুষেরা তাঁকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করে। তাঁর জুতো রক্তে ভিজে আটকে গিয়েছিল। তবুও তিনি তাদের জন্য বদদোয়া করেননি, বরং আল্লাহর কাছে তাদের হেদায়েত চেয়েছিলেন।

    ৬. মিরাজ ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ

    চরম দুঃখের এই সময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসূলকে সান্ত্বনা দিতে এবং সম্মান জানাতে আরশে আজিমে আমন্ত্রণ জানান। একে বলা হয় ‘মিরাজ’। এই সফরেই উম্মতের জন্য উপহার হিসেবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়।

    ৭. আকাবার শপথ ও হিজরতের প্রস্তুতি

    মক্কার বাইরে থেকে আসা হজ্জযাত্রীদের মাঝে নবীজি সাঃ দাওয়াত চালিয়ে যেতেন। মদীনার (তৎকালীন ইয়াসরিব) কিছু লোক তাঁর ওপর ঈমান আনেন এবং তাঁকে মদীনায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। একে ‘আকাবার শপথ’ বলা হয়। এর মাধ্যমেই মক্কী জীবনের সমাপ্তি এবং মদীনার সোনালী অধ্যায়ের ভিত্তি স্থাপিত হয়।


    মক্কী জীবনের মূল শিক্ষা

    মক্কী জীবনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘তাওহীদ’ বা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা। এই ১৩ বছরে কোনো যুদ্ধ হয়নি; বরং কেবল সবর, আখলাক এবং ঈমানি শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে সাহাবীদের একটি শক্তিশালী দল তৈরি করা হয়েছে।


    হযরত মুহাম্মদ সাঃ- এর মদিনায় হিজরত

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর মদিনায় হিজরত কেবল একটি স্থান ত্যাগ ছিল না, বরং এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি । ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহান আল্লাহর নির্দেশে মক্কা থেকে মদিনায় (তৎকালীন ইয়াসরিব) এই ঐতিহাসিক যাত্রা সম্পন্ন হয়।

    নিচে হিজরতের রোমহর্ষক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

    ১. হিজরতের প্রেক্ষাপট ও আকাবার শপথ

    মক্কায় কুরাইশদের নির্যাতন যখন চরমে পৌঁছায়, তখন মদিনার কিছু লোক হজ্জের মৌসুমে নবীজি সাঃ-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তারা ‘আকাবা’ নামক স্থানে নবীজির হাতে বায়াত (শপথ) গ্রহণ করেন। তারা অঙ্গীকার করেন যে, নবীজি মদিনায় গেলে তারা তাঁকে নিজেদের প্রাণের চেয়েও বেশি রক্ষা করবেন। এটিই হিজরতের পথ প্রশস্ত করে।

    ২. দারুন নদওয়ায় হত্যার ষড়যন্ত্র

    মদিনার সাথে মুসলমানদের এই ঐক্য দেখে কুরাইশরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা মক্কার ‘দারুন নদওয়া’ (সংসদ ভবন) নামক স্থানে এক জরুরি বৈঠকে বসে। শয়তানের কুমন্ত্রণায় তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী যুবক নেওয়া হবে এবং তারা সবাই মিলে একসাথে মুহাম্মদ সাঃ-কে হত্যা করবে। এতে কোনো একটি নির্দিষ্ট গোত্রের ওপর হত্যার দায় পড়বে না।

    ৩. আলীর (রাঃ) আত্মত্যাগ ও নবীজির প্রস্থান

    হত্যাকাণ্ডের নির্ধারিত রাতে জিবরাঈল (আঃ) এসে নবীজিকে আল্লাহর নির্দেশ জানিয়ে দেন— “আজ রাতে আপনি নিজের বিছানায় শোবেন না।”

