আপনি কি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর খুঁজছেন? তবে আপনি সঠিক জায়গায় এসেছেন! পরীক্ষায় ‘খ’ অংশের প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দুই প্যারায় (জ্ঞান ও অনুধাবন) উপস্থাপন না করতে পারলে ভালো নম্বর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে । আপনাদের সুবিধার্থে আমরা এক ছাদের নিচে নিয়ে এসেছি “বাঙালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর”-এর একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড । গুরুত্বপূর্ণ লাইন ও মূল বক্তব্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রশ্ন-উত্তরগুলো পড়লে অধ্যায়টির পুরো নির্যাস আপনার হাতের মুঠোয় চলে আসবে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি হবে ১০০% পূর্ণাঙ্গ ।
বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন অনুধাবন
১. “যশঃ কদাপি রচনার উদ্দেশ্য হইবে না”— কথাটি দ্বারা বঙ্কিমচন্দ্র কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, খ্যাতির পেছনে ছুটলে সাহিত্যের আসল গুণগত মান ও স্বকীয়তা নষ্ট হয়ে যায়। যশ বা সুনামের লোভে লিখতে গেলে লেখক নিজের সত্য অবস্থান থেকে সরে এসে পাঠকদের সাময়িক করতালি কুড়াতে ব্যস্ত থাকেন। ফলে রচনার গভীরতা থাকে না এবং তা দীর্ঘস্থায়ী রূপ পায় না। তাই তিনি যশের উদ্দেশ্যে লিখতে নিষেধ করেছেন।
২. “টাকার জন্য লিখিবেন না”— কেন এই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে?
উত্তর: উপার্জনের মূল লক্ষ্য নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করলে সাহিত্যের বাণিজ্যিকীকরণ ঘটে, যা রচনার মান নামিয়ে দেয়। বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, অর্থের লোভে লিখতে গেলে পাঠকদের নিচু রুচির কাছে নতিস্বীকার করতে হয়, যাকে তিনি ‘লোকরঞ্জন প্রবৃত্তি’ বলেছেন। এতে অসত্য ও চটকদার কথা লেখালেখিতে জায়গা পায় এবং সাহিত্যের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
৩. বঙ্কিমচন্দ্র ইউরোপের সাথে বাংলার সাহিত্যিক পরিস্থিতির তুলনা করেছেন কেন?
উত্তর: ইউরোপে পাঠকসমাজ সচেতন ও উন্নত হওয়ায় সেখানে টাকার জন্য লিখেও সাহিত্যিক মান ধরে রাখা সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে তখন উন্নত পাঠকসমাজ গড়ে ওঠেনি। ফলে কেবল অর্থের লোভে লিখতে গেলে সর্বসাধারণের নিচু রুচিকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে রচনার মান নেমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই পার্থক্য বোঝাতেই লেখক ইউরোপের প্রসঙ্গ টেনেছেন।
৪. “কাব্য নাটক উপন্যাস ব্যতীত অন্য রচনা শেষ হইবামাত্র প্রকাশ করা ভালো নহে”— বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: প্রবন্ধ বা গবেষণামূলক লেখা শেষ করার সাথে সাথেই ছাপাখানায় না দিয়ে কিছুদিন ফেলে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। লেখা শেষ হওয়ার পরপরই প্রকাশ করলে নিজের ভুলত্রুটিগুলো আবেগ বা উত্তেজনার দরুন চোখে পড়ে না। কিছুদিন পর ঠান্ডা মাথায় সেই লেখা পুনরায় পাঠ করলে ভুলগুলো নিজের চোখেই স্পষ্ট হয় এবং পরিমার্জন করা সহজ হয়।
৫. “সত্য ও ধর্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য”— উক্তিটির অন্তর্নিহিত অর্থ কী?
