‘কারবালা প্রান্তর’ কেবল একটি ঐতিহাসিক বিয়োগান্ত ঘটনা নয়, বরং অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করা এবং সত্যের পক্ষে আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক । HSC বাংলা সাহিত্য পাঠ বইয়ের অন্তর্ভুক্ত এই পাঠটিতে কবি ও সাহিত্যিকরা কারবালার করুণ প্রেক্ষাপটকে উপজীব্য করে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অসীম সাহসিকতার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন । এই অনুচ্ছেদে ‘কারবালা প্রান্তর’ রচনার মূল চেতনা, ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার উপযোগী সৃজনশীল প্রশ্ন-উত্তরের মূল ভিত্তি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো, যা শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে ।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ১
উদ্দীপক:
একটি গ্রামের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করেন তরুণ নেতা আরমান। প্রভাবশালী শোষকগোষ্ঠী তাকে বিপুল অর্থ ও ক্ষমতার লোভ দেখায়, কিন্তু আরমান তা প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে শোষকচক্রের চক্রান্তে নিঃসঙ্গ অবস্থায় শত্রুর গুলিতে আরমান প্রাণ হারান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি বলেন, “আমার মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মুক্তির সংগ্রাম থামবে না।”
- (ক) মীর মশাররফ হোসেনের ‘কারবালা-প্রান্তর’ রচনাটি কোন রচনার অন্তর্গত?
- (খ) কাসেমের মৃত্যুর সংবাদ শুনে ইমাম হোসেনের অবস্থা কেমন হয়েছিল?
- (গ) উদ্দীপকের আরমান ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের সাথে কোন দিক দিয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ? ব্যাখ্যা করো।
- (ঘ) “মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হওয়া সত্যানুসন্ধানীদের মূল বৈশিষ্ট্য”— উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের আলোকে উক্তিটির সত্যতা বিচার করো।
১ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) মীর মশাররফ হোসেনের ‘কারবালা-প্রান্তর’ গদ্যাংশটি তাঁর বিখ্যাত কালজয়ী উপন্যাস ‘বিষাদ-সিন্ধু’ (মহররম পর্ব) থেকে সংকলিত।
(খ) কাসেমের মৃত্যুর করুণ সংবাদ শুনে শোকাহত ইমাম হোসেন শোকে স্তব্ধ ও বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন এবং বিচ্ছেদের বেদনায় ভেঙে পড়েছিলেন।
ভাতিজা কাসেম ছিলেন ইমাম হোসেনের পরম স্নেহভাজন। কারবালার রণক্ষেত্রে কাসেমের নির্মম মৃত্যুর খবর যখন ইমাম হোসেনের কানে পৌঁছায়, তখন তিনি গভীর শোক ও বেদনায় কাতর হয়ে পড়েন। স্বজন হারানোর এই তীব্র যন্ত্রণায় তাঁর হৃদয় ভেঙে খানখান হয়ে যায় এবং তিনি নিদারুণ বিষাদে আচ্ছন্ন হন।
(গ) উদ্দীপকের তরুণ নেতা আরমানের লোভ-প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অটল থাকার মানসিকতা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান ও সত্যের জন্য আত্মত্যাগের দিকটির সাথে গভীরভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।
মীর মশাররফ হোসেন রচিত ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে দেখা যায়, কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেন স্বৈরাচারী ও অধার্মিক এজিদের ক্ষমতার সামনে নতি স্বীকার করেননি। এজিদ বাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁর ওপর নানা চাপ ও প্রলোভন থাকলেও তিনি ইসলামের মূল নীতি, সত্য ও ইনসাফ রক্ষায় অটল ছিলেন। একে একে প্রিয় স্বজনদের হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেও তিনি অন্যায় ও অসত্যের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেননি।
উদ্দীপকের আরমানও ঠিক একইভাবে নিজ গ্রামের পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নামেন। প্রভাবশালী শোষকগোষ্ঠীর চক্রান্ত, বিপুল অর্থ ও ক্ষমতার লোভে পা না দিয়ে তিনি নিঃসঙ্গ অবস্থায় জীবন দিতেও দ্বিধা করেননি।
অতএব, প্রলোভনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে সত্য ও ন্যায়বিচারের জন্য একাকী লড়ে যাওয়া এবং জীবন বিসর্জন দেওয়ার বীরত্বপূর্ণ মানসিকতাই আরমান ও ইমাম হোসেনের মধ্যকার মূল সাদৃশ্য।
(ঘ) “মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হওয়া সত্যানুসন্ধানীদের মূল বৈশিষ্ট্য”— উক্তিটি উদ্দীপকের আরমান এবং ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেন উভয়ের জীবনের প্রেক্ষাপটেই চরমভাবে সত্য ও যথার্থ।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন খুব ভালো করেই জানতেন যে, কারবালার মাঠে অগণিত এজিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হওয়া বা বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু তিনি কেবল প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে এজিদের অধর্ম ও স্বৈরাচারী শাসনকে স্বীকৃতি দেননি। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল সততা, ধর্মনীতি ও মানবীয় মর্যাদা রক্ষা করা। চারদিকে রক্তস্নাত ময়দানে স্বজনদের হারানো সত্ত্বেও তিনি চরম মুহূর্তে নির্ভীকভাবে শত্রুর মুখোমুখি হয়েছেন এবং নিজের আদর্শ থেকে একচুলও বিচ্যুত হননি।
উদ্দীপকের দিকে তাকালেও আমরা সত্যানুসন্ধানী ও নীতিবান এই মানসিকতার প্রতিফলন দেখতে পাই। নেতা আরমান শোষকচক্রের চক্রান্ত ও ঘাতকদের উপস্থিতি টের পেয়েও নিজ লক্ষ্য থেকে সরে যাননি। শত্রুর গুলি বুক পেতে নেওয়ার মুহূর্তেও তাঁর উচ্চারণ ছিল স্পষ্ট— “আমার মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মুক্তির সংগ্রাম থামবে না।”
পরিশেষে বলা যায়, সাধারণ মানুষ মৃত্যুর ভয়ে আদর্শ ত্যাগ করে, কিন্তু যারা খাঁটি সত্যানুসন্ধানী ও মহান লক্ষ্যের প্রতি নিবেদিত, নিশ্চিত মৃত্যুও তাঁদের পদপ্রান্ত থেকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারে না। ইমাম হোসেন ও আরমান—উভয়েই প্রমাণ করেছেন যে নশ্বর শরীরের অবসান হতে পারে, কিন্তু আদর্শ ও লক্ষ্য অমর থাকে।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ২
উদ্দীপক:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির এক অকুতোভয় তরুণ সেনা সদস্যকে শত্রুসেনারা বন্দী করে গোপন সামরিক তথ্য দেওয়ার জন্য নির্মম নির্যাতন চালায়। তরুণ সৈনিক যন্ত্রণায় ছটফট করলেও একটি তথ্যও প্রকাশ করেনি। জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার শেষ মুহূর্তেও তার মুখে ছিল দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও অটুট আত্মমর্যাদাবোধ।
- (ক) ইমাম হোসেন ফোরাত নদীর কুলে কিসের জন্য গিয়েছিলেন?
- (খ) “ইহজীবনে আর পানি পান করিব না”— কথাটির অর্থ বুঝিয়ে লেখো।
- (গ) উদ্দীপকের সৈনিকের কষ্ট সহ্য করার বিষয়টি ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের কোন করুণ দিকটি নির্দেশ করে?
- (ঘ) “সহ্যশক্তির চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেও সত্য রক্ষা করাই বীরের ধর্ম”— উদ্দীপক ও গল্পের প্রেক্ষিতে এটি বিশ্লেষণ করো।
২ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) ইমাম হোসেন ফোরাত নদীর কূলে মূলত নিজের চরম ক্লান্ত ও অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত অশ্বকে (ঘোড়াকে) পানি পান করানোর জন্য গিয়েছিলেন।
(খ) স্বজন ও অবোধ শিশুদের কারবালার মাঠে ফোরাতের এক ফোঁটা পানির অভাবে ছটফট করে মারা যাওয়ার কথা মনে পড়ায় চরম অনুশোচনা ও সহমর্মিতা থেকে ইমাম হোসেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ফোরাত নদীর পাড়ে অঞ্জলি ভরে পানি মুখের কাছে নেওয়ার পর মুহূর্তেই ইমাম হোসেনের মনে পড়ে যায় পানির অভাবে ছটফট করে মারা যাওয়া তাঁর প্রিয় সন্তান আলী আকবর ও ভাতিজা কাসেমের মুখ। যাদের তিনি এক ফোঁটা পানি এনে দিতে পারেননি, নিজে পানি পান করে তাদের স্মৃতি ও আত্মার প্রতি অবিচার করতে চাননি। গভীর অনুশোচনা ও সহমর্মিতার জায়গা থেকেই তিনি অঞ্জলির পানি নদীতে ফেলে দেন এবং জীবনে আর কখনো পানি না খাওয়ার কঠোর সংকল্প ব্যক্ত করেন।
(গ) উদ্দীপকের জার্মান সেনা সদস্যটির শত্রুঘাঁটিতে নির্মম শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেও দেশের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার ঘটনাটি ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের অমানুষিক কষ্ট, ক্ষোভ ও শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করেও সত্যের পথে অবিচল থাকার দিকটিকে নির্দেশ করে।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে কারবালার মাঠে ইমাম হোসেনকে এজিদ বাহিনী চারিদিক থেকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। তিন দিন ধরে অন্ন-জলহীন অবস্থায় থেকে এবং বিষাক্ত তীরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েও তিনি চরম সহনশীলতা প্রদর্শন করেছেন। সীমারের বিষাক্ত লৌহশর তাঁর পিঠ ভেদ করে ঘাড়ে গিয়ে বিদ্ধ হয়েছিল, যা তাঁকে চরম শারীরিক যন্ত্রণায় অবশ করে ফেলেছিল। কিন্তু এই পর্বতসম অমানুষিক কষ্ট সহ্য করেও তিনি এজিদের কাছে নতি স্বীকার করেননি।
উদ্দীপকের তরুণ সৈনিকটিও দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে শত্রুর নির্যাতন সহ্য করে নিজের মুখে তালা এঁটে রেখেছিল। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সে অটল ছিল।
সুতরাং, শত্রুপক্ষের অমানবিক নির্যাতন ও তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করেও নিজের আদর্শকে ধরে রাখার চরম ধৈর্যই উভয় ক্ষেত্রে নির্দেশিত হয়েছে।
(ঘ) “সহ্যশক্তির চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেও সত্য রক্ষা করাই বীরের ধর্ম”— উক্তিটি উদ্দীপক এবং ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের সারমর্ম হিসেবে পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণযোগ্য।
প্রকৃত বীরত্ব কেবল তরবারি চালানো বা শক্তিতে থাকে না, বরং সত্য ও নীতির রক্ষায় কতটুকু আত্মত্যাগ ও কষ্ট সহ্য করা যায়—তার ওপর নির্ভর করে। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন ছিলেন এই মহান বীরত্বের এক অনবদ্য প্রতীক। তিনি পরিবারের একের পর এক সদস্যের লাশ বয়ে নিয়ে এসেছেন, অবর্ণনীয় তৃষ্ণার মুখোমুখি হয়েছেন এবং ঘাতক সীমারের নির্মম তীরের যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। অসীম সহ্যশক্তি ও মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে তিনি বিশ্বকে দেখিয়ে গেছেন যে সত্যের জন্য কীভাবে প্রাণ দিতে হয়।
অন্যদিকে, উদ্দীপকের তরুণ সেনা সদস্যটির মাধ্যমেও একই সত্য প্রকাশিত হয়েছে। শত্রুসেনাদের অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতন তাকে এতটুকুও টলাতে পারেনি। নিজের জীবন সঁপে দিয়ে সে প্রমাণ করেছে যে, চরম কষ্ট বা মৃত্যু সহ্য করা গেলেও সত্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা যায় না।
সংক্ষেপে বলা যায়, শারীরিক বিপর্যয় ও অসহ্য যন্ত্রণা দিয়ে বীরকে সাময়িকভাবে কাবু করা গেলেও তাঁর নৈতিক আত্মাকে ধ্বংস করা যায় না। সহ্যশক্তির শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে সত্যের মর্যাদা রক্ষা করাই সত্যিকারের বীরের লক্ষণ, যা উদ্দীপক ও গল্পে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ফুটে উঠেছে।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ৩
উদ্দীপক:
জসীম একজন সৎ সংবাদকর্মী। একটি প্রভাবশালী মহলের অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির সত্য তথ্য প্রকাশ করায় তাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয় এবং একপর্যায়ে তার ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়। রক্তে ভেসে যাওয়া জসীমকে দেখে তাঁর সহকর্মীরা ভেঙে পড়লে তিনি বলেন, “সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে যদি আমার রক্ত ঝরে, তবে সে রক্ত ব্যর্থ যাবে না।”
- (ক) ইমাম হোসেনের গলায় কার অলৌকিক স্পর্শের কারণে খঞ্জর কাটছিল না?
- (খ) আব্দুর রহমান কেন ইমাম হোসেনকে আগে আক্রমণ করতে বলেছিলেন?
- (গ) উদ্দীপকের জসীমের বক্তব্যের সাথে ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের মানসিকতার কোন দিকটির মিল রয়েছে?