    • আমানত রক্ষা: নবীজি সাঃ-এর কাছে তখনও মক্কাবাসীদের অনেক মূল্যবান আমানত ছিল। তিনি হযরত আলী (রাঃ)-কে ডেকে তাঁর বিছানায় শুয়ে থাকতে বলেন এবং পরদিন আমানতগুলো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
    • অলৌকিক নির্গমন: কুরাইশ যুবকরা যখন তাঁর ঘর ঘেরাও করে রেখেছিল, তখন নবীজি সাঃ এক মুষ্টি মাটি হাতে নিয়ে সূরা ইয়াসিনের প্রথম অংশ পাঠ করে তাদের দিকে ছুড়ে দেন। আল্লাহর কুদরতে তারা সবাই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং নবীজি তাদের চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যান।

    ৪. সওর গুহায় অবস্থান

    নবীজি সাঃ এবং তাঁর পরম বন্ধু আবু বকর (রাঃ) মক্কা থেকে দক্ষিণ দিকে গিয়ে ‘সওর’ নামক একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেন।

    • তিন দিন অবস্থান: তাঁরা সেখানে তিন দিন ও তিন রাত অবস্থান করেন। আবু বকর (রাঃ)-এর ছেলে আব্দুল্লাহ শহর থেকে খবর আনতেন এবং মেয়ে আসমা (রাঃ) খাবার পৌঁছে দিতেন।
    • মাকড়সার জাল: কুরাইশরা পুরস্কারের আশায় খুঁজতে খুঁজতে গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর হুকুমে গুহার মুখে মাকড়সা জাল বুনেছিল এবং কবুতর বাসা বেঁধেছিল। তা দেখে কাফেররা ফিরে যায়। ভীত আবু বকরকে সান্ত্বনা দিয়ে নবীজি বলেছিলেন: “ভয় পেয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।”

    ৫. সুরাকা ইবনে মালিকের ধাওয়া

    পুরস্কারের লোভ সামলাতে না পেরে সুরাকা ইবনে মালিক নবীজির পিছু ধাওয়া করে। কিন্তু সে যতবারই কাছাকাছি পৌঁছাতে চাইল, ততবারই তার ঘোড়ার পা বালিতে গেঁথে গেল। অলৌকিক এই ঘটনা দেখে সুরাকা ক্ষমা চায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে।

    ৬. কুবাতে অবস্থান ও প্রথম মসজিদ নির্মাণ

    মদিনার কাছাকাছি ‘কুবা’ নামক স্থানে পৌঁছে নবীজি সাঃ কয়েক দিন অবস্থান করেন। সেখানে তিনি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মসজিদ— ‘মসজিদে কুবা’ নির্মাণ করেন। এরপর তিনি মদিনার মূল শহরের দিকে যাত্রা করেন।

    ৭. মদিনায় রাজকীয় অভ্যর্থনা

    নবীজি সাঃ যখন মদিনায় প্রবেশ করেন, তখন মদিনার নারী, পুরুষ ও শিশুরা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে পড়ে। তারা ঐতিহাসিক গান গেয়ে তাঁকে বরণ করে নেয়:

    “ত্বলা আল বাদরু আলাইনা, মিন সানিয়্যাতিল বিদা…” (বিদায় উপত্যকা থেকে আমাদের মাঝে পূর্ণিমার চাঁদের উদয় হয়েছে)।

    প্রত্যেক সাহাবী চাচ্ছিলেন নবীজি যেন তাঁর বাড়িতে অতিথি হন। কিন্তু নবীজি বললেন, “আমার উটনিটিকে ছেড়ে দাও, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট।” উটনিটি যেখানে গিয়ে থামল, সেখানেই নবীজির ঘর ও মসজিদে নববী নির্মাণের স্থান নির্ধারিত হলো।


    হিজরতের তাৎপর্য (এক নজরে)

    1. ইসলামি বর্ষপঞ্জি: এই মহান ঘটনাকে স্মরণীয় রাখতে হযরত ওমর (রাঃ)-এর শাসনামলে ‘হিজরি সাল’ গণনা শুরু হয়।
    2. ** ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা:** মক্কা থেকে আসা ‘মুহাজির’ এবং মদিনার ‘আনসার’দের মধ্যে নবীজি এক নজিরবিহীন ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করেন।
    3. মদিনা রাষ্ট্র: হিজরতের মাধ্যমেই মদিনায় বিশ্বের প্রথম ইসলামী জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ- এর মক্কা বিজয়