উত্তর: সাহিত্য চর্চার একমাত্র ও প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত মানবকল্যাণ এবং সত্যের প্রতিষ্ঠা। অসত্য, মিথ্যার আশ্রয় বা নীতিবিরুদ্ধ কোনো বক্তব্য দিয়ে সাময়িক জনপ্রিয়তা পাওয়া গেলেও তা সার্থক সাহিত্য হতে পারে না। সাহিত্য তখনই মহৎ হয়ে ওঠে, যখন তা সমাজের সত্য ও সুন্দরকে ধারণ করে।
৬. “পরপীড়ন রচনার উদ্দেশ্য হইতে পারে না”— কথাটি কেন বলা হয়েছে?
উত্তর: সাহিত্য মানুষকে আনন্দ দেবে এবং সুপথে পরিচালিত করবে, কাউকে মানসিক বা ব্যক্তিগত আঘাত করবে না। কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা, বিদ্বেষ বা কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে লেখনী ধারণ করাকে বঙ্কিমচন্দ্র ‘মহাপাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সাহিত্যের মতো পবিত্র মাধ্যমে হিংসা বা পরপীড়নের স্থান থাকা উচিত নয় বলেই তিনি এটি বলেছেন।
৭. রচনায় বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা বঙ্কিমচন্দ্রের মতে অনুচিত কেন?
উত্তর: জোর করে রচনায় বিদ্যা বা পণ্ডিত্য জাহির করার চেষ্টা করলে রচনার প্রাঞ্জলতা নষ্ট হয় এবং তা পাঠকদের কাছে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। প্রকৃত বিদ্যা থাকলে তা লেখকের বক্তব্য ও ভাব প্রকাশের মাঝে আপনা থেকেই ফুটে ওঠে। তার জন্য কৃত্রিম আড়ম্বর বা অযাচিত বিদেশি উদ্ধৃতি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
৮. “যে ভাষা জানা নাই, সে ভাষা হইতে উদ্ধৃতি দেওয়া অনুচিত”— বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: না-জানা ভাষা থেকে অভিধান বা অন্য বইয়ের সাহায্য নিয়ে রচনায় শব্দ বা উদ্ধৃতি ব্যবহার করলে লেখকের ভণ্ডামি প্রকাশ পায়। এতে রচনায় ভুলের আশঙ্কা থাকে এবং রচনার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়। নিজের দক্ষতার বাইরের কোনো ভাষা জাহির না করাই সার্থক সাহিত্যের লক্ষণ।
৯. রচনায় অলংকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রাচীন বিধিটি কী?
উত্তর: অলংকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রাচীন পণ্ডিতদের বিধিটি হলো— রচনায় কোনো অলংকার (যেমন রূপক বা জটিল শব্দ) প্রয়োগের পর যদি মনে হয় তা খুব চমৎকার হয়েছে, তবে সেটি কেটে বাদ দেওয়াই শ্রেয়। কারণ, এর অর্থ দাঁড়িয়েছে যে অলংকারটি স্বতঃস্ফূর্ত না হয়ে কৃত্রিমভাবে বসানো হয়েছে।
১০. অলংকার ব্যবহারে বঙ্কিমচন্দ্রের নিজস্ব বিধিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্রের নিজস্ব বিধিটি হলো— অলংকারসংবলিত অংশটি বারবার বন্ধুদের পড়ে শোনানো উচিত। যদি সেই অংশটি বন্ধুদের সামনে পড়ে শোনাতে লজ্জা করে বা তা কৃত্রিম মনে হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে তা কেটে বাদ দেওয়া উচিত। এর মাধ্যমে রচনার প্রাঞ্জলতা রক্ষা পায়।
১১. “সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার সরলতা”— কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: কঠিন শব্দ বা জটিল গঠন দিয়ে বাক্যকে সাজানোর চেয়ে সহজ-সরল ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করাই রচনার আসল দক্ষতা। যে লেখক সোজা কথায় নিজের চিন্তা পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে পারেন, তিনিই প্রকৃত অর্থেই শ্রেষ্ঠ। তাই ভাষার সাবলীলতা ও সহজবোধ্যতাকেই শ্রেষ্ঠ অলংকার বলা হয়েছে।
১২. “অনুকরণ করিও না”— বঙ্কিমচন্দ্র কেন এই উপদেশ দিয়েছেন?