- (ঘ) “রক্তক্ষয় সত্যানুসন্ধানীকে স্তব্ধ করতে পারে না, বরং সত্যকে অমর করে”— উদ্দীপক ও গল্পের আলোকে মন্তব্যটির যথার্থতা নিরূপণ করো।
৩ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) শৈশবে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) অত্যন্ত স্নেহভরে ইমাম হোসেনের গলায় বারবার পরশ ও চুম্বন দিয়েছিলেন বলে সেখানে ঘাতক সীমারের ধারালো খঞ্জর কাটছিল না।
(খ) অনাহারী ও শারীরিকভাবে চরম ক্লান্ত ইমাম হোসেনের গায়ের বল ও যুদ্ধকৌশল পরীক্ষা করার জন্যই এজিদ পক্ষের সেনাপতি আব্দুর রহমান তাঁকে আগে আঘাত করার কথা বলেছিলেন।
আব্দুর রহমান জানতেন যে ইমাম হোসেন দীর্ঘদিন ধরে অন্ন-জলহীন অবস্থায় রয়েছেন। তা সত্ত্বেও বংশগত বীরত্ব ও আলীর সন্তান হিসেবে হোসেনের রণকৌশলকে শত্রুরা ভয় পেত। তাই নিজের শক্তি প্রদর্শনের আগে হোসেনের শরীর ও সামরিক সক্ষমতা ঠিক কতটা অবশিষ্ট আছে, তা যাচাই করে দেখতেই তিনি হোসেনকে প্রথম আঘাত হানার প্রস্তাব দেন।
(গ) উদ্দীপকের সংবাদকর্মী জসীমের রক্তস্নাত হয়েও সত্য প্রকাশে অনড় থাকা ও আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যের মানসিকতা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতিতেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান ও মহতী ত্যাগের মানসিকতার সাথে বৈাদৃশ্যহীনভাবে মিলে যায়।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে দেখা যায়, বিষাক্ত তীরের আঘাতে ইমাম হোসেনের ঘাড় ভেদ হয়ে অবিরত রক্ত ঝরছিল। কিন্তু শরীরের এই চরম ক্ষত ও রক্তক্ষরণ তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে পারেনি। তিনি জানতেন, সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কারবালার ময়দানে ঝরা এই রক্ত বৃথা যাবে না, বরং এই আত্মত্যাগ যুগ যুগ ধরে সত্যের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।
উদ্দীপকের জসীমও সত্য খবর প্রকাশ করতে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে রক্তাক্ত হন। কিন্তু তিনি অনুশোচনা না করে বরং নিজের রক্ত ঝরাকে সত্যের বিজয়ের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন।
অতএব, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শারীরিকভাবে রক্তাক্ত হলেও আত্মিক শক্তিতে বলীয়ান থাকার দৃষ্টিভঙ্গিই উভয় চরিত্রের প্রধান মিল।
(ঘ) “রক্তক্ষয় সত্যানুসন্ধানীকে স্তব্ধ করতে পারে না, বরং সত্যকে অমর করে”— উক্তিটি উদ্দীপকের সংবাদকর্মী জসীম এবং ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেন উভয়ের ক্ষেত্রে শতভাগ বাস্তব ও যথার্থ।
অন্যায়কারী ও অত্যাচারীরা মনে করে রক্ত ঝরিয়ে বা শারীরিক ক্ষতি করে সত্যের কণ্ঠরোধ করা সম্ভব। কিন্তু প্রকৃত সত্যানুসন্ধানীদের ক্ষেত্রে ঘটে ঠিক বিপরীত। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে এজিদ বাহিনী ইমাম হোসেনকে রক্তাক্ত ও শহীদ করে ভেবেছিল তারা জয়ী হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ইমাম হোসেনের ফোটা ফোটা রক্ত ইসলামের প্রকৃত আদর্শ ও ন্যায়বিচারকে চিরদিনের জন্য অমর করে দিয়ে গেছে। তাঁর শাহাদাত ইতিহাসকে এই বার্তা দিয়েছে যে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার নামই প্রকৃত জীবন।
উদ্দীপকের সৎ সাংবাদিক জসীমের ভাবনাতেও এই একই মহতী চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। নৃশংস হামলায় রক্তে ভেসে গিয়েও তিনি বিশ্বাস করেছেন যে তাঁর এই রক্ত সত্যকে দাবিয়ে রাখবে না, বরং সমাজকে জাগ্রত করবে।
পরিশেষে বলা যায়, সত্যের পথিকের রক্ত কখনো বিফলে যায় না। অত্যাচারীর আঘাত সত্যানুসন্ধানীকে থামিয়ে দেওয়ার বদলে তাঁর আদর্শকে অমরত্ব দান করে। তাই উক্তিটি সর্বাংশে সত্য ও সুপ্রতিষ্ঠিত।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ৪
উদ্দীপক:
একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার প্রধান বিজ্ঞানী ড. শফিক দীর্ঘ প্রচেষ্টায় ক্ষতিকর ভাইরাসের ওষুধ আবিষ্কার করেন। কিন্তু এক মুনাফালোভী গোষ্ঠী বিপুল অর্থ দিয়ে এটি গোপন রাখতে বলে যাতে তাদের ওষুধের ব্যবসা সচল থাকে। ড. শফিক প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ করে দেন এবং মিথ্যা হুমকির মুখেও জনস্বার্থে ওষুধটি উন্মুক্ত করেন।
- (ক) ইমাম হোসেনকে হত্যার জন্য এজিদ পক্ষ কত টাকা মাথার দাম ঘোষণা করেছিল?
- (খ) অশ্বটি কেন অবিরত অশ্রুপাত করছিল?
- (গ) উদ্দীপকের ড. শফিকের সিদ্ধান্ত ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের কোন মূল দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে?
- (ঘ) “ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠে আদর্শ রক্ষা করাই মহৎ জীবনের বৈশিষ্ট্য”— উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের বিচারে বিশ্লেষণ করো।
৪ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) ইমাম হোসেনের মাথার দাম এজিদ পক্ষ ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা নির্ধারণ করেছিল।
(খ) নিজের প্রিয় মনিব ও অসীম বীর ইমাম হোসেনকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, বিষাক্ত তীরের আঘাতে মারাত্মক আহত এবং ঘাতক সৈন্য দ্বারা অবরুদ্ধ দেখে অশ্বটি ব্যথিত হয়ে অশ্রুপাত করছিল।
ইমাম হোসেন যখন কারবালার মাঠে অস্ত্র, বর্ম ও শিরস্ত্রাণ ত্যাগ করে প্রভুর ধ্যানে মগ্ন হন, তখন এজিদের ঘাতক সৈন্যরা তাঁকে চার দিক থেকে বেষ্টন করে ফেলে। নিঃসঙ্গ ও মারাত্মক আহত অবস্থায় মনিবের এই নিশ্চিত মৃত্যুকে নির্দ্বিধায় বরণ করে নেওয়ার করুণ দৃশ্যটি অনুভব করতে পেরেই বোবা প্রাণী হয়েও অশ্বটি দু’চোখ বেয়ে অবিরত জল ঝরাচ্ছিল।
(গ) উদ্দীপকের ড. শফিকের বিপুল অর্থের লোভ ও চক্রান্ত প্রত্যাখ্যান করে জনস্বার্থে সততার পথে থাকার সিদ্ধান্তটি ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের ‘ব্যক্তিগত প্রলোভন ও পার্থিব সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করে বৃহত্তর মানবকল্যাণ ও সত্য আদর্শ ধরে রাখা’ দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের সামনে সুযোগ ছিল এজিদের আনুগত্য স্বীকার করে রাজকীয় জীবন ও অঢেল সম্পদ লাভ করার। কিন্তু তিনি জানতেন এজিদকে মেনে নিলে সমাজ ও ধর্মের নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই তিনি পার্থিব আরাম-আয়েশের লোভ তুচ্ছ করে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেওয়াকে শ্রেয় মনে করেছেন।
উদ্দীপকের বিজ্ঞানী ড. শফিকও একই দর্শনে বিশ্বাসী। মুনাফালোভী কোম্পানির বিপুল অর্থ ও হুমকি উপেক্ষা করে তিনি সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং সত্যের পথ বেছে নিয়েছেন।
সুতরাং, জাগতিক লাভ ও প্রলোভনকে পায়ে ঠেলে আদর্শকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মহতী দর্শনটি উভয় চরিত্রেই সমানভাবে বিদ্যমান।
(ঘ) “ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠে আদর্শ রক্ষা করাই মহৎ জীবনের বৈশিষ্ট্য”— উক্তিটি উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্প বিচারে চরম সত্যি হিসেবে সাব্যস্ত হয়।
যাঁরা কেবল ব্যক্তিগত সুখ, লাভ-ক্ষতি ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেন, সমাজ তাঁদের মনে রাখে না। মহৎ মানুষ তারাই, যাঁরা আত্মস্বার্থের চশমা খুলে বৃহত্তর সত্য ও নীতিকে আঁকড়ে ধরে থাকেন। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন যদি পার্থিব লাভ-ক্ষতি হিসাব করতেন, তবে তিনি কারবালার মাঠে নিজের পরিবার ও নিজেকে বলিদানের দিকে ঠেলে দিতেন না। কিন্তু তিনি আত্মসুখের চেয়ে ঈমান ও আদর্শকে বড় মনে করেছিলেন। এই ত্যাগই তাঁকে বিশ্বসাহিত্যে ও ইতিহাসে অমর মানব হিসেবে স্থান দিয়েছে।
উদ্দীপকের বিজ্ঞানী ড. শফিকের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, বিপুল টাকার লোভ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হুমকিকে তিনি আমলেই নেননি। তিনি বুঝেছিলেন যে নিজের নীতি বিক্রি করে বেঁচে থাকার চেয়ে সত্যের পথে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণ করা অনেক বেশি প্রশংসনীয় ও সম্মানজনক।
সংক্ষেপে বলা যায়, ব্যক্তিগত স্বার্থের মহোৎসব যেখানে মানুষকে অন্ধ করে, সেখানে আদর্শবান ব্যক্তিরা নিজেদের ত্যাগের মাধ্যমে আলো ছড়ান। তাই উক্তিটি সম্পূর্ণরূপে সঠিক।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ৫
উদ্দীপক:
এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংকটে দেশের প্রধান বিরোধী নেতাকে সরকারের পক্ষে যোগ দেওয়ার জন্য মন্ত্রী পদ ও বিশাল ধন-সম্পদের প্রস্তাব দেওয়া হয়। অন্যথায় তাকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়। নেতা মৃদু হেসে বললেন, “দেশের মানুষের বিশ্বাসের সাথে প্রতারণা করে আমি রাজপ্রাসাদ চাই না, সাধারণ নাগরিক হিসেবে থাকা আমার কাছে বেশি মর্যাদার।”
- (ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে কারবালা ট্র্যাজেডির মূল কারণ কী ছিল?
- (খ) “জগৎ দেখুক, আমি কী অবস্থায় চলিলাম!”— চরণটির অন্তর্নিহিত অর্থ ব্যাখ্যা করো।
- (গ) উদ্দীপকের রাজনৈতিক নেতার অবস্থান ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের কোন মনোভাবকে ফুটিয়ে তোলে?
- (ঘ) “প্রলোভন ও হুমকির মুখে অনড় থাকায় সত্যিকারের নেতৃত্বের পরিচয়”— উদ্দীপক ও গল্পের আলোকে মন্তব্যটি মূল্যায়ন করো।
৫ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) এজিদের অবৈধ ক্ষমতা দখল ও অনৈতিক শাসনের বিরুদ্ধে ইমাম হোসেনের সত্য, ধর্মীয় নীতি ও ইনসাফ রক্ষায় অনড় অবস্থানই ছিল কারবালা ট্র্যাজেডির মূল কারণ।
(খ) শত্রু দ্বারা সম্পূর্ণ সহায়হীন, অস্ত্রহীন, মারাত্মক রক্তে সিক্ত ও অবরুদ্ধ অবস্থায় মহতী আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত হিসেবে দুনিয়া ত্যাগ করার অভিপ্রায় প্রকাশে উক্তিটি ব্যবহৃত হয়েছে।
কারবালার মাঠে সব অস্ত্র ও বর্ম খুলে ফেলে ইমাম হোসেন যখন ধ্যানে আচ্ছন্ন হন, তখন তিনি বুঝেছিলেন তাঁর অন্তিম মুহূর্ত আগত। তিনি সত্য রক্ষায় সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে কীভাবে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন, পৃথিবীর মানুষ যেন সেই পরম ত্যাগের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে—এই আত্মিক উপলব্ধি ও অনুভূতি থেকেই তিনি উক্ত আবেগঘন কথাটি বলেছিলেন।
(গ) উদ্দীপকের রাজনৈতিক নেতার প্রলোভন ও হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে জনগণের ট্রাস্ট ও নিজের নীতি না বেচার ঘোষণাটি ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের ‘আপসহীন আত্মমর্যাদাবোধ ও অসত্যের কাছে নতিস্বীকার না করার’ দৃঢ় মনোভাবকে ফুটিয়ে তোলে।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনকে এজিদ পক্ষের অন্যায্য শর্ত মেনে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। এজিদের বশ্যতা স্বীকার করলে তিনি হয়তো প্রাণ বাঁচিয়ে ক্ষমতা ও রাজকীয় সম্মান লাভ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতার প্রলোভন ও মৃত্যুর হুমকিকে চরম ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং নীতিতে অনড় থেকেছেন।
উদ্দীপকের রাজনৈতিক নেতাও একই মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। মন্ত্রী পদ ও সম্পদের টোপ ফিরিয়ে দিয়ে এবং নির্বাসনের হুমকি তুচ্ছ করে তিনি নিজের নীতি ও জনগণের বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছেন।
অতএব, প্রলোভন বা হুমকির মুখোমুখি হয়েও আত্মমর্যাদা ও আদর্শে অবিচল থাকার দৃঢ়তাই উভয় চরিত্রের কমন বৈশিষ্ট্য।
(ঘ) “প্রলোভন ও হুমকির মুখে অনড় থাকায় সত্যিকারের নেতৃত্বের পরিচয়”— উদ্দীপক এবং ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের বিচারে উক্তিটি নেতৃত্বের অন্যতম মূল নীতি হিসেবে প্রতিফলিত হয়।
একজন প্রকৃত নেতার আসল পরীক্ষা হয় সংকটের সময়ে। যিনি প্রলোভন বা ভয়ে নিজের অনুসারীদের বা আদর্শকে বিক্রি করে দেন, তিনি ভীরু; আর যিনি চরম বিপদেও অবিচল থাকেন, তিনিই প্রকৃত নেতা। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন মুসলিম উম্মাহ ও সত্যের পথপ্রদর্শক হিসেবে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। কারবালার মাঠে তাসের ঘরের মতো চারপাশ ভেঙে পড়লেও এবং এজিদের তলোয়ারের হুমকি সামনে থাকা সত্ত্বেও তিনি আদর্শিক অবস্থান থেকে এক চুল পিছপা হননি। তাঁর এই অনন্য নেতৃত্বই তাঁকে সত্যের অমর প্রতীক করেছে।
উদ্দীপকের রাজনৈতিক নেতার মধ্যেও প্রকৃত নেতৃত্বের এই গুণের প্রতিফলন দেখা যায়। ক্ষমতার লোভ বা নির্বাসনের ভয় কোনটিই তাঁর আদর্শিক দৃঢ়তাকে টলাতে পারেনি। দেশের মানুষের অধিকার ও বিশ্বাসের পক্ষে তিনি অনড় থেকে যোগ্য নেতৃত্বের প্রমাণ দিয়েছেন।
সুতরাং, নীতি ও সত্যের প্রশ্নে ভয় ও প্রলোভনকে জয় করে অবিচল থাকাই যে সত্যিকারের মহৎ নেতৃত্বের কষ্টিপাথর—তা গল্প ও উদ্দীপক উভয় থেকেই প্রমাণিত হয়।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ৬
উদ্দীপক:
একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এক অ্যাথলেট দৌড় শেষ করার ঠিক আগ মুহূর্তে দেখতে পেলেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিযোগী হঠাৎ পায়ে টান পড়ে পড়ে গেছেন। অ্যাথলেটটি নিজের নিশ্চিত প্রথম হওয়া ও স্বর্ণপদক পাওয়ার কথা না ভেবে দৌড় থামিয়ে সহ-প্রতিযোগীকে তুলতে এগিয়ে গেলেন এবং তাকে সাথে নিয়ে লাইন অতিক্রম করলেন।
- (ক) জেযাদ পিছন থেকে ইমাম হোসেনকে আঘাত করতে কী ছুড়ে মেরেছিল?
