আপনি কি ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধের সেরা সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর খুঁজছেন? তবে আপনি একদম সঠিক জায়গায় এসেছেন! বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই নীতিধর্মী প্রবন্ধটি বাংলা ব্যাকরণ ও সাহিত্য পাঠ্যক্রমের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হলে কেবল উদ্দীপক বোঝাই যথেষ্ট নয়, বরং ‘গ’ (প্রয়োগ) ও ‘ঘ’ (উচ্চতর চিন্তনদক্ষতা) অংশের উত্তরগুলোকে নির্দিষ্ট প্যারা অনুযায়ী যথার্থভাবে ফুটিয়ে তোলা আবশ্যক । আপনাদের সুবিধার্থে এই পোস্টে আমরা নিয়ে এসেছি “বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর”-এর একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য সহায়িকা । প্রতিটি প্রশ্ন ও উত্তর এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে খুব সহজেই পরীক্ষার আগের দিন রিভিশন দিয়ে নিজেকে শতভাগ প্রস্তুত করে তোলা যায় ।
বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন সৃজনশীল প্রশ্ন
সৃজনশীল প্রশ্ন – ১
উদ্দীপক:
সাইফ একজন উদীয়মান তরুণ লেখক। সে অনলাইনে দ্রুত খ্যাতি ও টাকা উপার্জনের আশায় ট্রেন্ডিং বিষয়ে চটকদার লেখা পোস্ট করে। মানহীন হলেও লাইক-শেয়ার পাওয়ার জন্য সে অন্যের লেখার স্টাইল হুবহু অনুকরণ করে। বর্ষীয়ান সাহিত্যিক শফিক সাহেব তাকে ডেকে বললেন, “যশ ও অর্থের লোভে সাহিত্য সৃষ্টি করলে তার আয়ু বেশিদিন থাকে না। রচনার মূল শক্তি হলো তার সত্যতা ও সরলতা।”
- (ক) ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধটি প্রথম কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়?
- (খ) “সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার সরলতা”— বুঝিয়ে লেখো।
- (গ) উদ্দীপকের সাইফের কাজের মধ্যে ‘বাঙালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধের নির্দেশিত কোন দিকটি লঙ্ঘিত হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
- (ঘ) “শফিক সাহেবের বক্তব্য বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধের মূল সুরকেই নির্দেশ করে”— মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।
১ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) ‘প্রচার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
(খ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, সহজ-সরল ভাষায় মনের ভাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করাই রচনার আসল সৌন্দর্য। অলংকার বা কঠিন শব্দের আড়ম্বর দিয়ে লেখা জটিল করলে পাঠকের কাছে তা বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। যে লেখক সোজা কথায় নিজের মনের ভাব পাঠককে বোঝাতে পারেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক। তাই সরলতাকেই শ্রেষ্ঠ অলংকার বলা হয়েছে।
(গ) উদ্দীপকের সাইফের আচরণের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধে নির্দেশিত ‘অর্থ ও যশের উদ্দেশ্যে সাহিত্য সাধনা করা’ এবং ‘অন্য লেখকের অন্ধ অনুকরণ করা’র মতো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ দিকগুলো লঙ্ঘিত হয়েছে।
প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র নতুন লেখকদের সতর্ক করে বলেছেন যে, কেবল অর্থ উপার্জন বা সাময়িক যশ-খ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে লেখনী ধারণ করা অনুচিত। টাকার জন্য লিখতে গেলে আমাদের দেশে পাঠকদের নিম্নমানের রুচির কাছে নতিস্বীকার করতে হয়, যাকে তিনি ‘লোকরঞ্জন প্রবৃত্তি’ বলেছেন। এতে সাহিত্যের মৌলিক মান ধ্বংস হয়ে যায়। পাশাপাশি তিনি এগারো নম্বর উপদেশে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন— “অনুকরণ করিও না।” অন্ধ অনুকরণ করলে মূল লেখকের গুণগুলো আসে না, বরং তাঁর শৈলীর ভুল ও দোষগুলোই অনুকৃত হয়।
উদ্দীপকের সাইফ একজন উদীয়মান লেখক হয়েও সাহিত্যের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত। সে দ্রুত অর্থ ও খ্যাতি অর্জনের লোভে চটকদার ও মানহীন লেখা পোস্ট করে এবং লাইক-শেয়ার পাওয়ার আশায় অন্য লেখকের স্টাইল হুবহু অনুকরণ করে। সাইফের এই চটকদার মনোভাব ও অনুকরণপ্রবৃত্তি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম ও একাদশ উপদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
(ঘ) উদ্দীপকের প্রবীণ সাহিত্যিক শফিক সাহেবের উপদেশ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধের মূল দর্শন ও আদর্শকে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিফলিত করে। তাই মন্তব্যটি একেবারেই যথার্থ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রবন্ধে সাহিত্য চর্চার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিশাস্ত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, সাহিত্যের প্রধান ও একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ‘সত্য ও ধর্ম’। যশ বা অর্থের লোভে সাহিত্য সৃষ্টি করলে তার স্থায়ী মূল্য থাকে না, তা সাময়িক ব্যবসার রূপ নেয়। বঙ্কিমচন্দ্র বিশ্বাস করতেন, সত্য ও সরল ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করাই রচনার সর্বপ্রধান সৌন্দর্য। কৃত্রিমতা বা চটক দিয়ে কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়।
উদ্দীপকের সাইফ যখন অর্থের লোভে অনৈতিক ও মানহীন সাহিত্যচর্চায় মেতে ওঠে, তখন প্রবীণ সাহিত্যিক শফিক সাহেব তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, লোভের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সাহিত্যের আয়ু বেশিদিন থাকে না। তিনি সাইফকে রচনার সত্যতা ও সরলতার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন।
শফিক সাহেবের এই দিকনির্দেশনা বঙ্কিমচন্দ্রের ‘যশঃ কদাপি রচনার উদ্দেশ্য হইবে না’ এবং ‘সত্যই সাহিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য’— এই দুটি মূল নীতিকেই পুনরুচ্চারণ করে। বঙ্কিমচন্দ্র যেমন অসত্য ও লোভমুক্ত সরল সাহিত্যের কথা বলেছেন, শফিক সাহেবও ঠিক সেই বার্তাটিই সাইফকে দিয়েছেন। অতএব বলা যায়, শফিক সাহেবের বক্তব্য বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধের মূল সুরকেই নির্দেশ করে।
সৃজনশীল প্রশ্ন – ২
উদ্দীপক:
আরিফ একটি গবেষণা প্রবন্ধ লিখে শেষ করেই পরদিন তা পত্রিকায় ছাপাতে দিয়ে দিল। কিছুদিন পর ভুল তথ্য ও অসঙ্গতির কারণে সুধীসমাজে তার লেখাটি কঠোরভাবে সমালোচিত হলো। অভিজ্ঞ সম্পাদকের কাছে গেলে তিনি বললেন, “লেখা শেষ করেই ছাপাতে দেওয়া ঠিক নয়। কিছুদিন ফেলে রেখে পরে পড়লে নিজের ভুলগুলো নিজের চোখেই ধরা পড়ে।”
- (ক) ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র কয়টি উপদেশের কথা উল্লেখ করেছেন?
- (খ) “যে বিষয়ে যাহার অধিকার নাই, সে বিষয়ে তাহার হস্তক্ষেপ অকর্তব্য”— কথাটি কেন বলা হয়েছে?