উত্তর: অন্য লেখকের অন্ধ অনুকরণ করলে নিজের স্বকীয়তা ও মৌলিক চিন্তাশক্তি ধ্বংস হয়ে যায়। তাছাড়া অন্যকে নকল করতে গেলে তাঁর গুণগুলো লাভ করা যায় না, বরং শৈলীর বাহ্যিক দোষ ও দুর্বলতাগুলোই নিজের লেখায় চলে আসে। তাই সাহিত্যকে সার্থক করতে অনুকরণ বর্জন করা অপরিহার্য।
১৩. “যে কথার প্রমাণ দিতে পারিবে না, তা লিখিও না”— বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: রচনার বস্তুনিষ্ঠতা ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার প্রমাণের সত্যতার ওপর। লেখক যদি অপ্রমাণিত বা ভিত্তিহীন তথ্য রচনায় উপস্থাপন করেন, তবে পাঠকেরা ভুল বার্তা পায় এবং লেখকের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। তাই সব সময় সত্য ও প্রমাণসাধ্য বিষয়ই রচনায় তুলে ধরা উচিত।
১৪. বঙ্কিমচন্দ্র কেন সাময়িক সাহিত্যকে লেখকের পক্ষে অবনতিকর বলেছেন?
উত্তর: সাময়িক সাহিত্য (যেমন সংবাদপত্র বা তৎকালীন সাময়িক পত্রিকা) দ্রুত প্রকাশ করতে হয়। ফলে লেখাটি কিছুদিন গচ্ছিত রেখে ধীরস্থিরভাবে সংশোধন ও পরিমার্জন করার কোনো সময় পাওয়া যায় না। তাড়াহুড়োয় লেখা প্রকাশের কারণে লেখকের মেধা ও নিখুঁত সাহিত্য রচনার ক্ষমতা ব্যাহত হয়।
১৫. “বাঙ্গালা সাহিত্য, ঘণ্টার ভরসা”— কথাটি দ্বারা বঙ্কিমচন্দ্র কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, বাংলা ভাষার ও বাঙালি জাতির ভবিষ্যতের সার্বিক নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি বাংলা সাহিত্যের ওপরই নির্ভর করে। নব্য লেখকেরা যদি দায়িত্বশীল ও সৎ হয়ে সাহিত্য রচনা করেন, তবে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হবে এবং সেই সমৃদ্ধ সাহিত্যই পুরো জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেবে।
১৬. বঙ্কিমচন্দ্রের মতে কারা ‘যাত্রাওয়ালার সমতুল্য’?
উত্তর: যাঁরা সত্য ও সাহিত্যের পবিত্রতা রক্ষা না করে কেবল অর্থ উপার্জন, নাম-যশ বা চটকদার লোকরঞ্জনের উদ্দেশ্যে সাহিত্য চর্চা করেন, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁদের নীচ ব্যবসায়ী বা ‘যাত্রাওয়ালার সমতুল্য’ বলেছেন। সাহিত্যকে পণ্যে রূপান্তর করার কারণে তিনি এই কঠোর মন্তব্য করেছেন।
১৭. “যে বিষয়ে অধিকার নাই, সে বিষয়ে হস্তক্ষেপ অকর্তব্য”— বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: কোনো বিষয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত পড়াশোনা, জ্ঞান বা স্পষ্ট ধারণা না থাকলে সে বিষয়ে মতামত প্রকাশ করা বা নিবন্ধ লেখা উচিত নয়। না জেনে কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, যা পাঠকদের বিভ্রান্ত করে এবং সাহিত্যের ক্ষতি করে।
১৮. রচনায় অসংযত রসিকতা বা ব্যঙ্গ বর্জন করা উচিত কেন?