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর জীবনে ‘মক্কা বিজয়’ ছিল সত্যের চূড়ান্ত জয় এবং মিথ্যার শোচনীয় পরাজয়। এটি কেবল একটি শহর দখল ছিল না, বরং এটি ছিল ক্ষমা, মহত্ত্ব এবং আদর্শের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয়ের এক অনন্য ইতিহাস। অষ্টম হিজরীর ২০শে রমজান এই ঐতিহাসিক বিজয় সংঘটিত হয়।

    নিচে মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষাপট ও ঘটনাবলী বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

    ১. হুদায়বিয়ার সন্ধি ও চুক্তি ভঙ্গ

    ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে মুসলমান ও কুরাইশদের মধ্যে ১০ বছরের জন্য ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় কুরাইশদের মিত্র গোত্র ‘বনু বকর’ মুসলমানদের মিত্র গোত্র ‘বনু খুজাআ’র ওপর আক্রমণ করে। কুরাইশরা গোপনে এই আক্রমণে অস্ত্র ও লোকবল দিয়ে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে কুরাইশরা সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে।

    নবীজি সাঃ কুরাইশদের কাছে তিনটি প্রস্তাব পাঠান:

    1. বনু খুজাআ’র নিহতদের রক্তপণ দিতে হবে।
    2. অথবা বনু বকরের সাথে কুরাইশদের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।
    3. অথবা হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল ঘোষণা করতে হবে।

    কুরাইশরা দাম্ভিকতাবশত সন্ধি বাতিলের পথ বেছে নেয়, যা পরবর্তীতে তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

    ২. মক্কা অভিমুখে দশ হাজারী বাহিনী

    চুক্তি ভঙ্গের পর নবীজি সাঃ অত্যন্ত গোপনে মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি নেন। অষ্টম হিজরীর ১০ই রমজান তিনি ১০,০০০ সাহাবীর এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার পথে রওনা হন। এটি ছিল তৎকালীন আরবের সবচেয়ে সুশৃঙ্খল এবং শক্তিশালী বাহিনী।

    • মক্কার উপকণ্ঠে: মক্কার কাছে ‘মাররুজ জাহরান’ নামক স্থানে পৌঁছে সাহাবীরা দশ হাজার জায়গায় আগুন জ্বালান। আগুনের এই বিশালতা দেখে কুরাইশরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
    • আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ: কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে এসে ধরা পড়েন এবং নবীজির ক্ষমা ও মহানুভবতা দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন।

    ৩. রক্তপাতহীন প্রবেশ ও সাধারণ ক্ষমা

    নবীজি সাঃ মক্কাকে রক্তপাতহীনভাবে জয় করতে চেয়েছিলেন। তিনি মক্কায় প্রবেশের সময় ঘোষণা করেন:

    ১. যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে, সে নিরাপদ। ২. যে নিজ ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে, সে নিরাপদ। ৩. যে পবিত্র কাবার চত্বরে আশ্রয় নেবে, সে নিরাপদ।

    নবীজি সাঃ অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতার সাথে উটের পিঠে মাথা নিচু করে মক্কায় প্রবেশ করেন। তাঁর মনে কোনো দম্ভ ছিল না, বরং ছিল মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা।

    ৪. মূর্তিমুক্ত কাবা ঘর

    মক্কায় প্রবেশ করেই নবীজি সাঃ সোজা কাবা ঘরে যান। সে সময় কাবার ভেতরে ও চারপাশে ৩৬০টি মূর্তি ছিল। নবীজি সাঃ তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে একে একে মূর্তিগুলো আঘাত করেন এবং পাঠ করেন:

    “জাআল হাক্কু ওয়া যাহাকাল বাতিল, ইন্নাল বাতিলা কানা যাহুকা।” (সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই বিষয়)।

    এভাবে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী পর পবিত্র কাবা ঘর শিরকমুক্ত হয় এবং সেখানে হযরত বিলাল (রাঃ) আযান প্রদান করেন।