- (গ) উদ্দীপকের আরিফের ভুল প্রবন্ধের কোন উপদেশের সাথে সম্পর্কিত? ব্যাখ্যা করো।
- (ঘ) “আরিফ যদি প্রবন্ধের শিক্ষা গ্রহণ করত, তবে তাকে এই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না”— মূল্যায়ন করো।
২ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) ১৩টি উপদেশের কথা উল্লেখ করেছেন।
(খ) না জেনে বা না বুঝে কোনো বিষয়ে লিখতে গেলে বিভ্রান্তি ও ভুল তথ্য ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে বলে বঙ্কিমচন্দ্র এই কথাটি বলেছেন। কোনো বিষয়ে গভীর জ্ঞান বা স্পষ্ট ধারণা না থাকলে সাহিত্য সৃষ্টি করতে যাওয়া অনুচিত; এতে সাহিত্যের মান ক্ষুণ্ন হয়।
(গ) উদ্দীপকের আরিফের ভুলটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধের তৃতীয় উপদেশের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত, যেখানে বঙ্কিমচন্দ্র লেখা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তা প্রকাশ না করে কিছুদিন গচ্ছিত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে নব্য লেখকদের উদ্দেশ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো কবিতা, উপন্যাস বা গদ্য রচনা শেষ করার পরপরই তা ছাপাখানায় পাঠানো উচিত নয়। লেখাটি কিছুদিন বা কয়েক মাস ড্রয়ারে বা গচ্ছিত রেখে দেওয়া ভালো। কিছুদিন পর নিজের লেখার ওপর আবেগ কমে এলে লেখক যখন তা পুনরায় পাঠ করেন, তখন রচনার নানা ভুলভ্রান্তি, অসংগতি ও অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো নিজের চোখেই ধরা পড়ে। ফলে তা সহজে পরিমার্জন করা যায়।
উদ্দীপকের আরিফ একটি গবেষণা প্রবন্ধ লিখে শেষ করার পরদিন পরেই তা পত্রিকায় ছাপাতে দিয়ে চরম ভুল করেছে। লেখাটি কিছুদিন ফেলে রেখে পুনরায় সংশোধন না করার দরুন এতে ভুল তথ্য ও অসংগতি থেকে যায়, যার ফলে তাকে সুধীসমাজে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। আরিফ যদি বঙ্কিমচন্দ্রের তৃতীয় উপদেশটি মেনে চলত, তবে তার এই ভুলগুলো নিজেই শুধরে নিতে পারত।
(ঘ) প্রশ্নোক্ত উক্তিটি শতভাগ সত্য ও যুক্তিযুক্ত। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধের শিক্ষণীয় দিকগুলো অনুসরণ করলে আরিফ সুধীসমাজে সমালোচিত হওয়ার বিব্রতকর পরিস্থিতি অনায়াসে এড়াতে পারত।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে সাহিত্য প্রকাশের পূর্বে লেখকের আত্মসমালোচনা ও সতর্কতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ৩ নম্বর উপদেশে বলেছেন, লেখা শেষ করে কিছুদিন রেখে দিলে লেখক নিজে থেকেই তার ভুলগুলো সংশোধন করতে পারেন। এছাড়া ১২ নম্বর উপদেশে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন— “যে কথার প্রমাণ দিতে পারিবে না, তা লিখিও না।” রচনায় তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সত্যতা ও প্রমাণের স্পষ্টতা থাকা অপরিহার্য।
উদ্দীপকের আরিফ তাড়াহুড়ো করে অপরিপক্ক ও অপ্রমাণিত ভুল তথ্যসংবলিত গবেষণা প্রবন্ধ পত্রিকায় প্রকাশ করে। ফলে পাঠক ও সুধী সমাজ তার লেখার অসংগতি ধরে ফেলে এবং তাকে সমালোচিত করে। আরিফ যদি লেখাটি প্রকাশ না করে কিছুদিন নিজের কাছে রেখে দিত, তবে ঠান্ডা মাথায় পড়ে সে নিজের ভুলগুলো সংশোধন করতে পারত এবং অসত্য তথ্যগুলো বাদ দিয়ে প্রমাণের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারতো।
সুতরাং, বঙ্কিমচন্দ্রের উপদেশ মেনে লেখা কিছুদিন ফেলে রেখে পরিমার্জন ও তথ্য যাচাই করলে আরিফের গবেষণা প্রবন্ধটি মানসম্পন্ন ও বস্তুনিষ্ঠ হতো। আরিফ বঙ্কিমচন্দ্রের নির্দেশিত ধৈর্য ও আত্মপর্যালোচনার শিক্ষা গ্রহণ করেনি বলেই তাকে এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাই বলা যায়, প্রবন্ধের শিক্ষা গ্রহণ করলে আরিফকে এই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।
সৃজনশীল প্রশ্ন – ৩
উদ্দীপক:
কবির সাহেব একজন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক। তিনি সহজ বাংলা আলোচনার মাঝেও অনাবশ্যকভাবে প্রচুর জটিল ইংরেজি ও ফরাসি উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন। পাঠকের কাছে বিষয়বস্তু বুঝিয়ে দেওয়ার চেয়ে নিজের গভীর পণ্ডিত্য জাহির করাই যেন তাঁর মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়।
- (ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাসের নাম কী?
- (খ) বঙ্কিমচন্দ্র “অন্য উদ্দেশ্যে” লেখা লেখকদের কাদের সাথে তুলনা করেছেন এবং কেন?
- (গ) উদ্দীপকের কবির সাহেবের মানসিকতা প্রবন্ধের কোন নিষেধের বিপরীত? ব্যাখ্যা করো।
- (ঘ) “কবির সাহেবের সাহিত্য চর্চায় রচনার পরিপাটি ও উদ্দেশ্য বিনষ্ট হচ্ছে”— প্রবন্ধের আলোকে উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।
৩ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) দুর্গেশনন্দিনী।
(খ) বঙ্কিমচন্দ্র অন্য উদ্দেশ্যে (যশ, অর্থ বা লোকরঞ্জন) লেখা লেখকদের ‘যাত্রাওয়ালা’ বা নীচ ব্যবসায়ীদের সাথে তুলনা করেছেন। কারণ, সত্য ও সাহিত্যের মঙ্গল ত্যাগ করে কেবল উপার্জনের উদ্দেশ্যে সাহিত্যকে পণ্য বানালে তার নৈতিক মান নেমে যায়।
(গ) উদ্দীপকের কবির সাহেবের মানসিকতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধে বর্ণিত ‘বিদ্যাপ্রকাশের অনর্থক চেষ্টা করা অনুচিত’ সংক্রান্ত নিষেধের সম্পূর্ণ বিপরীত।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রবন্ধের ষষ্ঠ উপদেশে অলংকার ও ভাষার কৃত্রিম ব্যবহারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রচনায় অনাবশ্যক বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা করা অত্যন্ত কদর্য এবং তা পাঠকের জন্য অতিশয় বিরক্তিকর। বিদ্যা যদি সত্যি লেখকের থাকে, তবে তা রচনার ভাব ও রসে আপনা থেকেই প্রকাশিত হবে; তার জন্য জোড়াতালি দিয়ে কঠিন ইংরেজি বা অন্য ভাষার উদ্ধৃতি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। জোর করে পণ্ডিত্য জাহির করলে রচনার স্বাভাবিক প্রাঞ্জলতা নষ্ট হয়।
উদ্দীপকের কবির সাহেব একজন প্রাবন্ধিক হয়েও সহজ বাংলা রচনার মাঝে অনাবশ্যকভাবে প্রচুর জটিল ইংরেজি ও ফরাসি শব্দ ও উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন। পাঠকের কাছে বিষয়টি বোধগম্য করার চেয়ে নিজের জ্ঞান প্রদর্শন করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কবির সাহেবের এই মানসিকতা বঙ্কিমচন্দ্রের বিদ্বান জাহির করার বিরুদ্ধে দেওয়া কঠোর নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে।
(ঘ) কবির সাহেবের অনাবশ্যক পাণ্ডিত্য জাহির করার প্রবণতা সাহিত্য সৃষ্টির মূল নান্দনিকতা ও কার্যকারিতাকে ধূলিসাৎ করছে। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধের আলোকে উক্তিটি সম্পূর্ণরূপে যথার্থ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, সাহিত্য রচনার সর্বপ্রধান গুণ হওয়া উচিত ‘প্রাঞ্জলতা’ এবং প্রধান অলংকার হওয়া উচিত ‘সরলতা’। সাহিত্য সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের মনের ভাব বা সত্যকে পাঠকের হৃদয়ে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু কোনো লেখক যদি নিজের বিদ্যা জাহির করার জন্য কঠিন কঠিন বিদেশি উদ্ধৃতি বা দুর্বোধ্য ভাষার মহড়া দেন, তবে রচনার মূল সৌন্দর্য নষ্ট হয় এবং পাঠক বিরক্ত হয়ে সাহিত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
উদ্দীপকের প্রাবন্ধিক কবির সাহেব সহজ বিষয় বোঝানোর ক্ষেত্রেও জটিল ইংরেজি ও ফরাসি উদ্ধৃতি প্রয়োগ করেন। তিনি পাঠকের অনুভূতির চেয়ে নিজের অহংবোধ ও পণ্ডিত্যকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। এর ফলে তাঁর লেখাটি দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে, যা বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়— “রচনার পরিপাটির বিশেষ হানাজনক।”
পরিশেষে বলা যায়, সাহিত্য যখন পাঠকের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় এবং স্রেফ লেখকের জ্ঞান প্রদর্শনের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। কবির সাহেব সরলতার পথ ত্যাগ করে জটিলতার পথ ধরেছেন বলেই তাঁর রচনার প্রাঞ্জলতা, পরিপাটি এবং পাঠকের সাথে সংযোগ সাধনের মূল উদ্দেশ্য বিনষ্ট হচ্ছে।
সৃজনশীল প্রশ্ন ৪
উদ্দীপক:
তরুণ কলামিস্ট তানভীর সামাজিক মাধ্যমে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে সে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে গিয়ে পাঠকদের চটকদার রুচিকে প্রাধান্য দিয়ে পোস্ট করে। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে এবং ভিত্তিহীন গুজব ছড়িয়ে সে লাইক কুড়ায়। প্রবীণ সাংবাদিক রাশেদ সাহেব তাকে বললেন, “অসত্য ও মিথ্যা দিয়ে তৈরি জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী। সত্যই সাহিত্যের একমাত্র ভিত।”
- (ক) ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা কত সালে প্রকাশিত হয়?
- (খ) সাময়িক সাহিত্যকে বঙ্কিমচন্দ্র কেন লেখকের পক্ষে অবনতিকর বলেছেন?