- (খ) সীমারের ছোড়া বিষাক্ত তীর ইমাম হোসেনের শরীরে কোথায় লেগেছিল এবং তার প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল?
- (গ) উদ্দীপকের অ্যাথলেটের আচরণ ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের কোন মানবিকতার কথা মনে করিয়ে দেয়?
- (ঘ) “প্রতিযোগিতা বা জয়ের চেয়ে মানবিক সহমর্মিতাই পরম প্রাপ্তি”— উদ্দীপক ও গল্পের আলোকে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।
৬ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) জেযাদ পিছন থেকে ইমাম হোসেনকে আঘাত করতে বিষাক্ত লৌহশর (লোহার তীর) ছুড়ে মেরেছিল।
(খ) সীমারের ছুড়ে মারা বিষাক্ত তীরটি ইমাম হোসেনের পিঠে বিদ্ধ হয়ে ঘাড়ের একপাশ ভেদ করে বের হয়ে গিয়েছিল, যার বিষক্রিয়ায় তাঁর সমস্ত শরীর অবশ হয়ে এসেছিল।
তীরের তীব্র বিষে আক্রান্ত হয়ে ইমাম হোসেনের শরীর অসাড় হতে শুরু করে। এর ফলে তিনি নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে ধরণীর বুকে ঢলে পড়েন এবং শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যান।
(গ) উদ্দীপকের অ্যাথলেটের নিশ্চিত প্রথম হওয়ার লোভ ছেড়ে আহত প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের ‘তীব্র সংকটেও অন্যের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করার পরম সহমর্মিতা ও মানবিকতার’ কথা মনে করিয়ে দেয়।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে দেখা যায়, ইমাম হোসেন নিজে তিন দিন ধরে তৃষ্ণার্ত থাকা সত্ত্বেও ফোরাত নদীর পাড়ে গিয়ে প্রথমে নিজের নিঃসঙ্গ ও ক্লান্ত অশ্বকে পানি পান করাতে উদ্যত হয়েছিলেন। এছাড়া, শহীদ স্বজন ও তৃষ্ণার্ত শিশুদের কষ্টের কথা মনে করে তিনি নিজের মুখের কাছে নেওয়া পানি নদীগর্ভে ফেলে দিয়েছিলেন। নিজের চাহিদার চেয়ে অন্যের কষ্টের প্রতি সংবেদনশীল হওয়াই ছিল তাঁর স্বভাব।
উদ্দীপকের অ্যাথলেটও ঠিক একইভাবে নিজ জয় ও পদকের প্রলোভনকে তুচ্ছ করে আহত সহ-প্রতিযোগীর সাহায্যে এগিয়ে গিয়ে অনন্য মানবিকতা দেখিয়েছেন।
অতএব, ব্যক্তিগত লাভ বা জয়ের চেয়ে অন্যের প্রতি সহানুভূতি দেখানোই উভয় ঘটনার মধ্যে প্রতিফলিত মূল মানবিক দিক।
(ঘ) “প্রতিযোগিতা বা জয়ের চেয়ে মানবিক সহমর্মিতাই পরম প্রাপ্তি”— উক্তিটি উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ভাবাদর্শের সাথে গভীরভাবে সংগতিপূর্ণ।
জগতে জয়-পরাজয়, মেডেল বা পদ-পদবি সাময়িক, কিন্তু মানবিকতার দৃষ্টান্ত চিরন্তন। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে বাহ্যিকভাবে এজিদ জয়ী হয়েছিল আর ইমাম হোসেন পরাজিত ও নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু নৈতিকতা ও মানবিকতার বিচারে ইমাম হোসেনই চিরঞ্জীব বিজয়ী। ফোরাতের পানি না খেয়ে সহমর্মিতা দেখানো এবং দুশমনদের প্রতিও আক্রোশ প্রকাশ না করে তাঁদের মুক্তির পথ দেখানো—হোসেনের এই মানবিক গুণাবলিই ইতিহাসকে জয় করেছে।
উদ্দীপকের অ্যাথলেটের ক্ষেত্রেও আমরা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখি। সে হয়তো প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পায়নি, কিন্তু প্রতিযোগীকে সাহায্য করে দুনিয়াব্যাপী মানুষের মন জয় করেছে এবং পরম মানবিক সন্তুষ্টি লাভ করেছে।
পরিশেষে বলা যায়, বাহ্যিক জয় মানুষকে সাময়িক পরিচিতি দেয়, কিন্তু মানবিক সহমর্মিতা মানুষকে মহান সত্তায় পরিণত করে। উদ্দীপক ও গল্প উভয়ই প্রমাণ করে যে সহমর্মিতাই মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ৭
উদ্দীপক:
পাহাড়ি এলাকায় নতুন রাস্তা তৈরির কাজ চলছিল। কন্ট্রাক্টর কাজের মান খারাপ করে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করতে চাইলে সাইট ইঞ্জিনিয়ার তন্ময় তা আটকে দেন। কন্ট্রাক্টর তন্ময়কে চাকরিচ্যুত করা ও প্রাণনাশের ভয় দেখায়। তন্ময় শান্ত কণ্ঠে বলেন, “আমার জীবন থাকলেও কাজ সততার সাথে হবে, না থাকলেও মিথ্যা সই আমি দেব না।”
- (ক) ইমাম হোসেনের শত্রুপক্ষের প্রধান সেনা অধিনায়ক কে ছিল?
- (খ) “অস্ত্রই বল পরীক্ষার প্রধান উপকরণ!”— উক্তিটি কার এবং কেন করা হয়েছিল?
- (গ) উদ্দীপকের ইঞ্জিনিয়ার তন্ময়ের অনমনীয় মনোভাব ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের প্রতিবাদের সাথে কীভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ?
- (ঘ) “জীবন বিপন্ন হলেও সততার পথে অনড় থাকাই নীতিবানের শক্তি”— উদ্দীপক ও গল্পের প্রেক্ষিতে এটি মূল্যায়ন করো।
৭ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের শত্রুপক্ষের (এজিদ বাহিনীর) প্রধান সেনা অধিনায়ক ছিল ওমর ছাদ।
(খ) উক্ত উক্তিটি এজিদ পক্ষের অন্যতম পরাক্রান্ত বীর আব্দুর রহমানের, যা তিনি মুখের কথার চেয়ে যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে শারীরিক বল পরীক্ষা করার প্রেক্ষাপটে করেছিলেন।
ইমাম হোসেনের সাথে দ্বৈরথ যুদ্ধের শুরুতে আব্দুর রহমান তাঁকে আগে আঘাত করার আহ্বান জানান। কিন্তু ইমাম হোসেন জানান যে বংশগত নীতি অনুযায়ী তাঁরা আগে শত্রুকে আক্রমণ করেন না। তখন আব্দুর রহমান বলেন, কেবল কথা দিয়ে বীরত্ব মাপা যায় না, অস্ত্র চালনার মাধ্যমেই একজন যোদ্ধার সত্যিকারের বল ও সক্ষমতা পরীক্ষা করা সম্ভব।
(গ) উদ্দীপকের সাইট ইঞ্জিনিয়ার তন্ময়ের চাকরি ও প্রাণনাশের হুমকি উপেক্ষা করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনমনীয় থাকা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের এজিদ বাহিনীর ক্ষমতার হুমকির মুখেও ধর্ম ও সততার আদর্শে অটল থাকার দিকটির সাথে সম্পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের বিরুদ্ধে এজিদের বিশাল সামরিক শক্তি মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু ইমাম হোসেন কোনো রক্তচক্ষু বা অশুভ শক্তির কাছে সত্যকে বিকিয়ে দেননি। তিনি জানতেন এজিদের দুর্নীতি ও অন্যায্য দাবি মেনে নিলে অনธรรม টিকে যাবে, তাই জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তিনি সত্যের মানদণ্ড ধরে রেখেছিলেন।
উদ্দীপকের ইঞ্জিনিয়ার তন্ময়ও দুর্নীতিগ্রস্ত কন্ট্রাক্টরের হুমকি ও জীবন বিপন্ন হওয়ার ভয়কে তুচ্ছ করে দুর্নীতির খাতায় সই করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
অতএব, বিপদের মুখাবয়বে দাঁড়িয়েও অনৈতিক কাজে সায় না দেওয়ার এই অনন্য প্রতিবাদী ও নীতিবান মানসিকতাই উভয় চরিত্রের প্রধান মিলনক্ষেত্র।
(ঘ) “জীবন বিপন্ন হলেও সততার পথে অনড় থাকাই নীতিবানের শক্তি”— উক্তিটি উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের আলোকচ্ছটায় এক অবিসংবাদিত সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়।
পার্থিব ক্ষমতা বা অস্ত্র নীতিবান মানুষকে শারীরিকভাবে শেষ করতে পারে, কিন্তু তাঁর আদর্শিক শক্তিকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে না। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে এজিদের অস্ত্র ও সৈন্যরা ইমাম হোসেনকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল, তাঁর জীবন নিঃশেষ করে দিয়েছিল। কিন্তু ইমাম হোসেন অসততা ও অন্যায়ের সাথে আপস করেননি। তাঁর জীবনের বিনিময়ে অর্জিত এই সততাই আজ বিশ্বজুড়ে ন্যায়কামী মানুষের বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
উদ্দীপকের ইঞ্জিনিয়ার তন্ময়ের ভেতরেও এই আত্যিক শক্তি লক্ষ্য করা যায়। জীবনের ঝুঁকি জেনেও দুর্নীতি না করার যে পণ তিনি করেছেন, তা প্রমাণ করে যে নীতিবান মানুষের সত্যিকারের বল তাঁর সততার ভেতরেই নিহিত থাকে। অসৎ লোক ক্ষমতার ভয় দেখাতে পারে, কিন্তু নীতিবান লোকের চরিত্রকে তোয়ালে দিয়ে বাঁধতে পারে না।
সুতরাং, জীবন বিপন্ন হওয়ার সংকটেও সততা না হারানোই একজন প্রকৃত নীতিবান মানুষের আসল বল বা শক্তি, যা গল্প ও উদ্দীপক উভয়তেই দীপ্তমান।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ৮
উদ্দীপক:
গ্রামের এক বৃদ্ধ কৃষক তাঁর একমাত্র জমিটুকু নিয়ে প্রভাবশালী জোতদারের সাথে আইনি লড়াই লড়ছেন। জোতদার তাকে বিপুল টাকা দিয়ে মামলা তুলে নিতে বলল, নতুবা তার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দিল। বৃদ্ধ কৃষক বললেন, “ভিটেমাটি পুড়ে ছাই হতে পারে, কিন্তু জালিয়াতির কাছে মাথা নোয়াব না।”
- (ক) সীমার কার বুকের ওপর চেপে বসেছিল?
- (খ) সীমারের বুকের বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল এবং তা কী প্রমাণ করে?
- (গ) উদ্দীপকের কৃষকের দৃঢ় অবস্থান ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের কোন প্রসঙ্গের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ?