    ৫. ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ক্ষমা

    মক্কা বিজয়ের পর কুরাইশদের সেই বড় বড় অপরাধীরা (যারা নবীজিকে মারতে চেয়েছিল, সাহাবীদের হত্যা করেছিল) কাবার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। নবীজি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “আজ তোমরা আমার কাছে কেমন আচরণ আশা করো?” তারা বলল, “আপনি দয়ালু ভাই এবং দয়ালু ভাইয়ের পুত্র।” তখন বিশ্বনবী সাঃ ঘোষণা করলেন:

    “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা সবাই মুক্ত।”

    শত্রুদের প্রতি এমন নজিরবিহীন ক্ষমা দেখে হাজার হাজার মক্কাবাসী স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

    আরও পড়ুন:  হযরত ওমর (রাঃ) এর জীবনী: জন্ম, ইসলাম গ্রহণ, খিলাফত ও শাসনব্যবস্থা

    ৬. মক্কা বিজয়ের ফলাফল

    1. ইসলামের পূর্ণতা: মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে আরবে ইসলামের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
    2. পৌত্তলিকতার অবসান: আরব উপদ্বীপ থেকে মূর্তিপূজা চিরতরে বিলীন হতে শুরু করে।
    3. আদর্শ রাষ্ট্র: মক্কা ও মদীনার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ও সুসংহত ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত মজবুত হয়।

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ- এর বিদায় হজ্জ ও শেষ ভাষণ

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর জীবনের শেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ‘বিদায় হজ্জ’ এবং আরাফাতের ময়দানে প্রদত্ত তাঁর ‘ঐতিহাসিক ভাষণ’। ১০ম হিজরীতে (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) অনুষ্ঠিত এই হজ্জ ছিল নবীজি সাঃ-এর জীবনের প্রথম এবং শেষ হজ্জ। এই ভাষণটি কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান এবং মানবাধিকারের প্রথম বিশ্বজনীন ঘোষণা।

    নিচে বিস্তারিতভাবে বিদায় হজ্জ ও শেষ ভাষণের ঘটনাপ্রবাহ আলোচনা করা হলো:

    ১. বিদায় হজ্জের প্রেক্ষাপট

    ১০ম হিজরীর জিলকদ মাসে নবীজি সাঃ ঘোষণা করলেন যে, তিনি হজ্জ পালন করবেন। এই খবর আরবের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার সাহাবী মদীনায় সমবেত হন। প্রায় ১ লক্ষ ১৪ হাজার (মতান্তরে ১ লক্ষ ৪০ হাজার) সাহাবীর এক বিশাল কাফেলা নিয়ে তিনি মক্কা অভিমুখে রওনা হন। ইতিহাসে এটিই ‘বিদায় হজ্জ’ নামে পরিচিত কারণ এর অল্পকাল পরেই তিনি ওফাত লাভ করেন।

    ২. আরাফাতের ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ

    ৯ই জিলহজ্জ জোহরের নামাজের পর আরাফাতের ময়দানে ‘জাবালে রহমত’ পাহাড়ের পাদদেশে উটের পিঠে দাঁড়িয়ে নবীজি সাঃ তাঁর জীবনের সেই মহান ভাষণটি প্রদান করেন। ভাষণের মূল পয়েন্টগুলো নিচে দেওয়া হলো:

    ক) মানবজীবনের পবিত্রতা ও জানমালের নিরাপত্তা

    নবীজি সাঃ ঘোষণা করেন—

    “হে লোকসকল! তোমাদের রক্ত (জীবন), তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই শহরের মতোই পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয়। কেউ কারো জানমালের ক্ষতি করবে না।”

    খ) অন্ধকার যুগের কুপ্রথা ও সুদের বিলোপ

    তিনি জাহেলি যুগের সমস্ত কুসংস্কার ও প্রতিহিংসার অবসান ঘটান:

    “জাহেলি যুগের সকল রক্তের দাবি (প্রতিশোধ) আজ থেকে পায়ের নিচে দাফন করা হলো। আর সকল প্রকার ‘সুদ’ আজ থেকে নিষিদ্ধ করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার বংশের (চাচা আব্বাসের) সুদের দাবি ত্যাগ করছি।”