- (গ) তানভীরের লেখার ধরণ প্রবন্ধের যে দিকটিকে নির্দেশ করে তা ব্যাখ্যা করো।
- (ঘ) “রাশেদ সাহেবের বার্তাটি বঙ্কিমচন্দ্রের চতুর্থ উপদেশেরই প্রতিধ্বনি”— উক্তিটির যৌক্তিকতা বিচার করো।
৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) ১৮৭২ সালে প্রকাশিত হয়।
(খ) সাময়িক সাহিত্য (যেমন সংবাদপত্র বা তাৎক্ষণিক লেখা) দ্রুত প্রকাশ করতে হয় বলে তা কিছুদিন ফেলে রেখে বারবার সংশোধন ও পরিমার্জন করার সুযোগ থাকে না। ফলে রচনায় নিখুঁত সৌন্দর্য আনা সম্ভব হয় না, যা লেখকের দূরগামী উন্নতির অন্তরায়।
(গ) তানভীরের লেখার ধরণ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধে বর্ণিত ‘লোকরঞ্জন প্রবৃত্তি’ এবং ‘অসত্য ও মিথ্যা প্রকাশের মহাপাপ’-এর নেতিবাচক দিকটিকে নির্দেশ করে।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে নতুন লেখকদের সত্য ও ধর্মের পথ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি চতুর্থ উপদেশে বলেছেন, “সত্য ও ধর্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য। অন্য উদ্দেশ্যে লেখনী ধারণ মহাপাপ।” এছাড়া তিনি সতর্ক করেছেন যে, কেবল পাঠকদের সস্তা করতালি বা লাইক কুড়ানোর জন্য (লোকরঞ্জন প্রবৃত্তি) লিখতে গেলে রচনার নৈতিক মান নেমে যায় এবং লেখক অসত্য ও ক্ষতিকর বার্তা ছড়াতে বাধ্য হন।
উদ্দীপকের তরুণ কলামিস্ট তানভীর সামাজিক মাধ্যমে নিজের জনপ্রিয়তা টিকিয়ে রাখতে পাঠকদের চটকদার রুচিকে প্রাধান্য দেয়। সে সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে ভিত্তিহীন গুজব ছড়ায়, যাতে কেবল সস্তা জনপ্রিয়তার লাইক পাওয়া যায়। তানভীরের এই আচরণ বঙ্কিমচন্দ্র নির্দেশিত নীতিবান সাহিত্যচর্চার চরম বিপরীত এবং তা প্রবন্ধের ‘অসত্য প্রকাশের মাধ্যমে লোকরঞ্জন করা’র ক্ষতিকর দিককেই ফুটিয়ে তোলে।
(ঘ) উদ্দীপকের প্রবীণ সাংবাদিক রাশেদ সাহেবের উপদেশ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের চতুর্থ উপদেশ অর্থাৎ “সত্য ও ধর্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য”— এই চিরন্তন সত্যটিরই হুবহু প্রতিধ্বনি। তাই উক্তিটি অত্যন্ত যৌক্তিক।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর চতুর্থ উপদেশে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন যে, সাহিত্য রচনার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত সত্য ও ধর্মের প্রতিষ্ঠা। সাময়িক খ্যাতি, টাকা বা মানুষকে মিথ্যা বলে প্রলুব্ধ করার উদ্দেশ্যে লেখনী ধারণ করা মহাপাপ। মিথ্যা ও ক্ষণস্থায়ী চটক দিয়ে তৈরি লেখা সাময়িক আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারলেও তা ইতিহাস বা পাঠকের হৃদয়ে টিকে থাকে না। সাহিত্যের ভিত্তি হতে হয় অটল সত্যের ওপর।
উদ্দীপকের রাশেদ সাহেবও ঠিক একই সুর ধরে তরুণ তানভীরকে সতর্ক করেছেন। তানভীর যখন লাইক পাওয়ার আশায় গুজব ও অসত্য তথ্য ছড়াচ্ছিল, তখন রাশেদ সাহেব তাকে সত্যের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “অসত্য ও মিথ্যা দিয়ে তৈরি জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী। সত্যই সাহিত্যের একমাত্র ভিত।”
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, রাশেদ সাহেবের এই মূল বক্তব্যটি বঙ্কিমচন্দ্রের চতুর্থ উপদেশের আদর্শিক অবস্থানকে পুরোপুরি সমর্থন করে। বঙ্কিমচন্দ্র যেভাবে সত্যকে সাহিত্যের মূল চালিকাশক্তি বলেছেন, রাশেদ সাহেবও সেভাবেই তানভীরকে সত্যের পথে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। অতএব, রাশেদ সাহেবের বার্তাটি বঙ্কিমচন্দ্রের উপদেশের সত্যতারই পুনর্ব্যক্ত রূপ।
সৃজনশীল প্রশ্ন ৫
উদ্দীপক:
রবিউল তার নতুন লেখা গল্পটিতে প্রচুর কঠিন সংস্কৃত শব্দ ও রূপক ব্যবহার করেছে। তার ধারণা ছিল, যত বেশি অলংকার ও কঠিন শব্দ ব্যবহার করা যাবে, গল্প তত উন্নতমানের হবে। কিন্তু তার বন্ধুরা গল্পটি পড়ে বলল, “লেখাটি এতই জটিল হয়েছে যে মূল গল্পটা বোঝা যাচ্ছে না, যেন জোর করে রূপক বসানো হয়েছে।”
- (ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পেশাগত জীবনে কী ছিলেন?
- (খ) “অনুকরণে দোষগুলি অনুকৃত হয়, গুণগুলি হয় না”— কথাটি বুঝিয়ে লেখো।
- (গ) রবিউলের লেখায় প্রবন্ধের কোন ভুলটি ফুটে উঠেছে? ব্যাখ্যা করো।
- (ঘ) “রবিউলের উচিত বঙ্কিমচন্দ্রের অলংকার সংক্রান্ত প্রাচীন ও নতুন বিধির অনুসরণ করা”— উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।
৫ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) পেশাগত জীবনে তিনি একজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।
(খ) কোনো সফল লেখকের অন্ধ অনুকরণ করতে গেলে তাঁর লেখার মূল গুণ বা আত্মাকে ছোঁয়া যায় না; বরং তাঁর শৈলীর বাহ্যিক দুর্বলতা বা দোষগুলোই অজান্তে অনুকরণকারীর লেখায় চলে আসে। তাই বঙ্কিমচন্দ্র কাউকে অন্ধ অনুকরণ করতে বারণ করেছেন।
(গ) রবিউলের লেখায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের সপ্তম ও অষ্টম উপদেশে বর্ণিত ‘অসংযত ও অনাবশ্যক অলংকার প্রয়োগ করার ভুলটি’ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে অলংকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়া নিয়মের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, রচনায় জোর করে অলংকার (যেমন কঠিন শব্দ, জটিল রূপক, সমাসবদ্ধ পদ) বসানোর চেষ্টা করা কদর্য ও অনুচিত। অলংকার যদি রচনার ভাবের সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে না আসে, তবে তা ব্যবহার না করাই শ্রেয়। জোরপূর্বক অলংকার প্রয়োগ করলে রচনার স্বাভাবিক প্রাঞ্জলতা নষ্ট হয় এবং মূল বিষয়বস্তু ঢাকা পড়ে যায়।
উদ্দীপকের রবিউল মনে করেছিল প্রচুর কঠিন সংস্কৃত শব্দ ও রূপক ব্যবহার করলেই তার গল্প উন্নতমানের হবে। কিন্তু কৃত্রিম অলংকার দেওয়ার ফলে তার গল্পটি এতই জটিল ও দুর্বোধ্য হয়ে পড়েছে যে বন্ধুরা মূল গল্পটিই বুঝতে পারছে না। রবিউলের এই জোরপূর্বক অলংকার প্রীতি বঙ্কিমচন্দ্র নির্দেশিত অলংকার ব্যবহারের ভুলের সাথেই মিলে যায়।
(ঘ) রবিউল যদি তার লেখার গুণগত মান বাড়াতে চায় এবং জটিলতা দূর করতে চায়, তবে বঙ্কিমচন্দ্রের বর্ণিত অলংকার ব্যবহারের প্রাচীন ও নতুন বিধি অনুসরণ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রবন্ধের অষ্টম উপদেশে অলংকার পরিমার্জনের দুটি চমৎকার নিয়মের উল্লেখ করেছেন। প্রাচীন পণ্ডিতদের মতে নিয়মটি হলো— রচনায় কোনো অলংকার বা রূপক ব্যবহারের পর যদি মনে হয় তা খুব সুন্দর হয়েছে, তবে সেটি কেটে বাদ দেওয়াই ভালো। আর বঙ্কিমচন্দ্রের নিজস্ব বিধি হলো— ওই অলংকারযুক্ত অংশটি বারবার বন্ধুদের পড়ে শোনানো উচিত। যদি বন্ধুদের পড়ে শোনাতে লজ্জা করে বা বন্ধুরা তা কৃত্রিম ও জটিল মনে করে, তবে সঙ্গে সঙ্গে তা কেটে ফেলা উচিত।
উদ্দীপকের রবিউল তার লেখায় অসংযতভাবে রূপক বসিয়ে গল্পটিকে জটিল করে ফেলেছে। তার বন্ধুরা স্পষ্ট জানিয়েছে যে লেখাটি বুঝে আসছে না। রবিউল যদি বঙ্কিমচন্দ্রের বিধি মেনে ওই জটিল রূপক ও কঠিন শব্দযুক্ত অংশগুলো তার বন্ধুদের পড়ে শোনাত, তবে সে বুঝতে পারত যে তা গল্পের প্রাঞ্জলতা নষ্ট করছে।
বন্ধুদের মন্তব্যের পর বঙ্কিমচন্দ্রের নিয়ম মেনে সে যদি অপ্রয়োজনীয় অলংকারগুলো কেটে বাদ দিত, তবে গল্পটি সহজ, সুন্দর ও অর্থবহ হয়ে উঠত। অতএব, নিজের রচনাকে প্রাণবন্ত ও প্রাঞ্জল করতে রবিউলের বঙ্কিমচন্দ্রের প্রাচীন ও নতুন বিধি মেনে চলা একান্ত অপরিহার্য।
সৃজনশীল প্রশ্ন ৬
উদ্দীপক:
নবীন প্রাবন্ধিক ফাহিম একটি সামাজিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখল। তবে এতে যেসব তথ্য উপস্থাপন করা হলো, তার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা সূত্র সে দিতে পারল না। পাঠকেরা লেখার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে সে বলল, “আমি যা বুঝেছি তাই লিখেছি, প্রমাণের কী দরকার?”
- (ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কত খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন?
- (খ) “প্রমাণগুলি হাতে থাকা চাই”— বঙ্কিমচন্দ্র কেন এই কথা বলেছেন?