- (ঘ) “অন্যায়কারীর দাপটের চেয়ে সত্যের শক্তি বহুগুণ শক্তিশালী”— উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের বিচারে বক্তব্যটি সত্যতা যাচাই করো।
৮ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর:
(ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে পাপাচারী সীমার ইমাম হোসেনের বুকের ওপর চেপে বসেছিল।
(খ) ঘাতক সীমারের বক্ষস্থল বা বুকের ছাতি ছিল পশমহীন (লোমশূন্য), যা মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণীর অলৌকিক সত্যতা প্রমাণ করে।
ইমাম হোসেনের মাতামহ হযরত মোহাম্মদ (সা.) আগেই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে, তাঁর প্রিয় দৌহিত্র হোসেনের হত্যাকারী হবে এক পাপাচারী ব্যক্তি, যার বুকে কোনো লোম থাকবে না। সীমার যখন হোসেনের বুকের ওপর বসে খঞ্জর চালাতে উদ্যত হয়, তখন জামা সরালে দেখা যায় যে তার বুকে কোনো পশম নেই। এটি বিশ্বনবীর বাণীর সত্যতাকেই অলৌকিকভাবে প্রমাণ করে।
(গ) উদ্দীপকের নিঃস্ব কৃষকের ভিটেমাটি হারানোর হুমকি সত্ত্বেও প্রভাবশালী জোতদারের জালিয়াতির কাছে মাথা নত না করার অবস্থানটি ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের ক্ষমতাধর এজিদ বাহিনীর চরম অত্যাচার ও অবরোধের মুখে দাঁড়িয়েও নিজের সত্যের অবস্থান বজায় রাখার প্রসঙ্গের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে দেখা যায়, এজিদ বাহিনীর কাছে ক্ষমতা, সৈন্য ও ধারালো অস্ত্র ছিল। কিন্তু ইমাম হোসেন জানতেন এজিদ অন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই তিনি সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হলেও এজিদের অন্যায্য ও মিথ্যার দাপটের কাছে মাথা নোয়াননি।
উদ্দীপকের বৃদ্ধ কৃষকটিও একাকী হয়েও জোতদারের টাকা ও হুমকির মুখে অনড় থেকেছেন। তিনি ভিটেমাটি ছাই হওয়া সহ্য করতে রাজী, কিন্তু জালিয়াতির কাছে পরাজয় স্বীকার করতে নারাজ।
সুতরাং, প্রতিপক্ষের অশুভ দাপট ও হুমকির বিপরীতে সততা ও সত্যকে আঁকড়ে ধরে রাখার এই অবস্থানই উভয় চরিত্রের মূল সাদৃশ্য।
(ঘ) “অন্যায়কারীর দাপটের চেয়ে সত্যের শক্তি বহুগুণ শক্তিশালী”— উদ্দীপক এবং ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এই মন্তব্যের গভীর সত্যতা প্রমাণিত হয়।
অন্যায়কারীদের থাকে বাহ্যিক দাপট, সৈন্য বা টাকা; কিন্তু সত্যের পথিকের থাকে অদম্য আত্মিক শক্তি। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে কারবালার মাঠে এজিদের হাজার হাজার সৈন্য ও অস্ত্রের দাপট ছিল। কিন্তু নৈতিকতার লড়াইয়ে এজিদের সেই দাপট ইমাম হোসেনের একক সত্যের শক্তির কাছে পরাস্ত হয়েছে। ইমাম হোসেন রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, তরবারি দিয়ে দেহ কাটা গেলেও সত্যকে ধ্বংস করা যায় না। এজিদ ইতিহাসে ঘৃণিত এবং ইমাম হোসেন সত্যের বিজয়ী প্রদীপ হিসেবে আজও প্রজ্জ্বলিত।
উদ্দীপকের বৃদ্ধ কৃষকের ক্ষেত্রেও একই সত্য দৃশ্যমান। অত্যাচারী জোতদারের বিপুল টাকা ও ক্ষমতার দাপট কৃষকটির আত্মিক ও সৎ শক্তির সামনে হেরে গেছে। কৃষকটি নিঃস্ব হলেও তাঁর সত্যের বল তাঁকে জোতদারের হুমকির সামনে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, বাহ্যিক দৃষ্টিতে অন্যায়কারীদের শক্তিশালী মনে হলেও দিনশেষে সত্যের আত্মিক শক্তিই বিজয়ী হয়। তাই উক্তিটি সম্পূর্ণরূপে সঠিক ও সর্বজনগ্রাহ্য।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ৯
উদ্দীপক:
এক মহান বিপ্লবী নেতা দেশের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। বিচারে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে তিনি জল্লাদকে বললেন, “তোমরা আমার শরীরকে ফাঁসি দিতে পারো, কিন্তু আমার স্বাধীনতার স্বপ্নকে কখনো ফাঁসি দিতে পারবে না।”
প্রশ্ন:
- (ক) ইমাম হোসেনের মাতামহের নাম কী ছিল?
- (খ) “অস্ত্রই বল পরীক্ষার প্রধান উপকরণ!”— নিহিতার্থ বুঝিয়ে লেখো।
- (গ) উদ্দীপকের বিপ্লবী নেতার বক্তব্য ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের কোন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটায়?
- (ঘ) “শারীরিক বিনাশ সম্ভব হলেও আদর্শের মৃত্যু ঘটে না”— উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের বিচারে উক্তিটি মূল্যায়ন করো।
৯ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) ইমাম হোসেনের মাতামহের (নানার) নাম ছিল বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)।
(খ) কেবল মুখের কথা বা বীরত্বপূর্ণ সংলাপে যোদ্ধার আসল শক্তি বোঝা যায় না, বরং যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি অস্ত্র চালনার দক্ষতা ও বলের মাধ্যমেই শক্তির সঠিক পরীক্ষা ঘটে—এটাই চরণটির মূল নিহিতার্থ।
এজিদ সেনাপতি আব্দুর রহমান হোসেনকে আগে আঘাত করার আমন্ত্রণ জানালে হোসেন ধর্মীয় নীতি উল্লেখ করে আগে আঘাত করতে অসম্মতি প্রকাশ করেন। তখন আব্দুর রহমান জানান যে কথা না বাড়িয়ে অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রমাণিত হবে যে দীর্ঘদিন ধরে অনাহারী হোসেনের শরীরে ঠিক কতটা সামরিক বল অবশিষ্ট আছে।
(গ) উদ্দীপকের বিপ্লবী নেতার ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজ আন্দোলনের আত্মিক অমরতার কথা ব্যক্ত করার মানসিকতা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের ‘শারীরিক মৃত্যুকে তোয়াক্কা না করে সত্য ও ঈমানি আদর্শকে চিরস্থায়ী করার’ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটায়।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন যখন শত্রুবেষ্টিত হয়ে তীরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিলেন, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে পার্থিব জীবন শেষ হতে চলেছে। কিন্তু তিনি ব্যাকুল হননি। তিনি জানতেন, সত্যের জন্য তাঁর এই মহতি আত্মত্যাগ ইসলামের অমর আদর্শকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখবে এবং এজিদের অন্যায় শাসনব্যবস্থাকে নৈতিকভাবে পরাজিত করবে।
উদ্দীপকের বিপ্লবী নেতাও ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর ভয়কে জয় করে নিজের দেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে অবিনশ্বর বলে ঘোষণা করেছেন।
অতএব, পার্থিব শরীরের অবসানকে তুচ্ছ মনে করে আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার দৃঢ় দৃষ্টিভঙ্গিই উভয় চরিত্রে ফুটে উঠেছে।
(ঘ) “শারীরিক বিনাশ সম্ভব হলেও আদর্শের মৃত্যু ঘটে না”— উক্তিটি উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্প উভয়ের চেতনাকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করে।
মানুষের শরীর নশ্বর, কিন্তু তার মহৎ চিন্তাধারা ও আদর্শ চিরন্তন। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে এজিদের সৈন্যরা নির্মমভাবে ইমাম হোসেনের শারীরিক বিনাশ ঘটিয়েছিল। কিন্তু ইমাম হোসেন যে সত্য, ন্যায় বিচার ও আত্মমর্যাদার বার্তা দিয়ে গেছেন, তা কি এজিদ ধ্বংস করতে পেরেছে? পারেনি। ইমাম হোসেনের শাহাদাত শতাব্দী থেকে শতাব্দীতে মানুষের হৃদয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রেরণা জোগায়।
উদ্দীপকের প্রসংগেও দেখা যায়, জল্লাদ বা শাসক বিপ্লবীর শরীরকে ফাঁসি দিয়ে শেষ করতে পেরেছে, কিন্তু তাঁর মনের স্বাধীনতার আগুনকে নেভাতে পারেনি। সেই আদর্শ পরবর্তী প্রজন্মের আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
উপসংহারে বলা যায়, ঘাতকের অস্ত্র কেবল রক্ত-মাংসের শরীরকে ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু যে আদর্শ সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তার কখনো মৃত্যু ঘটে না। গল্প ও উদ্দীপক উভয়ই এই শাশ্বত সত্যকে প্রমাণ করে।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ১০
উদ্দীপক:
একটি অবরুদ্ধ শহরের সাধারণ নাগরিকরা খাদ্যাভাবে কষ্ট পাচ্ছিল। এক ব্যবসায়ী নিজের গুদামে জমিয়ে রাখা ত্রাণ সামগ্রী চড়া দামে বিক্রি না করে কোনো লাভ ছাড়া ক্ষুধার্ত মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিলেন। এতে তাঁর নিজের জমানো মূলধন শেষ হয়ে গেলেও মানুষের মুখে হাসি দেখে তিনি পরম তৃপ্তি পেলেন।
- (ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের শেষ মুহূর্তে বক্ষস্থলে কে চেপে বসেছিল?
- (খ) ইমাম হোসেন এজিদ সৈন্যদের কী বলে তিরস্কার করেছিলেন এবং কেন?
- (গ) উদ্দীপকের ব্যবসায়ীর ত্যাগ ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের কোন গুণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
- (ঘ) “স্বার্থপরতার চেয়ে পরমার্থেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা”— উদ্দীপক ও গল্পের প্রেক্ষিতে এটি বিশ্লেষণ করো।
১০ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের চরম অন্তিম মুহূর্তে তাঁর বক্ষস্থলে পাপাচারী ঘাতক সীমার চেপে বসেছিল।
(খ) এজিদের তুচ্ছ প্রলোভনে পা দিয়ে নিজেদের অমূল্য জীবন বিসর্জন দেওয়া এবং এক ভীরু ও চক্রান্তকারী নেতার অন্ধ অনুগামী হওয়ার কারণে হোসেন এজিদ সৈন্যদের ভীরু ও অর্থলোভী পিশাচ বলে তিরস্কার করেছিলেন।
ইমাম হোসেন রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে এজিদ সেনাদলকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এজিদ নিজে সুরক্ষিত দূরত্বে থেকে সাধারণ সৈন্যদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। সামান্য অর্থ ও পদের লোভে পড়ে তারা এক অধার্মিক শাসকের জন্য নিজেদের ঈমান ও জীবন ধ্বংস করছে। এই অন্ধত্ব ও নৈতিক পতন দেখেই হোসেন তাদের ধিক্কার দেন।
(গ) উদ্দীপকের ব্যবসায়ীর নিজের জমানো অঢেল মুনাফা ও মূলধন বিসর্জন দিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সেবা করার মানসিকতা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের ‘নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও জীবন বিসর্জন দিয়ে নীতি ও মানবকল্যাণে আত্মনিবেদন করার’ মহান গুণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন নিজের ভোগ-বিলাস বা জীবনের তোয়াক্কা করেননি। তিনি নিজের জীবন, পরিবার ও স্বজনদের বিসর্জন দিয়েছেন যাতে দ্বীন ও ইনসাফের ধারা বজায় থাকে। আত্মসুখ ত্যাগ করে অন্যের কল্যাণ ও সত্য রক্ষাই ছিল তাঁর জীবনের মূল স্পন্দন।
উদ্দীপকের ব্যবসায়ীও পরমার্থের টানে নিজের জমানো ব্যবসা ও মুনাফা বিলিয়ে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।
সুতরাং, নিজের লাভ বা সুবিধা বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর কল্যাণ ও ত্যাগের আনন্দ খুঁজে নেওয়ার মানসিকতাই উভয় চরিত্রের সামঞ্জস্য।
(ঘ) “স্বার্থপরতার চেয়ে পরমার্থেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা”— উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের বিচারে বক্তব্যটি পরম সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়।
যারা কেবল নিজের স্বার্থ, টাকা ও আয়েশের কথা ভাবে, তাদের জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যুর সাথে সাথেই তাদের অস্তিত্ব মুছে যায়। কিন্তু যারা পরমার্থে অর্থাৎ অন্যের কল্যাণে ও মহৎ উদ্দেশ্যে জীবনকে সঁপে দেয়, তাদের জীবনই প্রকৃতপক্ষে সার্থক। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন কারবালার মাঠে যে পরম আত্মত্যাগ করেছিলেন, তা ছিল নিছক ঈশ্বর ও মানবতার জন্য। নিজের স্বার্থের হিসাব করলে তিনি এজিদের সাথে সন্ধি করতেন। কিন্তু ত্যাগের পথ বেছে নিয়েই তিনি ইতিহাসে জীবনের পরম সার্থকতা অর্জন করেছেন।
উদ্দীপকের ব্যবসায়ীটির ক্ষেত্রেও একই সত্যি ফুটে ওঠে। নিজের লাভ বা মূলধন হারানোর পর ব্যবসায়ী দেউলিয়া হননি, বরং ক্ষুধার্তদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তিনি পরম আত্মিক শান্তি ও জীবনের প্রকৃত সার্থকতা লাভ করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ ও সার্থকতা। উদ্দীপকের ব্যবসায়ী এবং গল্পের ইমাম হোসেন—উভয়েই প্রমাণ করেছেন যে আত্মস্বার্থের চেয়ে পরমার্থের পথে হাঁটাই মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ১১
উদ্দীপক:
৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারেরা যখন গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছিল, তখন মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেন তাঁর পুরো পরিবারকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। বুকে স্বজন হারানোর তীব্র যন্ত্রণা নিয়েও তিনি যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেননি। সহযোদ্ধারা তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বললে তিনি বলেন, “স্বজনদের হারিয়েছি সত্যি, কিন্তু দেশের স্বাধীনতার চেয়ে বড় কোনো আশ্রয় আমার কাছে নেই।”
- (ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে কারবালায় ইমাম হোসেনের কোন স্বজনের বিচ্ছেদের কথা উল্লেখ রয়েছে?