    গ) নারী অধিকারের নিশ্চয়তা

    নারীদের মর্যাদার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বলেন—

    “হে মানুষ! নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তাদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তোমাদের ওপরও তাদের তেমন অধিকার আছে। তাদের সাথে সদয় ব্যবহার করো।”

    ঘ) বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও সাম্য

    বর্ণবাদ ও আভিজাত্যের অহংকার চূর্ণ করে তিনি বলেন—

    “হে মানুষ! তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতাও এক (আদম)। কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের এবং কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; তেমনি কালোর ওপর সাদার কিংবা সাদার ওপর কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি।”

    ঙ) আমানত ও দাস-দাসীর অধিকার

    তিনি অধীনস্তদের ব্যাপারে সতর্ক করেন—

    “তোমাদের দাস-দাসীদের প্রতি খেয়াল রেখো। তোমরা যা খাবে তাদেরও তা খাওয়াবে, তোমরা যা পরবে তাদেরও তা পরাবে।”

    চ) দ্বীনের পূর্ণতা ও শেষ বার্তা

    ভাষণের শেষ পর্যায়ে তিনি ঘোষণা করেন—

    “আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি; যতক্ষণ তোমরা এ দুটি আঁকড়ে ধরবে, ততক্ষণ পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হলো আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং অন্যটি হলো আমার সুন্নাহ (হাদিস)।”

    ৩. আল-বিদা ও আল্লাহর সাক্ষ্য

    নবীজি সাঃ উপস্থিত জনসমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—

    “হে লোকসকল! কিয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাদের আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। তখন তোমরা কী বলবে?” সবাই একস্বরে জবাব দিলেন— “আমরা সাক্ষ্য দেব যে, আপনি আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছেন এবং আপনার আমানত আদায় করেছেন।”

    তখন নবীজি সাঃ আকাশের দিকে আঙুল তুলে তিনবার বললেন— “হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।”

    ৪. দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হওয়ার ঘোষণা

    এই ভাষণ শেষ হওয়ার পরপরই জিবরাঈল (আঃ) আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআনের শেষ আয়াতগুলোর একটি নিয়ে অবতীর্ণ হন (সূরা মায়িদা: ৩):

    “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে (জীবনব্যবস্থা) পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”

    এই আয়াত শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) কাঁদতে শুরু করেন, কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে দায়িত্ব শেষ হওয়ার অর্থ হলো নবীজি সাঃ-এর বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে।


    মহানবী (সা.)-এর অনন্য মানবিক গুণাবলী ও শিক্ষা

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর অনন্য মানবিক গুণাবলী ও শিক্ষা কেবল মুসলিম উম্মাহর জন্য নয়, বরং গোটা মানবজাতির জন্য এক জীবন্ত মোজেজা। তাঁর চরিত্র সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন: “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।” (সূরা কলম: ৪)।

    নিচে তাঁর চরিত্রের অতুলনীয় দিকগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

    ১. ক্ষমা ও সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক

    নবীজি সাঃ-এর ক্ষমার কোনো সীমানা ছিল না। যারা তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছে, দাঁত শহীদ করেছে এবং হিজরতে বাধ্য করেছে, তাদের প্রতিও তিনি ছিলেন দয়ালু।

    • তায়েফের ময়দান: পাথর খেয়ে রক্তাক্ত হয়েও তিনি বলেছিলেন, “হে আল্লাহ! এদের ক্ষমা করুন, কারণ এরা জানে না এরা কী করছে।”
    • হিন্দা ও ওয়াহশির ক্ষমা: তাঁর প্রিয় চাচা হামজা রাঃ-কে নৃশংসভাবে হত্যাকারী ওয়াহশি এবং কলিজা চিবিয়ে খাওয়া হিন্দাকেও তিনি মক্কা বিজয়ের দিন ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

    ২. সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতা

    নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে থেকেই মক্কাবাসীরা তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত বলে জানত।