- (গ) ফাহিমের মনোভাবের সাথে প্রবন্ধের কোন উপদেশের বৈপরীত্য দেখা যায়? ব্যাখ্যা করো।
- (ঘ) “ফাহিমের মতো লেখকদের দায়িত্বহীনতা সাহিত্য ও সমাজের ক্ষতি সাধন করে”— প্রবন্ধের আলোকে মতামত দাও।
৬ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে।
(খ) লেখায় যে তথ্য বা দাবি করা হয়, তার পেছনে যেন লেখকের কাছে সত্য ও নির্ভরযোগ্য যুক্তি বা প্রমাণ তৈরি থাকে—তা নিশ্চিত করতেই বঙ্কিমচন্দ্র এটি বলেছেন। সব সময় রচনায় প্রমাণ না দেখালেও লেখককে তার সত্যতার বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে হবে।
(গ) ফাহিমের মনোভাবের সাথে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধের দ্বাদশ উপদেশের সুস্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায়।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর দ্বাদশ উপদেশে লেখকদের সত্যনিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন— “যে কথার প্রমাণ দিতে পারিবে না, তা লিখিও না।” একজন প্রাবন্ধিক বা লেখকের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো তিনি লেখায় যে দাবি বা তথ্য উপস্থাপন করবেন, তার পেছনে অকাট্য প্রমাণ রাখা। প্রমাণ ছাড়া মনগড়া তথ্য প্রকাশ করলে লেখকের বিশ্বাসযোগ্যতা ধসে পড়ে এবং পাঠক সমাজ ভুল বার্তা পায়।
উদ্দীপকের নবীন প্রাবন্ধিক ফাহিম একটি সামাজিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখলেও তাতে উপস্থাপিত তথ্যের কোনো প্রমাণ বা উৎস দিতে পারেনি। পাঠকেরা যখন প্রমাণের দাবি তুলেছে, তখন সে দায়িত্বহীনভাবে বলেছে, “আমি যা বুঝেছি তাই লিখেছি, প্রমাণের কী দরকার?” প্রমাণের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার এই মানসিকতা বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বাদশ উপদেশের সম্পূর্ণ বিপরীত।
(ঘ) ফাহিমের মতো দায়িত্বহীন ও প্রমাণহীন তথ্য পরিবেশনকারী লেখকেরা সাহিত্যের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে এবং সমাজকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেয়। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধের নীতিমালার ভিত্তিতে উক্তিটি শতভাগ সত্য।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, সাহিত্য হলো একটি জাতির ভরসার জায়গা। লেখক যখন কোনো বিষয়ে মন্তব্য বা গবেষণা প্রকাশ করেন, সাধারণ পাঠক তা সত্য বলেই ধরে নেয়। তাই লেখক যদি কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই কাল্পনিক বা ভুল তথ্য উপস্থাপন করেন, তবে সমাজের মানুষ ভুল পথে চালিত হয়। সাহিত্য তখন তার সততা ও বস্তুনিষ্ঠতা হারিয়ে ফেলে।
উদ্দীপকের ফাহিম গবেষণামূলক প্রবন্ধের মতো একটি দায়িত্বশীল ক্ষেত্রেও প্রমাণের তোয়াক্কা না করে মনগড়া তথ্য প্রকাশ করেছে। তার এই যুক্তিহীন “প্রমাণের কী দরকার?” মনোভাব পাঠকদের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াবে এবং সত্যের অপলাপ ঘটাবে। এতে পাঠকেরা সাহিত্যিকের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে।
সুতরাং বলা যায়, যে সাহিত্য প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, তা সমাজকে কোনো আলো দিতে পারে না; বরং ভুল বার্তা ছড়িয়ে ক্ষতিসাধন করে। বঙ্কিমচন্দ্র এ কারণেই প্রমাণহীন কথা লিখতে বারণ করেছিলেন। তাই ফাহিমের মতো প্রমাণের গুরুত্ব না দেওয়া লেখকদের আচরণ নিঃসন্দেহে সাহিত্য ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
সৃজনশীল প্রশ্ন ৭
উদ্দীপক:
তরুণ লেখক নাবিল বিশ্ববিখ্যাত এক ঔপন্যাসিকের লেখার ধরন খুব পছন্দ করে। সে তার নিজের নতুন উপন্যাসে ওই লেখকের প্লট, বাক্যের গঠন এবং চরিত্র চিত্রণ হুবহু নকল করার চেষ্টা করল। ফলে নাবিলের নিজস্ব কোনো পরিচয় বা মৌলিকতা লেখায় ফুটে উঠল না।
- (ক) বঙ্কিমচন্দ্রের মতে সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার কোনটি?
- (খ) রচনায় অসত্য ও পরনিন্দাকে বঙ্কিমচন্দ্র কেন ‘মহাপাপ’ বলেছেন?
- (গ) উদ্দীপকের নাবিলের কাজে ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধের কোন নিষেধাজ্ঞার প্রতিফলন ঘটেছে?
- (ঘ) “অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং স্বকীয়তাই সাহিত্যের সার্থকতা”— নাবিলের অভিজ্ঞতা ও প্রবন্ধের আলোকে বক্তব্যটি মূল্যায়ন করো।
৭ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) সরলতা।
(খ) সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে মনুষ্যজাতির মঙ্গল করা এবং সত্য প্রকাশ করা। কিন্তু কেউ যদি লেখনীকে অন্যের ক্ষতিসাধন (পরপীড়ন), অসত্য ভাষণ বা পরনিন্দার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তবে তা সাহিত্যের পবিত্রতাকে নষ্ট করে বলেই একে মহাপাপ বলা হয়েছে।
(গ) উদ্দীপকের নাবিলের কাজের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধের একাদশ উপদেশে বর্ণিত ‘অনুকরণ না করা’র নিষেধাজ্ঞার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে নতুন লেখকদের উদ্দেশ্যে একাদশ উপদেশে স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন— “অনুকরণ করিও না।” তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, অন্য কোনো বিখ্যাত লেখকের স্টাইল অনুকরণ করতে গেলে কখনো তাঁর মূল গুণগুলো বা শক্তি অর্জন করা যায় না। বরং অন্ধ অনুকরণের ফলে সেই বিখ্যাত লেখকের শৈলীর ভুল বা দোষগুলোই নিজের লেখায় অজান্তে চলে আসে। সাহিত্যিকের প্রধান সম্পদ হলো তাঁর নিজস্ব ভাব ও মৌলিকতা।
উদ্দীপকের তরুণ লেখক নাবিল বিশ্ববিখ্যাত ঔপন্যাসিকের শৈলী পছন্দ করে তার উপন্যাসের প্লট, বাক্য গঠন ও চরিত্র হুবহু নকল করার চেষ্টা করেছে। এর ফলে নাবিলের নিজস্ব কোনো মৌলিকতা ফুটে ওঠেনি। নাবিলের এই অন্ধ অনুকরণ বঙ্কিমচন্দ্রের অনুকরণবিরোধী নিষেধাজ্ঞার প্রতিফলন ঘটায়।
(ঘ) অনুকরণ মানুষকে অন্যের ছায়া বানিয়ে রাখে, আর স্বকীয়তা লেখককে সৃষ্টিশীলতার অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। নাবিলের ব্যর্থতা ও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধের আলোকে প্রশ্নোক্ত বক্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সত্য।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মনে করতেন, সাহিত্যিকের নিজস্ব একটি কণ্ঠস্বর থাকা উচিত। তিনি নব্য লেখকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, “অমুক লেখক এরূপ লিখিয়াছেন, আমিও সেইরূপ লিখিব”—এই চিন্তা মনে স্থান দেওয়া কদাপি উচিত নয়। কারণ অন্যকে নকল করতে গেলে লেখকের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা লোপ পায়। কালজয়ী সাহিত্যিকেরা কখনোই অন্যকে অনুকরণ করে বিখ্যাত হননি, বরং নিজেদের মৌলিক সৃষ্টির মাধ্যমেই সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
উদ্দীপকের নাবিল এক বিখ্যাত ঔপন্যাসিককে হুবহু অনুকরণ করতে গিয়ে নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে তার লেখাটি একটি নিষ্প্রাণ নকলে পরিণত হয়েছে, যা পাঠকের মন জয় করতে ব্যর্থ। সে যদি অন্যের শৈলী নকল না করে নিজের মতো করে উপন্যাস লিখত, তবে তাতে তার নিজস্ব চিন্তা ও স্বকীয়তা ফুটে উঠত।
পরিশেষে বলা যায়, অন্ধ অনুকরণ সাহিত্যকে রুগ্ণ করে তোলে, আর স্বকীয়তাই সাহিত্যকে দান করে প্রাণবন্ত সার্থকতা। নাবিল অনুকরণ করে যা হারিয়েছে, স্বকীয়তা বজায় রাখলে তা অর্জন করতে পারত। তাই বলা যায়, অন্ধ অনুকরণে সাহিত্যের মৃত্যু ঘটে, স্বকীয়তাই সাহিত্যের সার্থকতা।
সৃজনশীল প্রশ্ন ৮
উদ্দীপক:
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবরিনা একটি প্রতিযোগিতার জন্য প্রবন্ধ লিখল। সে তার লেখায় খুব সাধারণ বিষয়কেও এত কঠিন ও সাধু ভাষার অলংকারে মুড়িয়ে লিখল যে সাধারণ বিচারকদের তা বুঝতে বেগ পেতে হলো। বিচারকরা মন্তব্য করলেন, “সহজ কথা সহজভাবে বলতে পারাই আসল দক্ষতা।”
- (ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ইংরেজি উপন্যাসটির নাম কী?
- (খ) “লেখা ভালো হইলে যশ আপনি আসিবে”— বুঝিয়ে লেখো।
- (গ) উদ্দীপকের বিচারকদের মন্তব্য প্রবন্ধের কোন মূল ভাবের সাথে মিলে যায়?