- (খ) “ইহজীবনেও আর পানি পান করিব না”— কে এবং কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
- (গ) উদ্দীপকের আলতাফ হোসেনের মানসিকতার সাথে ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের কোন দিকটির মিল পাওয়া যায়? ব্যাখ্যা করো।
- (ঘ) “স্বজন হারানোর বেদনা সত্যানু সন্ধানীকে ব্যাকুল করলেও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে না”— উদ্দীপক ও গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করো।
১১ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের ভ্রাতুষ্পুত্র (ভাতিজা) কাসেমের বিচ্ছেদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে।
(খ) দুগ্ধপোষ্য শিশু ও প্রিয় স্বজনদের কারবালার তৃষ্ণার্ত অবস্থার কথা মনে পড়ায় চরম অনুশোচনা ও গভীর সহমর্মিতা থেকে ইমাম হোসেন এই আবেগঘন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
কারবালার মরুপ্রান্তরে ফোরাত নদীর কূলে পৌঁছে এক আঁজলা পানি পান করতে গিয়ে ইমাম হোসেনের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পানির অভাবে ছটফট করে মারা যাওয়া তাঁর প্রিয় সন্তান আলী আকবর ও ভাতিজা কাসেমের মুখ। যাদের তিনি এক ফোঁটা পানি এনে দিতে পারেননি, নিজে পানি পান করে তাদের স্মৃতি ও আত্মার প্রতি অবিচার করতে চাননি। গভীর অনুশোচনা ও সহমর্মিতার জায়গা থেকেই তিনি হাতের পানি নদীতে ফেলে দেন এবং জীবনে আর কখনো পানি না খাওয়ার সংকল্প করেন।
(গ) উদ্দীপকের মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেনের স্বজন হারিয়েও দেশের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে সত্য ও আদর্শের পথে অবিচল থাকার দিকটির সাথে গভীরভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।
মীর মশাররফ হোসেনের ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে দেখা যায়, কারবালার মাঠে একে একে ভাই হাসান, ভাতিজা কাসেম ও কোলের শিশুদের হারিয়ে ইমাম হোসেন সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। চারপাশের এই হৃদয়বিদারক বিয়োগব্যথা ও শোক তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেললেও তিনি এজিদের অধর্ম ও অন্যায্য শাসনের সামনে আত্মপরিচয় বা আদর্শ বিসর্জন দেননি। শত স্বজন হারানোর বেদনায় নীল হয়েও তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে একচুলও পিছপা হননি।
উদ্দীপকের আলতাফ হোসেনও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে নিজের পুরো পরিবারকে হারিয়েছেন। সহযোদ্ধারা তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি দেশের স্বাধীনতা অর্জনের মহৎ লক্ষ্যকে স্বজন হারানোর শোকের চেয়ে বড় মনে করেছেন।
অতএব, ব্যক্তিগত বিয়োগব্যথাকে পেছনে ফেলে মহৎ কোনো উদ্দেশ্য বা সত্যের পথে অনড় থাকার এই মানসিকতাই ইমাম হোসেন ও আলতাফ হোসেনের চরিত্রে ফুটে ওঠা মূল সাদৃশ্য।
(ঘ) “স্বজন হারানোর বেদনা সত্যানুসন্ধানীকে ব্যাকুল করলেও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে না”— উক্তিটি উদ্দীপকের মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেন এবং ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেন উভয়ের জীবনের প্রেক্ষাপটেই শতভাগ যথার্থ ও তাৎপর্যপূর্ণ।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গদ্যাংশে কারবালার রক্তঝরা ময়দানে ইমাম হোসেনের চারপাশের পরিস্থিতি ছিল ঘোর অমানিশায় ভরা। এজিদ বাহিনীর নির্মমতায় একের পর এক প্রিয়জনের মৃত্যুতে তাঁর অন্তর ছিল রক্তাক্ত ও ব্যথিত। কিন্তু তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারী এজিদের শাসন প্রত্যাখ্যান করে ইসলামের মূল সত্য, ইনসাফ ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করা। স্বজনদের করুণ মৃত্যুতে তিনি ব্যাকুল হলেও এজিদের বশ্যতা স্বীকার করে কাপুরুষের মতো জীবন বাঁচানোর সহজ পথ বেছে নেননি। তিনি বীরের মতো মৃত্যুকে জড়িয়ে ধরে নিজের মূল লক্ষ্যকে রক্ষা করেছেন।
উদ্দীপকের দিকে তাকালেও আমরা একই ঘটনার প্রতিফলন দেখতে পাই। মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেনের জীবনে পরিবার হারানোর শোক ছিল পাহাড়সম। এই বেদনা তাঁকে মানসিকভাবে ব্যাকুল করেছিল নিঃসন্দেহে, কিন্তু এটি তাঁর ভেতরের দেশপ্রেম বা মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য থেকে তাঁকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি পরিবার হারানোর শোককে দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার শক্তিতে পরিণত করেছিলেন।
সারসংক্ষেপ হিসেবে বলা যায়, সাধারণ মানুষ শোক পেলে দিশেহারা হয়ে পড়ে, কিন্তু যারা সত্য ও আদর্শের পথপ্রদর্শক বা সত্যানুসন্ধানী, শোক তাঁদের পথকে অবরুদ্ধ করতে পারে না। ইমাম হোসেন ও আলতাফ হোসেন—উভয়েই প্রমাণ করেছেন যে সত্য ও মহৎ লক্ষ্যের সামনে স্বজন হারানোর ব্যক্তিগত বেদনা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ১২
উদ্দীপক:
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম বাজারে নিজের সততার জন্য পরিচিত। একবার এক অসাধু সিন্ডিকেট তাকে চড়া দামে ভেজাল পণ্য বিক্রি করার বড় অফার দিল। এতে না রাজ হওয়ায় তারা জহিরুলকে হুমকি দিল এবং তার দোকান ভাঙচুর করল। কিন্তু জহিরুল শান্ত থেকে বললেন, “তোমরা আমার ব্যবসা নষ্ট করতে পারো, কিন্তু আমাকে অসৎ বানাতে পারবে না।”
- (ক) ইমাম হোসেনের মাথার দাম এজিদ পক্ষে কত নির্ধারণ করা হয়েছিল?
- (খ) আব্দুর রহমান কেন ইমাম হোসেনকে আগে আক্রমণ করতে বলেছিলেন?
- (গ) উদ্দীপকের জহিরুলের নীতিবোধ ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের কোন প্রসঙ্গের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ?
- (ঘ) “পার্থিব ক্ষতি বা ভয় নীতিবান মানুষকে অন্যায়ের সহযোগী বানাতে পারে না”— উদ্দীপক ও গল্পের আলোকে উক্তিটি মূল্যায়ন করো।
১২ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) ইমাম হোসেনের মাথার দাম এজিদ পক্ষে ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
(খ) অনাহারী ও শারীরিকভাবে ক্লান্ত ইমাম হোসেনের গায়ের বল এবং লড়াইয়ের শক্তির পরিমাপ বা পরীক্ষা করার জন্যই এজিদ পক্ষের সেনাপতি আব্দুর রহমান তাঁকে আগে আঘাত করতে বলেছিলেন।
এজিদ বাহিনীর অন্যতম পরাক্রান্ত যোদ্ধা আব্দুর রহমান জানতেন যে ইমাম হোসেন দীর্ঘদিন ধরে অনাহারে-তৃষ্ণায় রয়েছেন। তা সত্ত্বেও হোসেনের বীরত্ব ও যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে এজিদ পক্ষের ভয় ছিল। তাই নিজের শক্তি প্রদর্শনের আগে হোসেনের শারীরিক সক্ষমতা কতটা অবশিষ্ট আছে তা পরীক্ষা করতেই তিনি হোসেনকে আগে আঘাত করার প্রস্তাব দেন।
(গ) উদ্দীপকের জহিরুল ইসলামের ভয়-ভীতি, হুমকি ও ক্ষতির মুখেও নিজের সততায় অটল থাকার ঘটনাটি ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের এজিদ বাহিনীর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ও মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সত্য ও ধর্মীয় নীতি রক্ষা করার প্রসঙ্গের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে দেখা যায়, এজিদের সৈন্যরা ইমাম হোসেনকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে খাদ্য ও পানি বন্ধ করে দিয়েছিল। এজিদের ক্ষমতা স্বীকার করে নিলে তিনি সহজেই এই মহাবিপদ থেকে উদ্ধার পেতেন এবং রাজকীয় জীবন লাভ করতে পারতেন। কিন্তু ইমাম হোসেন জানতেন এজিদকে মেনে নেওয়া মানে অধর্ম ও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া। তাই তিনি জীবন ও স্বজনদের বিসর্জনের মতো চরম ক্ষতি সহ্য করেছেন, তবু অন্যায়ের বশ্যতা স্বীকার করেননি।
উদ্দীপকের জহিরুলও একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হলেও তাঁর নীতিবোধ ছিল অত্যন্ত শক্ত। অসাধু সিন্ডিকেটের ভেজাল পণ্যের লাভজনক অফার ও হুমকি প্রত্যাখ্যান করে তিনি দোকান ভাঙচুরের মতো আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, কিন্তু অসৎ হননি।
সুতরাং, পার্থিব প্রলোভন ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েও নীতির পথে অনড় থাকার মানসিকতাই গল্পের ইমাম হোসেন ও উদ্দীপকের জহিরুলের নীতিবোধের মূল সঙ্গতি।
(ঘ) “পার্থিব ক্ষতি বা ভয় নীতিবান মানুষকে অন্যায়ের সহযোগী বানাতে পারে না”— উক্তিটি উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্প উভয়ের মূল চেতনাকে সঠিকভাবে উন্মোচিত করে।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের পার্থিব ক্ষতির কোনো সীমা ছিল না। তিনি রাজ্য হারিয়েছেন, স্বজনদের হারিয়েছেন, ফোরাতের পানি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। এজিদ বাহিনীর অগণিত সৈন্য, অস্ত্র ও নির্মমতা তাঁকে ভীতি প্রদর্শনের কোনো ত্রুটি করেনি। কিন্তু এই পর্বতসম ক্ষতি বা চরম মৃত্যুর ভয় ইমাম হোসেনকে এক মুহূর্তের জন্যও এজিদের অন্যায় শাসনের সহযোগী বানাতে পারেনি। তিনি জেনেছিলেন, পার্থিব শরীর ধ্বংস হতে পারে কিন্তু নৈতিকতার পরাজয় হতে দেওয়া যাবে না।
একইভাবে, উদ্দীপকের জহিরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও দেখা যায় পার্থিব ক্ষতি তাঁর নীতিকে টলাতে পারেনি। অসৎ ব্যবসায়ীরা তাকে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিল এবং তাঁর দোকান ভাঙচুর করেছিল। কিন্তু এসব পার্থিব ভয় জহিরুলকে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য করতে পারেনি। সে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তার ব্যবসা নষ্ট হতে পারে, কিন্তু চরিত্র বা সততা নষ্ট করা সম্ভব নয়।
পরিশেষে বলা যায়, সাধারণ মানুষ পার্থিব লাভ-ক্ষতির হিসেব করে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু খাঁটি নীতিবান মানুষ সবসময় সত্য ও আদর্শকে অগ্রাধিকার দেন। কোনো ভয়-ভীতি বা জাগতিক ক্ষতি তাঁদের অন্যায়ের সাথে আপস করাতে পারে না। তাই উক্তিটি সর্বাংশে সত্য ও যৌক্তিক।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ১৩
উদ্দীপক:
এক ঐতিহাসিক যুদ্ধে রাজা বিক্রমাদিত্য প্রতিপক্ষের শত শত সৈন্য দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তাঁর হাতের তরবারিটি ভেঙে গিয়েছিল এবং তিনি মারাত্মকভাবে আহত ছিলেন। প্রতিপক্ষের সেনাপতি তাঁকে উপহাস করে আত্মসমর্পণ করতে বললে বিক্রমাদিত্য বীরের মতো বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বলেন, “পরাজয় মেনে নেওয়ার চেয়ে বীরের মতো আত্মোৎসর্গ করা অনেক বেশি সম্মানের।”
- (ক) জেযাদ পিছন থেকে ইমাম হোসেনকে আঘাত করতে কী ছুড়ে মেরেছিল?
- (খ) অশ্বের চোখ দিয়ে কেন অবিরত জল ঝরছিল?
- (গ) উদ্দীপকের বিক্রমাদিত্যের উক্তিটি ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের কোন দৃষ্টিভঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলে?
- (ঘ) “আত্মসমর্পণের চেয়ে বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগই ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকে”— উদ্দীপক ও গল্পের প্রেক্ষাপটে উক্তিটির সত্যতা বিচার করো।
১৩ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) জেযাদ পিছন থেকে ইমাম হোসেনকে আঘাত করতে বিষাক্ত লৌহশর (লোহার তীর) ছুড়ে মেরেছিল।
(খ) নিজের প্রিয় মনিব ও পরম বীর ইমাম হোসেনকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, বিষাক্ত তীরের আঘাতে মারাত্মক আহত এবং ঘাতক সৈন্য দ্বারা ঘেরাও হয়ে অন্তিম মুহূর্তে উপস্থিত হতে দেখে অশ্বটি ব্যথিত হয়ে অশ্রুপাত করছিল।
ইমাম হোসেন যখন কারবালার মাঠে সকল অস্ত্র, বর্ম ও শিরস্ত্রাণ ত্যাগ করে ধ্যানে মগ্ন হন, তখন এজিদের সৈন্যরা সুযোগ বুঝে তাঁকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে ফেলে। নিঃসঙ্গ ও মারাত্মক আহত অবস্থায় প্রভুর এই নির্দ্বিধায় মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়ার করুণ দৃশ্যটি অবোলা প্রাণী হয়েও অশ্বটি বুঝতে পেরেছিল। প্রভুর এই করুণ ও নিশ্চিত পরিণতি দেখেই তার দু’চোখ বেয়ে পানি ঝরছিল।
(গ) উদ্দীপকের রাজা বিক্রমাদিত্যের “পরাজয় মেনে নেওয়ার চেয়ে বীরের মতো আত্মোৎসর্গ করা অনেক বেশি সম্মানের” উক্তিটি ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের ‘আত্মমর্যাদাবোধ, বীরত্ব এবং অন্যায়ের কাছে নতিস্বীকার না করার’ অনন্য দৃষ্টিভঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলে।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে দেখা যায়, কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেন যখন বিষাক্ত তীরের আঘাতে মারাত্মকভাবে জখম ও রক্তাক্ত হন, তখন তাঁর কাছে আত্মরক্ষার আর কোনো অস্ত্র ছিল না। চারিদিকে হাজার হাজার ঘাতক শত্রু তাঁকে ঘিরে ধরেছিল। এজিদের আনুগত্য স্বীকার করে নিলে হয়তো তিনি প্রাণ রক্ষা করতে পারতেন, কিন্তু তিনি কাপুরুষের মতো জঘন্য পরাজয় বা আত্মসমর্পণ মেনে নেননি। তিনি নিঃশ্বেষ হয়েও বীরত্ব বজায় রেখেছেন এবং আত্মমর্যাদার সাথে মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করেছেন।
উদ্দীপকের রাজা বিক্রমাদিত্যও ঠিক একইভাবে শত্রুর বেষ্টনীতে তরবারিভাঙা ও আহত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি জীবন রক্ষার চেয়ে আত্মমর্যাদা ও বীরত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
অতএব, অন্যায়ের কাছে পরাজিত হওয়ার চেয়ে আত্মসম্মান রক্ষা করে আত্মোৎসর্গ করার এই অবিচল মানসিকতাই উভয় চরিত্রের মধ্যে প্রতিফলিত মূল দৃষ্টিভঙ্গি।
(ঘ) “আত্মসমর্পণের চেয়ে বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগই ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকে”— উদ্দীপক এবং ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্প উভয় সাহিত্যের মূল ভাব বিশ্লেষণ করলে এই উক্তিটির গভীর সত্যতা প্রমাণিত হয়।
ইতিহাসে যারা কেবল প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে অন্যায়ের কাছে নতিস্বীকার বা আত্মসমর্পণ করে, তারা সাময়িকভাবে বেঁচে থাকলেও সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায় অথবা ধিক্কৃত হয়। কিন্তু যারা বীরত্বের সাথে মৃত্যুকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বরণ করে নেয়, তারা শারীরিক মৃত্যুর মাধ্যমেও অমরত্ব লাভ করে। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন যদি এজিদের অন্যায় শর্ত মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণ করতেন, তবে কারবালার মাঠে হয়তো তাঁর মৃত্যু হতো না। কিন্তু তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে শহীদ হওয়াকেই শ্রেষ্ঠ মনে করেছিলেন। তাঁর এই আত্মত্যাগই আজ শত শত বছর ধরে বিশ্বজুড়ে সত্য ও ইনসাফের প্রতীক হিসেবে জগতবাসীকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
উদ্দীপকের রাজা বিক্রমাদিত্যও একইভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, বেঁচে থাকাটাই শেষ কথা নয়, কীভাবে বেঁচে থাকা হচ্ছে সেটাই আসল। শত শত শত্রুর মাঝেও তিনি আত্মসমর্পণ না করে বীরের মতো জীবন বিসর্জন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিক্রমাদিত্যের এই বীরত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই তাঁকে ইতিহাসের পাতায় একজন অনন্য বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উপসংহারে বলা যায়, বাহ্যিক দৃষ্টিতে এজিদ জয়ী হয়েছিল আর ইমাম হোসেন নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু নৈতিকতার বিচারে এজিদ ইতিহাসে ঘৃণিত পাত্র আর ইমাম হোসেন তাঁর আত্মত্যাগের কারণে অমর ও চিরভাস্বর। সুতরাং, উক্তিটি সম্পূর্ণ সত্য ও সর্বজনগ্রাহ্য।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ১৪
উদ্দীপক:
বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ ডা. রহমান একটি মরণব্যাধির প্রতিষেধক আবিষ্কার করেন। এক লোভী ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বিপুল অর্থের বিনিময়ে তাঁর কাছ থেকে এই ফর্মুলা কিনে একচেটিয়া ব্যবসা করতে চায়। ডা. রহমান তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন এবং সাধারণ মানুষের জন্য তা বিনামূল্যে উন্মুক্ত করে দেন। ফলে কোম্পানি তাঁর ক্ষতি করলেও সাধারণ মানুষ তাঁর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকে।
- (ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে কারবালা ট্র্যাজেডির মূল কারণ কী ছিল?
