• অপরিচিতা গল্প
  • অপরিচিতা গল্পের অনুধাবন প্রশ্ন ও উত্তর: একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি

    অপরিচিতা গল্পের অনুধাবন প্রশ্ন

    একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির বাংলা ১ম পত্রের অন্যতম কালজয়ী সৃষ্টি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অপরিচিতা’ । গল্পটি যেমন তৎকালীন সমাজব্যবস্থার যৌতুকপ্রথা ও অন্ধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ, তেমনি এটি ব্যক্তিত্বহীনতার বিপরীতে আত্মমর্যাদাবোধ ও নারীশিক্ষার জয়ের এক অনন্য স্মারক । এইচএসসি বোর্ড পরীক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে উদ্দীপক নির্ভর সৃজনশীল প্রশ্নেরখ’ নম্বরের জন্য অনুধাবনমূলক প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত নম্বর নিশ্চিত করতে এবং গল্পের সূক্ষ্ম অনুভূতি, রূপক, চরিত্র বিশ্লেষণ ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরগুলো গভীরভাবে অনুধাবনের উদ্দেশ্যে ৫০টি মানসম্মত ও সম্পূর্ণ ইউনিক প্রশ্ন-উত্তর সাজানো হয়েছে । অনুশীলনের সুবিধার্থে তৈরি এই সংকলনটি শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতার বাইরে গিয়ে মূল ভাবসত্য অনুধাবনে এবং পরীক্ষায় নিখুঁত উত্তর উপস্থাপনে এক বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রাখবে ।


    অপরিচিতা গল্পের অনুধাবন প্রশ্ন

    নিচে ‘অপরিচিতা’ গল্পের উল্লেখযোগ্য কিছু অনুধাবন প্রশ্ন এবং তার উত্তর দেওয়া হলো । যা শিক্ষার্থীকে এইচএসসি বোর্ড পরীক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে নিখুঁত দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করবে ।


    ১. “মকরশৃঙ্খলের মাঝখানটাতে যে হীরেটা জ্বলজ্বল করিতেছে” — কথাটির মাধ্যমে কী বোঝানো হয়েছে?

    উত্তর: অনুপমের জীবনে তার ভাগ্নে বিনুর অসাধারণ গুরুত্ব এবং বিনুর রুচিশীল ব্যক্তিত্বকে বোঝাতে উক্তিটি করা হয়েছে।

    পারিবারিক অলংকার গড়ার কাজে শম্ভুনাথ সেনের দেওয়া গহনার খাঁটিত্ব যাচাই করতে অনুপমদের বিশ্বস্ত সেকরাকে সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল। অলংকারের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সেকরার বিচার এতটাই নিখুঁত ছিল যে, মকরমুখো সোনার বালা গড়ার শেকড়ে বসানো মূল্যবান হীরাকেও সে নিখাদ বলে রায় দেয়। একইভাবে, অনুপমের দুর্বল ও ব্যক্তিত্বহীন পরিবারের মধ্যে তার মামা ও ভাগ্নে বিনুর রুচি ও প্রভাবই ছিল প্রধান। বিনুর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও রুচিবোধ অনুপমের জীবনের বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করত—এই অবস্থান বোঝাতেই উপমাটি ব্যবহার করা হয়েছে।

    ২. অনুপমকে কেন ‘অনুপম’ বলা চলে না?

    উত্তর: অনুপমের নাম ‘অনুপম’ (যার তুলনা নেই) হলেও বাস্তব জীবনে তার ব্যক্তিত্বহীনতা ও পরনির্ভরশীলতার কারণে তাকে নামের যোগ্য বলা চলে না।

    অনুপম সুপুরুষ ও উচ্চশিক্ষিত এম.এ পাস হলেও তার স্বাধীন কোনো চিন্তাশক্তি বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। শৈশব থেকেই সে মায়ের বাধ্য সন্তান এবং সর্ব বিষয়ে মামার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল। বিয়ের সিদ্ধান্ত, যৌতুকের দরকষাকষি বা শম্ভুনাথ সেনের আপ্যায়ন বর্জন—কোনো কিছুতেই সে সত্য ও বাপের মর্যাদার পক্ষে দাঁড়াতে পারেনি। বাহ্যিক চেহারার সৌন্দর্য থাকলেও চারিত্রিক দৃঢ়তার অভাবে তার নাম অনুপম হওয়া সত্ত্বেও সে ছিল অতি সাধারণ ও ব্যক্তিত্বহীন এক পুরুষ।

    ৩. “ফল পাইবার আশা ছাড়িয়া দেওয়াই ভালো” — অনুপমের মামা কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

    উত্তর: কনের বাবা শম্ভুনাথ সেন কোনো অযাচিত যৌতুক বা দেনাপাওনার আগাম প্রতিশ্রুতি না দেওয়ায় অনুপমের মামা বিয়ের আশাব্যাঞ্জক ফল না পাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

    অনুপমের মামার প্রধান লক্ষ্য ছিল এমন পরিবারে বিয়ে দেওয়া, যারা প্রচুর যৌতুক দিতে পারবে অথচ সমাজে ধনী বলে নামডাক থাকবে না। কিন্তু কল্যাণীর বাবা শম্ভুনাথ সেন প্রথম সাক্ষাতে অনুপমকে কোনো আড়ম্বর ছাড়াই গ্রহণ করেন এবং যৌতুক নিয়ে মামার কোনো স্পষ্ট শর্তে রাজি হওয়ার জোরালো সংকেত দেননি। তিনি ছিলেন আত্মমর্যাদাবান ও মৃদুভাষী। মামার কাছে মনে হয়েছিল শম্ভুনাথ সেনের সম্পত্তি সামান্য এবং তার থেকে বড় অঙ্কের যৌতুক আদায় করা যাবে না, তাই তিনি প্রত্যাশিত ফল পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।

    ৪. শম্ভুনাথ সেনকে ‘বিলাতি ফাউন্টেন পেনের’ সাথে তুলনা করা হয়েছে কেন?

    উত্তর: শম্ভুনাথ সেনের বাহ্যিক সাধারণ সজ্জা ও গাম্ভীর্যপূর্ণ আচরণের ভেতরের আত্মমর্যাদাবোধ ও ব্যক্তিত্বকে বোঝাতে এই তুলনা করা হয়েছে।

    শম্ভুনাথ সেন ছিলেন একজন সৎ ও আত্মমর্যাদাবান চিকিৎসক। প্রথম দর্শনে অনুপমের মামা তাকে অত্যন্ত সাধারণ ও গরিব মানুষ বলে ভুল ভেবেছিলেন। কিন্তু বিলাতি ফাউন্টেন পেনের ক্যাপ বন্ধ থাকলে যেমন তার ভেতরের কালি বা ধারের গভীরতা বোঝা যায় না, তেমনি শম্ভুনাথ সেনের নীরবতা ও সাধারণ চালচলনের পেছনেও ছিল এক অনমনীয় আত্মসম্মানবোধ। যখনই মামা অলংকার পরখ করার মধ্য দিয়ে তার পরিবারকে অপমান করেন, তখনই শম্ভুনাথ সেনের দৃঢ় প্রতিবাদ ও বিয়ে ভাঙার মধ্য দিয়ে তার ভেতরের ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায়।

    ৫. “তোমাদের পাত্রের কোনো দর নাই” — কথাটির অন্তর্নিহিত অর্থ কী?