- (ঘ) “সাবরিনার লেখার শৈলী বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যরীতির বিপরীত”— উক্তিটির যথার্থতা নিরূপণ করো।
৮ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) Rajmohan’s Wife।
(খ) লেখকদের যশের (খ্যাতির) পেছনে ছোটা উচিত নয়। রচনার মান যদি ভালো হয়, তবে পাঠক তা সানন্দে গ্রহণ করবে এবং খ্যাতি বা সুনাম স্বাভাবিক নিয়মেই লেখকের কাছে চলে আসবে।
(গ) উদ্দীপকের বিচারকদের মন্তব্যটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের দশম উপদেশে বর্ণিত “সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার সরলতা”— এই মূল ভাবের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে সাহিত্য রচনার সর্বপ্রধান গুণ হিসেবে প্রাঞ্জলতা এবং শ্রেষ্ঠ অলংকার হিসেবে সরলতাকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, সহজ-সরল ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করাই সাহিত্যিকের আসল কারিশমা। যা সহজে বলা যায়, তাকে জটিল শব্দ বা কৃত্রিম আড়ম্বর দিয়ে পেঁচানো সাহিত্যিকের কাজ নয়। যে লেখক সোজা কথায় নিজের চিন্তা পাঠককে বোঝাতে পারেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে শ্রেষ্ঠ লেখক।
উদ্দীপকের সাবরিনা একটি খুব সাধারণ বিষয়কে অত্যন্ত কঠিন ও সাধু ভাষার অলংকারে মুড়িয়ে লিখে জটিল করে ফেলেছিল। বিচারকেরা তার সেই কৃত্রিমতাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “সহজ কথা সহজভাবে বলতে পারাই আসল দক্ষতা।” বিচারকদের এই বক্তব্যটি বঙ্কিমচন্দ্রের সরলতার নীতিরই হুবহু প্রতিফলন।
(ঘ) সাবরিনার কৃত্রিম ও আড়ম্বরপূর্ণ লেখার ধরন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশিত সাবলীল সাহিত্যরীতির সম্পূর্ণ বৈপরীত্য বহন করে। তাই উক্তিটি একেবারেই যথার্থ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধে অসংযত অলংকার, কঠিন ভাষার আস্ফালন এবং কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশ হলো— ভাষা হতে হবে প্রাঞ্জল এবং ভাব প্রকাশের মাধ্যম হতে হবে সরল। জোর করে অলংকার গোঁজা বা সহজ কথাকে কঠিন ভাষায় রূপ দেওয়া রচনার সৌন্দর্য নষ্ট করে এবং পাঠককে দূরে ঠেলে দেয়।
উদ্দীপকের সাবরিনা মনে করেছিল প্রাঞ্জল ভাষার চেয়ে কঠিন অলংকার ও সাধু ভাষার শব্দ ব্যবহার করলেই বোধহয় লেখাটি চমৎকার হবে। কিন্তু তার এই ধারণার ফলে রচনাটি দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে এবং বিচারকেরা তা বুঝতে হিমশিম খান। সাবরিনা রচনার প্রধান গুণ ‘প্রাঞ্জলতা’কে বিসর্জন দিয়ে কৃত্রিম আড়ম্বরকে বেছে নিয়েছে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বঙ্কিমচন্দ্র যেখানে সহজ কথা সহজভাবে বলার (সরলতা) পক্ষে মত দিয়েছেন, সেখানে সাবরিনা কঠিন ভাষার আড়ালে ভাব লুকিয়ে ফেলেছে। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যরীতির মূল শর্তই হলো প্রাঞ্জলতা ও সরলতা, যার লেশমাত্র সাবরিনার লেখায় ছিল না। তাই সাবরিনার লেখার শৈলী বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যরীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
সৃজনশীল প্রশ্ন ৯
উদ্দীপক:
রশীদ সাহেব একটি লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক। তিনি তরুণ লেখকদের পরামর্শ দেন, “তোমরা যদি সাহিত্যকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানাও, তবে পাঠকদের নিম্নমানের রুচির কাছে মাথা নত করতে হবে। এতে সাহিত্যের বস্তুনিষ্ঠতা নষ্ট হবে।”
- (ক) ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধটি বঙ্কিমচন্দ্রের কোন গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত?
- (খ) ইউরোপের দৃষ্টান্ত দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র লেখকদের কী সতর্কবার্তা দিয়েছেন?
- (গ) রশীদ সাহেবের কথাগুলো উদ্দীপক ও প্রবন্ধের কোন সাধারণ বিষয়কে প্রকাশ করে?
- (ঘ) “রশীদ সাহেবের বার্তাটি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রারম্ভিক উপদেশেরই বাস্তব রূপায়ন”— আলোচনা করো।
৯ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।
(খ) ইউরোপে টাকার জন্য অনেকে লেখেন এবং টাকা পান, কারণ সেখানে পাঠকসমাজ উন্নত। কিন্তু আমাদের দেশে অর্থের উদ্দেশ্যে লিখতে গেলে সাধারণ পাঠকদের নিম্ন রুচিকে সন্তুষ্ট করার প্রবৃত্তি (লোকরঞ্জন) প্রবল হয়ে ওঠে, যা রচনার মান নষ্ট করে।
(গ) রশীদ সাহেবের কথাগুলো উদ্দীপক ও প্রবন্ধের ‘অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে সাহিত্য চর্চা করার নেতিবাচক ফল’-এর মতো সাধারণ বিষয়কে প্রকাশ করে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রবন্ধের প্রথম ও দ্বিতীয় উপদেশে নতুন লেখকদের অর্থের লোভে লিখতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, কেবল টাকা উপার্জনের লক্ষ্য নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করতে গেলে লেখককে সাধারণ পাঠকদের নিচু রুচিকে সন্তুষ্ট করার পথ বেছে নিতে হয়, যাকে তিনি ‘লোকরঞ্জন প্রবৃত্তি’ বলেছেন। এর ফলে রচনার বস্তুনিষ্ঠতা, সত্যতা ও সার্বিক মান বিকৃত হয়ে পড়ে এবং সাহিত্য তার নৈতিক মর্যাদা হারায়।
উদ্দীপকের লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক রশীদ সাহেবও ঠিক একই আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি তরুণ লেখকদের সতর্ক করে বলেছেন যে, সাহিত্যকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানালে পাঠকদের নিম্নমানের রুচির কাছে মাথা নত করতে হবে, যা সাহিত্যের বস্তুনিষ্ঠতা নষ্ট করবে। এই বক্তব্যটি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রারম্ভিক উপদেশের সারমর্মকেই ফুটিয়ে তোলে।
(ঘ) রশীদ সাহেবের তরুণ লেখকদের প্রতি উপদেশ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের প্রথম ও দ্বিতীয় উপদেশের বাস্তব সত্যতাকেই ফুটিয়ে তোলে। তাই উক্তিটি অত্যন্ত সঙ্গতিপূর্ণ।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধ শুরুই করেছেন নতুন লেখকদের উদ্দেশ্যে এই বলে— “যশের জন্য লিখিবেন না” এবং ” টাকার জন্য লিখিবেন না”। তিনি ইউরোপের সাথে আমাদের দেশের পাঠকদের তুলনা করে বলেছেন, ইউরোপে অর্থের উদ্দেশ্যে লিখেও ভালো সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব, কারণ সেখানকার পাঠকসমাজ সচেতন। কিন্তু আমাদের দেশে অর্থের লোভে লিখতে গেলে পাঠকদের নিচু রুচির চটকদার চাহিদা মেটাতে গিয়ে সাহিত্যের মূল সত্য ও সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। সাহিত্যিক তখন নিছক পণ্যের বিক্রেতায় পরিণত হন।
উদ্দীপকের রশীদ সাহেব বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তরুণদের এই একই শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি দেখেছেন, অর্থের পেছনে ছুটলে লেখককে পাঠকদের মানহীন রুচির কাছে আপস করতে হয়, যার ফলে সাহিত্যের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। তিনি তরুণদের এই আত্মঘাতী পথ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র ১৯ শতকে সাহিত্যকে বাণিজ্যের হাত থেকে রক্ষার জন্য যে প্রারম্ভিক উপদেশগুলো দিয়েছিলেন, রশীদ সাহেবের বার্তাটি ঠিক সেই সত্যটিকেই আধুনিক প্রেক্ষাপটে প্রমাণ করে। রশীদ সাহেব যেন বঙ্কিমচন্দ্রের নীতিমালাকেই নতুন লেখকদের সামনে বাস্তব সতর্কবার্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সৃজনশীল প্রশ্ন ১০
উদ্দীপক:
লেখক শাহেদ একটি নতুন থ্রিলার উপন্যাস লিখলেন। লেখা শেষ হওয়ার পরেই তাঁর মনে হলো কয়েকটি অধ্যায়ে জোর করে হাসির উপাদান ঢোকানো হয়েছে, যা মূল কাহিনীর গতি নষ্ট করছে। তিনি লেখাটি ড্রয়ারে রেখে দিলেন এবং দুই মাস পর বের করে ওই অপ্রাসঙ্গিক হাসির দৃশ্যগুলো কেটে বাদ দিয়ে উপন্যাসটি চূড়ান্ত করলেন।
- (ক) ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র কয়টি উপদেশ দিয়েছেন?
- (খ) “ধর্মবিরুদ্ধ অসত্য বা পরপীড়ন রচনার উদ্দেশ্য হইতে পারে না”— বুঝিয়ে লেখো।
- (গ) শাহেদের লেখাটি ড্রয়ারে রেখে দেওয়ার বিষয়টি প্রবন্ধের কোন নিয়মের প্রতিফলন?