    • শত্রু আবু জাহেলও স্বীকার করত যে, মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা বলেন না।
    • হিজরতের রাতেও তিনি নিজের জানের তোয়াক্কা না করে শত্রুদের আমানত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর শিক্ষা ছিল: “যার মধ্যে আমানতদারিতা নেই, তার মধ্যে ঈমান নেই।”

    ৩. অনাড়ম্বর ও সাধারণ জীবনযাপন

    তিনি ছিলেন একটি বিশাল রাষ্ট্রের প্রধান, অথচ তাঁর জীবন ছিল অতি সাধারণ।

    • বিছানা: তিনি খেজুর পাতার চাটাইয়ে ঘুমাতেন, যার চিহ্ন তাঁর পিঠে লেগে যেত। সাহাবীরা ব্যথিত হয়ে গদি দিতে চাইলে তিনি বলতেন, “দুনিয়ার সাথে আমার কীসের সম্পর্ক? আমি তো সেই মুসাফিরের মতো, যে গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবার পথে বের হয়।”
    • শ্রমের মর্যাদা: তিনি নিজের জুতো নিজে সেলাই করতেন, কাপড়ে তালি দিতেন এবং সাহাবীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরিখা খননের কাজ করতেন।

    ৪. নারী অধিকারের অগ্রদূত

    ইসলাম-পূর্ব যুগে যখন কন্যা সন্তানকে অভিশাপ মনে করা হতো, তখন নবীজি সাঃ ঘোষণা করেন:

    • “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।”
    • তিনি সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করেন এবং বিদায় হজ্জে নারীদের প্রতি সদয় ব্যবহারের চূড়ান্ত তাগিদ দিয়ে যান। তিনি বলতেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ, যে তার স্ত্রীর কাছে শ্রেষ্ঠ।”

    ৫. অমুসলিম ও সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ

    মদীনা রাষ্ট্রে অমুসলিমদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিল।

    • তিনি বলেছিলেন, “যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিকের (জিম্মি) ওপর জুলুম করবে, কিয়ামতের দিন আমি স্বয়ং তার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে মামলা লড়ব।” * খ্রিষ্টান প্রতিনিধি দল মদীনায় এলে তিনি তাদের মসজিদে নববীতে উপাসনা করার অনুমতি দিয়েছিলেন।

    ৬. জীবের প্রতি দয়া

    তাঁর মমতা কেবল মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না।

    • তিনি অতিরিক্ত বোঝা বহনকারী উটের মালিককে তিরস্কার করেছেন।
    • একটি বিড়ালকে কষ্ট দেওয়ায় এক মহিলার জাহান্নামী হওয়ার কথা এবং পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়ে এক পাপী লোকের জান্নাত পাওয়ার গল্প শুনিয়ে তিনি প্রাণীকুলের অধিকার রক্ষা করেছেন।

    ৭. মহানবী সাঃ-এর প্রধান শিক্ষা (সংক্ষেপে)

    নবীজি সাঃ-এর জীবনের নির্যাস হলো এই শিক্ষাগুলো:

    1. তাওহীদ: এক আল্লাহর ইবাদত করা এবং শিরকমুক্ত থাকা।
    2. ইনসাফ: উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
    3. আখলাক: উত্তম আচরণের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা।
    4. পবিত্রতা: আত্মিক ও বাহ্যিক উভয় প্রকার পবিত্রতা বজায় রাখা।

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ- এর মৃত্যু

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর জীবনের শেষ অধ্যায় অর্থাৎ তাঁর ‘ওফাত’ বা ইহলোক ত্যাগ ছিল ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক এবং বেদনাদায়ক ঘটনা। এটি কেবল একজন মহামানবের বিদায় ছিল না, বরং ওহী বা ঐশী বার্তার আগমনের ধারা সমাপ্ত হওয়ার মুহূর্ত ছিল। নিচে বিস্তারিতভাবে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো আলোচনা করা হলো:

    ১. অসুস্থতার সূচনা

    বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার কিছুদিন পর ১১ হিজরীর সফর মাসের শেষের দিকে নবীজি সাঃ অসুস্থ হয়ে পড়েন। মূলত তাঁর প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও তীব্র জ্বর দেখা দেয়। অসুস্থতা বৃদ্ধির পর তিনি তাঁর সকল স্ত্রীদের অনুমতি নিয়ে হযরত আয়েশা রাঃ-এর হুজরায় (কামরায়) অবস্থান করতে শুরু করেন।

    ২. শেষ দিনগুলোর ইবাদত ও ইমামতি

    অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও নবীজি সাঃ যতদিন সম্ভব হয়েছে মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ পড়িয়েছেন। কিন্তু শারীরিক অবস্থা আরও অবনতি হলে তিনি দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলেন। তখন তিনি নির্দেশ দেন— “আবু বকরকে বলো মানুষের ইমামতি করতে।” এটি ছিল ভবিষ্যতে আবু বকর রাঃ-এর নেতৃত্বের একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত।

    ৩. শেষ উপদেশ ও সাধারণ ক্ষমা

    মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে তিনি অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় সাহাবীদের উদ্দেশে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। তিনি বলেন:

    • “আল্লাহ তাঁর এক বান্দাকে দুনিয়ার ভোগবিলাস অথবা আল্লাহর সান্নিধ্য—এই দুটির মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। সেই বান্দা আল্লাহর সান্নিধ্যকেই বেছে নিয়েছে।” (এই কথা শুনে আবু বকর রাঃ বুঝতে পারেন নবীজির বিদায় আসন্ন)।
    • তিনি উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলেন— “কারো ওপর যদি আমার কোনো পাওনা থাকে বা আমি যদি কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকি, তবে সে যেন আজই আমার থেকে তার প্রতিশোধ নেয়।” ## ৪. চূড়ান্ত মুহূর্ত ও শেষ বাণী ১১ হিজরীর ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার। নবীজি সাঃ-এর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। তিনি বারবার একটি পাত্রের পানিতে হাত ভিজিয়ে মুখ মুছছিলেন আর বলছিলেন— “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, নিশ্চয়ই মৃত্যুর যন্ত্রণা বড় কঠিন।”

    হযরত আয়েশা রাঃ-এর কোল ঘেঁষে তিনি শুয়ে ছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি আকাশের দিকে আঙুল তুলে তিনবার বললেন:

    “আল্লাহুম্মা আর-রাফিকাল আলা” (হে আল্লাহ! আমি মহান বন্ধুর সান্নিধ্য চাই)।

    এই ছিল তাঁর শেষ কথা। এরপর তাঁর হাতটি নুয়ে পড়ে এবং তিনি মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যান। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

    ৫. মদীনায় শোকের ছায়া ও সাহাবীদের অবস্থা

    নবীজির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো মদীনা স্তব্ধ হয়ে যায়। সাহাবীদের মাঝে শোকের এমন মাতম শুরু হয় যে, হযরত ওমর রাঃ-এর মতো শক্ত হৃদয়ের মানুষও শোকে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তিনি তলোয়ার বের করে বললেন, “যে বলবে মুহাম্মদ সাঃ মারা গেছেন, আমি তার মাথা কেটে ফেলব। তিনি মূসা আঃ-এর মতো আল্লাহর সাথে দেখা করতে গেছেন।”

    এসময় হযরত আবু বকর রাঃ এসে পরিস্থিতি শান্ত করেন। তিনি সাহাবীদের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন সেই অমর বাণী:

    “তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মদের ইবাদত করতে, তারা জেনে রাখো মুহাম্মদ সাঃ মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করো, তারা জেনে রাখো আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই।” এরপর তিনি কুরআনের আয়াত পাঠ করেন: “মুহাম্মদ একজন রাসূল বৈ তো নন, তাঁর আগেও বহু রাসূল গত হয়েছেন…” (সূরা আল-ইমরান: ১৪৪)। এই আয়াত শুনে সাহাবীদের হুঁশ ফেরে এবং ওমর রাঃ ডুকরে কেঁদে ওঠেন।