    উত্তর: সমাজ সংস্কারক ও আত্মসম্মানী শম্ভুনাথ সেন যৌতুকলোভী ও ব্যক্তিত্বহীন অনুপম এবং তার পরিবারের অসারতাকে আঘাত করতেই এই উক্তিটি করেছিলেন।

    বিয়ের আসরে কনের অলংকার পরীক্ষা করার মাধ্যমে অনুপমের মামা শম্ভুনাথ সেনের সততা ও বংশ মর্যাদাকে চরম অপমান করেন। মামা ভেবেছিলেন যৌতুকের লোভ দেখিয়ে পাত্রপক্ষের বড়ত্ব প্রকাশ করবেন। কিন্তু শম্ভুনাথ সেন সমস্ত অলংকার পরীক্ষা করিয়ে প্রমাণিত করেন যে তিনি এক চুলও কম দেননি। এরপর তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে যেসব মানুষ বরকে যৌতুকের পণ্য মনে করে এবং বেয়াইয়ের সততাকে সন্দেহ করে, তাদের কাছে পাত্রের নিজস্ব কোনো নৈতিক মূল্য নেই। যৌতুকের দায়ে বর বিক্রি হলেও আত্মসম্মানী মানুষের কাছে তা মূল্যহীন।

    ৬. অনুপমের মামাকে কেন ‘ফল্গু নদীর’ সাথে তুলনা করা হয়েছে?

    উত্তর: অনুপমের মামার ভেতরের অদম্য বিষয়াসক্তি ও লোভ বাইরে প্রকাশ না পেলেও ভেতরে প্রবলাকারে কাজ করত বলেই তাকে ফল্গু নদীর সাথে তুলনা করা হয়েছে।

    ফল্গু নদী যেমন ওপরে শুষ্ক বালুর আস্তরণে ঢাকা থাকে কিন্তু নিচে পানির অন্তঃস্রোত বইতে থাকে, তেমনি অনুপমের মামার বাহ্যিক অবয়ব ভদ্র ও শৃঙ্খলাপরায়ণ মনে হলেও তার ভেতরে ছিল বৈষয়িক স্বার্থ ও লোভের তীব্র আকর্ষণ। অনুপমের পরিবারের চালিকাশক্তি ছিলেন মামা, যিনি সবসময় ধনী হওয়ার ও কনের পরিবারের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধাদানের সুপ্ত কামনায় মগ্ন থাকতেন। তার এই সুপ্ত লোভ ও অসাধু মানসিকতা বোঝাতেই ফল্গু নদীর রূপক ব্যবহার করা হয়েছে।

    ৭. কল্যাণী কেন বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?

    উত্তর: কল্যাণী যৌতুকপ্রথা ও পাত্রপক্ষের অপমানের প্রতিবাদে এবং মাতৃভূমির সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে আজীবন বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

    বিয়ের আসরে যৌতুকের লোভ ও কনের গহনা পরীক্ষার মাধ্যমে অনুপমের পরিবার যে জঘন্য মনস্তাত্ত্বিক অপমান করেছিল, তা কল্যাণীর আত্মসম্মানে আঘাত করে। পরবর্তীকালে অনুপম যখন তাকে গ্রহণ করতে অনুশোচনা প্রকাশ করে, তখন কল্যাণী তাকে বর্জন করে এবং জানিয়ে দেয় যে সে ‘মাতৃআজ্ঞা’ অর্থাৎ দেশের নারীদের শিক্ষার কাজে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। যৌতুকভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি চরম ঘৃণা এবং নারী শিক্ষার মহান ব্রতই তাকে অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্তে অটল রাখে।

    ৮. “গাড়ি চড়িবার জায়গা আছে, কিন্তু চড়িব না” — কল্যাণীর এই বক্তব্যের কারণ কী?

    উত্তর: ট্রেনের প্রথম শ্রেণির কামরায় পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্ত্বেও ইংরেজ দম্পতির ক্ষমতার দাপটের মুখে কল্যাণী নিজের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন না করতে এই কথা বলেছিল।

    রেলযাত্রার সময় ইংরেজ সপরিবারে এসে খালি কামরায় ওঠার চেষ্টা করে এবং কল্যাণী ও তার সঙ্গীদের নামিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করে। স্টেশন মাস্টারও সচরাচর ইংরেজদের তোষামোদ করতেন। কিন্তু কল্যাণী ভীত না হয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে ইংরেজদের নিয়মবিরুদ্ধ ও অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করে। সে স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় যে আইনের বিধানে ও অধিকারের বিচারে তার আসনে বসার যোগ্যতা রয়েছে, কিন্তু কারো অন্যায্য ঔদ্ধত্যের কাছে মাথা নত করে সে সেখানে কৃপা চাইতে যাবে না।

    ৯. অনুপমের জীবনে “দ্বিতীয় অঙ্ক” কীভাবে শুরু হয়েছিল?

    উত্তর: বিয়ের আসর থেকে অপমানিত হয়ে ফিরে আসার পর অনুপমের জীবনের স্বপ্নভঙ্গ এবং কল্যাণীর স্মৃতির অনুশোচনার মাধ্যমে তার জীবনের ‘দ্বিতীয় অঙ্ক’ শুরু হয়।

    বিয়ের দিন পর্যন্ত অনুপম ছিল পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা এক পুতুল সদৃশ যুবক, যার জীবন ছিল নিস্তরঙ্গ ও মামার আজ্ঞাবহ। কিন্তু বিয়ের লগ্ন ভেঙে যাওয়ার পর সে বুঝতে পারে যে সে কী অসাধারণ রত্ন হারিয়েছে। কল্যাণীর প্রতি প্রেম, অনুশোচনা এবং নিজের কাপুরুষতার জন্য তীব্র গ্লানিবোধ তাকে ভেতরে ভেতরে বদলে দেয়। এই মানসিক সংকট ও কল্যাণীকে নতুনভাবে পাওয়ার বাসনাই অনুপমের নিষ্ক্রিয় জীবনের পট পরিবর্তন করে এক নতুন পর্ব বা ‘দ্বিতীয় অঙ্কের’ সূচনা করে।

    ১০. “মনটা যেন অন্য কোথাও পড়িয়া রহিল” — অনুপমের এমন অনুভূতির কারণ কী?

    উত্তর: ট্রেনের কামরায় কল্যাণীর মিষ্টি কিন্তু ব্যক্তিত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর শোনার পর অনুপমের মন কল্যাণীর দিকে ব্যাকুল হয়ে ওঠায় তার এই অনুভূতি হয়েছিল।

    অনুপম ট্রেনে কানপুর যাওয়ার পথে এক অচেনা মেয়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, যা তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত আলোড়ন তৈরি করে। মেয়েটি অত্যন্ত সাহসিকতা ও শান্ত ভাষায় স্টেশনে নেমে যাওয়া সহযাত্রীদের ট্রেনে তুলে নিচ্ছিল। মেয়েটির কণ্ঠের সুধা ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব অনুপমকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পরও তার সমস্ত চিন্তা ও অনুভূতি সেই রহস্যময়ী বালিকার দিকেই নিবেদিত হয়ে রইল।

    ১১. শম্ভুনাথ সেন কনের অলংকার পরীক্ষা করতে দিয়েছিলেন কেন?