- (ঘ) “শাহেদ বঙ্কিমচন্দ্রের একজন আদর্শ অনুসারী প্রাবন্ধিক/লেখক”— উদ্দীপক ও প্রবন্ধের আলোকে মন্তব্যটি যাচাই করো।
১০ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) ১৩টি উপদেশ দিয়েছেন।
(খ) সাহিত্য চর্চার মূল লক্ষ্য হলো মানবকল্যাণ। কিন্তু কোনো লেখা যদি অধর্ম, অসত্য তথ্য বা অন্যকে কষ্ট দেওয়ার (পরপীড়ন) উদ্দেশ্যে লেখা হয়, তবে তা সাহিত্যের নীতি ও নৈতিকতাবিরোধী কাজ হিসেবে গণ্য হয়।
(গ) শাহেদের লেখাটি ড্রয়ারে রেখে দেওয়ার বিষয়টি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের তৃতীয় উপদেশ— “কাব্য নাটক উপন্যাস ব্যতীত অন্য রচনা শেষ হইবামাত্র প্রকাশ করা ভালো নহে, কিছুকাল ফেলিয়া রাখা ভালো”— এর সরাসরি প্রতিফলন।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে সাহিত্য পরিমার্জনের একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, রচনা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তা প্রেসে পাঠানো অনুচিত। লেখাটি কিছুদিন বন্ধ করে রেখে দিলে লেখকের আবেগ থিতিয়ে আসে। কিছুদিন পর নিজের লেখা নিজে পড়লে রচনার ভুলভ্রান্তি, অসংগতি কিংবা অনাবশ্যক অংশগুলো লেখকের নিজস্ব বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে ধরা পড়ে।
উদ্দীপকের লেখক শাহেদ তাঁর থ্রিলার উপন্যাসটি শেষ করার পর তাড়াহুড়ো করে প্রকাশ না করে দুই মাসের জন্য ড্রয়ারে রেখে দেন। এই সময় পার হওয়ার পর তিনি যখন উপন্যাসটি পুনরায় পড়েন, তখন জোর করে বসানো হাসির দৃশ্যগুলো তাঁর চোখে ধরা পড়ে। শাহেদের এই ধৈর্য ও পদ্ধতি বঙ্কিমচন্দ্রের তৃতীয় নিয়মেরই হুবহু প্রয়োগ।
(ঘ) শাহেদ যেভাবে আত্মপর্যালোচনা ও বর্জনের মাধ্যমে তাঁর উপন্যাস পরিমার্জন করেছেন, তা তাঁকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক আদর্শের একজন যোগ্য ও সচেতন অনুসারী হিসেবে প্রমাণ করে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রবন্ধে রচনার উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রধানত দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন: প্রথমত, লেখা শেষ করে কিছুদিন গচ্ছিত রেখে পরিমার্জন করা (৩ নম্বর উপদেশ); এবং দ্বিতীয়ত, অনাবশ্যক বা অসংযত ব্যঙ্গ-রসিকতা ও অলংকার রচনার স্বার্থে কেটে ফেলা (৮ নম্বর উপদেশ)। বঙ্কিমচন্দ্র স্পষ্ট বলেছিলেন, রচনায় জোর করে হাস্যরস বা অলংকার প্রয়োগ করলে তা কদর্য দেখায়, তাই তা বাদ দেওয়াই শ্রেয়।
উদ্দীপকের শাহেদ একজন সতর্ক লেখক। তিনি উপন্যাস শেষ করে দুই মাস ড্রয়ারে রেখে বঙ্কিমচন্দ্রের তৃতীয় উপদেশ পালন করেছেন। এরপর পুনরায় পড়ার সময় যখন দেখলেন যে কয়েকটি অধ্যায়ে জোর করে হাসির উপাদান ঢোকানো হয়েছে যা কাহিনীর গতি নষ্ট করছে, তখন তিনি নির্দ্বিধায় সেগুলো কেটে বাদ দিয়ে মূল কাহিনীর প্রাঞ্জলতা ফিরিয়ে আনেন। এর মাধ্যমে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের অষ্টম উপদেশটিও অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।
সুতরাং, শাহেদ কেবল আবেগ দিয়ে লেখেননি, বরং বঙ্কিমচন্দ্রের মতো বিচারবুদ্ধি দিয়ে নিজের লেখাকে নিখুঁত করেছেন। একজন আদর্শ লেখকের মতো তিনি অনাবশ্যক অংশ বাদ দিয়ে সাহিত্যের মান রক্ষা করেছেন। তাই তাঁকে বঙ্কিমচন্দ্রের আদর্শ অনুসারী লেখক বলা সম্পূর্ণ যথার্থ ও যুক্তিযুক্ত।
সৃজনশীল প্রশ্ন ১১
উদ্দীপক:
তরুণ লেখক প্রান্ত আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখল। কিন্তু নিবন্ধজুড়ে সে জার্মান ও স্প্যানিশ ভাষার বেশ কিছু কঠিন ফ্র্যাজ বা শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করল, যার অর্থ সে নিজেও ভালো করে বোঝে না। কেবল লেখাটিকে ‘হাই-স্ট্যান্ডার্ড’ দেখানোর জন্যই সে এ কাজ করেছে।
- (ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কত সালে বিএ পাস করেন?
- (খ) বঙ্কিমচন্দ্রের মতে কারা নীচ ব্যবসায়ীদের সমতুল্য?
- (গ) প্রান্তের লেখার প্রবৃত্তিটি ‘বাঙালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধের কোন নিষিদ্ধ কাজকে চিহ্নিত করে?
- (ঘ) “প্রান্তের মতো লেখকদের মানসিকতা রচনার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও মাধুর্য বিনষ্ট করে”— প্রবন্ধের আলোকে উক্তিটি পর্যালোচনা করো।
১১ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) ১৮৫৮ সালে।
(খ) যাঁরা সত্য ও ধর্মের তোয়াক্কা না করে কেবল অর্থ উপার্জন, নাম-যশ বা লোকরঞ্জনের উদ্দেশ্যে সাহিত্য রচনা করেন, তাঁদের বঙ্কিমচন্দ্র যাত্রাওয়ালার মতো নীচ ব্যবসায়ীদের সমতুল্য বলেছেন।
(গ) প্রান্তের লেখার প্রবৃত্তিটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের ষষ্ঠ উপদেশে বর্ণিত ‘যে ভাষা জানা নাই, সেই ভাষা হইতে উদ্ধৃতি দেওয়া অনুচিত’ সংক্রান্ত নিষিদ্ধ কাজটিকে চিহ্নিত করে।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ষষ্ঠ উপদেশে রচনায় পাণ্ডিত্য জাহির করার ভণ্ডামির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, যেসব ভাষা লেখক নিজে ভালো করে জানেন না বা বোঝেন না, অন্য কোনো অভিধান বা রচনার সাহায্য নিয়ে সেই অজানা ভাষার শব্দ বা কোটেশন লেখনীতে গোঁজা চরম অনুচিত। এটি লেখকের অহংকার ও বিদ্যার ভান প্রদর্শন করে মাত্র, যা রচনার স্বাভাবিক প্রাঞ্জলতা নষ্ট করে এবং সচেতন পাঠকের কাছে লেখককে হাস্যকর করে তোলে।
উদ্দীপকের তরুণ লেখক প্রান্ত আন্তর্জাতিক ঘটনা নিয়ে লিখতে গিয়ে নিবন্ধজুড়ে জার্মান ও স্প্যানিশ ভাষার কঠিন কিছু শব্দ ও বাক্যাংশ ব্যবহার করেছে, যার অর্থ সে নিজেও ভালো করে বোঝে না। কেবল লেখাকে তথাকথিত ‘হাই-স্ট্যান্ডার্ড’ দেখানোর অপচেষ্টায় সে এ কাজ করেছে, যা বঙ্কিমচন্দ্রের ষষ্ঠ নিষেধকে সরাসরি চিহ্নিত করে।
(ঘ) রচনায় নিজের না-জানা ভাষার অনর্থক ব্যবহার বা কৃত্রিমতা সাহিত্যের সহজ ভাব ও মাধুর্যকে ধ্বংস করে। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধের আলোকে উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সত্য।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মনে করতেন, সাহিত্যের মূল প্রাণ হলো তার ‘প্রাঞ্জলতা’ বা স্পষ্টতা। লেখক যা বলতে চান, তা যেন পাঠক কোনো বাধা ছাড়াই বুঝতে পারেন। কিন্তু প্রান্তের মতো লেখকেরা যখন নিজেদের বিদ্যা জাহির করতে গিয়ে অহেতুক অজানা বিদেশি ভাষা বা কঠিন শব্দ রচনায় প্রয়োগ করেন, তখন বাক্যের প্রবাহ থমকে যায়। পাঠক রচনার মূল ভাব থেকে বিচ্যুত হয়ে শব্দের জালে হারিয়ে যান।
উদ্দীপকের প্রান্ত যে কাজ করেছে, তা রচনার মান বাড়ায়নি; বরং নিবন্ধটিকে সাধারণ পাঠকের জন্য দুর্বোধ্য ও কৃত্রিম করে তুলেছে। না বুঝে বিদেশি ভাষার কোটেশন দেওয়ার ফলে লেখার স্বাভাবিক সাবলীলতা নষ্ট হয়েছে। এটি বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় “বিদ্যাপ্রকাশের চেষ্টা”, যা পাঠকের মনে বিরক্তি উৎপন্ন করে।
সুতরাং বলা যায়, বিদ্যা বা ভাষাজ্ঞান জাহির করার এই ভণ্ডামী মানসিকতা সাহিত্যকে সুন্দর করে না, বরং তাকে রুগ্ণ ও দুর্বোধ্য করে তোলে। প্রান্ত যদি সহজ ভাষায় বিষয়বস্তু উপস্থাপন করত, তবেই রচনার সৌন্দর্য বজায় থাকত। তাই প্রান্তের মতো লেখকদের এই আড়ম্বরপূর্ণ মানসিকতা রচনার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও মাধুর্য বিনষ্ট করে— এ কথা নিদ্বির্ধায় বলা যায়।
সৃজনশীল প্রশ্ন ১২
উদ্দীপক:
শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে বললেন, “একটি ভালো দেশের মূল ভিত্তি যেমন তার নীতিবান নাগরিক, তেমনি একটি উন্নত জাতির ভরসা হলো তার সুশীল সাহিত্য। সাহিত্যিকদের সততার ওপর একটি ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।”
- (ক) ১৯ শতকে বঙ্কিমচন্দ্রের সময়ে ‘বাংলা’ শব্দটি কীভাবে লেখা হতো?