- (খ) সীমারের ছোড়া বিষাক্ত তীরটি ইমাম হোসেনের শরীরে কোথায় লেগেছিল?
- (গ) উদ্দীপকের ডা. রহমানের স্বার্থত্যাগের দিকটি ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের কোন মহানুভবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
- (ঘ) “ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জনকল্যাণ ও সত্য প্রতিষ্ঠা যাদের লক্ষ্য, তারা যুগে যুগে স্মরণীয়”— উদ্দীপক ও গল্পের বিচারে উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।
১৪ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) এজিদের অবৈধ ক্ষমতা দখল ও ইসলামি মূল্যবোধ লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ইমাম হোসেনের সত্য ও ধর্মীয় নীতি রক্ষায় অনড় অবস্থানই ছিল কারবালা ট্র্যাজেডির মূল কারণ।
(খ) সীমারের ছোড়া বিষাক্ত তীরটি ইমাম হোসেনের পিঠে বিদ্ধ হয়ে গ্রীবাদেশের (ঘাড়ের) একপাশ ভেদ করে বের হয়ে গিয়েছিল।
ঘাতক সীমার যখন ধনুকে বিষাক্ত লৌহশর যুক্ত করে নিশানা করে ছুড়ে মারে, তখন তা সরাসরি ইমাম হোসেনের পিঠ ভেদ করে ঘাড়ের পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। তীরের বিষের তীব্রতায় এবং রক্তক্ষরণের দরুন হোসেনের সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসে এবং তিনি ভূ-তলে ঢলে পড়েন।
(গ) উদ্দীপকের ডা. রহমানের বিপুল অর্থ ও ব্যক্তিগত লাভের প্রলোভন ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করার দিকটি ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের ‘ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে মানবজাতি ও ইসলামের সত্য প্রতিষ্ঠা করার’ মহানুভবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন কেবল নিজের বা নিজের পরিবারের সুবিধার কথা চিন্তা করেননি। তিনি জানতেন এজিদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে তিনি বিপুল সম্পত্তি, সম্মান ও ক্ষমতা পেতেন। কিন্তু এজিদের অন্যায্য শাসন মেনে নিলে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও সত্যের অপপূরণীয় ক্ষতি হতো। তাই তিনি ব্যক্তিগত সকল স্বার্থ ও প্রাণের তোয়াক্কা না করে সত্যের ধারাকে প্রবাহমান রাখতে নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দিয়েছেন।
উদ্দীপকের ডা. রহমানও একজন বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ হয়েও লভ্যাংশের প্রলোভনে পা দেননি। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির বিপুল অর্থের বিনিময়ে ফর্মুলা বিক্রির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে তিনি তা সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় বিনামূল্যে উন্মুক্ত করেছেন।
অতএব, আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা না করে বৃহত্তর সত্য ও মহৎ উদ্দেশ্যে নিজের লাভ বা সুবিধা বিসর্জন দেওয়ার মহানুভবতাই উভয় চরিত্রের মধ্যে বিদ্যমান মূল মেলবন্ধন।
(ঘ) “ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জনকল্যাণ ও সত্য প্রতিষ্ঠা যাদের লক্ষ্য, তারা যুগে যুগে স্মরণীয়”— উক্তিটি উদ্দীপকের ডা. রহমান এবং ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের জীবনের মূল দর্শনকে ফুটিয়ে তোলে।
যাঁরা কেবল নিজের খাওয়া-পরা, ক্ষমতা বা অর্থ-সম্পদের কথা ভাবেন, তাঁদের প্রভাব তাঁদের মৃত্যুর সাথেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাস তাঁদেরই শ্রদ্ধার সাথে মনে রাখে, যাঁরা নিজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে সমাজ, দেশ বা সত্যের কল্যাণে নিবেদিত হন। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন যদি নিজের স্বার্থ দেখতেন, তবে তিনি কারবালার মাঠে রক্ত দিতেন না। কিন্তু তিনি সত্যের পতাকা উঁচুতে রাখতে এবং ইসলামি বিচারব্যবস্থাকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। তাই শত শত বছর পার হয়ে গেলেও তিনি পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
একইভাবে, উদ্দীপকের ডা. রহমান লোভী কোম্পানির বিপুল অর্থের লোভ সামলে জনকল্যাণকে বেছে নিয়েছেন। কোম্পানি হয়তো তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু কোটি কোটি সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করে তিনি চিরস্মরণীয় আসন লাভ করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, সত্য প্রতিষ্ঠা ও পরোপকারের মধ্যে যে অমরত্ব রয়েছে, তা কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। উদ্দীপক ও গল্পের সারমর্ম এই সত্যটিকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ১৫
উদ্দীপক:
সোমেন একজন প্রবীণ শিক্ষক। স্কুলের গভর্নিং বডির প্রভাবশালী প্রধান যখন স্কুলের ফান্ড তছরুপ করতে চেয়েছিলেন, সোমেন একাই তার প্রতিবাদ করেন। প্রধান শিক্ষক তাঁকে চাকরিচ্যুতির ভয় দেখান এবং মিথ্যা মামলায় ফাসান। তা সত্ত্বেও সোমেন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলেন, “আমার চাকরি যেতে পারে, কিন্তু অন্যায়কে মুখ বুজে সহ্য করব না।”
- (ক) ইমাম হোসেনের মাতামহের নাম কী ছিল?
- (খ) “জগৎ দেখুক, আমি কী অবস্থায় চলিলাম!”— উক্তিটির অর্থ ব্যাখ্যা করো।
- (গ) উদ্দীপকের সোমেন শিক্ষকের প্রতিবাদী মনোভাব ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের প্রতিবাদের সাথে কীভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ?
- (ঘ) “একাকী হলেও সত্যের পথিকের সাহস পরাভব মানে না”— উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের আলোকে উক্তিটির যথার্থতা নিরূপণ করো।
১৫ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) ইমাম হোসেনের মাতামহের নাম ছিল বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)।
(খ) শত্রু দ্বারা সম্পূর্ণ সহায়হীন, অস্ত্রহীন, মারাত্মকভাবে রক্তাক্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় দুনিয়া ত্যাগ করার মাধ্যমে নিজের মহতী আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত জগতবাসীকে দেখানোর অভিপ্রায় প্রকাশে উক্তিটি ব্যবহৃত হয়েছে।
কারবালার মরুপ্রান্তরে এজিদ বাহিনীর নির্মম তীরের আঘাত ও অবরোধের মুখে পড়ে ইমাম হোসেন যখন তাঁর সমস্ত সামরিক সরঞ্জাম ও বর্ম খুলে ফেলে ধ্যানে মগ্ন হন, তখন তিনি বুঝতে পারেন তাঁর পার্থিব জীবনের অন্তিম মুহূর্ত উপস্থিত। তিনি সত্য ও ইনসাফ রক্ষার জন্য নিঃস্ব হয়ে নিজের প্রাণ সঁপে দিয়েছিলেন। এই নিরঙ্কুশ ও নিস্বার্থ আত্মত্যাগের মহিমা সমগ্র বিশ্ব যেন প্রত্যক্ষ করে—এই অনুভূতি থেকেই তিনি উক্ত কথাটি বলেছিলেন।
(গ) উদ্দীপকের প্রবীণ শিক্ষক সোমেনের একা দাঁড়িয়ে ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মানসিকতা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের অগণিত শত্রুসেনার সামনে একাকী সত্যের পক্ষে অনড় থাকার দিকটির সাথে দারুণভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।
মীর মশাররফ হোসেনের ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে দেখা যায়, কারবালার মাঠে স্বজনদের হারিয়ে ইমাম হোসেন একসময় প্রায় একাকী হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর সামনে ছিল এজিদের হাজার হাজার সশস্ত্র সৈন্য। কিন্তু শত্রুর বিপুল সৈন্যসংখ্যা বা চরম বিপর্যয় দেখেও তিনি ভয় পাননি কিংবা প্রতিবাদের পথ থেকে সরে দাঁড়াননি। একাকী হওয়ার পরেও তিনি এজিদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছিলেন।
উদ্দীপকের সোমেন শিক্ষকও স্কুলের দুর্নীতিবাজ ও প্রভাবশালী প্রধানের বিরুদ্ধে একাই লড়াই শুরু করেছেন। চাকরি হারানো বা মিথ্যা মামলার হুমকিও তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠকে থামিয়ে দিতে পারেনি।
সুতরাং, সংখ্যাগরিষ্ঠ বা শক্তিশালী অন্যায়ের বিরুদ্ধে একা হয়ে পড়লেও নির্ভীকভাবে সত্যের পক্ষে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার এই বৈশিষ্ট্যই গল্প ও উদ্দীপকের মূল সাদৃশ্য।
(ঘ) “একাকী হলেও সত্যের পথিকের সাহস পরাভব মানে না”— উক্তিটি উদ্দীপকের সোমেন শিক্ষক এবং ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের চরিত্রের ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে সত্য।
সত্যের আসল শক্তি সংখ্যায় থাকে না, থাকে আত্মিক ও নৈতিক বলের মধ্যে। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন যখন মারাত্মকভাবে আহত হয়ে একা ময়দানে অবস্থান করছিলেন, তখন সামাজিকভাবে বা সামরিকভাবে তিনি ছিলেন চরম বিপন্ন। কিন্তু আত্মিক সাহসের দিক থেকে তিনি এজিদের পুরো বাহিনীর চেয়েও পরাক্রমশালী ছিলেন। শত্রুরা তাঁকে বিষাক্ত তীরে জর্জরিত করতে পেরেছিল, তাঁর বক্ষস্থলে খঞ্জর চালাতে পেরেছিল, কিন্তু তাঁর নৈতিক সাহস ও প্রতিবাদের আত্মাকে পরাজিত করতে পারেনি।
উদ্দীপকের শিক্ষক সোমেনের ক্ষেত্রেও একই সত্যি পরিলক্ষিত হয়। স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের প্রধানের ক্ষমতা ও ষড়যন্ত্রের কাছে সোমেন একাকী ছিলেন। কিন্তু তাঁর নৈতিক ভিত্তি শক্ত থাকায় তিনি চাকরি হারানোর ভয়কেও জয় করেছিলেন। তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ— “অন্যায়কে মুখ বুজে সহ্য করব না”— প্রমাণ করে যে সত্যের পথিকের সাহসকে কোনো ভয় বা পরিণতি দিয়ে পরাস্ত করা যায় না।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, অত্যাচারীর অস্ত্র বা ক্ষমতা সাময়িকভাবে কাউকে একাকী বা কোণঠাসা করতে পারে, কিন্তু সত্যপথিকের ভেতরের আত্মবিশ্বাস ও সাহসের শিখাকে কখনো নিভিয়ে দিতে পারে না। তাই উক্তিটি সম্পূর্ণ যথার্থ।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ১৬
উদ্দীপক:
এক পথশিশু কুড়িয়ে পাওয়া টাকার একটি মানিব্যাগ নিয়ে থানায় জমা দিল। থানার পুলিশ তাকে কিছু টাকা পুরস্কার দিতে চাইলে শিশুটি বলল, “পরের টাকা ফেরত দেওয়া আমার দায়িত্ব, এর জন্য পুরস্কার নিলে কাজের ভালো উদ্দেশ্যটাই নষ্ট হয়ে যাবে।”
- (ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে সীমার কার বুকের ওপর চেপে বসেছিল?
- (খ) “অস্ত্রই বল পরীক্ষার প্রধান উপকরণ!”— উক্তিটি কার এবং কেন করা হয়েছিল?
- (গ) উদ্দীপকের পথশিশুর সততার মানসিকতা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের কোন বৈশিষ্ট্যের কথা স্মরণ করায়?