    উত্তর: পাত্রপক্ষের নির্লজ্জ যৌতুকপ্রীতি ও সন্দেহপ্রবণ মানসিকতাকে হাতেনাতে প্রমাণ করে তাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য শম্ভুনাথ সেন অলংকার পরীক্ষা করতে দিয়েছিলেন।

    আরও পড়ুন:  অপরিচিতা গল্পের মূল কথা - বাংলা সাহিত্য পাঠ একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি

    বিয়ের আসরে শুভলগ্নের পূর্বেই অনুপমের মামা শম্ভুনাথ সেনকে ডেকে কনের অলংকারগুলো আসল কি না তা পরীক্ষা করার দাবি জানান। কারণ মামা আশঙ্কা করেছিলেন যে কনের বাবা তাকে কম সোনা দিয়ে ঠকাতে পারেন। শম্ভুনাথ সেন শান্ত থেকে সিন্দুক খুলে সব গহনা সেকরার হাতে তুলে দেন। পরীক্ষা শেষে জানা যায় যে সোনাগুলো শুধু খাঁটিই নয়, পরিমাণেও বেশি ছিল। মামার মিথ্যা সন্দেহ এবং নীচতা প্রকাশ করতেই শম্ভুনাথ সেন এই সুযোগ দিয়েছিলেন।

    ১২. অনুপম কেন নিজেকে ‘আন্নাপূর্ণার কোলে গজানন’ বলেছিল?

    উত্তর: শৈশব থেকে অতি-আদরে মানুষ হওয়া এবং পরম নির্ভয়ে ও পরনির্ভরশীলতায় জীবন কাটানোর কারণে অনুপম নিজেকে এই উপমা দিয়ে বর্ণনা করেছে।

    হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী দেবী অন্নপূর্ণার কোলে গণেশ যেভাবে পরম নিশ্চিন্তে ও সুখে থাকেন, অনুপমও তার মায়ের কোলে ঠিক সেভাবেই লালিত-পালিত হয়েছিল। অনুপমের পিতা মারা যাওয়ার পর তার মা ও মামা তাকে কোনো কষ্ট পেতে দেননি, এমনকি জীবনের সিদ্ধান্তগুলোও তারা নিজেরা নিতেন। ফলে অনুপম জীবনের বাস্তবতা ও সংগ্রাম থেকে দূরে থেকে অলস, আড়ম্বরহীন ও পরম সুখে বড় হয়েছিল, যা তাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও পঙ্গু করে তুলেছিল।

    ১৩. “কিন্তু এবার তো পাত্রের নাম শুনিয়া মামার মন গলিিল না” — কেন?

    উত্তর: হরিশ্চন্দ্র যখন শম্ভুনাথ সেনের প্রস্তাব নিয়ে আসেন, তখন শম্ভুনাথ সেনের ধনসম্পদ বেশি ছিল না বলে মামার মন সানন্দে রাজি হয়নি।

    অনুপমের মামা চেয়েছিলেন এমন একটি পরিবারে অনুপমের বিয়ে দিতে, যাদের প্রচুর ধনসম্পদ ও টাকা-পয়সা আছে এবং যারা বরপক্ষকে প্রচুর যৌতুক দেবে। কিন্তু শম্ভুনাথ সেন ছিলেন এক মধ্যবিত্ত পরিবারের চিকিৎসক, যিনি পূর্বে ধনী থাকলেও বর্তমানে সৎভাবে সামান্য উপার্জন করতেন। তার প্রচুর অর্থবিত্ত না থাকায় এবং যৌতুকের নগদ টাকা হস্তান্তরের জোরালো আশ্বাস না মেলায় মামার লোভী মন প্রথম থেকেই এ প্রস্তাবে অসন্তুষ্ট ছিল।

    ১৪. “জিনিসটা যে কী তাহা আমরাও বুঝি নাই” — এখানে ‘জিনিসটা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

    উত্তর: ‘জিনিসটা’ বলতে শম্ভুনাথ সেনের ভেতরের প্রচ্ছন্ন আত্মসম্মানবোধ, অনমনীয় ব্যক্তিত্ব ও সত্যবাদিতাকে বোঝানো হয়েছে।

    অনুপম ও তার পরিবার শম্ভুনাথ সেনকে অত্যন্ত সাধারণ, নমনীয় এবং অসচ্ছল একজন পিতা মনে করেছিল, যাকে ইচ্ছেমতো অপমান করা যাবে। কিন্তু বিয়ের রাতে অলংকার পরখ করার মতো ঘৃণ্য কাজের পরও শম্ভুনাথ সেন শান্ত থেকে বরপক্ষকে আপ্যায়ন করান এবং পরে বিয়ে ভেঙে দেন। অনুপমের মামা বা অনুপম কেউই কল্পনা করতে পারেনি যে একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত পিতা কন্যাপক্ষের তথাকথিত দুর্বলতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে এতটা দৃঢ়তার সাথে মেয়ের আত্মসম্মান রক্ষা করবেন।

    ১৫. শম্ভুনাথ সেন কেন বিয়ে ভেঙে দিয়েছিলেন?

    উত্তর: পাত্রপক্ষের নীচ মানসিকতা, যৌতুকের অসৎ দাবি এবং কনেপক্ষের সততাকে অপমান করার প্রতিবাদেই শম্ভুনাথ সেন বিয়ে ভেঙে দিয়েছিলেন।

    বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতার আগে অনুপমের মামা কনের দেওয়া অলংকারগুলো সত্যিকারের সোনা কি না তা যাচাই করতে সেকরা নিয়ে আসেন। এই জঘন্য কাজের মাধ্যমে অনুপমের মামা কনের বাবা শম্ভুনাথ সেনের সততা ও মর্যাদায় আঘাত হানেন। শম্ভুনাথ সেন বুঝতে পারেন যে যে পরিবার যৌতুকের টাকায় চোখ রাখে এবং মানুষকে সম্মান করতে জানে না, সে পরিবারে তার মেয়ে কল্যাণী সুখী হতে পারবে না। তাই তিনি বরপক্ষকে আপ্যায়ন করে বিদায় দেন এবং বিয়ে ভেঙে দেন।

    ১৬. “মেয়ের বয়স যে পনেরো তাই শুনিয়া মামার মন ভার হইল” — কেন?

    উত্তর: তৎকালীন সমাজ সংস্কার অনুযায়ী পনেরো বছর বয়সী কনেকে বয়স্ক বা ‘বেশি বয়সের’ মেয়ে মনে করা হতো বলে মামার মন খারাপ হয়েছিল।

    তৎকালীন হিন্দু সমাজে বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল এবং কম বয়সের মেয়েদেরই আদর্শ কনে মনে করা হতো। পনেরো বছর বয়স মানে কনে বেশ বড় হয়ে গেছে, যা মামার রক্ষণশীল মানসিকতার বিরুদ্ধে যেত। তাছাড়াও মামা ভয় পেয়েছিলেন যে বড় বয়সের মেয়ের স্বাধীন ব্যক্তিত্ব থাকতে পারে এবং তাকে সহজে নিজের ইচ্ছামতো যৌতুকের জালে বন্দি করা সম্ভব নাও হতে পারে। এই সামাজিক কুসংস্কার ও ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণেই মামার মন ভার হয়েছিল।

    ১৭. “ওগো শুনছ, ওই ট্রেনটাতে আমাদের জায়গা হইবে না” — উক্তিটির তাৎপর্য বুঝিয়ে লেখ।

    উত্তর: তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে ইংরেজ বা প্রভাবশালীদের ভয়ে বাঙালি যাত্রীদের আত্মসমর্পণমূলক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে এই উক্তিটিতে।

    রেলযাত্রার সময় যখন একজন ইংরেজ সাহেব তার পরিবার নিয়ে ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করেন, তখন ট্রেনের বাঙালিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্থান ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা দেখায়। অনুপমের বন্ধু বা সহযাত্রীরাও ইংরেজদের অন্যায় দাবির মুখে নিজেদের অধিকার ছেড়ে দিতে রাজি ছিল। উক্তিটি দিয়ে বাঙালিদের তৎকালীন পরাধীন মানসিকতা, ভয় ও ইংরেজদের প্রতি দাসত্বমূলক আনুগত্যের চিরচেনা প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে, যা কল্যাণীর সাহসিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত।

    ১৮. অনুপমের মায়ের চরিত্রে কী ধরণের মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে?