উত্তর: রচনায় জোর করে হাস্যরস বা ব্যঙ্গাত্মক কথা ঢোকানোর চেষ্টা করলে তা কদর্য ও বেমানান দেখায়। রসিকতা যদি স্বাভাবিকভাবে রচনার ভাবের সাথে মিশে না যায়, তবে তা রচনার মূল আবেদন ও মার্জিত ভাবকে নষ্ট করে দেয়।
১৯. রচনায় প্রমাণের গুরুত্ব বঙ্কিমচন্দ্র কীভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র মনে করতেন, সত্যের ওপরই সাহিত্যের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে, রচনায় সব সময় প্রমাণ সরাসরি না দেখালেও লেখকের নিজের কাছে অকাট্য যুক্তি বা প্রমাণ প্রস্তুত থাকা চাই, যাতে রচনার অখণ্ড সত্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্নের অবকাশ না থাকে।
২০. “লেখার উদ্দেশ্য যদি লোকরঞ্জন হয়, তবে রচনার মান নামিয়া যায়”— কেন?
উত্তর: সাধারণ পাঠকের তাৎক্ষণিক করতালি বা পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে লিখতে গেলে সাহিত্যিককে পাঠকদের নিচু রুচির কাছে আপস করতে হয়। এর ফলে লেখক সত্য ও গভীর জীবনবোধের চর্চা বাদ দিয়ে চটকদার বিষয়বস্তু পরিবেশনে বাধ্য হন, যা রচনার মৌলিক মান নষ্ট করে।
২১. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নব্য লেখকদের উদ্দেশ্যে কলম ধরতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন কেন?
উত্তর: ১৯ শতকে বাংলায় নতুন অনেক লেখক উঠে আসছিলেন, কিন্তু সঠিক নির্দেশনার অভাবে অনেকে খ্যাতি, অর্থ বা লোকরঞ্জনের সস্তা পথে পা বাড়াচ্ছিলেন। সাহিত্যকে সুপথে পরিচালনা করা এবং নতুনদের নীতিবান ও দায়িত্বশীল সাহিত্যিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্যই বঙ্কিমচন্দ্র এই উপদেশমালা রচনা করেন।
২২. “যশ আপনি আসিবে”— বঙ্কিমচন্দ্রের এই আশ্বাসের পটভূমি কী?
উত্তর: লেখকদের যশের পেছনে না ছুটে লেখার গুণগত মানের ওপর মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র এই কথা বলেছেন। রচনা যদি মানসম্মত, সত্যনির্ভর ও প্রাঞ্জল হয়, তবে পাঠক সমাজ তা গ্রহণ করবেই এবং স্বাভাবিক নিয়মেই খ্যাতি বা সুনাম লেখকের কাছে চলে আসবে।
২৩. “সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী”— সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে এর অর্থ কী?
উত্তর: সাহিত্য চর্চায় মিথ্যা বা অসত্য দিয়ে সাময়িক জনপ্রিয়তা পাওয়া গেলেও কালক্রমে তা হারিয়ে যায়। সত্য ও নীতিভিত্তিক সাহিত্যই চিরকাল টিকে থাকে এবং জয়ী হয়। তাই সাহিত্যিককে সবসময় সত্যের পক্ষাবলম্বন করে লেখনী ধারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২৪. “অনুকরণে দোষগুলি অনুকৃত হয়, গুণগুলি হয় না”— বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: কোনো মহৎ লেখকের মৌলিক সৃষ্টিশীলতা ও আত্মা তাঁর নিজস্ব। অন্য কেউ তাঁকে অনুকরণ করতে গেলে সেই আত্মাকে ধারণ করতে পারে না; বরং তাঁর লেখার বাহ্যিক কিছু অভ্যাস, কৃত্রিমতা বা দুর্বলতাকেই নিজের লেখায় নিয়ে আসে। তাই অনুকরণ ক্ষতিকর।
২৫. “বিদ্যা জাহির করা রচনার পরিপাটির হানাজনক”— কথাটি বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: রচনার মূল উদ্দেশ্য ভাবের আদান-প্রদান। কিন্তু লেখক যদি সেখানে জোর করে নিজের বিদ্যা বা পণ্ডিত্য দেখাতে চান, তবে বাক্য জটিল হয়ে ওঠে এবং রচনার নান্দনিক ভারসাম্য ও পরিপাটি সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে পড়ে।
২৬. প্রাচীন ও নতুন বিধির মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: প্রাচীন ও নতুন উভয় বিধির মূল উদ্দেশ্য ছিল রচনায় ব্যবহৃত অতিরিক্ত বা কৃত্রিম অলংকার কেটে বাদ দিয়ে লেখার প্রাঞ্জলতা, সহজবোধ্যতা ও সাবলীলতা ফিরিয়ে আনা।
২৭. বঙ্কিমচন্দ্র কেন ‘অসত্য ভাষণকে মহাপাপ’ বলেছেন?