- (খ) “বাঙ্গালা সাহিত্য, ঘণ্টার ভরসা”— কথাটির অর্থ কী?
- (গ) উদ্দীপকের শিক্ষকের বক্তব্যটি প্রবন্ধের কোন শেষ ভাবনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ?
- (ঘ) “শিক্ষকের মন্তব্যটি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধের সার্বিক উদ্দেশ্যেরই সারসংক্ষেপ”— যুক্তি দাও।
১২ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) ‘বাঙ্গালা’ হিসেবে লেখা হতো।
(খ) ‘বাঙ্গালা সাহিত্যই বাংলার ভরসা’— কথাটির মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র বুঝিয়েছেন যে, বাংলা সাহিত্যের উন্নতির ওপরই বাঙালি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক উন্নতি নির্ভর করে।
(গ) উদ্দীপকের শিক্ষকের বক্তব্যটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের একদম শেষ অনুচ্ছেদের ‘বাংলা সাহিত্যের উন্নতির ওপর বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ ও ভরসা নির্ভর করে’ সংক্রান্ত ভাবনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধের সমাপ্তি টেনেছেন একটি বড় আশাবাদ ও দায়বদ্ধতার কথা বলে। তিনি ত্রয়োদশ উপদেশের পর বলেছেন, “বাংলা সাহিত্যই বাংলা ভাষার ও বাঙালি জাতির একমাত্র আশা ও ভরসা।” যদি নব্য লেখকেরা অসত্য, লোভ ও কৃত্রিমতা ত্যাগ করে বঙ্কিমচন্দ্রের নির্দেশিত উপদেশগুলো মেনে চলেন, তবে বাংলা সাহিত্যের দ্রুত উন্নতি হবে এবং সেই উন্নত সাহিত্যের আলোতেই জাতির কল্যাণ সাধিত হবে।
উদ্দীপকের শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে বলেছেন যে, একটি দেশের মূল ভিত্তি যেমন নীতিবান নাগরিক, তেমনি উন্নত জাতির ভরসা হলো সুশীল সাহিত্য। সাহিত্যিকদের সততার ওপরই ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। শিক্ষকের এই দূরদর্শী বক্তব্যটি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধের সমাপনী ভাবনার সাথে সম্পূর্ণ মিলে যায়।
(ঘ) উদ্দীপকের শিক্ষকের উক্তিটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধটি রচনার নেপথ্য দর্শন ও সার্বিক লক্ষ্যকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই প্রবন্ধে ১৩টি উপদেশ দিয়ে কেবল কিছু ব্যাকরণগত বা রীতিনীতিগত নিয়ম সংস্কার করতে চাননি; তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল একটি নীতিবান ও দায়িত্বশীল সাহিত্যিক সমাজ গড়ে তোলা। তিনি জানতেন, লেখক যদি সৎ না হন, তবে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর সাহিত্য সৃষ্টি হবে, যা পুরো জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। তাই তিনি সাহিত্যিকদের সততা, সত্যবাদিতা, এবং সরলতার ওপর জোর দিয়েছেন, যাতে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়ে জাতির ভরসার স্থল হতে পারে।
উদ্দীপকের শিক্ষক ঠিক এই সত্যটিই উচ্চারণ করেছেন। তিনি সাহিত্যের সাথে জাতির সার্বিক উন্নতির সম্পর্ক এবং লেখকদের নৈতিক সততার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। সাহিত্যিকদের অসততা বা অপরিপক্কতা যে ভাষার ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়—শিক্ষকের এই উপলব্ধি বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তারই নামান্তর।
পরিশেষে বলা যায়, বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধের মূল সুরই ছিল সত্য ও সৎ সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য তথা বাঙালি জাতিকে বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে বসানো। শিক্ষকের সংক্ষিপ্ত মন্তব্যটি বঙ্কিমচন্দ্রের সেই মহান উদ্দেশ্যকেই নির্দেশ করে। তাই মন্তব্যটিকে প্রবন্ধের সার্বিক উদ্দেশ্যের সারসংক্ষেপ বলা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত।
সৃজনশীল প্রশ্ন ১৩
উদ্দীপক:
তরুণ প্রাবন্ধিক নাভিদ তার প্রবন্ধে সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরেছে। কিন্তু লেখাটির কোথাও সে কোনো ব্যক্তির প্রতি হিংসা প্রকাশ করেনি কিংবা কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেনি। তার লেখার লক্ষ্য শুধুই সমাজের কুসংস্কার দূর করা এবং সত্য প্রতিষ্ঠা করা।
- (ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পিতা পেশায় কী ছিলেন?
- (খ) “যশঃ কদাপি রচনার উদ্দেশ্য হইবে না”— কেন বলা হয়েছে?
- (গ) নাভিদের সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্য বঙ্কিমচন্দ্রের নির্দেশিত কোন উপদেশের অনুরূপ?
- (ঘ) “নাভিদের মতো দায়িত্বশীল লেখকদের দ্বারাই সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য সাধিত হয়”— প্রবন্ধের আলোকে মতামত দাও।
১৩ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন।
(খ) যশের পেছনে ছুটলে লেখকের মনোযোগ লেখার গুণগত মান ও সত্য প্রকাশের ওপর থেকে সরে যায়। লেখক তখন আত্ম প্রচার বা লোকরঞ্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, ফলে সাহিত্যের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
(গ) নাভিদের সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্য বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের চতুর্থ ও পঞ্চম উপদেশে নির্দেশিত ‘সত্য ও ধর্মই সাহিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য’ এবং ‘পরপীড়ন রচনার উদ্দেশ্য হইতে পারে না’— নীতিগুলোর পুরোপুরি অনুরূপ।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর চতুর্থ উপদেশে বলেছেন, সাহিত্য রচনার মূল লক্ষ্য হতে হবে সত্য এবং মানবকল্যাণ। এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো স্বার্থসিদ্ধি বা অসত্যের উদ্দেশ্যে লেখনী ধারণ করা মহাপাপ। আবার পঞ্চম উপদেশে তিনি কড়া নির্দেশ দিয়েছেন যে, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করা, হিংসা প্রকাশ করা বা কারো মনঃকষ্টের কারণ হওয়া (পরপীড়ন) সাহিত্যের উদ্দেশ্য হতে পারে না। সাহিত্য হবে কল্যাণমুখী।
উদ্দীপকের প্রাবন্ধিক নাভিদ তার প্রবন্ধে সমাজের নানা কুসংস্কার ও অসঙ্গতি তুলে ধরলেও কোনো ব্যক্তির প্রতি হিংসা প্রকাশ করেনি কিংবা কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেনি। তার একমাত্র লক্ষ্য সত্য প্রতিষ্ঠা ও সমাজ সংস্কার। নাভিদের এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বঙ্কিমচন্দ্রের চতুর্থ ও পঞ্চম উপদেশের সাথেই হুবহু মিলে যায়।
(ঘ) নাভিদের মতো সৎ, বস্তুনিষ্ঠ ও দ্বেষমুক্ত লেখকদের সাহিত্যচর্চায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাঙ্ক্ষিত সত্য ও সুন্দর সাহিত্য গড়ে তুলতে পারে। বঙ্কিমচন্দ্রের নীতিমালার ভিত্তিতে উক্তিটি শতভাগ সত্য।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, সাহিত্যের প্রধান দায়িত্ব হলো সত্য প্রকাশ করা এবং মনুষ্যজাতির মঙ্গল সাধন করা। কিন্তু অনেক লেখক নিজের ব্যক্তিগত হিংসা, বিদ্বেষ বা কাউকে অপমান করার জন্য সাহিত্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, যাকে বঙ্কিমচন্দ্র ‘পরপীড়ন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ হিসেবে গণ্য করেছেন। এ ধরনের লেখায় সাময়িক উত্তেজনা থাকলেও তা সমাজকে কোনো ইতিবাচক দিকনির্দেশনা দিতে পারে না।
উদ্দীপকের নাভিদ একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল প্রাবন্ধিক। সে সমাজের কুসংস্কার ও অসংগতি কাটাতে কলম ধরেছে, কিন্তু তার লেখায় কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা পরপীড়নের বিষ নেই। সে সত্যকে সামনে রেখে নিরপেক্ষভাবে সমাজের মঙ্গল কামনা করেছে।
বঙ্কিমচন্দ্র যেমন সাহিত্যের মাধ্যমে সত্য ও ধর্মের জয়গান গাইতে চেয়েছেন, নাভিদও ঠিক সেই পথেই হাঁটছে। এ ধরনের লেখকদের কলমেই সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ ‘সত্যের জয় ও জনকল্যাণ’ সাধিত হয়। তাই বলা যায়, নাভিদের মতো দায়িত্বশীল লেখকদের দ্বারাই সাহিত্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও সার্থকতা ফুটে ওঠে।
সৃজনশীল প্রশ্ন ১৪
উদ্দীপক:
নাসিম একজন নামকরা কলামিস্ট। সম্পাদক তাকে একটি রাজনৈতিক বিষয়ে নিবন্ধ লিখতে বললে নাসিম বিনয়ের সাথে বললেন, “এই বিষয়টি সম্পর্কে আমার গভীর পড়াশোনা বা পরিষ্কার ধারণা নেই। না জেনে আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য বা নিবন্ধ লিখতে পারব না।”
- (ক) বঙ্কিমচন্দ্র কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?