    উত্তর: অনুপমের মায়ের চরিত্রে ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কুসংস্কার, পুত্রস্নেহের অন্ধত্ব এবং বিত্তের প্রতি নীরব লোভের মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে।

    অনুপমের মা নিজে একসময় দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছিলেন, তাই তিনি ধনসম্পদের অহংকার প্রকাশ করলেও মনে মনে অতি-সংরক্ষনশীল ছিলেন। তিনি অনুপমকে সবসময় চোখের আড়ালে রাখতে চাইতেন এবং তার সব দায়িত্ব মামার হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের আসরে শম্ভুনাথ সেন বরপক্ষকে বিদায় দিলে তিনিও মামার মতোই আহত হন, তবে তা নীতিগত কারণে নয়, বরং তাদের তথাকথিত ‘বংশমর্যাদা’ ক্ষুণ্ন হওয়ায়। তিনি ছিলেন নিজের সমাজের অন্ধ অনুসারী।

    ১৯. কল্যাণী কেন ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাসের কামরায় নামতে অস্বীকার করেছিল?

    উত্তর: স্টেশনের টিকিট চেকার ও ইংরেজ সাহেবের অন্যায্য নির্দেশ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই কল্যাণী কামরা ছাড়তে অস্বীকার করে।

    কল্যাণী এবং তার বাবা উপযুক্ত টিকিট কেটেই ট্রেনের প্রথম শ্রেণির কামরায় বসেছিলেন। কিন্তু একজন ইংরেজ সপরিবারে এলে স্টেশন মাস্টার ও রেলকর্মীরা কল্যাণীদের সেখান থেকে নামিয়ে সাধারণ কামরায় পাঠাতে চায়। কল্যাণী জানত যে তাদের টিকিট বৈধ এবং ট্রেনে পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। কোনো কারণ ছাড়া সাহেবের তোষামোদ করতে গিয়ে নিজের বৈধ অধিকার ত্যাগ করাকে কল্যাণী অন্যায় মনে করেছিল, তাই সে আত্মসম্মান রক্ষা করতে দৃঢ় অবস্থান নেয়।

    ২০. “জায়গা আছে” — কথাটির প্রতীকী অর্থ বুঝিয়ে লেখ।

    উত্তর: ‘জায়গা আছে’ কথাটির বাহ্যিক অর্থ ট্রেনে বসার স্থান হলেও এর প্রতীকী অর্থ হলো অনুপমের হৃদয়জুড়ে কল্যাণীর অবিনাশী স্থান।

    গল্পের শেষে অনুপম যখন কানপুরে কল্যাণীর সন্ধান পায় এবং মাতৃভূমির সেবায় কল্যাণীর আত্মনিবেদনের কথা জানতে পারে, তখন সে কল্যাণীদের জীবনে একটু ঠাঁই চায়। কল্যাণী তাকে ট্রেন থেকে নামার সময় শেষবার বলেছিল “জায়গা আছে”। এই কথাটি অনুপমের মনে আজীবন বেজে চলে। অনুপম অনুধাবন করে যে, যদিও স্বামীরূপে কল্যাণীর জীবনে তার আর কোনো স্থান নেই, কিন্তু অনুপমের নিজের অনুশোচনাগ্রস্ত অন্তরে কল্যাণীর স্মৃতি ও ভক্তির জন্য অনন্ত ‘জায়গা আছে’।

    ২১. “মাথা যে তিনি কিনিয়া লইয়াছেন” — কথাটি দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে?

    উত্তর: শম্ভুনাথ সেন যৌতুকের দাবি মেনে না নিয়েও বরপক্ষকে যে চমৎকার আপ্যায়ন করেছিলেন, তাতে অনুপমদের অহংকার চূর্ণ হওয়াকে বোঝানো হয়েছে।

    বিয়ের রাতে অলংকার পরীক্ষার অপমান সহ্য করার পরও শম্ভুনাথ সেন কোনো প্রকার রাগ প্রকাশ না করে বরপক্ষকে সাদরে অত্যন্ত উন্নতমানের ভোজ খাওয়ান। কিন্তু খাওয়ার পরপরই তিনি জানান যে এ বিয়ে আর সম্ভব নয়। অনুপম ও তার মামা ভেবেছিল অলংকার কাণ্ডের পর বেয়াই মশাই হয়তো অনুনয়-বিনয় করবেন। কিন্তু শম্ভুনাথ সেনের এই অভূতপূর্ব আতিথেয়তা ও তারপরই বিয়ে ভাঙার দৃঢ় সিদ্ধান্ত অনুপমের মামার সমস্ত অহংকার ও আস্ফালনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

    ২২. হরিশ্চন্দ্রের প্রধান গুণটি কী ছিল?

    উত্তর: হরিশ্চন্দ্রের প্রধান গুণ ছিল যেকোনো গম্ভীর ও কঠিন বিষয়কে আসর জমিয়ে রসাত্মকভাবে উপস্থাপন করার অসাধারণ ক্ষমতা।

    হরিশ্চন্দ্র ছিলেন অনুপমের মধ্যস্থতাকারী বা বিয়ের ঘটকসম বন্ধু। তিনি কানপুরে চাকরি করতেন এবং রসিক মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মামা যখন অনুপমের বিয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্রীর সন্ধান করছিলেন, তখন হরিশ্চন্দ্রই শম্ভুনাথ সেনের মেয়ে কল্যাণীর প্রস্তাব নিয়ে আসেন। মামা যে ধরণের যৌতুক ও কনে দেখতে চান, হরিশ্চন্দ্র তার কথাবার্তা ও রসিকতার মাধ্যমে মামার সেই লোভাতুর মনকে রাজি করাতে পেরেছিলেন।

    ২৩. “তাহা হইলে বড়োই আনন্দের কথা” — শম্ভুনাথ সেনের এই উক্তির পেছনের সত্যটি কী?

    উত্তর: মামার অহংকার ও অসৎ মানসিকতা প্রকাশ পাওয়ার পর শম্ভুনাথ সেন বিদ্রূপাত্মকভাবে এই উক্তি করেছিলেন।

    বিয়ের আসরে কনের গহনাগুলো আসল সোনা কি না তা পরীক্ষা করার পর যখন দেখা গেল সোনা পুরোপুরি খাঁটি, তখন মামা লজ্জিত হয়ে বলেন যে তিনি বরপক্ষের নাম উজ্জ্বল করতে চান। শম্ভুনাথ সেন মামার এই ভণ্ডামি ও নীচতা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি মুখে শান্ত থেকে “তাহা হইলে বড়োই আনন্দের কথা” বলে বরপক্ষকে খেতে পাঠিয়ে দেন, কিন্তু মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে এই ভণ্ড ও লোভী পরিবারে তিনি মেয়ে দেবেন না।

    ২৪. অনুপম কেন নিজেকে ‘ভাগ্যের উপহাস’ বলে মনে করেছিল?