উত্তর: সাহিত্য সমাজকে পথ দেখায়। সাহিত্যিক যদি রচনায় মিথ্যা তথ্য বা অসত্য ভাব পরিবেশন করেন, তবে পুরো সমাজ বিভ্রান্ত হতে পারে। সমাজের প্রতি সাহিত্যের এই দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকেই তিনি অসত্য প্রকাশকে মহাপাপ বলেছেন।
২৮. “লোকরঞ্জন প্রবৃত্তি” বলতে প্রবন্ধটিতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: পাঠকদের সস্তা আবেগ, ভুল ধারণা বা চটকদার রুচিকে তুষ্ট করে লাইক, বাহবা বা বই বিক্রির উদ্দেশ্যে সাহিত্য রচনা করার মানসিকতাকেই প্রবন্ধে ‘লোকরঞ্জন প্রবৃত্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২৯. রচনায় প্রাঞ্জলতা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: প্রাঞ্জলতা হলো রচনার এমন এক গুণ, যার ফলে পাঠক কোনো জটিলতা বা অস্পষ্টতা ছাড়াই লেখকের মনের ভাব সহজে ও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন। এটিই রচনার সর্বপ্রধান গুণ।
৩০. “লেখা শেষ হইবামাত্র না ছাপানো” কেন এক ধরনের আত্মসংযম?
উত্তর: লেখা শেষ হলে তা দ্রুত মানুষকে দেখানোর বা প্রকাশের একটি আবেগীয় তাড়না কাজ করে। লেখা কিছুদিন ফেলে রাখা এই তাড়নাকে দমন করে ঠান্ডা মাথায় আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়, যা লেখকের আত্মসংযমেরই পরিচয়।
৩১. বঙ্কিমচন্দ্র কেন নব্য লেখকদের ১৩টি নির্দিষ্ট উপদেশ দিয়েছিলেন?
উত্তর: নব্য লেখকেরা যাতে সস্তা খ্যাতির লোভে না পড়ে সত্য, ধর্ম ও সরলতার পথ ধরে একটি উচ্চমানের বাংলা সাহিত্য গড়ে তুলতে পারেন—সেই লক্ষ্যেই বঙ্কিমচন্দ্র এই ১৩টি সুনির্দিষ্ট উপদেশ দিয়েছিলেন।
৩২. রচনায় ‘ধর্ম’ বলতে বঙ্কিমচন্দ্র কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: রচনায় ‘ধর্ম’ বলতে কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে বোঝানো হয়নি; বরং সার্বজনীন নীতিবোধ, সততা, সত্যবাদিতা এবং মানবকল্যাণকামী মানসিকতাকে বোঝানো হয়েছে।
৩৩. রচনায় অনাবশ্যক বিদেশি ভাষার ব্যবহার কীভাবে পাঠককে দূরে ঠেলে দেয়?
উত্তর: না বুঝে বা বিদ্যা জাহির করতে অনাবশ্যক বিদেশি শব্দ ও উদ্ধৃতি ব্যবহার করলে রচনা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। সাধারণ পাঠক লেখাটির মূল রস অনুধাবন করতে না পেরে বিরক্তিবোধ করে এবং সাহিত্য থেকে দূরে সরে যায়।
৩৪. “সত্য ও ধর্ম ত্যাগ করিয়া অন্য উদ্দেশ্যে লেখনী ধারণ করা উচিত নহে”— কেন?