- (ঘ) “কোনো প্রতিদানের আশায় নয়, বরং দায়িত্ব ও নীতির তাগিদেই মহৎ কাজ সম্পাদিত হয়”— উদ্দীপক ও গল্পের আলোকে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।
১৬ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে সীমার ইমাম হোসেনের বুকের ওপর চেপে বসেছিল।
(খ) উক্ত উক্তিটি এজিদ পক্ষের অন্যতম বীর যোদ্ধা আব্দুর রহমানের, যা তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে বাহ্যিক বা মুখের কথার চেয়ে অস্ত্র চালনার মাধ্যমে শারীরিক বল পরীক্ষা করার প্রেক্ষাপটে করেছিলেন।
ইমাম হোসেনের সাথে দ্বৈরথ যুদ্ধে আব্দুর রহমান হোসেনকে আগে আক্রমণ করতে প্রস্তাব দেন। কিন্তু হোসেন তাঁর বংশগত নীতি অনুযায়ী শত্রুকে আগে আঘাত না করার কথা জানান। তখন আব্দুর রহমান বলেন যে, কেবল কথার লড়াইয়ে বীরত্ব বা বল পরিমাপ করা সম্ভব নয়, অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমেই কার কতটুকু শক্তি তা সঠিকভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব।
(গ) উদ্দীপকের পথশিশুর কোনো পুরস্কার বা লভ্যাংশের আশা না করে কেবল দায়িত্ব ও নৈতিকতার টানে কাজ করার মানসিকতা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের ‘স্বার্থহীনভাবে এবং কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে ঈমান ও সততার দায়িত্ব পালন করার’ বৈশিষ্ট্যের কথা স্মরণ করায়।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন কারবালার মাঠে যে মহান আত্মত্যাগ করেছিলেন, তার পেছনে তাঁর কোনো রাজকীয় ভোগ-বিলাস, ক্ষমতা বা দুনিয়াবি প্রতিদানের আশা ছিল না। মহানবী (সা.)-এর পবিত্র দৌহিত্র হিসেবে সত্য ও ইনসাফকে টিকিয়ে রাখা তিনি নিজের পরম দায়িত্ব মনে করেছিলেন। সেই কর্তব্যের তাগিদেই তিনি নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন।
উদ্দীপকের পথশিশুটির মধ্যেও এই নিঃস্বার্থ চেতনা দেখা যায়। কুড়িয়ে পাওয়া মানিব্যাগ ফেরত দেওয়াকে সে তার সাধারণ মানবিক দায়িত্ব মনে করেছে এবং পুরস্কার হিসেবে টাকা নিতে অস্বীকার করেছে, যাতে তার কাজের আসল পবিত্রতা নষ্ট না হয়।
অতএব, লাভ-ক্ষতি বা পুরস্কারের হিসাব না করে কেবল নীতির তাগিদে কাজ করার এই বিরল গুণটি উভয় চরিত্রকেই মহিমান্বিত করেছে।
(ঘ) “কোনো প্রতিদানের আশায় নয়, বরং দায়িত্ব ও নীতির তাগিদেই মহৎ কাজ সম্পাদিত হয়”— উক্তিটি উদ্দীপক এবং ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের বিচারে অত্যন্ত গভীর ও তথ্যনিষ্ঠ।
মহৎ কাজের মূল সৌন্দর্য নিহিত থাকে তার নিঃস্বার্থতার মধ্যে। যদি কোনো ভালো কাজের পেছনে বিনিময় পাওয়ার ইচ্ছা থাকে, তবে তা আর মহৎ থাকে না, ব্যবসায় পরিণত হয়। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন কারবালার মাঠে কোনো পার্থিব পুরস্কারের আশা করেননি। এজিদের সাথে সন্ধি করলে তিনি অগাধ ধন-সম্পদ ও নিরাপত্তা পেতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি জীবনের বিনিময়ে সত্য রক্ষাকে নিজের নৈতিক দায়িত্ব মনে করেছিলেন। চরম অন্তিম মুহূর্তেও তিনি ঘাতক সীমারকে স্বর্গে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন—যা কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা ছাড়া কেবল অসীম উদারতা ও দ্বীনের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে উদ্ভূত।
উদ্দীপকের পথশিশুর আচরণেও আমরা একই সত্যের দর্শন পাই। একজন অতি দরিদ্র পথশিশু হওয়া সত্ত্বেও কুড়িয়ে পাওয়া অর্থ ফেরত দিয়ে সে কোনো পুরস্কার গ্রহণ করেনি। সে স্পষ্ট বুঝেছে যে সৎ থাকাটা একটা দায়িত্ব, ব্যবসার মাধ্যম নয়।
পরিশেষে বলা যায়, জগতে যারা কালজয়ী মহৎ কাজ করে গেছেন, তাঁরা সবাই লাভ-ক্ষতি বা পুরস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল নীতি ও দায়িত্বের তাড়নায় নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন। উদ্দীপক ও গল্প উভয়ই এই মহতী সত্যের সাক্ষ্য দেয়।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ১৭
উদ্দীপক:
একটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে দাবানল ছড়িয়ে পড়লে ফায়ার সার্ভিসের কর্মী রতন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি হরিণ ও তার ছানাকে উদ্ধার করেন। ফায়ার সুরক্ষার পোশাক পুড়ে রতনের শরীর মারাত্মকভাবে দগ্ধ হলেও তিনি প্রাণী দুটিকে বাঁচাতে পেরে হাসিমুখে যন্ত্রণাকে মেনে নেন।
- (ক) ফোরাত নদীর কাছে গিয়ে ইমাম হোসেনের মনের ইচ্ছা কী ছিল?
- (খ) ইমাম হোসেন নদী থেকে তোলা পানি না খেয়ে ফেলে দিলেন কেন?
- (গ) উদ্দীপকের রতনের আত্মত্যাগের সাথে ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগের বৈসাদৃশ্য ও সাদৃশ্য আলোচনা করো।
- (ঘ) “নিজের কষ্টকে ভুলে অন্যের জন্য নিজেকে সঁপে দেওয়া মহৎ আত্মত্যাগেরই রূপ”— উদ্দীপক ও গল্পের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করো।
১৭ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) ফোরাত নদীর কাছে গিয়ে ইমাম হোসেনের প্রথম ও প্রধান ইচ্ছা ছিল নিজের ক্লান্ত ও অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত অশ্বকে (ঘোড়াকে) পানি পান করানো।
(খ) তৃষ্ণার্ত দুগ্ধপোষ্য শিশু এবং অনাহারে শহীদ হওয়া স্বজনদের কষ্টের করুণ চিত্র মনে পড়ায় গভীর সহমর্মিতা ও অনুশোচনা থেকে ইমাম হোসেন নদী থেকে তোলা পানি না খেয়ে ফেলে দেন।
ফোরাত নদীর পাড়ে গিয়ে অঞ্জলি ভরে পানি মুখের কাছে নেওয়ার পর মুহূর্তেই ইমাম হোসেনের মনে পড়ে যায় পানির অভাবে ছটফট করে মারা যাওয়া কোলের শিশু ও সঙ্গীদের কথা। যাদের তিনি এক ফোঁটা পানি দিতে পারেননি, নিজে পানি পান করে তাদের প্রতি অবিচার করতে চাননি বলেই তিনি পানি নদীতে ফেলে দেন এবং জীবনে আর পানি না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
(গ) উদ্দীপকের ফায়ার সার্ভিস কর্মী রতনের ত্যাগের সাথে ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের ত্যাগের প্রধান সাদৃশ্য হলো— ‘নিজের চরম শারীরিক যন্ত্রণাকে তুচ্ছ করে অন্যের জীবন বা সহমর্মিতাকে প্রাধান্য দেওয়া’।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন নিজে ৩ দিন ধরে অন্ন-জলহীন থেকেও শহীদ স্বজনদের স্মরণে ফোরাতের পানি পান করেননি এবং সত্যের জন্য নিজের শরীরকে বিষাক্ত তীরে ক্ষতবিক্ষত হতে দিয়েছেন। উদ্দীপকের রতনও আগুনে শরীর পুড়িয়ে হরিণ ও তার ছানাকে বাঁচিয়ে নিজের যন্ত্রণাকে হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন।
তবে তাঁদের মধ্যে মূল বৈসাদৃশ্য হলো ত্যাগের প্রেক্ষাপটে। রতনের আত্মত্যাগ ছিল মূলত অবোলা বন্যপ্রাণী রক্ষায় তাঁর পেশাগত ও মানবিক উদ্ধারকাজের অংশ। অন্যদিকে, ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগ ছিল স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইসলামি আদর্শ, বিচারব্যবস্থা ও মানবজাতির নৈতিক আত্মমর্যাদা রক্ষার এক কালজয়ী ঐতিহাসিক মহা-আদর্শিক আত্মত্যাগ।
(ঘ) “নিজের কষ্টকে ভুলে অন্যের জন্য নিজেকে সঁপে দেওয়া মহৎ আত্মত্যাগেরই রূপ”— উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের সারমর্ম হিসেবে মন্তব্যটি অত্যন্ত যথার্থ।
প্রকৃত আত্মত্যাগ তখনই ঘটে, যখন মানুষ নিজের আরাম, নিরাপত্তা বা জীবনের মায়া ভুলে গিয়ে অন্য কারও জন্য বা কোনো মহৎ দর্শনের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের পুরো জীবনটিই ছিল ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। তিনি তৃষ্ণায় ছটফট করছিলেন, তীরের আঘাতে তাঁর ঘাড় ভেদ হয়ে রক্ত ঝরছিল, বিষের জ্বালায় শরীর অবশ হয়ে আসছিল। কিন্তু তিনি নিজের এই অবর্ণনীয় কষ্টের কথা চিন্তা না করে ধ্যানে মগ্ন ছিলেন এবং স্বজনদের স্মরণে নিজেকে স্রষ্টার বিধানে সঁপে দিয়েছিলেন। নিজের কষ্ট তাঁর কাছে মহৎ আদর্শের সামনে তুচ্ছ মনে হয়েছিল।
উদ্দীপকের রতনের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, সে আগুনে পোড়ার বীভৎস কষ্ট ও শারীরিক ক্ষত সহ্য করেও হরিণ ছানাটিকে বাঁচাতে পেরে পরম শান্তি পেয়েছে। সেখানে তার নিজের কষ্ট ঢাকা পড়ে গিয়েছিল অন্যের জীবন বাঁচানোর আনন্দের নিচে।
অতএব, আত্মকেন্দ্রিকতা ত্যাগ করে অন্যের কষ্ট মোচনে বা কোনো পবিত্র উদ্দেশ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ মহত্ত্ব ফুটে ওঠে, যা উদ্দীপক ও গল্প উভয় থেকেই প্রতিভাত হয়।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ১৮
উদ্দীপক:
এক অত্যাচারী রাজা ঘোষণা দিলেন, “যে আমার ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা করবে, তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে।” দেশের সবাই ভয়ে চুপ হয়ে গেল, কিন্তু রাজ্যসভার এক তরুণ কবি দরবারে দাঁড়িয়ে রাজার ভুল নীতি নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করলেন। কবি বললেন, “শিরচ্ছেদ হতে পারে, কিন্তু সত্য উচ্চারণ থামবে না।”
- (ক) ইমাম হোসেনের গলায় খঞ্জর না কাটার অলৌকিক কারণ কী ছিল?
- (খ) সীমারের বুকের বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল এবং তা কী প্রমাণ করে?
- (গ) উদ্দীপকের তরুণ কবির মানসিকতা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের কোন বৈশিষ্ট্যের সাথে অভিন্ন?
- (ঘ) “অত্যাচারীর তলোয়ার সত্যের কণ্ঠরোধ করতে পারে না”— উদ্দীপক ও গল্পের আলোকে উক্তিটি মূল্যায়ন করো।
১৮ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) শৈশবে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) অত্যন্ত স্নেহভরে ইমাম হোসেনের গলায় বারবার চুম্বন করেছিলেন বলে সেখানে ঘাতক সীমারের খঞ্জর কাটছিল না।
(খ) ঘাতক সীমারের বুকের ছাতি বা বক্ষস্থল ছিল পশমহীন (লোমশূন্য), যা মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যৎবাণীর অলৌকিক সত্যতা প্রমাণ করে।
ইমাম হোসেনের মাতামহ হযরত মোহাম্মদ (সা.) আগেই বলে গিয়েছিলেন যে, তাঁর প্রিয় দৌহিত্র হোসেনের হত্যাকারী হবে এমন এক পাপাচারী লোক যার বুকে কোনো লোম থাকবে না। সীমার যখন হোসেনের বুকের ওপর বসে খঞ্জর চালাতে উদ্যত হয়, তখন হোসেনের নির্দেশে জামা সরালে দেখা যায় যে সীমারের বুকে বাস্তবিকই কোনো পশম নেই। এটি প্রমান করে যে মহানবী (সা.)-এর ঘোষণা শতভাগ সত্য ছিল।
(গ) উদ্দীপকের তরুণ কবির জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলার মানসিকতা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীকভাবে সত্য প্রকাশ ও মৃত্যুভয়হীন বীরত্ব’ বৈশিষ্ট্যের সাথে অভিন্ন।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে এজিদের অন্যায্য ও অনৈসলামিক দাবির সামনে ইমাম হোসেন কখনো মাথা নত করেননি। এজিদের বিশাল সৈন্যবাহিনী, অস্ত্র বা নিশ্চিত মৃত্যুর ভয় তাঁকে সত্য বলা ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি জানতেন এজিদের বিরোধিতা করার পরিণাম কী হতে পারে, তবুও তিনি সত্য থেকে বিচ্যুত হননি।
উদ্দীপকের তরুণ কবিও ঠিক একইভাবে অত্যাচারী রাজার ফাঁসির আদেশ ও শিরচ্ছেদের ভয়কে তোয়াক্কা না করে রাজদরবারে দাঁড়িয়েই রাজার ভুল নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা পাঠ করেছেন।
অতএব, শাসকের চোখরাঙানি বা মৃত্যুর ভয়কে পদদলিত করে সত্যের জয়গান গাওয়ার এই নির্ভীক সাহসই উভয় চরিত্রের অভিন্ন সংযোগসূত্র।
(ঘ) “অত্যাচারীর তলোয়ার সত্যের কণ্ঠরোধ করতে পারে না”— উক্তিটি উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গভীর সত্যকে উন্মোচিত করে।
দুনিয়ার অত্যাচারী শাসকেরা সবসময় মনে করে যে তরবারি, বন্দুক বা ফাঁসির দড়ি দিয়ে মানুষকে ভয় দেখিয়ে সত্যকে দাবিয়ে রাখা সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে শরীরকে হত্যা করা গেলেও সত্যের কণ্ঠকে স্তব্ধ করা যায় না। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে এজিদ তার হাজার হাজার সৈন্য ও ধারালো তরবারি দিয়ে কারবালার মাঠে ইমাম হোসেনকে সপরিবারে শহীদ করেছিল। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইমাম হোসেন যে প্রতিবাদী চেতনার জন্ম দিয়ে গেছেন, তাকে এজিদের তলোয়ার কাটাতে পারেনি। আজ এজিদ ঘৃণিত, আর ইমাম হোসেনের সত্যের কণ্ঠ বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে ধ্বনিত হচ্ছে।
উদ্দীপকের তরুণ কবির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রাজা হয়তো ফাঁসি দিয়ে কবির শারীরিক অস্তিত্ব বিলীন করতে পারেন, কিন্তু দরবারে উচ্চারিত তাঁর সত্য বার্তা ও কবিতার অনলস্পর্শকে রুদ্ধ করতে পারবেন না। সেই সত্য প্রজা থেকে প্রজান্তরে ছড়িয়ে পড়বে।
সারসংক্ষেপ বলা যায়, তলোয়ারের ধার ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্যের শক্তি চিরন্তন। অত্যাচারী শক্তি শরীরকে বিনাশ করতে পারলেও সত্যের বাক্য ও আদর্শকে অমরত্ব লাভ করা থেকে আটকাতে পারে না।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ১৯
উদ্দীপক:
একটি ভাস্কর্য প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ভাস্করকে এক ধনী ব্যক্তি এসে বললেন, “আমি তোমাকে ১০ গুণ টাকা দেব, তুমি এই ভাস্কর্যের নিচে আমার নামটি খোদাই করে দাও।” ভাস্কর নম্রভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, “টাকার বিনিময়ে অন্যের সৃষ্টিকে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া এক ধরনের নৈতিক হত্যা। আমি আমার শ্রমের সত্যতাকে বিক্রি করব না।”
- (ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গদ্যাংশটি মীর মশাররফ হোসেনের কোন উপন্যাসের অংশ?