    উত্তর: নিজের যোগ্যতার অভাব এবং হাতের কাছে পাওয়া পরম সুন্দর জীবনসঙ্গীকে নিজের কাপুরুষতায় হারানোর কারণেই অনুপম নিজেকে ভাগ্যের করুণ উপহাস মনে করেছিল।

    অনুপম ছিল উচ্চশিক্ষিত এবং দেখতেও সুপুরুষ, কিন্তু বিয়ের রাতে নিজের মামার অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলতে পারেনি। এর ফলে কল্যাণীর মতো অনন্য, রূপসী ও আত্মসম্মানী মেয়েকে সে লাভ করার খুব কাছাকাছি গিয়েও চিরতরে হারিয়ে ফেলে। সুবর্ণ সুযোগ সামনে এসেও নিজের ব্যক্তিত্বহীনতার কারণে তা হাতছাড়া হয়ে যাওয়াকেই অনুপম তার জীবনে ভাগ্যের চরম নিষ্ঠুর তামাশা বা উপহাস হিসেবে গণ্য করেছে।

    আরও পড়ুন:  অপরিচিতা গল্প (Oporichita) – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি

    ২৫. “আমাদের সেই দুইখানি খাঁটি সোনার গহনা” — উক্তিটির অর্থ কী?

    উত্তর: কনের অলংকার পরীক্ষা করতে গিয়ে মামা বুঝতে পারেন যে তাদের পারিবারিক গহনার চেয়ে শম্ভুনাথ সেনের দেওয়া অলংকার অনেক বেশি উন্নত ও খাঁটি ছিল।

    বিয়ের রাতে কনেকে দেওয়ার জন্য অনুপমের মামা তাদের নিজেদের সেকরাকে সাথে এনেছিলেন যাতে কনের গহনাগুলো পরীক্ষা করা যায়। মামা মনে করেছিলেন কনের বাবা হয়তো তাদের পিতল মেশানো গহনা দিয়ে ঠকাবেন। কিন্তু সেকরা পরীক্ষা করে জানায় যে কনের বাবার দেওয়া গহনাগুলো শুধু আসল সোনাই নয়, তাতে কোনো খাদ ছিল না। বরং অনুপমের পরিবারের পুরনো গহনার চেয়েও তা উন্নতমানের। এতে মামার সংকীর্ণ মানসিকতারই পরাজয় ঘটেছিল।

    ২৬. কল্যাণীকে কেন ‘অনন্যা’ বলা যায়?

    উত্তর: কল্যাণী তার রূপ, শিক্ষা, অদম্য সাহসিকতা, আত্মমর্যাদা এবং দেশপ্রেমের কারণে তৎকালীন অন্যান্য সাধারণ নারী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও অনন্যা।

    তৎকালীন সমাজের নারীরা যখন অবাধ্যতা ও অন্যায় মেনে নিতে বাধ্য হতো, তখন কল্যাণী বিয়ের আসরে বরপক্ষের অন্যায় অপমানকে নীরব প্রচ্ছদে দূর করে নিজের মর্যাদা রক্ষা করেছিল। সে কেবল সুন্দরই ছিল না, ছিল প্রতিবাদী ও স্বাবলম্বী। পরবর্তীতে সে বিবাহ না করে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে নারীদের শিক্ষিত করার ব্রত নেয় এবং ট্রেনের কামরায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের অধিকার আদায় করে। এসব গুণই তাকে তৎকালীন সমাজে অনন্যা করে তুলেছিল।

    ২৭. “সে তো সাধারণ মেয়ে নয়” — অনুপম কেন কল্যাণী সম্পর্কে এই ধারণা করেছিল?

    উত্তর: ট্রেনের কামরায় কল্যাণীর তেজস্বী রূপ, নির্ভীক আচরণ এবং ট্রেনের সহযাত্রী শিশুদের প্রতি ভালোবাসা দেখে অনুপম এই অনুধাবন করেছিল।

    রেলযাত্রার সময় ইংরেজ সাহেব ও স্টেশন মাস্টারের অন্যায় চাপের মুখে কল্যাণী বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি। বরং অত্যন্ত শান্ত ও দৃঢ় ভাষায় নিজের আসনে থাকার আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। একই সাথে সে ট্রেনে ওঠানামা করা ছোট শিশুদের চকোলেট দিয়ে আপন করে নিচ্ছিল। সাধারণ বাঙালি নারীদের মতো ভীতি বা লজ্জা কল্যাণীর মধ্যে ছিল না। তার এই অনন্য ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাস দেখেই অনুপম বুঝেছিল যে কল্যাণী আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো নয়।

    ২৮. “আমার সংসারে আমিই একমাত্র পুরুষ” — অনুপমের মামার এই অহংকারের ভিত্তি কী?

    উত্তর: অনুপমের বাবা মারা যাওয়ার পর পুরো সংসারের সমস্ত কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার একক ক্ষমতা মামার হাতে চলে যাওয়াটাই ছিল তার অহংকারের ভিত্তি।

    অনুপমের পিতা ওকালতি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেও তা ভোগ করার আগেই মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর অনুপমের মা সব দায়িত্ব অনুপমের মামার ওপর সঁপে দেন। মামা সংসারের চালক হয়ে ওঠেন এবং নিজের বৈষয়িক জ্ঞান দিয়ে অনুপমকে সম্পূর্ণ পুতুল বানিয়ে রাখেন। সংসারে অন্য কোনো বয়স্ক পুরুষ অভিভাবক না থাকায় মামা নিজেকেই সর্বেসর্বা মনে করতেন এবং নিজের মতকে পরিবারের একমাত্র আইন হিসেবে চালাতেন।

    ২৯. “সে যে অন্য জগতের লোক” — বলতে কাকে এবং কেন বোঝানো হয়েছে?

    উত্তর: বলতে শম্ভুনাথ সেন ও তার কন্যা কল্যাণীকে বোঝানো হয়েছে, কারণ তাদের জগতটি ছিল সত্য, আত্মমর্যাদা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের।

    অনুপম ও তার মামার জগতটি ছিল যৌতুক, সামাজিক নামডাক, মিথ্যে অহংকার এবং অর্থের লোভে ভরপুর। অন্যদিকে শম্ভুনাথ সেনের পরিবার অর্থসম্পদে ধনী না হলেও তারা ছিলেন চরিত্রের দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও খাঁটি। তারা যৌতুকের লোভী সমাজের সামনে মাথা নত না করে আত্মসম্মানকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছিলেন। এই নৈতিক আদর্শের বৈপরীত্যের কারণেই অনুপম তাদের ‘অন্য জগতের লোক’ বলে চিহ্নিত করেছে।

    ৩০. অনুপমের মা কেন কনে দেখার বিষয়ে মামার ওপর নির্ভর করতেন?

    উত্তর: অনুপমের মা সাংসারিক জ্ঞান ও সামাজিক জটিলতা বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন না এবং মামার বৈষয়িক বুদ্ধির ওপর তার অন্ধ বিশ্বাস ছিল।

    অনুপমের মা নিজে এক দরিদ্র পরিবার থেকে এসে ধনী ঘরে স্ত্রী হিসেবে স্থান পেয়েছিলেন, তাই অর্থের মূল্য ও সামাজিক দেনাপাওনার হিসাব তিনি বুঝতেন না। তিনি মনে করতেন তার ভাই অর্থাৎ অনুপমের মামা সংসারের ভালো-মন্দ সবচেয়ে ভালো বোঝেন। মামা যে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তাতে কোনো ভুল হতে পারে না—এই সরল ও অন্ধ বিশ্বাসের কারণেই তিনি ছেলের বিয়ের কনে দেখার সম্পূর্ণ দায়িত্ব মামার হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন।

    ৩১. “আমি খাইয়া আসি” — শম্ভুনাথ সেনের এই আচরণের তাৎপর্য কী?