উত্তর: সত্য ও ধর্মই সাহিত্যের নৈতিক ভিত্তি। এই ভিত্তি ত্যাগ করে অর্থ বা খ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে লিখলে সাহিত্য তার পবিত্রতা হারিয়ে ব্যবসায়িক সামগ্রীতে পরিণত হয়, যা সমাজ ও সাহিত্য উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
৩৫. বঙ্কিমচন্দ্র কেন সাহিত্য চর্চাকে এক ধরনের মহৎ সাধনা মনে করতেন?
উত্তর: সাহিত্য কেবল বিনোদন নয়, তা একটি জাতির বিবেক গঠন করে। যেহেতু সাহিত্যিকদের লেখায় একটি সমাজ প্রভাবিত হয়, তাই সাহিত্য চর্চাকে তিনি আত্মস্বার্থহীন মহৎ সাধনা হিসেবে গণ্য করতেন।
৩৬. “যে কথার প্রমাণ দিতে পারিব না, তা লিখিব না”— এই প্রতিজ্ঞা লেখকের জন্য কেন জরুরি?
উত্তর: এই প্রতিজ্ঞা লেখককে দায়িত্বশীল ও সত্যনিষ্ঠ করে তোলে। এর ফলে লেখক যেকোনো চটকদার গুজব বা অপ্রমাণিত তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন এবং রচনার বস্তুনিষ্ঠতা রক্ষিত হয়।
৩৭. রচনায় স্বকীয়তা বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: অন্যের অনুকরণ না করে নিজের চিন্তা, নিজস্ব শৈলী ও নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে স্বাধীনভাবে সাহিত্য সৃষ্টি করার ক্ষমতাকেই রচনায় স্বকীয়তা বলা হয়েছে।
৩৮. “যশ ও অর্থ রচনার গৌণ ফল হতে পারে, প্রধান উদ্দেশ্য নয়”— ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ভালো সাহিত্য সৃষ্টি হলে যশ ও অর্থ উপহার হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই আসতে পারে। কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টির শুরুর উদ্দেশ্যই যদি হয় যশ বা অর্থ, তবে সাহিত্য তার পথ হারায়। তাই এগুলো গৌণ বা উপজাত ফল হতে পারে, মূল উদ্দেশ্য নয়।
৩৯. বঙ্কিমচন্দ্রের মতে সার্থক রচনার লক্ষণ কী?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, সার্থক রচনার মূল লক্ষণ হলো তা হবে সত্যনির্ভর, সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় রচিত, পরপীড়নহীন এবং মানবকল্যাণমুখী।
৪০. “বাংলা সাহিত্যের উন্নতি নব্য লেখকদের হাতেই নির্ভর করে”— বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: প্রবীণদের পর নতুন প্রজন্মই সাহিত্যের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই নব্য লেখকেরা যদি সৎ ও নিয়মনিষ্ঠ হয়ে সাহিত্য চর্চা করেন, তবেই বাংলা সাহিত্যের দ্রুত ও সার্বিক বিকাশ ঘটা সম্ভব।
৪১. “পরনিন্দা রচনার উদ্দেশ্য হইতে পারে না”— কথাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: সাহিত্য চর্চার স্থান হওয়া উচিত হিংসা ও ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়ির ঊর্ধ্বে। পরনিন্দা বা অন্যকে খাটো করার উদ্দেশ্যে লিখলে সাহিত্যের মান কদর্য হয়ে পড়ে এবং তা সাহিত্যের মৌলিক উদ্দেশ্য নষ্ট করে।
৪২. বঙ্কিমচন্দ্র কেন জটিল শব্দ প্রয়োগের বিরোধিতা করেছেন?
উত্তর: জটিল ও সমাসবদ্ধ শব্দ প্রয়োগ করলে রচনার ভাব আড়াল হয়ে যায় এবং পাঠক মূল বক্তব্য বুঝতে হিমশিম খায়। রচনার মূল কাজ মনের ভাব সহজে পৌঁছানো বলে তিনি জটিলতার বিরোধিতা করেছেন।
৪৩. “রসিকতার অসংযত প্রয়োগ কদর্য”— বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: রচনায় হাস্যরস বা ব্যঙ্গ যদি বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় এবং জোড়াতালি দিয়ে বসানো হয়, তবে তা রচনার গুরুত্ব কমিয়ে দেয় এবং সুন্দর লেখার বদলে এক ধরনের কদর্য ভাব ফুটিয়ে তোলে।
৪৪. সাময়িক সাহিত্যের প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের সতর্কবার্তা কী ছিল?