- (খ) রচনায় বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা পাঠকের কাছে কেমন লাগে এবং কেন?
- (গ) নাসিমের অস্বীকার করার বিষয়টি প্রবন্ধের কোন নীতিকে সমর্থন করে?
- (ঘ) “নাসিমের এই সততা ও সচেতনতা নব্য লেখকদের জন্য অনুকরণীয়”— প্রবন্ধের আলোকে মূল্যায়ন করো।
১৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) ১৮৩৮ সালে।
(খ) রচনায় বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা পাঠকের কাছে অতিশয় বিরক্তিকর লাগে। কারণ পাঠক রচনায় বিষয়ের প্রাঞ্জলতা দেখতে চায়, অনাবশ্যক পাণ্ডিত্য বা জোর করে কঠিন তথ্য গোঁজা দেখলে লেখার স্বাভাবিক রস নষ্ট হয়।
(গ) নাসিমের না-জেনে নিবন্ধ লিখতে অস্বীকার করার বিষয়টি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের ষষ্ঠ নীতি— “যে বিষয়ে যাহার অধিকার নাই, সে বিষয়ে তাহার হস্তক্ষেপ অকর্তব্য”— কে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে লেখকদের আত্মসংযম ও অধিকার সীমার কথা স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিটি বিষয়ের জন্য গভীর জ্ঞান ও অধ্যয়ন প্রয়োজন। কোনো বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা বা অধিকার না থাকলে কেবল সম্পাদক চেয়েছে বা নাম কামানোর সুযোগ আছে বলেই তাতে হাত দেওয়া অনুচিত। না জেনে কোনো বিষয়ে লিখতে গেলে রচনায় ভুল তথ্য চলে আসে, যা পাঠকদের বিভ্রান্ত করে এবং সাহিত্যের বিশ্বাসযোগ্যতা কমায়।
উদ্দীপকের কলামিস্ট নাসিমকে সম্পাদক একটি রাজনৈতিক বিষয়ে নিবন্ধ লিখতে বললে সে বিনীতভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে। সে স্বীকার করে যে বিষয়টিতে তার পর্যাপ্ত পড়াশোনা বা অধিকার নেই। নাসিমের এই নীতিবোধ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘অনধিকার চর্চা না করা’র উপদেশকেই হুবহু সমর্থন করে।
(ঘ) নাসিম যে আত্মসংযম ও সত্যবাদিতার পরিচয় দিয়েছে, তা আজকের নব্য লেখকদের অপূর্ণাঙ্গ সাহিত্যচর্চার বিরুদ্ধে একটি বড় শিক্ষণীয় উদাহরণ। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধের আলোকে উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আমাদের সমাজে অনেক নতুন লেখক রয়েছেন যারা অল্প জেনেই সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞের মতো মতামত দিতে শুরু করেন। বঙ্কিমচন্দ্র এই অনধিকার চর্চাকে কঠোরভাবে বর্জন করতে বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে বিষয়ে লেখকের পর্যাপ্ত পড়াশোনা বা অধিকার নেই, সে বিষয়ে কলম ধরা সাহিত্যিক অপরাধের নামান্তর। এতে ভুল ও ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়ে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উদ্দীপকের নাসিম একজন প্রতিষ্ঠিত কলামিস্ট হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে জ্ঞানের অহংকার নেই। যে বিষয়ে তার পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে লিখতে সে বিনয়ের সাথে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। নাসিমের এই পেশাদার সততা ও নৈতিক সচেতনতা বঙ্কিমচন্দ্রের ভাবনারই বাস্তব প্রতিফলন।
নাসিম যদি না জেনে কেবল নিবন্ধ লেখার খাতিরে লিখত, তবে তা বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বাদশ নীতি অর্থাৎ ‘প্রমাণহীন কথা বলা’র শামিল হতো। নাসিম তা না করে নিজের সীমানাকে সম্মান করেছে। আজ নব্য লেখকেরা যদি নাসিমের মতো এই সততা ও সচেতনতা অনুসরণ করে, তবেই সাহিত্য বিভ্রান্তিমুক্ত ও বস্তুনিষ্ঠ হবে। তাই নাসিমের এই আচরণ নব্য লেখকদের জন্য অবশ্যই অনুকরণীয়।
সৃজনশীল প্রশ্ন ১৫
উদ্দীপক:
একটি অনলাইন পোর্টালে কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে— “একজন খাঁটি লেখকের কাজ হলো সহজ ভাষায় কঠিন সত্য প্রকাশ করা, রচনায় অলংকারের বাহার দেখানো নয়।”
- (ক) বঙ্কিমচন্দ্র রচিত একমাত্র ইংরেজি উপন্যাসের নাম কী?
- (খ) বঙ্কিমচন্দ্র কেন রচনায় ব্যঙ্গ বা রসিকতা ব্যবহারে সতর্ক হতে বলেছেন?
- (গ) উদ্দীপকের বক্তব্যটি ‘বাঙালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধের কোন উপদেশের প্রতিনিধিত্ব করে?
- (ঘ) “উদ্দীপকের মূলকথাটি বঙ্কিমচন্দ্রের সমগ্র প্রবন্ধের সারমর্মকে ধারণ করে”— মতামত দাও।
১৫ নম্বর প্রশ্নের উত্তর
(ক) Rajmohan’s Wife।
(খ) ব্যঙ্গ বা রসিকতা যদি অসংযত ও অসময়ে প্রয়োগ করা হয় বা জোর করে আনা হয়, তবে তা কদর্য রূপ ধারণ করে। রচনার মূল আবেদন ও গুরুত্ব নষ্ট হয় বলেই তিনি এতে সতর্ক হতে বলেছেন।
(গ) উদ্দীপকের বক্তব্যটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের দশম উপদেশে বর্ণিত— “সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার সরলতা”— এই অমূল্য উপদেশের প্রতিনিধিত্ব করে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রবন্ধে ভাষা ও অলংকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃত্রিমতা ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রচনার প্রধান কাজ হলো নিজের মনের সত্য ও ভাবকে পাঠকের কাছে বোধগম্য করা। অলংকারের বাহ্যিক আড়ম্বর, কঠিন সংস্কৃত শব্দ বা কৃত্রিম সমাসের মহড়া দিয়ে লেখাকে জটিল করলে সাহিত্য তার প্রাণ হারায়। যে লেখক সোজা কথায় গভীর সত্য প্রকাশ করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত শিল্পী।
উদ্দীপকের কুইজ প্রতিযোগিতার মূল বার্তায় বলা হয়েছে— “একজন খাঁটি লেখকের কাজ হলো সহজ ভাষায় কঠিন সত্য প্রকাশ করা, রচনায় অলংকারের বাহার দেখানো নয়।” এই উক্তিটি বঙ্কিমচন্দ্রের নির্দেশিত অলংকারহীন সরলতার নীতিকেই প্রতিনিধিত্ব করে।
(ঘ) উদ্দীপকে যে সহজ ভাষায় সত্য প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে, তা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধের ১৩টি উপদেশের মূল দর্শনকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। তাই উক্তিটি সম্পূর্ণরূপে সত্য ও যথার্থ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পুরো প্রবন্ধটি বিশ্লেষণ করলে দুটি প্রধান ভিত্তি লক্ষ্য করা যায়: প্রথমটি হলো সাহিত্যের ‘আদর্শ’ (যা হতে হবে সত্য, ধর্ম ও জনকল্যাণ) এবং দ্বিতীয়টি হলো সাহিত্যের ‘ভাষা’ (যা হতে হবে সরল, প্রাঞ্জল ও আড়ম্বরহীন)। বঙ্কিমচন্দ্র একদিকে যেমন অসত্য, অর্থলোভ, খ্যাতি ও পরপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, অন্যদিকে অনাবশ্যক অলংকার, বিদ্যা জাহির ও কৃত্রিম ভাষার ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।
উদ্দীপকের মূলকথায় দুটি বিষয়ই চমৎকারভাবে একত্রিত হয়েছে— ‘সহজ ভাষা’ (বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষা শৈলী) এবং ‘কঠিন সত্য প্রকাশ’ (বঙ্কিমচন্দ্রের রচনার মূল উদ্দেশ্য)। অলংকারের কৃত্রিম বাহার বাদ দিয়ে সত্যের জয়গান গাওয়াই ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের নির্দেশাবলির মূল প্রতিপাদ্য।
পরিশেষে বলা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র ১৩টি ভিন্ন ভিন্ন উপদেশের মাধ্যমে নব্য লেখকদের মূলত এই একটি শিক্ষাই দিতে চেয়েছেন যে— সাহিত্যকে সত্যের ওপর দাঁড় করাতে হবে এবং তা প্রকাশের পথ হতে হবে সরল। উদ্দীপকের ছোট্ট বাক্যটি বঙ্কিমচন্দ্রের সেই বিশাল সাহিত্যদর্শনের নির্যাসকে ধারণ করে আছে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধটি কেবল সাহিত্য রচনার নিয়মাবলীই শেখায় না, বরং একজন শিক্ষার্থীকে নৈতিকতা ও সত্যনিষ্ঠার শিক্ষা দেয় । পরীক্ষায় ভালো নম্বর অর্জনের মূল চাবিকাঠি হলো পাঠ্যবইয়ের মূলভাবকে সৃজনশীল কাঠামোর (ক, খ, গ, ঘ) সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে তুলে ধরা। আশা করি, আমাদের এই “বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর” সংকলনটি আপনার পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও নিখুঁত ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে । নিয়মিত এই প্রশ্ন উত্তরগুলো অনুশীলনের মাধ্যমে আপনি পরীক্ষায় যেকোনো ঘুরিয়ে আসা উদ্দীপকের উত্তরও সহজ ও সাবলীলভাবে দিতে সক্ষম হবেন ।