    উত্তর: চরম অপমানের মুখোমুখি হয়েও অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামলানো এবং বরপক্ষকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার পূর্ব-প্রস্তুতি হিসেবে শম্ভুনাথ সেন এই কাজ করেছিলেন।

    বিয়ের শুভলগ্নের পূর্বে কনের অলংকার পরীক্ষা করে অনুপমের মামা শম্ভুনাথ সেনকে চরম লজ্জিত ও অপমানিত করার চেষ্টা করেন। শম্ভুনাথ সেন একটুও চিৎকার বা তর্ক না করে শান্তভাবে অলংকার পরীক্ষা করিয়ে দেন। এরপর তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে বরপক্ষকে খাওয়াতে নিয়ে যান এবং নিজে অন্য ঘরে গিয়ে খেয়ে আসার কথা বলেন। তার এই আচরণ প্রমাণ করে যে তিনি ভেতরে ভেতরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, যা ছিল বরপক্ষকে চিরতরে প্রত্যাখ্যান করা।

    ৩২. অনুপমের বন্ধুর নাম কী এবং তার ভূমিকা কেমন ছিল?

    উত্তর: অনুপমের বন্ধুর নাম ছিল হরিশ (বা হরিশ্চন্দ্র) এবং সে ছিল রসিক ও মধ্যস্থতাকারী একজন মানুষ।

    হরিশ কানপুরে চাকরি করত এবং সুযোগ পেলেই কলকাতায় অনুপমের কাছে এসে আড্ডা দিত। সেই অনুপমের কাছে শম্ভুনাথ সেনের কন্যা কল্যাণীর সৌন্দর্য ও গুণের প্রশংসা করে এবং মামার কাছে বিয়ের প্রস্তাবটি নিয়ে যায়। মামার মতো লোভী মানুষকে রাজি করানোর পেছনে হরিশের রসাত্মক ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনা প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। যদিও পরবর্তীতে বিয়ের আসরে সংকট তৈরি হলে সে-ও সাধারণ দর্শকের মতো নীরব ছিল।

    ৩৩. “বাপের বিশেষ কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না” — কথাটির অর্থ কী?

    উত্তর: কল্যাণীর বাবা শম্ভুনাথ সেন অনুপমের মামার মতো অন্যায্য শর্ত বা যৌতুকের দাসত্ব মেনে নিতে বাধ্য ছিলেন না।

    অনুপমের মামা ভেবেছিলেন শম্ভুনাথ সেন যেহেতু মেয়ে বিয়ে দিতে এসেছেন, তাই বরপক্ষের সব অপমান ও শর্ত তিনি মাথা পেতে নেবেন। কিন্তু শম্ভুনাথ সেন ছিলেন একজন মুক্ত ও আত্মসম্মানী পুরুষ। তিনি মেয়ের বিয়ের জন্য সামাজিক প্রথার কাছে নিজের আত্মসম্মান বিক্রি করতে রাজি ছিলেন না। তার কোনো দেনার দায় বা বরপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণের বাধ্যবাধকতা ছিল না বলেই তিনি অনায়াসে যৌতুকলোভী অনুপমদের প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছিলেন।

    ৩৪. “প্রদোশের অন্ধকারেই তাহার রূপটি দেখিলাম” — উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।

    উত্তর: ট্রেন ভ্রমণের সূর্যাস্তকালীন আবছা আলোয় অনুপম কল্যাণীকে প্রথমবার গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছিল।

    কানপুর যাওয়ার পথে ট্রেনে যখন অনুপম ও কল্যাণীর মুখোমুখি সাক্ষাত হয়, তখন দিন শেষের গোধূলি বা প্রদোশের অন্ধকার নেমে আসছিল। সেই আবছা আলোয় কল্যাণীর আত্মপ্রত্যয়ী মুখশ্রী, ডাগর চোখ এবং ব্যক্তিত্বপূর্ণ উপস্থিতি অনুপমের মনে এক অদ্ভুত মায়ার সৃষ্টি করে। অন্ধকার সত্ত্বেও কল্যাণীর অভ্যন্তরীণ তেজ ও সৌন্দর্য অনুপমের চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, যা তার হৃদয়কে আলোড়িত করে।

    ৩৫. কল্যাণীর ‘মাতৃআজ্ঞা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

    উত্তর: ‘মাতৃআজ্ঞা’ বলতে দেশমাতৃকার সেবা এবং দেশের নারীদের শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল করার অঙ্গীকারকে বোঝানো হয়েছে।

    অনুপম যখন অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে কল্যাণীর কাছে অনুগ্রহ চাইতে কানপুরে যায়, তখন কল্যাণী তাকে বিয়ে করতে অসম্মতি জানায়। সে বলে যে সে ‘মাতৃআজ্ঞা’ গ্রহণ করেছে। এখানে মাতৃআজ্ঞা বলতে কোনো ব্যক্তিগত মায়ের নির্দেশ নয়, বরং জন্মভূমি বা দেশমাতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আত্মনিয়োগ করাকে বোঝানো হয়েছে। কল্যাণী দেশের বালিকাদের শিক্ষার দায়িত্বে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল এবং এই স্বদেশপ্রেমকেই সে তার জীবনের সর্বোচ্চ ব্রত মনে করেছিল।

    ৩৬. অনুপমের মামা বিয়ের আসরে সেকরা নিয়ে এসেছিলেন কেন?

    উত্তর: কনেপক্ষ থেকে দেওয়া অলংকারগুলোতে আসল সোনা রয়েছে নাকি পিতল বা খাদ মেশানো আছে তা পরীক্ষা করার জন্য মামা সেকরা এনেছিলেন।

    অনুপমের মামা ছিলেন প্রচণ্ড সন্দেহপ্রবণ ও লোভী প্রকৃতির মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কনের পরিবার হয়তো তাদের ঠকানোর জন্য কম সোনার বা কম দামি অলংকার দিতে পারে। বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেলে আর দাবি করা যাবে না—এই চিন্তায় শুভলগ্নের আগেই তিনি সঙ্গে করে আনা নিজেদের বিশ্বাসী সেকরা দিয়ে কনের শরীরের সব অলংকার মেপে ও পরীক্ষা করে নিতে চেয়েছিলেন।

    ৩৭. “আহা, এ যেন কোন্ দেওদারের বনে বাতাস আসিয়া লাগিল” — কথাটির অর্থ কী?

    উত্তর: ট্রেনের মধ্যে কল্যাণীর সুমিষ্ট ও প্রাণবন্ত কণ্ঠস্বর শুনে অনুপমের শুষ্ক ও বিষণ্ণ হৃদয়ে যে শিহরণ জেগেছিল, তাকেই এই উপমায় ব্যক্ত করা হয়েছে।

    বিয়ের ট্র্যাজেডির পর অনুপমের জীবন হয়ে উঠেছিল আনন্দহীন ও মরুভূমির মতো শুষ্ক। ট্রেনে ভ্রমণকালে হঠাৎ করেই এক অচেনা বালিকার (কল্যাণীর) কণ্ঠস্বর তার কানে আসে। সেই কণ্ঠ এতই সজীব, স্পষ্ট ও মধুর ছিল যে অনুপমের মনে হয়েছিল তা যেন পার্বত্য দেওদার বনের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া সতেজ বাতাসের মতো। এই উক্তিটি কল্যাণীর কণ্ঠস্বরের সৌন্দর্য ও অনুপমের অন্তরের অনুভূতির গভীরতাকে প্রকাশ করে।

    আরও পড়ুন:  অপরিচিতা গল্পের MCQ: অপরিচিতা গল্পের বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর

    ৩৮. শম্ভুনাথ সেন কেন মেয়েকে নিয়ে কানপুরে চলে গিয়েছিলেন?