উত্তর: সাময়িক সাহিত্য দ্রুত লেখার চাপে পরিমার্জনের সুযোগ কা কেড়ে নেয়। তাই নতুন লেখকদের সাময়িক সাহিত্যের মোহে পড়ে স্থায়ী ও যত্নশীল সাহিত্য সৃষ্টি থেকে দূরে সরে না যাওয়ার জন্য তিনি সতর্ক করেছেন।
৪৫. রচনায় ‘সরলতা’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: রচনায় কোনো রকম কৃত্রিমতা, বিদ্বেষ বা ভাষার আড়ম্বর না রেখে সহজ ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের মতামত প্রকাশ করাকেই ‘সরলতা’ বলা হয়।
৪৬. বঙ্কিমচন্দ্রের উপদেশগুলো কেন সর্বকালের লেখকদের জন্য প্রযোজ্য?
উত্তর: কারণ উপদেশগুলো সাহিত্য চর্চার মৌলিক নীতিশাস্ত্র, সততা, সত্যবাদিতা এবং প্রাঞ্জলতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যুগ পাল্টালেও সাহিত্য সৃষ্টির এই মূল নৈতিক শর্তগুলো কখনো পরিবর্তিত হয় না।
৪৭. “বিদ্যা থাকিলে তাহা আপনা হইতেই প্রকাশ পায়”— বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: লেখকের জ্ঞান ও গভীরতা যদি সত্যিই থাকে, তবে তাঁর চিন্তাভাবনা ও রচনার বাচনভঙ্গির মাধ্যমেই তা প্রকাশ পায়। তার জন্য আলাদা করে কঠিন শব্দ বা পণ্ডিত্য দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না।
৪৮. রচনায় ‘অনধিকার চর্চা’র পরিণতি কী হতে পারে?
উত্তর: অনধিকার চর্চা অর্থাৎ না জেনে কোনো বিষয়ে লিখতে গেলে রচনায় ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য স্থান পায়, যা পাঠকের কাছে লেখকের ইজ্জত ও সম্মান ক্ষুণ্ন করে।
৪৯. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কেন সাহিত্যিকদের আত্মসংযমী হতে বলেছেন?
উত্তর: লোভ, খ্যাতি, তাড়াহুড়ো করে প্রকাশ করা এবং পরনিন্দার রূপ থেকে মুক্ত থাকার জন্য সাহিত্যিকের আত্মসংযম অত্যন্ত প্রয়োজন। আত্মসংযম ছাড়া মানসম্পন্ন ও কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়।
৫০. ‘বাঙালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধটির মূল সুর কী?
উত্তর: প্রবন্ধটির মূল সুর হলো— সত্য ও নীতিভিত্তিক সাহিত্য চর্চা, আত্মপ্রচার ও লোভ বর্জন, ভাষার সরলতা রক্ষা এবং জাতীয় দায়িত্ববোধ নিয়ে সার্থক বাংলা সাহিত্য গড়ে তোলা।
উপসংহার:
‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ অধ্যায়ের ওপর প্রস্তুতকৃত এই গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তরগুলো শেষ পর্যন্ত পড়ার মাধ্যমে আপনার পরীক্ষার প্রস্তুতি এক ধাপ এগিয়ে গেল । বোর্ড পরীক্ষার মানদণ্ড বজায় রেখে তৈরি এই প্রশ্ন-উত্তরগুলো আপনার পরীক্ষার সময় অনেকটাই বাঁচিয়ে দেবে । এই “বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর” গাইডটি যদি আপনার বিন্দুমাত্র উপকারে এসে থাকে, তবে সহপাঠী ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না । আপনার এইচএসসি ও অন্যান্য পরীক্ষার সার্বিক সফলতা কামনায়!