- (খ) “অস্ত্রই বল পরীক্ষার প্রধান উপকরণ!”— উক্তিটির নিহিতার্থ কী?
- (গ) উদ্দীপকের ভাস্করের নৈতিক দৃঢ়তা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের কোন মূল ভাবের সাথে মিলে যায়?
- (ঘ) “প্রলোভনের কাছে নৈতিকতা বিক্রি না করাই আদর্শ মানুষের পরিচয়”— উদ্দীপক ও গল্পের বিচারে বিশ্লেষণ করো।
১৯ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গদ্যাংশটি মীর মশাররফ হোসেনের কালজয়ী মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘বিষাদ-সিন্ধু’-এর ‘মহররম পর্ব’ থেকে সংকলিত।
(খ) যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল মুখের কথা বা আস্ফালনে বীরত্ব প্রমাণ হয় না, বরং অস্ত্র ব্যবহারের দক্ষতা ও শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেই একজন যোদ্ধার প্রকৃত সামরিক বল পরীক্ষিত হয়—উক্তিটি দ্বারা এটাই বোঝানো হয়েছে।
এজিদ বাহিনীর সেনাপতি আব্দুর রহমান ইমাম হোসেনকে আগে আক্রমণ করতে প্রস্তাব দিলে হোসেন তাঁর পারিবারিক আদর্শ তুলে ধরে আগে আঘাত করতে অস্বীকৃতি জানান। তখন আব্দুর রহমান জানান যে কথা না বাড়িয়ে অস্ত্র চালনার মাধ্যমেই বোঝা যাবে যে অনাহারী হোসেনের শরীরে কতটুকু বল অবশিষ্ট রয়েছে।
(গ) উদ্দীপকের ভাস্করের বিপুল অর্থের প্রলোভন উপেক্ষা করে নিজের কাজের সত্যতা ও আত্মসম্মান রক্ষা করার বিষয়টির সাথে ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ‘প্রলোভন ও হুমকির মুখেও নিজের ঈমান ও নৈতিক আদর্শে অটল থাকা’ মূল ভাবের মিল পাওয়া যায়।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে এজিদের পক্ষ থেকে ইমাম হোসেনের কাছে সুযোগ ও প্রলোভন উভয়ই দেওয়া হয়েছিল। এজিদের বশ্যতা মেনে নিলে তিনি ক্ষমতা, রাজকীয় সুবিধা ও পরিবারের নিরাপত্তা পেতে পারতেন। কিন্তু অন্যায্য ও পাপাচারী এজিদকে মেনে নেওয়ার অর্থ হলো সত্য ও ধর্মের নৈতিকতাকে বিসর্জন দেওয়া। তাই হোসেন সকল প্রলোভন ধূলিসাৎ করে দিয়ে সত্যের পথে প্রাণ দিয়েছেন।
উদ্দীপকের ভাস্করও ১০ গুণ টাকার বিপুল লোভের সামনে নতিস্বীকার করেনি। টাকার বিনিময়ে নিজের শ্রমের সত্যতা ও শিল্পকে বিক্রি করতে সে অস্বীকার করেছে।
সুতরাং, জাগতিক লাভ বা লভ্যাংশের লোভ সামলে নীতি ও সত্যের ওপর অবিচল থাকার চেতনাটিই গল্প ও উদ্দীপকের সাধারণ মিল।
(ঘ) “প্রলোভনের কাছে নৈতিকতা বিক্রি না করাই আদর্শ মানুষের পরিচয়”— উদ্দীপক এবং ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্প বিচারে উক্তিটি আদর্শ চরিত্রের শ্রেষ্ঠ কষ্টিপাথর হিসেবে প্রমাণিত।
সমাজে সাধারণ মানুষের সাথে অনন্য বা আদর্শ মানুষের মূল পার্থক্য তৈরি হয় সংকটের মুখে তাঁদের নৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। সাধারণ মানুষ প্রায়শই প্রলোভনে পড়ে নিজের নীতি বিক্রি করে দেয়, কিন্তু আদর্শ মানুষ জীবন গেলেও নীতি ছাড়েন না। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন ছিলেন আদর্শ মানুষের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এজিদের ক্ষমতার প্রলোভন বা কারবালার মাঠে তাসের ঘরের মতো জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার ভয়—কোনোটিই তাঁর আদর্শকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি নিজেকে বিক্রি করেননি বলেই আজ যুগের পর যুগ নীতিমান মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন।
উদ্দীপকের ভাস্করটির ক্ষেত্রেও এই মানসিকতাই প্রতিভাত হয়। বিপুল ধন-সম্পদ অর্জন করার সহজ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে অসততার আশ্রয় নেয়নি। সে মনে করেছে মিথ্যাচার করে অর্জিত টাকা নিজের আত্মাকে হত্যা করার শামিল। তাই সে নিজের সৃষ্টি ও সততার ওপর বিশ্বাস রেখে নিজেকে প্রলোভনের কাছে বিক্রি করেনি।
পরিশেষে বলা যায়, ধন-সম্পদ বা ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু মানুষের নৈতিকতা ও আদর্শ অবিনশ্বর। যারা কোনো অবস্থাতেই প্রলোভনের কাছে নিজের বিবেক বা নীতি বিক্রি করেন না, তারাই ইতিহাসে প্রকৃত আদর্শ মানুষ হিসেবে অমর থাকেন।
কারবালা প্রান্তর সৃজনশীল প্রশ্ন – ২০
উদ্দীপক:
এক গভীর রাতে এক বৃদ্ধা একা ঘরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রতিবেশী এক যুবক কালবিলম্ব না করে তাকে পিঠে করে প্রায় পাঁচ মাইল হেঁটে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাক্তার বললেন, “আর ১০ মিনিট দেরি হলে বৃদ্ধাকে বাঁচানো যেত না।” যুবকটি নিজের ক্লান্তি বা কষ্টের কথা না ভেবে বৃদ্ধার জীবন বেঁচে যাওয়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
- (ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের শেষ মুহূর্তে বক্ষস্থলে কে চেপে বসেছিল?
- (খ) ইমাম হোসেন এজিদ সৈন্যদের কী বলে তিরস্কার করেছিলেন?
- (গ) উদ্দীপকের যুবকের আত্মত্যাগের অনুভূতি ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের কোন মানবিক গুণের সাথে তুলনীয়?
- (ঘ) “পরোপকার ও সহমর্মিতাই মানব চরিত্রের শ্রেষ্ঠ ভূষণ”— উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের আলোকে মন্তব্যটি মূল্যায়ন করো।
২০ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের শেষ মুহূর্তে তাঁর বক্ষস্থলে পাপাচারী ঘাতক সীমার চেপে বসেছিল।
(খ) এজিদের অর্থ ও ভূয়া প্রলোভনে পড়ে নিজেদের মূল্যবান জীবন অকাতরে বিসর্জন দেওয়া এবং এজিদের মতো এক ভীরু ও ষড়যন্ত্রকারী নেতার অন্ধ অনুগামী হওয়ার কারণে হোসেন এজিদ সৈন্যদের তিরস্কার করেছিলেন।
ইমাম হোসেন রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে এজিদ সেনাদলকে অনুযোগ করে বলেন যে, এজিদ নিজে নিরাপদ দূরত্বে লুকিয়ে থেকে সাধারণ সৈন্যদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। সামান্য অর্থ ও পদের লোভে পড়ে তারা এক অধার্মিক শাসকের জন্য নিজের দ্বীন ও জীবন ধ্বংস করছে। এই নির্বুদ্ধিতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের জন্যই হোসেন তাদের ভীরু ও অর্থলোভী পিশাচ বলে ধিক্কার দেন।
(গ) উদ্দীপকের যুবকের নিজের ক্লান্তি ও শারীরিক কষ্ট ভুলে এক বৃদ্ধাকে বাঁচাতে ছুটে যাওয়ার আকুলতা ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পের ইমাম হোসেনের ‘পরোপকার, সহানুভূতি ও প্রাণিকুলের প্রতি অসীম দয়া’ মানবিক গুণের সাথে দারুণভাবে তুলনীয়।
‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেন কেবল নিজের জীবনের চিন্তায় মগ্ন ছিলেন না। তিনি ফোরাত নদীর পাড়ে গিয়ে নিজের তীব্র তৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও প্রথমে তাঁর ক্লান্ত অশ্বটিকে পানি পান করাতে এগিয়ে যান। এছাড়া, শেষ মুহূর্তে ঘাতক সীমারের প্রতিও তিনি পরকালের স্বর্গের সুসংবাদ দেওয়ার মাধ্যমে নিজের মহানুভবতা দেখিয়েছেন। নিজের কষ্টের চেয়ে অন্যের বেদনা বুঝতে পারাই তাঁর প্রধান গুণ ছিল।
উদ্দীপকের যুবকটিও গভীর রাতে নিজের ঘুম, ক্লান্তি বা কষ্টকে পাত্তা না দিয়ে পাঁচ মাইল পথ বৃদ্ধাকে পিঠে বহন করে নিয়ে গেছে কেবল তাঁর জীবন রক্ষা করার আকুলতায়।
সুতরাং, অন্যের বিপদে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে এগিয়ে আসার এই গভীর মানবিক সহমর্মিতাই উভয় চরিত্রের মধ্যে তুলনীয় মূল বিষয়।
(ঘ) “পরোপকার ও সহমর্মিতাই মানব চরিত্রের শ্রেষ্ঠ ভূষণ”— উক্তিটি উদ্দীপক ও ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্প উভয় সাহিত্যের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক শিক্ষাকে সুদৃঢ় করে।
মানুষের বাহ্যিক রূপ, ক্ষমতা বা ধন-সম্পদ দিয়ে তার আসল চরিত্র বিচার করা যায় না; বিচার করা যায় তার ভেতরের পরোপকার ও সহমর্মিতার অনুভূতি দিয়ে। ‘কারবালা-প্রান্তর’ গল্পে ইমাম হোসেনের পুরো জীবনকাহিনিই এই মহান গুণের সাক্ষ্য দেয়। তিনি স্বজনদের হারিয়ে বিষাক্ত তীরের যন্ত্রণায় ছটফট করা অবস্থাতেও পরম করুণাময়ের ধ্যানে মগ্ন ছিলেন এবং অনুসারীদের সুরক্ষার চিন্তা করেছেন। এমনকি তিনি ঘাতক সীমারের চরম শত্রুতা ও নিষ্ঠুরতার বিপরীতে দাঁড়িয়েও কোনো ব্যক্তিক আক্রোশ না দেখিয়ে তার জন্য মহানুভবতার স্থান উন্মুক্ত রেখেছেন। এই অসীম সহমর্মিতাই ইমাম হোসেনকে পৃথিবীর ইতিহাসে মানব শ্রেষ্ঠের আসনে বসিয়েছে।
উদ্দীপকের যুবকের আচরণেও পরোপকারের এই শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য প্রকাশ পেয়েছে। বৃদ্ধার সাথে তার হয়তো কোনো রক্ত সম্পর্কিত নিকটাত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষের কষ্টের প্রতি সহমর্মী হয়ে সে পাঁচ মাইল পথ হেঁটে হাসপাতাল গিয়ে বৃদ্ধার প্রাণ বাঁচিয়েছে। বৃদ্ধার জীবন বেঁচে যাওয়ায় নিজের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে-মুছে তাঁর মনে যে স্বস্তি এসেছে, তা পরোপকারের আনন্দকেই প্রকাশ করে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সহমর্মিতা ও পরোপকার মানুষকে হিংসা, ঘৃণা ও স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত করে এক ঐশ্বরিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। উদ্দীপক ও গল্প উভয়ই প্রমাণ করে যে পরোপকারেই মানব জীবনের প্রকৃত রূপ ও সৌন্দর্য নিহিত।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ‘কারবালা প্রান্তর’ কেবল অতীতের একটি বিয়োগান্ত ঘটনার বিবরণ নয়; বরং তা যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রামের এক অমর উৎস । HSC বাংলা সাহিত্য পাঠের এই অংশটি শিক্ষার্থীদের কেবল একটি সাহিত্যকর্মের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় না, বরং তাদের ভেতরে সত্য, ত্যাগ ও নীতিবোধের চেতনা জাগ্রত করে । এই পাঠভিত্তিক সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন পরীক্ষার জন্য নিজেদের যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে পারবে, অন্যদিকে জীবনের প্রতিটি ধাপে অন্যায় ও অসত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচার অনুপ্রেরণা লাভ করবে ।