    উত্তর: বিয়ের আসরে চরম অপমানিত হওয়ার পর সমাজের কুৎসিত কৌতূহল ও মেকি লোকলজ্জা থেকে দূরে থাকতে শম্ভুনাথ সেন কানপুরে চলে যান।

    কলকাতায় বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর তৎকালীন সামাজিক নিয়মে কনে ও তার পরিবারকে নানাবিধ সামাজিক গঞ্জনা ও কৌতূহলের মুখে পড়তে হতো। শম্ভুনাথ সেন ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা ও আত্মসম্মানী চিকিৎসক। তিনি সামাজিক আলোচনা বা নিন্দার পরোয়া না করে নিজের পেশাগত কাজের সূত্রে এবং মেয়েকে এক নতুন ও মুক্ত পরিবেশে বড় করার উদ্দেশ্যে কানপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

    ৩৯. অনুপমের বয়স কত এবং সে কী পাস করেছিল?

    উত্তর: ‘অপরিচিতা’ গল্পের শুরুতে অনুপমের বয়স ছিল ২৭ বছর এবং সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ (M.A) পাস করেছিল।

    উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও অনুপমের নিজস্ব কোনো মতামত বা ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠেনি। এম.এ পাস করার পরও সে সংসারের কোনো দায়িত্ব নেয়নি এবং পুরোপুরি মামার ওপর নির্ভর করে অলস জীবনযাপন করছিল। তার এই ডিগ্রি অর্জন কেবল বাহ্যিক যোগ্যতা হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল, চরিত্র গঠনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।

    ৪০. “হরিশের সরস রসনার গুণেই মামার মন ভিজিল” — কথাটির তাৎপর্য কী?

    উত্তর: হরিশের আকর্ষণীয় উপস্থাপন শৈলী এবং কনেপক্ষের অবস্থান রসময় করে তোলার কারণেই মামা বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলেন।

    অনুপমের মামা ছিলেন অত্যন্ত শক্ত মনের লোভী মানুষ, যাকে সহজে রাজি করানো যেত না। হরিশ কানপুর থেকে এসে শম্ভুনাথ সেনের কন্যার রূপ ও বংশমর্যাদার এমন এক মনোমুগ্ধকর বিবরণ মামার সামনে তুলে ধরে যে মামার লোভী মন গলে যায়। হরিশ মামার মনস্তত্ত্ব বুঝত, তাই সে বুঝতে পেরেছিল কীভাবে বললে মামা যৌতুক ও সম্মানের হিসাব মিলিয়ে কনে দেখতে উৎসাহিত হবেন।

    ৪১. অনুপমের আসল অভিভাবক কে ছিলেন?

    উত্তর: অনুপমের আসল অভিভাবক ছিলেন তার মামা, যিনি বয়সে অনুপমের চেয়ে সামান্য বড় হলেও সংসারের সার্বিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।

    যদিও অনুপমের মা জীবিত ছিলেন, কিন্তু পিতা মারা যাওয়ার পর মামাই পুরো পরিবারের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন। অনুপমের শিক্ষা, বিয়ে এমনকি দৈনন্দিন জীবনের সিদ্ধান্তও মামার ইচ্ছায় নির্ধারিত হতো। অনুপম নিজেই স্বীকার করেছে যে তার মামা ছিলেন সংসারের প্রকৃত চালক এবং অনুপমের ব্যক্তিত্বকে স্তব্ধ করে দেওয়া প্রধান অভিভাবক।

    ৪২. “সেই স্বর যে আমার হৃদয়ের তারে আজও বাজিতেছে” — অনুপমের এই ব্যাকুলতার কারণ কী?

    উত্তর: ট্রেনের কামরায় কল্যাণীর যে কণ্ঠস্বর অনুপম শুনেছিল, তার সৌন্দর্য ও তেজস্বিতা অনুপমের হৃদয়ে চিরস্থায়ী দাগ কেটেছিল।

    রেল ভ্রমণের সময় অনুপম প্রথমবার কল্যাণীর স্পষ্ট ও মিষ্টি কণ্ঠ শুনতে পায়, যখন সে তার সহযাত্রীদের ট্রেনে তুলছিল। সেই আওয়াজে ছিল অদ্ভুত এক অধিকারবোধ ও পরম মমতা। পরবর্তীতে যখন অনুপম জানতে পারে যে এই মেয়েটিই তার বাগদত্তা কল্যাণী, যাকে সে হারিয়েছে, তখন সেই কণ্ঠস্বর আরও বেশি আবেদনময় হয়ে ওঠে। অনুশোচনা ও গভীর অনুরাগের কারণে সেই কণ্ঠস্বর অনুপমের হৃদয়ে অবিনাশী সুর হয়ে বাজতে থাকে।

    ৪৩. শম্ভুনাথ সেনের শারীরিক ও মানসিক গঠন কেমন ছিল?

    উত্তর: শম্ভুনাথ সেন ছিলেন সুপুরুষ, গৌরবর্ণ, শান্ত প্রকৃতির কিন্তু অন্তরে অত্যন্ত দৃঢ় ও আত্মসম্মানী মানসিকতার অধিকারী।

    বাহ্যিকভাবে শম্ভুনাথ সেনের বয়স চল্লিশের ওপরে হলেও তাকে দেখতে যুবক মনে হতো। তিনি বেশ ধীর-স্থির ও কম কথা বলতেন। কিন্তু তার বাহ্যিক নম্রতার পেছনে ছিল অনমনীয় ব্যক্তিত্ব। বিয়ের আসরে বরের পরিবার যখন যৌতুকের লোভে কনের অলংকার পরীক্ষা করে, তখন তিনি বিন্দুমাত্র উত্তেজিত না হয়ে অত্যন্ত নিখুঁত ও কঠোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিয়ে ভেঙে দেন, যা তার মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয়।

    ৪৪. “আমি ভাগ্যকে লাভ করিলাম” — গল্পের শেষে অনুপমের এই তৃপ্তির কারণ কী?

    উত্তর: কল্যাণীকে স্ত্রী হিসেবে না পেলেও তার সান্নিধ্য লাভ করতে পারা এবং তার সেবায় আত্মনিয়োগ করার সুযোগ পাওয়াকেই অনুপম তার পরম ভাগ্য বলে মনে করেছিল।

    কল্যাণী চিরকুমারী থেকে দেশের কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অনুপমের সাথে তার বিবাহ সম্ভব হয়নি। কিন্তু অনুপম কানপুরে গিয়ে কল্যাণীর কাছে থাকার এবং তার কাজে সাহায্য করার সুযোগ পায়। অনুপম অনুধাবন করে যে, সাধারণ সাংসারিক সম্পর্কের চেয়ে কল্যাণীর মতো এক অনন্য ও মহৎ নারীর সেবক বা সঙ্গী হতে পারাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এই আত্মিক অনুভূতির কারণেই সে নিজেকে ভাগ্যবানের আসনে বসিয়েছে।

    ৪৫. তৎকালীন সমাজে যৌতুকপ্রথার চিত্র ‘অপরিচিতা’ গল্পে কীভাবে ফুটে উঠেছে?

    উত্তর: তৎকালীন সমাজে যৌতুকপ্রথাকে বরের পরিবারের অধিকার এবং কনেপক্ষকে অত্যাচার করার মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়েছে।

    গল্পে দেখা যায়, কনেপক্ষের সততা বা আত্মসম্মানের চেয়ে বরের পরিবার নগদ টাকা ও অলংকার পাওয়ার লোভে মত্ত থাকত। অনুপমের মামা বিয়ের আসরে অলংকার মেপে নেওয়াকে অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয় মনে করেছিলেন, যা প্রমাণ করে সমাজ কনেপক্ষকে কতটা হীন চোখে দেখত। যৌতুকের এই কুৎসিত দরকষাকষির কাছে মানবিক সম্পর্ক ও ভালোবাসার কোনো স্থান ছিল না।

    ৪৬. “আমাকে ক্ষমা করো” — অনুপম কার কাছে এবং কেন ক্ষমা চেয়েছিল?