    ৬. জানাজা ও দাফন

    নবীজি সাঃ-এর কোনো সাধারণ জানাজা হয়নি। তাঁর হুজরাটি ছোট হওয়ায় সাহাবীরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেন এবং ইমাম ছাড়াই জানাজা পড়ে বেরিয়ে আসতেন। পুরুষদের পর মহিলারা এবং এরপর শিশুরা জানাজা পড়েন। হযরত আবু বকর রাঃ-এর পরামর্শে—নবীগণ যেখানে মৃত্যুবরণ করেন সেখানেই তাঁদের দাফন করার নিয়ম অনুযায়ী—হযরত আয়েশা রাঃ-এর কক্ষেই তাঁকে দাফন করা হয়, যা বর্তমানে ‘রওজা শরীফ’ হিসেবে পরিচিত।


    শেষ কথা

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবী নশ্বর। তবে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ এবং পবিত্র কুরআন কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের পথ দেখাবে। তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সুন্নাহ বা জীবনপদ্ধতি প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে বেঁচে আছে।


    উপসংহার: চিরন্তন আলোর বাতিঘর

    হযরত মুহাম্মদ সাঃ-এর জীবন কেবল একটি ঐতিহাসিক উপাখ্যান নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার জন্য এক পূর্ণাঙ্গ ও জীবন্ত পাণ্ডুলিপি। মরুভূমির তপ্ত বালুকা রাশি থেকে শুরু করে মদীনার রাষ্ট্রীয় সিংহাসন পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল মানবজাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্য নিবেদিত। তিনি এমন এক সমাজ বিনির্মাণ করেছিলেন যেখানে শোষিতের কান্না থামিয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে বর্ণের চেয়ে চরিত্র বড় ছিল এবং যেখানে তলোয়ারের চেয়ে আদর্শের শক্তি ছিল প্রখর।

    আজকের এই অস্থির পৃথিবীতে, যেখানে মানুষ নৈতিক অবক্ষয়, জাতিগত বিভেদ এবং আত্মিক শূন্যতায় ভুগছে, সেখানে মহানবী সাঃ-এর আদর্শই একমাত্র সমাধান। তাঁর ক্ষমা আমাদের শেখায় কীভাবে শত্রুকে আপন করতে হয়, তাঁর ত্যাগ আমাদের শেখায় স্বার্থহীনতা, আর তাঁর ধৈর্য আমাদের শেখায় প্রতিকূলতাকে জয় করার কৌশল। তিনি শিখিয়েছেন যে, প্রকৃত বীরত্ব শক্তিতে নয়, বরং নিজের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে।

    পরিশেষে বলা যায়, মুহাম্মদ সাঃ ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ বা বিশ্বজগতের জন্য রহমত। তাঁর প্রচারিত ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, বরং এটি শান্তি, সাম্য এবং মানবতার এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা। তাঁর তিরোধানের চৌদ্দশ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর আদর্শ আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে অমলিন। আমরা যদি তাঁর দেখানো পথে নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে পারি, তবেই আমাদের ইহকালীন শান্তি এবং পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত হবে। তিনিই ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠতম আদর্শ।

    Admin

    Moner Rong (মনের রঙ) একটি সৃজনশীল বাংলা ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম, যেখানে আমরা জীবনবোধ, সাহিত্য এবং ভ্রমণের মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা করি । আমাদের পাঠকদের জন্য আমরা নিয়মিত মৌলিক কবিতা, হৃদয়স্পর্শী গল্প, জীবনমুখী মোটিভেশনাল আর্টিকেল এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের নিখুঁত ট্রাভেল গাইড শেয়ার করি । মানসম্মত কন্টেন্ট এবং সঠিক তথ্যের মাধ্যমে পাঠকদের মনের খোরাক জোগানোই আমাদের মূল লক্ষ্য । আপনি যদি সাহিত্যপ্রেমী হন বা নতুন কোনো ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তবে 'মনের রঙ' হতে পারে আপনার প্রতিদিনের সঙ্গী । আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।"
    2 mins
    Right Menu Icon