    উত্তর: অনুপম কল্যাণীর বাবার (শম্ভুনাথ সেন) কাছে তাদের পরিবারের অতীত অন্যায় ও কাপুরুষতার জন্য ক্ষমা চেয়েছিল।

    বিয়ের আসরে অনুপমের মামা যে জঘন্য আচরণ করেছিলেন এবং অনুপম নীরব থেকে তা সমর্থন করেছিল, সে জন্য অনুপম তীব্র অনুশোচনায় ভুগছিল। কানপুরে শম্ভুনাথ সেনের সাথে দেখা হওয়ার পর অনুপম তার পায়ের ধুলো নিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে। সে বুঝতে পেরেছিল যে তাদের নীচ আচরণের কারণেই একটি সুন্দর সম্পর্ক ধ্বংস হয়েছিল এবং সেই পাপের প্রাশ্চিত্ত করতেই সে বিনয়ের সাথে ক্ষমা চেয়েছিল।

    ৪৭. ‘অপরিচিতা’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা কী?

    উত্তর: অপরিচিতা শব্দটির মাধ্যমে কল্যাণীর রহস্যময় রূপ এবং অনুপমের জীবনে তার চির-অপরিচিত কিন্তু পরম আপন হয়ে থাকার অবস্থানকে বোঝানো হয়েছে।

    অনুপমের কাছে কল্যাণী প্রথমে ছিল এক নাম না জানা কনে, যাকে সে কখনো দেখেনি। পরবর্তীতে ট্রেনে দেখা হওয়া মেয়েটিও ছিল তার কাছে এক ‘অপরিচিতা’। যখন সে জানতে পারে যে এই তেজস্বী মেয়েটিই তার বাগদত্তা ছিল, ততদিনে সে তাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে। কল্যাণী অনুপমের খুব কাছে থেকেও সামাজিক ও মানসিক দূরত্বের কারণে চিরকাল এক ‘অপরিচিতা’ অনুভূতির নাম হয়ে রয়ে যায়, যা গল্পের নামকরণকে সার্থক করে।

    ৪৮. “ঠাট্টার সম্পর্কটাকে স্থায়ী করিবার ইচ্ছা আমার নাই” — কথাটি কে, কাকে বলেছিল?

    উত্তর: কথাটি কনের বাবা শম্ভুনাথ সেন অনুপমের মামাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন।

    বিয়ের রাতে অলংকার পরীক্ষার পর শম্ভুনাথ সেন বরপক্ষকে আপ্যায়ন করান। খাওয়া শেষে যখন মামা অনুপমকে ছাদনা তলায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন, তখন শম্ভুনাথ সেন স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তিনি এই বিয়ে দেবেন না। মামা অবাক হয়ে একে ‘ঠাট্টা’ বা তামাশা বললে শম্ভুনাথ সেন উত্তর দেন যে বরপক্ষ অলংকার পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের সাথে যে উপহাস করেছে, সেই অপমানজনক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে তিনি মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবেন না।

    ৪৯. কল্যাণী কেন ছোট ছোট শিশুদের ট্রেনে মিষ্টি খাওয়াচ্ছিল?

    উত্তর: কল্যাণী স্বভাবগতভাবেই কোমলমতি, মাতৃত্বপূর্ণ ও শিশুদের প্রতি মমতাময়ী ছিল বলেই তাদের ট্রেনে খাবার ও মিষ্টি খাওয়াচ্ছিল।

    কল্যাণীর চরিত্রে একদিকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও আত্মসম্মান ছিল, অন্যদিকে ছিল মানবিক কোমলতা। ট্রেনে ভ্রমণকালে সহযাত্রী শিশুদের সে অত্যন্ত ভালোবেসে চকোলেট ও মিষ্টি দিচ্ছিল। এতে বোঝায় যায় যে সে কেবল কঠোর ব্যক্তিত্বের অধিকারী নয়, বরং তার হৃদয় ছিল অত্যন্ত দয়াশীল ও নিখাদ ভালোবাসায় পূর্ণ।

    ৫০. ‘অপরিচিতা’ গল্পে অনুপমের আত্মোপলব্ধি কীভাবে ঘটেছে?

    উত্তর: বিয়ে ভেঙে যাওয়া, কল্যাণীর অদম্য ব্যক্তিত্ব দর্শন এবং নিজের কাপুরুষতার অনুশোচনার মধ্য দিয়ে অনুপমের মানসিক বিপ্লব ও আত্মোপলব্ধি ঘটেছে।

    বিয়ের দিন পর্যন্ত অনুপম ছিল পরিবারের কথামতো চলা এক পুতুল। কিন্তু বিয়ের আসরে শম্ভুনাথ সেনের কঠোর সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তীতে ট্রেনে কল্যাণীর স্বাধীন ও প্রখর ব্যক্তিত্ব দেখে অনুপম নিজের ভেতরের ক্ষুদ্রতা ও শূন্যতা অনুধাবন করতে পারে। সে বুঝতে পারে যে শিক্ষার চেয়ে ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক সাহসের মূল্য অনেক বেশি। এই অনুশোচনাই তাকে পরিবারের অন্ধ অনুগত্য থেকে বের করে এক সংবেদনশীল ও অনুতপ্ত মানুষে রূপান্তরিত করে।


    উপসংহার

    এইচএসসি বাংলা ১ম পত্রের সৃজনশীল অংশে পূর্ণ নম্বর অর্জনের ক্ষেত্রে ‘খ’ নম্বর বা অনুধাবনমূলক প্রশ্নের সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ উত্তরের ভূমিকা অপরিসীম । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অপরিচিতা’ গল্পের প্রতিটি পঙ্ক্তি ও উক্তির আড়ালে যে গভীর সামাজিক বার্তা, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং আত্মমর্যাদার বাণী লুকিয়ে আছে, তা নিখুঁতভাবে অনুধাবন করাই হলো ভালো ফলাফলের মূল চাবিকাঠি। আশা করা যায়, ওপরের সুবিন্যস্ত প্রশ্ন ও উত্তরগুলো চর্চা করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা গল্পের অন্তর্নিহিত ভাবসত্যকে সহজে উপলব্ধি করতে পারবে এবং পরীক্ষায় যেকোনো অনুধাবনমূলক প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর দিতে সক্ষম হবে । এই গভীর অনুশীলন একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার্থীদের কেবল এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতেই সাহায্য করবে না, বরং তাদের সাহিত্যরসবোধ ও চিন্তাশক্তিকেও সমৃদ্ধ করতে এক বিশ্বস্ত নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে ।

    Views: 1

    Admin

    Moner Rong (মনের রঙ) একটি সৃজনশীল বাংলা ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম, যেখানে আমরা জীবনবোধ, সাহিত্য এবং ভ্রমণের মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা করি । আমাদের পাঠকদের জন্য আমরা নিয়মিত মৌলিক কবিতা, হৃদয়স্পর্শী গল্প, জীবনমুখী মোটিভেশনাল আর্টিকেল এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের নিখুঁত ট্রাভেল গাইড শেয়ার করি । মানসম্মত কন্টেন্ট এবং সঠিক তথ্যের মাধ্যমে পাঠকদের মনের খোরাক জোগানোই আমাদের মূল লক্ষ্য । আপনি যদি সাহিত্যপ্রেমী হন বা নতুন কোনো ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তবে 'মনের রঙ' হতে পারে আপনার প্রতিদিনের সঙ্গী । আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।"
    1 mins

    Share with

    Right Menu Icon